আল্লাহর সাথেই-বা আপনার সম্পর্কটা কেমন? তিনি যে কাজগুলো আপনার জন্য ফরয করেছেন, সেগুলোর ব্যাপারে আপনি কতখানি যত্নবান? আযান শুনে আপনি কি মসজিদে যাওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন নাকি বুঁদ হয়ে থাকেন নিজের কাজে? আপনার ওপর যাকাত ফরয হওয়ার পরেও কি কৃপণতা করে তা আদায় করেন না? আপনার কুরবানিগুলো কি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর জন্যই হয় নাকি সমাজে আপনি কত বড়লোক তা প্রমাণের উপলক্ষ হয়ে ওঠে? রামাদানের সিয়াম পালনে আপনার আন্তরিকতা কেমন? নাকি তা কেবলই উপোস থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা হয়েই থাকে?
এসব হলো ‘মনের আয়না’র কয়েকটা উদাহরণ। সত্যিকার অর্থে কোন গোপন গুনাহে আপনি নিমজ্জিত, তা আপনার রব আর আপনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। জীবনে হারানো বারাকাহ পুনরুদ্ধারে তাই মনের সেই আয়নার সামনে আজকেই দাঁড়িয়ে যান। যে নিরন্তর পাপ কাজে নিমজ্জিত আছেন, তা থেকে নিজেকে অতি-শীঘ্রই টেনে তুলুন। যেখানে যার সাথে যা অন্যায় করেছেন, সম্ভব হলে সেগুলো মিটিয়ে নিন। যার পাওনা অপরিশোধিত আছে, তা পরিশোধ করে দেন। যদি তা না-ও পারেন, অন্তত তার কাছে গিয়ে করজোড়ে ‘দুঃখিত’ বলে ক্ষমা চান। আল্লাহর যে হকগুলো আদায়ে আপনি উদাসীন হয়ে আছেন, সেগুলোতেও তৎপর হতে হবে আপনাকে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে–আজ থেকে আর কোনোদিন এক ওয়াক্ত সালাত কাযা করা যাবে না। মিথ্যা কথা বলা যাবে না। খারাপ কাজ করা, খারাপ কথা শোনা, খারাপ কিছু দেখা যাবে না। রামাদান মাসে নিজেকে নিবিড়ভাবে সঁপে দিতে হবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে। যাকাত আদায়ে আর কোনো কৃপণতা নয়। এবার থেকে কুরবানিগুলো হবে সত্যিকার অর্থে আল্লাহর জন্যই।
মনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যদি খুঁজে বের করে আনতে পারেন জীবন থেকে বারাকাহ কমে যাওয়ার সত্যিকার কারণ, তবে সেটাই আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হয়ে দাঁড়াবে।
পাঁচ.
জীবনে বারাকাহ লাভের কিংবা হারানো বারাকাহ পুনরুদ্ধারের কার্যকরী একটা পন্থা হলো ইস্তিগফার।
জনপদে বহুদিন ধরে বৃষ্টি হয় না। মাঠ ফেঁটে চৌচির। পানির জলাশয়গুলো শুকিয়ে আস্তে আস্তে বিলীন হতে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে মানুষের জীবন মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এমন করুণ অবস্থার কথা বর্ণনা করে এক লোক হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহর কাছে এসে বললো, ‘ইয়া শাইখ, বহুদিন বৃষ্টির দেখা নেই। জীবনধারণ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। আমাদের এই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেন।
তখন হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করো। বেশি বেশি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ো।
অন্যদিন আরেকজন এলো হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহর কাছে। এসে বললো, ‘শাইখ, দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছি। আয়-রোজগার নেই কোনো। সন্তান সন্ততি নিয়ে উপোসে কাটছে দিন। এই সমস্যা থেকে বাঁচবার পথ বাতলে দেন, দয়া করে।
হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘অধিক পরিমাণে আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করো। বেশি বেশি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ো৷
তৃতীয় একজন এসে বললো, ‘শাইখ, বিয়ের এতগুলো বছর পার হলো, কিন্তু কোলজুড়ে কোনো সন্তানাদি এলো না এখনো। আপনি কি আমাদের সন্তানাদি লাভের কোনো আমল শিখিয়ে দিতে পারেন?
হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহ তাকেও বললেন, ‘অত্যধিক পরিমাণে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়ো৷
প্রত্যেককে একই উপদেশ আর পরামর্শ দিতে দেখে, তখন একজন জিগ্যেশ করে বসল, ‘ইয়া শাইখ, কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে এলেই আপনি তাকে একই সমাধান। দিচ্ছেন। ইস্তিগফার করতে বলছেন। এমনটা কেন?
লোকটার প্রশ্নের জবাবে তখন হাসান আল বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘তোমরা। কি আল্লাহর কিতাবের ওই কথাগুলো পড়োনি?’ এরপর তিনি সুরা নুহের আয়াতটা তিলাওয়াত করলেন–
‘আর আমি তাদেরকে বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ইস্তিগফার করো; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল।(তোমরা ইস্তিগফার করলে) তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টিবর্ষণ করবেন। আর তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি দিয়ে। তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত নদীমালা।[১][২]
নুহ আলাইহিস সালাম তার অবাধ্য জাতিকে বলছেন, যেন তারা আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার তথা ক্ষমাপ্রার্থনা করে। আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করলে কী হবে? নুহ আলাইহিস সালাম বলে দিচ্ছেন–তারা যদি ক্ষমাপ্রার্থনা করে তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের জন্য মুষলধারে বৃষ্টিবর্ষণ করবেন, তাদের ধন-সম্পদ এবং সন্তানাদি দিয়ে ভরিয়ে তুলবেন এবং সাথে আছে জান্নাতের চির সবুজ উদ্যান আর প্রবাহিত নদীমালার নিশ্চয়তা। এটা নুহ আলাইহিস সালাম কর্তৃক দেওয়া আল্লাহর একটা ওয়াদা। সবকিছুর জন্য শর্ত কী? ইস্তিগফার তথা আল্লাহর কাছে অবারিত ক্ষমাপ্রার্থনা করা।
ক্ষমাপ্রার্থনা করলে কুরআনুল কারিমে দুনিয়ায় তিনটা জিনিস দেওয়ার কথা আছে– এক. মুষলধারে বৃষ্টি। দুই. সম্পদ। তিন, সন্তানাদি।
তবে অবারিত ক্ষমাপ্রার্থনার ফলাফল কি কেবল এই তিনটা বিষয়েই সীমাবদ্ধ? এর বাইরে আল্লাহ কি আর কিছুই দেবেন না বান্দাদের? দেবেন তো অবশ্যই। এই আয়াতে যে তিনটা বিষয়ের কথা এসেছে, ওই তিনটা জিনিসের প্রকট ঘাটতি ছিলো নুহ আলাইহিস সালামের জাতির মাঝে। প্রচণ্ড খরায় তাদের জীবন দুর্বিষহ ছিলো, দরিদ্রতায় তারা নাস্তানাবুদ হচ্ছিলো তখন। আর তাদের অধিকাংশই ছিলো নিঃসন্তান। কোনো সন্তানাদি হচ্ছিলো না। এজন্যই এই আয়াতে তাদের সমস্যাগুলোকে ধরে কথা বলা হয়েছে মূলত। কিন্তু আয়াতটার গূঢ় অর্থ হচ্ছে এই–বান্দার যদি কোনোকিছুর দরকার হয়, যদি তার জীবনে কোনোকিছুর ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়, যদি তার কোনোকিছু পেতে ইচ্ছে করে, তবে সে যেন আল্লাহর কাছে অবারিতভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করে। তবেই আল্লাহ তার মনোবা পূরণ করে দেবেন।
