তিনি সোৎসাহে বললেন, ‘ভালো কথা বলেছেন তো! এভাবে ভাবা হয়নি আগে। আমার তো নিজেকেই আগে প্রশ্ন করা দরকার যে, বারাকাহ আসার পথগুলো আমি আদৌ ঠিক রাখতে পেরেছি কি না।
‘একদম ঠিক। নিজেকে মনের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে একবার চিন্তা করুন তো–জীবনের কোনো এক পর্যায়ে আপনার এমন কোনো কাজ আছে বা হচ্ছে। কি না, যার দরুন আপনি জীবনে ছন্দ হারাচ্ছেন? এমন কোনো ভুল যা আপনি প্রতিদিনই করছেন, কিন্তু তা যে ভুল, সে ব্যাপারে আপনি বেমালুম ও বেখবর। যদি সেরকম কোনোকিছুর দেখা মেলে, সবার আগে সেটা সংশোধন করে ফেলুন। বারাকাহ লাভের যে পথগুলো রুদ্ধ হয়ে আছে, সেগুলোকে প্রবল ধাক্কায় উন্মুক্ত করে দেন। এরপরও যদি জীবনে বারাকাহ না পান, তখন বারাকাহ লাভের নতুন কোনো দরোজার কথা ভাবতে পারেন।
দুই.
আমার এক কলিগ একদিন বেশ মন খারাপ করে তার পরিবারের কথা বললেন। সংসারে ঝামেলা যাচ্ছে, স্ত্রীর সাথে নিত্য-নৈমিত্তিক ঝগড়া-ঝাটি হচ্ছে। সংসারের টানাপোড়েনের দরুন ঘরে ঢুকলে অস্থির অস্থির লাগছে তার। কাজে মন বসে না, ইবাদতে মনোযোগ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি।
কারো জীবনের করুণ এবং হাপিত্যেশের গল্প শুনলে বিমর্ষ হয়ে পড়ি। জীবনের জানা-পথে যখন অজানা শঙ্কা এসে ভর করে, তার ভার তখন হিমালয়ের ভারত্বকেও ছাড়িয়ে যায়। সব ঠিকঠাক চলার পরেও কেবল সংসারে যদি দহন লাগে, সেই আগুন-স্পর্শ তখন সব ভালো চলাকেই ভস্ম করে ছাড়ে।
এক বন্ধুর কাছে বেশ অনেকদিন হলো কিছু টাকা পাই। কয়েকদিন আগে তাকে বললাম, সম্ভব হলে টাকাগুলো দেওয়ার জন্য। সে বেশ আফসোস নিয়ে লজ্জিত মুখেই বললো, এখন যদি আমাকে কেটে দুই ভাগও করিস, তারপরও একটা টাকা আমি তোকে দিতে পারবো না। বউ আর শিশুকে অনেকদিন হয় তার বাপের বাড়ি রেখে এসেছি। যে কাজেই হাত দিচ্ছি, মনে হচ্ছে সব ছাই হয়ে যাচ্ছে। জীবনের ওপর বিতৃষা জন্মে যাচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে, এর পরের ধাপে আমাকে আত্মহত্যাই করতে হবে।
তিন.
আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এই পর্যায়গুলো আসতে পারে–জীবনে বারাকাহ না পাওয়া, সংসার থেকে সুখ-শান্তি উবে যাওয়া, জীবনের কোথাও নিদারুণ ছন্দপতন ঘটা। সময়ে, আয়-রোজগারে, ব্যবসাপাতিতে, কাজে-কর্মে, এমনকি আমল-ইবাদত থেকে শুরু করে জ্ঞানার্জনেও আমরা বারাকাহ হারাতে পারি। মনে হতে পারে প্রবল প্রচেষ্টার পরেও প্রাপ্তির খাতাটা কেমন যেন শূন্যতায় ঠাসা! কোথাও যেন স্বস্তি নেই, যেন কোথাও নেই একটু আনন্দ আর আয়েশের ঘনঘটা।
জীবনে যখনই এ ধরনের মুহূর্তের মুখোমুখি হবো, সবার আগে আমাদেরকে মনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। যে আয়নায় চেহারা দেখা যায়, তাতে মনের রোগ ধরা পড়ে না, কিন্তু মনের আয়নায় সুন্দর মুখাবয়বের দেখা না মিললেও, মনের রোগগুলো তাতে একে একে ভেসে উঠতে থাকে; অবশ্য যদি সে ইচ্ছে ও আন্তরিকতা নিয়ে আমরা মনের আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারি তবেই তো!
আকাশে মেঘ জমলে আদিগন্ত নীলাকাশ মেঘের আড়ালে লুপ্ত হয়ে যায়, প্রবল প্রতাপের সূর্য-রশ্মি মিলিয়ে যায় অন্ধকারের গহ্বরে। এমন মুহূর্তে ঝকঝকে নীলাকাশ দেখতে হলে শর্ত কী? শর্ত হলো–আকাশ থেকে মেঘ কেটে যাওয়া। মেঘ কেটে গেলেই আবার আমরা দূরদ্বিগলয়লীন নীল আকাশ দেখতে পাই, সূর্য-কিরণে আবারও গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে প্রকৃতি।
জীবনে বারাকাহ লাভের এবং বারাকাহ হারানোর ব্যাপারগুলোও একইরকম। জীবন হলো সেই সীমানা-বিহীন আকাশের মতোই, আর তার নীল রঙ এবং অবারিত সূর্য-কিরণ হলো বারাকাহ-র প্রতিচ্ছবি। জীবনের আকাশে যখন মেঘের আস্তরণ পড়বে, যখন তাতে দলে দলে ঘনীভূত হবে কালো মেঘ, তখন বারাকাহ হিশেবে পাওয়া অবারিত নীল আর সূর্য-কিরণ জীবনাকাশ থেকে লুপ্ত হবে–এই তো স্বাভাবিক।
তবে সেই মেঘ কেন জমে, কোথায় তার উৎসস্থল, সেটা নির্ণয় করা গেলে, তা সংশোধন করা গেলে ঘনায়মান মেঘের অন্ধকার গহ্বর থেকে জীবনের নীল আর প্রভাতের সূর্য-কিরণ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
চার.
পুনরুদ্ধার? কিন্তু কীভাবে?
জীবনে যে পথে বারাকাহ আসে, কিংবা যে পথে রুদ্ধ হয়ে যায় বারাকাহ লাভের দুয়ার, সেই পথগুলোেতে অনুসন্ধান চালিয়ে। আপনার সেই গুনাহটার কথা ভাবুন তো, যা আপনি নিয়মিতভাবে করে যাচ্ছেন। যা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আপনার রাজ্যের অনীহা! আছে এমন কোনো গুনাহ আপনার? সেটা হতে পারে দৃষ্টির হিফাযত না করা, পরনারী বা পরপুরুষের দিকে নিজেকে আকৃষ্ট করে রাখা, চোখের যিনায় নিজেকে মগ্ন করে রাখা, নেট দুনিয়ায় অশ্লীল-অশালীন ভিডিও দেখে বেড়ানো।
অথবা কখনো কি কারো আমানত নষ্ট করেছেন? কেউ বিশ্বাস করে আপনার কাছে কোনো আমানত গচ্ছিত রেখেছে, কিন্তু আপনি তা ভোগ করে বসে আছেন? সেই আমানত হতে পারে তার অর্থকড়ি, যা আপনি যথেচ্ছ খরচ করে ফেলেছেন; হতে পারে তার গোপন কোনো কথা, যা আপনি অন্যদের বলে বেড়িয়েছেন; হতে পারে অর্পিত কোনো দায়িত্ব, যা আপনি পালন করেননি। আছে এমন কিছু?
কিংবা কারো হক কি নষ্ট করেছেন কোনোদিন? কোনো ইয়াতিমের সম্পদ ভোগ করা কিংবা কারো ন্যায্য পাওনা না দেওয়া? ক্ষমতা দেখিয়ে কোনোদিন কি কারো জমি-জমা দখল করেছেন বা হাতিয়ে নিয়েছেন কোনো ব্যক্তির জমানো অর্থ-সম্পদ?
