তার কাঁধে হাত রেখে বললাম, ‘দেখ, এভাবে ভেঙে পড়লে তো চলবে না। রোগ। যেমন আছে, তার চিকিৎসাও আছে। তুই চিন্তা করিস না জাহিদ। আল্লাহ চান তো। তোর মেয়ের কিচ্ছু হবে না। ও ঠিক ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে।
বিপদের দিনে মানুষকে আশার আলো দেখাতে হয়। যেখানে অন্ধকার ব্যতীত আলোর নিশানাও নেই, সেখানেও আলোর উপস্থিতি কল্পনা করে নিতে হয় আমাদের। মানুষ আশা করতে পারে বলেই সে এতো বিচিত্র বিপদেও সভ্যতার পর সভ্যতা ধরে টিকে আছে।
জাহিদের সাথে কথাগুলো হয়েছিলো বেশ আগে। এরপর দীর্ঘদিন আমাদের কোনো যোগাযোগ হয়নি। যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় কেউ কারও খোঁজ-খবরও নিতে পারিনি সেভাবে। মতিঝিলে গতকাল অকস্মাৎ মুখোমুখি দুজনে। দুজনেই দৌড়ের ওপর ছিলাম একপ্রকার। জাহিদকে দেখলাম বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আছে। টং দোকানে চা খেতে খেতে হালকা আলাপ হলো বটে, কিন্তু সেই প্রাণবন্ত আলাপের কোথাও দুঃখ-বেদনার কোনো উপস্থিতি টের পাইনি।
এরপর? এরপর আজ তার মৃত্যুসংবাদ! আহা মৃত্যু! আহারে মানুষ! কচুপাতার ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দুর মতোই ঠুনকো মানুষের জীবন। হালকা বাতাসে পাতা দুললেই গড়িয়ে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়।
হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়েছে জাহিদের। কী জানি ওই বুকের ভেতর কতো রকমের বোঝা চেপে রেখেছিল সে। গতকালকের জাহিদকে আজ অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন বিশেষণে ডাকতে হবে। মৃত জাহিদ। লেইট জাহিদ। গতকালকের জাহিদ আজ কেবলই একটা নির্জীব, অনড় পদার্থ। গতকালকের মানুষটা আজ কেবলই লাশ! জীবনের পরিণতি কতটা নিষ্ঠুর হয় তা যদি আমরা অনুভব করতাম!
জাহিদের মৃত্যুর সাথে সাথে তার মেয়েটার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেলো। যাদের সাথে ব্যবসা করতো সে, তারাও নানান অজুহাতে সবকিছু গুটিয়ে নিয়ে পালাবার ধান্দায় ব্যস্ত। মৃত্যুর সাথে সাথে নামে-বেনামে বেরিয়ে এলো অনেক পাওনাদার। কোথায় জানি একবার পড়েছিলাম, ‘জীবিতকে নিয়ে ব্যবসা চলে, মৃতকে নিয়ে নয়। এই অসত্য, অযৌক্তিক কথাখানি যিনি বলেছিলেন সেই ভদ্রলোক বেঁচেবর্তে আছেন কি না জানা নেই। থাকলে তাকে আজ দেখানো যেতো মৃত মানুষকে নিয়েও এখানে কতো রমরমা ব্যবসা হয়!
জাহিদের মৃত্যুর মাস তিন পেরুতে না পেরুতেই বাড়িওয়ালার কড়া নোটিশ হাজির– আগামী মাসে বকেয়া এবং চলতি পাওনা পরিশোধ না করা গেলে অন্যত্র বাসা খুঁজতে হবে, তবে অতি-অবশ্যই পাওনা অনুযায়ী বাসার আসবাবপত্র বাড়িওয়ালা রেখে দেবেন। ওদিকে ব্যবসার অংশীদারেরাও কম যান না একদম। ব্যবসায় বিরাট ক্ষতি আবিষ্কার করে তারা ইতোমধ্যেই ব্যবসার চুক্তিপত্র থেকে জাহিদের নাম। কর্তন করতে কার্পণ্য করেননি।
ঢাকা শহর, যেখানে খাবার পানিটাও কিনে খেতে হয়, সেখানে বুঝি এই অবস্থায় ব্রেইন টিউমারের চিকিৎসা হবে? অবস্থা এমন–বাচ্চা মেয়েটিকে নিয়ে পথে বসা ছাড়া জাহিদের বউয়ের আর কোনো গত্যন্তর নেই। আমাদের অবস্থাও তেমন। আহামরি কিছু নয়। মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি। কোনোরকমে নিজেদের ভরণপোষণ সামলে বাড়তি কারও দায়িত্ব কাঁধে নেবো–সে সাধ্যি কই? তবুও যে তাদের একেবারে ত্যাগ করেছি তা নয়। সামথ্য অনুযায়ী পাশে থাকবার আপ্রাণ চেষ্টা তো ছিলোই।
আমার হালকা কিছু সঞ্চয় ছিলো। মনে হলো ওই টাকা দিয়ে জাহিদের অসুস্থ মেয়েটার চিকিৎসা করানো যায়। একদিন আমার হাত ধরে মেয়ের জন্য অঝোর। ধারায় যেভাবে কেঁদেছিল জাহিদ–সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। জাহিদ আজ নেই, কিন্তু মেয়েটাও যদি ধুকে ধুকে শেষ হয়ে যায়–নিজের কাছে নিজেই তখন ছোটো হয়ে যাবো আমি।
ভাবনাটা ফাতিমাকে জানালাম। ফাতিমা খুবই সরল মনের মানুষ। দীর্ঘ সাংসারিক জীবনে তাকে আমি কখনোই কঠোর হতে দেখিনি। মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াবার সে কি আকুল আগ্রহ তার! তার সেই আগ্রহ আমাকে মুগ্ধ করে রাখত। মনে হতো–আমার যদি একদিন অনেক টাকা হয়, আমি অনেক বড় একটা চ্যারিটি ফাউন্ডেশন করে যাবো যেখান থেকে দুঃখী-দুঃস্থ মানুষেরা সাহায্য পাবে। ফাউন্ডেশনটার নাম হবে–’ফাতিমা চ্যারিটি ফাউন্ডেশন। ফাতিমা যখন শুনবে আমি আমার একমাত্র সঞ্চয় ব্যয় করে একটা অসহায় পরিবারের অসুস্থ মেয়ের চিকিৎসা করাতে চাচ্ছি–আমি নিশ্চিত এটা শুনে ফাতিমার চাইতে সুখী এবং খুশি আর কেউ হবে না।
কিন্তু আমার কথা শুনে একপ্রকার আমার মুখের ওপরে সে বললো, এটার কোনো দরকার নেই।
আমি বেশ অবাক হলাম! এমন একটা প্রস্তাবে ফাতিমা রাজি হবে না–এ তো আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। দু-হাতে দান করতে পারলে যে মানুষটি সুখ পায়, অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে যার ব্যাকুল থাকে মন–সে কিনা আমার মুখের ওপরে ‘না’ বলে দিলো! নরম হৃদয়, সরল আর শুভ্র মনের অধিকারিণী যে ফাতিমাকে আমি চিনি, যাকে আমি ভালোবাসি, বিশ্বাস আর ভরসা করি–এ কি সে-ই?
তার পাশে বেশিক্ষণ বসে থাকা গেলো না। দুনিয়াটা কেমন যেন বিস্বাদ ঠেকছে। জগতের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত বোধকরি এটাই। মনে মনে বিড়বিড় করে বললাম, ‘ফাতিমা, তুমিও এভাবে বদলে যেতে পারলে? স্বার্থপরতার মোহ থেকে তুমিও বাঁচতে পারলে না?
পরিস্থিতিটা কেন জানি সহ্য হচ্ছিল না। দ্রুত স্থান ত্যাগ করার জন্যে পা বাড়াতেই আমার হাত ধরে ফেলল ফাতিমা। আমাকে আগের জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বললো, ‘আমার কিছু কথা আছে আপনার সাথে।
