আত্মকথা

 

আত্মকথা – আবুল মনসুর আহমদ / Atmakatha by Abul Mansur Ahmad
প্রথম প্রকাশ : অগ্রহায়ণ ১৪২৫, নভেম্বর ২০১৮
প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন ১৯ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: মাসুক হেলাল
মুদ্রণ : আর জে জেড প্রিন্টার্স ২৫৭ ফকিরেরপুল, ঢাকা ১০০০
প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর ১৯৭৮, ঢাকা

.

প্রকাশকের কথা

আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন ব্যক্তিত্ব। সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, আইনজীবী ইত্যাদি নানা পরিচয়ে তিনি পরিচিত ছিলেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ব্যঙ্গধর্মী রচনার ক্ষেত্রে আমাদের সাহিত্যে তার স্থান আজও কেউ অতিক্রম করতে পারেননি। তাঁর স্মৃতিকথাধর্মী বইগুলোও আমাদের সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এ দেশের তথা উপমহাদেশের গত এক শতাব্দীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে জানার জন্য তাঁর এই বইগুলো পাঠের কোনো বিকল্প নেই। তার আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর এবং আত্মকথা এমন দুটি বই। ইতিমধ্যে আমাদের প্রকাশনা সংস্থা থেকে আমরা তার আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর বইটির একটি সুমুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ করেছি। বইটিতে লেখক গত শতাব্দীর বিশের দশক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অভ্যুদয়-পরবর্তীকাল পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। এবার আমরা প্রকাশ করছি তাঁর আত্মকথা বইটি।

আত্মকথায় আবুল মনসুর আহমদ তাঁর পারিবারিক পটভূমি, শৈশব, বাল্য ও কৈশোর, শিক্ষা, সাহিত্য, আইন পেশা ও সংসারজীবনের কথা লিখেছেন। বইটিতে লেখকের বয়ান কেবল নিজ জীবন ও অভিজ্ঞতার কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ, নানা ঘটনা। ও চরিত্রের কথাও এতে উঠে এসেছে। স্মৃতিচারণার আঙ্গিকে লেখা সময়ের এই অন্তরঙ্গ বর্ণনা লেখকের অনুপম রচনাশৈলীর গুণে পাঠককে যে কেবল আকৃষ্ট করবে তা-ই নয়, আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব এবং তার প্রবণতাগুলোকে বুঝতেও অনেকখানি সাহায্য করবে। এক কথায় বলা যায়, পূর্ব বাংলার মুসলমান মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশের পটভূমি ও তার ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পেতে বিশেষ সহায়ক এ বই। সেদিক থেকে ইতিহাস বা সমাজ নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাঁদের জন্য এ বইটির মূল্য অত্যধিক।

প্রথমা প্রকাশন বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও ইতিহাস সম্পর্কে জানার জন্য প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই পুনঃপ্রকাশের একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। মূলত নবীন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পাঠক ও গবেষকদের কথা ভেবেই আমাদের এই পরিকল্পনা। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা পুনর্মুদ্রণের অভাবে বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারেও পাওয়া যায় না, কিংবা হয়তো যথাযথ প্রক্রিয়ায় অনুমোদন নেওয়া ছাড়াই ও নিতান্ত অযত্নের সঙ্গে ছাপা হচ্ছে, এমন কিছু নির্বাচিত গ্রন্থ লেখক বা তাদের উত্তরাধিকারীদের অনুমতি নিয়ে পুনঃপ্রকাশ করছি। প্রথম পর্যায়ে জীবনী, স্মৃতিকথা, আত্মজীবনী, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার ও গবেষণাধর্মী বইয়ের ক্ষেত্রেই মূলত আমাদের উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকছে।

প্রসঙ্গত, বিভাগোত্তরকালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা আজকের বাংলাদেশ নামে পরিচিত ভূখণ্ডটির জন্য আবুল মনসুর আহমদ একটি বিশেষ ভাষারীতির প্রস্তাব করেছিলেন। সেই ভাষারীতির পক্ষে নিজস্ব যুক্তিগুলোই শুধু তিনি তুলে ধরেননি, আপন লেখালেখির ক্ষেত্রেও যথাসম্ভব সে ভাষারীতিকে অনুসরণ করেছেন। বলাই বাহুল্য, লেখকের রচনাশৈলী হিসেবে আমরা সর্বত্র তার সে ভাষারীতি অক্ষুণ্ণ রেখেছি। বানানের ক্ষেত্রেও লেখক কিছু স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন। বর্তমান গ্রন্থেই এ সম্পর্কে তিনি তাঁর মতামত তুলে ধরেছেন। কিন্তু তার সে নিয়ম আমরা পুরোপুরি অনুসরণ করতে পারিনি। এর একটি কারণ, বইটির পূর্ববর্তী সংস্করণগুলোতে দেখা যায় একই শব্দের বানান দুই বা তিন রকমে ছাপা হয়েছে। লেখকের প্রস্তাবিত বানানরীতির সঙ্গেও যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংগতিপূর্ণ নয়। এ অবস্থায় বানানের সমতা রক্ষার তাগিদ থেকে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত আমাদের নিতে হয়েছে। তবে ‘জ’ ও ‘য’-এর ক্ষেত্রে আমরা মোটামুটিভাবে লেখকের মতকেই প্রাধান্য দিতে চেষ্টা করেছি। বস্তুত পাঠক ও গবেষকদের জন্য মূল্যবান এই বইটির একটি সম্ভব নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য সংস্করণ প্রকাশই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। বইটির এই নতুন সংস্করণ প্রকাশের ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য লেখকের পুত্র ও ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনামের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

মতিউর রহমান
ঢাকা, নভেম্বর ২০১৮

.

ভূমিকা

আত্মজীবনী লেখার কাজটা কঠিন। অসাধারণও। কঠিন এই জন্য যে এর বেশির ভাগ কথাই স্মৃতি হইতে লিখিতে হয়। যখনকার কথা লেখা হয়, তখন আত্মজীবনী-লেখক চিন্তাও করেন নাই যে ভবিষ্যতে একদিন তিনি নিজের জীবনী লিখিবেন। আত্মজীবনী লিখিবার মত জীবনের অধিকারী তিনি কোনো দিন হইবেন, এটা ধারণাও অনেকে ছেলেবেলা করিতে পারেন না। ছেলেবেলা সবাই ছেলেমানুষই থাকেন। মন-মস্তিষ্ক পাকিতে তখনো অনেক দেরি। বড় হইয়া তিনি কী হইবেন, কী করিবেন, তার স্পষ্ট ধারণা-চিন্তাও তখন তিনি করিতে পারেন না। পারেন না মানে তখনকার চিন্তা-ভাবনার বেশির ভাগই থাকে অবাস্তব কল্পনা-বিলাসিতা। এ ব্যাপারে মনীষী ও অমনীষীর মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নাই। যা কিছু পার্থক্য তার বেশির ভাগই পরিবেশগত। আমাদের তরুণেরা যারা কলেজ-ভার্সিটিতে মেধাবী ও যশস্বী ভাল ছাত্র থাকেন, তাঁদের অধিকাংশেরই উচ্চকাঙ্ক্ষা থাকে, তখন সরকারি চাকরি কামনায় সীমাবদ্ধ। আমাদের কালে ছিল ডিপটিগিরি। আজকাল সেটা সিনিয়র সিভিল সার্ভিস। অধুনা কিছু ভাল ছেলের মধ্যে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ার ও অধ্যাপনার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছাত্রজীবনেই দেখা যায়। এঁদেরও কেউ ভবিষ্যতে আত্মজীবনী লিখিবেন, এমন ধারণা সাধারণত পোষণ করেন না। কারণ এই শ্রেণীর প্রতিভাবানেরা আত্মজীবনী লিখিয়াছেন তার দৃষ্টান্ত খুব বেশি নাই। বরঞ্চ যাদের বাপ-দাদাদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রচলন আছে, তাদের মধ্যে বাপ-দাদার লাইনটার কথাই আগে মনে পড়া স্বাভাবিক। ডিপটির ছেলে ডিপটি, উকিল-ব্যারিস্টারের ছেলে উকিল ব্যারিস্টার, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়াটাকেই অগ্রাধিকার দিয়া থাকেন। এমনকি চাষির ছেলে চাষি, শ্রমিকের ছেলে শ্রমিক, পীরের ছেলে পীর ও জমিদার-জোতদারের ছেলে জমিদার-জোতদারই থাকিবে এমন ধারণা সাধারণত বাপ-মা ও মুরুব্বিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিলেও এটাই সাধারণ জীবন-চিন্তা। যে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবন লইয়া মুরুব্বিদের এই সব চিন্তা-ভাবনা, সে শিশু কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর কিছুই জানে না। না জানিলেও কালক্রমে অনেক লোকই মুরুব্বিদের এই ধ্যান-ধারণায় সংক্রমিত হয়।

এ বিষয়ে এত কথা বলিবার কারণ এই যে, যে-শিশু যে-পরিবেশে যে ধরনের জীবন গড়ন-যাপনের স্বপ্ন কল্পনাই করুক না কেন, শৈশবে কারো মনে ভবিষ্যতে আত্মজীবনী লিখিবার কল্পনা থাকে না। এ চিন্তা মানুষের মনে। সর্বপ্রথম জাগে তখনই, যখন ব্যক্তিটির জীবন প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে। জীবন-নদী প্রায় পার হইয়া আসিয়াছেন। ওপারের ঘাট দেখা যায়-যায়। ঠিক এই মুহূর্তে আত্মজীবনী লেখা মানে জীবন-পথে পিছন ফিরিয়া দেখা। যারা বিনা-ঝড়-তুফানে নিরাপদে স্বাচ্ছন্দ্যের পানসিতে চড়িয়া জীবন-নদী পার হইয়াছেন, তাঁদের পিছন ফিরিয়া দেখিবার কিছু নাই। সুতরাং আত্মজীবনী লিখিবারও কিছু থাকে না। এই দিক হইতে বিচার করিলে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের নিরাপদ জীবন আসলে কোনো জীবনই নয়। অথচ বিপুল অধিকাংশের জীবনই এমনি ধরনের বৈচিত্র্যহীন মামুলি জীবন। কাজেই সমাজের দিক হইতে অর্থহীন জীবন। কিন্তু সংসারের প্যারাডক্স এই যে আমরা অধিকাংশই এমনি জীবন যাপন করিতে চাই। বিষয়ী লোকের বিবেচনায় এটাই আদর্শ জীবন। কাজেই এমন নিরাপদ জীবনই অধিকাংশের কাম্য। যারা এর ব্যতিক্রম, যাদের জীবনসংগ্রাম সংঘাতপূর্ণ, নিরাপদ জীবন। ইচ্ছা সত্ত্বেও যারা যাপন করিতে পারেন নাই, ঝড়-তুফানের সঙ্গে লড়াই করিয়া যাঁদের জীবন কাটিয়াছে, ভব-নদী পার হইতে গিয়া যাদের জীবন তরী ডুবি-ডুবি করিতে-করিতে কিনারা লইয়াছে, তাঁদের মধ্য হইতেই সাধারণত আত্মজীবনী লেখার যোগ্য ও অধিকারী লোকের আবির্ভাব। সে ঝড়ঝঞ্ঝা আদর্শ জীবনযাপনের ইচ্ছাতেই ঘটুক, আর নিছক বিষয়ী জীবনের সাফল্যের সন্ধানেই ঘটুক, উভয় শ্রেণীর লোকেরই আত্মজীবনী লেখার অধিকার জন্মে। উভয়ের জীবনই দুর্বলতা-সরলতা ও ব্যর্থতা-সফলতার মেঘ ও রৌদ্রের জীবন। সংগ্রামের জীবন। সরল ও খোলাখুলিভাবে বর্ণিত হইলে তা অপরের শিক্ষা গ্রহণের জীবন।

এই সংগ্রাম ও নিরাপত্তা, উভয়টারই বিচার হয় জীবনসায়াহ্নে। কাজেই জীবনের অর্থপূর্ণতার উপলব্ধি হয় জীবনের সন্ধ্যাতেই। এই কারণে আত্মজীবনী লেখার ইচ্ছা ও সংকল্পও জন্মিতে পারে এই মুদ্দতেই। এই জীবন-সন্ধ্যায় দাঁড়াইয়া পিছন ফিরিয়া তাকাইয়া দেখিবার ও বুঝিবার একমাত্র উপায় না হইলেও প্রধান উপায় স্মৃতি। প্রধানত এই স্মৃতির উপর ভরসা করিয়াই আত্মজীবনী লেখকের গোটা জীবনের আশা-নিরাশা, সুখ দুঃখ, সাফল্য-অসাফল্য, ভুল-ত্রুটির খতিয়ান লিখিতে হয়। অথচ এই বয়সে স্মৃতির বাতিটাও অনেকটা ধোঁয়াটে হইয়া যায়। এই ধোয়াটে স্মৃতিতে ভর করিয়াই আত্মজীবনী লিখিতে হয়। লেখাও হয়। কারণ সাধারণ গল্পী লোকের মতই আত্মজীবনীকারদের কথা বলিবার আগ্রহ খুবই প্রবল। কথা বলার চেয়ে লেখা অনেক বেশি শ্রমসাধ্য। তাই এখানে ইচ্ছা-আগ্রহটা হওয়া চাই আরো বেশি প্রবল।

এই প্রবল ইচ্ছার প্রেরণা হইতে পারে দুইটা : এক. সংগ্রাম-সাফল্যের বাহাদুরি করা। দুই. ভাবীকালের লোকদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে নিজের জীবনের কাহিনী বলা। এই দুইটি উদ্দেশ্যই লেখকের সচেতন মনে জাগরূক নাও থাকিতে পারে। অবচেতন মনে গোপন থাকিতে পারে। কিন্তু এই দুই শ্রেণীর আত্মজীবনীর মধ্যেও একটা পার্থক্য আছে। সে পার্থক্য সাবধান পাঠকের কাছে ধরাও পড়ে। একটিতে লেখক বাছিয়া-বাছিয়া শুধু নিজের গুণ ও সাফল্যের কথাটাই প্রধান করিয়া তোলেন। গুণগুলির অতিরঞ্জন করেন। দোষগুলি চাপিয়া যান। অপরটিতে লেখক সত্য ও সরল কথায় নিজের ভাল মন্দ ও দোষ-গুণ উভয়টাই পাঠকের কাছে তুলিয়া ধরেন। সচেতন-অবচেতন মনের দরুনই এ পার্থক্যও লেখকের অজ্ঞাতেই হইতে পারে। বাহাদুরিটাও। অনিচ্ছাকৃত হইতে পারে। আবার বিনয়ের নিরপেক্ষতাটাও চেষ্টাকৃত হইতে পারে। আমাদের মধ্যে যেমন বদ-মেজাজি ও বিনয়ী উভয় প্রকার লোক আছেন এবং এই বদ-মেজাজিদের মধ্যে সাধুতা ও বিনয়ীদের মধ্যে ভণ্ডামি থাকিতে পারে, আত্মজীবনী-লেখকদের মধ্যেও তা-ই আছে। তবু নিজের দোষ উপলব্ধি করা খুবই কঠিন। সেটা মুখে ও কাগজে-কলমে স্বীকার করা আরো কঠিন। এই কারণে আত্মজীবনী লেখার কাজটা এমন কঠিন।

আর অসাধারণ এই জন্য যে যাদের জীবনী জানা ও পড়ার যোগ্য, যাদের জীবনকথা অপরের জন্য স্মরণীয় ও শিক্ষণীয়, যেসব প্রতিভাবান মনীষী, রাষ্ট্রনেতা ও জননায়ক দেশ ও দশের মঙ্গল সাধন করিয়াছেন, তাঁদের আত্মজীবনী লিখিবার দরকারই হয় না। অপরেই তাদের জীবনী লেখেন। তাঁদের সহকর্মী ও অনুসারীরা ত লেখেনই, দেশ-বিদেশের শক্তিশালী লেখকেরাও লিখিয়া থাকেন। যারা ব্যক্তিগতভাবে এই সব নেতা-নায়কদের জানেন না বা দেখেন নাই, তারাও লেখেন। গবেষণা করিয়া তাঁদের জীবনের অজানা কথা, ঘটনা ও বৃত্তান্ত আবিষ্কার করেন।

তবে এই ধরনের জীবনী ও আত্মজীবনীর মধ্যে পার্থক্য আছে। অপরের জীবনী-লেখকেরা সাধারণত তাদের নায়কের জীবনের ভাল দিকটাই দেখান। এই সব লেখক সাধারণত যার-তার নায়কের ভক্ত-অনুরক্ত হওয়ায় তাঁদের লেখা গুণাবলি বর্ণনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। নিতান্ত ভক্ত-অনুরক্ত না হইলে সাধারণ ভদ্রতা ও শালীনতার খাতিরে আলোচ্য ব্যক্তির জীবনের অপর দিকটা চাপিয়া যান। আর ভক্ত-অনুরক্তেরা ত শুধু গুণাবলির বর্ণনা করিবেনই। তাতে কিছুটা অতিরঞ্জনও করিতে পারেন। লেখক-ভেদে এই ধরনের জীবনী উৎকৃষ্ট শ্রেণীর সাহিত্য হইতে পারে, কিন্তু সত্য ও প্রকৃত তথ্যের দিক হইতে এগুলি সত্যনিষ্ঠ, অতএব শিক্ষণীয় না-ও হইতে পারে। পক্ষান্তরে জীবনী লেখক যদি নায়কের বিরোধী পক্ষের লোক হন, তবে তাঁর রচনা হয় প্রধানত নিন্দা-কুৎসা। আলোচ্য ব্যক্তিকে লোকচক্ষে হেয় করিবার অপচেষ্টা। তাতে প্রকৃত ও সত্য জীবনী লেখা হয় না। ফলে অধিকাংশ জীবনী হয় প্রশংসা ও গুণকীর্তন, নয় ত নিন্দা ও ছিদ্রান্বেষণ। কোনোটাই ঐতিহাসিক সত্য হয় না।

এই কারণেই বোধ হয় সব দোষ-গুণ বিচার করিয়া সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও জীবনী অপেক্ষা আত্মজীবনীই অধিকতর বাঞ্ছনীয়। সাহিত্য হিসাবে যদি না-ও হয়, তবু রিপোর্ট হিসাবে ত বটেই। আগামী দিনের পাঠকের স্বার্থ ও প্রয়োজনের দিক হইতে বিচার করিলে নির্ভরযোগ্য রিপোের্ট হিসাবেই বোধ হয় জীবনীর আবশ্যকতা বেশি। আত্মজীবনী লিখিবার প্রবল ইচ্ছা ও সামান্য অধিকারও যাদের থাকে, তারা আর কিছু না হউক, আব্রাহীম লিংকনের এই মূল্যবান কথাটি নিশ্চয়ই মনে রাখেন : নিজের কথা লেখা যেমন তৃপ্তিদায়ক, তেমনি কঠিন। কারণ নিজের দোষের কথা স্বীকার করিতে লেখকের বুকে যেমন বাজে, লেখকের আত্ম-প্রশংসাও তেমনি পাঠকের কানে পীড়া দেয়।

তাছাড়া প্রায় সকল আত্মজীবনী-লেখকের মধ্যে যে দুইটি গুণ থাকিতেই হয়, তার একটা নির্ভয়ে ও অসংকোচে সত্য কথা বলার অভ্যাস; আর অপরটা বাপ-দাদার প্রতি বিবেকবান শ্রদ্ধা। একটু গভীরভাবে তলাইয়া বিচার করিলেই দেখা যাইবে যে এই দুইটা অত্যাবশ্যক গুণের মূল কিন্তু মাত্র একটি। সেটা ব্যক্তিত্ব। এই ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে এখানে দুই-একটা কথা বলা দরকার। মানুষ মাত্রেই একটি ব্যক্তি, একটি শখছ, একটি ইন্ডিভিজুয়াল। কাজেই হরেক ব্যক্তির একটা ব্যক্তিত্ব থাকিবার কথা। আসলে যা থাকে তাকে ব্যক্তিত্ব বলা যায় না। সেটা ইন্ডিভিজুয়ালিটি, পার্সনালিটি নয়। আত্মজীবনীকারের যে ব্যক্তিত্বের কথা আমি বলিতেছি সেটা ইন্ডিভিজুয়ালিটি নয়, সেটা পার্সনালিটি। ইন্ডিভিজুয়ালিটি সাধারণ; আর পার্সনালিটি অসাধারণ। দর্শন-মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে আমরা ইগো, অহম, আত্মা, রুহু, শখছিয়াত, ইন্ডিভিজুয়ালিটি বা পার্সনালিটি যে নামই দেই না কেন, জিনিসটা কিন্তু শুধু মানসিক অবস্থা নয়। মনটাও শুধু অরূপ চিন্তা-স্রোত নয়। অনুভূতির দলা বা পিণ্ডও না। মনোবিকলনের বিচারে কোনো ব্যক্তির বেলা এই চিন্তা-অনুভূতির সুসংগত সুগঠিত অবস্থাকেই তার ব্যক্তিত্ব বলা যায় বটে, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ওটাই যথেষ্ট নয়। যতক্ষণ মনের যে অবস্থাটি ব্যক্তির কাজে-কর্মে, আচার-আচরণে বহিঃপ্রকাশ লাভ না করিবে, ততক্ষণ তাকে পার্সনালিটি বলা যাইবে না।

কিন্তু সাধারণ মানুষের সংসার-সমাজ-জীবনের জন্য এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের দরকার নাই। এই ব্যক্তিত্ব ছাড়াই মামুলি, এমনকি সুখী ও নিরাপদ ব্যক্তি-জীবনও চলিয়া যায়। শুধু চলিয়া যায় না, মামুলি সাধারণ নিরাপদ জীবনে এটাই কাম্য, এ কথা আগেই বলিয়াছি। কথাটার তাৎপর্য এই যে সমাজের প্রচলিত আচার-আচরণ, পরিবারের মামুলি দায়দায়িত্ব ও রাষ্ট্রের আইন-কানুন চোখ বুজিয়া মানিয়া চলার নামই আদর্শ নাগরিক জীবন। এমন নির্বিরোধ জীবন যাপন করিতে পারিলেই তা সফল হইল। এটাই জনমত।

কিন্তু এমন জীবন লইয়া জীবন্তিকা হইতে পারে, জীবনী হইতে পারে না। আত্মজীবনী ত নয়ই। এমন জীবনে পার্সনালিটি অর্থে ব্যক্তিত্ব থাকে না বলিয়াই সে জীবনে দশ বা দেশের শুনিবার বা বুঝিবার কিছু থাকে না। যেসব ব্যক্তিত্ব দেশ ও দশের জীবন প্রভাবিত করে, রাষ্ট্রনায়কেরা নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। কিন্তু রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে যারা শুধুই রাজনৈতিক নেতা বা পলিটিশিয়ান, তাঁদের ব্যক্তিত্ব স্টেটসম্যানদের ব্যক্তিত্বের থনে অনেকখানি পৃথক। পলিটিশিয়ানদের ব্যক্তিত্ব পরিণামে দেশ ও দশের অনিষ্ট করিতে পারে, কিন্তু স্টেটসম্যানদের ব্যক্তিত্ব কদাচ ত করে না। ব্যক্তিত্বের সাধারণ গুণ এই যে, ব্যক্তিত্ব বাড়ায়। ব্যক্তিত্ববান মনীষীর সংশ্রবে মানুষ ব্যক্তিত্ববান হয়। বিজ্ঞানী-দর্শনী, শিক্ষক-অধ্যাপক, সাধু-দরবেশ, শিল্পী-আর্টিস্ট, সাহিত্যিক-সাংবাদিক, এমনকি ব্যক্তিত্ববান সওদাগর-ব্যবসায়ীরাও নিজেদের ব্যক্তিত্ববলে ছাত্র, অনুসারী ও সহকর্মীদের মধ্যে ব্যক্তিত্ব প্রসার করিয়া তাঁদের ব্যক্তিত্ববান করিয়া থাকেন। স্টেটসম্যানরা এই দিক হইতে বিজ্ঞানী-দর্শনী, শিক্ষক-অধ্যাপক, সাধু-দরবেশদের সকল গুণে গুণান্বিত। কিন্তু সাধারণ রাষ্ট্রনায়কেরা তা নন। বরঞ্চ তার ঠিক উল্টা। অসাধারণ ব্যক্তিত্ববান রাষ্ট্রনায়কেরা প্রায়ই সহকর্মী ও অনুসারীদের ব্যক্তিত্ব শুধু সংকুচিত করেন না,  অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদেরে সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিত্বহীন করিয়া ফেলেন। এর সবটুকুই যে নেতার ইচ্ছাকৃত তা-ও নয়। সহকর্মী ও অনুসারীরা ইচ্ছা করিয়াই নেতাকে ডিক্টেটরে ও নিজেদেরে চাটুকারে পর্যবসিত করেন। নেতার অপরাধ শুধু এইটুকু যে তিনি এতে বাধা দেন না, বরঞ্চ কাজে-কর্মে সমর্থন করেন। একমাত্র সমর-নায়কেরা ছাড়া আর সব ডিক্টেটরই গোড়ায় সোজাসুজি নির্বাচিত না হইলেও জনমতের সমর্থনেই নেতা হইয়াছিলেন। কিন্তু তাদের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রক্ষমতার বলে কালক্রমে ডিক্টেটরের স্বৈরাচারে উন্নীত হয়। এই ধরনের ডিক্টেটরদের কেউ কেউ দেশ ও জাতির অর্থনৈতিক ও অন্যবিধ উপকার করিয়াছেন, এটা সত্য হইলেও এ কথাও সমানভাবে সত্য যে এঁরা দেশ ও জাতির আত্মমর্যাদাবোধ ঘোরতরভাবে ক্ষুণ্ণ করিয়াছেন। এর কারণ এই যে এঁদের শাসন-আমলে নাগরিকদের ব্যক্তিত্ব স্ফুরণ সাধারণভাবে বাধাপ্রাপ্ত হইয়াছে। ফলে অর্থনীতি ও শিল্প-বিজ্ঞানের দিকের উন্নতির চেয়ে আত্মিক দিকের ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হইয়াছে। এই দিক হইতে বিচার করিয়াই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সকল অবস্থায় গণতন্ত্রকেই একনায়কত্বের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর শাসন-পদ্ধতি বলিয়াছেন। এতে এটাই স্বীকৃত হইয়াছে যে মানুষের ব্যক্তিত্ব-বিকাশের সবচেয়ে বেশি সুযোগ যে রাষ্ট্র ও সমাজ-ব্যবস্থায়, সেটাই শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা, সেটাই আদর্শ বিধান। কিন্তু বর্তমানে দুনিয়ায় যে পুঁজিবাদী ও সমাজবাদী দুই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চালু আছে, তার কোনোটাতেই ব্যক্তিত্ব বিকাশের পূর্ণ সুযোগ বিদ্যমান নাই। এই কারণেই এ যুগে মানব-সমাজে ব্যক্তিত্বহীন মানুষই নিয়ম, আর ব্যক্তিত্ববান লোকেরা ব্যতিক্রম মাত্র। কিন্তু ব্যক্তিত্বের বিচার বা সন্ধান করা খুবই কঠিন কাজ। দুনিয়াতে বিজ্ঞান-দর্শনের যত গবেষণার কাজ আছে, মানুষের মনের বৈচিত্র্যটাই তার মধ্যে সবচেয়ে দুরূহ কাজ। দর্শন-বিজ্ঞানের গহিনে প্রবেশ না করিয়াও বলা যায়, মনের বিকাশ ও প্রকাশ মানুষের ব্যক্তিত্বে। এই ব্যক্তিত্বের খানিকটা বাপ-মার দেওয়া। খানিকটা দেওয়া পরিবেশের। অন্য। কথায় খানিকটা ওয়ারিসি; আর খানিকটা অর্জিত। কোনটা কতটুকু তা লইয়া মতভেদ আছে। এক পরিবেশে প্রতিপালিত হইয়াও দুইজনের ব্যক্তিত্ব সমান হয় না, এটা যেমন সত্য, আবার এক বাপের দুই সন্তানও সমান ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয় না, এটাও তেমনি সত্য। তাই এই সিদ্ধান্তে আসিতে হয়, ব্যক্তিত্ব ব্যক্তির স্বকীয়তা, তার নিজেরই ব্যাপার। ঘুরিয়া-ফিরিয়া সেই গোড়ার কথায়, জন্মের কথায়, বাপ-মার কথায় আসিতে হয়।

এইখানেই পাঠক আত্মজীবনীকারের অরিজিন জানিতে চান। লেখক ত বলিতে বাধ্য। আত্মজীবনী-লেখক শিল্পী-সাহিত্যিকই হউন, আর রাষ্ট্রনায়কই হউন, তাঁর সম্বন্ধে জানার কৌতূহল মানুষের স্বাভাবিক। এ কৌতূহল শুধু তাঁর সৃষ্ট শিল্পকর্ম বা তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য-অসাফল্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও পরিবেশিক বিচরণ-আচরণ, বিবর্তন-উদ্বর্তনের ব্যাপারেও প্রসারিত। এই কৌতূহল নিবৃত্ত করা জীবনী-লেখকের কর্তব্য। না করিলে তাঁর কাজ অসম্পূর্ণ থাকিবে। কাজেই কর্তব্যও পালিত হইবে না। এখানেই আত্মজীবনী-লেখকের বংশপরিচয়, সে-বংশের সামাজিক স্তর ও পরিবেশ, তাদের জীবিকা ও জীবনধারণ-প্রণালি, তাদের ধর্মীয় ও কালচারের আচার-আচরণ ইত্যাদি সম্বন্ধে উল্লেখ করা নিতান্ত প্রাসঙ্গিক হইয়া পড়ে। এই প্রাসঙ্গিকতা পাঠকের জন্য যেমন আবশ্যক, লেখকের জন্যও ঠিক তেমনি আবশ্যক। শুধু আবশ্যক নয়, অপরিহার্য। কোনো ব্যক্তির জীবনী সম্যক জানিতে হইলে ব্যক্তিটিকে আগে জানিতে হইবে। ব্যক্তিটির সঠিক পরিচয় পাইতে হইলে তাঁর বংশ-পরিবার, সামাজিক ও আর্থিক পরিবেশ জানিতে হইবে। মানুষের দেহ-মনের ক্রমবিকাশের উপর তার পরিবার ও পরিবেশের প্রভাব সর্বাধুনিক গবেষকেরাও স্বীকার করিয়াছেন। বংশ-পরিবার ও সমাজ পরিবেশ এই দুই-এর মধ্যে ব্যক্তিজীবনে কোনটার প্রভাব বেশি, এ বিষয়ে গবেষক-বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ থাকিতে পারে ও আছে। কিন্তু এ দুই এর সমন্বয় যে ব্যক্তি-জীবনকে মূলত সংগঠিত করিয়া থাকে, এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নাই। এই কারণেও ব্যক্তির পরিবার ও পরিবেশের খবর। জানিতে হয়। আর যেহেতু জীবনী বা আত্মজীবনী লেখা একটা বাস্তবভিত্তিক সৃষ্টিকর্ম, মানে ইতিবৃত্তমূলক শিল্পকর্ম, সেই হেতু বংশ-পরিচয়হীন জীবনকথা বা আত্মজীবনী হয় ত্রুটিপূর্ণ বিকলাঙ্গ শিল্প। আত্মজীবনী-লেখক যদি অভিজাত বংশের লোক হন, তবে বাপ-মার ও বংশের পরিচয় দেওয়া যেমন সহজ, তেমনি আনন্দদায়ক। কিন্তু আত্মজীবনী-লেখক যদি তা না হন, তিনি যদি গরীব, নিরক্ষর, চাষি-মজুরের সন্তান হন, তবে কী হয়। নিজের অনভিজাত বংশের কথা, বাপ-মার নিরক্ষরতা বা দারিদ্র্যের কথা, বলা তত সহজ নয়, আনন্দদায়ক ত নয়ই। কাজেই এ ক্ষেত্রে কাজটা কঠিন। কঠিন বলিয়াই এ শ্রেণীর আত্মজীবনী-লেখকের ব্যক্তিত্ব আরো সবল, আত্মমর্যাদাবোধ আরো তীক্ষ্ণ, সত্যপ্রিয়তা আরো ধারালো হওয়া দরকার। উদ্ববর্তন প্রকৃতির নিয়ম। অতীত হইতে যেমন বর্তমান এবং বর্তমান হইতে যেমন ভবিষ্যতের জন্ম, দাদা হইতে বাপ এবং বাপ হইতে তেমনি বেটার জন্ম। একটা ছাড়া অপরটা হয় না। একটার ইতিহাস ছাড়া অপরটারও ইতিহাস হয় না। কোনো লোকের জীবনী শুধু তাঁর ব্যক্তিজীবনের ঘটনার বর্ণনা, তার ধ্যান-ধারণার বিকলন ও তাঁর কাজ-কর্মের বিবরণ নয়। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে তার আচরণ, এই সব ব্যাপারে তার দেহ-মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও তার বা তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য উল্লেখযোগ্য বিষয়। এই কারণে উক্ত ব্যক্তির জীবনী বা আত্মজীবনী খোলা ময়দানে তাঁর ফটোগ্রাফের সমতুল্য। খোলা ময়দানে কোনো লোকের ফটো নিলে যেমন উপর-নিচের ডাইন-বায়ের ও পেছনের ল্যান্ডস্কেপটা আপনি ফটোতে আসিয়া পড়ে, তেমনি একটি ব্যক্তি-জীবনীর আলেখ্যে তার পিছনের ঐতিহ্যের ছবি ও ডাইনে-বাঁয়ের পরিবেশের রূপ ধরা পড়িতেই হইবে।

আরেকটা কথা বলিয়াই আমার এই ভূমিকা শেষ করিব। আমি আত্মজীবনী লেখিবার উপযুক্ত ব্যক্তি এবং সে জীবনকথা লোকেরা পড়িবেন বা সে বিশ্বাসে প্রকাশক লোকসানের ঝুঁকি না লইয়া তা ছাপিবেন, এমন ধারণার মধ্যে একটা উপলব্ধি আছে। সেটাকে অহংকারও বলা যাইতে পারে। এমন অহংকার ব্যক্তিত্বেরই লক্ষণ। ব্যক্তিত্বহীন লোকের অহংকার থাকিতে পারে না। কাজেই অহংকারটা দোষের নয়। অহংকার প্রকাশের ধরনটাই দোষের। দায়িত্ববোধের উপলব্ধিটাই অহংকার। এটা আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদাবোধ, আত্মসম্মান-জ্ঞানেরই নামান্তর বা রূপান্তর মাত্র। এর একটাও দোষের নয়। কিন্তু অহংকার যখন দম্ভের আকারে প্রকাশ পায়, তখন সেটা শুধু দোষের হয় না, বোকামিও হয়। আমার অহংকার, আমার আত্মবিশ্বাস ও আমার আত্মমর্যাদাবোধ যতক্ষণ তোমার ঐ-ঐ অনুভূতিকে আহত ও অপমানিত না করে, ততক্ষণ আমার এগুলি গুণ, সুতরাং গর্বের বস্তু। কিন্তু যেই এগুলি দম্ভের আকারে তোমার অনুভূতিতে আঘাত করিল, সেই মুহূর্তে সে-গুণগুলি দোষে পরিণত হইল। কাজেই নিজের অহংকার ও আত্মসম্মানবোধ লইয়া অতি সাবধানে চলিতে হয়। এ যেন রশির উপর দিয়া নাচিয়া যাওয়া, টাইট-রোপ-ড্যাসিং। পা ফসকাইয়া, কি ব্যালেন্স হারাইলা, ত গেলা।

এবার আত্মকথার বিষয়বস্তু ও ঘটনাবলি সম্পর্কে পাঠকদেরে একটু আভাস দিবার চেষ্টা করিব। পুস্তকে বর্ণিত ঘটনাবলির বিবরণী স্পষ্টতই স্মৃতিকথা। ব্যক্তিগত ঘটনার প্রায় সবটুকুই এই শ্রেণীর। কিন্তু যেসব ঘটনার সাথে নেতৃবৃন্দ ও বন্ধুবান্ধবদের সম্পর্ক আছে, সেগুলি যথাসম্ভব পুরাতন কাগজপত্র সংবাদপত্রের কাটিং অথবা পকেট-ডায়েরি বা নোটবই হইতে নেওয়া হইয়াছে। এসবেরও বিস্তারিত খুঁটিনাটি স্মৃতিকথাই। তাও আবার বুড়া মানুষের স্মৃতি। শৈশবের কথা লিখিয়াছি এই বুড়া স্মৃতিশক্তির উপর নির্ভর করিয়াই বটে, কিন্তু এটাও সত্য যে মানুষের শৈশবের স্মৃতিই বেশি নির্ভরযোগ্য। এ বই লিখিতে শুরু করি ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে আইউব শাহির জেলখানায় বসিয়া। অবসরমত আস্তে আস্তে লিখিয়া শেষ করি ১৯৬৮ সালে। পাবলিশারদের ইচ্ছাতে আমার এই জীবনকথার রাজনৈতিক দিকটা আলাদা করিয়া ঐ সালেই আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর নামে প্রকাশিত হইয়াছিল। এই পাঁচ বছরে সে বই-এর তিন-তিনটা সংস্করণ হইয়া গিয়াছে। ক্রমে আকারও তার বড় হইয়াছে। পরাধীন বা ঔপনিবেশিক দেশের মানুষের জীবনের অনেকখানি জুড়িয়া থাকে সক্রিয় রাজনীতি অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই। আমার বেলাও আমার জীবনে রাজনীতি ঢুকিয়াছিল, বরঞ্চ আমিই রাজনীতিতে ঢুকিয়াছিলাম, আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা সক্ষমতা অক্ষমতা উপেক্ষা করিয়াই। এই কারণে আমার রাজনীতির কথা আকারে বড় হইয়াছে তার মূল্য কমই হউক আর বেশিই হউক।

কিন্তু আমার নিজের মত এই যে আমার মত গরীব গৃহস্থের সন্তানের জন্য রাজনীতির ভিতরের চেয়ে বাহিরের জীবনই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতির ভিতরের চেয়ে বাইরেই করিবার মত কাজ ও বলিবার মত কথা আমার অনেক বেশি ছিল ও আছে। আমার অতৃপ্তি আজও বলে আমার করার কাজ ও বলার কথা আজও শেষ হয় নাই। অবশ্য সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীর মতই রাজনীতির ক্ষেত্রে আমারও নেতা, পথপ্রদর্শক ও সহকর্মী ছিলেন। সেখানে ছিলাম আমি পার্টি মেম্বর, অনেকের একজন। কিন্তু রাজনীতির বাইরে ছিলাম আমি একা ও একক। চিন্তায় ও কাজে আমার নিজের পথ সেখানে আমাকেই নির্দেশ করিতে হইয়াছে। আমার চিন্তার বিষয়বস্তু আমাকেই ঠিক করিতে হইয়াছে। এক কথায়, আমি নিজেই এখানে আমার নেতা ও পথপ্রদর্শক। আমার দায়িত্বও এখানে একক। সে দায়িত্বও কাজেই কঠিন। আমার সে দায়িত্ব পালনে আমার সাফল্য-অসাফল্য দুইটাই পাঠকদের জন্য শিক্ষণীয়। রাজনীতির বাইরের আমার জীবন কাজেই যেমন বিস্তৃত, তেমনি গভীর। আজকার এই আত্মকথায় আমার সেই জীবনই বর্ণিত হইয়াছে। এইটি লেখার পর অতিবাহিত হইয়াছে পাক্কা দশ বছর। কাজেই দক্ষতা, ক্ষমতা, জ্ঞান, মতবাদ ও ধ্যান-ধারণার অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছে আমার এই দীর্ঘ মুদ্দতে। কিন্তু যখন যা লিখিয়াছি, অবিকল তা-ই রাখিয়াছি। পরবর্তী জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা মতবাদের আলোকে আগের লেখার পরিবর্তন বা সংশোধন করিবার চেষ্টা করি নাই। অথচ করিবার যথেষ্ট অবসর ছিল ও আছে। বর্তমানে আমি বিষয়ী অর্থে সম্পূর্ণ নিষ্কর্মা। হাঁটু-ভাঙা আর্থরাইটিস রোগে উকালতি ছাড়িয়াছি। রাজনীতি ছাড়িয়া আমি এডার স্টেটসম্যান, চেম্বার পলিটিশিয়ান বা রাজনৈতিক হরি-ঠাকুর হইয়াছি। সাংবাদিকতা ছাড়িয়া এখন কলামিস্ট বা কমলাকান্ত হইয়াছি। হার্ট স্পেশিয়ালিস্ট ডাক্তারদের নির্দেশে তারও মাত্রা কমাইয়াছি। পলিটিক্যাল হরি-ঠাকুর হওয়ার ব্যাপারে আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছরে অনেক কথা লিখিয়াছি। সাংবাদিকতায় কমলাকান্ত হওয়া সম্পর্কেও এই পুস্তকের সাংবাদিক জীবন-খণ্ডে বিস্তারিত আলোচনা করিয়াছি। এখানে শুধু এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, এই বই লেখা শেষ করিয়া যখন এই ভূমিকা লেখায় হাত দিয়াছি, তখন আমি স্ত্রী পুত্র-নাতি-নাতনি লইয়া পরম সুখ-শান্তিতে ও যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে প্রচুর অবসরে এমন একটি জীবন যাপন করিতেছি, যখন পদমর্যাদার লোভ লালসা, নিন্দা-প্রশংসা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে উঠিয়া সকল ব্যাপারে সচেতন নিরপেক্ষতার ও সকলের প্রতি সদয় ইনসাফের মনোভাব লইয়াই ওপারে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া আছি।

আবুল মনসুর আহমদ
ধানমন্ডি, ঢাকা
১০ আগস্ট ১৯৭৩

.

ফিরিস্তি

প্রথম খণ্ড : পটভূমি

অধ্যায় এক : বংশ-পরিচয়
জন্মস্থান, পূর্বপুরুষ, শরা কবুলের আগে, সামাজিক অনাচার, ধুতি বনাম তহবন্দ, গাজী সাহেবের প্রত্যাবর্তন, গাজী সাহেবের তবলিগ, গাজী সাহেবের জনপ্রিয়তা, গাজী সাহেবের বিবাহ ও সন্তানাদি।

অধ্যায় দুই : জন্ম ও শৈশব
জন্ম, স্বাস্থ্য ও ভাগ্য, রোগ ও চিকিৎসা, নিদ্ৰাচর, ঘুমে চিৎকার, আকস্মিক দুর্ঘটনা, শৈশবের কড়াকড়ি, পারিবারিক প্রথা, সমসাময়িক অবস্থা, প্রাচুর্য ও সরলতা, দাদাজীর এন্তেকালের পর, খেলাধুলার স্বাধীনতা, চুরুট-তামাকের কড়াকড়ি।

দ্বিতীয় খণ্ড : শিক্ষাজীবন

অধ্যায় তিন : প্রাইমারি শিক্ষা–বাড়িতে
চাচাজীর নিকট, ইয়াকুব মুনশীর নিকট, পাঠশালায়, স্বদেশি ধুতি, পাঠ্য বিষয়, ধানীখোলা-বৈলর বিরোধ, আলিমুদ্দিন মাস্টার, মাস্টার সাহেবের ছাত্রপ্রীতি, স্বপ্নে মুখরেজ তালাফুয।

অধ্যায় চার : নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা–দরিরামপুর
ত্রিশাল-দরিরামপুর–বনাম ও বেনাম, হেডমাস্টারের নজরে সত্যবাদিতা, হেডমাস্টারের ডাক-হরকরা, হেডমাস্টারের ‘ভুল’, ‘ভুল’ সংশোধন, মহিষ ও মহিষী, পণ্ডিত মশায়ের অভিনব দণ্ড, স্কুলে যাতায়াত, বই-পুস্তকের থলি, থলির সুবিধা, বিপজ্জনক রাস্তা, দুইটি ব্যক্তিত্বের প্রভাব, করোনেশনের পুরস্কার।

অধ্যায় পাঁচ : মাধ্যমিক শিক্ষা–নাসিরাবাদে
মৃত্যুঞ্জয় স্কুল, হিন্দু-মুসলমান পৃথক বেঞ্চি, প্রথম বিরোধ, ঢিলের জবাবে ঢিল, প্রথম মিলাদ শরিফ, বাংলায় মিলাদ, ঢাকা দর্শন, নাম-নামা।

অধ্যায় ছয় : উচ্চশিক্ষা–ঢাকা শহরে
জগন্নাথ কলেজে, যায়গীর-হাকিম সাহেবের বাড়িতে, পথে পাওয়া টাকার সদ্ব্যবহার, কেতাবি সাধুতা বনাম বিষয়ী সাধুতা, হোস্টেল-জীবন বনাম যায়গীর-জীবন, ঢাকার মহল্লা-জীবন, ঢাকা কলেজ–এস এম হোস্টেল, খেলাধুলা, গলা সাধনা, মাধ্যম রকমের ভাল ছাত্র, ল্যাংলি সাহেবের শেষ উপদেশ, সমকালীন শিক্ষা কারিকুলাম, শিক্ষাজীবনের শেষ নাই।

তৃতীয় খণ্ড : ধর্ম-জীবন

অধ্যায় সাত : গোঁড়ামির পরিবেশ
নফলিয়াতের পাবন্দি, শৈশবের বাড়াবাড়ি, টুপি নিষ্ঠা, মযহাবী-বিরোধ, আমার একগুঁয়েমি, প্রথম সংঘর্ষ, মযহাবী বিরোধের তৎকালীন রূপ, করটিয়ার কাহিনী, ময়মনসিংহ শহরে সংঘর্ষ, দাদাজীর উদারতা, গোঁড়ামি ও আদব-লেহায, মযহাবী সংকীর্ণতা মরিয়াও মরে না, আমার জবাব।

অধ্যায় আট : গোঁড়ামির প্রতিক্রিয়া
উদারতার ক্রমপ্রসার, ডা. বিপিন বিহারী সেন, খৃষ্টান, নামাজ রোযার শিথিলতা, কবর-পূজা, পীর-পূজা, ধর্মমত বনাম চরিত্র, সব ধর্ম সত্য, না সব ধর্ম মিথ্যা? খোদা-বিশ্বাস বনাম ধর্মবিশ্বাস, নাস্তিকতা, মি. ল্যাংলির সহনশীলতা, অধ্যাপক ভট্টাচার্য, এ্যাগনস্‌টিক।

অধ্যায় নয় : প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া
খিলাফত ও স্বরাজ আন্দোলন, পুনরায় ধর্মে মতি, ওয়ায়ে নূতনত্ব, পীরগিরির উপক্রম, নূতন পরিবেশ, মোল্লাকি-বিরোধী লীগ, মওলানা মলিহাবাদী, মোল্লা-বিরোধের প্রসারিত রূপ, আচার-সর্বস্বতার কুফল, ধর্মান্তর গ্রহণ অনাবশ্যক, ধর্মত্যাগ অসম্মানসূচক, ধর্মে-ধর্মে টলারেন্স, সর্বধর্ম-সমন্বয় বনাম সর্বধর্ম-পরিচয়, ইসলাম-হিতৈষী’ বনাম মুসলিম-হিতৈষী’।

অধ্যায় দশ : ‘অনিসলামি মুসলমান’
স্পর্শকাতর মুসলমান, চাল-চলনে গোঁড়ামি, মিঠাই বর্জন, বেশ্যা-বর্জিত, ফ্যাসটিডিয়াস, মুসলমানের পর্দা-প্রথা, ভিক্ষা বৃত্তি, মুসলিম-হিত বনাম হিন্দু-অহিত, ইসলাম বনাম মুসলমান, ধর্ম ও ঔষধ, শাঁস ও খোসা, ধর্ম বনাম ধর্মীয় দল, ধর্ম বনাম আল্লাহ, মানব বনাম মুসলমান।

অধ্যায় এগার : হক্কুল এবাদ
বুদ্ধির মুক্তির সামাজিক দিক, মুক্তবুদ্ধি বনাম চিন্তার অস্থিরতা, বিজ্ঞান ধর্মবিরোধী নয়, অন্ধভক্তি নয়, অর্জিত উপলব্ধি, শ্রেষ্ঠ মাবুদ, বিজ্ঞানী-শ্ৰেষ্ঠ আইনস্টাইন, ধর্ম-বোধের ভিত পাকা, ধর্মের রুহানিয়াত অব্যয়।

চতুর্থ খণ্ড : সাহিত্যিক জীবন (মামুলি)

অধ্যায় বার : প্রচলিত পথে অগ্রসর
কৈফিয়ত, শৈশবের খোরাক পুঁথি, পুঁথির নিশা, গদ্য সাহিত্যের সাথে পরিচয়, শৈশবে সম্পাদকতা, কৈলাস বাবুর প্রভাব, আতিকুল্লাহ, হাজী আহমদ আলী, আহমদিয়া লাইব্রেরি, বৃদ্ধ মিতাজির দোওয়া, উচ্চতর পরিবেশ, বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব, কাব্য-সাধনা, মাইকেলের প্রভাব, পুস্তক বাইন্ডিং, চোরের উপর বাটপারি।

অধ্যায় তের : সাহিত্য-সাধনা
কবি হওয়ার অপচেষ্টা, গদ্যে প্রথম সাফল্য, অনুবাদ, আল এসলাম, পিওর আর্টের বিতর্ক, সাহিত্যিকদের সাথে প্রথম পরিচয়, প্রথম বইয়ের কপিরাইট, আরবি-ফারসি বনাম বাংলা শব্দ, প্রথম স্যাক্রিফাইস, দ্বিতীয় স্যাক্রিফাইস, সাহিত্য সমিতির সেক্রেটারি, চাদা আদায়, চাঁদা দান, সাহিত্য-জীবনের মুদ্দত ভাগ, অভিনব বিষয়বস্তু।

পঞ্চম খণ্ড : সাহিত্যিক জীবন (গরমামুলি)

অধ্যায় চৌদ্দ : গণভিত্তিক সাহিত্যিক মোড়
উৎপ্রেরণা-জাত জাতীয় চিন্তা, সাহিত্য-জীবন, খণ্ডতার সংগত কারণ, পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতা, নূতন উপলব্ধি, জটিলতা বৃদ্ধি, আমার উভয়সংকট, পাকিস্তান সংগ্রামে মুসলিম সাহিত্যের দ্বিধাবিভক্তি।

অধ্যায় পনের : স্বাতন্ত্রের স্বীকৃতি
সোজা পথ সহজ না, প্রথম তিক্ত অভিজ্ঞতা, পশ্চিমাদের অদূরদর্শিতা, পূর্ব বাংলার দুধারী বিপদ, বাংলা সাহিত্যের মুসলমানি রূপ, বাংলা সাহিত্যের বাঙ্গাল রূপ, বিভ্রান্তির হেতু, আমাদের কথ্য ভাষার শক্তির উৎস, মনিব’ ও ‘চাকরের’ ভাষা, আমার একাকিত্ব’।

অধ্যায় ষোল : রাষ্ট্রিক বনাম কৃষ্টিক স্বাধীনতা
মার্কিন নজির, স্বাতন্ত্র-বোধের উন্মেষ, ওয়েবস্টারের দৃঢ়তা, দেশি শত্রুতা বনাম বিদেশি শত্রুতা, দূরদর্শী বিদেশির সদুপদেশ, উপলব্ধির বাস্তবায়ন, জনগণের জয়।

ষষ্ঠ খণ্ড : সাংবাদিক জীবন

অধ্যায় সতের : সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি
এক ঢিলে দুই পাখি, ‘ছোলতান’, ‘মোহাম্মদী’, ‘দি মুসলমান, ‘খাদেম, প্রথম পর্যায়ের সমাপ্তি।

অধ্যায় আঠার : দ্বিতীয় পর্যায়
‘দৈনিক কৃষক’, ‘কৃষক’-এর অর্থাভাব, ব্যক্তিগত বিপদ, অর্থাভাবের সংগত কারণ, খান বাহাদুর মোহাম্মদ জান, মি. এইচ দত্ত, নীতিগত বিরোধ, কৃষক’ ত্যাগ, সাংবাদিকতার নূতন জ্ঞান, সম্পাদক বনাম মালিক।

অধ্যায় উনিশ : তৃতীয় পর্যায়
‘নবযুগ’, বেনামী সম্পাদক, আমার রাজনীতিক সাংবাদিকতা, আমার ব্যক্তিগত সংকট, নজরুলের ধর্মে মতি, নজরুলের আধ্যাত্মিকতা, নজরুলের রোগ লক্ষণ, মি. দত্তের আবির্ভাব, লজ্জাকর দুর্ঘটনা, আগুনে ইন্ধন, নবযুগে চাকুরি খতম।

অধ্যায় বিশ : চতুর্থ পর্যায়
‘ইত্তেহাদ’, আমার চরম সাফল্য, মুসলিম সাংবাদিকতার অসুবিধা, সমাজ-প্রাণতা বনাম বাস্তববাদিতা, ‘ইত্তেহাদ’-এর প্রয়াস, ‘ইত্তেহাদ’-এর জনপ্রিয়তার কারণ, ‘পাঠকের মজলিস, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদারতা, ‘ইত্তেহাদ’-এর অপমৃত্যু, কলামিস্ট মাত্র।

সপ্তম খণ্ড : আমার সংসার-জীবন

অধ্যায় একুশ : দাম্পত্য জীবন
বিবাহ, বয়সের দূরত্ব লোপ, কচি ঘাড়ে ভারী বোঝা, কুশলী নিপুণা গিন্নি, কলিকাতার জীবন, সংকল্পে দৃঢ়তা, বিবিই জিতিলেন, বিবির প্রভাবের ব্যাপকতা, আমার স্বাস্থ্যের দিকে অতন্দ্র দৃষ্টি, সুখী দাম্পত্য জীবন।

অধ্যায় বাইশ : উকালতি জীবন
শুরুতে নৈরাশ্য, খান সাহেব সাহেব আলী, নূতন অভিজ্ঞতা, ‘অনুকিলী’-সততা, ফিস আদায়, টাউট প্রথা, ‘নোবল প্রফেশন’, মিথ্যাই সত্য, সত্যের জন্যে মিথ্যার ভূমিকা, আলীপুরে।

অধ্যায় তেইশ : বিষয়ী জীবন
বংশগত দুর্বলতা, উস্তাদের শিক্ষা, সাধু থাকা কঠিন না, নবাব সাহেবের উপদেশ, অর্থম-অনর্থম, চিত্রগুপ্তের বাজেট, নিজের বাড়ি, নিজের বাড়ি বনাম ভাড়াটিয়া বাড়ি, জ্ঞান ও বুদ্ধি, আহাম্মকের পাহারাদার তকদির, ‘অজাতশত্রু’, সততা ও তুকাব্বরি, শেষ কথা।

শেষ কথা

 

প্রথম খণ্ড – পটভূমি

অধ্যায় এক – বংশ-পরিচয়

. জন্মস্থান

পাঠকগণ, ভুল বুঝিবেন না। এ বংশ-পরিচয় মানে কোনো ডাইনেটি বা শরিফ খান্দানের কুরসিনামা বা বংশলতা নয়। এ বংশ-পরিচয় পাড়াগাঁয়ের একটি সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কৃষক-পরিবারের অতি সাধারণ জীবনমানের ও দিনযাপনের সুখ-দুঃখের কথা। বর্তমান লেখক এমনই একটি কৃষক-পরিবারের সন্তান। সেজন্য তার আত্মজীবনী লেখার মধ্যে তার বংশের এবং আত্মীয়-স্বজনের কথা অমনি আসিয়া পড়ে। সব আত্মজীবনী-লেখকের বেলাতেই এটা সত্য। দুনিয়ার সব দেশের সর্ব শ্রেণীর আত্মজীবনী লেখকেরাই যে নিজেদের বংশ-পরিচয় দিয়া আত্মজীবনী শুরু করিয়াছেন, সেটা এই কারণেই। আত্মজীবনীকার অভিজাত বংশের সন্তানই হউন, আর সমাজের নিচের তলার সাধারণ মানুষের সন্তানই হউন, সবাই একই ধরনের বাপ-মার ঘরেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। নিতান্ত এতিম না হইলে বাপ-মার সংসার ও পরিবেশেই তিনি লালিত-পালিতও হইয়াছেন। অভিজাত বংশের সন্তান ও কৃষক-শ্রমিক বংশের সন্তানের মধ্যে সাধারণত গর্ব-অহংকার ও লজ্জা-সংকোচের যে একটা কমপ্লেক্স থাকা খুবই স্বাভাবিক, আত্মজীবনী লেখার অধিকারীদের অধিকাংশের মধ্যে ঐ বয়সে তেমন কোনো কমপ্লেক্স আর থাকে না। কৌলীন্যবোধ ও হীনম্মন্যতার উর্ধ্বে যারা উঠিতে পারেন, সাধারণত তাঁদের মধ্যেই আত্মজীবনী লেখার অধিকার ও ইচ্ছার উন্মেষ লাভ ঘটে। যে বয়সে আত্মজীবনী লেখার অধিকার ও বাসনা জন্মে, সেটা প্রায় জীবন-সন্ধ্যা। সে বয়সে বংশের উচ্চতা ও নীচতার কথা চিন্তা করার মত মনের অবস্থা অনেকেরই থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে তারা হন নিজেরাই এক একটি বংশের প্রতিষ্ঠাতা।

তাছাড়া প্রকৃত আত্মজীবনী শুধু একটি ব্যক্তির জীবনকথা নয়। আমার মত নগণ্য ব্যক্তির ত নয়ই। আত্মজীবনী-লেখক যে শ্রেণীর লোকই হউন না কেন, তার জীবনকথা মানেই তার শৈশবের পরিবেশের কথা। বংশ ও পরিবারের পরিবেশটাই ব্যক্তি-জীবনে সবচেয়ে গুরুতর প্রভাবশালী পরিবেশ। এ বিষয়ে আমি এই পুস্তকের ভূমিকায় আরো বিস্তৃত আলোচনা করিয়াছি। এখানে এইটুকুর উল্লেখই যথেষ্ট যে, ভূমিকায় যে ব্যক্তিত্ব, শখছিয়াত বা পার্সনালিটির কথা বলিয়াছি, তার অর্ধেক বাপ-মা পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার, আর অর্ধেক পরিবেশের দান। কাজেই ব্যক্তিমাত্রেই পিতৃ-পুরুষ ও পরিবেশের নিকট সমভাবে ঋণী–সে ঋণের আনুপাতিক হার যা-ই হোক না কেন। কাজেই আত্মজীবনী বুঝিতে হইলে যার জীবনী সে ব্যক্তিটিকে বুঝিতে হইবে। ব্যক্তিটিকে বুঝিতে হইলে ঐ দুইটিও বুঝা দরকার। তাই সবাই এ কাজটা করেন। আমিও করিলাম।

ময়মনসিংহ জিলা। ত্রিশাল থানা। ধানীখোলা গ্রাম। এই গ্রামই আমার জন্মভূমি। বর্তমানে এটা বিশাল গ্রাম, একই গ্রামেই একটা ইউনিয়ন। ধানীখোলার উত্তরে গোপাল নগর, দক্ষিণে ত্রিশাল, পূর্বে বৈলর ও পশ্চিমে রাধাকানাই। এই চারটা গ্রামও এক-একটি ইউনিয়ন। এই চৌহদ্দির মধ্যে ধানীখোলা ইউনিয়নের আয়তন কমবেশি পঁচিশ বর্গমাইল। লোকসংখ্যা প্রায় বিশ হাজার। দুইটি নদী। একটির নাম সুতোয়া। অপরটির নাম নাগুয়া। সুতোয়াই বড়। বেগুনবাড়ি রেলস্টেশনের নিকট ব্ৰহ্মপুত্র হইতে বাহির হইয়াছে। ধানীখোলার পূর্ব সীমার আগাগোড়াই এই নদী। দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হইয়া অন্য নদীর সহিত মিশিয়া অবশেষে শীতলক্ষ্যাতে পড়িয়াছে। এই দৈর্ঘ্যে ইহার উভয় তীরে বহু বাজার-বন্দর আছে। কিন্তু শুধু সুতোয়া নামেই ইহার দৈর্ঘ্য বিশ মাইলের বেশি। আমাদের ছেলেবেলা এই নদীতে বছরের বার মাস বড় বড় নৌকা চলিত। তার মধ্যে পাঁচ শ মণ হইতে হাজার মণের পালওয়ালা নৌকাও অনেক থাকিত। এখন এই নদীর উপর চারটা পাকা ব্রিজ হইয়া যাওয়াতে আগের মত বড় নৌকার আর যাতায়াত নাই।

অপর পক্ষে নাগুয়া খুব ছোট নদী। উত্তর দিকে ধলি বিল নামক একটি বিল হইতে বাহির হইয়া ধানীখোলাকে উত্তর-দক্ষিণে সমান দুই ভাগে ভাগ করিয়া ক্ষীরো নদীতে পড়িয়াছে। ইহার দৈর্ঘ্য দশ মাইলের বেশি হইবে না। আমাদের ছেলেবেলায় এই নদীতেও বার মাস পানি থাকিত। মালবাহী নৌকাও চলাচল করিত। এখন অনেক জায়গাতেই তীরবর্তী সব গাছপালা কাটিয়া ফেলায় এবং নদীর ঢালুতে ফসলাদি আবাদ শুরু হওয়ায় নদীটি অতিশয় ক্ষীণ হইয়া পড়িয়াছে।

ধানীখোলা গ্রামে মৌযার সংখ্যা বাইশটি। একই গ্রামে দুইটা হাই স্কুল, দুইটা মাইনর স্কুল ও ছয়টি প্রাইমারি স্কুল আছে। এছাড়া একটি ডাক্তারখানা, সরকারি কৃষি ফার্ম, কমিউনিটি সেন্টার, মিলন সমাজ, পাবলিক পাঠাগার, তাঁতের স্কুল, তহসিল কাছারি, বাজার ও পোস্টাফিস আছে।

কিন্তু এক শ বছর আগে ধানীখোলা এর চেয়েও উন্নত ছিল। এর মর্যাদা আরো উঁচা ছিল। তখন ধানীখোলা ছিল ময়মনসিংহ জিলার পাঁচটি উল্লেখযোগ্য শহরের একটি। এ সম্পর্কে তৎকালীন সরকার প্রকাশিত প্রামাণ্য পুস্তক স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্টস-অব-বেঙ্গলএর উল্লেখ করা যায়। পুস্তকের লেখক বিখ্যাত স্ট্যাটিসটিশিয়ান ও ঐতিহাসিক ডবলিও ডবলিও হান্টার। বইখানা প্রকাশিত হয় ১৮৭৫ ইংরেজি সনে। তার আগের বছর মানে ১৮৭৪ সালের বিবরণ এতে আছে। এই পুস্তকের ৪১৪ পৃষ্ঠায় ময়মনসিংহ জিলার পাঁচটি বৃহত্তম শহর’ এই শিরোনামার যে তালিকা দেওয়া হইয়াছে তাতে যথাক্রমে নাসিরাবাদ, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও ধানীখোলার নাম আছে। দেখা যায় অধিবাসী-সংখ্যার ভিত্তিতেই শহরগুলির মান নির্ণীত হইয়াছিল। এই পাঁচটি শহরের মধ্যে নাসিরাবাদ শহর সারা জিলার ও সদর মহকুমার, জামালপুর শহর জামালপুর মহকুমার, কিশোরগঞ্জ শহর কিশোরগঞ্জ মহকুমার হেডকোয়ার্টার ছিল। কেবল শেরপুর ও ধানীখোলাই ছিল বেসরকারি শহর। সরকারি শাসনক্ষেত্রে শহর গড়িয়া উঠা খুবই স্বাভাবিক নিশ্চিত ব্যাপার। কিন্তু বেসরকারি জায়গায় শহর গড়িয়া উঠা কম কথা নয়। হান্টার সাহেবের হিসাবমত দেখা যায়, ঐ সময়ে ধানীখোলা শহরে মোট বাসেন্দা ছিল ছয় হাজার সাত শ ত্রিশ। তার মধ্যে মুসলমান ছিল চার হাজার ছয় শ পঁয়ত্রিশ, হিন্দু ছিল দুই হাজার পঁচানব্বই, খৃষ্টান বা অন্য কোনো ধর্ম সম্প্রদায়ের লোক ধানীখোলায় ছিল না। অধিবাসী সংখ্যা সামান্য নয়। কারণ জিলার হেডকোয়ার্টার নাসিরাবাদ শহরের লোকসংখ্যা ছিল তখন দশ হাজার আটষট্টি জন মাত্র।

এই সময় ময়মনসিংহ জিলার মাত্র চারটি মহকুমা ছিল–সদর, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ ও আটিয়া। বর্তমানের নেত্রকোনা মহকুমা তৎকালে সদর মহকুমার এলাকাভুক্ত ছিল। আটিয়া মহকুমাই পরে টাঙ্গাইল মহকুমা ও আরো পরে টাঙ্গাইল জিলা হয়। আটিয়া শহরই আটিয়া মহকুমার প্রধান নগর ছিল। কিন্তু একটি মহকুমার হেডকোয়ার্টার হইয়াও আটিয়া উল্লেখযোগ্য শহরের তালিকাভুক্ত হইতে পারে নাই। কারণ আটিয়া মহকুমা ও তার হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় মাত্র ১৮৬৯ সালে। তার আগে পর্যন্ত আটিয়া মহকুমা জামালপুর মহকুমার এলাকাভুক্ত ছিল। জামালপুর মহকুমাই এই জিলার সর্বপ্রথম মহকুমা। এটি স্থাপিত হয় ১৮৪৫ সালে। জামালপুর মহকুমা স্থাপিত হওয়ার আগে পর্যন্ত সারা জিলা নাসিরাবাদ হইতেই শাসিত হইত। নাসিরাবাদ শহরে জিলার হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় ১৭৬৮ সালে।

হান্টার সাহেবের বর্ণনায় দেখা যায়, তৎকালে এই জিলার ফরাযীদের প্রাধান্য ছিল। এ সম্পর্কে স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্টস-অব-বেঙ্গল-এর ৪০৯ পৃষ্ঠায় হান্টার সাহেব লিখিয়াছেন :

In Farazis centre much of the wealth and influence of the district some of its members being large landlords. Many of the poorer of the Farazis were formerly known as sympathisers of the Whabi’s disaffection and a small number went from Mymensingh to the rebel camp beyond our North Western frontiers for the purpose of co-operating with the fanatics of that part of the country.

অর্থাৎ ফরাযীদের হাতেই এখন এ জিলার ধনসম্পদ ও প্রভাবের অনেকখানি কেন্দ্রীভূত। তাদের কয়েকজন বড় বড় জমিদার। ফরাযীদের মধ্যকার অপেক্ষাকৃত গরীব শ্রেণীর অনেকেই ওহাবি বিদ্রোহের সমর্থক ছিল বলিয়া জানা যায়। এদের মধ্যে অল্প কয়েকজন সীমান্তপারের ধর্মান্ধদের সাথে সহযোগিতা করিবার উদ্দেশ্যে ময়মনসিংহ হইতে উত্তর-পশ্চিম পারের বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়াছিল।

হান্টার সাহেবের বর্ণিত এই ‘অল্পসংখ্যক লোক আসলে কতজন ছিলেন, তা আজও জানা যায় নাই।

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক গবেষকেরা একদিন সে খবর দেশবাসীকে দিতে পারিবেন, তাতে সন্দেহ নাই। ইতিমধ্যে এই অহংকার আমি কিছুতেই গোপন। করিতে পারিতেছ না যে, আমার পূর্বপুরুষের একজন ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন আমার দাদাজীর জ্যেষ্ঠ সহোদর গাজী আশেক উল্লা সাহেব।

.

. পূর্বপুরুষ

সম্ভবত ১৮২৭-২৮ সালের কাছাকাছি কোনো এক সময়ে মওলানা সৈয়দ আহমদ শহীদ বেরেলভীর চার খলিফার অন্যতম মওলানা এনায়েত আলী স্থানীয় খলিফা মওলানা চেরাগ আলীসহ তবলিগ উপলক্ষে ধানীখোলা তশরিফ আনেন। তাদের প্রচারকালে আমার দাদার বাবা আছরউদ্দিন, আমার নানার বাবা মহব্বত উল্লা ও তার বেহাই খোদাবখশ এবং সোনাখালী মৌযার জাবু নামক এক ব্যক্তি, এই চারজন মওলানা সাহেবের হাতে শরা কবুল করেন। এটাকে মুরিদ হওয়া বলা হইত না। কারণ এঁরা পীর-মুরিদির বিরোধী ছিলেন। এই চারজন পূর্বেকার বংশ পদবির স্থলে ফরাযী’ পদবি লাভ করেন। স্বভাবতই সামাজিক ক্রিয়াকলাপে এরা পরস্পরের খুব ঘনিষ্ঠ। হইয়া পড়েন। পরবর্তীকালে মহব্বত উল্লা ফরাযীর পুত্র মেহের উল্লা ফরাযীর এক মেয়েকে আমার বাবা আবদুর রহিম ফরাযী বিবাহ করেন। খোদা বখশ ফরাযীর পুত্র জলিল বখশ ফরাযী মেহের উল্লা ফরাযীর এক বোনকে বিবাহ করেন এবং জাবু ফরাযীর পুত্র আবদুল গফুর ফরাযী আমার দাদার বড় ভাই গাজী আশেক উল্লার মেয়েকে বিবাহ করেন।

যা হোক, মওলানা এনায়েত আলী ও মওলানা চেরাগ আলীর হাতে শরা গ্রহণের সময় আছরউদ্দিন ফরাযীর তিন পুত্র ছিলেন : জ্যেষ্ঠ আশেক উল্লা, মধ্যম আরয উল্লা, কনিষ্ঠ আরমান উল্লা। জ্যেষ্ঠ আশেক উল্লার বয়স তখন অনুমান আঠার-উনিশ। সবেমাত্র মুখ ভরিয়া দাড়ি-মোচ উঠিয়াছে। তিনি তখন। স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়িতেন। মওলানাদ্বয়ের প্রেরণায় আশেক উল্লা সাহেব সৈয়দ আহমদ শহীদের মোজাহিদ দলে ভর্তি হন এবং তাঁদের সঙ্গে সরহদ্দে চলিয়া যান। দাদাজী আরমান উল্লার বয়স তখন মাত্র আট-দশ বছর।

এই ঘটনার সময়কাল ১৮২৭-২৮ সাল অনুমান করা হয় এই জন্য যে আমাদের পারিবারিক প্রবাদ মোতাবেক আশেক উল্লা সাহেবের মোজাহিদ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পাঁচ বছর পরেই বালাকোটের যুদ্ধ হয়। বালাকোটের যুদ্ধ হয় ১৮৩১ সালের মে মাসে। বড় ছেলে ইসলামের জন্য জান দিয়া শহীদ হইতে অথবা গাজী হইতে গিয়াছে, এই জন্য আছরউদ্দিন ফরাযীর মর্যাদা প্রতিবেশীদের কাছে এবং আলেম-ওলামাদের কাছে বাড়িয়া যায়। তিনি স্থানীয় ফরাযীদের মাতব্বর হন।

হান্টার সাহেবের কথা অন্তত আমাদের বংশ সম্বন্ধে মাত্র অংশত সত্য। প্রথমত আমাদের পারিবারিক পদবি ফরাযী ছিল সত্য; কিন্তু আমার মুরুব্বিরা কেউ হাজী শরিয়ত উল্লা বা তার পুত্র দুদু মিয়া সাহেবের মুরিদ ফরায়েযী’ ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, তারা নিজেদের ওহাবি বলিয়াও স্বীকার করিতেন না। আমার দাদা আশেক উল্লা সাহেব যে মোজাহিদ বাহিনীতে যোগ দিয়াছিলেন, সেটাকেও তারা ওহাবি আন্দোলন বলিয়া মানিতেন না। তৃতীয়ত, আমার দাদা গাজী আশেক উল্লার সাথে এ জিলার আরো যারা জেহাদে গিয়াছিলেন, তাদের কয়েকজনের পরিবারের সাথে পরবর্তীকালে আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হইয়াছে। তাঁরা কেউই হাজী শরিয়ত উল্লার ফরায়েযী জমাতের লোক নন। তবে হান্টার সাহেবের উক্ত-মত আমাদের পূর্বপুরুষেরা সত্যিই গরীব কৃষক শ্রেণীর লোক ছিলেন। বস্তুত, আমার শৈশবে মুরুব্বিদের ফরায়েযী’ ও ‘ফরাযী’ শব্দ দুইটার পার্থক্য সম্বন্ধে অতিশয় সচেতন দেখিয়াছি। কেউ তাদের ফরায়েযী’ বলিলে তারা মুখে আপত্তি করিতেন, মনে কষ্ট পাইতেন এবং অনেক সময় চটিয়াও যাইতেন। এই ভুল আমাদের সমাজের বা আত্মীয়-স্বজনদের কেউ করিতেন না। আমাদের স্কুল-মাদ্রাসায় শিক্ষকতা ও মাঠে-মসজিদে ওয়ায-নসিহত করিতে বরিশাল, নোয়াখালী এবং ঢাকা হইতে অনেক আলেম-ওলামা আসিতেন এবং আমাদের বাড়িতে মেহমান হইতেন। ঢাকা হইতে যেসব আলেম আসিতেন, তাঁদের সবাই আমাদের জমাতি ছিলেন। নোয়াখালী হইতে আগত আলেমরা সবাই ছিলেন হানাফি জমাতের। একমাত্র বরিশাল জিলা হইতে আগত আলেমরা আধাআধি হানাফি এবং আধাআধি মোহাম্মদী, মানে আমাদের জমাতের লোক ছিলেন। মোহাম্মদী আলেমদের কেউই আমাদের ‘ফরায়েযী’ বলিতেন না। ফরাযীই বলিতেন। কোনো হানাফি আলেমও আমাদেরে ‘ফরায়েযী’ বলিয়া সম্বোধন করিতেন না। হানাফি আলেমদেরেও আমাদের অঞ্চলে খুবই তাজিম ও সম্মান করা হইত। বস্তুত, আমাদের বাড়ির মাদ্রাসায় শিক্ষকদের বেশির ভাগ হানাফি ছিলেন। তারা আমাদেরে উর্দু-কি পহেলি কিতাব পড়াইবার পরই নামাজ-রোযা-হালাল-হারাম শিখাইবার জন্য রাহে-নাজাত ও মিফতাহুল জান্নাত পড়াইতেন। তবে পড়াইবার সময় তারা তাহরিমা বান্ধা, জোরে আমিন কওয়া, রেকাতে-রেকাতে বসা, রুকুতে নিচা ও উঁচা হওয়ার সময় রফাদায়েন করা ইত্যাদি ব্যাপারে হানাফি মোহাম্মদী মতের পার্থক্য বুঝাইয়া দিতেন। এঁদের মধ্যেই কেউ কেউ প্রথম প্রথম আমাদের পরিবারকে যখন ফরায়েযী পরিবার বলিতেন, তখনই আমার মুরুব্বিরা আপত্তি করিতেন। তর্কও হইত। কিন্তু আমি তখন ওসব কিছুই বুঝিতাম না। তার অনেক পরে আমি যখন শহরের ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ি, তখন সিটি স্কুলের আরবি-ফারসি টিচার জনাব মৌ. মাসুম আলী সাহেব আমাদের মেসের সুপারিনটেন্ডেন্ট ছিলেন। তিনিই প্রথম আমাকে এলমা করিয়া ফরায়েযী’ ও ‘ফরাযী’ শব্দ দুইটির পার্থক্য বুঝাইবার চেষ্টা করেন। কারণ তিনি নিজেও একজন ফরাযী ছিলেন। তাকে কেউ ফরায়েযী বলিলে তিনি কঠোর প্রতিবাদ করিতেন। তিনি আরবি ব্যাকরণের বিভিন্ন সংজ্ঞার উল্লেখ করিয়া আমাকে বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। আমি নিজে তখন ফারসি পড়িতাম বলিয়া তার সব কথা বুঝিও নাই, যাও বুঝিয়াছিলাম তাও মনেও নাই সব। তবে যেটুকু মনে আছে এবং বাড়িতে গিয়া যতটুকুতে চাচাজীর অনুমোদন পাইয়াছিলাম তা এই যে ফরিযা’ শব্দটার বহুবচন ফরায়েয হইতে ফরায়েযী’ শব্দটির উৎপত্তি হইয়াছে। কিন্তু ফরাযী’ শব্দটা আসিয়াছে সোজাসুজি ফরয ইতে। বিশেষত ফরায়েযী’ শব্দটা পদবি হিসাবে ব্যবহারের অসুবিধাও ছিল। মুসলমান উত্তরাধিকার আইন মোতাবেক শরিকদের প্রাপ্য অংশের হিসাবকেও ফরায়েয করা বলা হইত জনগণের স্তরেও। সেজন্য ফরায়েযী শব্দটার একাধিক অর্থবোধক বিভ্রান্তির আশঙ্কা ছিল। তাছাড়া হাজী শরিয়তুল্লা সাহেবের অনুসারী ফরায়েযীরা গ্রামে জুম্মা ও ঈদের জমাত করা নাজায়েয মনে করিতেন। অথচ আমাদের জমাতের লোকেরা গ্রামে জুম্মা ও ঈদের নামাজ পড়া অবশ্যকর্তব্য মনে করিতেন। আমাদের বাড়িতেই জুম্মার মসজিদ ছিল। তাতে সারা গায়ের ছেলে-বুড়া জুম্মার নামাজ পড়িতেন। ছেলেবেলায় দেখিয়াছি আশপাশের তিন-চার গাঁয়ের লোকেরা এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান মাতব্বর ইউসুফ আলী মৃধা সাহেবের বাড়ির সামনের বিশাল মাঠে খুব বড় ঈদের জমাতে শামিল হইত। দাদাজীর মুখে শুনিয়াছি তিনি বাপের আমল হইতেই ঐ ঈদগাতেই ঈদের জমাত করিয়া আসিয়াছেন। আজকাল অবশ্য সে ঈদের মাঠ ভাঙ্গিয়া চার-পাঁচটা মাঠ হইয়াছে। যা হোক আমাদের পরিবারের ‘ফরাযী’ পদটি যে হাজী শরিয়তুল্লা-দুদু মিয়া সাহেবদের অনুসারী ফরায়েযী নয়, আশা করি এতেই তা পরিষ্কার হইল। তবে প্রশ্ন। থাকিয়া যায়, আমাদের পরিবারের ফরাযী’ পদবিটি আসিল কোথা হইতে? এ সম্পর্কে কোনো লিখিত দলিল প্রমাণ নাই। সবই দাদাজী ও তার সমবয়সী লোকজন ও তৎকালীন আলেম-ফাযেলদের মুখে শুনা কথা। তাঁদের কথা হইতে বুঝা যায় যে, সৈয়দ আহমদ শহীদ বেরেলভীর অন্যতম খলিফা মওলানা এনায়েত আলী, মওলানা চেরাগ আলী ও তাদের স্থানীয় সহকর্মী দেলদুয়ারের মওলানা মাহমুদ আলী তরিকায়ে-মেহাম্মদিয়ায় তবলিগ কাজে এই অঞ্চলে আগমন করেন। তারা অনেক সময় আমাদের বাড়িতেই রাত কাটাইতেন। এঁদের প্রচারের ফলেই এ অঞ্চলের লোকেরা ক্রমে-ক্রমে শরা কবুল করেন। শরা কবুল করা মানে ইসলাম গ্রহণ নয়। কারণ আগে হইতেই এ অঞ্চলের বিশেষত ধানীখোলা গ্রামের বিপুল মেজরিটি মুসলমান ছিলেন। কাজেই উপরিউক্ত আলেমরা এ অঞ্চলে ‘শরা’ জারি করিতে আসিতেন, ইসলাম প্রচারে আসিতেন না। তাঁদের প্রচারকালে ধানীখোলা গ্রামের প্রায় আধাআধি লোক কালক্রমে শরা’ কবুল করেন। এঁরা সকলেই মোহাম্মদী জমাতভুক্ত। পরবর্তীকালে ১৮৩১ সালে সৈয়দ আহমদ শহীদ বেরেলভী ও তাঁর অনেক সহকর্মী এবং খলিফাঁদের কেউ-কেউ বালাকোটের যুদ্ধে শাহাদতবরণ করিলে আহমদ শহীদের পাঁচ খলিফার অন্যতম মওলানা কেরামত আলী জৌনপুরী সাহেব নিজে এবং তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে প্রধান মওলানা আবদুল আউয়াল সাহেবানের তবলিগের ফলে এতদঞ্চলের অনেক মুসলমান শরা কবুল করেন। তবে এঁরা প্রায় সকলেই হানাফি মযহাবভুক্ত।

মওলানা এনায়েত আলী ও মওলানা চেরাগ আলীর তবলিগে এ অঞ্চলের যাঁরা শরা কবুল করিয়াছিলেন, তাঁদেরও সকলের ফরাযী পদবি নাই। তারা আগের মতই শেখ, খা, সর্দার, মণ্ডল, তরফদার, তালুকদার ইত্যাদি পারিবারিক পদবি লইয়াই থাকিতেন। শুধু আমাদের পরিবারেরই ফরাযী’ পদটি আসিল কোথা হইতে? এ অঞ্চল হইতে একমাত্র আমাদের পরিবার থনেই একজন মোজাহিদ বাহিনীতে ভর্তি হইয়াছিলেন, সে কারণেই কি উক্ত আলেমগণ আমাদের পরিবারকেই ‘ফরাযী’ লকব দিয়াছিলেন? তাও নয়। আমাদের পরিবার ছাড়াও এ অঞ্চলে আরো তিন-চার ঘর ‘ফরাযী আছেন, অথচ তাদের পরিবার হইতে কেউ জেহাদে যান নাই।

প্রচলিত প্রবাদ অনুসারে প্রকৃত ব্যাপার এই যে মওলানা এনায়েত আলী ও মওলানা চেরাগ আলী সাহেবদের হাতে ও মওলানা মাহমুদ আলী সাহেবের সাক্ষাতে এ অঞ্চলের যে চারটি পরিবার সর্বপ্রথম শরা কবুল করিয়াছিলেন, শুধু তাদেরেই ফরাযী লকব দেওয়া হইয়াছিল। এই চারি পরিবারের মধ্যেই পরবর্তীকালে বিবাহ-শাদির সম্পর্ক স্থাপিত হইয়াছিল। আমার দাদার পিতা আছরউদ্দিন সাহেবের সাথে একই সময়ে যে তিনজন শরা গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁদের একজন মহব্বত উল্লা, দ্বিতীয়জন খোদা বখশ, তৃতীয়জন জাবু। শরা কবুল করিয়া এঁরা যথাক্রমে আছরউদ্দিন ফরাযী, মহব্বত উল্লা ফরাযী, খোদা বখশ ও জাবু ফরাযী নামে পরিচিত হন। আছরউদ্দিন ফরাযীর কনিষ্ঠ পুত্র আরমান উল্লা ফরাযীর জ্যেষ্ঠ পুত্র আমার পিতা আবদুর রহিম ফরাযী সাহেব পরবর্তীকালে মহব্বত উল্লা ফরাযীর পুত্র মেহেরুল্লা ফরাযীর কন্যা মীর জাহান খাতুনকে বিবাহ করেন। ইনিই আমার মা। খোদা বখশ ফরাযীর পুত্র জলিল বখশ ফরাযী আমার নানা মেহেরুল্লা ফরাযীর পিতা মহব্বত উল্লা ফরাযীর এক কন্যাকে বিবাহ করেন। জাবু ফরাযীর জ্যেষ্ঠ পুত্র আবদুল গফুর ফরাযীর নিকট বহুকাল প্রায়, ষাট বছর, পরে গাজী আশেক উল্লা সাহেব তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যাসন্তান ফাতেমা খাতুনকে বিবাহ দেন। এইভাবে গোড়ার চার ফরাযী পরিবারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হইয়াছিল।

শরা কবুল করিয়া আমার প্রপিতামহ আছরউদ্দিন সাহেব ‘ফরাযী’ হইবার আগে তাদের পারিবারিক পদবি ছিল মাদারী। তাঁর বাবার নাম ছিল ফালু মাদারী। দাদাজীর কথিত মতে তাদের এই পদবি বংশানুক্রমিক। নয় পুরুষের নাম তিনি জানিতেন। গড়গড় করিয়া একদমে নয় পুরুষের নামও বলিতেন। সকলের নাম আজ আমার মনে নাই। কোনো কাগজপত্রেও লেখা নাই। তারা কেউ লেখাপড়া জানিতেন বলিয়া মনে হয় না। দাদাজীর কওয়া এবং তার সমবয়সী বুড়াদের সমর্থিত মাত্র চারটি নাম আমার মনে আছে। তদনুসারে ফালু মাদারীর বাপ ছিলেন কালু মাদারী, তার বাপ ছিলেন ছাবু মাদারী ও তাঁর বাবার নাম লেদু মাদারী। এঁদের ধারাবাহিকতারও গ্যারান্টি আমি দিতে পারিতেছি না। ছেলেবেলার শোনা কথা আশ্চর্য রকম স্মরণ থাকে। এই দাবিতেই নামগুলি বলিতেছি, কিন্তু দাদাজীর কওয়া নয়টি নামের মধ্যে মাত্র চারটির উল্লেখ করিতেছি বলিয়া আমার নিজের মনেও সন্দেহ আছে, পূর্বপুরুষদের পারম্পর্য ঠিকমত উল্লিখিত হইল কি না। তবে তাদের সকলের পদবি যে মাদারী ছিল, তাতে সন্দেহ নাই। মাদারী পদবি ছিল কেন, সে বিষয়ে দাদাজী ও গ্রামের বুড়া মুরুব্বিরা একই কথা বলিতেন। তাই এখানে তার উল্লেখ করিতেছি।

.

. শরা কবুলের আগে

শরা জারি হইবার আগে আমাদের অঞ্চলে মুসলমানদের মধ্যে পীরপূজা, গোরপূজা ইত্যাদি যেসব বেশরা প্রথা প্রচলিত ছিল তার মধ্যে ‘মাদার পূজা’ ছিল প্রধান। এবং এটা বার্ষিক মচ্ছব। হিন্দুদের মহোৎসবেরই এটা অপভ্রংশ নিশ্চয়। পূজা কথাটাও মুসলমানদের মধ্যে সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল। কালু গাজীর মত মাদার গাজীও মুসলমানদের কিংবদন্তির ‘হিরো’ ছিলেন। তবে ‘মাদার পূজা’ বা কোনো পূজাতেই কোনো মূর্তিপূজা হইত না।

প্রতিবছর ধান মাড়াই হইবার পরই, সাধারণত মাঘ মাসে এই ‘মাদার পূজার মচ্ছব’ হইত। খুব লম্বা সোজা একটা আস্ত বাঁশ খাড়া করিয়া গাড়া হইত। বাঁশটির আগাগোড়া নিপিস করিয়া চাছিয়া-ছুলিয়া সুন্দর করা হইত। শুধু আগার দু’ একটা কঞ্চি পাতা-সুদ্ধা রাখিয়া দেওয়া হইত। ঐ কঞ্চির নিচেই একগোছা পাট বাঁধা হইত। এই পাটের গোছাটি কোনো বছর মেজেন্টর লাগাইয়া লাল রং করা হইত। কোনো বছর নীল লাগাইয়া নীল রঙা করা হইত। এই রং বদলানোর কোনো ধর্মীয় কারণ ছিল, না একটার অভাবে আরেকটা লাগানো হইত, দাদাজী তা বলিতে পারিতেন না। যা হোক, বাঁশের আগায় ঐ লাল-নীল রঙের একগোছা পাট ঝুলানো হইত এবং বাঁশটির আগাগোড়া চুন-হলুদ ও গোড়ায় হলুদ ও সিন্দুরের ফোঁটা দেওয়া হইত। বাঁশের গোড়ায় অনেকখানি জায়গা জুড়িয়া উঁচা ভিটি বানানো হইত এবং তা লেপিয়া-পুঁছিয়া ফিটফাট করা হইত। তিন দিন ধরিয়া এই বাঁশটি খাড়া থাকিত। এই তিন দিন ধরিয়াই এই বাশ ঘিরিয়া ঢাল-তলোয়ারসহ নাচিয়া কুঁদিয়া ঢোল-ডগর যোগে মাদারের গান, গাজীর গান ও জারিগান গাওয়া হইত। এই তিন দিনই, বিশেষত প্রথম দিন এই বাঁশের চারদিক মেলা বসিত। মেলায় অনেক জিনিস বিকিকিনি হইত।

‘মাদার পূজার’ পুরোহিতকে মাদারী বলা হইত। তিনি ছিলেন গ্রামের ধর্মীয় গুরু। তিনি ছুঁইয়া না দেওয়া পর্যন্ত বাঁশ খাড়া হইত না। তিনি আবার চুঁইয়া না দেওয়া পর্যন্ত বাঁশ নামানো হইত না। মাদার বাঁশ খাড়া করিবার পর মাদারী সাহেব বাঁশের গোড়ায় ভিটিতে লাল রঙের নয়া গামছা পাতিয়া বসিয়া থাকিতেন। দর্শকেরা সেই গামছায় যার-তার নজর দিত। তৎকালে টাকা আধুলির প্রচলন খুব কমই ছিল। অধিকাংশেই কড়ি, আধলা, পয়সা, ডবল পয়সা ও বড়জোর আনী-দুআনী ব্যবহার করিত। মাদারীর নজরেও কাজেই তা-ই ফেলিত। কিন্তু ঐরূপে যে পয়সা জমা হইত, তাতেই মাদারী সাহেবের সম্বৎসর চলিয়া যাইত।

মাদারীর পূজা ও মেলার সুস্পষ্ট চিত্র আমাদের চোখের সামনে তুলিয়া ধরিবার জন্য দাদাজী ওটাকে হিন্দুদের চড়কপূজার সহিত তুলনা করিতেন। তত্ত্বালে আমাদের বাড়ির অদূরেই হিন্দুপাড়া ছিল। প্রতিবৎসর চৈত্র মাসে সংক্রান্তির দিনে তাদের চড়কপূজা হইত। গ্রামের বাজার-সংলগ্ন খোলা মাঠে, তদভাবে চাষের জমিতে পূজা হইত ও মেলা বসিত। খুব লম্বা ও বেশ মোটা। একটা শাল-গজারি কাঠ খাড়া করিয়া গাড়া হইত। তার আগায় থাকিত একটা আড়ি কাঠ। আড়ি কাঠের দুই মাথা হইতে দুইটা মযবুত রশি মাটিতক ঝুলিয়া থাকিত। আড়ি কাঠটা খাড়া কাঠের সঙ্গে এমন কেড়কি কৌশলে লাগানো হইত যে আড়ি কাঠের রশি ধরিয়া খাড়া কাঠের চারপাশে দৌড়াইলে আড়ি কাঠও ভনভন করিয়া ঘুরিত। আমরা যখন দেখিয়াছি, তখন আড়ি কাঠের দুই পাশের রশি ধরিয়া লোকেরা মাটির উপরেই দৌড়াদৌড়ি করিত। কিন্তু আমরা বুড়াদের কাছে শুনিতাম যে আগেরকালে দুইজন লোক ঐ দুই রশি ধরিয়া শূন্যে ঝুলিয়া ঝুলিয়া চড়কগাছের চারিদিকে ঘুরিত। কিন্তু নিজ চক্ষে ওটা আমরা কোথাও কোনো দিন দেখি নাই। যা হোক ঐ চড়কপূজায় পূজা-পালি ছাড়া একটা মেলা বসিত। এই মেলায় চিনি-বাতাসা, খই-মুড়ি চিড়া, কদমা-জিলাপি-মিসরি, বাঁশি ও খেলনা ইত্যাদি ছেলেমেয়ের প্রিয় জিনিস পাওয়া যাইত। এছাড়া দাও, কুড়াল, কোদাল, লাঙলের ঈষ ও ফাল ইত্যাদি কৃষকদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যাইত। মোট কথা, এই বার্ষিক মেলা সকল দিক দিয়া জাতি-ধর্মনির্বিশেষে ছেলে-বুড়া-পুরুষ-নারী সকলের জন্যই বহু আকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছিল। দাদাজী আমাদেরে বুঝাইতেন মাদারীর মেলা অবিকল এই রকম ছিল। তিনি বলিতেন, ‘মাদার পূজা’ছিল বেশরা। মুসলমানদের চড়কপূজা। তার বয়স যখন সাত-আট বছর, তখন হইতেই আমাদের বাড়িতে ঐ ‘মাদার পূজা’ও মেলা বসার প্রথা বন্ধ হয়। তিনি বলিতেন যে, ঐ মেলা বন্ধ হওয়ায় প্রথম-প্রথম স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান জনসাধারণ অসন্তুষ্ট হইয়াছিল। তাঁর নিজেরও খুবই খারাপ লাগিয়াছিল, তাও তিনি স্বীকার করিতেন।

.

. সামাজিক অনাচার

শরা জারির আগে আমাদের অঞ্চলে মুসলমানদের মধ্যে যেসব আচার ব্যবহার প্রচলিত ছিল, সে সম্বন্ধে দাদাজী ও তার সমবয়সীদের মুখে এইরূপ শুনিয়াছি :

তৎকালে নামাজ-রোযা খুব চালু ছিল না। ওয়াকতিয়া ও জুম্মার নামাজ বড় কেউ পড়িত না। এ অঞ্চলে কোনো মসজিদ বা জুম্মার ঘর ছিল না। বছরে দুইবার ঈদের জমাত হইত বটে, কিন্তু তাতে বড়রাই শামিল হইত। কাজেই জমাতে খুব অল্প লোক হইত। ঈদের মাঠে লোক না হইলেও বাড়ি বাড়ি আমোদ-সামুদ হইত খুব। সাধ্যমত নূতন কাপড়-চোপড় পরিয়া লোকেরা বেদম গান-বাজনা করিত। সারা রাত ঢোলের আওয়াজ পাওয়া যাইত। প্রায়ই বাড়ি-বাড়ি ঢোল-ডগর দেখা যাইত। বা ঈদের গরু কোরবানি কেউ করিত না। কারণ জমিদারদের তরফ হইতে উহা কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ ছিল। খাশি-বকরি কোরবানি করা চলিত। লোকেরা করিতও তা প্রচুর।

তরুণদের ত কথাই নাই, বয়স্কদেরও সকলে রোযা রাখিত না। যারা রোযা রাখিত, তারাও দিনের বেলায় পানি ও তামাক খাইত। শুধু ভাত খাওয়া হইতে বিরত থাকিত। পানি ও তামাক খাওয়াতে রোযা নষ্ট হইত না, এই বিশ্বাস তাদের ছিল। কারণ পানি তামাক খাইবার সময় তারা রোযাটা একটা চোঙার মধ্যে ভরিয়া রাখিত। কায়দাটা ছিল এই : একদিকে গিরোওয়ালা মোটা বরাক বাশের দুই-একটা চোঙা সব গৃহস্থের বাড়িতেই আজও আছে, আগেও থাকিত। তাতে সারা বছর পুরুষেরা তামাক রাখে। মেয়েরা রাখে লবণ, সজ, গরমমসলা, লাউ-কুমড়ার বিচি ইত্যাদি। আগের কালে এ রকম চোঙার অতিরিক্ত দুই-একটা বাড়ি-বাড়িই থাকিত। রোযার মাসে মাঠে যাইবার সময় এই রকম এক-একটা চোঙা রোযাদাররা সঙ্গে রাখিত। পানি-তামাকের শখ হইলে এই চোঙার খোলা মুখে মুখ লাগাইয়া খুব জোরে দম ছাড়া হইত। মুখ তোলার সঙ্গে সঙ্গে খুব তাড়াতাড়ি গামছা, নেকড়া বা পাটের টিপলা দিয়া চোঙার মুখ কষিয়া বন্ধ করা হইত, যাতে বাতাস বাহির হইয়া না আসে। তারপর আবশ্যকমত পানি-তামাক খাইয়া চোঙাটা আবার মুখের কাছে ধরা হইত। খুব ক্ষিপ্রহস্তে চোঙার ঢিপলাটা খুলিয়া মুখ লাগাইয়া মুখে চুষিয়া চোঙার বন্ধ রোযা মুখে আনা হইত এবং সেঁক গিলিয়া একেবারে পেটের মধ্যে ফেলিয়া দেওয়া হইত। খুব ধার্মিক ভাল মানুষ দু’একজন এমন করাটা পছন্দ করিতেন না বটে, কিন্তু সাধারণভাবে এটাই চালু ছিল।

আছরউদ্দিন ফরাযী ও তার তিনজন সাথি শরা কবুল করার পরেও জনসাধারণের মধ্যে বহুকাল যাবৎ ঐ আচার প্রচলিত ছিল। ঐ চারি বন্ধুর প্রচারে ক্রমে ক্রমে আরো অনেক লোক শরা কবুল করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু সারা গ্রামবাসীর তুলনায় তাঁরা ছিলেন নগণ্য মাইনরিটি।

.

. ধুতি বনাম তহবন্দ

তৎকালে তহবন্দ পরা খুবই শরমের ব্যাপার ছিল। সবাই কাছা দিয়া কাপড় পরিত। শরা জারির আগে ত বটেই, শরা জারির পরেও এটা চালু ছিল। ঈদের জমাতেও লোকেরা কাছা দিয়া ধুতি পরিয়াই যাইত। নামাজের সময় কাছা খুলিতেই হইত। সে কাজটাও নামাজে দাঁড়াইবার আগে তক করিত না। প্রথম প্রথম নামাজের কাতারে বসিবার পর অন্যের আগোচরে চুপি চুপি কাছা খুলিয়া নামাজ শেষ করিয়া কাতার হইতে উঠিবার আগেই আবার কাছা দিয়া ফেলিত। শরম কাটিবার পর অবশ্য নামাজের কাতারে বসিবার আগে ত বটেই, অযু করিবার আগেই কাছা ভোলা চালু হইয়াছিল। পক্ষান্তরে শরা কবুল করিবার পর আছরউদ্দিন ফরাযী ও তাঁর সঙ্গীদের পরিবারের তরুণদের সকলে না হইলেও অন্তত বয়স্করা নামাজ বন্দেগির সময় ছাড়াও চব্বিশ ঘণ্টা তহবন্দ পরিয়া থাকিতেন। এটা নাকি তাঁদের পীরের হুকুম ছিল, শরা কবুলের অন্যতম শর্ত ছিল। সাদা লুঙ্গিকেই আগে তহবন্দ বলা হইত। দাদাজীর আমলে রঙিন লুঙ্গি কেউ দেখেন নাই। রঙিন লুঙ্গির প্রথম প্রচলন হয় বার্মা হইতে। লুঙ্গির প্রচলন হওয়ার আগে পর্যন্ত সকলেই তহবন্দ পরিত। সাড়ে চার হাত লম্বা মার্কিন (অধোলাই লংক্লথ) বা নয়ানসুখ (ধোলাই লংক্লথ) কাপড়ের দুই মাথা একত্র জুড়িয়া সিলাই করিলেই তহবন্দ হইত।

ফরাযীদের জন্য এই তহবন্দ পরা বাধ্যতামূলক ছিল। হান্টার সাহেব এ সম্বন্ধে তাঁর বইয়ের ১৯৫ পৃষ্ঠায় লিখিয়াছেন :

Farazis can be distinguished by their dresses. They do not wear dhuti. He dresses differently from other Musalmans and wraps his dhuti or waiste cloth round his body without crossing it between his legs.

অর্থ : ফরাযীদের তাদের পোপাশাক দেখিয়াই চিনা যায়। অন্যান্য মুসলমানদের থনে তারা ভিন্ন রকমের পোশাক পরে। তারা তাদের ধুতি বা তহবন্দ শরীরের চারিদিকে পঁাচাইয়া পরে, দুই পায়ের ভিতর দিয়া কাপড় পার করায় না অর্থাৎ কাছা দেয় না। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, আজকাল যেমন শুধু পাড়ওয়ালা কাপড়কেই ধুতি বলা হয়, আগের কালের রেওয়াজ তা ছিল। না। কাছা দিয়া কাপড় পরাকেই তখন ধুতি পরা বলা হইত। আজকাল হিন্দুরা ধুতি পরাকেই কাপড় পরা’ বলিয়া থাকেন। তাদের বিচারে প্যান্ট পাজামা পরা আর কাপড় পরা আলাদা ব্যাপার।

আছরউদ্দিন ফরাযী সাহেব ও তার সঙ্গীরা নিজেদের মধ্যে তহবন্দ পরা চালু করিলেও প্রতিবেশীদের মধ্যে তা চালু করিতে পারেন নাই। আছরউদ্দিন সাহেব শুধু মুখে-মুখেই এ বিষয়ে প্রচার করিতেন। কাউকে যবরদস্তি করিতেন না। দাদাজীর কাছে শুনিয়াছি তাঁর বাবা আছরউদ্দিন ফরাযী তার নিতান্ত বাধ্য অনুগত এক লোককে বলিয়া-কহিয়া তহবন্দ পরিতে রাজি করিয়াছিলেন। একদিন তহবন্দ পরিয়াই সে তোক তহবন্দ ফেলিয়া আবার ধুতি পরিয়া আছরউদ্দিন সাহেবের কাছে আসেন এবং মাফ চান। ফরাযী সাহেব তাঁকে তম্বি করিলে জবাবে সে লোক কাঁচুমাচু হইয়া বলেন, তহবন্দ পরিয়া রাস্তা চলিতে আমার ভারি শরম লাগে। কারণ কাছা না দিলে মনে হয় আমি কাপড়ের নিচে ন্যাংটা রহিয়াছি।’ ফরাযী সাহেব হাসিয়া তহবন্দ পরা হইতে তাকে রেহাই দেন।

আছরউদ্দিন সাহেব তহবন্দ পরার তাকিদ করিলে সাধারণত লোকেরা এই ধরনের জবাব দিত, ‘আমরা শরা কবুল করিয়াছি বটে, কিন্তু ফরাযী হই নাই। তহবন্দ পরা শুধু ফরাযীদের কর্তব্য। সব মুসলমানের কর্তব্য নয়। অর্থাৎ জনসাধারণের রায় এই ছিল যে গোড়াতে যে চারজন মওলানা এনায়েত আলী সাহেবের হাতে শরা কবুল করিয়াছিলেন, তাঁরাই ফরাযী এবং তহবন্দ পরা শুধু তাদেরই জন্য বাধ্যতামূলক। যারা পরে ঐ ফরাযীদের হাতে শরা কবুল করিয়াছেন, তাঁরা ফরাযীও নন, তহবন্দ পরাও তাঁদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। শুধু তহবন্দ পরার মত শরমের কাজ এবং কারো-কারো মতে শাস্তি হইতে রেহাই পাইবার আশাতেই জনসাধারণ ফরাযী শব্দের এরূপ সংকীর্ণ ব্যাখ্যা করিয়াছিল, তাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু কালক্রমে এটাই চালু হইয়া গিয়াছিল। এতদঞ্চলে শুধু এই চার পরিবারই ফরাযী বলিয়া পরিচিত। আর কোনো পরিবার এই পারিবারিক পদবি লাভ করে নাই। কোনো বেনামাজি বাবু-কেসেমের লোক হঠাৎ নামাজ ধরিলে, দাড়ি রাখিলে এবং সাদা লুঙ্গি ও লম্বা কোর্তা ধরিলে আজ পর্যন্ত লোকেরা বলাবলি করে, ‘লোকটা একেবারে ফরাযী হইয়া গিয়াছে।’ এতে মনে হয় ফরাযীরা ধর্মে কর্মে চালে-চলনে এবং পোশাক-পাতিতে গোঁড়া মুসলমান, এ ধারণা তকালেও ছিল।

আছরউদ্দিন ফরাযী ও তাঁর সঙ্গীরা তহবন্দ পরার জন্য লোকজনকে পীড়াপীড়ি না করিলেও লোকজনেরা কিন্তু ফরাযী সাহেবদের অত সহজে ছাড়িয়া দেয় নাই। শরমের খাতিরে লোকেরা নিজেরা ত তহবন্দ পরিতই না, অপরে তহবন্দ পরিয়া রাস্তাঘাটে চলাফেরা করিলেও বোধ হয় তাদের শরম লাগিত। কাজেই ফরাযীরাও যাতে তহবন্দ পরিয়া রাস্তাঘাটে চলাফেরা না করেন, তার চেষ্টা তারা সর্বদাই করিত। তহবন্দ পরাকে তারা নানা প্রকার মুখরোচক, অনেক সময় অশ্লীল রসিকতার দ্বারা আক্রমণ করিত। তহবন্দকে তারা কাপড় না বলিয়া ‘চারা গাছের খাঁচা’, ‘বালিশের ওসার’ ইত্যাদি কবিত্বপূর্ণ আখ্যায়িত করিত। ফরাযীরা কাপড়ের নিচে বিলাইর বাচ্চা পোষে’, শুনাইয়া-শুনাইয়া এই ধরনের আশালীন রসিকতাও করিত। অপেক্ষাকৃত মুখপোড়া লোকেরা বলাবলি করিত, ‘অঙ্গবিশেষ বড় হইয়া যাওয়াতেই ফরাযীরা কাছা দিতে পারে না।’

এসব ত গেল মৌখিক যুলুম। এর উপর ছিল শারীরিক যুলুম। এই যুলুমের সুপ্রচলিত একটা ট্যাকটিকস ছিল এইরূপ : খুব লম্বা সরু বাঁশের আগায় কলকাঠি বাধিয়া লোকেরা রাস্তার ধারের ঝোপে-জঙ্গলে বসিয়া থাকিত। কোনো তহবন্দ-পরা ফরাযী ঐ রাস্তায় চলিবার সময় পিছন হইতে ঐ কলকাঠি তহবন্দের নিচের পারে আটকাইয়া হেঁচকা টান মারা হইত। তাতে ফরাযী সাহেব একেবারে উলঙ্গ হইয়া পরিতেন। দুষ্কৃতকারীরা অট্টহাস্য করিতে করিতে জঙ্গলে লুকাইয়া পড়িত। এসব কথা গ্রামের মাতব্বরদের কানে গেলে তারা বলিতেন যে দুষ্ট ছেলেরাই এসব অন্যায় কাজ করিয়া থাকে, তাদেরে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হইবে। কিন্তু কোনো দুষ্ট ছেলেই শাস্তি পাইত না। কাজেই বুঝা যাইত, তলে তলে মুরুব্বিদের সমর্থনেই দুষ্ট ছেলেরা এসব দুষ্টামি করিতেছে। স্বয়ং আছরউদ্দিন ফরাযী সাহেবকেও অনেক সময় এসব যুলুমের শিকার হইতে হইয়াছে। কাজেই ফরাযীরা সাবধানতা হিসাবে কোমরে গিরো দিয়া তহবন্দ পরিতে লাগিলেন। গিরো দিয়া তহবন্দ পরায় অতঃপর উলঙ্গ হইয়া পড়ার লজ্জা হইতে তাঁরা রক্ষা পাইলেন বটে কিন্তু কলকাঠির টানে তাদের তহবন্দ ফাঁড়িয়া যাইতে লাগিল। এতেই বোধ হয় দুষ্কৃতকারীদের প্রাণে দয়া হইল। কারণ ফরাযীদের লজ্জা দিয়া তহবন্দ ছাড়ানোই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। তহবন্দ ছিঁড়িয়া তাঁদের লোকসান করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।

.

. গাজী সাহেবের প্রত্যাবর্তন

দাদাজীর বয়স তখন চল্লিশের কাছাকাছি। সেটা গদর বা সিপাহী বিদ্রোহের মুদ্দত। ঐ সময়ে একদিন গ্রামের উত্তরপাড়ার কয়েকজন তোক একটি কাবুলি পোশাক পরা লোককে আমাদের বাড়িতে নিয়া আসেন। উনিই দাদাজীর বড় ভাই আশেক উল্লা সাহেব। প্রায় ত্রিশ বৎসর আগে তিনি দেশ ছাড়িয়াছিলেন। এই ত্রিশ বৎসরে তিনি কোনো প্রকার চিঠিপত্র বা খবর-বার্তা দেন নাই। গিয়াছিলেন সবেমাত্র দাড়ি-গোঁফ-গজানো তরুণ। আসিয়াছেন কাঁচা-পাকা চাপ দাড়িওয়ালা আধবুড়া মানুষ। কাজেই বড় ভাইকে চিনা দাদাজীর পক্ষে কঠিন হইয়াছিল। সঙ্গে আসা লোকজনেরা যা বলিয়াছিলেন তা এই : ঐ কাবুলি মার্কা লোকটাকে তাঁরা তাঁদের বাড়ির আশপাশে ঘোরাফেরা করিতে দেখেন। কৌতূহলী হইয়া তাঁরা কাছে যাইয়া পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। লোকটি দুর্বোধ্য ভাষায় যা বলেন, সেসব কথার মধ্যে আছরউদ্দিন, আরমান উল্লা, আশেক উল্লা এই তিনটি নাম তাঁরা বুঝিতে পারেন। তাতেই পাড়ার মুরুব্বিদের মনে পড়ে আছরউদ্দিন ফরাযীর জেহাদে যাওয়া ছেলের কথা। আছরউদ্দিন ফরাযীর বড় ছেলে জেহাদে গিয়াছেন, এ কথা এই অঞ্চলে বয়োজ্যেষ্ঠ সকলেরই জানা ছিল। তিনি যখন জেহাদে যান, তখন আছরউদ্দিন ফরাযী সাহেবের বাড়ি উত্তরপাড়া মৌযাতেই ছিল। তারপর তিনি দক্ষিণ দিকে প্রায় আধমাইল দূরে অন্য মৌযায় আসিয়া বাড়ি করেন। এটাই আমাদের বর্তমান বাড়ি। আশেক উল্লা সাহেব স্বভাবতই তা জানিতেন না। সুদূর অতীত বাল্যের স্মৃতির বলেই তিনি সাবেক পৈতৃক ভিটাতে নিজেদের বাড়ি তালাশ করিতেছিলেন।

ইতিমধ্যে আছরউদ্দিন ফরাযী নিজে, তাঁর স্ত্রী এবং দ্বিতীয় পুত্র আরজ উল্লা এন্তেকাল করিয়াছেন। আরজ উল্লা বিবাহের আগেই মারা যান। কাজেই এই সময় ফরাযী বাড়িতে কেবল আমার দাদা আরমান উল্লা, তার স্ত্রী বিবি মহরম, আয়েযুননেছা নামে আট-দশ বছরের এক মেয়ে এবং আবদুর রহিম নামে দুই-এক বছরের একটি ছেলে। বহুদিন পরে পাওয়া বড় ভাইকে আমার দাদাজী আরমান উল্লা অতি আদরে গ্রহণ করিলেন। প্রতিবেশীদের সহায়তায় বাড়ির ভিতরে তার থাকিবার ঘর করিয়া দিলেন।

আশেক উল্লা সাহেব প্রায় ত্রিশ-বত্রিশ বছর বিদেশ থাকিয়া মাতৃভাষা একরকম ভুলিয়াই গিয়াছিলেন। শোনা যায়, তিনি আরবি-ফারসি-উর্দুতে খুব ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু দাদাজীর নিকট হইতে এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য খবর সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না। দাদাজী নিজে লেখাপড়া জানিতেন না। আমাদের এক আত্মীয় ছিলেন কারী ময়েযুদ্দিন সাহেব। তিনি গাজী সাহেবের সাথে অনেক দিন কাটাইয়াছিলেন। তাঁর মুখে শুনিয়াছি, তিনি গাজী সাহেবের নিত্য সহচর ছিলেন। ধানীখোলা গ্রামের মৈশাটিকি মৌযার মুনশী আজিম উদ্দিন সাহেবও একজন আলেম ছিলেন। তিনিও গাজী সাহেবের অন্যতম সহচর ছিলেন। পারতপক্ষে কারী সাহেব ও মুনশী সাহেবকে সঙ্গে না লইয়া গাজী সাহেব কোথাও সভা করিতে বা বেড়াইতে যাইতেন না। এই কারী সাহেব আমাদের কাছে বলিয়াছেন, গাজী সাহেব আরবি-ফারসি-হিন্দিতে খুব লিয়াকত রাখিতেন। হিন্দি মানে এখানে উর্দু। বর্তমানে আমরা যাকে উর্দু বলি, আমাদের ছেলেবেলায় তাকেই হিন্দি বলা হইত। আমি যখন ছেলেবেলা আমাদের বাড়ির মাদ্রাসায় চাচাজীর কাছে এবং পরে অন্যান্য মৌলবীর কাছে রাহে-নাজাত, তিফতাহুল জান্নাত, ফেকায়ে মোহাম্মদী, দুরাতুন নাসেহীন ইত্যাদি উর্দু কেতাব পড়িতাম, তখনও ঐসব কেতাবকে উস্তাদজিরা হিন্দি কিতাব বলিতেন। মাদ্রাসা ছাড়িয়া যখন মাইনর স্কুলে ইংরাজি পড়া শুরু করি, তখনও আমাদের ক্লাসে অপশনাল বিষয় হিসাবে একটি পুস্তিকা পাঠ্য করা হয়। তার নাম ছিল উর্দু কি পহেলি কিতাব। হিন্দিকে উর্দু বলিতে এই প্রথম শুনি। পুস্তকে উর্দু লেখা থাকিলেও মাস্টার ছাত্র সবাই ওটাকে হিন্দি ক্লাস বলিতাম।

যা হোক, কারী ময়েযুদ্দিন সাহেবের কাছে শুনিয়াছি যে গাজী সাহেব ফারসি ও হিন্দিতে পশ্চিমে চিঠিপত্র লিখিতেন। সেসব চিঠিপত্র অবশ্যই ডাকে যাওয়া আসা করিত না। লোক মারফত যাওয়া-আসা করিত। মোজাহিদদের এ অঞ্চলে যাতায়াত ছিল। প্রধানত গাজী সাহেবের সাথে সলা-পরামর্শ করিতেই তাঁরা আসিতেন। এঁদের অধিকাংশই পাটনা, কলিকাতা, মালদহ, এমনকি লাহোর, লাখনৌ হইতেও আসিতেন। কথাবার্তা, দেখা-সাক্ষাৎ খুব গোপনেই হইত। কারী সাহেব ও দাদাজীর মতে ঐ সময় কলিকাতা, মালদহ ও রাজশাহীতে কোনো কোনো মোজাহিদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা চলিতেছিল। অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরওয়ানাও ছিল কি না তা দাদাজী বা কারী সাহেব বলিতে পারিতেন না। তবে কারী সাহেব বলিতেন, গাজী সাহেবের মোজাহেদি নাম ছিল মওলানা শিহাবুদ্দিন। ঐ নামেই গাজী সাহেবের নামে পত্রাদি আসিত। গাজী সাহেবের মত সব মোজাহেদিদেরই একটি করিয়া ফী নাম (ছদ্মনাম) ছিল। তথাপি গাজী সাহেব কাউকে কিছু না বলিয়া হঠাৎ গায়েব হইয়া যাইতেন। সপ্তাহ, মাস এমনকি কখনো-কখনো দুমাস, ছমাস পরে আবার বাড়ি ফিরিতেন। এমন চলিয়াছিল দশ-বার বছর। জীবনের শেষ দিনতক গাজী সাহেবকে সপ্তাহে একবার থানায় হাজিরা দিতে হইত। আমাদের থানা ছিল তখন কোতোয়ালি। তখনও ত্রিশাল থানা হয় নাই। গাজী সাহেব দশ মাইল রাস্তা হাঁটিয়া কোতোয়ালি হাজিরা দিতে যাইতেন। ভাষার জন্য প্রথম দিকে কিছুদিন তাঁর অসুবিধা হইলেও তা থাকে নাই। আঠার বছরের কওয়া মাতৃভাষা মানুষ ত্রিশ বছরেও ভুলিয়া যাইতে পারে না। অতি অল্প দিনেই গাজী সাহেব মাতৃভাষায় দখল পুনরায় ফিরিয়া পাইলেন। তখন হইতেই তিনি লোকজনের সাথে পুনরায় মিলা-মিশা করিতে লাগিলেন।

.

. গাজী সাহেবের তবলিগ

অল্প দিনেই গাজী সাহেবের অনেক শিষ্য-শাগরেদ জুটিয়া গেল। এদেরে সঙ্গে লইয়া তিনি শরা জারিতে লাগিয়া গেলেন। তিনি জেহাদে যাইবার সময় শরা জারি সম্বন্ধে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখিয়া গিয়াছিলেন, তার কিছুই তিনি দেখিতেছেন না বলিয়া আফসোস করিতেন। কারী ময়েযুদ্দিন ছাড়া গাজী সাহেবের আরো দুইজন নিত্য সহচরের সঙ্গে আলাপ করিবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছিল। এঁদের মধ্যে একজন আমার দূর সম্পর্কের নানা মুনশী ওয়ালী মাহমুদ মির্যা। আরেকজন আমাদের নিকট প্রতিবেশী ইব্রাহিম শেখ। মির‍্যা সাহেব গাজী সাহেবের তালবিলিম’ হিসাবে তার সাথে-সাথে ঘুরিতেন। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের বাড়ির মসজিদের ইমাম ছিলেন। আর ইব্রাহিম শেখ ছিলেন গাজী সাহেবের অতিশয় প্রিয়পাত্র দেহরক্ষী। কিশোর ইব্রাহিম শেখ পুরা ছয় ফুট উঁচা বিশালকায় জোয়ান ছিলেন। গায়ে ছিল তাঁর পাঁচজনের শক্তি। আমাদের আমলে এই ইব্রাহিম শেখ দস্তুরমত বুড়া হইয়া গিয়াছেন। তবু তার বিশাল কায়া দেখিলে ও তাঁর বুলন্দ আওয়াজ শুনিলে ভয় হইত। গ্রামে কথা চলতি ছিল যে, ইব্রাহিম শেখকে দেখিলে ভূতেও ডরায়। এই ইব্রাহিম শেখের মুখে আমরা গাজী সাহেবের প্রাত্যহিক জীবনের অনেক চাক্ষুষ বিবরণী শুনিয়াছি। আমার দাদাজী, কারী ময়েযুদ্দিন, নানা ওয়ালী মাহমুদ মির‍্যা এবং ইব্রাহিম শেখের নিকট যা-যা শুনিয়াছি তার সংক্ষিপ্তসার এই :

গাজী সাহেব তহবন্দ নিয়া বেশি মাথা ঘামাইতেন না। কারণ নিজে তিনি পাজামা পরিয়া থাকিতেন। আর তত দিনে লোকেরার তহবন্দ-বিদ্বেষ অনেকটা কমিয়া গিয়াছে। অনেকেই জুম্মার বা ঈদের দিনে বাড়ি হইতে তহবন্দ পরিয়া রওনা হন। অবশ্য কিছু লোক কাছা দিয়াই মসজিদে বা ঈদের জামাতে আসিত এবং এখানে অযু করার আগে বা পরে কাছা খুলিয়া তহবন্দ পরিত। তেমন লোক আজও আছে। আজকাল যেমন টুপি-ছাড়া নামাজিরা জমাতে শামিল হইয়া কাতারে দাঁড়াইয়া পকেট হইতে কিশতি টুপি বা রুমাল বাহির করিয়া তাহাই মাথায় চড়ান, তেমনি তৎকালে অনেক লোক কাতারে দাঁড়াইবার পর কাছা খুলিয়া মুছুল্লি হইতেন।

যা হোক, গাজী সাহেব তহবন্দ ফেলিয়া গান-বাজনার উপরই হামলা চালাইলেন বেশি। আছরউদ্দিন ফরাযী সাহেবের আমলে শরা কবুলের শর্ত ছিল চারটি : (১) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়িতে হইবে, (২) রোযায় চোঙা ব্যবহার চলিবে না (৩) কাছা দিয়া কাপড় পরিতে পারিবে না, (৪) গান বাজনা বন্ধ করিতে হইবে।

এসবের মধ্যে গাজী সাহেব গান-বাজনা বন্ধের দিকেই অধিকতর দৃষ্টি দিলেন। ওয়াযের মহফিলে ছাড়া বাড়ি-বাড়ি ঘুরিয়াও তিনি গান-বাজনার কুফল বর্ণনা করিতেন। কিছুকাল প্রচারের পরেও যারা গান-বাজনা ছাড়িল না, তাদের উপর গাজী সাহেব বল প্রয়োগ করিতে লাগিলেন। যারা ঢোল ডগর বিক্রয় করিয়া ফেলিতে দেরি করিল, গাজী সাহেব লাঠি দিয়া পিটাইয়া তাদের ঢোল-ডগর ভাঙ্গিয়া গুড়া-গুঁড়া করিয়া ফেলিতে লাগিলেন। গাজী সাহেবের ভয়ে যারা দিনের বেলায় বা নিজ বাড়িতে গান-বাজনা করিত না, তারা গভীর রাতে মাঠে-জঙ্গলে বসিয়া গান-বাজনা করিতে লাগিল। এই ধরনের লোকের বাদ্যযন্ত্র তালাশ করিতে গিয়া গাজী সাহেব এদের বাড়িতে ঢুকিয়া পড়িতেন। এ কাজ করিতে গিয়া গাজী সাহেব দু’একবার শারীরিক বিপদের সামনে পড়িয়াছেন। সন্দেহজনক লোকের বাড়িতে গিয়া প্রথমে পুরুষ মুরুব্বিদেরে এবং অন্দরে ঢুকিয়া মেয়েদেরে বাদ্যযন্ত্রের কথা পুছ করিতেন। পরিবারের অপরাধীকে ধরাইয়া দিতে স্বভাবতই কেউ রাজি ছিল না। বরঞ্চ ঐ পরিবারের একাধিক লোকই গান-বাজনা করিয়া থাকে। কাজেই। সকলেই একবাক্যে মিছা কথা বলিত। ঐ বাড়িতে বাদ্যযন্ত্র থাকার কথা মুখ পুঁছিয়া না করিত। কিন্তু গাজী সাহেব ত আর নিজের কানকে অবিশ্বাস করিতে পারেন না। তিনি গভীর রাত্রে ঐ বাড়িতেই বাজনার আওয়াজ নিজ কানে শুনিয়াছেন যে। কাজেই গাজী সাহেব বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়া ঘরে-ঘরে আনাচে-কানাচে উগারের উপর-নিচে ও ডুলি-ডালায় বাদ্যযন্ত্রের তালাশ করিতেন। এক-আধটা বাদ্যযন্ত্র পাওয়া গেলে আর রক্ষা ছিল না। সঙ্গীগণকে ঐ বাদ্যযন্ত্র ভাঙ্গিবার আদেশ দিয়া গাজী সাহেব বাড়ির লোকদের হেদায়েত করিতে লাগিতেন। ভাঙার কাজে কোনোরূপ শৈথিল্য, বিলম্ব অথবা অসম্পূর্ণতা দেখিলে গাজী সাহেব নিজের হাতের লাঠি দিয়া বাদ্যযন্ত্র ভাঙ্গিতে শুরু করিতেন। বাদ্যযন্ত্রকে বাদকেরা যে প্রাণের চেয়েও ভালবাসে, সে জ্ঞান। গাজী সাহেবের ছিল না। নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় বাদ্যযন্ত্র ভাঙ্গিতে দেখিয়া দু’একবার দু’এক তরুণ যুবক আত্ম-সম্বরণ করিতে পারে নাই। বেহুঁশ হইয়া গাজী সাহেবকে তারা আক্রমণ করিতে আসিয়াছে। উপস্থিত লোকজন গাজী সাহেবকে রক্ষা করিয়াছে। নইলে দু-একবার তিনি নিশ্চয়ই আহত হইতেন।

.

. গাজী সাহেবের জনপ্রিয়তা

শরা-শরিয়ত সম্বন্ধে গাজী সাহেব এমন কড়া, সুতরাং আন-পপুলার হওয়া সত্ত্বেও অন্য দুই-একটি কারণে তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি গ্রামের যুবকদেরে কুস্তি-কসরত ও লাঠি-তলওয়ার খেলা শিখাইতেন। লাঠি ও তলওয়ার খেলার একটা উস্তাদির নমুনা ছিল এইরূপ :

গাজী সাহেব লাঠি বা তলওয়ার হাতে এক জায়গায় দাঁড়াইতেন। তাঁর চারপাশে আট-দশ হাত দূরে-দূরে চারজন লোক দাঁড়াইত। তাদের এক-এক জনের কাছে এক-এক ধামা বেগুন। চারদিক ঘিরিয়া পাঁচ গাঁয়ের লোক ভিড় করিয়া তামাশা দেখিত। ধামাওয়ালা চারজন লোক ক্ষিপ্ত হস্তে একযোগে গাজী সাহেবের মাথা হইতে কোমরের উপর পর্যন্ত শরীর সই করিয়া বেগুন ছুড়িতে থাকিত। গাজী সাহেব কখনও শুধু লাঠি বা শুধু তলওয়ার, কখনো বা এক হাতে লাঠি এক হাতে তলওয়ার লইয়া একই জায়গায় দাঁড়াইয়া চরকির মত ঘুরিতেন এবং লাঠি বা তলওয়ার অথবা লাঠি ও তলওয়ার ঘুরাইতেন। দর্শকেরা বিস্ময়ে দেখিত, একটি বেগুনও গাজী সাহেবের গায়ে লাগে নাই। লাঠি বা তলওয়ারে ঠেকিয়া বেগুনগুলি মাটিতে পড়িয়া যাইত। ধামাওয়ালাদের ধামার বেগুন শেষ হইলে গাজী সাহেব তার হাতের লাঠি বা তলওয়ার ঘুরানো বন্ধ করিতেন। তখন সকলে মিলিয়া একটা-একটা করিয়া দেখিত যে তলওয়ারে লাগা বেগুনগুলি সব দুই টুকরা হইয়া গিয়াছে, আর লাঠিতে লাগা বেগুনগুলিতে লাঠির দাগ পড়িয়াছে। এইরূপ উস্তাদির জন্য জনসাধারণের কাছে, বিশেষত যুবকদের কাছে, গাজী সাহেবের জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল। গাজী সাহেবের হুকুমে জান দিবার জন্য তৈয়ার ছিল গাঁয়ের শত-শত যুবক। কিছুকাল পরে পুলিশ নাকি তলওয়ার খেলা নিষিদ্ধ করিয়া দেয়। কাজেই গাজী সাহেব আর তলওয়ার ব্যবহার করিতেন না। শুধু লাঠি খেলিয়া এই উস্তাদি দেখাইতেন। তলওয়ারের জন্য পীড়াপীড়ি করিলে গাজী সাহেব অগত্যা রাম। দাও দিয়া সে খেলা দেখাইতেন। কিন্তু তাতে দর্শকদের মন ভরিত না।

শাগরেদদের ও স্থানীয় যুবকদের কাছে গাজী সাহেবের জনপ্রিয়তার আরো অনেক কারণ ছিল। তারা বিশ্বাস করিতেন, গাজী সাহেব জিন-পরি পালিতেন। তাঁদের মধ্যে আমার ছেলেবেলায় যাঁরা বাঁচিয়াছিলেন, তাঁদের অনেকেই নিজের চক্ষের দেখা বলিয়া অনেক নজির দিতেন। এঁদের মধ্যে পূর্ব-বর্ণিত কারী ময়েযুদ্দিন সাহেব, আমার দূর সম্পর্কের এক দাদা রমজান আলী শাহ ফকীর, আমার দূর সম্পর্কের এক নানা পূর্ব-বর্ণিত ওয়ালী মাহমুদ মির্যা, আমাদের নিকট প্রতিবেশী বাবুজান শেখ, শরাফত শেখ ও পূর্ব-বর্ণিত ইব্রাহিম শেখ প্রভৃতি আরো অনেকে এই ধরনের মাযেজার সাক্ষ্য দিতেন। কোনো দিন পথ চলিতে-চলিতে গাজী সাহেব ওয়ালায়কুমুস সালাম বলিয়া থমকিয়া দাঁড়াইতেন এবং অদৃশ্য লোকের সাথে হাল-পুর্সি করিতেন। কথা শেষ করিয়া আসোলামু আলায়কুম বলিয়া আবার পথ চলিতে শুরু করিতেন। তা না করা পর্যন্ত সঙ্গী-সাথিরা কেউ কথা বলিতে পারিতেন না। আবার কোনো দিন সঙ্গী-সাথিদেরেও জিন দেখাইতেন। পথ চলিতে চলিতে হঠাৎ একটা বড় বটগাছতলায় দাঁড়াইয়া পড়িতেন। সঙ্গীদেরে বলিতেন, তোমরা যদি জিন দেখিতে চাও তবে এক-একজন গাছের একটি করিয়া পাতা একটানে ছিঁড়িয়া আনো। সকলে এক-একটা পাতা হাতে গাজী সাহেবের সামনে দাঁড়াইতেন। তিনি এক-এক করিয়া সকলের পাতায় শাহাদত আঙুল দিয়া কী যেন লিখিতেন ও ফুঁ দিতেন। যার তার পাতা যার তার হাতে ফিরাইয়া দিয়া বলিতেন, ‘এক ধ্যানে পাতার দিকে চাহিয়া থাকো, মনে মনে সোবহানাল্লাহ পড়িতে থাকো। সাবধান, আমার হুকুম না পাওয়া পর্যন্ত চোখ তুলিয়ো না বা অন্য দিকে নজর ফিরাইয়ো না।’ সকলে তা-ই করিতেন। কী তাজ্জব। সকলে দেখিতেন বিরাট ধুমধাম ও শান-শওকতের সাথে একটা নবাব-জমিদারের বিয়ার মিছিল যাইতেছে। সকলে অবাক বিস্ময়ে ঐ মিছিল দেখিতেছেন। অমন সময় গাজী সাহেব বলিয়া উঠেন, “তোমরা চোখ তোলো। সকলে দেখিলেন, চারিদিকে ফাঁকা। যে যেখানে দাঁড়াইয়া ছিলেন, সেখানেই দাঁড়াইয়া আছেন।

এসব কাহিনীর নির্ভরযোগ্য কোনো সাক্ষী পাওয়া যাইত না। যাকে আমরা জীবনে মিথ্যা বলিতে দেখি নাই, সেই দাদাজী আরমান উল্লা ফরাযী কখনো তার বড় ভাইয়ের এইসব মাযেজার সাক্ষ্য দিতেন না। দাদাজীর সত্যবাদিতারও আমি খুব বড় সাক্ষী নই। কারণ আমার বয়স যখন মাত্র ষোল বছর, সেই ১৯১৩ সালেই দাদাজী এন্তেকাল করেন। কিন্তু তার সমবয়সীরাও বলিতেন, দাদাজীকে মিথ্যা কথা বলিতে তারাও দেখেন নাই। দাদাজী খুব দৃঢ়তার সাথেই এই বলিয়া বড়াই করিতেন, ‘আমি জীবনে কোর্টে সাক্ষ্য দেই নাই। আমার ন পুস্তের মধ্যে কেউ দিয়াছেন বলিয়াও শুনি নাই। তারা সাক্ষ্য দিতেন না মানে মামলার কোনো পক্ষই তাঁদেরে সাক্ষী মানিত না। দাদাজী বলিতেন, কথাটা সত্যও, যে মামলার পক্ষেরা কেউ সত্য কথা বলিবার জন্য সাক্ষী মানে না। যার-তার পক্ষে কথা বলিবার জন্যই মানে। যা হোক, আমার দাদাজী গাজী সাহেবের উপরিউক্ত মাযেজার একটাও সাক্ষী ছিলেন না। অন্য লোকের মুখে শুনিয়া দাদাজীকে জেরা করিলে তিনি বলিতেন, তিনি নিজে ও সব কিছু দেখেন নাই। বড় ভাইয়ের বুযুৰ্গির কোনো হানি না হয়, সে উদ্দেশ্যেই বোধ হয় বলিতেন, ‘আমি মিয়া ভাইর সাথে খুব কমই বেড়াইতে বাহির হইতাম।’

কিন্তু সাক্ষীদের সকলেই কমবেশি আলেম ছিলেন। প্রতিবেশী বুড়া মুরুব্বিদেরও অবিশ্বাস করিবার কোনো কারণ ছিল না। একমাত্র উক্ত শাহ রমজান আলী ফকির ছাড়া আর কেউই পীরগিরি ব্যবসাও করিতেন না। রমজান আলী শাহ ফকির সাহেব শুধু পীরগিরি ব্যবসাই করিতেন না; তিনি নিজেও জিন-পরি পালেন বলিয়া দাবি করিতেন। তিনি আমাদের বাড়িতে প্রায়ই মেহমান হইতেন, আমাদের কাছে বড়াই করিতেন, তার অধীনে এমন শক্তিশালী জিন আছে, যে তার হুকুমে পুকুরপাড়ের ঐ কাঁঠালগাছটা উখড়াইয়া ছুড়িয়া ঐ দূরে ফেলিয়া দিতে পারে। কিন্তু আমাদের হাজার আবদার অনুরোধেও তিনি কোনো দিন তাঁর জিন দিয়া কাঁঠালগাছ উখড়ান নাই।

জিন-পরি-ভূত-প্রেতে লোকেরা আজও বিশ্বাস করে। আগে আরো বেশি বিশ্বাস করিত। আগেকার জনসাধারণের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তার লেভেল বুঝাইবার উদ্দেশ্যেই গাজী সাহেব সম্বন্ধে ঐ সব কিংবদন্তির উল্লেখ করিলাম।

.

. গাজী সাহেবের বিবাহ ও সন্তানাদি

গাজী সাহেব ১৮/২০ বছর বয়সে ১৮২৭/২৮ সালে মোজাহেদ বাহিনীতে যোগ দেন। ত্রিশ-বত্রিশ বছর পরে প্রায় ১৮৬০ সালের কাছাকাছি কোনো এক সময়ে কমবেশি পঞ্চাশ বছরের বৃদ্ধ বাড়ি ফিরিয়া আসেন। আমার দাদাজী ও গাজী সাহেবসহ আমাদের পূর্বপুরুষেরা সবাই কৃষ্ণবর্ণ ছিলেন। কিন্তু সবাই আমারই মত লম্বা ছিলেন। পরিমাণমত মোটাসোটা, উঁচা-নাক, চাপ দাড়িওয়ালা ছিলেন। গাজী সাহেব ব্যায়ামবীর ও যোদ্ধা হওয়াতে তিনি দেখিতে আরো বলিষ্ঠ এবং সুপুরুষ ছিলেন। সেইজন্য ঐ পঞ্চাশ বছর বয়সেও তাকে বুড়া দেখাইত না। মাথার চুল ও দাড়ি-মোচে বেশ পাক ধরিয়াছিল বটে, তবে খুব কাছে না গেলে তা দেখাই যাইত না।

কাজেই স্বয়ং দাদাজী, আত্মীয়-স্বজন ও শিষ্য-শাগরেদরা সবাই ধরিলেন তাঁকে বিয়া করিয়া সংসারী হইতে। তিনি অনেক ওযর-আপত্তি দেখাইয়া, এমনকি নিরাপত্তার অনিশ্চয়তার দোহাই দিয়া, ঘন ঘন তাঁর আত্মগোপনের হেতুর দিকে ইশারা করিয়া অনেক দিন বিয়া ঠেকাইয়া রাখিলেন। আনুমানিক পাঁচ-ছয় বছর পরে তিনি বিয়া করিলেন। বিয়া করিলেন এক শাগরিদের মেয়েকে। তাঁর বাড়ি ছিল ফুলবাড়িয়া থানার পশ্চিম সীমান্তে বালাশর নামক গ্রামে। অন্তরঙ্গ শাগরিদরা ঠাট্টা করিয়া বলিতেন, শাহাদাঁতের পবিত্র ময়দানে বালাকুটের নামের সাথে এই গ্রামের মিল আছে বলিয়াই গাজী সাহেব সেখানে বিয়া করিতে রাজি হইয়াছেন।

যা হোক, ঘরে ভাবি আনিবার সঙ্গে সঙ্গেই দাদাজী পৈতৃক ভূসম্পত্তির (তত্ত্বালে প্রায় ২শ বিঘা) অর্ধেক ভাগ করিয়া বড় ভাইকে দিয়া দিলেন। সেই জমি চাষাবাদ করিবার জন্য ভাল-ভাল বর্গাদারও ঠিক করিয়া দিলেন তিনিই। গাজী সাহেবের থাকিবার জন্য দাদাজী আগেই ভাল একটি ঘর করিয়া দিয়াছিলেন। এখন পৃথক পাকঘরও বানাইয়া দিলেন। দাদাজীর নিজের দুই-তিন জোড়া হাল ও দরকারমত বছরিয়া কামলা ছিল। দাদাজী তাদের সঙ্গে লইয়া হাল-চাষাবাদ, গৃহস্থের সব কাজকর্ম নিজে করিতেন। কিন্তু গাজী সাহেব ঐসব কিছুই পারিতেন না বলিয়া সব জমি বর্গাপত্তন দিয়া দিলেন। কিন্তু গাজী সাহেব এর পরেও প্রায়শ কাউকে না বলিয়া নিরুদ্দেশ হইতেন বলিয়া গাজী সাহেবের সংসারের হাট-বাজারটাও দাদাজীকেই করিয়া দিতে হইত।

এই বিয়ার ঘরে প্রথমে ফাতেমা নাম্নী একটি মেয়ে হইল। কয়েক বছর পরে দ্বিতীয় প্রসবের সময় একটি পুত্রসন্তানসহ গাজী সাহেবের বিবি সাহেবও এন্তেকাল করিলেন। গাজী সাহেব দ্বিতীয়বার বিবাহ করিতে রাজি হইলেন না। ইতিমধ্যে দাদাজীর ঘরে যমিরুদ্দিন ও ছমিরুদ্দিন নামে আরো দুইটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করিলেন। গাজী সাহেব দ্বিতীয়বার বিয়া না করার আরো একটি যুক্তি পাইলেন। দাদাজীকে বলিলেন, খোদার রহমতে তোমারই যখন তিনটি পুত্র হইল তখন এরাই আমাদের খান্দানের নাম রাখিবে। আমার আবার বিয়ার দরকার নাই। দাদাজী ও আত্মীয়-স্বজনের উপরোধ এড়াইবার জন্যই যেন গাজী সাহেব এবার বেশ কিছুদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হইলেন।

গাজী সাহেব মাঝে-মাঝে নিরুদ্দেশ হইয়া কোথায় যান প্রায় সবাই তা অনুমান করিতে পারিতেন। কারণ অতীতে অনেকবার এমন ঘটিয়াছে। তাঁর যাওয়ার স্থান ছিল সাধারণত মোজাহেদ ভাইদের বাড়ি। দাদাজীর মুখে ছেলেবেলা এইসব মোজাহেদ ভাইদের নাম প্রায়ই শুনিয়াছি। এখন আর সকলের নাম-ঠিকানা মনে নাই। যে কয়জনের নাম মনে আছে, তাঁদের মধ্যে আটিয়া (বর্তমান টাঙ্গাইল) মহকুমার দেলদুয়ারের মৌ, ইব্রাহিম, আকালুর খোন্দকার যহিরুদ্দিন ও জামালপুর মহকুমার নূর আলী তরফদারের নাম মনে আছে। নূর আলী সাহেব জেহাদে শহীদ হইয়াছিলেন। কাজেই তিনি দেশে আর ফিরিয়া আসেন নাই। খোন্দকার যহিরুদ্দিন বোধ হয় পুলিশের ধাওয়ায় আকালু ত্যাগ করিয়া জামালপুরের বানেশ্বরদী গ্রামে চলিয়া আসেন এবং সেখানেই বিয়া-শাদি করিয়া বসবাস করিতে শুরু করেন। শহীদ নূর আলী সাহেবের এক পুত্র ছিলেন। তিনি তখন বিবাহ করিয়াছিলেন। কাজেই গাজী সাহেবের যাওয়ার স্থান ছিল আটিয়ার একটি : মৌ. ইব্রাহিমের বাড়ি, আর জামালপুরে দুইটি : খোন্দকার যহিরুদ্দিনের এবং নূর আলী তরফদারের বাড়ি। দাদাজী ও আত্মীয়েরা এসব জায়গায় খোঁজ করিতেন না, শুধু অনুমান করিতেন। তৎকালে খোঁজখবর লওয়ার ও যাতায়াতের মোটেই সুবিধা ছিল না। কিছুদিন নিরুদ্দেশ থাকিয়া গাজী সাহেবই ফিরিয়া আসিয়া এই সব ও অন্যান্য জায়গার নাম করিতেন।

বেশ কিছুদিন পরে এবার ফিরিয়া আসিলে দাদাজী ও আত্মীয়-স্বজনেরা একরূপ জোর করিয়া আমাদের পুরাতন আত্মীয় ফুলবাড়িয়া (বর্তমানে ত্রিশাল) থানার মাগুরজোড়া গ্রামের মৌ. আহসানুল্লাহ সাহেবের এক বোনের সাথে বিয়া দেন। গাজী সাহেবের এই বিয়া স্থায়ী হয়। এই ঘরে জাফর নামে একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। গাজী সাহেবের দেশ ভ্রমণের বাতিকও দূর হয়। গাজী সাহেব বিবাহিতা কন্যা ফাতেমা ও নাবালক পুত্র জাফর সাহেবকে রাখিয়া অনুমান ষাট বছর বয়সে এন্তেকাল করেন। তৎকালে বয়স আন্দাজ-অনুমান করিয়াই বলা হইত। তেমন অনুমানের কতকগুলি অবিস্মরণীয় ঘটনাকেই হিসাবের খুঁটি ধরা হইত। যেমন ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১২৭৬ সালের আকাল), গদর (সিপাহী বিদ্রোহ ইং ১৮৫৮ বাং ১২৬৫), বালাকুটের জেহাদ (বাং ১২৩৮ ইং ১৮৩১), তিতুমীরের লড়াই (১৮৩১ ইং) ইত্যাদি। দাদাজীর জন্মতারিখও এ ধরনে হিসাব করা হইত। কিন্তু আশ্চর্য এই যে বাপজী ও চাচাজীর কুষ্ঠি ছিল। দাদাজীর বন্ধু এক বামন ঠাকুর নাকি ঐ কুষ্ঠি তৈয়ার করিয়াছিলেন। চাচাজী নজ্রমিকে কুফরি বলিতেন। কিন্তু নিজের কুষ্ঠিটি তিনি ছিঁড়িয়া ফেলেন নাই। গণক ছাড়া কেউ কুষ্ঠি পড়িতে পারিতেন না। তবে জন্ম-মৃত্যুর সন বুঝা যাইত। কুষ্ঠি অনুসারে বাপজীর জন্ম ১২৬৫ সন ও চাচাজীর জন্ম ১২৭২ সন। বাপজী ১৩৪১ সালে ইং ১৯৩৪ সালে ৭৯ বৎসর বয়সে এন্তেকাল করেন। চাচাজী ৮৫ বৎসর বয়সে ১৩৫৭ সালে (ইং ১৯৫০) এন্তেকাল করেন। দাদাজীর কোনো কুষ্ঠি ছিল না। নিজের জন্মতারিখ তিনি বলিতে পারিতেন না। তবে তিনি তাঁর বয়স পঁচানব্বইর কাছাকাছি দাবি করিতেন। ১৯১৩ সালে এন্তেকালের সময় দাদাজী আমাদের অঞ্চলে সর্বজ্যেষ্ঠ বৃদ্ধ ছিলেন। গদরের (সিপাহী বিদ্রোহের) দুই-তিন বছর পর গাজী সাহেব যখন দেশে ফিরিয়া আসেন, তখন দাদাজীর বয়স প্রায় চল্লিশ ছিল, এ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। এই হিসাবে দেখা যায়, আমার পূর্বপুরুষের সকলেই মোটামুটি দীর্ঘায়ু ছিলেন। দাদাজী বলিতেন, তাঁর বাবা আছরউদ্দিন ফরাযী সাহেবও সত্তরের অধিক বয়সে মারা যান। আমার একমাত্র ফুফু আয়েযুননেসা দুইবার সন্তানহীন অবস্থায় বিধবা হওয়ার পর আর বিবাহ বসেন নাই এবং শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের বাড়িতেই থাকেন। তিনি কমবেশি তিরানব্বই বৎসর বয়সে ১৩৫০ সালে (ইং ১৯৪৩) এন্তেকাল করেন।

গাজী সাহেবের এন্তেকালের কয়েক বছর পরে তার একমাত্র পুত্র জাফর সাহেব নওগাঁ (আসাম) চলিয়া যান। দেশভাগ হওয়ার আগেত বছরে দু’বছরে একবার জাফর চাচা আমাদেরে দেখিতে আসিতেন। তিনি তখন খুব অবস্থাশালী মাতব্বর ‘গা বুড়ো’ ছিলেন। তিনি ইতিমধ্যে আসামেই এন্তেকাল করিয়াছেন বোধ হয় প্রায় আশি বছর বয়সে। আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য, দুই-একবার বড়দের জন্যও, এন্ডিমুগার কাপড় ও অন্যান্য উপহার আনিতেন। বর্তমানে (১৯৬২) তার ছেলেরা শিক্ষিত ও অবস্থাশীল ভারতীয় নাগরিক।

আছরউদ্দিন ফরাযী সাহেবের তিন পুত্র হওয়ার পর চতুর্থ সন্তান হয়। একটি মেয়ে। এই মেয়ে প্রসব করিয়াই আছরউদ্দিন সাহেবের বিবি এন্তেকাল করেন। আছরউদ্দিন সাহেব এর পরেও বহুদিন বাঁচিয়া ছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন নাই। নবজাত শিশুকন্যাকে তিনি তাঁর বিশেষ বন্ধু কাজীর শিমলা গ্রামের জানু খোন্দকার সাহেবের কাছে পোষ্য দেন। জানু খোন্দকার সাহেবের কোনো সন্তানাদি না থাকায় বন্ধুর মেয়েকে পোষ্য নিয়াছিলেন। কিন্তু পোয্য নেওয়ার কয়েক বছর পরেই তার এক পুত্রসন্তান। লাভ হয়। ইনিই কাজীর শিমলা গ্রামের খোন্দকার মিজানুর রহমান। জানু খোন্দকার সাহেব তার পালিত কন্যাকে যথাসময়ে নিজের আত্মীয়ের মধ্যে যোগ্য ঘরে পাবনা জিলার চৌহালী গ্রামের খোন্দকার বাড়িতে বিবাহ দেন। সেখানে আমার উক্ত দাদির এক পুত্র ও এক কন্যা হয়। পুত্র খোন্দকার আলাউদ্দীন আহমদ বিখ্যাত আলেম ও ম্যারেজ রেজিস্ট্রার ছিলেন। ভাইবোন উভয়েরই বংশধরেরা আজিও সুখে-সম্মানে বাঁচিয়া আছেন।

 

অধ্যায় দুই – জন্ম ও শৈশব

. জন্ম

বাংলা ১৩০৫ সালের ১৯ ভাদ্র (ইং ১৮৯৮, ৩ সেপ্টেম্বর) শনিবার ফযরের ওয়াতে আমার জন্ম। আমি বাপ-মার তৃতীয় সন্তান। আমাকে পেটে লইয়াই মা গুরুতর অসুখে পড়েন। সে রোগ দীঘস্থায়ী হয়। আমার জন্মের অনেক দিন পরে তিনি আরোগ্য লাভ করেন। কয়েক দিন স্থায়ী বেদনার পরে আমি ভূমিষ্ঠ হই এবং প্রসবের পরেই মা অজ্ঞান হইয়া পড়েন। আগের দুই প্রসবে মার কোনোই কষ্ট হয় নাই। কাজেই আমার প্রসবের সময়কার মার। এই কষ্ট ও এই অজ্ঞান হইয়া পড়াকে বাড়ির সকলে অশুভ লক্ষণ মনে। করেন। মা শ্বশুর-শাশুড়ির আদরের বউ ছিলেন। মার জন্য সকলে কান্নাকাটি জুড়িয়া দেন।

এদিকে দাই আমাকে প্রসব করাইয়া ঘোষণা করে যে মৃত সন্তান হইয়াছে। সাধারণ অবস্থায় দাইদের অমন কথায় কেউ বিশ্বাস করিতেন না। নিজ চক্ষে সন্তান দেখিবার জন্য সবাই উদ্বিগ্ন হইতেন। কিন্তু আদরের বড় বউয়ের মরা-বাঁচা লইয়া সবাই এত ব্যস্ত ছিলেন যে মরা সন্তান দেখিবার জন্য কেউ বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন নাই। কাজেই মরা সন্তানটিকে যথাসময়ে দাফন-কাফন করা সাপেক্ষে আমাকে একটি সুপারির খোলে ঢাকা হয় এবং বাইরে ফেলিয়া রাখিলে কাক-কুকুরে নিয়া যাইতে পারে বলিয়া ঘরের এক অন্ধকার কোণে রাখা হয়।

মেয়ের অন্তিম অবস্থায় খবর পাইয়া আমার নানা মেহের উল্লা ফরাযী আসেন মেয়েকে দেখিতে। নানাজী গৌরবর্ণ দীর্ঘাঙ্গ সুপুরুষ ছিলেন। তাঁর চাপদাড়ি ও সুউচ্চ বাঁশির মত নাকটা দেখিবার মত ছিল। নাকের আগাটা ময়না পাখির ঠোঁটের মত বাঁকা ছিল। নানার মুখে শুনিয়াছি তাঁর বাবা মহব্বত উল্লা ফরাযী আরো গৌরবর্ণ সুপুরুষ ছিলেন। তাঁর নাকটা নাকি আরো সুন্দর ছিল। যা হোক, নানাজী ছিলেন এ অঞ্চলে ডাকসাইটে ধানুরি (ধন্বন্তরি) কবিরাজ। তিনি মেয়েকে দেখিয়া-শুনিয়া এবং তয়-তদবিরের পরামর্শ দিয়া মরা নাতিটি দেখিতে চাহিলেন। তাঁকে ঘরের কোণে রাখা সুপারির খোলটি দেখাইয়া দেওয়া হইল। নানাজী সুপারির খোলটি খুলিয়া আমাকে দেখিলেন। নাড়ি ও বুক পরীক্ষা করিয়া ঘোষণা করিলেন, সন্তানের জান এখনও কবয হয় নাই, যত্ন-তালাফি করিলে এখনও বাঁচিবার আশা আছে। আমার দাদি নানাজীর কথায় দাইকে লইয়া তদবির-তালাফির কাজে লাগিলেন। নানাজীর কথামত কিছুক্ষণ তালাফি করিবার পরই আমি কাঁদিয়া উঠি। নানাজী আমার কানে কলেমা তৈয়ব বারবার আবৃত্তি করিতে লাগিলেন। বাড়িময় এবং শেষে পাড়াময় চাঞ্চল্য পড়িয়া যায়। নানাজীর প্রশংসায় দেশ ফাটিয়া যায়। তিনি জিন পালিতেন, এ ধারণা লোকের আগেই ছিল। এবার প্রমাণ হইল তিনি মরা মানুষও বাঁচাইতে পারেন। আমার জ্ঞান হইবার পরও বহুদিন দাদি-ফুফু-চাচি এই গল্প করিতেন। বলিবার সময় দাদির নিজের এবং আমার মারও চোখ পানিতে ছলছল করিয়া উঠিত। আমি নিজেও খুব পেট-কান্দুয়া ছিলাম, অর্থাৎ কথায়-কথায় কাঁদিয়া ফেলিতাম। আমিও ঐ গল্প শুনিয়া কাঁদিয়া ফেলিতাম। দাদি-ফুফু বা মা যাকে হাতের কাছে পাইতাম, তাঁরই কোলে মাথা লুকাইয়া ফ্যাক-ফ্যাক করিয়া কাঁদিতে থাকিতাম। মার কাছে ছিল এসবই শোনা কথা। কারণ, এসব ঘটনা ঘটিয়াছিল তাঁর অজ্ঞান অবস্থাতেই। তবু তিনি বহুবার ঐ শোনা কথা বহু মেয়েলোকের কাছে আবৃত্তি করিয়াছেন। আমি কাছে থাকিলে আমাকে বুকে জড়াইয়া বলিতেন, আল্লা আমার হারানো মানিক ফিরাইয়া দিয়াছে।

.

. স্বাস্থ্য ও ভাগ্য

আমার স্বাস্থ্য বরাবর খারাপ ছিল। প্রধান কারণ মার দুধ পাই নাই। আমার জন্মের পর পুরা এক বছর মা অসুস্থ থাকেন। গরুর দুধ ও ভিমটা কলাই ছিল আমার একমাত্র খাদ্য। বোধ হয় এ কারণেই আমার পেটের অসুখ সর্বদা লাগিয়াই থাকে। ফলে আমার শরীর স্বাভাবিক পুষ্টি লাভ করে নাই। দূর হইতে আমার বুকের ও পাঁজরার হাড়ি গোনা যাইত। হাত-পা লম্বা লম্বা শুকনা কাঠি আর মাথাটা ইয়া বড়। দাঁড়াইলে মনে হইত ঝাঁটার শলার আগায় একটা বেগুন গাঁথিয়া খাড়া করিয়া রাখা হইয়াছে। বস্তুত, এই উপমাটাও লোকজনের দেওয়া। এইরূপ স্বাস্থ্য ও জন্মের সময়কার ঐ অনৈসর্গিক ঘটনার জন্য আমার মুরুব্বিরা আমার জীবন সম্পর্কে সর্বদাই সন্ত্রস্ত থাকিতেন। তারা প্রায়ই বলিতেন, “এটা কি বাঁচিবে? মায়া বাড়াইয়া কোনো দিন না কোনো দিন আমাদেরে কান্দাইয়া চলিয়া যাইবে। মুরুব্বিদের এই সন্ত্রাস আরো বাড়াইবার জন্যই বোধ হয় আমার শরীরের উপর দিয়া ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটিয়া যাইত। মরিতে-মরিতে বাঁচিয়া উঠিতাম।

আমাদের অঞ্চলেও তৎকালে অনেক গণক ঠাকুর ছিলেন। বাপ-মা আদরের ছেলেপিলে দেখিলেই গণক ঠাকুরেরা যা যা বলিয়া থাকেন, আমার বেলায়ও তা-ই বলিলেন। তারা আমার হাত দেখিয়া বলিলেন, ছেলের কপালে রাজটিকা আছে। বাঁচিয়া থাকিলে এ ছেলে কোনো দিন দেশের রাজা হইবে। কিন্তু এর ভাগ্যে বড় বড় ফাড়া আছে। শান্তি-স্বস্ত্যয়ন করিলেই সেসব ফাড়া কাটিয়া যাইবে।

রাজভাগ্য ও ফাড়া গণকদের মুখে অবিচ্ছেদ্য। এটাই তাদের স্টক-ইন ট্রেড। কারণ, এ দুইটি কথায় কোনো বাপ-মার মন স্থির থাকিতে পারে? কোনো কৃপণ মা-বাবার টাকার থলির মুখ এর পরেও বন্ধ থাকিতে পারে? বলেন, গণক ঠাকুর ঐ যে কী বলিলেন ওটা করিতে কত খরচ লাগে? খরচ? খরচ আর এমন বেশি কী? একরূপ কিছুই লাগিবে না। কিন্তু ছেলেটার জন্ম শনিবারে কিনা। তাই শনি ও রাহু এই দুইজনে প্রতিযোগিতা করিয়া ছেলেটার অনিষ্ট করিবার চেষ্টা করিতেছে। কে কার আগে বেশি অনিষ্ট করিতে পারে? কাজেই দশ-বার টাকা লাগিয়া যাইবে। কঠিন স্বস্ত্যয়ন কিনা। আরেক গণক আসিয়া বলিলেন, দশ টাকা লাগিবে কেন? কোন গণক বলিয়াছে শনি এ ছেলের দুশমন? সে গণকই নয়। এ ছেলের জন্ম যখন শনিবারে তখন স্বয়ং শনিই এর রক্ষক: যেমন চোরের হেফাযতে ধন রাখা। যে চুরি করিবে সেই চোরই যদি হয় পাহারাদার, তবে সেটা চুরি হওয়ার সম্ভাবনা কোথায়? শনি এই ছেলের রক্ষক হওয়ায় স্বয়ং বৃহস্পতি এই ছেলের প্রতি অনুকম্পা করিবে। কাজেই এই ছেলে বিদ্যার সাগর ও বুদ্ধির রাজা হইবে। তবে যেসব ছোটখাটো গ্রহের কুদৃষ্টি আছে, সেগুলি কাটাইতে হইবেই। তাতে চার টাকার বেশি খরচ লাগিতে পারে না।

এই গণক ঠাকুরই ভাল। বুঝেও ভাল, অথচ সস্তাও। আমার দাদি, মা ও বাড়ির মেয়েদের সকলেরই ইচ্ছা হইত, সস্তায় আমার সব ফাড়া কাটাইয়া আমার রাজভাগ্যের আকাশটা একদম মেঘশূন্য করিয়া রাখিতে। তলে-তলে বাপজীরও সমর্থন ছিল। কিন্তু দাদাজী ও চাচাজীর জন্য কিছু করা সম্ভব ছিল না। তারা দুইজনই ছিলেন একদম পাক্কা ফরাযী। হাদিস-কোরআনের বাহিরে কোনো কথা বলা বা কাজ করা তাদের দ্বারা ত কল্পনাও করা যাইত না। অপরেও তাদের সামনে করিতে পারিতেন না। ফলে আমার জীবনের ফাড়াকাটাইবার জন্য গণকদের কথিত কোনো বেশরা কাজ হইল না বটে, তবে প্রচুর তাবিজ-কবচ দেওয়া হইতে লাগিল।

.

. রোগ ও চিকিৎসা

আমার দাদির মামু মফিজুদ্দিন আখন্দ ও খালাতো ভাই রমজান আলী শাহ ঝাড়-ফুঁক তুকতাক ও তাবিজ-কবচের ব্যবসা করিতেন। রমজান আলী শাহ জিন-পরি পালিতেন বলিয়া লোকের বিশ্বাস ছিল। এই দুইজনই একত্রে এবং পৃথক পৃথকভাবে আমাকে অনেক ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-কবচ দিয়াছেন। ঐ সব তাবিজ-কবচে কোনো কুফরি কালাম ইস্তেমাল করা হয় নাই, এই সম্পর্কে আমার মুরুব্বিরা নিশ্চিত হইয়া লইতেন। আখন্দ সাহেব বলিতেন, তিনি তাঁর তাবিজে কালামুল্লার আয়াত ও আরবি হরফ ছাড়া কিছু ব্যবহার করেন না। আর শাহ সাহেব? তিনি আখন্দ সাহেবের এক ডিগ্রি উপরে যাইতেন। তিনি দেখাইতেন যে তিনি বোখারার কাগজের উপর যাফরানের কালিতে যইতুন কাঠের কলমে তাবিজ লিখিয়া থাকেন। এঁরা দুইজনই ছিলেন হানাফি। কাজেই এরা পীর-মুরিদির ব্যবসা করিতেন। আমার মুরুব্বিরা মোহাম্মদী। পীর-মুরিদির তারা ঘোর বিরোধী। কাজেই একজন দাদাজীর মামাশ্বশুর ও আরেকজন শালা হওয়া সত্ত্বেও তাদের দেওয়া তাবিজ-কবচ সম্পর্কে এত সাবধানতা অবলম্বন করা হইত। তবু এই দুইজন মিলিয়া আমাকে এত তাবিজ-কবচ দিয়াছিলেন যে আমার গলা, কোমর ও দুই বাহুতে তিল ধারণের জায়গা থাকে নাই।

পেটের পীড়া ও হাড্ডিসার দেহ ছাড়া আমার আরো দুইটা বড় রোগ ছিল। আমার উপরিউক্ত দুইজন চিকিৎসক এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে, শেষোক্ত দুইটাই আমার আসল রোগ। প্রথমোক্ত দুইটা শেষোক্ত দুইটার কুফল মাত্র। আমার রোগ দুইটি ছিল এই : (১) আমি নিদ্ৰাচর বা সমনামবুলিস্ট ছিলাম। আমি ঘুমন্ত অবস্থায় বিছানা ছাড়িয়া উঠিয়া যাইতাম। বরাবর রাত্রেই এটা হইত। মাত্র দুইবার দিনের বেলা হইয়াছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় আমি বাড়ির বাহিরে অনেক দূরে চলিয়া যাইতাম। আমি শৈশবের শেষ পর্যন্ত বাপ-মার সাথে একই বিছানায় শুইতাম। আমাদের বাড়ির নিয়ম ছিল শুধু নবজাত শিশুই বাপ-মার বিছানায় থাকিতে পারিত। তার বড়রা দাদির ঘরে তার বিছানায় যাইত। এই হিসাবে আমার ছোট ভাইয়ের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই আমার দাদির বিছানায় যাওয়ার কথা। কিন্তু আমার বেলা তা হয় নাই। আমার ছোট ভাই ও বহিন এক-এক করিয়া বছরখানেক বয়সেই মার বিছানা ছাড়িয়া দাদির বিছানায় চলিয়া গেল। কিন্তু আমি মার কাছেই থাকিয়া গেলাম।

.

. নিদ্ৰাচর

আমার বাপ-মা দুজনই ঘুমে খুব হুশিয়ার ছিলেন। অর্থাৎ ঘুম তাদের খুব পাতলা ছিল। সামান্য শব্দেই তাদের ঘুম ভাঙ্গিয়া যাইত। তাছাড়া মা প্রায় সারা রাতেই নফল নামাজ ও অন্যান্য এবাদত করিয়া কাটাইতেন। কাজেই তাদের নিকট হইতে রাতে উঠিয়া যাওয়া খুবই কঠিন ছিল। তবু কেমন করিয়া না জানি, আমি তাদের পাশ হইতেই ঘুমের ঘোরে উঠিয়া যাইতাম। অবশ্য অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁরা টের পাইতেন। আমার খোঁজে তারা যে হৈচৈ শুরু করিতেন, তাতে সারা বাড়ির এমনকি পাড়ার লোক জাগিয়া উঠিত। লণ্ঠন, পাট সোলার বুন্দা, বাঁশের মশাল ইত্যাদি লইয়া চারদিকে আমার তালাশ করা হইত। সাধারণত বাড়ির আশপাশেই আমাকে পাওয়া যাইত। মাত্র দুইবার আমাকে বাড়ি থনে দূরে মাঠে পাওয়া গিয়াছিল। তালাশকারীরা দেখিয়াছেন, আমি জাগ্রত লোকের মতই সাবধানে পথ চলিতেছি। আঁকা-বাঁকা, উঁচা-নিচা, আইল-বাতরের কোথাও আমি হোঁচট খাইতেছি না। পুকুরাদি, জলাশয়ে না পড়িয়া সাবধানে ও-গুলির পাড় বাহিয়া চলিতেছি। এই অবস্থায় আমাকে ধরিয়া কোলে তুলিবার পরই আবার ঘুম ভাঙ্গিত। তখনই আমি কান্নাকাটি শুরু করিতাম।

এইভাবে বেশ কিছুকাল যাওয়ার পর বাড়ির সকলের উপদেশে বাপজীর ঘরের কেওয়াড়ে ভিতর থেকে শিকল লাগানো হইল। আমি ছেলেমানুষ। খুব সকাল-সকাল ঘুমাইয়া পড়িতাম। বাবা-মা শোবার সময় দরজার শিকল লাগাইয়া শুইতেন। ঘুমন্ত অবস্থায় আমি শিকল খুলিয়া বাহির হইয়া যাইতাম। কপাটের উপরের চৌকাঠে লাগানো শিকল আমার মত শিশুর নাগালের বাহিরে। তবু সেটা আমি কীরূপে খুলিতাম, এটা সকলের বিস্ময় সৃষ্টি করিত। এ ঘটনায় আমার মুরুব্বিদের, আত্মীয়-স্বজনের ও পাড়া-প্রতিবেশীর মনে আর কিছুমাত্র সন্দেহ থাকিল না যে জিনের আছরেই আমি এসব কাজ করিতেছি। এরপর বাবা-মা পালা করিয়া রাত জাগিয়াছেন। তার মধ্যেও কোন ফাঁকে আমি বাহির হইয়া পড়িয়াছি। বাবা-মার কাছে পরে শুনিয়াছি, বসা অবস্থায়ও তারা যখনই এক-আধটু ঝিমাইয়াছেন, সেই ঝিমানের ফাঁকেই আমি আলগোছে বাহির হইয়া গিয়াছি।

দিনের বেলার একটি ঘটনা এইরূপ : সেদিন আমাদের বাড়িতে ছোটখাটো একটি মেহমানি। বাড়ির পুরুষেরা সবাই বাহির বাড়িতে মেহমানদেরে লইয়া ব্যস্ত। বাড়ির মেয়েরা সকলে রান্না-বাড়ায় অতিরিক্ত খাটুনির পর যোহরের প্রায় শেষ ওয়াতে কেউ গোসল করিতে, কেউ নামাজ পড়িতে ব্যস্ত। আমার খুবই ক্ষিধা পাওয়ায় মেহমানদের খাওয়ার আগেই মা আমাকে খাওয়াইয়া-দাওয়াইয়া ঘুম পাড়াইয়া ছিলেন। হঠাৎ দেখা গেল আমি ভিতর বাড়ির উঠানের কোণের নারিকেলগাছের অনেকখানি উঁচায় উঠিয়া দুই হাতে গাছটা জড়াইয়া ধরিয়া আছি। নারিকেল-সুপারিগাছে উঠিতে দুপায়ে জুড়োম দরকার হয়। কিন্তু আমি খালি পায়েই গাছে উঠিয়াছি। বিশ হাত উঁচা গাছের অর্ধেকের বেশি উঁচায় আমি উঠিয়াছি। সকলেই বুঝিলেন আমি ঘুমের ঘোরে গাছে উঠিয়াছি। এটাও তাঁরা বুঝিলেন হৈচৈ করিলেই আমার ঘুম ভাঙ্গিয়া যাইবে এবং হুঁশ হওয়া মাত্র আমি ভয় পাইয়া মাটিতে পড়িয়া যাইব। এবং মারা যাইব। সারিসুরি করিয়া বাহির বাড়িতে খবর পাঠানো হইল। বাড়ির ও আত্মীয়-স্বজনের অনেক পুরুষ মানুষ আসিলেন। চাকর-বাকরেরাও সকলে আসিল। জাল, খেতা, ফরাস, চাদর, চট যা জুটিল সব আনিয়া লোকজনেরা নারিকেলগাছ ঘেরিয়া এসব পাতিয়া ধরিলেন। একজন দক্ষ গাছ-বাওয়ালোক গাছে উঠিলেন। আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে তুলিয়া লইলেন। আমার ঘুম ছুটিতেই চিৎকার শুরু করিলাম। কিন্তু লোকটি আমাকে সবলে চাপিয়া ধরিয়া নিচে নামিয়া আসিলেন। সকলে আরামের নিশ্বাস ফেলিলেন। মা-দাদি তাঁরা খুশিতে কাঁদিয়া ফেলিলেন।

.

. ঘুমে চিৎকার

আমার দ্বিতীয় রোগটা ছিল ঘুম হইতে চিৎকার করিয়া উঠা। এই চিৎকার অনেকক্ষণ ধরিয়া চলিত। তেমন শীতের মধ্যেও ঘামে আমার সারা গা ও কাপড়-চোপড় ভিজিয়া যাইত। স্বপ্নে আমি ভয়াবহ কিছু একটা দেখিয়া ভয়ে কাঁদিয়া উঠিতাম। কিন্তু সেটা কী, গোছাইয়া বলিতে পারিতাম না। তখনও বুঝিতাম, এই বৃদ্ধ বয়সে আজও বুঝি, ব্যাপারটা শুধু অনুভব করিবার, বর্ণনা করিবার নয়। অনুভব করাটাও নিতান্ত আবছা-আবছা। আজও যতদূর মনে পড়ে, তাতে এইটুকু বলা যায়, গরু-মহিষের গাড়ির চাকার মত বড় লোহার একটা খুব ভারী চাকা ভনভন করিয়া ঘুরিতে-ঘুরিতে আমার কাছে আসিয়া আমার চোখ-মুখ ঝলসাইয়া দিত। কে যেন সবলে আমাকে সেই চাকায় উঠাইয়া দিত। আমাকে লইয়া সেই চাকা ঊর্ধ্ব দিকে বন্দুকের গুলির বেগে ছুটিতে থাকিত। তাতেই আমার শ্বাস বন্ধ হইয়া আসিত। আমি চিৎকার করিয়া উঠিতাম। কিন্তু সহজে সে স্বপ্ন ছুটিত না।

এই দুইটা রোগ আমার দশ-এগার বছর বয়স পর্যন্ত ছিল। বয়স হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই আমার এই রোগ সারিয়া থাকুক, আর চিকিৎসার ফলেই সারিয়া থাকুক, কৃতিত্ব সবটুকু পাইয়াছিলেন আমার দাদার মামাশ্বশুর মফিযুদ্দিন আখন্দ সাহেব। কারণ শেষ চিকিৎসা করিয়াছিলেন তিনি একা, অনেকবারই তিনি আমাকে তাবিজ-কবচ ও পানি-পড়া দিয়াছেন বটে কিন্তু সেটা তখন ছিল এজমালি। রমজান আলী শাহ সাহেব ছাড়া মাঝখানে ‘পাবনার মৌলবী’ নামক এক আলেম একাদিক্রমে তিন মাস আমাদের বাড়ি থাকিয়া আমার চিকিৎসা করিয়াছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকিয়া থাকেন এই আখন্দ সাহেব। তার শেষ চিকিৎসাটা ছিল এইরূপ : চারটি তাজা রক্তজবা ফুল যোগাড় করা হইল। চারটি নয়া মাটির টোফা কিনা হইল। আখন্দ সাহেব চারটি রক্তজবায় আরবি আয়াত পড়িয়া-পড়িয়া দশ-দশ বার ফুঁ দিলেন এবং আমার মাথায়, চোখ, মুখে ও বুকে ঐ ফুল ছুঁয়াইয়া মাটির টোফায় ভরিলেন। নিজ হাতে টোফার মুখে ভাল করিয়া লেপিয়া-পুঁছিয়া আমাদের বাড়ির চার কোণে চারটি টোফা পুতিলেন। টোফা পপাতা জায়গা চারটি নিজে সযত্নে লেপিয়া পুঁছিয়া দিলেন। এই সব লেপা-পোছার কাজেও আখন্দ সাহেব প্রতিবার হাত চালাইবার সময় এক-একটি আরবি শব্দ উচ্চারণ করিলেন। সারাক্ষণ তিনি আমাকে সঙ্গে সঙ্গে রাখিলেন। তাতেই এই সব খুঁটিনাটি আমার স্পষ্ট মনে আছে। লেপা-পৌঁছার পর তিনি আদেশ করিলেন ঐ চারটি জায়গা যেন কেউ, বিশেষ করিয়া আমি, কখনও পায়ে না মাড়াই।

মুরুব্বিদের কাছে শুনিয়াছি, এরপর আমি আর কোনো দিন ঘুমের ঘোরে হাঁটি নাই বা ঘুম হইতে চিৎকার করিয়া উঠি নাই।

.

. আকস্মিক দুর্ঘটনা

কিন্তু ইতিমধ্যে আমার শরীরের উপর দিয়া সাংঘাতিক বহু দুর্ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। তার মধ্যে বড়-বড় কয়টা এইরূপ :

(ক) প্রথম আঘাত পাইয়াছিলাম বাপজীর নিজের হাত হইতে। তিনি একদিন একটা কোদালের আছাড়ি লাগাইতেছিলেন। কোদাল-কুড়ালের আছাড়ি টাইট করিবার জন্য উল্টা দিক হইতে কাঠ বা বাঁশের কচি মারিতে হয়। বাবজি। এই কাজটিই করিতেছিলেন। আছাড়িটা লম্বা হওয়ায় তিনি দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া মুগুর পিটাইয়া কচি ঢুকাইতে ছিলেন। এক হাতে কোদাল ধরিয়া আরেক হাতে পিটাইতে ছিলেন। একটা বাড়ি বেকায়দায় পড়ায় হাত হইতে কোদালটা ছুটিয়া সবেগে উল্টা দিকে মাটিতে গিয়া পড়ে। আমি তখন মাত্র আড়াই বছরের শিশু। সবেমাত্র দৌড়িতে শিখিয়াছি। আমি হঠাৎ কোথা হইতে দৌড়িয়া বাপজীর কাছে আসিতেছিলাম। ঐ কোদাল আসিয়া পড়িল আমার মাথায়। আমি চিৎকার করিয়া মাটিতে পড়িয়া গেলাম। লহুতে আমার মাথা লাল হইয়া গেল। বাপজী হায় কী করিলাম’ বলিয়া আমাকে কোলে করিয়া বাড়িতে ঢুকিলেন। ভাগ্যিস আমার মাথায় কোদালটার মুখ না লাগিয়া এক পাশ লাগিয়াছিল। মুখ লাগিলে আমার কচি মাথা দুই ফালা হইয়া যাইত। সেটা না হওয়ায় ঐ বিপদেও সকলে সান্ত্বনা পাইলেন এবং আল্লার দরগায় শোকরিয়া জানাইতে লাগিলেন। আমার দাদি ও মা উভয়ের কাটা-ছেঁড়ার ধন্বন্তরি ঔষধ জানিতেন। সেটা পাড়াগাঁয়ে সহজলভ্য একটি গাছড়ার রস। সেই ঔষধ লাগাইয়া আমার মাথায় গালপাট্টা বাধিয়া দেওয়া হইল। এটা সারিতে প্রায় এক মাস লাগিয়াছিল। এই আঘাতের দাগ আজও আমার তালুতে বিদ্যমান রহিয়াছে।

(খ) করাতিরা একবার আমাদের একটা খুব বড় কড়াইগাছ কাটিয়াছিল। সেটা মাটিতে পড়িবার পর কুড়াল দিয়া ওটার ডাল ছাঁটা হইতেছিল। বহু লোক ভিড় করিয়া তামাশা দেখিতেছিল। সে তামেশগিরদের মধ্যে আমিও ছিলাম। তামেশগিররা সকলেই আমার চেয়ে বড় ও লম্বা। কাজেই তামেশগিরের মধ্যে আমি ডুবিয়াছিলাম। অথচ করাতিদের কুড়ালের কোপে একটা ডালের বড় একটা ধারালো টুকরা ভনভন করিয়া উড়িয়া সকল তামেশগিরদেরে ডিঙ্গাইয়া আমার মাথায় বিধিয়া পড়ে। আমি গুরুতররূপে। আহত হইয়া বেহুঁশ হইয়া পড়ি। ধরাধরি করিয়া বাড়িতে আনার অনেকক্ষণ পরে আমার হুঁশ হয়। এটা ঘটে আমার ছয়-সাত বছর বয়সে। এর দাগ আজ পর্যন্ত আমার কপালের দিকে মাথায় আছে।

(গ) তখন আমার বয়স নয়-দশ বছর। সে সময় আমাদের অঞ্চলে অবস্থাপন্ন সব গৃহস্থের বাড়িতেই এক বা একাধিক দৌড়ের ঘোড়া ছিল। শুকনা দিনে মোহররম পর্ব পড়িলে সেই পরবের দিনে অথবা হিন্দুদের চড়কের মেলার সময় পাঁচ গ্রামে ঘোড়দৌড় হইত। আমাদেরও একটা ঘোড়া থাকিত। দুই-এক বছর পর-পর ঘোড়া বদল করা হইত। খুব ছেলেবেলা হইতেই আমার ঘোড়া দৌড়াইবার শখ ছিল। স্কুল হইতে ফিরিবার পর বিকালে মাঠে ব্যাটবল (ক্রিকেট), ডাংগুটি বা কপাটি খেলিতাম। খেলা শেষ করিবার পর এবং মগরেবের নামাজের আগ পর্যন্ত আধঘণ্টা খানেক ঘোড়া দৌড়াইতাম। গ্রামের ঘোড়াওয়ালারাও এই সময় যার তার ঘোড়া লইয়া বাহির হইত। মাঝে মাঝেই একত্রে বাজি রাখিয়া বা আড়াআড়ি করিয়া ঘোড়া দৌড়াইতাম। ঘোড়-সওয়ারদের মধ্যে কিন্তু আমার মত অল্প বয়সের কেউ ছিল না। আমার একটা বিশেষ অভ্যাস ছিল এই যে, মাঠে ঘোড়া দৌড় শেষ করিয়া বাড়ি ফিরিবার পথে আমাদের পুকুরপাড় হইতে তিন-চার রশি দূরে থাকিতেই লাগাম ছাড়িয়া দিয়া ঘোড়র পেটে গোড়াতালি দিতাম। ঘোড়া পবনের বেগে লম্বী দৌড় দিত। আমি লম্বীর সাথে তাল রাখিয়া দুই হাতে তালি বাজাইয়া ঘোড়াকে শাবাশ দিতাম। টাল সামলাইবার জন্য দরকার হইলে এক-আধবার বাম হাতে ঘোড়ার বাক বা গদির ইলট ধরিতাম। টাল সামলাইয়া আবার ছাড়িয়া দিতাম। এটা রোজই করিতাম।

সেদিন দেরিতে বাহির হইয়াছিলাম। কাজেই ফিরিতেও দেরি হইল। বরাবর মগরেবের আযান শুনিয়াই ঘোড়া ফিরাইতাম। এবং মগরেবের জমাতে শামিল হইতাম। আমাদের বাড়ির মসজিদে তৎকালে মগরেব ও এশা এই দুই ওয়াক্তিয়া নামাজেও পাড়ার লোকেরা জমাতে শামিল হইত। সেদিন কিন্তু আযান শুনিয়াই ঘোড়া ফিরাইলাম না। যাই যাচ্ছি করিয়া আও দুই একটি চক্কর দিলাম। অবশেষে ঘাটতি পূরণের আশায় ঘোড়াটিকে বরাবরের চেয়ে তেজের লম্বী দৌড় দেওয়াইলাম। আমার গোড়াতালির জবাবে ঘোড়াটা পিছনের পা দিয়া বাতাসে একটি লাথি মারিয়া বাতাসের আগে ছুট দিল।

আমাদের পুকুরের পুব পাশের প্রশস্ত পাড়াটায় পাট লাড়িবার জন্য সারি সারি বাঁশের আড় বাঁধা ছিল। পাটের মওসুম শেষ হইয়াছে। কাজেই আড়গুলি খোলার সময় হইয়াছে। দুই-এক দিনের মধ্যে খোলা হইবে এই অবস্থা। এই আড়ের সারির মধ্যে দিয়াই প্রশস্ত যাতায়াতের রাস্তা। এই রাস্তা দিয়াই আমি বরাবর অনায়াসে ঘোড়া চালাইয়া থাকি। বাহির হইবার সময়ও এই রাস্তা দিয়াই ঘোড়া দৌড়াইয়া গিয়াছি। বরাত মন্দ। ইতিমধ্যে কোনো কারণে একটা আড়ের বাঁশের গিরো খুলিয়া বাঁশের আগাটা রাস্তার দিকে গলা বাড়াইয়া ছিল। বাঁশের আগাটা ছিল একদম কলম কাটা। অন্ধের মত ঘোড়া ছুটাইয়া যখন এই জায়গায় আসিলাম, তখন হঠাৎ আমার নজরে পড়িল বাশের এই কলমকাটা আগাটা তির বেগে আমার ডান দিকের গলা সোজা আসিতেছে। চক্ষের নিমেষে ওটা আমার গলা ভেদ করিয়া ফেলিবে। লাগাম আমার হাতে ছিল না। কাজেই ঘোড়া থামাইবার প্রশ্ন উঠে না। জৈবিক উৎপ্রেরণা বশে ডাক হাতে ঘোড়ার বাঁক ধরিয়া বাম হাতে বাঁশের আগাটা ঠেকাইবার চেষ্টা করিলাম। কিসে যে কী হইল কিছুই জানিতে পারিলাম না। পরে শুনিয়াছি এবং অনুমান করিয়াছি যে ঘোড়ার গতিবেগে আমার হাতের চাপে বাশের গোড়ার দিকে দুই-একটা গিঁরো ছিঁড়িয়া যায় এবং তাতে বাঁশের আগাটা নুইয়া পড়ে। ফলে বাঁশটা আমার গলায় বা বুকে বিঁধিয়া বাম উরুতে গভীর খাদ করিয়া এক দলা গোশত উল্টাইয়া বাঁ দিকে বাহির হইয়া যায়।

তখন বাহির বাড়িতে কোনো লোকজন ছিলেন না। সবাই মগরেবের নামাজ জমাতে পড়িতে ছিলেন। ঘোড়াটা প্রথমে টাটু দৌড়ে পরে দুগামা গতিতে বাহির বাড়ির উঠান পার হইয়া দেউড়ির ভিতর বাড়িতে প্রবেশ করে এবং সোজা উত্তরের ভিটির দাদাজীর ঘরের সামনে গিয়া দাঁড়ায়। দাদি তখন নামাজ শেষ করিয়া ওজিফা পড়িতেছিলেন। ঘোড়ার পায়ের আহট ও হ্রেষার আওয়াজ শুনিয়া তিনি তাড়াতাড়ি মোনাজাত সারিয়া বাইরে আসেন। তিনি দেখেন যে আমি ঘোড়ার পিঠে উপুড় হইয়া পড়িয়া আছি। আমার মাথা ঘোড়ার বাকের উপর শায়িত এবং দুই হাত দুই দিকে ঝুলিতেছে। আমার কাপড়-চোপড় ও ঘোড়ার শরীর বাহিয়া টপটপ করিয়া লহু পড়িতেছে। ঘোড়ার গদি লহুতে ভিজিয়া গিয়াছে। তিনি চিৎকার করিয়া বারান্দা হইতে নামিয়া আসিয়া আমাকে ধরেন। মা, ফুফু, চাচি সবাই যার-তার ঘরে নামাজ পড়িতেছিলেন। দাদির চিঙ্কারে আমার মা, চাচি, ফুফু ও চাকরানিরা দৌড়াদৌড়ি করিয়া আসেন। বাহির বাড়ি হইতে মুরুব্বিরা সকলে আসেন। আমাকে বেহুশ অবস্থায় ঘোড়া হইতে নামানো হয়। কান্নাকাটির মধ্যে আমার শুশ্রূষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। আমার হুঁশ হইতে রাত দুপুরের বেশি হইয়া গিয়াছিল। ততক্ষণে আমার গায়ে হাত-পুড়িয়া-যাওয়া জ্বর উঠিয়াছে। এই ঘা শুকাইতে আমার মাসাধিককাল সময় লাগিয়াছিল। বাঁ হাতের তলায় তিন ইঞ্চি লম্বা এক ইঞ্চি গভীর ক্ষত হইয়াছিল। এই সত্তর বছরে সেটা ছোট হইয়া এখন এক ইঞ্চি পরিমাণ দাগ আছে। বা উরাতের ঘাটা হইয়াছিল লম্বায় চার ইঞ্চি পাশে দুই ইঞ্চি ও গভীরে দেড় ইঞ্চি। সে ক্ষত শুকাইয়া এই সত্তর বছরেও দীঘে দেড় ইঞ্চি পাশে এক হইয়াছে। গভীরতাটা গোশতে ভরিয়া উঠিয়াছে বটে কিন্তু সিকি ইঞ্চির মত খাদ বা ডিপ্রেশন আজও রহিয়াছে।

এমনি ধরনের অপেক্ষাকৃত কম সাংঘাতিক আকস্মিক আঘাত যে আমি কত পাইয়াছি, তার লেখাযযাখা নাই। আমার শরীরে অনেক দাগই মিশিয়া গিয়াছে। যেগুলি মিলিয়া যায় নাই এবং মিলিবেও না এমন কাটা দাগের সংখ্যাই সতেরটা। যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিকদের মত শরীরের কাটা-ছেঁড়া জখমের সংখ্যা গনিয়া যদি জীবনযুদ্ধের বীরত্বের পরিমাপ করা হইত, তবে আমি বার বছর বয়সের আগেই বীরত্বের মেডেল পাইতাম। পরবর্তী জীবনে আমি যে অহিংস সংগ্রামের একটা পক্ষপাতী হইয়াছি, তার সাথে ছেলেবেলায় এত বেশি খুন-জখমের কোনো সম্পর্ক থাকিতে পারে বলিয়াই এই তুচ্ছ ঘটনাগুলির উল্লেখ করিলাম।

.

. শৈশবের কড়াকড়ি

কতকগুলি ব্যাপারে শৈশবে আমাদের সর্বক্ষণ সবাইকে খুবই কড়াকড়ির মধ্যে জীবনযাপন করিতে হইত। কড়াকড়িগুলি যে বাপ-দাদার আরোপিত কড়াকড়ি তা নয়; সামাজিক পরিবেশেই এই কড়াকড়ি আরোপ করিত। এক আধ ওয়াক্ত নামাজ কাযা করিবার উপায় ছিল না। স্কুলে, মাদ্রাসায়, রাস্তা ঘাটে, আত্মীয় বাড়িতে মেহমানিতে, কোথাও আমাদের এক ওয়াক্ত নামাজ তরক হইলে বেনামাজিরাও আমাদেরে তম্বিহ করিতেন। বলিতেন, তুমি ফরাযী বাড়ির ছেলে হইয়াও নামাজ তরক করিয়াছ? কী লজ্জার কথা! যিনি এই তম্বিহটা করিলেন, তিনি জীবনেও পশ্চিম দিকে আছাড় পাড়েন নাই। কিন্তু সে কথা বলিবার উপায় নাই। কারণ সর্বসম্মত জনমত এই যে আর কেহ নামাজ তরক করিলে কিছু আসে যায় না। আমরা ফরাযী বাড়ির নাবালক শিশুরা নামাজ তরক করিলেই সেটা হয় নিতান্ত অন্যায় কাজ।

নামাজ-রোযা সম্বন্ধে যা, গান-বাজনা সম্বন্ধেও তা-ই। আমাদের গ্রামে হিন্দু তালুকদার বাড়িতে, জমিদারের কাছারিতে, পাশের গ্রামের জমিদারবাড়িতে প্রতিবছর কত গান-বাজনা যাত্রা-থিয়েটার হইত। গ্রামসুদ্ধা লোক তাতে ভাঙ্গিয়া পড়িত। কিন্তু আমাদের মুরুব্বিরা কেউ তাতে যাইতেন না। এমনকি আমাদের বাড়ির পুরাতন বছরিয়া চাকরেরা পর্যন্ত ঐ সব গান বাজনা দেখিতে যাইত না। গ্রামের সমবয়সী বন্ধু, স্কুলের সহপাঠী কারো প্ররোচনায় যদি আমাদের ভাইদের কেউ দিনের বেলাও এক-আধবার এসব দেখিতে গিয়াছি, তবে ঐ সব গান-বাজনার উদ্যোক্তারাই আপত্তি করিয়াছেন। মুসলমান দর্শকেরা বলিয়াছেন, সর্বনাশ, ফরাযী বাড়ির ছেলে হইয়া তুমি গান শুনিতে আসিয়াছ? শিগগির পালাও। হিন্দু উদ্যোক্তারা বলিতেন, তোমরা ফরাযী, গান শোনা তোমাদের নিষেধ। তোমার মুরুব্বিরা জানিতে পারিলে আমাদের দোষ হইবে। তোমরাও শাস্তি পাইবে। ফলে অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছিল যে গ্রামের সমবয়সীরা, স্কুলের সহপাঠীরা, এমনকি স্বয়ং মাস্টার সাহেব, যখন সদলবলে যাত্রা-থিয়েটার দেখিতে যাইতেন, তখন আমিও আমরা তিন ভাই তাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া থাকিতাম।

এটা ত গেল হিন্দুদের আয়োজিত যাত্রা-থিয়েটারের কথা। এমন যে, মুসলমানের আয়োজিত মোহররমের লাঠি খেলা,–ও আমাদের বাড়িতে হইতে পারি না। আমার ছেলেবেলায় মোহররমের লাঠি খেলার প্রচলন বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। মোহররমের দশ দিন ঢাক-ঢোল, কাড়া নাকাড়া, শানাই, ক্ল্যারিওনেটের আওয়াজ রাতদিন পাড়া-গাঁয়ের আকাশ মুখরিত ও মাটি কম্পিত থাকিত। একই গ্রামের বিভিন্ন পাড়া হইতে এক একটি আখড়া বাহির হইত। তারা লাঠি, তলওয়ার (তলওয়ারের বদলা পাজন), সড়কি, বল্লম, চরকি, রামদা লইয়া চমৎকার অনেক সময় বুক কাঁপানো বিস্ময়কর, উস্তাদি খেলা দেখাইত; একাধিক আখড়ার মধ্যে। মোকাবিলা হইয়া গেলে ঐ সব আখড়ার নেতাদের মধ্যে ডুয়েল প্রতিযোগিতা হইত। এসব প্রতিযোগিতা দেখিবার জন্য বিপুল জনতার ভিড় হইত। মোহররমের লাঠি খেলাকে আমাদের ছেলেবেলা ‘লাকড়ি-বাড়ি’ বলা হইত।

এই খেলা দেখিবার জন্য আমি গ্রামের অন্যান্য প্রতিবেশীর বাড়িতে যাইতাম। কারণ আমাদের বাড়িতে ঐ খেলা হওয়া নিষেধ ছিল। সব আখড়ার লোকেরাই ‘বার্ষিকীর’ (বছরিয়া বখশিশ) জন্য আমাদের বাড়িতেও আসিত। কিন্তু আমাদের বাড়িতে আসিবার সময় অনেক দূর হইতেই বাদ্য বন্ধ করিয়া দিত। এতে আমাদের মনে বড়ই কষ্ট হইত। পাশের বাড়িতে ধুমধামের সাথে লাকড়ি-বাড়ি খেলা হইতেছে। বাড়ির লোকেরা ও তাদের ছেলেমেয়েরা নিজেদের ঘরের উসারা-বারান্দায় বসিয়া নিজেদের উঠানের মধ্যে খেলা দেখিতেছে, তাদের বাড়ির মেয়েছেলেরা ঘরের খিড়কি, দেউড়ি, বেড়ার ফাঁক দিয়া ঐসব সুন্দর-সুন্দর এবং মজার-মজার খেলা দেখিতেছে, অথচ আমাদের পরের বাড়ি গিয়া সে তামাশা দেখিতে হইতেছে; আর আমাদের বাড়ির মেয়েছেলেরা অমন ভাল-ভাল খেলা দেখিতে পারিতেছেন না, এটা আমার খুবই অপমানকর মনে হইত। ছেলেবেলার এই অপমানবোধটা খেলা-তামাশা দেখার আনন্দের ক্ষুধার চেয়ে কম তীব্র ছিল না। তাই সাহসে বুক বাঁধিয়া দাদাজীর কাছে যাইতাম। তিনিই ছিলেন আমার আবদারের বড় জায়গা। তাই তার কাছে আবদার করিতাম। তর্ক করিতাম। তাদেরই মুখে শোনা হাদিসের দোহাই দিয়া বলিতাম, লাঠিখেলা সুন্নত। আমার মনে পড়ে, আমার অনেক জিদাজিদিতে দাদাজী একবার বিনা-বাজনায় লাঠিখেলার অনুমতি দিয়াছিলেন। কিন্তু বাজনা ছাড়া খেলা জমে নাই। খেলওয়াড়রাও বেশিক্ষণ খেলা চালাইতে পারে নাই। অতঃপর বাদ্যের পক্ষেও তাঁদেরই মুখে শোনা হাদিসের দোহাই দিতাম। একতারা বাজনা যুদ্ধ-জেহাদের বাজনা। এই যুক্তির কোনো জবাব ছিল না। শেষ পর্যন্ত দাদাজী বলেন, আমার বাপের আমল হইতেই এই রেওয়াজ চলিয়া আসিতেছে। আমি সে রেওয়াজ তুলিয়া দিতে পারি না। বাবার আমলে বরঞ্চ এর চেয়ে কড়াকড়ি ছিল। আমাদের বাড়ি হইতে শোনা না যায় এমন দূরে বাজনা বন্ধ করিতে হইত। এখন অনেক ঘন ঘন বসতবাড়ি হইয়া যাওয়ায় সে নিয়ম একটু ঢিলা হইয়াছে। তোমাদের আমলে যা হয় করিয়ো। আমি যত দিন আছি এটা বদলানো যাইবে না।

দাদাজীর কাছে নিরাশ হইয়া বাপ-চাচার নিকট গেলাম। দাদাজীর মতের বিরুদ্ধে কিছু করিতে তারা রাজি হইলেন না। মুরুব্বিদের এই মনোভাবের সমর্থনে আমি কোনোই যুক্তি খুঁজিয়া পাইলাম না। এই বংশ হইতেই গাজী আশেক উল্লা সাহেবের মত জেহাদি সৈনিকের জন্ম হইয়াছে। এই বাড়িতে বসিয়াই গাজী সাহেব গ্রামের যুবকদেরে লাঠি-তলওয়ার খেলা শিখাইয়াছেন। অথচ তাঁর অবর্তমানে সেই বাড়িতেই লাঠি খেলা ও যুদ্ধের একতারা বাজনা এমন কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ হইয়াছে। দাদাজীর কথা সত্য হইলে গাজী সাহেবের বিদ্যমানেও এ বাড়িতে মোহররমের লাঠি খেলা হয় নাই। কী আশ্চর্যের কথা!

.

. পারিবারিক প্রথা

আরেকটি বিস্ময়কর ব্যাপার আমাদের বাড়িতে ঘটিত। আমার জ্ঞান হইয়াছে। অবধি দেখিয়াছি প্রতিবছর মোহররমের সময় আমাদের বাড়িতে খুব বড় একটা যিয়াফত হইত। মোহররমের চাঁদ দেখিয়াই আমাদের বাড়ির মেয়ে পুরুষ সকলে নফল রোযা রাখিতে শুরু করিতেন। কাতলের দিন খুব বড় পাঁচগেরামি মেহমানি হইত। তাতে অনেক গরু-খাসি যবেহ হইত। বাড়ির সামনের উঠান ও ময়দান লোকে লোকারণ্য হইয়া যাইত। সাদা পোশাক পাগড়িপরা বহু মৌলবী-মওলানা তাতে যোগ দিতেন। লোক খাওয়ানো ছাড়া গরীব-মিসকিনের মধ্যে অনেক পয়সা-কড়ি বিতরণ করা হইত। ঐ মেহমানির ভগ্নাবশেষ পরদিবস ‘মনজিলের দিন পর্যন্ত চলিত। সেদিনও ছোটখাটো মেহমানি ও দান-দক্ষিণা চলিত। আলেম-ফাযেলরা সকাল হইতে যোহরের ওয়াক্ত পর্যন্ত কালামুল্লা খতম করিয়া বখশিয়া দিতেন। তারপর খাওয়া-দাওয়া সারিয়া আছরের নামাজ পড়িয়া বিদায় হইতেন। এই ধরনের যিয়াফতে লোক হইত বেশুমার। দাওয়াতি তোক ছাড়াও বিনা-দাওয়াতি গরীব-মিসকিন জমা হইত অনেক। আন্দাজ কমবেশি পাঁচ হাজার লোক খাইত। খরচ কিন্তু তেমন বেশি লাগিত না।

তারিখের পনের-বিশ দিন আগে হইতেই গাছ কাটিয়া লাকড়ি ফাড়া ও শুকানো শুরু হইত। শুধু যিয়াফত বাড়িতে নয়, পাড়ার প্রায় সকলের, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ত অবশ্যই। দুই-তিন দিন আগে হইতে কলাগাছের পাতা কাটা শুরু হইত। এটাও সারা গায়ের প্রায় সব বাড়িতেই। কলাগাছ। হইতে পাতা কাটিয়া সেগুলি আবার এক হাত লম্বা টুকরা করিয়া আঁটি বাধা হইত। এক এক আঁটিতে দশ-পনেরটা টুকরা পাতার এক-একটা বুন্দা থাকিত। দশটা বুন্দায় একটা আঁটি হইত। তার মানে এক-এক আঁটিতে কমবেশি দেড় শ কলাপাতার টুকরা থাকিত। যিয়াফতের দুই-এক দিন আগে হইতেই এ সব ফাড়া লাকড়ি ও এই সব আঁটি-বাঁধা কলাপাতা যিয়াফত বাড়িতে আসিয়া পৌঁছিত। তাতে যিয়াফত বাড়ির কোনো খরচ লাগিত না। দেনেওয়ালাদের অবস্থাভেদে ও সাধ্যমত নিজেরা অথবা চাকরের মাথায় এই সব যিয়াফত বাড়িতে পৌঁছাইয়া দিতেন। এটা ছিল তৎকালীন প্রথা ও একরকম বাধ্যকর রেওয়াজ। চাহিলে কেউ ‘না’ করিত না। না চাহিলেই বরঞ্চ মন-কষাকষির কারণ হইত। হাজার থনে বেশি লোকের যিয়াফতেই এই নিয়ম চালু ছিল। ছোটখাটো যিয়াফতে বাড়িওয়ালারা নিজেরাই লাকড়ি ও পাতার ব্যবস্থা করিয়া নিতেন।

লাকড়ি ও বাসন-বরতনের ব্যবস্থা ত এইভাবে হইয়া যাইত বিনা খরচায়। তার পরে ধরুন চাল-ডাল ও খাসি-গরুর কথা। একটা প্রমাণ সাইযের গরুতে পাঁচ শ ও একটা খাসিতে এক শ লোকের খাওয়া হইত। কারণ গোশতের সাথে গোল-আলু মাটিয়া আলু, ফেন কচু (চার-পাঁচ হাত লম্বা মানকচু) তরকারি দেওয়া হইত। গোশত ছাড়াও ডাইল এবং দই অথবা মিঠুরি থাকিত। দই গোয়ালারা দিত। আর মিঠুরিটা যিয়াফতের বাবুর্চিখানাতেই তৈরি হইত। বড় ডেগভর্তি পানির মধ্যে দরকারমত চালের গুঁড়া, চিনি, দুধ ও লবণ দিয়া জাল দিলেই মিঠুরি রান্না হইত।

এই হিসাবে দশটা গরু, দুইটা খাসি, পঁচিশ মণ চাল, পাঁচ মণ ডাল, পাঁচ মণ মিঠুরি বা দশ মণ দই দিয়া পাঁচ হাজার লোক খাওয়ানো যাইত। এতে মোটমাটে পাঁচ শ টাকার বেশি খরচ পড়িত না। গরুর দাম দশ-পনের, খাসির দাম চার-পাঁচ, চালের মণ দেড় টাকা-পাঁচসিকা। দুই-তিন টাকা মণ দই পাওয়া গেলে বরঞ্চ পাঁচ শ টাকার কিছু কমই লাগিত। চার-পাঁচ হাজার লোক বসিবার জায়গা করা খুব কঠিন ছিল না। ধান, সরিষা, কলাই মাড়াই শেষ হইবার পর এবং পাট বুনা শুরু হইবার আগে সকলের বাড়ির সামনে-পাশে বহু বিস্তৃত জমি খালি পড়িয়া থাকিত। নিম্ন-মধ্যবিত্ত গৃহস্থ বাড়ি মাত্রেরই দুই একখানা বড় শামিয়ানা, ফরাশ ও শতরঞ্জি থাকিত। মাতব্বরদের বাড়িতেই দুই-তিনটা করিয়া বড় ডেগ থাকিত। প্রতি গ্রামে দুই-একজন করিয়া শখের বাবুর্চি ছিলেন; বড় বড় যিয়াফতে রান্না করা তাদের গৌরবের বিষয় ছিল। এই সব শখের বাবুর্চিরা বিনা পারিশ্রমিকে সহকারী লইয়া ভোর হইতে রান্না শুরু করিতেন, বাঁশের কোনোই অভাব ছিল না। ঘন ঘন খুঁটি গাড়িয়া গ্রামের পাঁচ দশটা শামিয়ানা টাঙানো হইত। জমি চাষ করা থাকিলে সামান্য মুগুরপেটা করিয়া তাতে ধারি-টাচাইর উপর ফরাশ-শতরঞ্জি ও চট বিছাইয়া সুন্দর বসার ব্যবস্থা হইত। এতে খরচ যা লাগিত, তা উল্লেখযোগ্য নয়। আমাদের বাড়ির মত নিম্ন-মধ্যবিত্ত গৃহস্থের পক্ষে বছরে একবার চার-পাঁচ শ টাকা খরচ করিয়া এমন যিয়াফতের আয়োজন করা দাদাজীর আমলে মোটেই কঠিন মনে করিতাম না। আমাদের ছেলেবেলা আমাদের অঞ্চলের অনেক মাতব্বর গৃহস্থের বাড়িতেই বছরে বছরে এমন যিয়াফত দেখিয়াছি এবং নিজেরা। খাইয়াছি। কখনও-কখনও এর চেয়েও বড় বিশাল যিয়াফতও খাইয়াছি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেবের দাদা রিয়াত উল্লা মণ্ডল সাহেবের লিল্লায় যিয়াফতটা হইয়াছিল দস্তুরমত একটা মেলা। সে যিয়াফতে এক শ একটা গরু যবেহ হইয়াছিল বলিয়া শুনিয়াছিলাম।

.

. সমসাময়িক অবস্থা

প্রায় এক শ বিঘার জোতদার হইলেও দাদাজীর আমলে আমাদের কোনো বর্গাদার ছিল না। সব জমিই নিজের চাষে থাকিত। দাদাজীর আমলে দেখিয়াছি এইসব জমি আবাদ করিতে তিন-চার জোড়া হাল, দশ-বার জন কামলা খাঁটিত। হালের বলদগুলি ছিল বিশাল আকারের। উচ্চতায় পাঁচ ফুটের নিচে হইবে না। বলদ যেমন বড়, লাঙলগুলিও তেমনি দীঘে-পাশে আলিশান। এইসব হাল বাইবার মত কামলারাও ছিল ইয়া বড় জওয়ান। দাদার আমলের সাধু, ইদু, খিদিরদ্দি, খলবদ্দি, আইনদ্দি প্রভৃতি পাঁচ-ছয়জন বছরিয়া কামলার বিশাল আকারের কথা আজও মনে পড়ে। এরা কেউ উঁচায় প্রায় ছয় ফুট ও ঐ পরিমাণে মোটাতাজা ছিল। কাজে-কামে চলিতও এরা দেও-এর মত। এরা শুধু কাজেই বড় ছিল না, শক্তিতেও ছিল তেমনি অসাধারণ। সে শক্তি তারা শুধু এমনি দেখাইত না, আমাদের গিরস্থির কাজেও লাগাইত। বিভিন্ন রকমের ভারী ভারী বোঝা টানিতে, বিশেষত, মাঠ থনে ধানের আঁটির বোঝা আনিতে, সেই বিপুল শক্তি খাটাইত। ধান কাটিবার সময় যে আঁটি বাঁধা হয়, তারে আমাদের অঞ্চলে বলা হয় মুড়ি। এক-একটা মুড়ির ওজন পাঁচ সেরের বেশি ছাড়া কম হবে না। সাধারণ কামলারা এই ধরনের মুড়ির আটটাতে এক বোঝা বাধিয়া মাঠ হইতে বাড়ির খলায় আনিত। এই আটটা মুড়ি কেউ একটা আঁটি বাঁধিয়া মাথায় করিয়া আনিত। কেউ আবার চার-চারটা মুড়ির দুইটা আঁটি বাঁধিয়া বাহুক কাঁধে করিয়া আনিত। এই বাহুক সম্বন্ধেও সকলের এই ধারণা না-ও থাকিতে পারে। আমাদের অঞ্চলে ধান বাহিবার এই বাহুক গোয়ালা বা ফেরিওয়ালারা বাহুকের মত দুই পাশের দুইটা বোঝা ঝুলাইয়া আনা হয় না। তার বদলে বাহুকের দুই দিক ধানের দুই আঁটির ঠিক মাঝামাঝি ঢুকাইয়া দেওয়া হয়। সে উদ্দেশ্যে বাহুকের দুই দিকই ধারালো চোখা। এ চোখা মাথা দুইটি ধানের বোঝার ঠিক মাঝখানে এমনি কায়দায় ঢুকানো হইত যে, কোনো দিকে বেশি হইয়া তেছড়াভাবে হেলিয়া পড়িত না। পড়িলে আর বাহুক বওয়া সম্ভব হইত না। এই বাহুকের দুইটা আঁটি বাঁধার মধ্যেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জিলায়। অন্তত দুই রকম কায়দা আছে। এক ধরনে ধানের সব মুড়ির ধানের মুখ নিচ দিকে ঝুলাইয়া বাঁধা হয়। আরেক ধরনে মুড়িগুলি উল্টা-পাল্টা দুই মুখ করিয়া বাধা হয়। তাতে ধানের দিক একদিকে থাকে না। সমান সংখ্যায় দুই দিকে থাকে। এই ধানের বাধার ফলে দুই দিককার বোঝা দুইটার বাহকের কাঁধের উপরের লেভেলে থাকে। এই ধরনের বাধাতেই বাহুক চুকানোতে খুবই উস্তাদি লাগে। মনে হয়, এতে বোঝাটাও কিছুটা পাতলা হয়। কারণ বাহকের চলার তালে-তালে উভয় দিককার বোঝাই ছন্দে ছন্দে নাচিতে থাকে।

এই ধরনের বাহুকেই হউক, আর এক বোঝার মাথায় করিয়াই হউক, অপর কামলারা যেখানে আটটা মুড়ি বহন করিত, সেখানে আমাদের বাড়ির ইদু-সাধুরা দশ-বার-চৌদ্দটা মুড়ি একবারে বহন করিত। এই লইয়া তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হইত। এটা সহজ ছিল না। কারণ, এতে প্রত্যেক বারের বোঝার ভার দেড় হইতে দুই মণ ওজনের হইত।

এছাড়া ইদু-সাধুরা আরেক কাজে তাদের শক্তির প্রতিযোগিতা করিত। আমাদের বাড়িতে তৎকালে প্রায় হাজার মণ ধান বিক্রি হইতে। এই বিক্রিটা প্রায়শই দুই-তিন দফার বেশিতে হইত না। তাতে প্রতি দফায় তিন শ হইতে পাঁচ শ মণ বিক্রয় হইত। যেদিন বিক্রিটা হইত, সেদিন আমাদের বাড়ির উত্তরের উঠান (এটাই আমাদের খলা ছিল বলা যাইতে পারে) লোক সমাগমে গমগম করিত। আমাদের কামলারা মাপিয়া দিত। ব্যাপারীদের ঘোড়াওয়ালারা এসব ধান সুতোয়া নদীতে দক্ষিণা ব্যাপারীদের পাঁচ শ মণি নৌকায় নিয়া যাইত। পাঁচসেরি পাথরের দাঁড়িপাল্লায় এই ধান মাপা হইতে। অনেক ধান। কাজেই বড় বড় কান্দি। এক কান্দি হইতে ধান মাপিয়া আরেক কান্দি করিতে স্বভাবতই বেশ দূরে করা যাইত। নইলে অতি শীঘ্রই দুই কান্দি লাগালাগি হইয়া যাইবার আশঙ্কা ছিল। কাজেই দাঁড়িপাল্লাওয়ালারা প্রতিবারের মাপা ধান খুব দূরে অন্তত চার-পাঁচ হাত দূরে মেলিয়া মারিত। এই লইয়াই আমাদের ইদু-সাধুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করিতে দেখিয়াছি : কে কতদূর মেলিয়া মারিতে পারে। এটা সোজা কাজ নয়! কাজটা করিতে হয় বসা অবস্থা হইতে। পাঁচ সের ধান দুই একবার দশ হাত দূরে ফেলাও কঠিন নয়। কিন্তু চার-পাঁচ শ মণ ধান সারা দিন ধরিয়া মাপিতে হইবে। আগাগোড়া সমান দূরে ফেলিতে হইবে। কাজেই সমান জোরে মারিতে হইবে।

এমন বলবান জোয়ান-জোয়ান কামলারা যখন উঁচা উঁচা বলদ দিয়া হালচাষ করিত, তখন আমার বড় ভাই ও আমি স্কুল ছুটির দিনে হাল ধরিতে চাহিতাম। কামলাদের কেউ কেউ আমাদেরে লাঙল ধরিতে দিত, কিন্তু সাবধানতা হিসাবে আমাদের সাথে সাথে চলিত এবং লাঙলের কুটিতে আমাদের মুঠির কাছে হাত রাখিত। কিন্তু সর্দার কামলারা এতে আপত্তি করিত এবং আমাদেরে সরাইয়া দিত। বলিত, লেখাপড়া জানা লোকের লাঙল ধরিতে নাই। লেখাপড়া জানা লোক লাঙল ধরিলে লাঙলের রেখের নিচের জমি সত্তর হাত পর্যন্ত পুড়িয়া যায়। সে ক্ষেতে কোনো ফসল হয় না। আমাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অনেক মুনশী-মৌলবী নিজের হাতে হালচাষ করেন। তাতে মাটি পুড়িয়া যায় না। সে নজিরের কথা বলিলে কামলারা জবাব দিত, তাঁরা আরবি-ফারসি পড়িয়াছেন, লেখাপড়া করেন নাই। লেখাপড়া মানে এখানে বাংলা লেখাপড়া। তৎকালে এ কথার গূঢ় মর্ম বুঝিতে পারি নাই। পরে বুঝিয়াছিলাম। লেখাপড়া জানা বাবু ভদ্রলোকেরা নিজ হাতে চাষ না করিবার কী চমৎকার যুক্তি জনপ্রিয় করিয়াছিলেন।

.

১০. প্রাচুর্য ও সরলতা

এরা ছাড়া আমাদের আরো তিন-চারজন বছরিয়া কামলা ছিল। ফসল। লাগানো-মাড়ানো এই দুই সময় এদেরে ছাড়াও মাসুরা (মাসোহারা) কামলাও রাখা হইত। এই সব গৃহস্থির কামলা ছাড়া তিন-চারজন রাখালও থাকিত। বলদা গরু বা হালের বলদের জন্য একজন ও পালের গরু বা ছেটুয়া গরুর জন্য দুইজন রাখাল থাকিত। হালের বলদ দশ-বারটা, আর ছেটুয়া গরু ছিল। প্রায় পঞ্চাশটা। হালের বলদের জন্য পৃথক একটা ও ছেটুয়া গরুর জন্য দুই তিনটা গোয়াল ছিল। পঞ্চাশটা ছেটুয়া গরুর মধ্যে আধাআধি বাছুর ও বাকি সব গাই থাকিত। গাইগুলির মধ্যে আট-দশটা দুধাল, বাকিগুলির কিছু গাভীন ও কিছু ছাড়ানিয়া (দুধ দেওয়া শেষ হইয়াছে কিন্তু আজও গাভীন হয় নাই এমন) গাই ছিল। দুধের বাছুরগুলিকে গোয়ালের এক কোণে খোয়াড়ের মধ্যে সারা রাত বাধিয়া রাখা হইত। ফযরের ওয়াকতে এক-একটা করিয়া বাছুর ছাড়িয়া তার মায়ের দুধ পানান হইত। দুধ পানান (দুয়ান) শেষ হইলেই গোয়ালের সব গরু ছাড়িয়া দেওয়া হইত। গুরুগুলিও বরাবরের অভ্যাসমত হালটে চলিতে শুরু করিত। আমাদের বাড়ির হালট গিয়া পড়িয়াছে সারা গাঁয়ের এজমালি হালটে। এই হালটের এক শাখা গিয়া পড়িয়াছে নদীর পাড়ে, অপর শাখা গ্রামের মাঠে। ক্ষেতে ফসল থাকার সময় হালটের এই শাখায় গরু যাইত না। সব যাইত নদীর ধারে। সেখানে গাঁয়ের সব গরুর সাথে মিলিয়া জঙ্গলের পাতা-পুতুড়ি ও ঘাস খাইত। বেশি গরুওয়ালাদের নিজস্ব চরাক্ষেত (গরু চরাইবার জন্য পতিত জমি) থাকিত। আমাদেরও কয়েকটা চরাক্ষেত ছিল। বরাবর একই ক্ষেতকে চরাক্ষেত রাখা হইত না। দুই-তিন বছর পরপর বদলানো হইত। এতে একদিক যেমন যথেষ্ট ঘাসে। গরু চরানোও চলিত, আবার কয়েক বছর পতিত পড়িয়া থাকায় এবং গরু বাছুর চরিবার সময় যে পরিমাণ লেদাইত, তাতে ক্ষেতের উর্বরতাও বাড়িত।

এত-এত কামলা ও বলদ গরুর বয়ান শুনিয়া আজকালকার তরুণেরা মনে করিবে, এটা ত একমত হালুয়া রাজার ব্যাপার, আসলে তা কিছু নয়। ঐ যে ছয় ফুট লম্বা জোয়ান কামলাদের কথা বলা হইল, তাদের বার্ষিক বেতন ছিল সর্বোচ্চ পঞ্চাশ-ষাট টাকা। আর রাখালদের বেতন ছিল বছরে দশ টাকা। চাকরি শুরু করিবার প্রথম দিনেই কিংবা দু’এক দিন আগে সব টাকা অগ্রিম দেওয়া-নেওয়া হইত। বয়স্ক কামলারা নিজেরা, আর ছোকরা চাকরদের বাপ-চাচা মুরুব্বিরা এই টাকা নিতেন। অগ্রিম বেতনের টাকা পাওয়ার পর সারা বছর তারা কাজ করিয়া দিত। টাকা মারিয়া দিবার কথা তৎকালে কারো মনেও পড়িত না। বছরের বেতন অগ্রিম আদায় করিয়া পরবর্তী তিন শ পঁয়ষট্টি দিন সে টাকার বদলা খাঁটিয়া দিতে বোধ হয় আজকাল কোনোও লোকই রাজি হইবে না। কেউ যদি রাজি হয়, তবে দু’চার দিনের মধ্যেই নির্বোধ বেওকুফ বেআক্কেল গাধা বলিয়া সর্বত্র তার বদনাম ছড়াইয়া পড়িবে। কিন্তু আগের লোকেরা এমন ছিলেন না। গৃহস্থরাও না, তাঁদের কামলারাও না। সকলেই সকলকে বিশ্বাস করিতেন। বিশ্বাসের সুযোগ-সুবিধাও ছিল। ধরুন কামলাদের কথাটাই। যে বছরে ষাট টাকা অগ্রিম পাইল, সে ঐ টাকার মধ্যে ত্রিশ-চল্লিশ টাকায় ষাট-আশি মণ ধান কিনিয়া ফেলিল। তার স্ত্রী-কন্যারা মিলিয়া ধান সিদ্ধ করিয়া বাড়া বানিয়া চাউল করিল। ষাট মণ ধানে চাল হইবে পঁয়তাল্লিশ মণ। আশি মণে হইবে প্রায় ষাট মণ। চাউলের দাম তখন দেড় টাকা মণ। অর্থাৎ ষাট টাকা বেতন পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই কামলাটি শতাধিক টাকার মালিক হইয়া গেল। আর গৃহস্থের লাভ হইল যে, গাঁয়ের বাছা-বাছা সবল কর্মঠ কামলা তিনি বছরের নামে কিনিয়া ফেলিলেন। অন্যথায় বুনা-লাগানো ও দাওয়ামাড়ির সময় অমন কামলা পাওয়া যাইত না। পাওয়া গেলেও মাসিক বেতন দশ টাকার কম হইত না।

শুধু এই কারণেই যে লোকজন সৎ-সাধু থাকিত, তা নয়। শঠ-প্রবঞ্চক ও ঠক-ধড়িবায হইবার মত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও চুরি-ডাকাতি করিবার মত সাহসই তখন জনসাধারণের মধ্যে হয় নাই। আরেকটা দৃষ্টান্ত দেই। প্রতিবছর ফাল্গুন চৈত্র মাসে বিহার হইতে বহু গরুর ব্যাপারী হাজার হাজার গরু লইয়া বাংলাদেশে ঢুকিত। আমাদের এলাকায়ও অনেকে আসিত। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকে আগে বহুদূর বিস্তৃত ধানী জমি ছিল। একেবারে খোলা মাঠ। ধান কাটা হইয়া সবটাই একদম ময়দান। শুধু বাড়ির আশপাশে কিছু রবিশস্য সরিষা, কলাই করা হইত। এই ভোলা বিশাল মাঠে হাজার হাজার গরুসহ এই বিহারী ব্যাপারীরা আস্তানা ফেলিত। সুবিধা অনুসারে সাত দিন হইতে পনের দিন এক-এক আস্তানায় থাকিত। দৈনিক দশ-বিশটা গরু বিক্রি হইলে পাঁচ-সাত শ টাকা জমা হইত। সাত দিনে তিন-চার হাজার টাকা হইত। এই টাকা লইয়া ব্যাপারীরা মাঠের মধ্যে এত দিন রাত কাটাইত। কোনো একটা ডাকাতি-রাহাজানি হয় নাই।

.

১১. দাদাজীর এন্তেকালের পর

দাদাজী যত দিন বাঁচিয়া ছিলেন তত দিন উপরে কথিত মেহমানির ধুমধাম পুরা বজায় ছিল। কিন্তু রোযা রাখার নিয়মে শৈথিল্য আসিয়া পড়িয়াছিল। প্রথমে আমরা ভাইয়েরা রেহাই পাইলাম। কারণ অনেক দূরে হাঁটিয়া স্কুলে যাইতে হইত। মোহররমের ছুটি ছিল মাত্র এক দিন। আমাদের মত অপোগণ্ড শিশুর পক্ষে না খাইয়া স্কুলে যাওয়া কঠিন। কাজেই নফল রোযার জন্য অত কষ্ট করার দরকার নাই। আমরা যেই মাফ পাইলাম, অমনি আরো অনেকে নিজেদেরে মাফ করিয়া দিলেন। রোযা সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই যে, যত দিন বাড়িতে দিনের বেলা চুলায় আগুন না ধরে, তত দিন সে বাড়িতে রোযা রাখিতেও কারো কষ্ট হয় না। যেই মাত্র দুই-একজনের জন্য বিশেষ কারণে দিনের বেলা চুলায় রান্না চড়িল, অমনি প্রতিদিন এ বিশেষ কারণে হাজতির সংখ্যা বাড়িয়া চলিল। আমাদের বাড়িতে মোহররমের নফল রোযার বরাতে ঘটিল তা-ই। যত দিন দিনের বেলা পাকঘরের দরজা বন্ধ ছিল, তত দিন মোহররমের নফল রোযা প্রতাপ লইয়া আমাদের বাড়িতে রাজত্ব করিতেছিল। যেই ছাত্রত্বের হাজতে আমরা কয় ভাই হাজতি হইয়া রেহাই পাইলাম, অমনি গুরুতর অজুহাতের হাজতি দিন-দিন বাড়িয়া গেল। আমরা বড় হইয়া দেখিয়াছি, শেষ পর্যন্ত বাড়ির মুরুব্বি হিসাবে দাদাজী একাই রোযা রাখিতেন। আর মেয়েদের মধ্যে আমার মা এই নফল রোযা রাখিতেন।

দাদাজীর এন্তেকালের পর এই যিয়াফতের আচার ও ধুমধাম আস্তে আস্তে কমিয়া যায় এবং কয়েক বছর পরে একেবারে বন্ধ হইয়া যায়। কিন্তু এর কারণ আমার বাপ-চাচার কৃপণতা বা মত পরিবর্তন ছিল না। ছিল অর্থাভাব। দাদাজীর এন্তেকালের পর আট-দশ বছরের মধ্যে আমাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হইতে থাকে। একদিকে শরিকানা ভাগে চাষাবাদে ফসলের উৎপত্তি কমিয়া যায়, অপরদিকে আমাদের লেখাপড়ার খরচ বাড়িয়া যায়।

যা হোক, দাদাজীর আমলে মোহররম পর্বে আমাদের বাড়িতে এত ধুম ধড়ক্কি হইলেও দুই ঈদে কিন্তু অমন বিশেষ কিছু হইত না। বকরিদে প্রথম প্রথম দুই-তিনটা ও পরে মাত্র একটা গরু কোরবানি হইত। মোহররম লইয়া এত হৈচৈ করায় অনেক ছাত্র-বন্ধু ও শিক্ষক সন্দেহ প্রকাশ করিতেন আমরা আগে শিয়া ছিলাম। কিন্তু এটা ঠিক নয়। কারণ আমার বড় দাদা গাজী সাহেব এবং তারপর আমার চাচা মুনশী ছমিরুদ্দিন ফরাযী সাহেব ঘোরতর শিয়াবিরোধী ছিলেন। শিয়াদিগকে কাফের বলিতে চাচাজীকে আমি নিজ কানে শুনিয়াছি।

অথচ মোহররম লইয়া ধুম-ধড়কির কারণ দাদাজীও বলিতে পারিতেন না। তিনি বলিতেন, এটা বহুদিন হইতে এইভাবে পুরুষানুক্রমে চলিয়া আসিতেছিল।

.

১২. খেলাধুলার স্বাধীনতা

গান-বাজনা সম্বন্ধে আমার মুরুব্বিরা ঐরূপ কড়াকড়ি করিলেও খেলাধুলার ব্যাপারে তারা উদার ছিলেন। ঘোড়ায় চড়ার কথা আগেই লিখিয়াছি। এ ছাড়া আমরা শুকনার দিনে (অগ্রহায়ণ মাস হইতে জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত) মাঠে ব্যাটবল, ফুটবল, ডাংগুলি, কপাটি ইত্যাদি অনেক রকম খেলা খেলিতাম। ব্যাটবল মানে ক্রিকেট। আজকালের ছেলেদের মত আমরা ব্যাটবল কিনিতে পারিতাম না। নিজেরাই ব্যাট ও বল বানাইয়া লইতাম। দেবদারুগাছের চেলি অথবা ডাল কাটিয়া আগা চওড়া ও গোড়ায় হাতল করিয়া সুন্দর ব্যাট বানাইতাম। সুন্দর মানে তকালের জন্য সুন্দর। এটা ছিল প্রথম শ্রেণীর ব্যাট। সাধারণত এটাও জুটিত না। এক ফালি তক্তার একদিকে কাটিয়া ধরিবার মত একটা হাতল বানাইতে পারিলেই ব্যাট হইয়া গেল। আর বল? একটা শক্ত ভারী কাঠের গুলি বানাইয়া গাঁয়ের মুচেকে দিয়া তার উপর চামড়া সিলাই করাইয়া লইতাম। এটাই হইল আমাদের বল। এছাড়া কতগুলি লোহার চাকতি একত্রে করিয়া তার উপর খুব করিয়া নেকড়া জড়াইয়া গোল পিণ্ড বানাইতাম। এই গোল পিণ্ডের উপর মিহিন দড়ি দিয়া টাইপ করিয়া জাল বুনিতাম। তাতেও একরকম করিয়া শক্ত মযবুত ও টিকসই বল হইত। ত্রিকাঠি বা স্ট্যাম্প বানানো আরো সহজ ছিল। ত্রিকাঠি উচ্চারণে তিরিকাট ছিল আমাদের ক্রিকেটের বাংলা পরিভাষা। বাঁশের কাবারি বা ইঞ্চি অথবা সুপারিগাছের ফালা একদিকে চোখা করিয়া দুই জোড়া ত্ৰিকাঠি (তিন কাঠি) বানাইতাম। আমাদের আমলে পাড়াগাঁয়ে একদিক হইতে ওভারে-ওভারে বল করিবার নিয়ম ছিল না। দুই দিক হইতেই বল হইত। দুই দিকেই বৌলার, দুই দিকেই কিপার। খেলার গতিকে যেদিককার বৌলারের হাতে বল গিয়া পড়িত, সেদিক হইতেই বল চালনা হইত। আমাদের খেলার আরেকটা নিয়ম ছিল, আমরা মাথার উপর হইতে বল চালাইতাম না। বরঞ্চ হাত উঁচা করিয়া মাথা বা ঘাড়ের উপর হইতে বল মারিলে সেটা হইত ঢিল-মারা ‘নো বল’। আমাদের বল মারার কায়দা ছিল যাকে বলা যাইতে পারে আন্ডার হ্যান্ডবল মারা। ঝুলানো অবস্থায় হাতটা যতদূর সম্ভব পিছনে নিয়া ঐ ঝুলানোভাবেই অপরদিককার ত্ৰিকাঠি সই করিয়া বল নিক্ষেপ করা হইত।

ফুটবল সম্পর্কে কিন্তু অতটা আত্মনির্ভরশীল হওয়া সম্ভবও ছিল না, তার দরকারও হইত না। চামড়ার ফুটবল নিজ হাতে তৈয়ার করা কঠিন। কোনোমতে হারি-চাঁদা তুলিয়া তিন টাকা এক আনা জোগাড় করিতে পারিলেই তিন টাকার একটা তিন নম্বরের ফুটবল ও এক আনা দিয়া হুইসেল কেনা হইয়া যাইত। অনেক সময় হুইসেল ছাড়াও আমাদের খেলা হইত। রেফারি বুড়া ও শাহাদত এই দুই আঙুল মুখে ঢুকাইয়া জিভের চাপে সুন্দর হুইসেল মারিতে পারিত।

.

১৩. চুরুট-তামাকের কড়াকড়ি

তৎকালে পাড়াগাঁয়ে আমাদের সমবয়সীদের প্রায় সবাই তামাক খাইত। যারা চাষবাসের কাজ করিতেন, তাঁদের ছোট ছোট ছেলেরা বাপ-চাচার সামনেই তামাক খাইত। কাজে ব্যস্ত বাপ-চাচাঁদের তামাকটা ছেলেরাই সাজিয়া দিত। তামাক সাজিতে গিয়া নিজে দুই-এক টান খাইয়া লইত। ক্রমে এটা অনুমোদিত প্রথা হইয়া গিয়াছিল। একত্রে চাষবাস করিবার সময় এটা অপরিহার্য ছিল। একত্রে মাঠে কাজ করিবে, আর তামাক খাইবার সময় মুরুব্বিদের সম্মান দেখাইতে গিয়া গোপন করিবে, তার সময় ছিল না। সুবিধামত জায়গাও ছিল না। তবু অনেক ছেলে বাপ-চাচার সম্মানে একটু ঘুরিয়া বসিয়া হুঁক্কায় টান দিত। এই প্রথাই পরে নইচার আড়ালে তামাক খাওয়া’ বলিয়া সাহিত্যে স্থান পাইয়াছিল।

কিন্তু আমাদের বেলায় এটা হইবার ছিল না। কারণ আমাদের বাড়িতে তামাক খাওয়া একদম নিষিদ্ধ ছিল। দাদাজী তামাক খাওয়াকে একরূপ হারামই বলিতেন। কাজেকর্মে আচার-আচরণে তামাক খাওয়াকে তিনি হারামের থনে বেশি কড়া নজরে দেখিতেন। আমাদের দশ-পনের জন গৃহস্থির কামলার বেশির ভাগ ছিল তামাকখোর। তাদেরে তামাক না দিলে তারা কাজে জোর পাইত না। তাই বাপজী, চাচাজী ও গ্রামের মাতব্বরদের সুপারিশে কতকটা প্রয়োজনের তাগিদে দাদাজী কামলাদের বেলা তাঁর কড়াকড়ি শিথিল করিয়াছিলেন। কিন্তু আর সকলের বেলা খুব কড়া ছিলেন। ঘোরতর তামাকখোর বড় বড় আত্মীয়েরা আমাদের বাড়িতে আসিয়া তামাক ছাড়াই দিন কাটাইয়া যাইতেন। এ ব্যাপারে দাদাজীর কোনো পক্ষপাতিত্ব ছিল না। মুনশী-মৌলবী, আলেম-ফাযেল ও সরকার মাতব্বর সকলের প্রতি সমান নির্দয় ব্যবহার করিতেন। বিদেশাগত মৌলবী-মওলানাদের মধ্যে দু’একজন তামাকখোর, আর প্রায় সকলেই সাদা পাতাখোর থাকিতেন। পানের সাথে জর্দা-মশল্লার মত শুকনা তামাক পাতা খাওয়াকেই সাদা পাতা। খাওয়া বলা হইত। দাদাজী তাঁদেরে আমাদের বাড়িতে তামাক খাইতে ত দিতেনই না, তার জানামতে সাদা পাতা খাওয়াও সম্ভব ছিল না। তামাক চুরুট খাওয়াকে তিনি গু খাওয়া বলিতেন। হুক্কার তামাক খাওয়াকে তিনি কাঁচা গু ও সাদা পাতা চুরুট খাওয়াকে শুকনা গু খাওয়া বলিতেন। দাদাজীর কঠোরতায় তারা কেউ দাদাজীর সামনে সাদা পাতাও খাইতেন না। একটু আড়ালে সরিয়া গিয়া খাইতেন। তামাকের অভাব অসহ্য হইলে কেউ কেউ কামলাদের কাছে চাহিয়া তাদেরই সাজা হুক্কায় দুই-এক দম কষিতেন।

ছেলেবেলার একটি ঘটনার কথা মনে পড়িতেছে। একদিন নামাজের পরে এক মৌলবী সাহেব মসজিদে বসিয়াই ওয়ায করিতেছিলেন। ওয়ায করিতে করিতে তিনি মাঝে মাঝে পানের ডিবিয়া হইতে পানের খিলি বাহির করিয়া মুখে দিতেছিলেন। তিনি ছিলেন দিল্লি-ফেরতা বড় মওলানা। তিনি ছিলেন খুব ‘আম্বলী’ মানে তামাকের আদি। দাদাজীর মতামত তখনও তিনি জানিতেন না। দাদাজীর দিকে চাহিয়া তিনি বলিলেন, ‘ফরাযী সাহেব, আমার তামাক খাওয়ার আদত আছে। এক ছিলিম তামাকের হুকুম দিন। সমবেত মুসল্লিরা অবাক হইলেন। দাদাজীও বোধ হয় প্রথমে হকচকিয়া গিয়াছিলেন। কিন্তু মুসল্লিদের মধ্যে উপস্থিত আমাদের এক কামলাকে তিনি ভাল করিয়া তামাক সাজিয়া হুঁক্কাটা ধুইয়া-মুছিয়া আনিবার হুকুম দিলেন। কামলাটিও নিশ্চয়ই বিস্মিত হইয়াছিল। কিন্তু কিছু না বলিয়া তামাক সাজিয়া আনিতে বাহির হইয়া গেল। মওলানা সাহেব আবার ওয়ায শুরু করিলেন।

কিছুক্ষণ পরে কামলা হুক্কা হাতে মসজিদের দরজায় দাঁড়াইয়া উচ্চ স্বরে বলিল, “চাচা মিয়া, তামাক আনছি। ঐ কামলাটি ছিল বেশ বয়স্ক। সে দাদাজীরে চাচা মিয়া ডাকিত। দাদাজী তার দিকে চাহিয়া বলিলেন, ‘এইখানে। লৈয়া আয়।’

মওলানা সাহেব ঝটিতে দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিলেন, না না, তুমি ভিতরে আইসো না। আমি বাইরে আইতেছি।’

দাদাজী পাশে বসা মওলানার চৌগার দামন ধরিয়া বলিলেন, না, না, মওলানা সাহেব, আপনি বাইরে যাইতে পারবেন না, এইভাবে বৈসাই তামাক খাইতে হৈব।’

এরপর দাদাজী ও মওলানা সাহেবের মধ্যে যে কথা-কাটাকাটি হইল তার শেষটায় মওলানা সাহেব তওবা করিয়া তামাক ছাড়িয়া দিয়াছিলেন।

 

দ্বিতীয় খণ্ড শিক্ষাজীবন

অধ্যায় তিন প্রাইমারি শিক্ষা-বাড়িতে

. চাচাজীর নিকট

চাচাজী মুনশী ছমিরুদ্দিন ফরাযী সাহেব আমাদের বৈঠকখানায় একটি ফ্রি মাদ্রাসা চালাইতেন। এটাকে মাদ্রাসাও বলিতে পারেন, মক্তবও বলিতে পারেন। পাঁচ-সাত বৎসরের শিশুরা বগদাদি কায়দা, আম সেপারা ও কোরআন শরিফ পড়িত; অন্যদিকে দাড়ি-মোচওয়ালা যুবকেরা রাহে নাজাত, মেফতাহুল জান্নাত, ফেকায়ে মোহাম্মদী, শেখ সাদীর গুলিস্তাঁ, বুস্তাঁ এবং সাদীর ও ফরিদুদ্দিন আত্তারের পান্দেনামা, জামীর বাহার দানেশইত্যাদি উর্দু ফারসি কেতাবও পড়িত। মক্তবটি ফ্রি ছিল, মানে সকল দিকেই ফ্রি। বেতনও ছিল না, রেজিস্ট্রার হাজিরা বইও ছিল না। যার ইচ্ছা আসিয়া বসিয়া পড়িলেই হইত। যার যখন ইচ্ছা, উস্তাদজিকে বলিয়া চলিয়া যাইতে পারিত। বসিবার জন্য কোনো বেঞ্চির সারি ছিল না। আমাদের বাহির বাড়ির বিশাল আটচালা ঘরের মধ্যের কোঠায় চারটা হইতে ছয়টা চৌকি (তখতপোশ) লাগালাগি এক কাতারে পাতা ছিল। তার খানিকটায় পাটি ও খানিকটাতে চাটাই বিছানো থাকিত। এদের বেশির ভাগই অতি পুরান ও টুটাফাটা। এই ভাঙ্গা পাটি-চাটাইর উপর বসিয়াই তালেবিলিমরা মাথা ঝুকাইয়া-ঝুকাইয়া পড়া মুখস্থ করিত। চৌকির কাতারের সামনে একটা ডানা ভাঙ্গা কুরসিতে বসিয়া চাচাজী ছাত্রদেরে পড়াইতেন। আমার যতদূর মনে পড়ে, কোনো তালেবিলিমকেই নিজের আসন হইতে উঠিয়া আসিয়া পড়া দিতে হইত না। পড়ায় ভুল করিলে অথবা পুরান সবক শেষ করিয়া নূতন সবক নিতে হইলে চাচাজী নিজের আসনে বসিয়াই তা বলিয়া দিতেন। সব কেতাবই যেন তার মুখস্থ ছিল। চাচাজীর হাতে থাকিত একটা বাঁশের কঞ্চি অথবা ছিটকি লতার ডাল। ডালই হোক বা কঞ্চি হোক, ওটাকে ছিটকিই বলা হইত। ঐ ছিটকির উদ্দেশ্য ছিল, গাধা পিটাইয়া ঘোড়া করা অর্থাৎ অমনোযোগী ছাত্রকে পিটাইয়া মনোযাগী করা। সে উদ্দেশ্যে উদ্যত-ফণা সাপের মত সারা দিন ছিটকিটি অমনোযাগী ছাত্রের পিঠ বা হাতের তলা তালাশ করিয়া করিয়া উঁকিঝুঁকি পাড়িত। কিন্তু আমার জীবনে চাচাজীকে মাত্র তিনবার এ ছিটকিটি ব্যবহার করিতে দেখিয়াছি। আমাদের গ্রামের রেকাতুল্লাহ ও শহর আলী নামক দুইটি ছাত্রের পিঠে দুইবার এবং আমার নিজের পাছায় একবার; মোটমাট এই তিনবার মাত্র। আমার জন্য আর দরকারও ছিল না। ঐ একটি আঘাতের দাগই বহুদিন শুধু আমার শরীরে নয়, মনেও তাজা ছিল।

যা হোক, পাঁচ বছর বয়সে আমি চাচাজীর মক্তবে ভর্তি হইলাম, মানে অযু করিয়া পাকসাফ হইয়া তহবন্দ পরা অবস্থায় তালেবিলিমদের কাতারের এক কোণে বসিয়া পড়িলাম। আমার বড় দুই ভাই আগে হইতেই মক্তবের তালেবিলিম ছিলেন। কিন্তু আমি অল্প দিনেই তাঁদের সমান পড়া পড়িয়া ফেলিলাম। আমি প্রতিদিন একটার বদলে দুইটা নয়া সবক লইতাম। অল্প দিনেই আমি বগদাদি কায়দা শেষ করিয়া ফেলিলাম। তেলকা ও হালকা উভয় রকম ত্যদিকে আমি উত্তীর্ণ হইলাম। তেলকা মানে তীরের ফলার অর্ধেকের আকারে ভাঁজ করা চার পরত কাগজের একটি টুকরা। এর এক দিক মোটা, অপর দিক সুইয়ের মত ধারালো। ডান হাতের বুড়া ও শাহাদত আঙুলের ফাঁকে তেলকার মোটা অংশটা ধরিয়া চোখা অংশ দিয়া হরফ দেখানোই তেলকার কাজ। আরবি হরফ সংযুক্ত হইলে একটিমাত্র রেখার মধ্যে তিন চারটি হরফ লুকাইয়া থাকিতে পারে। শুধু নোকতা দেখিয়া সেই হরফগুলিকে চিনিতে হয়। আঙুলের মাথা দিয়া সে অক্ষর দেখানো যায় না। কারণ আঙুলের মাথা হরফের চেয়ে অনেক বেশি মোটা। এ কাজ করিতে হয় তেলকার সূচ্যগ্র মাথা দিয়া। এটা করিতে পারিলেই তালেবিলিম তেলকা পাশ করিয়াছে বলিতে হইবে। আর হালকা হইলে একটি কাগজের টুকরা, তার মাঝখানে একটা ছিদ্র। সকলেরই বোধ হয় মনে আছে, শিশুকালে বর্ণমালা পড়িবার সময় তারা আলিফ, বে, তে, ক-খ-গ বা এ-বি-সি গোড়া হইতে পড়িয়াও যাইতে পারিতেন। হরফও চিনিতেন। কিন্তু মাঝখান হইতে কোনো হরফ দেখাইয়া তার নাম পুছ করিলেই ঠেকিয়া যাইতেন। আগের পিছের হরফ না দেখিয়া যেকোনোও হরফ চিনিতে পারিলেই বুঝা গেল এইবার তালেবিলিমের অক্ষরজ্ঞান পাকা হইয়াছে। এই পরীক্ষাই হালকার কাজ। কেতাবের পৃষ্ঠায় হালকা নামক কাগজের টুকরাটি স্থাপন করিলে একটিমাত্র হরফ দেখা যাইত, ডাইনে বাঁয়ের উপর নিচের আর কোনও হরফ দেখা যাইত না। এ অবস্থায় যে এ হরফটি চিনিতে পারিত, কেবল সেই ছাত্রের হরফজ্ঞান পূর্ণ হইয়াছে।

আমি সমবয়সী এবং সহপাঠীদের সকলের আগে তেলকা ও হালকা পাশ করিয়া আম সেপারার সবক লইলাম। কয়েক মাসের মধ্যে আমি কোরআন শরিফে সবক লইলাম। আমপারাও কোরআন শরিফের অংশ বটে, কিন্তু ওটা কোরআন শরিফের সর্বশেষ পারা। উহার সুরাগুলি ছোট ছোট বলিয়া আলাদা করিয়া ছাপা হইয়াছে। এবং নাম দেওয়া হইয়াছে আমপারা। স্পষ্টতই এটা করা হইয়াছে কোরআন শরিফ পড়ার প্রথম পাঠ হিসাবে। কোরআন শরিফের ত্রিশটা পারার মধ্যে একমাত্র শেষ পারাটিরই বিশেষ নাম রাখা হইয়াছে। ‘আমপারা। অর্থ করা যায় সাধারণ পাঠ। ইংরাজিতে বলা যায় জেনারেল লেসন। অপর উনত্রিশটি পারার কোনোটারই বিশেষ নাম নাই। প্রথম পাঠ হিসাবে সুরাটির শুধু বিশেষ নামকরণই করা হয় নাই, তার সুরাগুলির স্থানিক মানও একদম পাল্টাইয়া দেওয়া হইয়াছে। কোরআন শরিফের শেষ পারা শুরু হইয়াছে সুরা নাবা’ দিয়া। শেষ হইয়াছে সুরা নাস দিয়া। কিন্তু আমপারা শুরু হইয়াছে সুরা নাস’ দিয়া। শেষ হইয়াছে সুরা নাবা’ দিয়া। কোরআন শরিফে সুরাসমূহের স্থানিক মান বড় হইতে ছোট। আমপারায় ছোট হইতে বড়। প্রাইমারি ছাত্রদের সুবিধার জন্যই এটা করা হইয়াছে। তারা ছোট ছোট সুরা পড়িয়া ক্রমে ক্রমে বড় বড় সুরা পড়িতে শুরু করিবে। আমপারার এই স্বাতন্ত্রের জন্যই এটি পড়া শুরু করাকেই কোরআন শরিফে সবক লওয়া বলা। হয় না। শুধু ‘আলিফ-লাম-মিম’, অর্থাৎ সুরা বাকারা পড়িতে শুরু করার নামই কোরআন শরিফ পড়া আরম্ভ করা। আমার বয়স সাত বছর পূর্ণ হইবার অনেক আগেই আমি কোরআন শরিফ মতন পড়া শেষ করিলাম। মতন পড়া’ মানে অর্থ না বুঝিয়া কোরআন পড়া। আমি যেদিন কোরআন শরিফে প্রথম সবক লইলাম এবং যেদিন খতম করিলাম, উভয় দিনই আমাদের বাড়িতে ছোটখাটো মেবানি হইয়াছিল। ভাইদের বেলাও তা-ই হইয়াছিল। মেহমান খাওয়ানোকেই মেবানি বলা হইত। তৎকালে অবস্থাপন্ন সকলেই তা করিতেন। আমার বড় দুই ভাইয়ের বেলা সেটা আগে হইয়াছিল। তৎকালে লেখা ও পড়া ছিল দুইটা আলাদা কাজ। বই-পুস্তক হাতে পড়ুয়ারারে পথেঘাটে দেখিলেই বুড়ারা পুছ করিতেন, ‘তুমি লেখো, না পড়ো? এ প্রশ্নের কারণ ছিল। মক্তবে শুধু পড়া হইত। লেখা হইত পাঠশালায়। তার মানে বাংলা পড়াইতে লেখার দরকার হইত। আরবি-ফারসি-উর্দু পড়ায় লেখার দরকার হইত না। মানে, লেখা কাজে লাগিত না অথচ মাদ্রাসায় আরবি ফারসি লেখা ও শিখানো হইত। মতন’ কোরআন শরিফ, মসলা-মাসায়েলের রাহে নাজাত বয়াতের গুলো-বুস্তা পড়িতে লেখার কোনো দরকার হয় না। তৎকালে আমাদের বাড়িতে ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে এমন পড়ুয়া অনেক ছিলেন, যারা লিখিতে জানিতেন না বাড়ির মেয়েলোকেরাও অনেকে কোরআন তেলাওয়াত করিতে পারিতেন। বস্তুত আমাদের বাড়ির মুরুব্বিদের মধ্যে একমাত্র চাচাজীই পড়া ও লেখা দুটোই জানিতেন। শুধু লেখা জানিতেন না, স্থানীয় মাদ্রাসায় আরবি-ফারসি পড়িয়া মুনশী’ হওয়া ছাড়াও চাচাজী তত্ত্বালের উচ্চ-প্রাইমারি পাশ করিয়াছিলেন। তাঁর বাংলা ও আরবি হাতের লেখা ছিল অতি চমৎকার, একদম ছাপার হরফ। চিঠিপত্র, জমা খরচ, বছরিয়া চাকররার হিসাবের খাতা তিনি সাধারণ ভাঙা হাতেই লিখিতেন। সে লেখাও তার খুবই সুন্দর ছিল। সে জন্য লোকেরা তাঁকে দিয়া জোরাজুরি করিয়া তমসুক ইত্যাদি লেখাইত। কিন্তু ওসব দলিলে সুদের কথা থাকে। বলিয়া তিনি পরে দলিল তমসুক লেখা ছাড়িয়া দেন।

তাঁর আরবি-ফারসি লেখা এমনকি বাংলা লেখাও ছিল দেখিবার মত। এমন লেখা আনেক কাগজপত্র, ফর্দ ও সিলাই করা জুজ-গাঁথা অনেক খাতা আমরা ছেলেবেলা চাচাজীর কিতাবের বস্তানি ও বাক্সে অনেক দেখিয়াছি। সেগুলি ছিল আরবি-ফারসি-উর্দু ও বাংলা বর্ণমালা, বয়েত-কবিতা অথবা অনেক গদ্য বাক্য। ওসবই তিনি লিখিয়াছিলেন বহু আগে। কিন্তু তখনও সেগুলি ছিল ঝলমলা চকচকা। তৎকালে আজকালের মত বুব্ল্যাকের বোতল বা বড়ি পাওয়া যাইত না। পড়ুয়ারার নিজের হাতে ‘ছিয়াই’ বা কালি বানাইয়া লইতে হইত। চাচাজীরে নিজ হাতে ‘ছিয়াই’ বানাইতে আমরা দেখিয়াছি। নিজেরাও চেষ্টা করিয়াছি। চাউল পুড়া-ভাজার গুড়া, ডেকচি-পাতিলের চুলার কালি ইত্যাদি একসাথে পিষিয়া লাউ-কুমড়ার পাতার রসের সঙ্গে মিশাইয়া এই কালি তৈয়ার করা হইত।

.

. ইয়াকুব মুনশীর নিকট

চাচাজীর এই সব গুণ ছিল বলিয়াই বোধ হয় তার মক্তবে পড়া ও লেখা দুইটাই ছিল। তবে লেখাটা বাধ্যতামূলক ছিল না। চাচাজীর মাদ্রাসার ছাত্ররাও ছিল যেমন অনিয়মিত, স্বয়ং চাচাজীও ছিলেন তেমনি অনিয়মিত। তিনি আত্মীয় বাড়িতে বা শহরে বেড়াইতে গেলে তিনি না ফিরা পর্যন্ত মাদ্রাসা বন্ধ থাকিত। তাতে অনেক সময় একনাগাড়ে দুই-তিন দিন পড়াশোনা হইত না। পড়াশোনায় আমার যেহান ভাল এ কথা সবাই বলিতেন। স্বয়ং চাচাজী। ত বলিতেনই। আমাদের বাড়িতে আগন্তুক আলেম-ফাযেলও সকলেই এক বাক্যে–ই বলিতেন। বোধ হয়, এতেই উৎসাহিত হইয়া দাদাজী চাচাজীর মাদ্রাসায় একজন বেতন করা মৌলবী রাখিবার ব্যবস্থা করিলেন। মুনশী ইয়াকুব আলী সুধারামী নামে একজন নোয়াখালীর মৌলবী সাহেব এই সময় আমাদের বাড়ির মাদ্রাসার শিক্ষক নিযুক্ত হন। আজকাল যেমন সবাইকে যাহা তাহা মৌলবী-মওলানা বলা হয়, তৎকালে তা হইত না। আরবি-ফারসিতে সর্বোচ্চ শিক্ষা লাভ করিয়া সনদ না পাইলে কাউকে মৌলবী বলা হইত না। তৎকালে আরবি-ফারসিতে এমন সব পণ্ডিত লোককে মুনশী বলা হইত, যাদের সমান জ্ঞান আজকাল অনেক তথাকথিত মওলানারও দেখা যায় না। এই কারণে মৌলবী ইয়াকুব আলী সুধারামী আমাদের অঞ্চলে ইয়াকুব মুনশী নামেই পরিচিত ছিলেন। উভয়েই মুনশী হইলেও সুধারামী সাহেব চাচাজীর চেয়ে সকল দিকেই লায়েক ছিলেন। তার মাহিনা নির্ধারিত হইল পাঁচ টাকা। এই পাঁচ টাকা বাড়াইয়া কোনো দিন ছয় টাকা করা হয় নাই। কিন্তু মৌলবী সাহেব ঐ বেতনেই তিন বছরকাল আমাদের মাদ্রাসায় পড়াইয়াছিলেন। কারণ তার মাসিক আয় ঐ পাঁচ টাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক বেশি ছিল। আমার এক নানা মুনশী ওয়ালি মাহমুদ মির‍্যা আমাদের বাড়ির মসজিদের স্থায়ী ইমাম ও সারা গায়ের মোল্লা ছিলেন। আঞ্চলিক মোল্লার কাজ ছিল বিয়া পড়ানো, সদকা-আকিকা-কোরবানির গরু-খাসি যবেহ করা, মউতার জানাযা পড়া এবং খতম পড়া। জানাযার মোল্লাকি ছাড়া সদকা-আকিকা-কোরবানির গরু-খাসির চামড়া মোল্লার প্রাপ্য ছিল। এতে মোল্লাজির বার্ষিক আয় খুব মোটা রকমের ছিল। আমার নানা মির‍্যা সাহেব অতিবৃদ্ধ হওয়ায় এক ইমামতি ছাড়া তার আর সব কাজ ও তাদের পাওনা মৌ. ইয়াকুব আলীর অনুকূলে ছাড়িয়া দেন। তাতে মৌলবী সাহেব যথেষ্ট রোযগার করিয়া মাসে মাসে বাড়িতে টাকা পাঠাইতে পারিতেন। একাদিক্রমে তিন বছর আমাদের বাড়িতে শিক্ষকতা করিয়া অবশেষে তিনি দেশে চলিয়া যান। শিক্ষকতা ছাড়িয়া দিলেও যত দিন তিনি বাঁচিয়াছিলেন, তত দিন প্রতিবছর রমযান মাসে তিনি আমাদের বাড়ি আসিতেন এবং মাসাবধি থাকিয়া গ্রামময় দাওয়াত খাইয়া বেশ টাকা পয়সা লইয়া দেশে ফিরিতেন। ফলত, এ গ্রামের শিক্ষিত লোকেরা প্রায় সকলেই সুধারামী মুনশী সাহেবের ছাত্র ছিলেন। কাজেই আমাদের গ্রামে তাঁর কদর ও দাওয়াতের কোনো অভাব ছিল না।

‘সুধারামী মুনশী’ সাহেব আমাদের মক্তবের ভার নেওয়ার পর সেখানে নিয়মমত হাজিরা বই করা হইল। দহম, নহম হাতম, হাতম এই চারিটি শ্রেণীর ছাত্রদের আলাদা করিয়া বসানো হইল। সুধারামী উপরের দুই ক্লাস এবং চাচাজী নিচের দুই ক্লাস পড়াইতেন। আমরা কাজেই উপরের শ্রেণীর ছাত্র হইলাম। সুধারামী সাহেব যত দিন আমাদেরে আরবি-ফারসি পড়াইয়াছেন, তত দিন চাচাজীর নিকট আর পড়ি নাই। কিন্তু ঐ সময় রাত্রে চাচাজীর কাছে বাংলা পড়িতাম। তিনি বর্ণ বানান শিক্ষানামক একখানি চটি বই আমাদের জন্য কিনিয়াছিলেন। চাচাজী মাদ্রাসার জমাতে চাহারম পড়ার পর উচ্চ প্রাইমারি পাশ করিয়াছিলেন। ছেলেবেলা তার বাক্সে পি ঘোষের পাটিগণিত, গোরীশংকরের বীজগণিত মলাটছেঁড়া ত্রিকোণমিতি বই দেখিয়াছি। পরে আমরা স্কুলে ইংরাজি পড়াশোনা শুরু করিলে চাচাজী নিজে রাজভাষা নামে একখানি বাংলা বই কিনিয়া কিছু কিছু ইংরাজি শিখাইয়াছিলেন। বাংলা ভাষার মাধ্যমে ইংরাজি শিক্ষার জন্য তৎকালে ইহা নামকরা পুস্তক ছিল।

সুধারামী সাহেবের পরে পরপর দুইজন মৌলবী আমাদের বাড়ির মাদ্রাসায় মুদাররেসি করিয়াছিলেন। কিন্তু এঁদের দুইজনের একজনও আমাদের বাড়িতে থাকিতেন না। এঁদের প্রথমজন ছিলেন মৌলবী মমতাযুদ্দিন। তিনি থাকিতেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেবদের বাড়িতে। ভোরের বেলা তিনি শামসুদ্দিন, তাঁর ভাই সদরুদ্দিন ও পাড়ার সমস্ত তালেবিলিমসহ দল বাঁধিয়া আসিতেন এবং ছাত্রদের দশটার সময় পাঠশালায় পড়িতে যাওয়ার সুবিধার জন্য যথাসময়ে মাদ্রাসা ছুটি দিয়া দল-বলে চলিয়া যাইতেন। ইতিমধ্যে ধানীখোলা জমিদার কাছারিতে যে একটি পাঠশালা স্থাপিত হইয়াছিল, সে কথা একটু পরেই বলিতেছি।

বছরখানেকের বেশি মৌলবী মমতাযুদ্দিন আমাদের বাড়ির মাদ্রাসায় ছিলেন না। তিনি চলিয়া যাওয়ার পর আমাদের মাদ্রাসার শিক্ষক হন মৌলবী আবদুল আজিজ। এঁর আমলেই আমাদের বাড়ির মাদ্রাসা উঠিয়া যায়। এই সময় আমরা দুই ভাই ও শামসুদ্দিনরা দুই ভাই ধানীখোলা পাঠশালায় পড়া শেষ করি। শামসুদ্দিনরা চলিয়া যায় শহরে। আমরা চলিয়া যাই দরিরামপুর মাইনর স্কুলে। আমাদের অভাবে আমার মুরুব্বিরা মাদ্রাসা চালাইতে আর তেমন উৎসাহ বোধ করিলেন না। বোধ হয় প্রধানত সেই কারণেই আস্তে আস্তে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অনুৎসাহে মাদ্রাসা উঠিয়া যায়।

.

. পাঠশালায়

ইতিপূর্বে সুধারামী সাহেবের আমলেই আমাদের গ্রামে জমিদার কাছারিতে একটি পাঠশালা স্থাপিত হয়। এই পাঠশালা স্থাপনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। আমাদের গ্রামের অন্যতম প্রধান মাতব্বর ওসমান আলী সরকার (পরবর্তীকালে খান সাহেব)। ইনি আমাদের দুই ভাইকেই এই পাঠশালায় দিতে দাদাজীকে ধরিয়া পড়েন। তখন আমরা তিন ভাই বাড়ির মাদ্রাসায় পড়িতাম। তার মধ্যে মাত্র একজনকে বাংলা লাইনে দিয়া অপর দুই ভাইকে দীনী লাইনে রাখার জন্য আমার মুরুব্বিরা জিদ করেন। কিন্তু ওসমান আলী সাহেবের পীড়াপীড়িতে এবং দাদাজীর সমর্থনে আমরা দুই ভাই (আমাদের সকলের জ্যেষ্ঠ মোহাম্মদ মকিম আলী ও আমি) পাঠশালায় ভর্তি হই। পাঠশালায় যাওয়ার সুবিধার জন্য আমাদের বাড়ির মাদ্রাসার সময় বদলাইয়া দুপুর হইতে সকালে আনা হয়। এই সময় আমরা ফারসি শেখ সাদী ও ফরিদুদ্দিন আত্তারের পান্দেনামা ও শেখ সাদীর গোলেস্ত-বুস্তা, উর্দু রাহেনাজাত, মেফতাহুল জান্নাত ও ফেকায়ে মোহাম্মদী পড়িতেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মুযদার ফাইয়ুসনামে ব্যাকরণের বইও পড়িতেছিলাম!

জমিদার কাছারিরই একটি বাড়তি ঘরে আমাদের এই নয়া পাঠশালা শুরু হয়। প্রথমে কাছারির অন্যতম নায়েব বিক্রমপুর নিবাসী শ্ৰীযুক্ত মথুরা নাথ চক্রবর্তীর আত্মীয় শ্রীযুক্ত জগদীশ চন্দ্র চক্রবর্তী আমাদের পাঠশালার শিক্ষক হন। কিন্তু দু-মাস যাইতেই জগদীশ বাবু অন্যত্র চলিয়া যান। তখন আমাদের গ্রামের অন্যতম প্রধান মাতব্বর ও তালুকদার শ্রীযুক্ত উমাচরণ সরকারের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীযুক্ত জগদীশ চন্দ্র সরকার আমাদের শিক্ষক হইয়া আসেন। জগদীশ বাবু ছিলেন তৎকালের এন্ট্রান্স পড়া যুবক। তিনি উৎসাহী কর্মী, মিষ্টভাষী, সুপুরুষ, মধুর-কণ্ঠী গায়ক ছিলেন। অতি অল্প দিনে তিনি ছাত্রদের মন জয় করিলেন। পড়াশোনা ও খেলাধুলায় জগদীশবাবু আমাদের প্রাণে বিপুল সাড়া জাগাইলেন। বাংলা, অঙ্ক ও শুভঙ্করী শিক্ষাদান ছাড়া তিনি পাঠশালায় ড্রয়িং ও ড্রিলের আমদানি করিলেন। এর উপর তিনি সপ্তাহে দুই এক দিন ইংরাজি পড়াইতে লাগিলেন। তিনি আমাদের দিয়া ওয়ার্ডবুক অথবা স্পেলিং বুক নামে এক আনা দামের বই কিনাইলেন। ইংরাজি পড়া ও চিত্র অঙ্কন করা নিয়া আমাদের বাড়িতে কয়েক দিন মুরুব্বিদের দরবার হইল। শেষ পর্যন্ত ইংরাজি পড়ার এবং মানুষের মূর্তি ছাড়া অন্য রকম চিত্র আঁকিবার অনুমতি পাওয়া গেল।

.

. স্বদেশি ধুতি

এটা ছিল ইং ১৯০৬ সাল। এই সময় স্বদেশি আন্দোলন ও বিলাতী বয়কট শুরু হয়। কিন্তু আমরা অত শত জানিতাম না। যা জানিতাম তা এই যে, আমাদের মাস্টার মশায়, আমাদেরে স্বদেশি ধুতি পরিতে বাধ্য করিলেন। এখানে বলা আবশ্যক যে, তৎকালে মুসলমানদের মধ্যেও সাধারণ ভদ্রলোকের পোশাক ছিল ধুতি। মুনশী-মৌলবীরা অবশ্য গায়ে লম্বা কোর্তা ও পরনে পাজামা অথবা তহবন্দ ব্যবহার করিতেন। কিন্তু মুনশী-মৌলবী নন এমন সব মুসলমান ভদ্রলোকেরা ধুতি পাঞ্জাবি শার্ট এবং শার্ট পাঞ্জাবির উপর গরমের দিনে ঠাণ্ডা কোট ও শীতের দিনে গরম কোট পরিতেন। ধুতি শার্ট কোটের উপর দামি পশমি শাল পরিয়া তার উপর লাল তুর্কি টুপি পরিতে তৎকালে আমার অনেক মুরুব্বিকেই দেখিয়াছি। চাচাজী মুনশী ছিলেন বলিয়া তিনি সাধারণত তহবন্দের উপর লম্বা কোর্তা পরিতেন। কিন্তু দাদা ও বাপজী মুনশী বা মৌলবী ছিলেন না বলিয়া বাড়িতে যদিও তহবন্দ পরিয়াই থাকিতেন, কিন্তু হাটে-বাজারে ও বিবাহ-মজলিসে যাইবার কালে তারাও ধুতি পরিয়াই যাইতেন। তবে তাঁদেরে পাড়ওয়ালা ধুতি পরিতে খুব কমই দেখিয়াছি। সাধারণত তারা চুলপাড় ধুতি পরিতেন। তালের আঁশের টুপি, ইরানি টুপি বা সাদা গোল টুপিই তাঁদের শিরস্ত্রাণ ছিল।

কিন্তু আমরা মাদ্রাসার যাইবার সময় তহবন্দ ও পাঠশালায় যাইবার সময় ধুতি ও মাথায় লাল তুর্কি টুপি পরিয়া যাইতাম। এটা তঙ্কালের নিয়ম ছিল। তহবন্দ পরিয়া পাঠশালায় যাওয়ার কথা কেউ কল্পনাও করিতে পারিতেন না। আমাদের মাস্টার মশায় যখন জোর করিয়া আমাদেরে স্বদেশি ধুতি পরাইলেন, তখন আমরা মনে মনে মাস্টার মশায়ের উপর অসন্তুষ্ট হইলাম। আমাদের অসন্তোষের কারণ ছিল দুইটি। এক. স্বদেশি ধুতি ছিল বিলাতী ধুতির চেয়ে অনেক মোটা ঘবসা ও খসখসা। দুই. স্বদেশি ধুতির পাড়ের রং ছিল একেবারে কাঁচা। প্রথম ধাপেই পাড়ের রং উঠিয়া গোটা ধুতিটাতেই ছাকা ছাকা রং লাগিয়া যাইত। কাঁচা রঙের চিরন্তন বিশেষত্ব এই যে রং আসল জায়গা হইতে উঠিয়া অন্য জায়গায় লাগিলেই সেটা পাকা হইয়া যায়। সেখান হইতে তাকে আর হাজার চেষ্টায়ও তোলা যায় না। একশ্রেণির লোক আছে যারা ভাল কাজ করিতে পারে না, কিন্তু কুকার্যের উস্তাদ। কাঁচা রঙের স্বভাবও তা-ই। নিজের জায়গায় যে কাঁচা বটে, কিন্তু বেজায়গায় সে একদম পাকা। বিলাতী ধুতির পাড়ের রং এত পাকা ছিল যে, ধুতিটা পুরাতন হইয়া ফাটিয়া-ছিঁড়িয়া যাওয়ার পরও পাড়ের রংটা চকচক করিত। এই পাকা রঙের পাড় দিয়া অনেক কাজ হইত। পক্ষান্তরে বিলাতী ধুতি ছিল মিহিন ও মসৃণ। পরিতে কত আরাম। সে স্থলে দেশি ধুতিতে গায়ের চামড়া কুটকুট করিত।

এমন মোলায়েম মিহিন বিলাতী ধুতি ফেলিয়া যেদিন মাস্টার মশায়ের হুকুমে এবং একরকম যবরদস্তিতে ঘবসা স্বদেশি ধুতি পরিতে বাধ্য হইলাম, সেটা ছিল আমাদের একটা দুঃখের দিন। কিন্তু দুইটা কারণে আমরা বিনা প্রতিবাদে এই দুঃখ বরণ করিলাম। প্রথমত, মাস্টার মশায় অত বড় ফিটবাবু হইয়াও নিজেও ঐ মোটা ঘবসা স্বদেশি ধুতি পরিতেন। দ্বিতীয়ত, তৎকালে উস্তাদকে আমরা বাপ-মার মতই মুরুব্বির গুরুজন মনে করিতাম। তাদের কাজ না পছন্দ করা বা তাদের কথায় ‘না’ বলা আমাদের স্বপ্নেরও অগোচর ছিল।

.

. পাঠ্য বিষয়

আগেই বলিয়াছি, পাঠশালায় শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে আমার মাদ্রাসার শিক্ষাও চলিতে লাগিল। সকালে উঠিয়া ফযরের নামাজ পড়িয়াই মাদ্রাসায় পড়িতে বসিতাম। ফাঁক পাইলে এই সময়ের মধ্যে তাড়াতাড়ি নাকে-মুখে চিড়া মুড়ি বা খই পিঠা পুঁজিয়া নাশতা করিয়া লইতাম। না হইলে বিনা নাশতাতেই মাদ্রাসায় বসিতাম। এক প্রহর বেলা হইতেই মাদ্রাসা ছুটি হইয়া যাইত। গোসল খাওয়া সারিয়া পাঠশালায় যাইতাম। বাড়িতে ঘড়ি ছিল না। কিন্তু বাড়ির মুরুব্বিদের সকলের, এমনকি মেয়েদেরও, এমন নিখুঁত সময়ের আন্দাজ ছিল যে ঠিক দশটার সময় পাঠশালায় হাজির হইতাম। অবশ্য পাঠশালাতেও ঘড়ি ছিল না। কিন্তু কাছারিতে বড় দেওয়াল ঘড়ি। ছিল। সেটা দেখিয়া দারওয়ান ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেল পিটাইয়া সারা গায়ে সময় ঘোষণা করিত। সাড়ে দশটা হইতে চারটা পর্যন্ত পাঠশালা বসিত। মাঝখানে আধঘণ্টা লেইজার বাদে মোট পাঁচ ঘণ্টা পড়া হইত। ১৯০৬ সালে যখন আমি প্রথম পাঠশালায় ভর্তি হই, তখন আমার বয়স আট বছর। বাড়ির মাদ্রাসায় আমি তখন মতন কোরআন শেষ করিয়া ফেকায়ে মোহাম্মদী, রাহেনাজাত, শেখ সাদীর পান্দেনামা ও গুলিস্তাঁ পড়িতেছি। যদিও আমাদের বাড়ির মাদ্রাসায় কোনো জমাত ছিল না, তথাপি চাচাজী ও মৌলবী সাহেবরা বলিতেন আমি জমাতে দহমের দরস পড়িতেছি। এই সময় পাঠশালায় ‘গ’ মিতি, ‘খ’-মিতি ও ‘ক’-মিতি এই তিনটা শিশু শ্রেণী ও তারপর ১ম ও ২য় শ্রেণী এই পাঁচ বছরের কোর্স ছিল। আমরা দুই ভাইকে প্রথমে ‘গ’-মিতিতে ভর্তি করা হইলেও বাড়িতে আমাদের বর্ণ পরিচয় হইয়াছিল বলিয়া তিন মাস পরে ‘খ’-মিতি এবং ছয় মাস পরে ‘ক’ মিতিতে আমাদের প্রমোশন দেওয়া হইল। ‘ক’-মিতিতে আমরা এক বছর পড়িলাম এবং এখানেই বাংলা সাহিত্য, অঙ্ক, শুভঙ্করী ও ‘ওয়ার্ডবুক’ পড়িলাম। সাহিত্য মানে বোধোদয় ও অঙ্কের নামতা, সরল যোগ-বিয়োগ এবং শুভঙ্করী আর‍্যা এই সব পড়িতাম। মাদ্রাসায় তিন ঘণ্টা সময়ে একটি হিন্দি মানে, উর্দু বই, দুইটা-দুইটা ফারসি বই পড়িতাম ও দুপুরে পাঠশালায় পাঁচ ঘণ্টা পড়া হইত। বাড়িতে পড়িবার সময় ছিল মগরেবের ও এশার নামাজের মধ্যেকার দুই ঘণ্টা সময়। এশার নামাজের পরই খাইয়া-দাইয়া ঘুমাইয়া পড়িতাম। পরের বছর যখন আমি পাঠশালায় ১ম শ্রেণীতে উঠিলাম, তখন মাদ্রাসায় জমাতে নহমে উঠিলাম। জমাতে নহমে সাদীর বুস্তা, ফরিদুদ্দিন আত্তারের পান্দেনামা ও ফেকায়ে মোহাম্মদীর বৃহত্তর অংশ ছাড়াও নহু সরফ ও মুসদার ফাইউস নামে দুইখানা আরবি ব্যাকরণের বই (উর্দুতে লেখা) পড়িতে হইত। পাঠশালায় প্রথম শ্রেণীতে কঠিনতম সাহিত্য, জটিলতর অঙ্ক ও শুভঙ্করী ছাড়া এই সময় বিজ্ঞান প্রবেশ নামক একখানা বিজ্ঞানের বই এবং শরীর পালন নামক একখানা স্বাস্থ্য বইও আমাদের পাঠ্য হয়। এর উপর ড্রিল-ড্রইং ত ছিলই। তৎকালে আমার মত আট-নয় বছরের শিশুর পক্ষে এতগুলি ভাষা ও বিষয় শিক্ষা খুব ভারী বোধ। হয় নাই।

আমি ‘ক’-মিতি হইতে প্রথম শ্রেণীতে উঠিবার অল্প দিন পরেই মাস্টার। মশায় জগদীশ বাবু ছুটি নেন। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা দীনেশ চন্দ্র সরকার বড় ভাইর স্থলে একটিনি (এ্যাটিং) করিতে আসেন। জগদীশ বাবু তৎকালে আমাদের অঞ্চলে শ্রেষ্ঠ গায়ক ছিলেন। তাঁর গলা অপূর্ব রকম মিঠা ছিল। কলের গানে গান গাইবার জন্য (গ্রামোফোনে রেকর্ড করাইবার জন্য) তিনি কলিকাতা না কোথায় চলিয়া যান, আর মাস্টারিতে যোগ দেন নাই। দীনেশ বাবুও এন্ট্রেন্স ফেল করিয়া হোমিওপ্যাথিক পড়িতে যান। আমাদের গ্রামের যশস্বী শিক্ষক এতদঞ্চলে প্রায় সকল লোকের উস্তাদ আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব এই সময় আমাদের শিক্ষক হইয়া আসেন। ইতিপূর্বে পাশের গ্রাম। বৈলরের পাঠশালায় তিনি বহুকাল ধরিয়া শিক্ষকতা করিয়া আসিতেছিলেন। নিচে লেখা ঘটনাসমূহের কারণে বাধ্য হইয়াই তিনি বৈলর পাঠশালা ছাড়িয়া ধানীখোলার শিক্ষক হইয়া আসেন।

.

. ধানীখোলা-বৈলর বিরোধ

বৈলর ও ধানীখোলা পাশাপাশি দুইটি বড় গ্রাম। মাঝখানে সুতোয়া নদী। নদীর একপারে বৈলরের জমিদারবাড়ি ও তৎসংলগ্ন বৈলরের বাজার। নদীর অপর পারে মুক্তগাছার জমিদারদের তিন হিস্যার কাছারি এবং তৎসংলগ্ন বাজার। দুই বাজারই যথেষ্ট সমৃদ্ধিশালী। তৎকালে সুতোয়া নদীর অবস্থা বর্তমানের মত শোচনীয় ছিল না। বার মাস নৌকা চলাচল করিত। বিশেষত, বর্ষাকালে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বর্মী, ভৈরব ও চানপুর হইতে মালপত্র লইয়া বড় বড় নৌকা এই নদী দিয়া চলাচল করিত। আমরা ছেলেবেলা বৈলর ও ধানীখোলা বাজারের ঘাটে বড় বড় নৌকা বাঁধা দেখিয়াছি। বাজারের মহাজনদের দোকানের মাল : লোহা, টিন, ধান, চাউল, হাঁড়ি, পাতিল, কড়াই এই সমস্ত নৌকা হইতে ওঠা-নামা করিতে দেখিয়াছি।

মোটকথা, নদীর দুই পারের দুইটা বাজারই সরগরম অথচ নদী। পারাপারের ব্যবস্থা নাই। জিলা বোর্ডের বা লোক্যাল বোর্ডের তরফ হইতে কোনো পোল বা গোদারা নাই। জমিদারদের তরফ হইতেও না। শুধু হাটবারে জমিদারপক্ষ হইতে হাটুরিয়াদের পারাপারের জন্য সাময়িক ব্যবস্থা হইত। বৈলর বাজারের হাট বসিত শনি ও বুধবারে। ধানীখোলার হাট বসিত শুক্রবার ও মঙ্গলবারে। কাজেই সপ্তাহের মধ্যে চার দিনই জমিদারপক্ষ হইতে নৌকার ব্যবস্থা থাকিত। কিন্তু তাতেও পাবলিকের দুর্দশা দূর হইত না। কারণ অ-হাটের তিন দিন রবি, সোম ও বিষুদবার নদী পারাপারের কোনোই ব্যবস্থা। ছিল না। হাটবারের চার দিনও শুধু বিকাল ও সন্ধ্যাবেলা জমিদারদের নৌকা পারাপার হইত।

কিন্তু নৌকাগুলি ভাড়াটিয়া নৌকা ছিল না। জমিদারদের কিনা নিজস্ব। নৌকা। তাতে পারাপারে পয়সা-কড়ি লাগিত না। জমিদারদের নিজের নৌকা বলিয়া অ-হাটবারেও নৌকাগুলি ঘাটের আশেপাশেই বাঁধা থাকিত। কিন্তু মাল্লারা জমিদারদের লোক বলিয়া তারা নৌকায় থাকিত না। অন্য কাজে যাইত। তবে নদীর পাশের সমান লম্বা দুইটা মযবুত রশি নৌকার দুই গলুইর গোড়ায় বাঁধিয়া দুই পাড়ে দুইটা খুঁটিতে বাঁধিয়া রাখিত। রশি ধরিয়া টানিয়া লগি ছাড়াই এক পাড়ের নৌকা অপর পাড়ে নেওয়া চলিত। এই অবস্থা চলিবার সময় হাটবার লইয়া দুই বাজারের মালিকদের মধ্যে বিরোধ বাধে। এই বিরোধ ফৌজদারি কোর্টে পর্যন্ত গড়ায়। আগেকার জমিদাররা অতি সহজেই প্রজা-সাধারণকে দিয়া নিজেদের স্বার্থে ও পক্ষে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করাইতে পারিতেন। জমিদারদের সীমা ও চর জমির দখল লইয়া দুই জমিদারের বিরোধ প্রজাদের নিজেদের মধ্যে খুনাখুনি করিতে আমি ছেলেবেলা একাধিকবার দেখিয়াছি। তদুপরি এই বাজার-বিরোধটার মধ্যে প্রজা, সাধারণের স্বার্থ সোজাসুজি জড়িত ছিল। কাজেই জমিদারদের বিরোধ অতি সহজেই বৈলর-ধানীখোলাবাসীর বিরোধে পরিণত হইল। দুই গ্রামের লাঠিওয়ালারা নদীর পাড়ে দাঁড়াইয়া লাঠি ঘুরাইতে লাগিল। এক গ্রামের পক্ষে অন্য গ্রামের ভিতর দিয়া চলাচল বিপজ্জনক হইয়া উঠিল।

.

. আলিমুদ্দিন মাস্টার

এই বিপদ আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেবকেও ছাড়িল না। তিনি ধানীখোলার লোক। কাজেই বৈলর যাওয়া তার পক্ষে বিপজ্জনক হইল। তিনি একাই মাস্টারি করিতে যাইতেন না। তাঁর প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের কয়েকজন ছাত্রও স্বভাবতই তার পাঠশালায় যাইত। এই সময় আমাদের মাস্টারের অভাব হইয়াছিল। সুতরাং, আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব অতি সহজেই ধানীখোলা পাঠশালার মাস্টারি পাইলেন। ছাত্ররা এবং তাহাদের অভিভাবকেরা আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেবকে পাইয়া খুশি। কারণ, তিনি দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসাবে খুব নাম করিয়াছিলেন। তিনি আমাদের স্কুলের মাস্টারি নিবার পর আমাদের স্কুলের ছাত্রসংখ্যা বাড়িয়া গেল। বাজার লইয়া গন্ডগোল মিটিবার পরে বৈলর গ্রাম হইতেও অনেক অনেক ছাত্র আমাদের স্কুলে চলিয়া আসিল।

আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব আমাদের পাঠশালার শিক্ষক হইবার পর তিনি এই স্কুলে কতকগুলি সংস্কার প্রবর্তন করিলেন। (এক) পাঠশালার বার্ষিক পুরস্কার-বিতরণী সভার আয়োজন হইল। গ্রামের ছুটির প্রাক্কালে সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে এই বার্ষিক সভা হইত। তাতে পর্দাঘেরা মঞ্চ করা হইত। মাস্টার সাহেব নিজে মঞ্চের ডিরেক্টর হইতেন। নিজ মুখে হুইসেল মারিয়া, নিজ হাতে রশি টানিয়া তিনি মঞ্চের পর্দা খুলিতেন ও বন্ধ করিতেন। ছাত্ররা এক মাস ধরিয়া শিখানো আবৃত্তি ঠিকমত করিতেছে কি না পর্দার পিছন হইতে তিনি দেখিতেন এবং প্রক্ট করিতেন। সভার শুরুতে তিনিই সমাগত অতিথিদিগকে স্বাগত জানাইতেন। সভা শেষে তিনিই সকলকে ধন্যবাদ দিতেন। মোটকথা, আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব ছিলেন উৎসাহ-উদ্যমের প্রতিমূর্তি। (দুই) তিনি স্কুল গৃহ বদলাইলেন। আগে স্কুলঘর ছিল কাছারির পূর্ব প্রান্তে একেবারে বাজারসংলগ্ন। বাজারের এত নিকটে স্কুল থাকা ভাল নয় বলিয়া তিনি স্কুল সরাইয়া নিয়া গেলেন কাছারির অনেক পশ্চিমে পুকুরেরও পশ্চিম পাড়ে। আগের ঘরটি ছিল টিনের চৌচালা। নূতন ঘরটি হইল ছনের দুচালা। এতে বরঞ্চ ভাল হইল। গরমের দিনে টিনের ঘরে খুব অসুবিধা হইত। এখন ছনের ঘরে আরাম হইল। আরেক কারণে মাস্টার সাহেব বাজারের অত নিকট হইতে স্কুল সরাইয়া নিয়াছিলেন। সেটি তখন বুঝি নাই। বড় হইয়া। বুঝিয়াছিলাম। সে কারণ এই যে অন্যান্য বাজারের মত ধানীখোলা বাজারেও বেশ্যাপল্লি ছিল। তৎকালে বেশ্যাপাড়া ছাড়া বাজার করা যাইত না। (৩) আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব স্কুলগৃহের মধ্যভাগকে তিন ক্লাসে বিভক্ত করিয়াছিলেন। কোনো পার্টিশন বা বেড়া-টাট্টি দিয়া নয়, শুধু বেঞ্চি পাতিয়া। একদিকে দ্বিতীয় শ্রেণী, মধ্যভাগে প্রথম শ্রেণী, আরেক পাশে ‘ক’-মিতি, ‘খ’ মিতি ইত্যাদি নিম্ন শ্ৰেণী। মাস্টার সাহেব একাই শিক্ষক ছিলেন এবং মাঝখানের ক্লাসে বসিয়া তিন ক্লাসই এক জায়গা হইতে পড়াইতেন। তবু দেখিতে স্কুলটির অভ্যন্তর ভাগ তিনটি আলাদা ক্লাস দেখাইত। (চার) মাস্টার সাহেব তত্ত্বালে ইংরাজি জানিতেন না বলিয়া জগদীশ বাবুর প্রচলিত নিয়ম বজায় রাখিবার জন্য কার্ত্তিক বাবু নামে কাছারির জনৈক আমলাকে সপ্তাহে দুই ঘণ্টা করিয়া ইংরাজি ক্লাস লইতে রাজি করেন। কার্তিক বাবু এ জন্য কোনো পয়সা-কড়ি নিতেন না। (পাঁচ) তিনি সব সময় টুপি পরিয়া স্কুলে আসিতেন। কখনও খালি মাথায় আসিতেন না। ছাত্রদেরেও টুপি পরিয়া আসিতে বলিতেন। তবে কেউ টুপি পরায় গাফলতি করিলে শাস্তি দিতেন না। তিনি নিজে ধুতি ও তহবন্দ উভয় পোশাকেই স্কুলে আসিতেন। তবে সাব ইন্সপেক্টর স্কুল পরিদর্শনে আসিবার দিন তিনি ধুতি পরিয়াই আসিতেন। তিনি নিজে তহবন্দ পরিলেও ছাত্রদের তিনি তহবন্দ পরিতে তাকিদ দিতেন না। স্কুলঘরের সামনে খানিকটা জায়গা বেড়া দিয়া তিনি নামাজের জায়গা করেন। এই বেড়ার চারদিকে পাতাবাহারের গাছ লাগাইয়া জায়গাটি সুন্দর রাখিতেন। নামাজের জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখিবার জন্যে তিনি নিজে আমাদিগকে লইয়া ঝাড় দিতেন এবং ঘাস লম্বা হইয়া গেলে কাটিয়া ফেলিতেন। প্রতিদিন যোহরের ওয়াক্তে ছাত্রদের লইয়া তিনি নামাজ পড়িতেন। যারা অযু নামাজ জানিত না বা সুরা তকবির পড়িতে পারিত না, তাদেরেও তিনি তার সাথে সাথে উঠবসা করিতে হুকুম দিতেন। একটু একটু করিয়া সকলকেই তিনি নামাজ শিখাইতে চেষ্টা করিতেন। নামাজের জায়গায় বিছাইবার জন্য তিনি ছাত্রদের নিকট হইতে চাঁদা তুলিয়া চট কিনিয়াছিলেন। এই চট স্কুলের বাক্সে সযত্নে রাখিয়া দিতেন এবং তার চাবি নিজের কাছে রাখিতেন। এইসব চাদা ও ছাত্র-বেতন সম্পর্কে মাস্টার সাহেব সুবিচারি লোক ছিলেন। গরীব ছাত্রদের বেতন ছিল অবস্থাভেদে এক আনা, দুই আনা, চারি আনা। অনেকে ছিল ফ্রি। কিন্তু আমরা দুই ভাই, শামসুদ্দিনরা দুই ভাই ও ওসমান আলী সরকার সাহেবের এক ভাই সাদত আলী এই ধরনের অবস্থাশালী ছাত্রদের বেতন ছিল আট আনা করিয়া। এছাড়া তিনি অভিভাবকদের নিকট হইতে পাটের মওসুমে পাট ও ধানের মওসুমে ধান তুলিয়া স্কুলগৃহের সাজসরঞ্জাম, যথা টেবিল, চেয়ার, বেঞ্চি, ব্ল্যাকবোর্ড, ভূচিত্রাবলি, গ্লোব, ঘড়ি ও ঘণ্টা কিনিয়াছিলেন এবং এইসব রাখার জন্য প্রথমে বাক্স এবং শেষে আলমারি তৈয়ার করিয়াছিলেন। (ছয়) হাতে-কলমে। বিজ্ঞান পড়াইবার উদ্দেশ্যে তিনি আমাদের হাতে স্কুল ঘরের পাশে ও পিছনে নানাবিধ ফল-ফুলের গাছ লাগাইতেন। আমরা সকলেই ছিলাম কৃষকশ্রেণির লোক। কাজেই হাতে-কলমে কৃষি-কার্য শিখাইবার উদ্দেশ্যে তিনি একবার পানি-কাদার মধ্যে রোয়া ধান লাগাইতে আমাদের কামলা লইয়াছিলেন, অর্থাৎ স্কুলের সকল ছাত্রকে তিনি একদিন নিজের বাড়িতে দাওয়াত করিলেন। আমরা প্রায় সকলেই মাস্টার সাহেবের বাড়ি গেলাম। তিনি আমাদিগকে চিড়া ভাজা নাশতা খাওয়াইয়া ক্ষেতে নিয়া গেলেন। আমাদের সকলের হাতে এক এক মুঠা জালা (চারাধান গাছ) দিয়া এবং নিজে এক মুঠা লইয়া কাতার বাঁধিয়া রোয়া লাগাইতে শুরু করিলেন। আমাদের সহপাঠীরা প্রায় সকলেই নিজের হাতে কম-বেশি এ কাজ আগেই করিয়াছিল। আমরা দুই ভাই এবং শামসুদ্দিনরা দুই ভাই এবং সাদত আলী আমরা কেউ কোনো দিন নিজ হাতে রোয়া লাগাই নাই। কিন্তু সে কথা স্বীকার করিয়া বোকা বনিতে কেউ রাজি হইলাম না। আমরা মাস্টার সাহেবের এবং অন্য ছাত্রদের দেখাদেখি রোয়া লাগাইয়া পুরা ক্ষেত শেষ করিয়া ফেলিলাম। মাস্টার সাহেব আমাদের দক্ষতায় খুব খুশি হইলেন। বেলা পশ্চিম দিকে হেলিয়া পড়িলে সবাই মাস্টার সাহেবের বাড়ি ফিরিলাম। বাড়ির পাশের নদীতে গোসল করিয়া শরীরে মাস্টার সাহেবের দেওয়া প্রচুর সরিষার তেল মাখিয়া খাইতে বসিলাম। মাস্টার সাহেব আমাদের খাওয়ার জন্য মাছ-গোশত ও দুধ-কলা চিনিতে প্রচুর আয়োজন করিয়াছিলেন। আমরা তকালেই হিসাব করিয়া দেখিয়াছি, রোজানা বেতন দিয়া তিনি যদি কৃষিশ্রমিক নিযুক্ত করিতেন, তবে তাদের বেতন ও খোরাকিতে তার অত টাকা লাগিত না। দুই-তিন দিন পরে মাস্টার সাহেব আমাদেরে জানাইয়াছিলেন যে আমাদের রোয়া লাগানো ক্ষেতের বেশির ভাগ চারা মরিয়া গিয়াছে। তিনি চারাগুলি উখাড়িয়া দেখিয়াছেন যে আমরা অনেকেই জালার গোড়া ভাঙ্গিয়া মাটিতে পুঁতিয়া রাখিয়াছি। অতঃপর আর কোনো দিন মাস্টার সাহেব আমাদের নিয়া কোনো চাষের কাজ করান নাই।

(সাত) আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব আমাদের স্কুলে আর একটি সংস্কার। প্রবর্তন করেন। সেটা হইল শুক্রবার মর্নিং স্কুল। স্কুলের আশপাশে প্রায় আধা মাইলের মধ্যে কোনো মসজিদ বা জুম্মাঘর ছিল না। কাজেই ছাত্রদের জুম্মার নামাজ পড়িবার সুবিধার জন্য তিনি শুক্রবারে সকাল ছয়টায় স্কুল বসাইবার ব্যবস্থা করিলেন। এর আগে পর্যন্ত আমরা দুই ভাই জগদীশ বাবুকে বলিয়াই শুক্রবারে অনুপস্থিত থাকিতাম। আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব এই নয়া ব্যবস্থা করায় আমাদের জুম্মার নামাজের জন্য আর পাঠশালা কামাই করার দরকার থাকল না। শুক্রবার আমাদের বাড়ির মাদ্রাসা বন্ধ থাকিত। কাজেই সকালে স্কুল হওয়ায় সেদিকেও কোনো অসুবিধা হইল না। ছয়টা হইতে এগারটা পর্যন্ত রীতিমত ক্লাস হইত। ছুটির পর আমরা সাড়ে এগারটায় বাড়ি পৌঁছিতাম এবং গোসল করিয়া জুম্মার নামাজে যোগ দিতে পারিতাম।

.

. মাস্টার সাহেবের ছাত্রপ্রীতি

এ অঞ্চলে কোনো বড় মেহমানি হইলে এবং সে মেহমানিতে মাস্টার সাহেবকে দাওয়াত করিলে তিনি শর্ত করিতেন, তাঁর সব ছাত্রকে দাওয়াত করিলে তিনি যাইবেন। প্রায় সবাই ছাত্র-সুদ্ধাই মাস্টার সাহেবকে দাওয়াত দিতেন। দাওয়াতের দিন যথাসাধ্য পরিষ্কার জামা-কাপড় পরিয়া টুপি মাথায় দিয়া আসিতে সব ছাত্রকে তিনি বিশেষ তাগিদ দিতেন। সম্ভব হইলে ছাত্রদের অভিভাবকদেরেও বলিয়া দিতেন। নিকট প্রতিবেশী ছাত্রদের বাড়িতে গিয়া কাপড়-চোপড় ধুইল কি না খোঁজখবর করিতেন। নির্দিষ্ট দিনে বারটা-একটার সময় স্কুল ছুটি দিয়া সদলবলে মেহমানিতে যাইতেন। একত্রে এক কাতারে তাঁর সব ছাত্রকে বসাইবার জন্য তদবির করিতেন। এমনটি প্রয়োজন হইলে দাওয়াতের মালিকের সাথে দরবার করিতেন। সকল ছাত্রকে ঠিকমত বসাইয়া তিনি স্বয়ং তাদের সাথে বসিতেন। সাকিদারির সময় কোন ছাত্রের পাতে ভাত নাই, কার ভাগে গোশত কম পড়িল, এসব ব্যাপার লইয়া সাকিদারদের সাথে। দর-কষাকষি করিতেন। ফলে মাস্টার সাহেবের সাথে মেহমানিতে গেলে বেশি গোশত ও আদর-যত্ন পাওয়া যায়, ছাত্রদের মধ্যে এ কথা মশহুর হইয়া গিয়াছিল। খাওয়া-দাওয়ার পর মাস্টার সাহেব হুইসেল দিয়া সব ছাত্রকে আবার একত্রে জমা করিতেন। ফলইন’, ‘এটেনশন’, রাইট টার্ন’, ‘সেলিউট ওয়ান-টু-থ্রি’ মার্চ’ বলিয়া তিনি যিয়াফতের মজলিস হইতে ছাত্রদেরে লইয়া বাহির হইতেন। দর্শকেরা প্রশংসমান এক দৃষ্টিতে সেদিকে চাইয়া থাকিতেন এবং ছাত্রসহ মাস্টার সাহেব দূরে চলিয়া গেলে সকলে মাস্টার সাহেবের শিক্ষকতার তারিফ করিতেন। হাঁ, মাস্টার বটে। ছাত্রদেরে কী সুন্দর শায়ের করিয়াছেন।

ধানীখোলা পাঠশালায় আমার ছাত্রজীবনের শেষ বছর, অর্থাৎ ১৯০৮ সালের খুব সম্ভব ডিসেম্বর মাসে বৈলর বাজারে মুসলমানদের এক বিরাট সভা হয়। এত বড় সভা আমি জীবনের প্রথম এই দেখি। উভয় গ্রামের মাতব্বররা মিলিয়াই এই সভার আয়োজন করিয়াছিলেন। জিলা সদর হইতে এবং বিদেশ হইতে বড়-বড় বক্তা এই সভায় যোগ দিয়াছিলেন। তাদের মধ্যে সিরাজগঞ্জের মুনশী মেহেরুল্লাহ, মৌ. মোহাম্মদ ইসমাইল (পরে খান বাহাদুর) ও মৌ. আবদুর হাকিম নামে একজন স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর আমার মনে স্থায়ী দাগ কাটিয়াছিলেন। এই বিরাট সভায় অনেক ভলান্টিয়ারের দরকার হইয়াছিল। উদ্যোক্তারা আশপাশের সমস্ত স্কুল-মাদ্রাসার কাছে ভলান্টিয়ার চাহিয়াছিলেন। কর্মবীর আলিমুদ্দিন মাস্টার এ ব্যাপারে সমস্ত স্কুল-মাদ্রাসাকে হারাইয়া দিয়াছিলেন। এক মাস ধরিয়া তিনি আমাদেরে ভলান্টিয়ারি কুচকাওয়াজ ও ফুট-ফরমাস সম্পর্কে এমন সুন্দর ট্রেনিং দিয়াছিলেন যে সম্মিলনীতে সমাগত মেহমানরা মাস্টার সাহেবকে ডাকিয়া নিয়া তারিফ করিয়াছিলেন। আমরা ছাত্ররাও এ সভা হইতে জীবনের খুব মূল্যবান জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলাম।

আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেবের কাছে মোটমাট দুই বছর পড়িয়াছিলাম। এই দুই বছরে আমার অনেক শিক্ষালাভ ঘটিয়াছিল। এই সময়ে আমি আট-নয় বছরের শিশু হইয়াও বুড়া প্রবীণের চেয়েও বেশি নফল এবাদত করিতাম। সে কথা আমি অন্যত্র বর্ণনা করিব। এখানে ঐ ব্যাপার উল্লেখ করা দরকার এই জন্য যে, হযরত পয়গম্বর সাহেবকে খাবে দেখা ঐ সময় আমার এবাদতের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু পয়গম্বর সাহেবকে খাবে কখনও দেখি নাই। তার বদলে সাদা জুব্বা-জাব্বা পাগড়ি-পরা খড়ম-পায়ে তসবি-হাতে একজন সুফি দরবেশকে খাবে দেখিতে পাইতাম। এই সুফি দরবেশের মুখের অবয়ব তখনও মনে পড়িত না। এখন ত পড়িবেই না কিন্তু এই দরবেশকে খাবে দেখিয়া আমার একটা অসাধারণ লাভ হইয়াছিল। তা এই :

.

. স্বপ্নে মুখরেজ-তালাফ্‌ফুয

চাচাজী ছমিরুদ্দিন মুনশী, ইয়াকুব, মৌলবী প্রভৃতি আমার শৈশবের উস্তাদরা কেই কারি ছিলেন না। তাঁদের মুখরেজ-তালাফুয সব আরবি হরফের বেলা নির্ভুল নিখুঁত ছিল না। মুখরেজ মানে হরফ উচ্চারণে অরগান-অব-স্পিচ ঠিক রাখা। হরফগুলির মধ্যে কতকগুলি মূর্ধা বা আলাজিভ হইতে, কতকগুলি তালু হইতে, কতকগুলি দাঁত হইতে, আর কতকগুলি ঠোঁট হইতে জিভের সংস্পর্শে বাহির হয়। অন্যান্য ভাষার চেয়ে আরবিতেই এই দিককার অর্থাৎ মুখরেজ উচ্চারণ খুব কড়াকড়িভাবে পালিত হয়। ইংরাজি একটা ‘এ’ ও বাংলা একটা স’ (ছ)-এর জায়গায় আরবিতে ‘সে’ ‘সিন’ ‘সোআদ’ এই তিনটা হরফ আছে। অথচ এই তিনটার মধ্যে দুইটা হরফই দন্ত্য হইলেও দুইটা উচ্চারণে দাঁত-জিভের দুইটা পৃথক জায়গা স্পর্শ করে এবং অপরটা ঠোঁট হইতে উচ্চারিত হয়। ঠিক তেমনি ইংরাজি একমাত্র ‘যেড’ হরফের স্থলে আরবিতে যাল, যে, যোআদ ও যোয়–এই চারিটি হরফ আছে। অথচ ঐ চারিটি হরফের নিজেদের মধ্যে প্রচুর উচ্চারণ-ভেদ রহিয়াছে। এই চারিটি হরফের প্রথম দুইটি হরফের মধ্যে যাল’-এর উচ্চারণের সময় দাঁত জিভের আগা স্পর্শ করে এবং যে উচ্চারণের সময় দাঁত জিভের মধ্যভাগ স্পর্শ করে। অর্থাৎ যে’র উচ্চারণ বাংলা য’র, উচ্চারণ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। তেমনি বাংলা ‘হ’ বা ইংরাজি ‘এইচ’-এর উচ্চারণের সঙ্গে আরবি ‘হায়হুত্তি’র কোনও মিল নাই। বাংলা-ইংরাজি হ’ উচ্চারণের সঙ্গে আরবি ‘হায় হাওওয়াজ’-এর মিল রহিয়াছে।

কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য উচ্চারণগত এই সব সূক্ষ্ম পার্থক্যের কোনও মূল্য নাই। তাদের কাছে মাত্র দুইটি হরফে এই পার্থক্য পালন সীমাবদ্ধ হইয়াছে। ইংরাজি জে (‘জি’সহ) ও ‘যেডের পার্থক্য ও আরবি ‘জিম’ ও। ‘যে’র পার্থক্য। ইংরাজির ‘জে’ ও ‘জি’ (যে শব্দে ‘গ’ হয় না) এবং আরবির ‘জিম’ মূর্ধন্য বর্ণ। এগুলি আলাজিভের সঙ্গে জিভের স্পর্শ হইতে বাহির হয়। পক্ষান্তরে ইংরাজি ‘যেড’ ও আরবির ‘যে’ (যাল’সহ) দন্ত্য বর্ণ। আরবি যোয়াদ, যোয় যদিও দন্ত্য নয় ঔষ্ঠ্য, তবু তাদের নৈকট্য দন্ত্য ‘যে’ ‘যালের সাথে, মূর্ধন্য’ ‘জিমের সাথে নয়।

আরবিতে এই আঙ্গিক উৎপত্তিগত পার্থক্য মানিয়া চলাকেই মুখরেজ আদায় করা বলে। ইংরাজিতে এটাকে বলে ফনেটিকস।

পক্ষান্তরে তালাফুযও উচ্চারণ-ভঙ্গি বটে, কিন্তু সেটা হরফের আঙ্গিক বুৎপত্তির উপর নির্ভর করে না। শব্দকে হ্রস্ব, দীর্ঘ, লম্বা, খাটো করা, কোনও হরফ বা শব্দের উপর কম বা বেশি জোর একসেন্ট দেওয়া, বাক্যের কোন জায়গায় থামা বা না থামা, বেশি থামা বা কম থামা ইত্যাদি তালাফফুযের অন্তর্ভুক্ত। ইংরাজিতে যাকে একসেন্ট এ্যামফেসিস্ ও ফুলস্টপ বলা হয়, আরবিতে যাকে মদ্দ, তশদিদ, আয়াত, ওয়াকফা বলা হয়, বাংলায় যাকে পুত, বা দাড়ি বলা হয়, এই সবই তালাফুযের অংশ। একটা খুব সাধারণ দৃষ্টান্ত দিতেছি। ‘চ’ মূর্ধন্য হরফ। এটাকে দন্ত্য উচ্চারণ করিলে এটা হইবে মুখরেজের খেলাফ। কিন্তু ঠিকমত ‘চ’ মূর্ধন্য উচ্চারণ করিয়াও ‘চোর’ শব্দকে ‘চুর উচ্চারণ করিলে এটা হইবে তালাফুফের খেলাফ। সোজা কথায় ইংরাজিতে যাকে বলে ফনেটিকস, বাংলায় ধ্বনিতত্ত্ব, আরবিতে তাই মুখরেজ। তেমনি ইংরাজিতে যাকে বলে পাংচুয়েশন, বাংলায় যতি, আরবিতে তাই তালাফফুয। বিশেষ করিয়া কোরআন শরিফ তিলাওয়াতে পুরাপুরি মুখরেজ-তালাফুয আদায় করার দিকে বিশেষ তাগিদ আছে। কিন্তু আমার উস্তাদদের মধ্যে বা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে এমনকি স্থানীয় আলেম-ওলামার মধ্যেও কারো এ বিষয়ের তীক্ষ্ণ জ্ঞান ছিল না। বিশেষত, মুখরেজের গুরুত্ব তারা মোটেই বুঝিতেন না। চাচাজীসহ আমার অন্য উস্তাদরা কোরআন তিলাওয়াতে এবং নামাজের কেরাতে মিঠা গলায় খোশ এলহানে সুরা পাঠ করিতেন। শুনিতে অতি মধুর লাগিত। বিশেষত, চাচাজী যখন নামাজে লম্বা কেরাত পাঠ করিতেন তখন ভদ্রার মধুর গুঞ্জন কাপিয়া-কাপিয়া আমার কানে বাজিতে থাকিত। এমন যে চাচাজী তিনিও জাহান্নামকে কখনও ‘যাহান্নাম’ ইযা জাআকে’ নির্বিচারে কখনও ইজা যাআ’। কখনও ইজা জাআ কখনও বা ইযা-যাআ পড়িতেন জিম’ ও ‘যে’র পার্থক্য যেন তারা বুঝিতেনই না। অন্তত উচ্চারণে তা মানিয়া চলিতেন না। শুধু সে কালে নয়, আজকালও আমি এমন অনেক পণ্ডিত লোক দেখিয়াছি, যারা জে’ ‘যেড’ ‘জিম’ ‘যের পার্থক্য বুঝেন না এবং বেদেরেগ একটার জায়গায় আরেকটা উচ্চারণ করিয়া থাকেন। বহু অধ্যাপককে ‘যিরো’র স্থলে ‘জিরো’, ‘যেনিথের’ জায়গায় ‘জেনিথ’, ‘এলিযাবেথের জায়গায় ‘এলিজাবেথ’, ‘জজ’-এর জায়গায় যর্জ’ এবং বহু উকিলকে জজকোর্টকে য কোর্ট উচ্চারণ করিতে শুনিয়াছি। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে পড়িতেছে। একবার নুরুযযামান নামক আরবিতে এমএ পাশ একটি যুবক চাকরিপ্রার্থী অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সহিত দেখা করিতে গিয়া নিজের নাম বলিয়াছিলেন, নুরুজ্জামান। সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রথমে ক্রুদ্ধ এবং শেষ পর্যন্ত বিস্মিত হইয়াছিলেন। কারণ দেখা গেল, নিজের নাম। আরবিতে এমলা করিবার সময় যে’কে ঠিক ‘যে’ই উচ্চারণ করেন, কিন্তু নামের উচ্চারণের সময় দুই ‘যে’কে সংযুক্ত করিয়া ‘জে’ করিয়া ফেলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ও আমি অনেক চেষ্টা করিয়াও তাকে ঠিক করিতে পারি। নাই। আমাদের প্রিয় সহকর্মী তরুণ বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ পর্যন্ত নিজের নাম মুযিবুর রহমান বলেন। অপর বন্ধু রাজশাহীর উলিক অধ্যাপক মুজিবুর রহমান নিজের নাম অসংকোচে যেড’ দিয়া লিখিয়া উচ্চারণ করিয়া থাকেন। বহুকাল সংশোধনের চেষ্টা করিয়াও ব্যর্থ হইয়া অবশেষে এই দুইজনকেই শহীদ সাহেব প্রকাশ্যভাবে খুব জোরে জোরে মুযিবুর রহমান ডাকিতেন। শৈশবে এই স্বরধ্বনিবোধ জাগ্রত না হইলে বয়সকালে যে এটা আর হইয়া উঠে না, তার প্রমাণ এই সেদিনও পাইয়াছি। আমার পরম স্নেহের পাত্রী এমএ পাশ একটি মেয়েকে এক ঘণ্টার বেশি সময় যেড’ ও ‘জে’র পার্থক্য বুঝাইতে ফনেটিকসের অনেক গূঢ় তত্ত্ব বুঝাইলাম। অবশেষে মহিলা সগৌরবে বলিলেন : ‘এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝিতে পারিলাম। ‘জেড’টার উচ্চারণটা সত্যই ঐরূপ। বাংলা বর্ণমালায় এই পার্থক্য নাই বলিয়াই বোধ হয় শিক্ষিত বাঙ্গালীদের জিভের এই অবস্থা।

যা হোক আমার ছেলেবেলায় দেশের অবস্থা এই রূপই ছিল। আমি নিজেও তেমনি শিক্ষা পাইতেছিলাম। এমন সময় স্বপ্নে-দেখা এই সুফি দরবেশ সাহেব আমাকে মুখরেজ-তালাফুয সম্পর্কে খাবেই সবক দিতে লাগিলেন। এক দিন নয়, দুই দিন নয়, পরপর কয়েক দিনই তিনি আমাকে মুখরেজ সম্বন্ধে সবক দিলেন। তিন দিনের খাবের কথা আমার আজিও স্পষ্ট মনে আছে। একদিন তিনি এক বড় জমাতে ইমামতি করিবার সময় সহি মুখরেজ আদায় করিয়া কেরাত পাঠ করিলেন এবং নামাজ শেষে আমাকে একা একদিকে লইয়া গিয়া তিনি কেরাতে কোন হরফ কীভাবে কোন উচ্চারণ করিয়াছেন আমাকে তা বুঝাইলেন। প্রত্যেক হরফের উচ্চারণ তিনি এমন স্পষ্ট ও সহজভাবে করিলেন যে, ঘুম ভাঙার পরেও ঐসব উচ্চারণ সুফি সাহেবের গলার সুরেই আমার কানে সারা দিন ঝংকৃত হইতে থাকিল। এই সুফি সাহেব নিজের পরিচয় দিতেন না। সে কথা তাঁকে পুছ করিতেও আমার মনে থাকিত না। তবু তার চেহারা সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা হইয়া গিয়াছিল। বরাবর যে একই লোক আসিতেন, সে কথা জোর করিয়াই বলা যায়। কারণ দিনের বেলা অনেক খুঁজিয়া-চিন্তিয়াও অমন সুন্দর চেহারার কোনও আলেম আমার মনে পড়িত না। উনার গলার আওয়াজও কারো সাথে মিলিত না। উনি আর যে-ই হোন, আমাদের আত্মীয় কারী ময়েযুদ্দিন সাহেব যে নন, তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না। কারণ কারি সাহেব আমাদের বংশের আর সব মুরুব্বিদের মতই ঘোর কালো রঙের লোক ছিলেন। কাজেই এই সুফি সাহেবকে আবার স্বপ্নে দেখিবার জন্য সারা দিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিতাম। দেখিতামও তাঁকে। একদিন খাবে দেখিলাম, তিনি আমাদের বাড়ির মসজিদেই খুব বুলন্দ আওয়াজে কোরআন তিলাওয়াত করিতেছেন। তিনি মসজিদের দরজার দিকে মুখ ফিরিয়া বসিয়া তিলাওয়াত করিতেছিলেন। আমি মসজিদের বাহিরের আঙিনায় খেলিতেছিলাম। হঠাৎ তার চিনা মিঠা গলা আমার কানে গেল। আমি কান পাতিয়া তাঁর গলা শুনিলাম। আমি তাঁকে দেখিতেছিলাম বটে, কিন্তু তিনি আমাকে দেখিতে পান নাই। তবু আমার মনে হইল, তিনি আমাকে শুনাইয়া প্রতি হরফের সহি মুখরেজ আদায় করিতেছেন। তিলাওয়াত শেষ করিয়া তিনি কোরআন শরিফ জুযদানে বাঁধিয়া রেহালের উপর রাখিয়া মাথা তুলিলেন এবং আমাকে দেখিতে পাইলেন। নিঃশব্দে হাত উঁচা করিয়া আমি তাকে সালাম করিলাম। তিনি হাত ইশারায় আমাকে ডাকিলেন। আমার অযু ছিল। খুব তাজিমের। সাথে তাঁর কাছে গিয়া বসিলাম। তিনি তখন আমাকে আলেফ-বে-তে-সে পড়াইতে শুরু করিলেন। তিনি অনেকক্ষণ ধরিয়া আমাকে জিম’ ‘যাল’ ‘যোআদ’ ‘যোয়’-এর উচ্চারণ শিখাইলেন। পাঠশালায় নামতা পড়িবার মত আমি সুফি সাহেবের প্রতি হরফ উচ্চারণে তার পুনরাবৃত্তি করিতে লাগিলাম। তৃতীয় দিনের স্বপ্নে আমি বাড়ির পশ্চিম দিকে নাগুয়া নদীর পাড় দিয়া বেড়াইতে ছিলাম। হঠাৎ ঐ সুফি সাহেব আমার সামনে পড়েন। আমি সালাম করি। তিনি কতদূর শিখিয়াছ?’ বলিলেন। আমি সবগুলি হরফ উচ্চারণ করিলাম। তিনি বলিলেন : শাবাশ, আর কয়েক দিন চেষ্টা করিলেই ঠিক হইয়া যাইবে।

এই সব স্বপ্নের বিস্ময়কর ফল হইল। আমি মুখরেজ ও তালাফুয এমন রত করিয়া ফেলিলাম যে মাদ্রাসায় সবক লইবার সময় উস্তাদজিদের ভুল ধরিতে লাগিলাম।

 

অধ্যায় চার – নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষা–দরিরামপুরে

. ত্রিশাল-দরিরামপুর–বনাম ও বেনাম

১৯০৯ সালের জানুয়ারি মাসে আমি ও আমার বড় ভাই মোহাম্মদ মকিম আলী দরিরামপুর মাইনর স্কুলের ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হই। শামসুদ্দিন ও সদরুদ্দিন দুই ভাইও আমাদের সাথে নিম্ন-প্রাথমিক পাশ করিয়া ময়মনসিংহ শহরে গিয়া জিলা স্কুলে ভর্তি হয়।

দরিরামপুর মাইনর স্কুল ছিল একেবারে নূতন। আমরা যে বৎসর সেখানে ভর্তি হইলাম, সেই বারই উহা প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম প্রতিষ্ঠিত হইলেও সে নয়া স্কুলে আমাদের উপরের ক্লাসে অর্থাৎ ক্লাস ফোর-ফাইভে এবং সম্ভবত সিক্সেও ছাত্র ভর্তি হইয়াছিল। কাজেই এক মাইনর স্কুলেই ছাত্রসংখ্যা ছিল দেড় শর কাছাকাছি। তার উপর স্কুলঘরের লাগাই ছিল মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটি ছিল পুরান নেসাবের। তাতে ছাত্র ছিল পঞ্চাশের উপর। ফলে মোট প্রায় দুই শ ছাত্র একই জায়গায় পড়াশোনা করিতাম।

স্কুল-মাদ্রাসার সামনেই ত্রিশাল থানা। ত্রিশাল গ্রাম আসলে সুতোয়া নদীর পশ্চিম পারে। থানাটি অবস্থিত নদীর পূর্ব পারের দরিরামপুর গ্রামে। এর কারণ, থানার অবস্থিতি লইয়া দুই গ্রামের মধ্যে বিরোধ হইয়াছিল। নেতৃবৃন্দ ও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যস্থতায় এই আপস হইয়াছিল যে, থানার অবস্থান হইবে দরিরামপুর গ্রামে, কিন্তু থানার নাম হইবে ত্রিশাল। ইহার ফল এই হইয়াছিল যে থানা প্রতিষ্ঠিত হইবার অল্পদিন পরই সাবরেজিস্টারি অফিসও স্থাপিত হইয়াছে। থানার অনুকরণে সাবরেজিস্টারি অফিসেরও নাম হইয়াছে। ত্রিশাল। কিন্তু তার অবস্থান হইয়াছে দরিরামপুরে। এই নিয়ম আজও চলিতেছে। এর কয়েক বছর পরে পোস্টাফিস হইয়াছে দরিরামপুরে। নাম তার ত্রিশাল। সম্প্রতি রেভিনিউ, কৃষি, পল্লি উন্নয়ন ও টেলিগ্রাফ অফিস ইত্যাদি যতগুলি সরকারি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হইয়াছে; সবগুলির অবস্থান হইয়াছে দরিরামপুরে কিন্তু নাম হইয়াছে ত্রিশাল। সুতরাং এত দিনে দেখা যাইতেছে যে গোড়ার এ আপসরফায় ত্রিশালেরই জয় হইয়াছিল। সব প্রতিষ্ঠানই ত্রিশালের নাম বহন করিতেছে; কিন্তু সন্তান উদরে ধরিতেছে দরিরামপুর। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এই নিয়ম চলে নাই। হাইস্কুলের অবস্থান ও নাম দরিরামপুরই রহিয়াছে। সম্প্রতি যে কলেজ স্থাপিত হইয়াছে তারও নাম দরিরামপুর। আমি যখন দরিরামপুর মাইনর স্কুলে ভর্তি হইলাম, তখন সাবরেজিস্টারি অফিসও মাত্র কয়েক দিন আগে স্থাপিত হইয়াছে। থানা ও সাবরেজিস্টারি অফিসে কার্যোপলক্ষে প্রতিদিন বহু লোক যাতায়াত করিতেছে। দুই শ ছাত্র, প্রায় পনের জন মাস্টার-মোদাররেস। ছাত্রদের অভিভাবকদেরও অনেকে যাতায়াত করিতেন। এই সব লোকজনের নিত্যপ্রয়োজন মিটাইবার জন্য ডিবি রোডের পার্শ্বে বেশ কয়েকটি দোকানপাট খোলা হইয়াছে। কাপড় সিলাই করিবার জন্য একখানা খলিফার দোকান বসিয়াছে। এখানে বলিয়া রাখা দরকার, ময়মনসিংহ হইতে ডিবি রাস্তা থানা ও সাবরেজিস্টারি অফিসের সামনে দিয়া সুতোয়া নদী পার হইয়াছে এবং ত্রিশাল বাজার ভেদ করিয়া পুড়াবাড়ি পর্যন্ত গিয়াছে। বর্তমানে এই রাস্তা পাকা হইয়াছে এবং সুতোয়া নদীর উপর পাকা পোলও হইয়াছে। কিন্তু তৎকালে নদীতে পোল হয় নাই। রাস্তাটি ছিল কাঁচা।

যা হোক দুই শ ছাত্রের স্কুলেও পার্শ্ববর্তী স্থানে এত লোক সমাগমে আমি সম্পূর্ণ নূতন জীবনের স্বাদ পাইলাম। এত বড় স্কুল। এত সব ছাত্র। এত সব মাস্টার-মৌলবী। সারা দিন এত লোকের আসা-যাওয়া। দারোগা সাহেব পরেন খাকি হাফপ্যান্ট ও সাবরেজিস্টার বাবু সাদা কোট প্যান্টালুন। তাঁদের যাতায়াত সাইকেলে। অবাক বিস্ময়ে এসবের দিকে চাহিয়া থাকিতাম। রাস্তা ঘাটে অনবরত লোকজনের ডাক-চিৎকার তো শুনিতামই। খোদ স্কুলের মধ্যেও যেন পড়ুয়াদের আওয়াজ গমগম করিত। এই নয়া পরিবেশ আমার কাছে স্বপ্নের মত লাগিত। আমি যেন স্বপ্নে কোনো অজানা রাজ্যে আসিয়াছি। যেন শীঘ্রই স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া যাইবে।

কিন্তু স্বপ্ন ভাঙ্গিল না। আস্তে আস্তে পরিবেশে মিলিয়া গেলাম। সবই বাস্তব হইয়া আসিল। এবং ভালও লাগিল। স্কুলের মাস্টার ছিলেন মোট সাতজন। বাবু বসন্তকুমার সেন ছিলেন হেডমাস্টার। তার বাড়ি ছিল নেত্রকোনা। বাবু কৈলাস চন্দ্র দে ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার। তাঁর বাড়ি ত্রিশাল থানার কাঁঠাল গ্রামে। হেডপণ্ডিত ছিলেন বাবু ঈশান চন্দ্র রায় তর্কালঙ্কার। তাঁর বাড়ির ঠিকানা মনে নাই। সেকেন্ড পণ্ডিত ছিলেন জনাব খিদির উদ্দিন খাঁ। বাড়ি ছিল ফুলবাড়িয়া থানার মাগুরজোড়া গ্রামে। হেডমৌলবী ছিলেন মৌ. যহুরুল হক। বাড়ি আমাদেরই পার্শ্ববর্তী গ্রাম বৈলরের কানহর নামক মৌযায়। এ ছাড়া আরো দুইজন শিক্ষক ছিলেন। একজনের নাম মোহাম্মদ শাহজাহান মিঞা। আরেকজনের নাম ছিল জনাব আব্বাস আলী।

শিক্ষকদের মধ্যে হেডমৌলবী মৌ, যহুরুল হক সাহেব আমার এক মামুর সম্বন্ধী। কাজেই তিনি আমাকে আগে হইতেই চিনিতেন। তা ছাড়া তিনি প্রতি শনিবার অবশ্যই এবং সপ্তাহের আরো দুই-এক দিন আমাদের সঙ্গেই বাড়ি আসিতেন। এবং ফিরিবার কালে প্রায় সবদিনই একই সঙ্গেই যাইতেন। কাজেই তার সঙ্গে স্বভাবতই ঘনিষ্ঠতা হয়। সেকেন্ড পণ্ডিত জনাব খিদির উদ্দিন খাঁ সাহেবের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়। সেকেন্ড পণ্ডিত জনাব খিদির উদ্দিন খাঁ সাহেবের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয় অন্য কারণে। আমার চাচা জাফর সাহেব ছিলেন পণ্ডিত সাহেবের নিকট প্রতিবেশী। চাচাজীর প্রতি পণ্ডিত সাহেবের পরিবারের উচ্চ ধারণা ছিল। গাজী সাহেবের পুত্র বলিয়া চাচাজীকে তারা সম্মান করিতেন। প্রায়ই তিনি জাফর চাচার তারিফ করিতেন। সে জন্য মনে মনে পণ্ডিত সাহেবের প্রতি আমি একটা আত্মীয়তা অনুভব করিতাম।

.

. হেডমাস্টারের নজরে সত্যবাদিতা

হেডমাস্টার বসন্ত বাবুর প্রিয় ছাত্র হই আমি এক আকস্মিক ঘটনায়। সেদিন আমাদের ক্লাসটিচার ছিলেন অনুপস্থিত। আমাদের ক্লাসের ছাত্রসংখ্যা ছিল চল্লিশের মত। এত বড় ক্লাসে ক্লাসটিচার না থাকিলে যা হওয়ার কথা তাই হইল। তুমুল হট্টগোল চলিতে লাগিল। হঠাৎ হেডমাস্টার বাবু আসিয়া ক্লাসের দরজায় দাঁড়াইলেন। ক্লাসের উপর যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হইল। হেডমাস্টার বাবুকে ছাত্ররা যমের মত ভয় করিত। কাজেই সারা ক্লাস একদম চুপ। নিঃশব্দে সকলে যার-তার সিটে দাঁড়াইয়া রহিলাম। হেডমাস্টার বাবু গম্ভীর মুখে একপা-দুপা করিয়া ক্লাসে ঢুকিলেন। ভাটার মত চোখ দুইটা সারা ক্লানের উপর দিয়া একবার ঘুরাইয়া নিয়া কঠোর আদেশের সুরে বলিলেন : “তোমরা সকলেই বসো। যন্ত্রচালিত-মত আমরা নিঃশব্দে বসিলাম। তিনি এইবার বজ্রনির্ঘোষে বলিলেন : “এইবার কও, গোলমাল করিয়াছে কে?’ ভয়ে সব ছাত্রেরই হাঁটু ঠকঠক করিতেছে। জিভ শুকাইয়া গিয়াছে। কেউ জবাব দিল না। হেডমাস্টার বাবু আবার গর্জন করিলেন : ‘কথার জবাব দাও। বলো, কে গোলমাল করিয়াছ?’

নিথর নিঃশব্দে ক্লাসের মধ্যে আমি অতি কষ্টে দাঁড়াইলাম। আমার হাঁটু ঠকঠক করিতেছিল। সারা গায় ঘাম ছুটিয়া গিয়াছিল। আমার জিভ শুকাইয়া গিয়াছিল। কোনো কথা বলিলাম না। শুধু, ফ্যালফ্যাল করিয়া হেডমাস্টার বাবুর দিকে তাকাইয়া রহিলাম। হেডমাস্টার বাবু আমার দিকে তাকাইলেন এবং বলিলেন : তুমি গোলমাল করিয়াছ?

আমার গলা দিয়া কথা আসিতে চাহিল না। কাজেই মাথা ঝুকাইলাম এবং ধরা গলায় বলিলাম : ‘জি, সার। হেডমাস্টার বাবুর মুখের গাম্ভীর্য বিস্ময় কৌতূহলে রূপান্তরিত হইল। তিনি কৌতূহলের সুরে বলিলেন : তুমি একাই গোলমাল করিয়াছ?

আমি আবার শির ঝুকাইয়া ধরা গলায় বলিলাম : ‘জি, সার।

এবার হেডমাস্টার বাবু লম্বা মোচের নিচে মুচকি হাসিলেন। বলিলেন : ‘এত বড় গোলমালটা তুমি একাই করিয়াছ? আর কেউ করে নাই?

আমি মাথা হেঁট করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম।

হেডমাস্টার বাবু আবার গম্ভীর সুরে বলিলেন : ‘এক জনে গোলমাল করা যায় না। এই ছেলে সত্য কথা কহিয়াছে। আর তোমার কেউ সত্য কথা কও নাই। এই ছেলে সত্য কথা বলার পুরস্কার পাইবে। সে একা বসিবে। আর তোমরা সকলে স্কুল ছুটি না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়াইয়া থাকিবা।

বলিয়া হাসিমুখে আমার দিকে চাহিয়া স্নেহমাখা সুরে বলিলেন : তুমি বসো। তোমার নাম কী?

আমি নাম বলিলাম। তিনি আবার বলিলেন : তুমি বসো।’ আমি বসিলাম। হেডমাস্টার বাবু আর সকলের দিকে চাহিয়া বলিলেন : তোমরা দাঁড়াইয়া থাকো। সকলে দাঁড়াইল। হেডমাস্টার বাবু ক্লাস থনে বাহির হইয়া গেলেন।

হেডমাস্টার বাবুর এই শাস্তিতে সারা ক্লাস শান্তই ছিল। আর কেউ কোনও গোলমাল করে নাই। তবু কিছুক্ষণ পরে চুপে চুপে পা ফেলিয়া হেডমাস্টার বাবু আমাদের ক্লাসে উঁকি দিলেন। ছাত্ররা তার আদেশ পালন করিতেছে কি না, তা দেখিবার জন্যই বোধ হয় তিনি আসিয়াছিলেন। তিনি ক্লাসের দরজায় দাঁড়াইয়া দেখিলেন, সকলে তো দাঁড়াইয়া আছেই, আমিও দাঁড়াইয়া আছি।

তিনি তখন ক্লাসে ঢুকিলেন। আমার দিকে চাহিয়া তিরস্কারের সুরে বলিলেন : “তোমাকে ত আমি বসিতে বলিয়াছিলাম। তুমি দাঁড়াইয়া আছ। কেন?

আমি মাথা হেঁট করিয়া রহিলাম। কোনও জবাব দিলাম না। হেডমাস্টার বাবু এবার কঠোর হইয়া বলিলেন : ‘কেন তুমি বসো নাই? কেন আমার আদেশ অমান্য করিলা?’

আমি ফোৎ ফোৎ করিয়া কাঁদিয়া ফেলিলাম। হেডমাস্টার বাবু অবাক হইয়া আগ বাড়িলেন। আমার মাথায় হাত রাখিয়া বলিলেন : ‘কাঁদো কেন? কী হইয়াছে?’

হেডমাস্টার বাবুর স্নেহমাখা সুরে আমার সাহস বাড়িল। তখন কান্না রুখিয়া অতি কষ্টে বলিলাম : আমার মিঞা ভাই এই ক্লাসেই আছে। তারে খাড়া রাইখা আমি বসি কেমনে?

হেডমাস্টার বাবু হাসিমুখে বলিলেন : ‘তোমার মিঞা ভাই কে?’

আমি আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিলাম। হেডমাস্টার বাবু তাঁকে বলিলেন : ‘তোমার ছোট ভাই-এর খাতিরে তোমাকেও বসিতে দিলাম। তোমরা দুই ভাই বসো। আর সকলে দাঁড়াইয়া থাকো।’

আমরা দুই ভাই এতক্ষণ দুই জায়গায় ছিলাম। এইবার দুজন একত্র হইয়া আরামসে বসিয়া রহিলাম। আর দাঁড়ানো সহপাঠীদের দুর্দশা হাসিমুখে উপভোগ করিতে লাগিলাম।

এতে আমরা দুই ভাই কিছুদিনের জন্য সহপাঠীদের চক্ষুশূল হইলাম বটে, কিন্তু অল্পদিনেই সে ভাব কাটিয়া গিয়াছিল। তবে এই ঘটনায় আমি হেডমাস্টার বাবুর সুনজরে পড়িলাম। তিনি ঐ গল্প সারা স্কুলে ছড়াইয়া। দেওয়ায় অন্য মাস্টাররা এবং অপর ক্লাসের ছাত্ররা আমাকে খুব ভালবাসিতে লাগিলেন। আমি ছাত্রও ভাল ছিলাম। ষান্মাসিক ও বার্ষিক পরীক্ষায় প্রায় সকল সাবজেকটেই ফার্স্ট হইতাম। এটাও আমার জনপ্রিয়তার কারণ ছিল।

এইভাবে হেডমাস্টার বাবুর স্নেহাদরের মধ্যে ক্লাস ফোরে উঠিবার পর হেডমাস্টার বাবুর সাথে আবার আরেকটা দুর্ঘটনা ঘটিয়া যায়। সে ঘটনাটি ঘটে এইভাবে :

.

. হেডমাস্টারের ডাক-হরকরা

তখনও ত্রিশাল পোস্টাফিস হয় নাই। বৈলরের পোস্টাফিস মারফতই তখনও এই স্কুলের চিঠিপত্র যাতায়াত হয়। বৈলর পোস্টাফিস আমাদের বাড়ির কাছে। স্কুলে যাতায়াত করিতে আমাদের এই পোস্টাফিসের সামনে দিয়াই যাইতে হয়। দরিরামপুর অঞ্চলে সপ্তাহে একবার মাত্র চিঠিপত্র বিলি হইত। বৃহস্পতিবার দিন ত্রিশাল বাজারের হাট বার। বিরাট হাট। পঞ্চাশ হাজার হইতে প্রায় এক লক্ষ লোক এই হাটে জমায়েত হইত। বৈলর পোস্টাফিসের পিয়ন ত্রিশালের বাজারে এই হাটের দিন এক নির্দিষ্ট জায়গায় বসিতেন। স্কুল, মাদ্রাসা, থানা, সাবরেজিস্টারি আফিস ও এতদঞ্চলের সমস্ত চিঠিপত্র এইখান থনেই বিলি হইত। পিয়ন ঐ দিন প্রচুর পোস্টকার্ড, স্ট্যাম্প, ইনভেলাপ নিয়া আসিতেন। ওখানে বসিয়াই বিক্রি করিতেন। বাজারের এক দোকানের বারান্দায় একটি চিঠির বাক্স টানানো ছিল। ঐ দিন পিয়ন ঐ বাক্স খুলিয়া চিঠিপত্র লইয়া যাইতেন। তা ছাড়া পিয়নের হাতে হাতে চিঠি দিয়া দিলেও ডাকে দেওয়া হইয়া যাইত। অবশ্য ত্রিশাল বাজারে প্রবেশ করিবার আগে পিয়নকে দরিরামপুর হইয়া আসিতে হইত। সে জন্য থানা সাবরেজিস্টারি আফিস ও স্কুল-মাদ্রাসার পত্রগুলি অনেক সময় তিনি যার-তার আফিসেই দিয়া আসিতেন। তবু এদের সকলের অসুবিধা হইত।

হেডমাস্টার বাবু যখন জানিতে পারিলেন যে, স্কুলে যাতায়াত করিতে আমরা কয়জন বৈলর পোস্টাফিসের সামনে দিয়াই যাওয়া-আসা করিয়া থাকি, তখন তিনি এক সহজ উপায় বাহির করিলেন। তিনি স্কুলের সমস্ত চিঠিপত্র আমাকে দিয়া পোস্ট করাইতে লাগিলেন। তাতে আমার কোনোই অসুবিধা হইত না। স্কুল হইতে ফিরিবার পথে চিঠিগুলি পোস্টাফিস ঘরের বেড়ায় মুখ হাঁ-করা ডাকবাক্সে ফেলিয়া দিয়া যাইতাম।

ফলে যেদিন হেডমাস্টার বাবুর চিঠি থাকিত, সেদিন পোস্টাফিস হইয়া যাওয়া আমার উপর বাধ্যতামূলক হইয়া পড়িত। আমাদের বাড়ি হইতে দরিরামপুর যাতায়াত করিবার একাধিক রাস্তা ছিল। পোস্টাফিসের সামনের রাস্তা তার মধ্যে একটি। কবে কোন রাস্তায় যাইব, সেটা নির্ভর করিত সাথীদের উপর। স্কুল হইতে বাহির হইবার সময় এক রাস্তার একই দিকে অনেক ছাত্র চলিতাম। তারপর আগ বাড়িতে-বাড়িতে সাথীসংখ্যা কমিতে থাকিত। একজন-দুইজন করিয়া ভিন্ন রাস্তায় আমরা ভাগ হইয়া পড়িতাম। পোস্টাফিসের কাছে আসিতে আসিতে আমরা চার-পাঁচজনে পরিণত হইতাম। এদের অধিকাংশের মত অন্য রাস্তায় যাইবার পক্ষে হইলে সাধারণত আমি ও মিঞা ভাই তা মানিয়া লইতাম। কিন্তু হেডমাস্টার বাবুর চিঠি ডাকে দেওয়া থাকিলে কিছুতেই আমি অন্য রাস্তায় যাইতে পারিতাম না। সাথীরা রাগ করিয়া আমাকে একা ত্যাগ করিও না। সে অবস্থায় আমার বড় ভাইই আমার একমাত্র সাথী হইতেন। এইটুকু অসুবিধা আমি সহজেই অগ্রাহ্য করিতাম। কারণ হেডমাস্টার বাবু জরুরি চিঠিপত্র আমার হাতে দিয়া বিশ্বাস করেন, এটা কম গৌরবের কথা নয়। বস্তুত এ জন্য আমার অনেক বন্ধু ঈর্ষাপরায়ণ হইয়াছে। আমার উপরের ক্লাসের কয়েকজন বয়স্ক ছাত্র হেডমাস্টার বাবুর চিঠি ডাকে দেওয়ার ভার লইতে চাহিয়াছেন, কিন্তু হেডমাস্টার বাবু রাজি হন নাই।

নিয়মিতভাবে পরম বিশ্বস্ততার সঙ্গে আমি এই দায়িত্ব পালন করিয়া চলিলাম। ছয় মাস চলিয়া গেল। কোনও ত্রুটি বা অসুবিধা হইল না। কিন্তু ছয় মাস পরে একটা গোলমাল হইয়া গেল।

ব্যাপারটা এই :

.

. হেডমাস্টারের ‘ভুল’

তৎকালে দরিরামপুর স্কুল লোকাল বোর্ড হইতে মাসিক অর্থ সাহায্য পাইত। সে জন্য আইন অনুসারে স্কুলের হেডমাস্টারকে লোকাল বোর্ড অফিসে একটি ষান্মাসিক রিপোর্ট পাঠাইতে হইত। এ বছরের ষান্মাসিক রিপোর্টও যথারীতি তিনি আমাকেই পোস্ট করিতে দিলেন। এটা ছিল একটা লম্বা ইনভেলাপ। অত বড় চিঠি এর আগে আমরা কেউ দেখি নাই। কাজেই পথে আসিতে সাথীরা সবাই এটা দেখিতে চাইল। আমি এক্সারসাইয বুকের মলাটের ফাঁক হইতে বাহির করিয়া সকলকেই দেখাইলাম। কিন্তু কাউকে ছুঁইতে দিলাম না। সাথীদের দেখাইতে গিয়া আমারও কৌতূহল হইল। আমি নিজে পথ চলিতে চলিতে চিঠিটা দেখিতে থাকিলাম। স্পেলিং করিয়া করিয়া ঠিকানাটা পড়িবার চেষ্টাও করিলাম। চিঠিটার ঠিকানা ছিল ‘টু দি ভাইস চেয়ারম্যান লোকাল বোর্ড সদর ময়মনসিংহ।’ কারণ তৎকালে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটরা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের এবং এসডিওরা মহকুমার লোকাল বোর্ডের এক্স-অফিশিও চেয়ারম্যান থাকিতেন। ঐ সব প্রতিষ্ঠানেই নির্বাচিত মেম্বরদের মধ্য হইতে একজন ভাইস চেয়ারম্যান হইতেন। কার্যত এই ভাইস চেয়ারম্যানই ঐ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন। সে জন্য সাধারণত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের লেখা সমস্ত চিঠিপত্র ভাইস চেয়ারম্যানের নামেই পাঠাইবার নিয়ম ছিল। কিন্তু আমি দশ বছরের শিশু। অতশত কি জানি? আমি ক্লাস ফোরের ভাল ছাত্র। ওয়ার্ডবুক আমার মুখস্থ। ম্যান’ মানে মানুষ, চেয়ার’ মানে কুরসি, এটা তো সোজা কথা। কাজেই চেয়ারম্যান। মানে কুরসি বানাইবার সুতারমিস্ত্রী, এটাও আমার মত ভাল ছাত্রের পক্ষে বুঝা কঠিন হইল না। কিন্তু চিন্তায় পড়িলাম আগের শব্দটা লইয়া। এটা কী? একটা খাড়া টান দিয়া তার গোড়া হইতে ডান দিকে একটা তেরছা টান বেশ লম্বা করিয়া যে হরফটা লেখা হইয়াছে তাতে শব্দটা হয় ভাইস’। কিন্তু এখানে সে শব্দের কোনও মানে হয় না। ভাইস মানে পাপ’। পাপের সাথে চেয়ার বা সুতারমিস্ত্রীর কোনও সম্পর্ক থাকিতে পারে না। কাজেই একটা কিছু ভুল এখানেই হইয়াছে। তাতে সন্দেহ নাই। হেডমাস্টার বাবুকে আমি শুধু শ্রদ্ধা করিতাম না, ভালবাসিতাম। তার মত পণ্ডিত লোক খুব কমই আছে। এই ছিল আমার বিশ্বাস। তাঁরই নিজ হাতে লেখা একটা চিঠি এমন বড় একটা ভুল লইয়া শহরে চলিয়া যাইবে, আর শহরের সরকারি লোকের নিকট আমার প্রিয় হেডমাস্টারের দুর্নাম হইবে, এটা আমার কিছুতেই সহ্য হইতেছিল না। আমি আমার সমস্ত বিদ্যা-বুদ্ধি খাটাইয়া এই ভুল সংশোধনের উপায় চিন্তা করিতে লাগিলাম। অনেক গবেষণা করিলাম। আমাকে চিন্তিত দেখিয়া এবং সাথীদের হৈ হল্লা ও অট্টহাসিতে বরাবরের মত যোগ দিতেছি না দেখিয়া অনেকেই কারণ জিজ্ঞাসা করিল। আমি সবচেয়ে ভাল ছাত্র। এ ব্যাপারে তাদেরে জিগাইবার কী আছে? আমি কিছু না বলিয়া তাদেরে এড়াইয়া চলিলাম এবং চিন্তা ও গবেষণা চালাইয়া গেলাম। ক্রমে সাথী-সংখ্যা কমিতে লাগিল। আমিও অধিকতর সূক্ষ্মভাবে ভাইস কথাটার উপর চোখ বুলাইতে লাগিলাম। এই সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে একটা বস্তু আমার নজরে পড়িল। দেখিলাম, “ভি’র খাড়া টান-টান মাথার পিছন দিকে অর্থাৎ বাম দিকে সূক্ষ্ম ও অতি ক্ষুদ্র একটি টান নিচ মুখে হেলিয়া রহিয়াছে। এই টানটি আরো একটু লম্বা হইলেই হরফটা ভি’ না হইয়া এন’ হইয়া যাইত। বিদ্যুতের বেগে আমার মাথায় একটা অনুপ্রেরণা নাজিল হইল। হাঁ, এটা ‘এন’-ই বটে। শব্দটা তবে ভাইস’ নয় নাইস’। এবার ব্যাপারটা আমার কাছে দিনের আলোর মত পরিষ্কার হইয়া গেল। নাইস’ মানে সুন্দর। ঠিক, হেডমাস্টার বাবুর সুন্দর চেয়ারের জন্য শহরে অর্ডার দিয়াছেন। চিঠিতে চেয়ারের সাইয মাপ ও কাঠ ইত্যাদির বিশদ বর্ণনা দিয়াছেন নিশ্চয়ই। কাজেই অত বড় চিঠি। এইবার আমার মনে পড়িয়া গেল, মাত্র কয়েক দিন আগে হেডমাস্টার বাবু সেক্রেটারি জনাব মানিক হাজী সাহেবের সঙ্গে স্কুলের এবং টিচারদের কমনরুমের চেয়ারের অভাবের কথা এবং শীঘ্রই কতকগুলি ভাল চেয়ার আনিবার কথা আলোচনা করিয়াছিলেন। সেই আলোচনায় হেডমাস্টার বাবু স্কুলের সেক্রেটারি মানিক হাজী সাহেবকে এমন কথাও বলিয়াছিলেন যে ভাঙা চেয়ারে বসিতে গিয়া অনেক শিক্ষকের জামাকাপড়ও দু-একবার ছিঁড়িয়া গিয়াছে।

আর কোনও সন্দেহ থাকিল না। হেডমাস্টার বাবু ব্যস্ত মানুষ। তাঁর অবসর খুবই কম। সেই ব্যস্ততার মধ্যে তিনি তাড়াতাড়িতে এই পত্র লিখিয়াছিলেন। বস্তুত ব্যাপারটা আমার চক্ষের সামনে এখন স্পষ্ট ভাসিয়া উঠিল। আমাকে দাঁড়াইতে বলিয়া তিনি এই চিঠিটা লিখিয়াছিলেন। তাড়াতাড়িতে লিখিবার ফলে নিশ্চয় নূতন সরু নিবেরই দোষে ‘এন’-এর বাম। দিকটার টানটা পুরাপুরি পড়ে নাই। আমি লেফাফাটা আরো চোখের কাছে আনিয়া দেখিতে পাইলাম যে, ‘এন’-এর বাম দিকটার টানটা না পড়িলেও নিবের একটা আঁচড় ওখানে স্পষ্টই দেখা যাইতেছে।

.

. ‘ভুল’ সংশোধন

সুতরাং আমি স্থির করিয়া ফেলিলাম, চিঠিটা ডাকে দিবার আগে ওটা সংশোধন করিতে হইবে। সাথীদেরে, এমনকি আমার বড় ভাইকে কিছু। বলিলাম না। তাদের সাথে কেন পরামর্শ করিব? আমি ক্লাসের ফার্স্ট বয়। ইংরাজিতে আমি এক শ নম্বরের মধ্যে পঁচানব্বইর কম কখনও পাই না। আর আমার সাথীরা পঞ্চাশ-ষাটের বেশি কেউ কখনও পান নাই। ইংরাজি শব্দ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিতে যাইব ওদেরে? একটা ফন্দি করিয়া সাথীদের নিকট হইতে আমি আলগা হইয়া পড়িলাম।

বাজারে গেলাম, ঢুকিলাম এক পরিচিত বড় দোকানে। দোকানের ফরাশের কলমদানে দুইটা দোয়াত ও চার-পাঁচটা কলম রাখা ছিল। পরীক্ষা করিয়া তারই একটা বাছিয়া লইলাম। কালি মিলাইয়া অতি সাবধানে ‘এন’ এর বাম দিককার টানটা লম্বা করিয়া ভাইস চেয়ারম্যানকে ‘নাইস’ চেয়ারম্যান করিয়া ফেলিলাম। চুষ কাগজ দিয়া ওটাকে নিপিস করিয়া শুখাইলাম। দৌড়াইয়া পোস্টাফিসে গেলাম। বরাবরের চেয়ে অনেক বেশি সাবধানে চিঠিটা বাক্সে ফেলিলাম। সে উদ্দেশ্যে বাক্সের হাঁ-করা মুখে হাত যতটা ঢুকে ততটা ঢুকাইলাম। চিঠিটা সশব্দে যখন বাক্সের তলায় পড়িল, তখন নিশ্চিত হইয়া আরামের নিশ্বাস ফেলিলাম। আল্লার দরগায় হাজার হাজার শোকর। আমার প্রাণপ্রিয় গর্বের ব্যক্তি হেডমাস্টার বাবুকে নিশ্চিত অপমানের ও বদনামের হাত হইতে রক্ষা করিতে পারিলাম!

এর দিন দশেক পরে একদিন হেডমাস্টার বাবু আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাঁর কামরায় গিয়া দেখিলাম, তিনি একা গম্ভীর মুখে বসিয়া আছেন। আমি ‘আদাব’ দিয়া সামনে দাঁড়াইলাম। তিনি বিষণ্ণ মুখে বলিলেন : ‘কিছুদিন আগে তোমারে একটা বড় লেফাফা ডাকে দিতে দিছিলাম মনে আছে?’

আমি : মনে আছে, সার।

হেডমাস্টার : তুমি সেটা নিজ হাতে ডাকবাক্সে দিছিলা? না, আর কারো হাতে দিছিলা?

আমি : আমি নিজ হাতেই বাক্সে দিছিলাম সার। সেই দিনই স্কুল থনে ফিরবার পথেই দিছিলাম। কেন সার? কী হইছে?

হেডমাস্টার বাবু আমার প্রশ্ন অগ্রাহ্য করিয়া নিজেই প্রশ্ন করিলেন : ডাকবাক্সে ফেলবার আগে চিঠিটা বরাবর তোমারই কাছে আছিল? না, আর কারো কাছে দিছিলা?

আমি সোৎসাহে বলিলাম : না সার, আর কারো হাতে দেই নাই। অনেকেই অত বড় চিঠিটা দেখতে চাইছিল। কিন্তু চিঠিটা আমি হাতছাড়া করছি না। আমার হাতে রাইখাই সকলরে দেখাইছি। কেউরেই ছুঁইবার ধরবার দেই নাই।’

হেডমাস্টার বাবু কী যেন চিন্তা করিলেন। পরে বলিলেন : তুমি চিঠিটা ডাকে দিবার আগে লেফাফার ঠিকানা লেখাটা পড়ছিলা?

এতক্ষণে সব ব্যাপারটা আমার চক্ষের সামনে পরিষ্কার হইয়া আসিয়া উঠিল। একটা অজানা অশুভ চিন্তায় আমার বুক কাঁপিয়া উঠিল। আমি বলিলাম : ‘জি সার, পড়ছিলাম।’

হেডমাস্টার বাবু আড়চক্ষে আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন : ‘ওতে কোনো রকম ভুল তোমার নজরে পড়ছিল কি?

আমার মনে অশুভ চিন্তা মুহূর্তে কাটিয়া গেল। আমি উৎসাহভরে বলিলাম : ‘হ সার। আপনার তাড়াতাড়ির জন্য একটা টান অস্পষ্ট হৈয়া গেছিল। তাতে ‘নাইস’ শব্দটা ভাইস’ হৈয়া গেছিল। আমি ওটা ঠিক কৈরা দিছিলাম।

মোচের নিচে অতিকষ্টে হাসি গোপন করিয়া গম্ভীর মুখে হেডমাস্টার বাবু বলিলেন : এ ভুল সংশোধনের জন্য স্কুলের সাহায্য কাটা যাবার এবং আমার চাকরি যাবার সম্ভাবনা হইছে। অমন সংশোধন আর কখনও কইর না। ময় মুরুব্বি গুরুজনের ভুল সংশোধন করবার আগে চিন্তাভাবনা কইর।

বলিয়া তিনি আরেকটা লম্বা লেফাফা দেখাইলেন। বলিলেন যে লোকাল বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান রাগ করিয়া ঐ পত্রটা পাঠাইয়াছেন। তিনি মনে করিয়াছেন হেডমাস্টার বাবু তাঁর সঙ্গে ঠাট্টা-মশকরা করিয়াছেন। অতঃপর হেডমাস্টার বাবু আমাকে ভাইস চেয়ারম্যান শব্দের অর্থ বুঝাইয়া দিলেন। আমি লজ্জায় মাটির সাথে মিশিয়া যাইতে থাকিলাম। হেডমাস্টার বাবু আমার দুর্দশা দেখিয়া দয়াপরবশ হইলেন। আমাকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়া ক্লাসে ফিরিয়া যাইতে বলিলেন।

হেডমাস্টার বাবুর কাছে অত সহজে রেহাই পাইয়া তাঁর প্রতি আমার ভক্তি আরো বাড়িয়া গেল। তিনি আমার এই এই লজ্জাজনক ব্যাপারটা কারো কাছে প্রকাশ করিলেন না। হেডপণ্ডিত ঈশান চন্দ্র রায় মশায়ের নিকট এই ব্যাপারটা ঘটিলে কী যে ঘটিত বলা যায় না। সারা গা কাঁটা দিয়া উঠিল। মাত্র কয়েক মাস আগের ঘটনা মনে পড়িয়া গেল। ঘটনাটা এই:

.

. মহিষ ও মহিষী

আমাদের বাংলা সাহিত্যের বইয়ে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড ও রানী আলেকজান্দ্রার দুইটা ছবি ছিল। দুইটা ছবিই সমান সাইযের আন্ডার মত গোলাকার। দুইটা ছবিই একই পৃষ্ঠায় পাশাপাশি ছাপা। রাজার ছবির নিচে লেখা ছিল : সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড। আর রানীর ছবির নিচে লেখা ছিল মহিষী আলেকান্দ্রা’। সপ্তম এডওয়ার্ড তখন আমাদের রাজা। সকলেই তাঁর নাম জানিতাম। রাজা-সম্রাটদের ‘বউ’ থাকে, এ জ্ঞানও আমার ছিল। সুতরাং রাজার পাশের ছবির মেয়ে লোকটা রাজার বউ হইবেন, তাতে আমার সন্দেহ থাকিল না। কিন্তু তাঁকে মহিষী বলা হইবে কেন, এটা আমি বুঝিতে পারিলাম না। চাচাজীকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, বড় বড় রাজা-বাদশার স্ত্রীকে সম্মান করিয়া মহিষী বলা হয়। চাচাজীর জবাবে সন্তুষ্ট না হইয়া হেডপণ্ডিত মশায়ের কাছে জিজ্ঞাসা করিলাম। বুঝিলাম, চাচাজী ঠিকই বলিয়াছেন। পণ্ডিত মহাশয় কিছু কিছু অবোধ্য সংস্কৃত আওড়াইয়া ধাতু প্রত্যয় বুঝাইবার। চেষ্টা করিয়া বলিলেন যে সংস্কৃত মহ+ইষ=মহিষ হইতে মহিষী হইয়াছে। আমি যাহা বুঝিবার বুঝিলাম।

এরপর আমার সিদ্ধান্ত দুর্নিবার হইয়া উঠিল। রানীকে সম্মান দেখাইয়া যদি মহিষী বলা যায়, তবে রাজাকে সম্মান দেখাইয়া নিশ্চয়ই মহিষ বলা যায়। যাহা চিন্তা, তাহা কাজ। পাঠ্যপুস্তকের ঐ পাতাটি বাহির করিয়া সপ্তম এডওয়ার্ডের ছবির নিচের লেখাটা বাম দিকে ‘সম্রাট’ কথাটা সাফ কাটিয়া সে স্থলে যথাসাধ্য ছাপার হরফের মত সুন্দর করিয়া গুট-গুট হরফে মহিষ লিখিয়া রাখিলাম। সহপাঠী ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছে, এমনকি বড় ভাইয়ের কাছে, খুব জোরের সঙ্গে বলিয়া বেড়াইতে লাগিলাম, বড় বড় রাজাকে মহিষ বলা হয়। আমি ক্লাসের ফার্স্ট বয় বলিয়া কেউ আমার কথায় সন্দেহ করিল না। এসব ব্যাপারে আমার মত কেউ মাথা ঘামাইতেন না। আধুনিক ভাষায়, গবেষণা করিতেন না।

পণ্ডিত মশায়ের একটা বরাবরের অভ্যাস ছিল তিনি ক্লাসে ঘুরিয়া ঘুরিয়া পড়াইতেন। তিনি চেয়ারে বসিলেই তার ঘুম পায়। ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইবার সময় তিনি এক-এক সময় যাকে সামনে পাইতেন, তার হাত হইতেই খপ করিয়া পড়ার বইটা টানিয়া নিতেন এবং বই দেখিয়াই তিনি ছাত্রদেরে প্রশ্ন করিতেন। তিনি বলিতেন, এতে তার দুইটা উদ্দেশ্য সাধিত হইত। অনেকে দুষ্ট ছেলে আসল পড়ার বইটা হাতে না লইয়া যে কোনও একটা বই খুলিয়া মুখের সামনে ধরিয়া রাখিত এবং পাঠ্যবই পড়িতেছে বলিয়া মাস্টার মশায়কে ফাঁকি দিত। হেডপণ্ডিত মশায়ের ক্লাসে অমন চালাকি করিবার উপায় ছিল না। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল, কোন ছেলে তার পড়ার বই কত পরিচ্ছন্ন রাখিয়াছে, তা দেখা। সেদিন তিনি এমন করিয়া আমার সাহিত্য বইটা টানিয়া নিলেন। পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে তাঁর নজর পড়বি-ত-পড় একেবারে রাজা-রানীর পৃষ্ঠায়। তিনি চোখ বড় করিয়াই কপালে তুলিলেন। তারপর আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন : “এটা কে করেছে?

বলিয়া তিনি আমার সামনে আঙুল দিয়া ছবিটার কাটা জায়গা দেখাইলেন।

আমি ব্যাপার বুঝিলাম। নির্ভয়ে বলিলাম : আমি।’

পণ্ডিত মহাশয় আমার স্থিরভাব দেখিয়া রুষ্ট হইলেন। কঠোর সুরে বলিলেন : “এটা তোমারে কে শিখাইছে?”

আমি সপ্রতিভভাবে বলিলাম : আপনে সার।’

পণ্ডিত মহাশয় বিস্ময়-ক্রোধে গর্জিয়া উঠিলেন। বলিলেন : আমি?

তাঁর বাঁ হাতটা আমার ডান কানের দিকে আসিতে আসিতে ফিরিয়া গেল। বলিলেন : তুমিও শেষ পর্যন্ত “বাজাইরা” হৈতছ?

‘বাজাইরা’ হেডপণ্ডিত মহাশয়ের মুখে সবচেয়ে অপমানকর গাল। যেসব দুষ্ট ছাত্র স্কুল ছুটির পর সোজা বাড়ি মুখে রওয়ানা না হইয়া বাজারের দোকানে দোকানে আড্ডা মারিয়া বেড়ায়, তাদেরই হেডপণ্ডিত মশায় ‘বাজাইরা’ বলিতেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ছেলে জীবনে উন্নতি করিতে পারিবে না। লেখাপড়া তাদের হইবে না। পিতা-মাতার অবাধ্য হইবে এবং শেষ জীবনে তাদের অনেক কষ্ট-লাঞ্ছনা হইবে। হেডপণ্ডিত মহাশয়ের এক ‘বাজাইরা’ কথার মধ্যে এত এত সুদূরপ্রসারী অর্থ নিহিত ছিল। কাজেই খুব অপমান বোধ করিলাম। ঘাড় হেঁট করিয়া বলিলাম : রানী মহিষী হৈলে রাজা মহিষ হইব না কেন, সার?

আমার এই অকাট্য যুক্তির কোনও জবাব পণ্ডিত মহাশয় দিতে পারিলেন। তাই তিনি আরো বেশি রাগিয়া বলিলেন: ফের ‘যদি’ ‘বাজাইরার মত তর্ক করো তবে তোমারেও একদিন নারিকেলের ঝোকা’ বানাইয়া ছাড়ম। ক্লাসের ফার্স্ট বয় বৈলা খাতির করুম না।’

.

. পণ্ডিত মশায়ের অভিনব দণ্ড

নারিকেলের ঝোকার কথা শুনিয়া আমার পিলা চমকিয়া গেল। কারণ হেডপণ্ডিত মশায়ের এটা নিজস্ব মৌলিক আবিষ্কার। পণ্ডিত মশায় ছিলেন বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ। খুবই শুচিবাইগ্রস্ত লোক। ছাত্রদের কানের ময়লায় তার হাত ময়লা হয় বলিয়া বেশ কিছুদিন ধরিয়া কান মলা ছাড়িয়া দিয়াছেন। কিন্তু বাধ্য হইয়া কোনও ভয়ানক দুষ্ট ছাত্রের কান যদি তাকে মলিতেই হয়, তবে হাতে কাপড় লইয়া কান ধরিয়া থাকেন। সে কাপড়টাও ঐ দুষ্ট ছেলেরই গায়ের চাদর। অথবা শার্টের আঁচল। পারতপক্ষে তিনি আজকাল কারো কান মলেন না। তবু বরাবরের অভ্যাসমত রাগ হইলেই তাঁর বাঁ হাতটা ছাত্রদের কানের দিকে ছোটে। খানিক আগে আমারই কানের দিকে তার হাত ছুটিয়াছিল। আমি ক্লাসের ফার্স্ট বয় বলিয়াই তার হাতটা ফিরিয়া গিয়াছে, তা নয়। তার আঙুলে আমার কানের ফিটের ময়লা লাগিবে বলিয়া। কানমলা ছাড়িয়া তিনি। ইদানীং ছিটকি অর্থাৎ লকলকা বাঁশের কঞ্চি ধরিয়াছেন। কিন্তু কিছুদিন আগে এক দুষ্ট ছেলেকে ছিটকির বাড়ি কশিতেই সে এমন গলা ফাটাইয়া ও মাগো, বাবাগো বলিয়া চিৎকার করে যে সারা স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্র দৌড়াদৌড়ি করিয়া সেই ক্লাসের সামনে ভিড় করেন। এমনকি থানা হইতে ছোট বা বড় কোনো দারোগা বাবুও আসিয়া পড়েন।

এরপর হইতে হেডপণ্ডিত মহাশয় ছিটকি ফেলিয়া নারিকেলের ঝোকা’র প্রবর্তন করেন। এই দণ্ডের কৌশলটা এই : তিনজন হইতে পাঁচ-ছয়-সাতজন ছেলেকে একত্রে দাঁড় করানো হইত। তাদের সকলের গলা বেড়িয়া একটা চাদরে দুই মাথা একত্র করিয়া পণ্ডিত মহাশয় নিজ হাতে লইতেন। তারপর দড়ির গিরো কশার মত করিয়া চাদরের দুই মাথায় আতেক্কা হেঁচকা টান মারিতেন। তাতে চাদর-বেড়া সব ছাত্রের মাথা ঠুকঠাক ঠুসঠাস ও ঘটাঘট শব্দ করিয়া পরস্পরের সঙ্গে ঘাত-প্রতিঘাত করিত। তাতে নারিকেলের ঝোকার আওয়াজ পাওয়া যাইত। তিন-চারবার এরূপ করিলেই ছাত্ররা কান্নাকাটি ও কাকুতি-মিনতি শুরু করিত আর দুষ্টামি করিব না সার, কাল পড়া শিখিয়া আসিব, আজ মাফ করিয়া দেন স্যার ইত্যাদি।

পাঁচ-সাতটা মাথা একটানে একখানে করা কম শক্তির কাম নয়। কাজেই পণ্ডিত মহাশয় নিজেও নিশ্চয়ই ক্লান্ত হইয়া পড়িতেন। কিন্তু সেভাব না দেখাইয়া শুধু ছাত্রদের উপর দয়া পরবশ হইয়াই’ সেদিনকার মত ছাড়িয়া দিতেন।

এমন শাস্তি পণ্ডিত মশায় প্রায়ই দিতেন। আমাদের ক্লাসেও হইত। একত্রে অন্তত তিনটা অপরাধী পাওয়া না গেলে নারিকেলের ঝোকা ভাল জমে না বলিয়াই যা কয়েক দিন বাদ পড়িত। এমন শাস্তির প্রতি আমার একটা ভয়ানক ভীতি ছিল। কাজেই রাজার মহিষ না হওয়ার কোনও কারণ খুঁজিয়া না পাইলেও শুধু নারিকেলের ঝোকা হওয়ার ভয়ে রাজাকে মহিষ বলা হইতে বিরত হইলাম।

.

৮. স্কুলে যাতায়াত

দরিরামপুর স্কুলে আমি চার বছর পড়িয়াছি। এই চার বছরে আমার অনেক জ্ঞান লাভ হইয়াছিল। তার মধ্যে বিপজ্জনক কায়িক পরিশ্রমই ছিল প্রধান। আমাদের বাড়ি হইতে বৈলর-ধানীখোলা বাজার-ঘাট আঁকাবাঁকা পথে এক মাইল। নদী পার হইয়া ডিবি রোডে আসিতে আরো এক মাইল। ডিবি রোড স্কুল পর্যন্ত তিন মাইল। এই পাঁচ মাইল রাস্তা চার বছর ধরিয়া দৈনিক দুইবার হাঁটিয়াছি। এই দূরত্ব পাঁচ মাইল শুকনা দিনে। বর্ষাকালে এই দূরত্ব অনেক বাড়িয়া যাইত। কারণ ধান-পাট ক্ষেতের আইল-বিল-বাতর ও খাল-বিলে কিনার ঘুরিয়া যাইতে হইত। শুকনা দিনের মত ক্ষেত-পাথালি বা বিল পাথালি চলিবার উপায় ছিল না। ঝড়-বৃষ্টির দিনেও স্কুল কামাই করার সাধ্য ছিল না। তবে বৃষ্টিতে কাপড়চোপড় নিতান্তই ভিজিয়া ডুবডুবা হইয়া গেলে ‘রেইনি ডে’ পাওয়া যাইত। অর্থাৎ নাম ডাকিয়া হাজিরা বইয়ে হাজির গরহাজির লিখিয়া স্কুল ছুটি দেওয়া হইত। এমন ‘সৌভাগ্য’ বছরে দুই দিনের বেশি আমার দরিরামপুর জীবনে হয় নাই।

বর্ষাকালে আরেকটা বড় অসুবিধা ছিল। সুতোয়া নদীতে কোনও পোল তো ছিলই না, গোদারাও ছিল না। ধানীখোলা-বৈলর ঘাটে হাটুরিয়াদের পারাপারের সুবিধার জন্য জমিদার পক্ষ হইতে যে নৌকার ব্যবস্থা ছিল, তা সব দিন বা সব সময় পাওয়া যাইত না। পুরা বর্ষাতে থমথমা ভরা নদী সাঁতরাইয়া পার হইবার সাহস বা মুরুব্বিদের অনুমতি ছিল না। অবশ্য অন্যান্য সময় নদী কম-ভরা অবস্থায় কোনও কোনও দিন সাতরাইয়া পার হইয়াছি। এতেও বই-পুস্তক, কালি-কলম, পেনসিল লইয়া আমাদের কোনও অসুবিধা হইত না। তবে এত দূরের রাস্তায় অতগুলি বই-পুস্তক ও খাতাপত্র লইয়া যাতায়াত বাস্তবিকই কঠিন হইত।

.

. বই-পুস্তকের থলি

কিন্তু দরিরামপুর ভর্তি হইবার পর মা আমাদের দুই ভাইকে দুটি জুযদানের মত থলি সিলাই করিয়া দিয়াছিলেন। প্রথমে এটা পুরাতন কাপড়ের মযবুত, পরে নয়া মার্কিনের টুকরা দিয়া তৈরি হইত। দশীর তাগা দিয়া জুযদানের মত এসব বড় থলি সিলাই করিতেন। দশী’ ও ‘তাগা’ শব্দ দুইটা আমাদের ছেলেবেলায় খুব চালু ছিল। আজকালের তরুণরা হয়তো এদের কথা শোনেই নাই। তাই এ সম্পর্কে কিছু বলা ভাল। তাগা’ মানে সুতা। মোটা সুতাকেই তাগা’ বলা হইত। ‘দশী’ হইল কাপড় বুনিবার সুতার (ইয়ান) ছোট ঘোট বান্ডিল। তৎকালে সুতার বান্ডিল আসিত বিলাত হইতে। এক এক বান্ডিল এক পাউন্ডের (আধসের) হইত। তাঁতি ও জোলারা বাজার হইতে এই বান্ডিল কিনিয়া গামছা, মেয়েদের মোটা রঙ্গিন শাড়ি ও পুরুষদের মোটা লুঙ্গি বুনিত। এক-এক বান্ডিল সুতার দাম ছিল দশ-বার আনা। সুতার দোকানদাররা এক পাউন্ডের বান্ডিল ভাঙ্গিয়া আধপোয়ার (এক আউন্স) ছোট ছোট বান্ডিল বানাইয়া বিক্রয় করিত। গিরস্তরা এই ছোট ছোট বান্ডিলকেই দশী’ বলিত। গিরস্তরা বাড়ির মেয়েদের জন্য এই ‘দশী কিনিত। মেয়েরা এই ‘দশী’র দুই-তিন নাল সুতায় তাগা পাকাইত। এই তাগায় মেয়েরা কথা সিলাই করিত। ছেলেবেলায় মা, ফুফু ও চাচিজানকে এই তাগা দিয়া কাঁথা সিলাই করিতে দেখিয়াছি। দশী’র সুতাগুলি ছিল সাদা। কথায় নকশি করিবার জন্য তাঁরা লাল-নীল-কালো রঙের সুতা ব্যবহার করিতেন। এই রঙ্গিন সুতা কিনিতে হইত না। মেয়েরা চওড়া পাড়ের যেসব বিলাতী শাড়ি পরিতেন, সেসব পাড়ের রং ছিল যেমন পাকা, সুতাও ছিল তেমনি মযবুত। ‘দশীর’ মোটা তাগায় সিলাই করিবার সময় মেয়েরা দুই নম্বর সুই ব্যবহার করিতেন। আর নকশি তুলিবার, তহবন্দ সিলাই করিবার এবং জামা-কোর্তা রিপু করিবার সময় পাঁচ নম্বর সুই ব্যবহার করিতেন। ফলে মেয়েদের কাছে দুই নম্বর ও পাঁচ নম্বর সুইই আমি দেখিয়াছি। আমাদের বাড়িতে শুধু চাচিজিকে দশ নম্বর সুই ব্যবহার করিতে দেখিয়াছি। এই দশ নম্বর সুই ও আলেকান্দ্রা মার্কা গুটি সুতা দিয়া তিনি নিজের জন্য কল্লিদার লম্বা কোর্তা সিলাই করিতেন।

.

১০. থলির সুবিধা

যা হোক, এই দশী তাগা দিয়াই মা আমাদের জন্য থলি তৈয়ার করিতেন। এই থলি বগলেও নেওয়া যাইত, আবার কাঁধে ঝুলাইয়াও নেওয়া যাইত। কাঁধে ঝুলাইবার জন্য কাপড়ের শক্ত পাড় দিয়া কাঁধ-প্যাচা বনাত লাগানো হইত। এই থলিতে পেনসিল, রবার ও কলম-তারাশের (ছোট চাকু) জন্য পৃথক পৃথক জেব থাকিত। প্রথম প্রথম আমরা কাঁধ-পঁাচা থলিতে করিয়া বই-পুস্তক নিতে আপত্তি করিতাম। কারণ এটা দেখিতে আদালত পোস্টাফিসের পিয়ন-পিয়াদার মত দেখাইত। কিন্তু কিছুদিনেই আমাদের এই শরম কাটিয়া গেল। দূরের রাস্তায় এইভাবে বই-পুস্তক বহনের সুবিধাও আমরা বুঝিলাম। দু-একজন শিক্ষক আমাদের তারিফও করিলেন। কোনও ছাত্র কিছু একটা হারাইবার অজুহাত দিলেই মাস্টার সাহেবেরা আমাদের নজির দিতেন। এই থলির দরুনই দরিরামপুরে আমরা ছাত্রজীবনের চারটা বছরে আমি কোনও দিন বই-পুস্তক, খাতা-দোয়াত, কলম-পেনসিল, রবার চুষকাগজ-কলম-তারাশ, কিছুই হারাই নাই। যখন যেটার দরকার হাত দিয়াই পাইয়াছি। অথচ অনেক বেশি বইয়ের ভারী বোঝা বহন করিতে আমাদের কোনও কষ্ট হইত না। কাধ-প্যাচা বনাতটা সাধারণত ডান কাঁধের উপর থাকিত এবং থলিটা বাম কাকালে ঝুলিয়া থাকিত। ক্কচিৎ-কদাচিৎ কাঁধ বদলাইয়া বনাতটা ডান কাঁধ হইতে বাম কাঁধে আনিতাম। তাতে থলিটা বাম কাকাল হইতে ডান কাকালে আসিত।

.

১১. বিপজ্জনক রাস্তা

এই থলি কাঁধে করিয়া আমরা বাড়ি হইতে বাহির হইতাম স্কুলের নির্ধারিত সময়ের দুই আড়াই ঘণ্টা আগে। অর্থাৎ দশটার সময় ক্লাস বসিলে আমরা সাড়ে সাতটায় বাড়ি হইতে বাহির হইয়া উঁচা-উঁচা পাটের ক্ষেতের সরু-সরু আইল-বাতর দিয়া পানিতে-ডুবা ধান ক্ষেতের আইল হাঁটিয়া নদী পার হইতাম এবং আরো মাইলখানেক হাঁটিয়া বড়দিঘির’ নিকটে আসিয়া ডিবি রাস্তায় উঠিতাম। বৈলর, কানহর, কাঁঠাল, ভরাডুবা ইত্যাদি গ্রামের সহপাঠীরা এই বড়দিঘির পাড়ে আসিয়া জমা হইত। ক্লাস আওয়ারের এক ঘণ্টা বাকি থাকিতে এখান হইতে সকলে মিলিয়া রওয়ানা হইতাম। রাস্তার দুই পাশে আরো ছাত্ররা অপেক্ষা করিতে থাকিত। তারা আমাদের সাথে শামিল হইত।

কিন্তু যদি নৌকার অভাবে আমরা সুতোয়া নদী পার হইতে না পারিতাম তবে নদীর কূল বাহিয়া দক্ষিণ দিকে যাইতে থাকিতাম। বর্তমানে ধানীখোলা বাজার হইতে ত্রিশাল বাজার পর্যন্ত গাড়ি, ঘোড়া মটর চলিবার উপযোগী যে ইউনিয়ন বোর্ডের রাস্তা আছে, এমন কোনও রাস্তা তৎকালে ছিল না। তবে দুপায়া একটি রাস্তা ছিল। কিন্তু সে রাস্তা ছিল প্রায় অন্ধকার বিশাল জঙ্গলের ভিতর দিয়া। তাতে আবার কিছু দূর পরপর পনের-বিশ হাত গভীর নদীর ভাঙতি ছিল। দিনের বেলায়ও ঐ রাস্তায় কেউ একা চলিতে সাহস পাইত না। আমাদের মত আট-দশ বছরের শিশুর তো কথাই নাই। কিন্তু আমরা সাহস করিতাম। আমরা দুই ভাই ছাড়াও আমাদের প্রতিবেশী আরো দুইজন ছাত্র দরিরামপুর স্কুলে পড়িত। আমরা এই চারিজন নদীর পাড়ের এই পথে। দক্ষিণ দিকে চলিতাম। নদীর পাড়ে বহু অবস্থাশালী গৃহস্থের বাড়ি ছিল। তাদের বাড়ির ঘাটে পারাপারের সুবিধার জন্য কলাগাছের ভোরা (ভেলা) থাকিত। আমরা বহুদিন এই রকম ভোরায় নদী পার হইয়াছি। নদী পার হইয়া একবার বৈলর গ্রামে যে কোনও মৌযায় পৌঁছিতে পারিলেই আমরা নিশ্চিন্ত হইতাম। আইল-বাতর ভাঙ্গিয়া কোনও এক উপায়ে আমরা ডিবি রাস্তা ধরিতে পারিতামই।

এত করিয়াও আমরা প্রায় ঠিক সময়েই স্কুলে পৌঁছিতাম। চার বছরে আমরা দুই এক দিনের বেশি লেইট হইয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না।

রাস্তাঘাটের এই বিপজ্জনক অবস্থার জন্য আমার মুরুব্বিরা সারা দিন উদ্বিগ্ন থাকিতেন। আমার মা সারা দিন আমাদের নিরাপদে ফিরিয়া আসিবার জন্য দমে-দমে আল্লা-আল্লা করিতেন। আসরের নামাজ পড়িয়াই দেউড়ির কাছে। আসিয়া উঁকিঝুঁকি শুরু করিতেন। বাপজী ও চাচাজী সাংসারিক কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকিতেন বটে, কিন্তু দাদাজী তৎকালে সব কাজ হইতে অবসর নিয়াছেন। কাজেই আসরের নামাজ পড়িয়াই তিনি বাড়ি হইতে বাহির হইতেন এবং নদীর ঘাটের কাছে কোনও দোকান ঘরে বা কাঁচারিতে বসিয়া ঘাটের দিকে চাহিয়া থাকিতেন। আমরা ফিরিয়া আসিলে আমাদেরে সঙ্গে নিয়া বাড়ি ফিরিতেন। কোনও কোনও দিন ফিরিতে আমাদের এত দেরি হইত যে নদীর পাড়েই দাদাজীকে মগরেবের নামাজ পড়িতে হইয়াছে। লোকজনের মুখে শুনিয়াছি সেদিন দাদাজী নদীর পাড় দিয়া প্রায় এক মাইল রাস্তায় উত্তর-দক্ষিণ করিয়া টহল দিয়াছেন। এবং রাস্তায় যাকে পাইয়াছেন তাকেই জিজ্ঞাসা করিয়াছেন।

.

১২. দুইটি ব্যক্তিত্বের প্রভাব

দরিরামপুর স্কুলে ছাত্রজীবনে আমি দুইটি লোকের দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হইয়াছিলাম। তার একজন আমাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার কৈলাস বাবু। আরেকজন স্কুল-সংলগ্ন মাদ্রাসার ছাত্র মোহাম্মদ আতিকুল্লাহ। কৈলাস বাবু আমাকে সাহিত্য সাধনার অনুপ্রেরণা দিয়াছিলেন। সে কথা আমি অন্য অধ্যায়ে বর্ণনা করিব। এখানে শুধু এইটুকু বলা দরকার যে কৈলাস বাবু আমার মনে উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগাইয়াছিলেন। পড়া-শোনায়, আদব-কায়দায়, স্বভাব-চরিত্রে আমার মত ছেলে তিনি জীবনে আর দুইটি দেখেন নাই, সব সময় সবার কাছে তিনি এই কথা বলিয়া বেড়াইতেন। তিনি ছাত্রদের উপযোগী শিক্ষামূলক নাটক লিখিয়া ছাত্রদের দিয়া অভিনয় করাইতেন। তাতে সব সময় আমাকে নায়কের পাট দিতেন। সব সময় নায়কটি আদর্শ চরিত্রবান যুবক থাকিত। উপসংহারে তার জয় দেখানো হইত। আমি আগে সত্য সত্যই ভাল ছিলাম কিনা দ্বিমত হইতে পারিত। কিন্তু কৈলাস বাবু ভাল বলিতে-বলিতে আমি সত্যই ভাল হইয়া গেলাম।

আতিকুল্লাহ মাদ্রাসার ছাত্র হইলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গায়ক ও চিত্রকর। জীব-জন্তুর ছবি আঁকা নিষেধ আছে বলিয়া আতিকুল্লাহ শুধু লতা পাতা-গাছ-বৃক্ষ ও নদী-নালার ছবি আঁকিতেন। গান না গাহিয়া তিনি বাংলা গজল গাইতেন। লতা-পাতা আঁকা ছাড়া তিনি আরবি ও বাংলা হরফে অতি চমৎকার ‘তুগরা’ আঁকিতেন। আরবি হরফের তুগরা অনেক কেতাবে পাওয়া যাইত, কাজেই আতিকুল্লাহর আরবি তুগরাতে বড় কেউ আশ্চর্য হইতেন না। কিন্তু বাংলা হরফে তিনি যে তুগরা আঁকিতেন সেটা ছিল সত্যই মৌলিক। চিত্র করা ও তুগরা লেখার কাজে যে সব বিভিন্ন রঙের কালি লাগিত, আতিকুল্লাহ সবই নিজের হাতে তৈয়ার করিতেন। চিত্র ও তুগরা ছাড়াও তিনি সাধারণ চিঠিপত্র ও খাতার কাগজেও এমন সুন্দর হরফে সব লেখা লিখিতেন যে ছাপার হরফ বলিয়া ভুল হইত। তিনি একদিকে তেরছাকাটা খাগের কলম দিয়া বড়-বড় হরফে বহু পোস্টার লিখিয়া ঘরের বেড়ায়, মসজিদের দেওয়ালে লটকাইয়া দিতেন। না বলিয়া দিলে কেউ এগুলিকে হাতের লেখা বলিয়া ধরিতে পারিতেন না। পক্ষান্তরে সরু মিহিন লেখাতেও তিনি উস্তাদ ছিলেন। একদা তিনি ছাপার হরফের মত গুট-গুট পরিচ্ছন্ন ও সুস্পষ্ট অক্ষরে একটি পোস্টকার্ডে একাশি লাইনের একটি পত্র লিখিয়াছিলেন। ছাপার হরফের মত প্রতিটি হরফ এমন স্পষ্ট ও আলগ ছিল যে কোনও অল্প শিক্ষিত লোকও তা পড়িতে পারিত।

এই সব গুণে আমি অল্পদিনেই আতিকুল্লাহর শাগরিদ হইয়া গেলাম। তিনিও আমাকে অকাতরে তার বিদ্যা শিখাইলেন। আমি নিজ হাতে বিভিন্ন রঙের কালি বানাইয়া চিত্র ও তুগরা আঁকায় লাগিয়া গেলাম। অবশ্য এসব গুণে আমি আতিকুল্লাহ সাহেবের ধারে-কাছেও যাইতে পারিলাম না। কিন্তু এতে আমার হাতের লেখার অনেক উন্নতি হইল। আমার ছেলেবেলার উস্তাদ চাচাজী, জগদীশ বাবু ও আলিমুদ্দিন মাস্টার সকলেরই হাতের লেখা ভাল ছিল। বিশেষত চাচাজীর আরবি ও বাংলা লেখা তাঁর পাঠ্যজীবনের খাতা-পত্র আমরা অনেক দেখিয়াছি। হাতে-তৈরি মিসমিসা কালিতে তেরছাকাটা কলমে এসব লেখা অবিকল ছাপা হরফের মত দেখা যাইত। ত্রিশ-চল্লিশ বছরেও কালির চকচকাভাব কমে নাই। বাল্য শিক্ষকের হাতের লেখাই অধিকাংশ ছাত্রের হস্তাক্ষরে প্রভাবিত করে। আমারও করিয়াছিল। কিন্তু নকশি লেখায় আমাকে একমাত্র আতিকুল্লাহ সাহেবই যে প্রভাবিত করিয়াছিলেন, তাতে কোনও সন্দেহ নাই। আতিকুল্লাহ সাহেব আমাকে সাহিত্য সাধনায়ও উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন, এ কথা আমি অন্য অধ্যায়ে বলিব। এখানে শুধু এইটুকু বলিতে চাই যে প্রায় সমবয়সী সহপাঠীও যে মানুষের জীবনে কত প্রভাব বিস্তার করিতে পারে, আতিকুল্লাহ আমার জীবনে তার একটা উজ্জ্বল প্রমাণ।

.

১৩. করোনেশনের পুরস্কার

১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি ক্লাস ফাইভ হইতে ক্লাস সিক্সে প্রমোশন পাই। ঠিক সেই সময়ে আমাদের সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড মারা যান। সে জন্য এক সপ্তাহ কাল আমরা ছাত্ররা হাতের বাহুতে কালো ফিতা বাধিয়া চলিতাম। সরকারি হুকুমে হেডমাস্টার বাবুই আমাদেরে এই কালো ফিতা পরিতে বাধ্য করিয়াছেন। কিন্তু ফিতা ও সেফটিপিন স্কুল হইতেই সরবরাহ করা হইয়াছিল বলিয়া এতে আমাদের কোনও আপত্তি হয় নাই। বরঞ্চ একটা নয়া অভিজ্ঞতা হিসাবে এটা আমি উপভোগ করিয়াছিলাম।

ঐ সালের ১২ ডিসেম্বর তারিখে সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক উৎসব দিল্লি দরবার উপলক্ষে সরকারি টাকায় আমাদের স্কুলে উৎসব হয় এবং পুরস্কার বিতরণ করা হয়। স্কুলের সবচেয়ে ভাল ছাত্র হিসাবে, সত্যবাদী ছাত্র হিসাবে এবং নিয়মিতভাবে স্কুলে হাজির থাকার দরুন আমি তিন দফা পুরস্কার পাই। তিন দফায় বাংলা-ইংরাজি মিলাইয়া আমি দশ কি বারখানা ভাল ভাল বাঁধানো বই পুরস্কার পাইয়াছিলাম। ইংরাজি বইয়ের মধ্যে রবিনসন ক্রুসো, আইভানহো, ইভনিংস অ্যাট হোম, গ্রিমস ফেয়ারি টেলস এর নাম এবং বাংলা বইয়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী ও নৌকাডুবি এবং জলধর সেনের বিশু দাদার নাম মনে আছে। এই সব বইয়ের দুই-একটি বাদে আর সবগুলিই লাল-নীল-সবুজ রঙের কাপড়ে বাঁধাই ছিল। অনেকগুলিতেই সুন্দর ছবি ছিল। এই সব পুস্তক বগলে লইয়া যেদিন বাড়ি ফিরিলাম এবং আমার বড় ভাই সগর্বে আমার সবচেয়ে বেশি ও সবচেয়ে দামি বই পুরস্কার পাওয়ার কথা বর্ণনা করিতে লাগিলেন, তখন বাড়ির সকলে আনন্দ-উল্লাস করিতে লাগিলেন। আমি লজ্জা-শরমে খানিকক্ষণ লুকাইয়া থাকিলাম। তারপর পুস্তকের মধ্যে মানুষের ছবি দেখিয়া কেউ কেউ আপত্তি তুলিলেন বটে কিন্তু কিছুদিন আগে চাচাজীর নিজের কেনা আমির হামযা ও জংগনামার মধ্যেও ঘোড়সওয়ার আমির হামযা ও হানিফার পাতা-জোড়া ছবি আছে বলিয়া ছবির আপত্তি বেশি দিন টিকিল না। ১৯১২ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি দরিরামপুর মাইনর স্কুলের বিদ্যা শেষ করিয়া ময়মনসিংহ শহরে আসিলাম। এই বছরই দরিরামপুর মাইনর স্কুলকে হাইস্কুলে উন্নীত করা হয়। কাজেই স্কুল কমিটির মেম্বর-সেক্রেটারি সকলে আমাদের দুই ভাইকেই ঐ স্কুলে থাকিয়া যাইতে বলেন এবং দাদাজীকে ধরেন। দাদাজী কিছুটা নরম হইলেন বটে কিন্তু আমি শহরে যাইবার জন্য জিদ ধরিলাম। শেষে আপসরফা হিসাবে অন্তত এক ভাই ঐ স্কুলে থাকা ঠিক হইল। ফলে মিঞা ভাই দরিরামপুর নয়া হাইস্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হইলেন। আমি ময়মনসিংহ চলিয়া আসিলাম।.

 

অধ্যায় পাঁচ – মাধ্যমিক শিক্ষা–নাসিরাবাদে

১. মৃত্যুঞ্জয় স্কুল

১৯১৩ সালের জানুয়ারি মাসে আমি নাসিরাবাদ শহরে পড়িবার জন্য আসিলাম। ময়মনসিংহ শহরকে তৎকালে পাড়াগাঁয়ের লোকেরা নাসিরাবাদ বলিত। আমার মুরুব্বিরাও বলিতেন। কিন্তু শহরে আসিয়া দেখিলাম, সবাই এটাকে ময়মনসিংহ বলে, নাসিরাবাদ কেউ বলে না।

শামসুদ্দিন আগে হইতে ময়মনসিংহ শহরে থাকিতেন। সুতরাং তার সাথে একত্রে থাকিবার জন্য তাঁদের মেসেই উঠিলাম। ঐ মেসে আমাদের প্রতিবেশী মাতবর ওসমান আলী সরকার সাহেবের ছোট ভাই সাঈদ আলী সাহেবও থাকিতেন। কাজেই মুরুব্বিদের কথামত বাড়ি হইতে আগেই ঠিক করিয়াই আসিয়াছিলাম, এদের সঙ্গেই থাকিব। সাঈদ আলী সাহেব ও শামসুদ্দিন উভয়েই জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। কাজেই জিলা স্কুলেই ভর্তি হইব, ঠিক করিয়াছিলাম। কিন্তু গিয়া দেখিলাম জিলা স্কুলে সিট নাই। সাঈদ আলী সাহেব ও শামসুদ্দিন অবশ্য আমার একটা সিটের জন্য অনেক ধরাধরি করিলেন। কিন্তু কোনও ফল হইল না। এতে আমি খুবই নিরাশ হইলাম। আমার আত্মীয়-বন্ধুরা। জিলা স্কুলে পড়েন, সে জন্য জিলা স্কুলের প্রতি একটা স্বাভাবিক টান ছিল। তা ছাড়া জিলা স্কুলের প্রতি আকৃষ্ট হইবার আরেকটা সাম্প্রতিক কারণ ঘটিয়াছিল। সেই বছরই জিলা স্কুল তার পুরাতন বাড়ি। হইতে নূতন দালানে উঠিয়া আসিয়াছে। বর্তমানে জিলা স্কুল যে বাড়িতে আছে, এটাই সেই নূতন দালান। এর আগে জিলা স্কুল ছিল জজকোর্টের দক্ষিণ দিকের লম্বা বড় টিনের ঘরটায়। বর্তমানে এই ঘরটা সেটেলমেন্ট বিভাগের রেকর্ড রুমরূপে ব্যবহৃত হইতেছে, জিলা স্কুলের নূতন বাড়িতে সেই বারই প্রথম স্কুল উঠিয়া আসিয়াছে। নূতন স্কুল দালানের ভিতর-বাইর সবই তকতকা সুন্দর। চারিদিকে সব দেওয়াল নূতন। বিশেষত মাঝখানের হল ঘরটা একটা বিস্ময়ের বস্তু। মাঝখানে দাঁড়াইয়া কথা বলিলে সারা। হলটায় গম গম করিয়া আওয়াজ ওঠে। এমন সুন্দর স্কুলে পড়িতে পারিব না বলিয়া মনটা এমন খারাপ হইয়া গেল যে রাগে ঠিক করিলাম আবার আমার প্রিয় দরিরামপুরে ফিরিয়া যাইব।

শামসুদ্দিন যে মেসে থাকিত এবং সেখানে আমি উঠিয়াছিলাম তার সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন মৌলবী আবদুল হাই। তিনি মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের আরবি ফারসি শিক্ষক। তিনি আমাকে মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে ভর্তি হইবার উপদেশ দিলেন। মৌলবী সাহেবকে আমার ভাল লাগিয়াছিল। তার উপদেশ আমি রাখিলাম। বিশেষত ঐ মেসে যত ছাত্র ছিল তাদের অধিকাংশই ছিল মৃত্যুঞ্জয়ের ছাত্র। কাজেই মৃত্যুঞ্জয় স্কুলেই ভর্তি হইলাম।

মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে ভর্তি হইয়া জিলা স্কুলে সিট না পাওয়ার দুঃখ আমি ভুলিয়া গেলাম। কারণ মৃত্যুঞ্জয় স্কুল আমার কাছে একটা মহাসাগর মনে হইল। স্কুল ত নয়, যেন একটা মেলা। স্কুল বিল্ডিং ত নয়, যেন একটা দুর্গ। কোথাও যে এ দালানের শুরু আর কোথায় যে এটার শেষ, খুঁজিয়া বাহির করা কঠিন। প্রথম প্রথম আমার মনে হইল এ স্কুলের ছাত্রদেরও লেখাযোখা নাই। মাস্টারের সংখ্যাও অগণিত। পরে জানিয়াছিলাম স্কুলে ছাত্রসংখ্যা দেড় হাজার। শিক্ষক-সংখ্যা চৌত্রিশ জন। দেড় হাজার ছাত্রের মধ্যে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা তিন শর কিছু উপরে। এই হিসাবে জিলা স্কুল অতি ছোট স্কুল। তার মোট ছাত্রসংখ্যাই ছিল পৌনে তিন শ, মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের মুসলমান ছাত্রের চেয়েও কম। তখন এই শহরে অবশ্য সিটি স্কুল ছিল ছাত্রসংখ্যার দিক দিয়া মৃত্যুঞ্জয়ের চেয়েও বড়। তার ছাত্রসংখ্যা ছিল সতের-আঠার শ। শিক্ষক ছিলেন চল্লিশের বেশি। কিন্তু মুসলমান ছাত্রের দিক দিয়া মৃত্যুঞ্জয় স্কুলই শ্রেষ্ঠ। সিটি স্কুলে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা ছিল এক শরও কম।

.

. হিন্দু-মুসলমান পৃথক বেঞ্চি

এই দিক দিয়া জিলা স্কুলে ভর্তি না হওয়ার দুঃখই শুধু ভুলিলাম না, মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য গর্ব-অহংকার করিতে লাগিলাম। অল্পদিনের মধ্যেই আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার শ্রীযুক্ত ভূপতি চরণ দত্ত, ইংরাজি শিক্ষক শ্রীযুক্ত যতীন্দ্র চন্দ্র সরকার, বাংলা শিক্ষক শ্রীযুক্ত বিপিন চন্দ্র রায়, গণিতের শিক্ষক শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্র নাথ দত্ত রায় প্রভৃতি মাস্টার মহাশয়ের প্রিয় পাত্র হইয়া উঠিলাম। ক্লাসে ভাল ছাত্র বলিয়া নাম করিলাম। ক্লাসের ফার্স্ট বয় শৈলেশ ধর, সেকেন্ড-থার্ড-ফোর্থ যথাক্রমে মনসা চক্রবর্তী, সুধীর রায়, নরেশ ঘোষ সকলের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হইয়া পড়িলাম। কিন্তু এ স্তরে পৌঁছিতে কয়েক মাস সময় লাগিয়াছিল। কারণ তৎকালে হিন্দু-প্রধান স্কুলে মুসলমান ছাত্রদের বিশেষ মর্যাদা ছিল না। আমি প্রথম দিন ক্লাসে গিয়াই বুঝিলাম, হিন্দু-মুসলমান ছাত্ররা পৃথক-পৃথক বেঞ্চিতে বসে। এটা উপরের হুকুমে হয় নাই সে খবর পাইলাম। আপনা-আপনিই এটা হইয়া গিয়াছে। সাধারণত ক্লাসে ছাত্রদের বসিবার জন্য নিয়ম-নির্দিষ্ট কোনও সিট নাই। ফার্স্ট-সেকেন্ড-থার্ড বয় পর্যন্ত ছাত্ররা শিক্ষকের বাম দিকস্থ কাতারের প্রথম দিকে বসিলেও অন্য ছাত্ররা যার যথা-ইচ্ছামত বসিয়া থাকে। এই বসার গ্রুপিং হইয়া থাকে ছাত্রদের পরস্পরের সখ্য ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে। খাতিরের সমপাঠীরা এক বেঞ্চে ঘেঁষাঘেঁষি করিয়া বসিয়া থাকে। এই নিয়মেই মুসলমান ছাত্ররা একসঙ্গে এক বেঞ্চিতে জমা হইয়া যাইত। সাধারণত হিন্দু ছেলেরাই ক্লাসের ভাল ছাত্র বলিয়া ভাল ছাত্রের বেঞ্চিতে শুধু হিন্দু ছাত্রই দেখা যাইত। এই স্বাভাবিক কারণে হিন্দু ও মুসলমান ছাত্ররা ক্লাসে পৃথক পৃথক আসনে বসিতে বসিতে এটা একরকমের নিয়মে পরিণত হইয়া গিয়াছিল। হিন্দুদের মধ্যে ছোঁয়াছুঁয়ির বাতিক থাকায় এই পৃথক বসাটাকে সেই অর্থে নেওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল। তা ছাড়া এতে হিন্দু ও মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে হয়তো একটা কমপ্লেক্স গড়িয়াও উঠিয়াছিল। মুসলমান ছাত্ররা হিন্দুদের সাথে এক বেঞ্চিতে বসিতে সাহস পাইত না; আর হিন্দুরা মুসলমানদের সাথে বসিতে ঘৃণা ও অপমান বোধ করিত। এই অবস্থায় প্রথম দিন ক্লাসে গিয়াই আমি প্রথম কাতারে টিচারের আসনের নিকটে যখন বসিলাম, তখন অনেক ছাত্রই পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিল। আমি অবশ্য আমার ডান দিকে দুই-একজন বসিতে পারে, সে মত জায়গা রাখিয়াই বসিলাম। নূতন নূতন ক্লাসে ভর্তি হইয়াই ক্লাসের প্রথম সিটটায় বসা উচিৎ মনে হইল না। আমি বরাবর ক্লাসে প্রথম সিটটাতেই বসিয়াছি। সেই অভ্যাসবশত প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকিয়াই নিজের অজ্ঞাতসারেই প্রথম সিটটায় বসিয়া পড়িয়াছিলাম। কারণ প্রথম দিন বলিয়া প্রায় আধা ঘণ্টা আগেই ক্লাসে গিয়াছি। ক্লাসের অনেক ছাত্র বিশেষত ফার্স্ট বয় শৈলেশ ধর তখনও আসেন নাই। তবু বেঞ্চিতে বসিবার পর আমার মনে হইল ডান দিকে দুই-একজনের বসিবার মত জায়গা ছাড়িয়া দেওয়া আমার উচিৎ। তদনুসারে সরিয়া বসিলাম। আমরা এই দ্বিধা ও দুর্বলতা অন্যান্য সামনের বেঞ্চের ছাত্রদের কেউ-কেউ বোধ হয় বুঝিতে পারিল। কারণ আমি যে মুসলমান সে সম্বন্ধে ভুল করিবার কোনও উপায় ছিল না। আমার মাথায় ঈষৎ খয়েরি লাল রঙের তুর্কি টুপিটা আমার মুসলমানত্ব ঘোষণা করিতেছিল। এখানে বলা দরকার যে দরিরামপুর স্কুলে পড়িবার কালে ১৯১১ সালে ইতালির ত্রিপলি আক্রমণের প্রতিবাদে আমি তুর্কি টুপিটা পোড়াইয়া ফেলিয়াছিলাম। তুর্কি টুপির বদলে একটা ইরানি টুপি কিনিয়াছিলাম। কিন্তু তুর্কি টুপির প্রতি আমার মায়া কাটে নাই। শুধু সকলের সঙ্গে হুজুগে মাতিয়াই অত আদরের টুপি পোড়াইয়াছিলাম। তারপর অল্প দিনেই তুর্কি টুপির প্রতি আমার টান আরো বাড়িয়া যায়। কারণ ইরানি টুপির আর যত গুণই থাকুক না কেন ওটা শক্ত। ওটা ধুইয়া পরিষ্কার করা যায় না। দরকারমত পকেটে ভরাও যায় না। পক্ষান্তরে তুর্কি টুপি নরম। ধুলা বা অন্য ময়লা লাগিলে রিঠা দিয়া ঘোয়া যায়। তারপর কালেবে করিয়া সুন্দর সাইযে বহাল করা যায়। বৃষ্টি-বাদল ইত্যাদি ঠেকা-বাধায় ভাঁজ করিয়া শার্ট-কোটের পকেটে ভরিয়া টুপি বাঁচানো যায়। এসব কারণে ইতালি বয়কটের হিড়িকটা একটু কমামাত্র পরের বছরই অপেক্ষাকৃত সুন্দর একটা তুর্কি টুপি কিনিয়া ইরানি টুপিটাকে বাক্সবন্দী করিয়াছিলাম। এই টুপি পরিয়াই মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে ক্লাস করিতে শুরু করিয়াছিলাম। টুপি-পরা মুসলমান, তা-ও আবার নূতন ছাত্র। কাজেই আমাকে ক্লাসের ফার্স্ট-সেকেন্ড বয়ের বেঞ্চিতে বসিতে দেখিয়া হিন্দু ছাত্ররা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিবে, এতে আশ্চর্যের কিছু ছিল না। পরে দু-একজন মুসলমান ছাত্র আমাকে বলিয়াছিল, আমাকে ঐখানে বসিতে দেখিয়া তাদের বুক কাঁপিতেছিল। তবে আমাকে রক্ষা করিবার জন্য তারা নাকি প্রস্তুতও ছিল। সে প্রস্তুতিটা ছিল এই : যদি হিন্দু ছেলেরা শিক্ষকদের কাছে নালিশ করিত এবং তাতে যদি শিক্ষকেরা আমাকে শাস্তি দিতে চাহিতেন, তবে তারা বলিত : পাড়াগা হইতে নূতন আসিয়াছি। শহরের হাল-চাল সম্বন্ধে আমার জ্ঞান নাই। কাজেই প্রথমবারের জন্য আমাকে মাফ করিয়া দেওয়া হউক।

কিন্তু তেমন কোনও দুর্ঘটনা ঘটিল না। যদিও আমার বেঞ্চের দু-একজন ভাল ছাত্র আমাকে ঐ বেঞ্চি ত্যাগ করিতে বলিয়াছিল এবং যদিও আমি তাদের কথায় কান না দিয়া নিজের জায়গায় বসিয়া রহিলাম তথাপি কেউ শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদের কাছে নালিশ করিল না। শুধু পাশের দুজন ছাত্র আমার গা ঘেঁষিয়া না বসিয়া একটু তফাতে বসিল এবং মাঝে মাঝে আড়চক্ষে আমার দিকে কড়া নজর ফেলিতে লাগিল।

.

. প্রথম বিরোধ

ভালয়-ভালয় দিনটা কাটিয়াই প্রায় গিয়াছিল। বিকালের দিকে একজন শিক্ষক আমাদের ক্লাসে আসিলেন। আমাকে তার অতি নিকটে প্রথম বেঞ্চিতে দেখিয়া তিনি মুখ ভেংগাইয়া বলিলেন : মিয়া সাহেবের কোন চিড়িয়াখানা থনে আসা হৈছে? এক লাফেই যে একেবারে গাছের আগায় বসা হৈছে?

আমি সারের কথার কোনও মানে বুঝিলাম না। কিন্তু সারা ক্লাস হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। ছাত্রদের সে হাসিতে সারও যোগ দিলেন না, আমিও যোগ দিলাম না। ক্লাসে এমন উচ্চ হাসির রোল তোলার জন্য ছাত্রদেরে তিনি কোনও ধমকও দিলেন না। তিনি একদৃষ্টে আমার দিকে চাহিয়াই রহিলেন। যেন তিনি প্রশ্নটার জবাবের অপেক্ষায় আছেন। আমি ধীরে ধীরে দাঁড়াইলাম। সারের কথার অর্থ না বুঝিলেও এইটুকু আমি বুঝিয়াছিলাম যে তিনি আমাকে বিদ্রূপ করিলেন; এটাও বুঝিলাম যে, এই স্থানে বসার জন্যই তিনি আমাকে বিদ্রূপ করিলেন। কাজেই মনে মনে আমার খুব রাগ হইয়াছিল। আমি দাঁড়াইয়া বলিলাম : এ জায়গায় বসা কি আমার অন্যায় হৈছে সার? কোনও নিষেধ আছে?

শিক্ষক মহাশয় যেন বিস্মিত হইলেন। সারা ক্লাস নিস্তব্ধ হইল। শিক্ষক মশায় একটু তোতলা ছিলেন। সেটা এইবার বুঝিলাম। তিনি দুই-একবার ঠোঁট বাজাইয়া বলিলেন : আমার কথা তুমি বুঝতে পারো নাই মিয়া সাহেব। এই বেঞ্চিতে বসায় নিষেধ নাই সত্য কিন্তু ওখানে বসতে হৈলে ভাল ছাত্র হওয়া দরকার।

আমি দাঁড়াইয়া ছিলাম। বলিলাম : আমি ছাত্র ভাল কি মন্দ, দু-চার দিন না পড়াইয়া কীভাবে বুঝলেন সার?

মাস্টার মশায় বোধ হয় আরো বেশি রাগিয়া গেলেন। তিনি বলিলেন : ‘অত কথা কইও না মিয়া সাহেব। ভাল ছাত্র হইলে একেবারে ডাইনে গিয়ে বসো। ফলেন পরিচিয়তে। এখন বইসা পড়ো ত মিয়া সাহেব।’ কিন্তু আমি বসিলাম না। বুঝিলাম মুসলমান ছাত্রকে মিয়া সাব’ বলা তাঁর রোগ। কী যেন ঘাড়ে জিদ চাপিয়া গিয়াছিল। আমি যে ক্লাসে প্রথম আসিয়াছি, সে কথা ভুলিয়া গেলাম। বলিলাম : কথায় কথায় আমারে মিয়া সাব বলেন কেন সার? আমরা মুরুব্বিদেরেই মিয়া সাব বলি। আমি ত আপনার মুরুব্বি নই; আপনার ছাত্র।

স্পষ্টই দেখিলাম, মাস্টার মশাই একেবারে সিদ্ধ করা শাকের মত মিলাইয়া গেলেন। আর দ্বিতীয় কথা না বলিয়া গজাইতে লাগিলেন। বাংলায়। তিনি দ্বিতীয় শিক্ষক। খুব ভাল পড়াইলেন। শিক্ষক হিসেবে উনাকে আমার খুব পছন্দ হইল। পরে জানিতে পারিলাম তাঁর নাম শ্রীযুক্ত অতুল চন্দ্র চক্রবর্তী। মুসলমান বন্ধুরা বলিল : অতুলবাবু মুসলিম-বিদ্বেষের জন্য খুব সুপরিচিত। আমি তার মুখের মত জবাব দিয়াছি বলিয়া অনেকে আমার তারিফও করিল। হিন্দু বন্ধুরা ঐ ধরনের কিছু বলিল না। ঐ ঘটনা সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও কোনও কথা আলোচনা করিল না। কিন্তু কাজে-কর্মে ব্যবহারে তারা প্রমাণ করিল, তারা আমাকে যথেষ্ট সমীহ করে। আস্তে আস্তে ক্লাসের ভাল ছাত্রদের সাথে ঘনিষ্ঠ হইলাম। প্রথম ত্রৈমাসিক পরীক্ষাতেই দ্বিতীয় স্থান দখল করিলাম। ওদের অনেকের সাথে এমন বন্ধুত্ব হইল যা মুসলমান ছেলেদের সঙ্গেও ছিল না। শুধু অতুলবাবু নন, কোনও কোনও হিন্দু সহপাঠীও মুসলমান ছাত্রদেরে ‘মিয়া সাব’ বলিয়া সম্বোধন করিত। আমি অল্প দিনেই বুঝিলাম অতুলবাবু ভাল শিক্ষক। অতুলবাবুও কয়েক দিনে বুঝিলেন, আমি ছাত্র মন্দ নই। কাজেই মোটামুটি ভাল ব্যবহারই তিনি। করিতেছিলেন। কিন্তু তিনি হঠাৎ একদিন আমার উপর চটিয়া গেলেন। পড়াশোনায় গাফলতির কোনও ব্যাপার ছিল না। আমার পোশাক দেখিয়াই তিনি চটিয়া গিয়াছিলেন। এটা তার কথায় বুঝা গেল। তিনি ক্লাসে ঢুকিয়া চেয়ারে বসিয়াই ছাত্রদেরে এক নজর দেখিয়া লইলেন। আমার উপর চক্ষু পড়িতেই তিনি মুখ বেঁকাইয়া বলিলেন : কী মিয়া সাব, আজ যে বড় চিকনাই জামাই বাবুটি সাইজা আসছ?

সত্যই আমি সেদিন একটা ডবল-কাফ ডবল-ব্রেস্টের সদ্য-ইস্ত্রি-করা শার্ট পরিয়া স্কুলে আসিয়াছিলাম। মেসের বন্ধু-বান্ধবের চাপেই আমি এই ডবল ব্রেস্টওয়ালা ইস্ত্রি-করা শার্টটা কিনিয়াছিলাম। সদ্য-ইস্ত্রি-করা লাল-সাদা ডুরির এই শার্টটা পরিয়া আমার নিজেরই কেমন লাগিতে ছিল। ক্লাসের বন্ধুরা কেউ কিছু বলিলে হয়তো আমি এর একটা কৈফিয়ত দিতাম। কিন্তু অতুলবাবুর উপর আমার আগেরই রাগ ছিল। বিশেষত তিনি বহুদিন পরে আজই আবার ‘মিয়া সাহেব’ বলিলেন। তার উপর আবার চিকনাই জামাই বাবু বলিয়া গাল দিলেন। আমার মন ও মাথায় যেন একটা ঝাঁকি লাগিল। কিন্তু মুহূর্তমাত্র। তারপর আমি দাঁড়াইয়া বলিলাম : কী কইলেন বাবুজি?

এমন কাজ কেউ করে নাই। এমন কথা কেউ আর বলে নাই। অতুলবাবু গর্জিয়া উঠিলেন : কী, তুমি আমারে বাবুজি কইলা?

আমি : আপনিও ত স্যার আমারে মিয়া সাব কইলেন।

অতুলবাবু ক্লাস থনে বাহির হইয়া গেলেন। হেডমাস্টার শ্রীযুক্ত চিন্তাহরণ মজুমদারের কাছে নালিশ হইল। আমার ডাক পড়িল। আমি গেলাম। সত্য কথা সব খুলিয়া বলিলাম। তার সুবিচারে আমি খালাস পাইলাম। অতুলবাবু তিরস্কৃত হইলেন। এই ঘটনার পর অতুলবাবু আমাকে আর কোনও দিন মিয়া সাব বলিয়া সম্বোধন করেন নাই। হিন্দু সহপাঠীদের মধ্য হইতে আস্তে আস্তে ঐ অভ্যাস দূর হইয়া গেল।

.

. ঢিলের জবাবে ঢিল

কিন্তু অতুলবাবুর প্রতি আমার রাগ কমিল না। অতুলবাবুও যেন আমাকে কোনও দিন ভাল চোখে দেখিতে পারেন নাই। সে জন্য দোষী ছিলাম বোধ। হয় আমিই। কারণ আমার একটা স্বভাবই ছিল এই যে আমাকে যিনি আদর করিতেন তাঁর প্রতি আমি একেবারে গলিয়া যাইতাম। একটা মিষ্টি কথা বলিলে আমি একেবারে নুইয়া পড়িতাম। কিন্তু আমাকে অবজ্ঞা করিলে, তুই তুংকার করিলে আমি আগুন হইয়া যাইতাম। এবং হুঁশ-জ্ঞান হারাইয়া। বেআদবি করিয়া ফেলিতাম। গ্রাম ছাড়িয়া শহরে আসিবার কিছুদিন আগে। আমি আমাদের জমিদারের ধানীখোলা কাঁচারির নায়েব শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয়ের সাথে তুই’-এর জবাবে তুই’ বলিয়া এমনি এক বেআদবি করিয়াছিলাম। তাতে সারা গায়ে ও কাঁচারিতে হৈচৈ পড়িয়া গিয়াছিল। আমার ও আমার মুরুব্বিদের বিপদের আশঙ্কা হইয়াছিল। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর নামক বইয়ে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়াছি। তাই এখানে তার পুনরুল্লেখ করিলাম না। শুধু এটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, এই স্বভাব আমার স্কুল-কলেজজীবনেও দূর হয় নাই। বোধ হয়, আজও এই বয়সেও না।

অতুলবাবুর গম্ভীর মুখ ও কড়া চাহনিও আমাকে নরম করিতে পারিল না। বরঞ্চ অনেক মুসলমান সহপাঠী গোপনে গোপনে আমাকে খুব সাহস দিতে লাগিল। তারা বলিল যে অতুলবাবু আমাকে বানর বলিয়াছেন। তারা দেখাইয়াছিল যে একলাফে গাছের আগায় উঠার কথাটার মধ্যেই বানরের ইঙ্গিত রহিয়াছে। কাজেই অতুলবাবুর প্রতি আমার মন নরম হইল না। তিনি ক্লাসে পড়াইবার সময় আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করিতেন না। কারণ তাঁর সাবজেক্ট বাংলায় আমি ভাল ছাত্র ছিলাম। কিন্তু ক্লাসের বাহিরে রাস্তাঘাটে তিনি আমার দিকে চাইতেন না। আমিও তাকে আদাব দিতাম না। অথচ আমি অন্য সব টিচারকেই, এমনকি অন্য স্কুলের টিচারগণকেও পথে-ঘাটে আদাব দিতাম। বন্ধুবান্ধবের প্রশ্নের জবাবে সগর্বে বলিতাম : ‘আমার টিচার না হোক, টিচার ত। অতুলবাবুর বেলায় বলিতাম : আমার সাথে যে যেমন ব্যবহার করিবে, সেই রকম ব্যবহার পাইবে।

এই নীতির চরম করিয়াছিলাম একদিন পোস্টকার্ড কিনিতে গিয়া। এটাও ময়মনসিংহ জীবনের প্রথম বছরের ঘটনা। একদিন ছোট বাজার পোস্ট অফিসে কার্ড কিনিতে গিয়াছি। ছোট পোস্ট অফিস। পপাস্টমাস্টার বাবু একটি জানালার ধারে বসিয়া অফিসের কাজও করেন, কার্ড-স্ট্যাম্পও বেচেন। হেড পোস্ট অফিসের মত এখানে জানালায় কোনও ফোকাম নাই। গরাদের ফাঁক দিয়াই বিকি-কিনি হইয়া থাকে। গরাদের ফাঁকগুলিও এমন চিপা যে তার ভিতর দিয়া অতি কষ্টে হাত আনা-নেওয়া করিতে হয়। অন্যান্য খরিদ্দারের মতই আমিও হাতের মুঠায় দরকার-মত পয়সা লইয়া অতি কষ্টে হাত ঢুকাইয়া মাস্টার বাবুর কাছাকাছি নিয়া মুঠা খুলিলাম এবং নিজের দরকার বলিলাম। মাস্টার বাবু পয়সা নিয়া গনিলেন এবং হিসাব ঠিক হওয়ায় হাত-বাকসের একটি খোপে পয়সা ফেলিয়া আরেকটি খোপ হইতে কার্ড বাহির করিয়া আমার প্রসারিত হাতে কার্ডগুলি দিতে উদ্যত হইলেন। সেখানে কোনও হাত না পাইয়া তিনি মাথা তুলিয়া জানালার দিকে চাহিলেন। ইতিমধ্যে ব্যাপার ঘটিয়াছে এই : মাস্টার বাবু আমার প্রসারিত ডান হাতের তলা হইতে যখন পয়সা নেন তখন আমি দেখিতে পাই যে বা হাতেই পয়সা নিলেন। আমিও অমনি আমার চিকরা ডান হাতটা ফেরত আনিয়া বা হাত ভিতরে ঢুকাইলাম। হাত ঢোকানো ও বাহির করা উভয়টাই একটু শ্রমসাধ্য, সুতরাং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। পোস্ট কার্ড তাতে লইয়া মাস্টার বাবু যখন জানালায় নজর করিলেন, তখন আমার ডান হাতটা সবেমাত্র বাহির হওয়ার কাজ শেষ করিতেছে এবং বাঁ হাতটা ঢুকিবার জন্য প্রস্তুত হইতেছে। পোস্টমাস্টার বাবু আমার হাত বদলাইবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি সরলভাবে সত্য বলিলাম। তিনি বাম হাতেই পোস্টকার্ড ধরিয়া ছিলেন। তৎক্ষণাৎ হাত বদলাইলেন। ফলে আমাকে আবার ঘুরাইয়া বাম হাতের বদলে ডান হাত ঢুকাইতে হইল। পোস্টমাস্টার বাবু প্রৌঢ় লোক। তিমি মুচকি হাসিলেন।

.

. প্রথম মিলাদ শরিফ

মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে আমার ছাত্রজীবন মোটামুটি ভালই কাটিতে লাগিল। অধিকাংশ শিক্ষকের প্রিয় পাত্র হইয়া উঠিলাম। বন্ধুর সংখ্যাও বাড়িল। এইভাবে আট-নয় মাস গেল।

এই সময় হিন্দু ছেলেরা ধুমধাম করিয়া সরস্বতী পূজা করিল। আমার সহপাঠীদের একজনের নাম ছিল আবদুর রহমান। তার বাড়ি ছিল নেত্রকোনা মহকুমার সেকান্দর নগর গ্রামে। আচার-ব্যবহার আদব-কায়দা ও চেহারা ছবিতে দেখিতে তাকে আমার খুব ভাল লাগে। আমি তার প্রতি মুগ্ধ হই। উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। এই আবদুর রহমান আমাকে একদিন বলে, আমাদের মিলাদ শরিফ করিতে হইবে। আমি মোহাম্মদী জমাতের লোক। মিলাদ পড়া আমাদের মধ্যে নিষেধ। কিন্তু বন্ধুকে সে কথা না বলিয়া হিন্দুদের স্কুলে মিলাদ পড়িবার অনুমতি দিবে না, এই কথা বলিলাম। জবাবে আবদুর রহমান বলিল : স্কুলের সেক্রেটারি হেডমাস্টার হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও এখানে আমরা তিন শর বেশি মুসলমান ছাত্র আছি। ইহাদের ধর্মকাজে অনুমতি না দিয়া পারিবেন না। হিন্দুদের সরস্বতী পূজার প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে মুসলমান ছাত্রদের একটা কিছু ধর্মকাজ করা নিতান্ত উচিৎ। আবদুর রহমানের এই সব যুক্তিতে আমি আকৃষ্ট হইলাম। দুই বন্ধুতে মিলিয়া আমরা স্কুলের তৎকালীন মুসলমান ছাত্রদের নেতা দশম শ্রেণীর শরফুদ্দিন আহমদ (পরবর্তীকালে খান বাহাদুর জিলা বোর্ডের চেয়ারম্যান, পাবলিক প্রসিকিউটর ও আইন পরিষদের মেম্বর) সাহেবের কাছে পরামর্শের জন্য গেলাম। তিনি আমাদের নিরাশ করিলেন। বলিলেন, স্কুলে মিলাদ পড়াইবার চেষ্টা তারা বহুদিন ধরিয়া বহুবার করিয়াছেন। লিখিত দরখাস্ত দিয়াছেন। হেডমাস্টার বাবু চিন্তাহরণ মজুমদার ও সেক্রেটারি বাবু অঘোর বন্ধু গুহের সহিত দেখা করিয়াছেন। কোনও ফল হয় নাই। স্কুলে মুসলমানদের ধর্মকাজ করিলে হিন্দু ছাত্রদের ধর্ম-প্রাণে আঘাত লাগিবে, এই যুক্তিতে কর্তৃপক্ষ তাদের সমস্ত অনুরোধ-উপরোধই অগ্রাহ্য করিয়াছেন।

শরফুদ্দিন সাহেবের নিকট হইতে নিরাশ হইয়া ফিরিলাম বটে, কিন্তু আমরা নিরুৎসাহ হইলাম না। ক্লাসের ও স্কুলের মুসলমান ছাত্রদের সাথে সলাপরামর্শ চালাইয়া গেলাম। হঠাৎ আমার মাথায় একটা ফন্দি আসিল। প্রথমে আবদুর রহমান ও পরে অন্যদের কাছে ফন্দিটা ভাঙ্গিয়া বলিলাম। বেশ কিছু সমর্থক জুটিবার পর আমরা স্কুল ছুটির পর একদিন এক সভা করিলাম। তাতে প্রস্তাব গ্রহণ করিলাম যে মূর্তিপূজা দেখা মুসলমানদের জন্য শেরিকি গোনা। অতএব স্কুলে সরস্বতী পূজা বন্ধ করিতে হইবে। অন্যথায় মুসলমান ছাত্ররা স্কুলে আগামী বকরিদে গরু কোরবানি করিবে। স্কুলে হৈচৈ পড়িয়া গেল। প্রথমে আমাদের জনপ্রিয় ইংরাজি টিচার বাবু যতীন্দ্র চন্দ্র সরকারের সাথে এবং পরে তার মধ্যস্থতায় হেডমাস্টার বাবু চিন্তাহরণ মজুমদারের সাথে। আমাদের বেশ কয়দিন দেন-দরবার হইল। অবশেষে স্কুল বিল্ডিংয়ে মিলাদ শরিফ অনুষ্ঠানের অনুমতির বদলে আমরা সরস্বতী পূজা বিরোধী দাবি প্রত্যাহার করিলাম।

মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে বিপুল আনন্দ-উল্লাস ফাটিয়া পড়িল। আমাদের নিতান্ত ন্যায়সংগত ধর্মীয় দাবি গ্রহণ করিবার জন্য সভা করিয়া স্কুল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ দিলাম। আমারও নাম ফাটিয়া গেল। আমরা পরম উৎসাহে চাদা আদায়ে লাগিয়া গেলাম। হিন্দু-চালিত স্কুল ত দূরের কথা এমন যে সরকারি জিলা স্কুল সেখানেও স্কুল প্রাঙ্গণে মিলাদ হয় নাই। জিলা স্কুলের মিলাদ আঞ্জুমান মুসলিম হোস্টেলে হইত। অথচ আমরা হিন্দু-প্রধান মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে মিলাদ শরিফ করিতেছি। এটা এ শহরে নূতন ঘটনা। কাজেই মুসলমান ছাত্ররা পরম উৎসাহে চাদা দিল। আমরা ক্লাস সেভেনের ছাত্ররা এ কাজে উদ্যোগী হইয়াছিলাম বটে কিন্তু উপরের ক্লাসের ছাত্ররাও আমাদের কাজে পূর্ণ সহায়তা করিলেন।

মিলাদ করিবার চেষ্টা আশাতিরিক্তরূপে সফল হইতেছে দেখিয়া আমার মনে এটা প্রেরণা জাগিল। মিলাদের বিরুদ্ধে শরিয়ত-ঘটিত আপত্তি ছাড়াও আমার একটা বিশেষ আপত্তি ছিল। উর্দু-ফারসিতে ওটা পড়া হয় বলিয়া হাযেরানে-মজলিসের অধিকাংশ লোক তা বুঝেন না। সে জন্য আমি হানাফি বন্ধুদের সাথে তর্ক করিতে গিয়া বলিতাম যদি মিলাদ পড়িতেই হয় তবে বাংলাতেই তা পড়া উচিৎ; তাতে পয়গম্বর সাহেবের পুণ্য জীবন কথা হইতে জনসাধারণ শিক্ষা লাভ করিতে পারিবে। বন্ধুরা, এমনকি অনেক সময় হানাফি দুই-একজন আলেমও বলিতেন, ও-কথা বলিয়া আমি প্রকারান্তরে বাংলায় নামাজ পড়ার কথা বলিতেছি। নামাজের সাথে মিলাদের তুলনা চলে না, এটাই আমার দৃঢ় মত। কাজেই এই মিলাদ মহফিলে এ বিষয়ে একটা প্রবন্ধ পড়িব বলিয়া মনে মনে ঠিক করিলাম। অনেক রাত জাগিয়া একটি প্রবন্ধ রচনা করিলাম।

এর আগেও আমি অনেকবার স্কুলের সভায় রচনা পাঠ করিয়াছি। কিন্তু সে সবই ছিল পাড়াগাঁয়ে। এবারই জীবনের প্রথমে শহরে উচ্চশিক্ষিত বড় বড় লোকের সামনে রচনা পড়িতে হইবে। আমি শহরে মিলাদের সভা এর আগে আর দেখি নাই। কিন্তু মসজিদের জমাত দেখিয়াছি। হিন্দু ও ব্রাহ্মদের ধর্মসভা দেখিয়াছি। কাজেই কল্পনায় টিচার-প্রফেসার উকিল-মোখতার জজ ম্যাজিস্ট্রেট আলেম-ফাজেলের বিরাট সমাবেশ দেখিলাম এবং তাঁদেরে সামনে রাখিয়াই প্রবন্ধ রচনা করিলাম। খাঁটিলামও সেই পরিমাণে। পড়িয়া দেখিলাম। নিজের কাছে ভাল লাগিল। মনে জোর পাইলাম।

এত বড় সভায় কি পোশাকে দাঁড়াইব? অনেক চিন্তা করিলাম। বন্ধুবান্ধবে উপদেশ চাহিলাম। এক-এক জন এক-এক পরামর্শ দিল। শেষ পর্যন্ত নিজের বুদ্ধিই সম্বল করিলাম। কিছুদিন আগে ডার্কগ্রিন রঙের একটা টার্কিশ কোট ও কালো জমিনের উপর গ্রিন ডুরি-দেওয়া আলপাকার একটা আচকান তৈয়ার করিয়াছিলাম। আমি ঘোর কালো রঙের লোক। এই কালো চেহারায় ঔ দুইটা রঙের একটাও মানায় না। তবু ঐ রঙের দুইটা দামি কাপড় কেন বানাইয়াছিলাম, আজও আমি তা বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। উকিলদের কালো পোশাক পরিতে হয় বলিয়া আমি আজও কালো গাউনের সাথে কালো শেরওয়ানি পরিয়া থাকি। তাতে মানাইল কি না এ বয়সে সে কথা বড় একটা ভাবি না। কিন্তু ষোল বছরের বালকের মনে নিশ্চয়ই চেহারার প্রতি এমন ঔদাসীন্য ছিল না। তবু কালো রঙের প্রতি অমন টান কোন খেয়ালে আমার হইয়াছিল, আজও তা রহস্যময় থাকিয়া গিয়াছে।

অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া আচকানটাই ঠিক করিলাম। তার উপর খয়েরি লাল তুর্কি টুপিটা ত আছেই। এই বেশে মিলাদের মজলিসে গেলাম। উদ্যোক্তাদের একজন বলিয়া আমি বেশ আগেই গেলাম। মেহমানদের অভ্যর্থনায় প্রধান অংশগ্রহণ করিলাম। কাজেই কারা-কারা সভায় আসিলেন, স্বচক্ষে দেখিলাম। অন্যান্য স্কুলের টিচার, কলেজের প্রফেসার, উকিল, মোখতার ও জজ-ম্যাজিস্ট্রেটরা আসিলেন। আমাদের স্কুলের সেক্রেটারি উকিল শ্ৰীযুক্ত অঘোর বন্ধু গুহও আসিলেন। এঁদের শুভাগমনে প্রতিবার আমার বুক নূতন করিয়া দুরুদুরু করিয়া কাঁপিয়া উঠিল। না জানি রচনা পাঠের সময় কোনো শরম পাইয়া বসি। শেষ পর্যন্ত হল ভর্তি হইয়া গেল। চার-পাঁচটা ক্লাসের কাঠের পার্টিশন সরাইয়া বিশাল লম্বা হল করা হইয়াছিল। সবটুকু জায়গা ভরিয়া গেল। ময়মনসিংহ শহরের জীবনের প্রথমে হিন্দুর স্কুলে মিলাদ হইতেছে বলিয়া শহরের গণ্যমান্য মুসলমান কেউই বাদ যান নাই।

.

. বাংলায় মিলাদ

যথারীতি মিলাদ পড়া হইলে সভার কাজ শুরু হইল। অমুসলমান অতিথিদের সকলে এবং মুসলমানদেরও অনেকে এতক্ষণ বারান্দা ও আঙিনায় গল্প। গোজারি করিতেছিলেন। এইবার সকলে সভায় জমিয়া বসিলেন। প্রথমে আমাদের জনপ্রিয় হেডমাস্টার শ্রীযুক্ত চিন্তাহরণ মজুমদার মহাশয় সমাগত অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাইলেন এবং তাঁর প্রিয় ছাত্ররা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় তিনি তাদের উদ্যমের প্রশংসা করিলেন। উপসংহারে ছাত্রদের এই প্রথম প্রয়াসের ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করিবার জন্য সকলকে অনুরোধ করিলেন। ছাত্রদের তরফ হইতে আমি দুই-চার কথা বলিব বলিয়া হেডমাস্টার বাবু আসন গ্রহণ করিলেন।

আমি দাঁড়াইলাম। আমার চেহারাও ভাল নয়। পোশাকও নিশ্চয়ই সুরুচির পরিচায়ক ছিল না। কাজেই সমবেত দ্রমণ্ডলী বোধ হয় নিরাশ হইলেন। আমি তাদের চোখে-মুখে কোনও উৎসাহ-সূচক হাসি দেখিলাম না। আমি সংক্ষেপে সমবেত অতিথিগণকে এবং বিশেষ করিয়া মুসলমান ছাত্রদের আবদার রাখার জন্য স্কুলের সেক্রেটারি ও হেডমাস্টার বাবুকে ধন্যবাদ দিয়াই পকেট হইতে প্রবন্ধটি বাহির করিলাম। এতক্ষণে শ্রোতাগণের মধ্যে উৎসাহ বা কৌতূহল একটা কিছু দেখিতে পাইলাম। দুই-তিন মিনিট পড়ার পরই সভা সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হইল। দশ-বার মিনিটেই ‘মারহাবা’ ও ‘হিয়ার হিয়ার’ শুনিতে লাগিলাম। ওজস্বিনী ভাষা ও পড়ার ভঙ্গির জন্য এর আগেও আমি শিক্ষকদের প্রশংসা পাইয়াছিলাম। সুতরাং ঐ দুইটা ভালই হইয়াছিল। তার উপর আমি বাগদাদ-দামেস্ক হইতে দিল্লি-আগ্রা ও গ্রানাডা-কর্ডোভা যুগের মুসলমান গৌরবের কাহিনী বর্ণনা করিয়া তার তুলনায় বর্তমানের দারিদ্র্য দুরবস্থার কথাই ঐ প্রবন্ধে লিখিয়াছিলাম। ওসব কথাই অবশ্য বই-পুস্তক ও মাসিক-সাপ্তাহিক কাগজের প্রবন্ধ হইতে ধার-করা। কিন্তু ভাষা ও পঠন-ভঙ্গি ছিল আমার নিজস্ব। তাতে সাধারণ লোক ত দূরের কথা, ঐ সব বই-পুস্তকের নিয়মিত পাঠকদের পক্ষেও সে নকল ধরা সহজ ছিল না। সুতরাং শ্ৰোতৃমণ্ডলী আমার লেখা ও পড়ায় যেমন আকৃষ্ট হইলেন আমি নিজেও তেমনি নিজের খেলা পড়ায় একদম মাতিয়া উঠিলাম। বর্তমান অধঃপতনের বর্ণনা করিতে গিয়া আমি এমন কথাও বলিলাম যে আমরা শুধু নিজেদের ধর্ম-সভ্যতাই ত্যাগ করি নাই, নিজেদের জাতীয় পোশাকও বর্জন করিয়াছি। জাতীয় পোশাক বর্জনের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়া কোট, প্যান্ট পরাকে কঠোর ব্যঙ্গ করিলাম। শ্বেতাঙ্গদের ঐ পোশাকে কালা আদমিদেরে যে কলিকাতার গড়ের মাঠের কালো পাথরের মূর্তির মত দেখায়, তেমন রসিকতাও করিলাম। উপস্থিত সভ্যমণ্ডলীর মধ্যে কয়েকজন কোট-প্যান্ট পরা অফিসার ও উকিল ছিলেন। এই রসিকতায় শ্রোতৃমণ্ডলীর মধ্যে হাসির হুল্লোড় পড়িল ও ‘হিয়ার হিয়ার’ ধ্বনি উঠিল; তাতে ঐ কয়জন ভদ্রলোক বেশ বিব্রত হইলেন। বলা দরকার ঐ রসিকতাটিও ছিল ধার করা। কারণ তখনও আমি কলিকাতা যাই নাই; গড়ের মাঠ ও তার পাথরের মূর্তিগুলিও দেখি নাই। কিন্তু সে খোঁজ রাখে কে?

এই ‘হিয়ার হিয়ার’ ও ‘মারহাবার’ মধ্যে আমি যখন আসল কথায় আসিলাম তখন হঠাৎ সমস্ত সভা গম্ভীর হইয়া উঠিল। এটা যে হইবে, তা আমি জানিতাম। সেই কারণেই বুদ্ধি করিয়া ঐ কথাটা আমি প্রবন্ধের সর্বশেষে লিখিয়াছিলাম। শ্ৰোতৃমণ্ডলীর গম্ভীর মুখের দিকে না চাহিয়া আমি প্রবন্ধ পড়িয়া যাইতে লাগিলাম। দুর্বোধ্য আরবি-ফারসি-উর্দুতে মিলাদ শরিফ পড়া উচিৎ নয়। কারণ তাতে মুসলমানদের কোনও লাভ হয় না। হযরতের জীবনী আলোচনার দ্বারা শিক্ষা লাভ করাই মৌলুদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ। বাংলা ভাষায় তা না করিয়া আমরা মৌলুদের এই মহৎ উদ্দেশ্যই ব্যর্থ করিয়া দিতেছি ইত্যাদি ইত্যাদি।

ষোল বছরের বালকের মুখ হইতে এমন জটিল বিষয়ে উপদেশ নিবার জন্য কেহ প্রস্তুত ছিলেন না। তা ছাড়া আমি হয়তো শিশুসুলভ অতি উৎসাহে আরবি-উর্দুতে মিলাদ পড়িবার প্রথার বিরুদ্ধে এমন সব কথা বলিয়া ফেলিয়াছিলাম, যার অর্থ শ্রোতারা বুঝিয়াছিলেন আমি আরবি-উর্দু ভাষা ও মিলাদ শরিফ পড়ার বিরুদ্ধেই কথা বলিতেছি। যা হোক সভায় আমার কথায় কেউ প্রতিবাদ করিলেন না। কিন্তু সভা শেষে দুইজন মুরুব্বি কেসেমের সুন্দর চেহারার লোক হলের বারান্দায় আমাকে বলিলেন : ওহে অ্যাডভোকেট অব বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ, ধর্মের বিষয়ে কথা বলিবার বয়স তোমার এখনও হয় নাই। আর কিছু না বলিয়া হাসিতে হাসিতে তাঁরা চলিয়া গেলেন। পরে জানিয়াছিলাম তিনি আমাকে এ কথাগুলি বলিয়াছিলেন, তিনি ছিলেন এ জিলার শ্রেষ্ঠ নেতা ও পাবলিক প্রসিকিউটর মৌলবী মোহাম্মদ ইসমাইল সাহেব ও তার সাথী বিখ্যাত উকিল মৌলবী আবদুল খালেক সাহেব। আমি তখন অ্যাডভোকেট শব্দটার মানে জানিতাম না। তবু ওঁরা যে আমাকে ভাল বলিলেন না, সেটা বুঝিলাম। মনটা খারাপ হইয়া গেল। রচনা পাঠ করিয়া এত প্রশংসা ও আনন্দ যে পাইয়াছিলাম, সে সবই মন হইতে ধুইয়া-মুছিয়া গেল। মেসের সুপারিনটেনডেন্ট স্কুলের হেড মৌলবী সাহেবও মুখ বেজার করিয়া রাখিলেন। সারা রাত দুর্ভাবনায় কাটাইলাম।

কিন্তু পরের দিন এর পুরস্কার পাইলাম। সেদিন জিলা স্কুলের মিলাদ। স্থান আঞ্জুমান মুসলিম হোস্টেল প্রাঙ্গণ। পরের স্কুলের অনুষ্ঠান বলিয়া একটু বিলম্বে মহফিলে পৌঁছিলাম। সভায় ঢুকিবার আগেই কয়েকজন বন্ধু হাসিতে হাসিতে আগাইয়া আসিয়া বলিল : আজ তোমারই দিন। তারপর বন্ধুরা সবিস্তারে যা বলিল তার সারমর্ম এই : মওলানা ফয়যুর রহমান বাংলায় মৌলুদ পড়িবার পক্ষে বক্তৃতা করিতেছেন। তার বক্তৃতার শুরুতেই তিনি বলিয়াছেন : গতকাল মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের মিলাদ মহফিলে যাইতে পারেন নাই বলিয়া তিনি দুঃখিত। তিনি জানিতে পারিয়াছেন, সে মহফিলে একটি ছাত্র বাংলায় মিলাদ পড়িবার পক্ষে রচনা পাঠ করিয়াছে। তাতে কেউ-কেউ নাকি অসন্তুষ্ট হইয়াছেন। কিন্তু মওলানা সাহেবের মত এই যে ঐ ছেলে সত্য কথাই বলিয়াছে। সকলেরই বাংলায় মৌলুদ পড়া উচিৎ। বাংলা ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় মৌলুদ পড়িলে মৌলুদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়া যায়। বন্ধুরা বলিলেন, আমিও নিজ চক্ষে দেখিলাম, মওলানা সাহেব তখনও বক্তৃতা করিতেছেন। মওলানা সাহেবের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বাড়িয়া গেল। আমি সভার এক কোণে বসিয়া পড়িলাম। তিনি প্রাঞ্জল অথচ ওজস্বিনী বাংলা ভাষায় পয়গম্বর সাহেবের জীবনের ঐতিহাসিক ঘটনাবলির শিক্ষা ও তাৎপর্য বুঝাইতেছেন। উর্দু ভাষায় সাধারণ মিলাদের কিতাবে পয়গম্বর সাহেবের পয়দায়েশ সম্বন্ধে যে সব অনৈসর্গিক আজাব কাহিনী লেখা হয়, মওলানা সাহেব তার দীর্ঘ বক্তৃতায় তার একটিও উল্লেখ করিলেন না। বরঞ্চ প্রকারান্তরে ওসবের নিন্দা করিলেন।

মওলানা ফয়যুর রহমান সাহেব আনন্দ মোহন কলেজের আরবি-ফারসির। প্রধান অধ্যাপক ছিলেন। কিন্তু সেটাই তার বড় পরিচয় নয়। তিনি সাধু সচ্চরিত্র স্পষ্টবাদী ও সুপণ্ডিত আলেম বলিয়া সুপরিচিত ছিলেন। হক পরস্তিতে তিনি খাতির-নাদার লোক ছিলেন। এমন লোকের সমর্থন পাইয়া আমার সম্মান বাড়িয়া গেল। আমি অতঃপর বুক ফুলাইয়া চলিতে লাগিলাম। অল্পদিনের মধ্যেই মওলানা সাহেবের সহিত পরিচিত হইয়া তাঁর দোওয়া নিয়াছিলাম। যদিও আনন্দ মোহন কলেজে, সুতরাং মওলানা সাহেবের খেদমতে, লেখাপড়া শিক্ষার সৌভাগ্য আমার হয় নাই, তবু মওলানা সাহেবকে শেষ পর্যন্ত উস্তাদের মতই ভক্তি করিতাম। তিনিও আমাকে নিজের ছাত্রের মতই স্নেহ করিতেন।

.

. ঢাকা দর্শন

এই সময় আমি অল্প দিন পর পর চাচাজীর সাথে দুইবার ঢাকা শহরে যাই। ঢাকা শহরকে তৎকালে আমি ও আমার মত অনেকেই কিসসা-কাহিনীর যাদুর শহর মনে করিতাম। পাড়াগাঁয়ে এই শহরকে বাউন্ন-বাজার-তিপান্ন গলির শহর’ বলা হইত। ঢাকার নবাবের বালাখানায় এবং শহরের রাস্তা ঘাট ও দোকান-পাটে ইসলামি জৌলুশ ফাটিয়া পড়িতেছে বলিয়া শুনিতাম। ঐ সব কথা শুনিয়া আলেফ-লায়লার বাগদাদ শহরই আমার চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিত। কাজেই চাচাজী এই শহরে যাইতেছেন শুনিয়া আমিও তাঁর সাথে যাইব জিদ ধরিলাম। একবার উপলক্ষ ছিল ঢাকা ‘মকফাইট’ দেখা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে বৃটিশ সরকারের সামরিক শক্তি প্রদর্শনই এই মকফাইটের উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু ঐ বয়সে আমি অতশত বুঝিতাম না। একটা লড়াই হইবে, ‘নকল লড়াই’ আবার কী? এটাই বুঝিতাম। লড়াইয়ের নাম শুনিয়াই আমার রোমাঞ্চ হইত। মোহররমের কাড়া নাকাড়ার বাদ্যে আমার পায়ের তলায় সুড়সুড়ি হইত। লাকড়ি খেলায় কুর্দিয়া পরিবার বাসনা অতি কষ্টে দমন করিতাম। সুতরাং মকফাইট’ দেখিতে যাইবই। কারো নিষেধ মানিব না। দাদাজী অনুমতি দিলেন। চাচাজীও বাধা দিলেন না।

দ্বিতীয় বারে আমার যাওয়ার কোনও যুক্তি ছিল না। কারণ সেটা ছিল কী একটা মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স। দেশের আলেম-ওলামা ও মাতব্বরদের দাওয়াত দেওয়া হইয়াছিল। আহসান মনজিল অর্থাৎ নবাববাড়ি হইতেই ওটা ডাকা হইয়াছিল। সমাগত ডেলিগেটদেরে আহসান। মনজিলে থাকা-খাওয়ার দাওয়াত করা হইয়াছিল। চাচাজীও দাওয়াত পাইয়াছিলেন। এবারও আমি তাঁর সঙ্গী হইলাম। আমার সঙ্গে আমার বড় ভাইও ঢাকায় যাওয়ার জিদ ধরিলেন। চাচাজী মুশকিলে পড়িলেন। ডেলিগেট ছাড়া আর কেউ আহসান মনজিলে থাকিতে পারিবেন না, আমাদের মত ছোট ছেলেদের ডেলিগেটও করা যাইবে না। কাজেই আমাদেরে লইয়া চাচাজীকে নিজের খরচে হোটেলে থাকিতে হইবে। তবু আমরা দুই ভাই চাচাজীর সঙ্গী হইলাম। খরচের ব্যাপার বলিয়া দাদাজীর অনুমতি লাগিল। বলা বাহুল্য, মকফাইট দেখার সময়েও আমরা দুই ভাই চাচাজীর সাথী হইয়াছিলাম। রমনা ময়দানে সৈন্যদের পায়তারা দেখিলাম। কামান-বন্দুকের আওয়াজ শুনিলাম। আসমানে ধোঁয়া উড়িতে দেখিলাম; আর, আর কী কী দেখিলাম সব মনে নাই। কিন্তু যাই দেখিয়া থাকি, তাতে লড়াই ছিল না। শহীদে-কারবালা, আমির হামযা ও জঙ্গনামা পড়িয়া লড়াই সম্পর্কে আমার যে ধারণা হইয়াছিল, তার কিছুই এখানে দেখিলাম না। নিরাশ হইয়াই বাড়ি ফিরিলাম।

এডুকেশন কনফারেন্সে আসিবার সময় ময়মনসিংহ হইতে আর যেসব ডেলিগেট একসঙ্গে আসিয়াছিলেন, তাঁদের মধ্যে যাকে চাচাজীর সঙ্গে খুব খাতির হইতে দেখিয়াছিলাম তিনি ছিলেন মওলানা খোন্দকার আহমদ আলী। আকালুবী। তার নাম বই-পুস্তকে ও খবরের কাগজে আগেই পড়িয়াছিলাম। এইবার নিজ চক্ষে তাঁকে সশরীরে দেখিয়া বড় আনন্দ পাইলাম। তিনি ছিলেন গৌরবর্ণের সুপুরুষ। গলার আওয়াজ বুলন্দ অথচ অতি মিষ্টি। আমি ট্রেনেই তার সঙ্গে খাতির জমাইবার বালকসুলভ চেষ্টা করিয়াছিলাম। তিনি আমাকে আদর করিয়াছিলেন। পরে ইনি আমাদের কৃষক-খাতক আন্দোলনের অন্যতম নেতা হন। আরো পরে তিনি আমার শ্বশুর হন।

ইহার অল্প কিছুদিন পরে আমার অতি প্রিয় দাদাজী ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে আমাদের সংসারে অভাব-অনটন দেখা দেয়। কারণ দাদাজীর ইন্তেকালের পরে-পরেই চাচাজী ও বাপজী এই সময় পৃথক হইয়া যান এবং সমস্ত সম্পত্তি আপসে বাটোয়ারা হইয়া যায়। চাচাজীর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। মাত্র দুই মেয়ে। আর আমরা ছিলাম চার ভাই, এক বোন। সব আত্মীয়স্বজন ও আলেম-ওলামা মেহমানরা বড় ভাই বাপজীরই মেহমান হইতেন। ফলে পরিবারের বেশির ভাগ খরচের দায়িত্ব বাপজীর ঘাড়েই পড়িয়াছিল। তা ছাড়া বাপজীর উপর ছিল আমাদের চার ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ। ফলে অল্প দিনেই বাপজীর সংসারে অভাব দেখা দিল। কিন্তু বাপজী আমাদের গায় সে অভাব-অনটনের আঁচড়ও লাগিতে দেন নাই। নির্বিবাদে মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের চার বছরের পড়া শেষ করিলাম। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলাম। এটা ছিল ১৯১৭ সাল। দুই-দুইবার প্রশ্নপত্র লিক আউট হওয়ায় আমাদের তিন-তিনবার পরীক্ষা দিতে হইল। পাঁচ টাকার একটি মোহসিন স্কলারশিপসহ আমি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করিলাম।

.

. নাম-নামা

ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করার সময় আমি অদ্ভুত ও নূতন একটা কাজ করিলাম। আমার নামের ঘরে লিখিলাম শুধু আহমদ। টিচারদের অনেকে এবং হেডমাস্টার বাবু স্বয়ং এই এক শব্দের নামে আপত্তি করিলেন। কিন্তু। আমার মত বদলাইতে পারেন নাই।

এই স্কুলের কাগজপত্রে এবং পূর্বেকার দুই স্কুলের কাগজপত্রেই আমার নাম আহমদ আলী ফরাযী। আমার পৈতৃক নামই আহমদ আলী। আমরা চার ভাই সকলেই ‘আলী। আমাদের নামে ‘আলী’ আসিল কোথা হইতে, তার জবাব দিয়াছিলেন দাদাজী। আগের কালে বাপ-মা মুরুব্বিরা আলেম ওলামাদের দ্বারা প্রভাবিত হইয়া ছেলেমেয়ের নাম রাখিতেন। মোজাহেদ আলেমদের মধ্যে এনায়েত আলী, বিলায়েত আলী, মাহমুদ আলী ও চেরাগ আলী এই চারটি নাম দাদাজীর খুব প্রিয় ছিল। ওদের নামের ‘আলী’ হইতেই তিনি আমাদের চার ভাইয়ের নামে ‘আলী’ আনিয়াছিলেন। দাদাজীরা তিন ভাই ছিলেন। সবাই উল্লা। বড় ভাই গাজী সাহেব ছিলেন আশেক উল্লা, মেজ আর উল্লা ও ছোট ভাই, আমার দাদা, আরমান উল্লা। আর উল্লা অবিবাহিত অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। বাপজীরা ছিলেন তিন ভাই। বড় ভাই আমার পিতা আবদুর রহিম, দ্বিতীয় জমিরুদ্দিন ও তৃতীয় ছমিরুদ্দিন। দাদাজীর ইচ্ছা ছিল নিজের ছেলেদের নাম তার পিতা আছরদ্দিন ফরাযীর নাম। অনুসারে উদ্দিন রাখিবেন। কিন্তু তার শ্বশুর মানে বাপজীর নানা আবদুল আখন্দ সাহেব প্রথম নাতির নাম নিজের নামের আবদুল দিয়া রাখিবার আবদার করিলেন। দাদিও তার বাবার সমর্থন করিলেন। কাজেই বাপজীর নাম আবদুর রহিম হইল। কিন্তু পরবর্তী দুই ছেলের নাম দাদাজীর ইচ্ছামত উদ্দিন’ দিয়াই রাখা হইল। দ্বিতীয় পুত্র জমিরুদ্দিন অবিবাহিত মারা যান।

নাম-কাম লইয়া মানুষের জীবন। আমার কামটা এলা যেমন-তেমন, মানটার কিন্তু একটা সংগ্রামী ইতিহাস আছে। সে সংগ্রামেও জয়-পরাজয়, উত্থান-পতন, সহজ ভাষায় বাড়তি-কমতি আছে। সে সংগ্রামটা ঘটিয়াছিল আমার শৈশবে। সেদিন হইতে এটাকে এক শিশুর জীবনের ‘জঙ্গনামা’ ‘শাহনামা’ও বলা যাইতে পারে। তাই এই উপ-অধ্যায়ের নামকরণ করিলাম : ‘নাম-নামা’। সংগ্রামটি এইরূপ :

আমাদের চার সহোদরের মধ্যে বড় ভাই মোহাম্মদ মকিম আলী, মেজ ভাই মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী, সেজ আমি আহমদ আলী ও ছোট ভাই মোহাম্মদ মোবারক আলী। চাচাজী আমাদের অপর তিনজনের সকলের নামের আগেই মোহাম্মদ লিখিতেন। শুধু আমার নামে আগে মোহাম্মদ লিখিতেন না। আমি এতে বেজার হইতাম। চাচাজী আমাকে তসল্লি দিতেন। তিনি বুঝাইতেন একই অর্থবাচক শব্দ বলিয়া আহমদের আগে মোহাম্মদ হয় না। চাচাজীর এ কথা আমি মানিতাম না। মনে মনে রাগ করিয়া আমি নিজেই পরে এই সমস্যার সমাধান করিয়াছিলাম। আমার আর তিন ভাই মোহাম্মদ লিখিতেন এবং আজও লেখেন। কিন্তু আমি শুধু আহমদ আলী লিখিতাম। ভাইদের মধ্যে আমি একাই উচ্চশিক্ষা পাইয়াছি। বড় ভাই ম্যাট্রিক পড়িয়া মাস্টারি করিতেন। মেজ ভাই হাফেজে কোরআন হইয়া মসজিদে-মকতবে পড়াইতেন। ছোট ভাই হোমিওপ্যাথি ডাক্তারি করিতেন। এই বই ছাপা হওয়ার সময় তারা কেউ আর বাঁচিয়া নাই।

নিজের নাম সম্পর্কে আমার মাথায় চিন্তা জাগে মাইনর স্কুলে। সেটা ১৯১০ কি ১৯১১ সাল। মি. স্টেপলটন ডিভিশনাল ইনসপেক্টর। তিনি আমাদের স্কুল পরিদর্শন করিতে আসেন। তিনি কোট-প্যান্ট-পরা ছয় ফুটের বেশি লম্বা সাদা সাহেব। তাকে দেখিয়া বিস্মিত হইলাম বটে কিন্তু খুশি হইলাম তার সাথে যে আলেমটি আসিলেন তাকে দেখিয়া। মাথায় পাগড়ি, মুখে দাড়ি, পরনে সাদা আচকান ও সাদা কলিদার পায়জামা। খৃষ্টান সাহেব অথচ সঙ্গে আলেম রাখেন। মনে মনে তিনি নিশ্চয়ই মুসলমান। সাহেবের উপরও খুশি হইলাম। কিন্তু সেকেন্ড পণ্ডিত খিদির উদ্দিন সাহেব আমাকে বলেন, ঐ লোকটা কোনও আলেম নয়, সে সাহেবের চাপরাশি। পণ্ডিত সাহেব ব্যাপারটা আমাকে বুঝাইবার জন্য চাপরাশির তকমা ও পেট্টি ও পাগড়ির মধ্যে একপ্রস্থ রঙিন কাপড় দেখাইয়া দিলেন।

এতে আমি স্টেপলটন সাহেবের উপর ব্যক্তিগতভাবে এবং ইংরাজ জাতির উপর সাধারণভাবে চটিয়া যাই। বেটা ইংরাজরা আমাদের বাদশাহি নিয়াও ছাড়ে নাই; আমাদের আরো অপমান করার মতলবেই আমাদের বাদশাহি পোশাক পাগড়ি-আচকান-পায়জামাকে ওরা চাপরাশির পোশাক বানাইয়াছে। ইহার প্রতিশোধ নিতেই হইবে। আমি তৎক্ষণাৎ ঠিক করিয়া ফেলিলাম, আমি বড় অফিসার হইয়া আচকান-পায়জামা-পাগড়ি পরিব এবং আমার চাপরাশিকে কোট-প্যান্ট পরাইব। চুপে-চুপে খোঁজখবর লইয়া জানিলাম, সরকারি কর্মচারী না হইলে চাপরাশি পাওয়া যায় না। সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আবার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটই সবের উপরের অফিসার। অতএব আমি ঠিক করিলাম আমি ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হইব। এটা আমি মানিয়া লইলাম যে ইংরাজের আমলে আমাকে খুব বড় জিলায় ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট করিবে না। কাজেই খুব ছোট জিলা লইয়াই আমাকে সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে। আমাদের ক্লাসের পাঠ্য ভূগোল পাঠে পড়িয়াছি, বঙ্গ দেশে বগুড়া জিলাই সবচেয়ে ছোট জিলা। অতএব আমি বগুড়ার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হইতে মনকে রাজি করিলাম। ক্লাসের একসারসাই বুকের শেষ পৃষ্ঠা (তখন পর্যন্ত আমার অভিজ্ঞতা এই যে স্কুলের লেখার কাজে খাতার শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত লাগে না) নিজের নাম দস্তখত করিয়া দেখিলাম ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটরূপে আমার নামটা মানায় কিনা। হেডমাস্টার বসন্ত বাবুর অনুকরণে খুব টানা ভাঙ্গা ইংরাজি হরফে লিখিলাম : আহমদ আলী ফরাযী, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, বগুড়া। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বানান ভুল না হয়, সে জন্য ডিকশনারি সামনে লইয়াই লিখিলাম। ইংরাজি অ্যাটলাস হইতে বগুড়া লিখার বানান জোগাড় করিয়াই বোগরা লিখিলাম। একবার লিখিয়া সন্তুষ্ট হইলাম না। স্কুলের সব মাস্টারদের হাতের লেখার অনুকরণে পৃথক পৃথক দস্তখত করিলাম। আশেপাশে কেউ নাই জানিয়া জোরে জোরে শব্দ কয়টা উচ্চারণ করিলাম।

ভাল শুনাইল না। নামটা কেমন ঢিলা-ঢিলা লাগিল। লেখাটাও দেখিতে সাহেব-সুবার দস্তখতের মত দেখাইল না। ভাবনায় পড়িলাম। শুধু নামটার জন্য ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটগিরি আটকাইয়া থাকিবে, এটা কিছুতেই সহ্য হইল না। কী করা যায়, ভাবিতে লাগিলাম। হঠাৎ মনে পড়িল অল্পদিন আগে খবরের কাগজে কী উপলক্ষে খান বাহাদুর মৌলবী আহম্মদ নামে একজন ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের নাম ছাপা হইয়াছিল সেটা কয়েক বার উচ্চারণ করিয়া বুঝিলাম নামটা জোরদার। বেশ ভারী ভারী। এই ভার ও জোরটা কোন শব্দটার জন্য? খান বাহাদুর, না আহমদ? যে শব্দের জন্যই হোক, ঐ ভদ্রলোক ছিলেন ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হইলে আমি নিশ্চয়ই খান বাহাদুর হইব। তাতে আমার নাম আরো জোরদার, আরো ভারী হইবে। উচ্চারণ করিয়া দেখিলাম। হাঁ ভারী ত বটেই জোরদারও বটে। সুতরাং আমার নাম নূতন করিয়া লিখিলাম : খান বাহাদুর মৌলবী আহমদ, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বোগরা। এইবার উচ্চারণে জোর পাইলাম। নামটার মধ্যে একটা সাহেবি ভাব যেন ফুটিয়া উঠিল। বুক টান করিয়া চারদিক তাকাইলাম। মনটা তৃপ্তিতে ভরিয়া উঠিল। কিন্তু নাম হইতে আলী ও ফরাযী একদম ছাঁটিয়া ফেলায় প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হইল, কিন্তু ক্রমে সে ভাব দূর হইল। যতই উচ্চারণ করিতে লাগিলাম ততই জোরদার, মধুর ও ভারী-ভারিক্কি লাগিতে লাগিল। অতএব স্থির হইয়া গেল, খান বাহাদুর মৌলবী আহমদ নামেই আমি বগুড়ার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হইব এবং আমার চাপরাশিকে কোট-প্যান্ট-হ্যাট পরাইয়া স্টেপলটন সাহেব ও সমস্ত ইংরাজ জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষা দিব।

১৯১৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফর্ম ফিলআপ করার দিন হইতে সেটা পাঁচ-ছয় বছর আগের কথা। ইতিমধ্যে আমার ইংরাজ-বিদ্বেষ আরো বাড়িয়াছে। সেই সঙ্গে ইংরাজের চাকরির প্রতিও ঘৃণা জন্মিয়াছে। সুতরাং ইংরাজের গোলামির তকমা খান বাহাদুর খেতাব লইবার প্রশ্নই উঠিতে পারে না। খান বাহাদুর ছাড়া শুধু আহমদ নামে সেই জোর-ভার থাকে কি না, সে সম্পর্কে আমার মনে সন্দেহ জাগিল। দ্বিধায় পড়িলাম। কিন্তু এই সময় আমাদের ফারসি টিচার হেডমৌলবী মওলানা মুসা সাহেব কয়েক মাসের ছুটি নেওয়ায় তাঁর ছোট ভাই অ্যাক্টিং নিযুক্ত হন। শুনিয়া চমকিয়া উঠিলাম, তার নাম মওলানা আহমদ। আহমদ নামের গরিমাটা আমার অন্তরে ছ্যাঁৎ করিয়া উঠিল। সে আগুন নিভাইতে না নিভাইতেই আমাদের ষান্মাসিক পরীক্ষা আসিল। এই পরীক্ষায় নূতন মওলানা সাহেব ফারসি পেপারে আমাকে মোট একশ নম্বরের মধ্যে একশ পাঁচ দিলেন। হেডমাস্টার বাবু মওলানা সাহেবকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি নিরুদ্বেগে জবাব দিলেন : ছেলে সব প্রশ্নের ঠিক জবাব দেওয়ায় পুরা একশ দিয়াছি। সব প্রশ্নের জবাব দিতে পারায় খুশি হইয়া আমি পাঁচ নম্বর তাঁকে বখশিশ দিয়াছি।

মওলানা সাহেব হেডমাস্টার বাবুর মস্তক জয় করিতে পারেন নাই। কিন্তু আমার হৃদয় জয় করিতে পারিলেন। আমি নিজের নাম শুধু আহমদ লিখিতে পুনরায় উদ্বুদ্ধ হইলাম। কিন্তু অসুবিধা হইল যথেষ্ট। ইতিমধ্যে আমি কিছুটা সাহিত্যিক হইয়া উঠিয়াছি। ঐ সঙ্গে আমার নাম স্কুলের বাহিরে দিঘে-পাশে বাড়িয়া আবুল মনসুর আহমদ আলী জামী হইয়া গিয়াছে। কারণটা এই : তকালীন বিখ্যাত বক্তা মৌলবী ইসমাইল হোসেন সিরাজী সাহেবের লেখা আদব-কায়দা শিক্ষা নামে একখানা বই আমার খুব পছন্দ হইয়াছিল। এই পুস্তকে তিনি নিজের ‘সিরাজী তাখালুসের অনুকরণে সকল কবি সাহিত্যিককে নামের শেষে একটা তাখালুস ও নামের আগে একটা কুনিয়াত বসাইবার জন্য উপদেশ দিয়াছেন। এই সময় মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মৌলবী আবুল কাসেম ফজলুল হক খুব নামকরা লোক ছিলেন। সিরাজী সাহেবের উপদেশে এবং এই সব মহাপুরুষের অনুকরণে আমি আবুল মনসুর ও শামসুদ্দিন আবুল কালাম কুনিয়াত গ্রহণ করা স্থির করিলাম। এমনি একদিন কবি ছাবেদ আলী নসিরাবাদী নামক মওলানা খোন্দকার আহমদ আলী আকালুবী টাঙ্গাইলবাসী এক শাগরিদ তাঁর ‘ললনা বান্ধব’ নামে কবিতার বই ছাপিতে ময়মনসিংহ শহরে আসেন এবং ঘটনাচক্রে আমাদের মেহমান হন। ইনি শামসুদ্দিনের চেহারা সুন্দর বলিয়া তাঁকে নূরী (আলোকোজ্জ্বল) ও আমাকে খুব রসিকতা করিতে দেখিয়া জামী (রসাবতের পিয়াশাল) তাখালুস দান করেন। এই কুনিয়াত ও তাখালুসের পাখা মেলিয়া আমার বন্ধুমহলে ও মাসিক কাগজে যাহির হইলাম। আমার কয়েকটা প্রবন্ধ আল-ইসলাম নামক মাসিক কাগজে এই আবুল মনসুর আহমদ জামী নামে ছাপা হইয়া গেল।

সুতরাং ম্যাট্রিক ফরম পূরণ করিবার সময় একদিকে শুধু আহমদ নামের প্রতি নাড়ির টান ও অপর দিকে কুনিয়াত ও তাখালুসে টান আমাকে বেশ কিছু দিন টানা-হেঁচড়া করিল। শেষ পর্যন্ত মনে মনে একটা আপস করিয়া ফেলিলাম। বিদ্যালয়ের খাতায় আমি শুধু আহমদ হইয়া গেলাম। সাহিত্যের খাতায় থাকিলাম আবুল মনসুর আহমদ আলী জামী। ব্যাঙ বড় হইলে লেজ আপনি খসিয়া পড়ে। আমারও ‘আলী জামী’র লেজও কিছুদিন পরে খসিয়া পড়িল।

 

অধ্যায় ছয় – উচ্চশিক্ষা–ঢাকা শহরে

১. জগন্নাথ কলেজে

১৯১৭ সালে ম্যাট্রিক পাশ করিয়াই কলেজে পড়িবার জন্য ঢাকা আসিলাম। ইচ্ছা ছিল ঢাকা কলেজে পড়িব। কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হইল। ময়মনসিংহ আসিয়া যেমন জিলা স্কুলে সিট না পাইয়া মৃত্যুঞ্জয়ে ভর্তি হইয়াছিলাম, ঢাকায় আসিয়া তেমনি ঢাকা কলেজে সিট না পাইয়া জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হইলাম। তৎকালে প্রথম বিভাগ দ্বিতীয় বিভাগের কোনও মারামারি ছিল না। যে আগে আসিত, সেই ভর্তি হইতে পারিত। ময়মনসিংহের মত ঢাকা আসার সময়েও আমার দেরি হইয়া গিয়াছিল। কাজেই আমার বরাতে জুটিল জগন্নাথ কলেজ।

ছাত্রসংখ্যার দিক দিয়া মৃত্যুঞ্জয় স্কুল যেমন ছিল জিলা স্কুলের পাঁচ গুণ বড়, জগন্নাথ কলেজও তেমনি ঢাকা কলেজের তুলনায় পাঁচ না হইলেও তিন গুণ বড়। অধ্যাপকের দিক দিয়াও তৎকালে ঢাকা কলেজের তুলনায় জগন্নাথ কলেজ হীন ছিল না। ঢাকা কলেজে যদিও তৎকালে মি. টার্নারের মত ইংরাজ প্রিন্সিপাল ছিলেন তবু জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপালও কম ছিলেন না। প্রফেসর ললিত কুমার চ্যাটার্জির মত দেশবিখ্যাত শিক্ষাবিদ জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপাল। ইনি আবার স্যার আশুতোষের জামাই। এটাও জগন্নাথ কলেজের একটা গৌরবের বিষয়। তৎকালে স্যার আশুতোষ মুখার্জি কলিকাতা হাইকোর্টের জজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। আমি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হইবার কয়েক মাস পরেই স্যাডলার কমিশন (মানে, ঢাকা ইউনিভার্সিটি কমিশন) ঢাকায় আসে। এই কমিশনের অন্যতম মেম্বর ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখার্জি। তিনি কমিশনের মেম্বর হিসাবে জগন্নাথ কলেজ পরিদর্শন করিলেন। আমাদের ক্লাসে গেলেন। জামাইর বাসায় খাওয়া-দাওয়া ও কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিলেন। এই সুযোগে আমরা স্যার আশুতোষের মত দেশবিখ্যাত বড়লোককে কাছে দাঁড়াইয়া দেখিবার সৌভাগ্য লাভ করিলাম। তা ছাড়া স্যার আশুতোষের পুত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আমাদের সঙ্গে একই সময়ে ম্যাট্রিক পাশ করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কিছুদিন পরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ভগিনীর বাড়িতে বেড়াইতে আসেন এবং কয়েক দিন থাকেন। এই উপলক্ষে তিনি তার ভাগিনা মনোরঞ্জন চ্যাটার্জির সাথে আমাদের কলেজে মাঝে মাঝে বেড়াইতে আসিতেন। প্রিন্সিপাল ললিত চ্যাটার্জির ছেলে মনোরঞ্জন চ্যাটার্জিও আমাদের ক্লাসের নামকরা ছাত্র ছিলেন। তার দৌলতে আমরা এই সময় শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে পরিচিত হইবার সৌভাগ্য লাভ করি। আমাদের প্রিন্সিপালের শালা আর আশুতোষ মুখার্জির পুত্র এবং ম্যাট্রিকে ফার্স্ট স্ট্যান্ড করা ছাত্র শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং তার সাথে মুখোমুখি আলাপ করা তৎকালে পরম। সৌভাগ্যের বিষয় ছিল। ঢাকা কলেজের আমার যেসব বন্ধু তাদের কলেজের। তুলনায় জগন্নাথ কলেজকে হেয়প্রতিপন্ন করিতে চাহিত, তাদেরে এই সব দৃষ্টান্ত দিয়া জব্দ করিতাম। তা ছাড়া জগন্নাথ কলেজে ভাল ভাল প্রফেসারও পাইয়াছিলাম। তাঁদের মধ্যে ইংরাজির অধ্যাপক বাবু সতীশ চন্দ্র সরকার ও দর্শনের অধ্যাপক বাবু উমেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য আমার জীবনে বিরাট প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন। যথাস্থানে তাদের কথা বলিব।

.

. যায়গীর–হাকিম সাহেবের বাড়িতে

আগেই বলিয়াছি কিছুদিন আগে হইতেই আমাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ। হইয়া যায়। পনের-বিশ টাকা স্কলারশিপ পাইয়া আইএ পড়িব বলিয়া যে স্বপ্ন দেখিতেছিলাম পাঁচ টাকা স্কলারশিপ পাওয়ায় সে স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। কাজেই হোস্টেলে থাকিয়া লেখাপড়ার আশা ত্যাগ করিলাম। শামসুদ্দিনের পিতা জনাব সাহেদুল্লাহ মণ্ডল সাহেব ও গাঁয়ের অন্যতম প্রধান মাতব্বর জনাব ওসমান আলী সরকার সাহেবের মধ্যস্থতায় ঢাকা চকবাজার চুড়িহাট্টার হাকিম আরশাদ আলী সাহেবের বাড়িতে আমার যায়গীরের ব্যবস্থা হইল। হাকিম সাহেবের বাড়িতে আমার থাকিবার মত অতিরিক্ত ঘর ছিল না। কাজেই হাকিম সাহেবের বাড়ির কাছের চুড়িহাট্টা মসজিদের ইমাম সাহেবের হুজরা-সংলগ্ন রুমে আমার থাকার ব্যবস্থা হইল। তিনজনকে আমি পড়াইতাম। তিনটি ছেলেই অতিশয় ভদ্র, বিনয়ী ও ভাল ছাত্র ছিল। তাদেরে পড়াইতে আমার বিশেষ বেগ পাইতে হইত না। আমার নিজের পড়ারও কোনো অসুবিধা হইত না। ছেলেমেয়েরা আমার অতিশয় যত্ন নিত। বিবি সাহেব যদিও পর্দা করিতেন এবং কখনও আমার সামনে আসিতেন না, তথাপি আমার খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধে সর্বদাই খবর নিতেন। ছেলেমেয়েরা না থাকিলে পর্দার আড়াল হইতে কথা বলিয়া আমার খোঁজখবর করিতেন। পরের বাড়িতে যায়গীর থাকার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম এবং এই শেষ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বৃদ্ধ বয়সে ওদের কথা মনে পড়ে। খবর লইয়া জানিয়াছি, হাকিম সাহেব ও তাঁর বিবি সাহেবা এন্তেকাল করিয়াছেন। ছেলেদের একজন হাকিমি পাশ করিয়া হাকিম সাহেবের দাওয়াখানা চালাইতেছে। অন্যান্য ছেলেরা অন্য ব্যবসায় করে। অনেক ইচ্ছা সত্ত্বেও, ঢাকা থাকিয়াও, তাদের সাথে দেখা করিতে পারি নাই। সে জন্য মনে একটা ক্ষোভ আছে।

হাকিম সাহেবের বাড়ি চুড়িহাট্টা হইতে, আমি চকবাজার, মোগলটুলী, ইমামগঞ্জ, বাবুর বাজার, ইসলামপুর, পাটুয়াটুলী হইয়া কলেজে যাতায়াত করিতাম। রোজ এতটা পথ হাঁটিতে আমার মোটেই কষ্ট হইত না। কারণ এর চেয়ে অনেক লম্বা রাস্তা, এর চেয়ে হাজার গুণে খারাপ পথে, এর চেয়ে অনেক কম বয়সে হাঁটিয়া স্কুল করিবার অভ্যাস আমার ছিল দরিরামপুর স্কুলে পড়িবার সময়। তা ছাড়া শহরের রাস্তায় চলা আরো সোজা। বিভিন্ন রকমের নিত্য-নূতন দৃশ্য দেখিতে-দেখিতে কখন যে পথ ফুরাইয়া যাইত, তা টেরও পাইতাম না।

এই রাস্তায় কলেজে যাতায়াত করিবার সময় একটা ভারি মজার ঘটনা ঘটিয়াছিল। আমি কলেজ হইতে ফিরিবার পথে রাস্তায় একটি কাপড়ের টুকরার (ঠিক রুমাল নয়)। ছোট পুঁটলি পাইলাম। পুঁটলিটি তুলিয়া হাতে লইয়া পথ চলিতে-চলিতেই তার গিরো খুলিলাম। যে জায়গায় পুঁটলিটি পাইয়াছিলাম তা ইমামগঞ্জ-মৌলবী বাজারের মোড়ের কাছাকাছি হইবে। কিন্তু ওর গিরো খুলিতে খুলিতে আমি মোগলটুলী ছাড়াইয়া প্রায় চকে পৌঁছিলাম। দশ টাকার একটি, পাঁচ টাকার দুইটি ও দুই টাকার একটি নোটে মোট বাইশটি টাকা। যুদ্ধ মুদ্দতের জন্য ঐ সময় দুই টাকার নোট বাহির হইয়াছিল। তৎকালে ঐ বাইশ টাকার দাম আজকালকার দুই শ টাকারও বেশি। কারণ ঐ সময় দশ-বার টাকায় কলেজ হোস্টেলে স্বচ্ছন্দে থাকা চলিত। এক টাকা সিটরেন্ট, পাঁচ টাকা খোরাকি, এক টাকা টিফিন ও চার টাকা কলেজের বেতন, এই এগার টাকায় রাজপুত্রের হালে কলেজ হোস্টেলে অনেকেই থাকিত। আর আমার মত যায়গীর থাকা গরীব ছাত্রের জন্য বাইশ টাকা ছিল আলী বাবার মোহরের খনি। কাজেই টাকা গনিবার সময় আমার হাত কাপিতেছিল। এই টাকার কী করা যায়? যে ধরনের নেকড়ায় যেভাবে টাকাগুলি বাঁধা তাতে বুঝা যায়, মফস্বলের কোনও লোক কোনও জিনিস কিনিতেই শহরে আসিয়াছিল। ঐ টাকা হারাইয়া নিশ্চয়ই বেচারার খুবই ক্ষতি হইয়াছে। কিন্তু করা যায় কী? শহরে ঢোল-শহরত করিয়া দিলে ঐ লোকের সন্ধান পাওয়া যাইতে পারে। পয়সা খরচ করিয়া ঢোল-শহরত করিলে এই টাকা হইতেই কিছু টাকা খরচ হইয়া যাইবে। সুতরাং কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া ঠিক করিলাম থানায় এই টাকাটা জমা দিলে দারোগা বাবু সরকারি খরচেই ঢোল পিটাইয়া ঐ লোকের সন্ধান করিবেন। সামনেই চকবাজার থানা। তাতে ঢুকিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম, ওসি আছেন কিনা? একজন বিহারি পুলিশ দাঁড়াইয়াছিল, সে বলিল : কুই নাহি হ্যায়।’

বাহির হইয়া আসিলাম। হঠাৎ একটু রিলিফ বোধ করিলাম। বুকের উপর হইতে একটা পাথর নামিয়া গেল। দারোগা বেটাদের যে বদনাম শুনি তাতে ওদের হাতে এ টাকাটা পড়িলে নির্ঘাত খাইয়া ফেলিবে। দারোগারা যে কেউ থানায় ছিলেন না এটা আল্লারই ইচ্ছা। তিনি যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। আল্লার এই মেহেরবানির কথা ভাবিয়া আসমানের দিকে চাইতেই দেখিলাম, সামনেই চকবাজার পোস্টাফিসের সাইনবোর্ড। আল্লার ইশারা এতক্ষণে বুঝিলাম। পোস্টাফিসে টাকাটা জমা দিয়া ঢোল-শহরতের কিম্বা ছাপা বিজ্ঞাপনের একটা কিছু ব্যবস্থা করা যাইবে। অতএব পোস্টাফিসে ঢুকিলাম। একটি কাউন্টার, বিকাল বেলা তাতেও খুব ভিড়। পোস্টাফিসে এ যাবকালে শুধু কার্ড ও স্ট্যাম্প কিনিয়াছি। টাকা জমাও দেই নাই, মনি অর্ডারও করি নাই। তবু এটা যে মনি অর্ডার হইবে না, তা বুঝিলাম। পোস্টাফিসের সেভিং ব্যাংকের নাম শুনিয়াছি। কিন্তু কীভাবে টাকা জমা দিতে হয়, তা জানি না। ভিড়ের পিছনে দাঁড়াইয়া এসব কথাই ভাবিতে লাগিলাম। যতক্ষণে সামনের ভিড় কমিল, ততক্ষণে আমার সন্দেহের উদ্রেক হইয়া গিয়াছে। পোস্টাফিসে টাকা জমা দিলে সেটাও থানার মতই গায়েব হইয়া যাইবে কিনা? একটু ভাবিয়া-চিন্তিয়া বন্ধু-বান্ধবের সাথে পরামর্শ করিয়াই কাজ করা উচিৎ। অতগুলি টাকা। আবার পরের টাকা। কাজেই সামনের ভিড় শূন্য হইয়া যাওয়ার পরও যখন আমি দাঁড়াইয়াই আছি, কিছু চাইতেছি না, তখন কাউন্টারের কর্মচারীই আমাকে বলিলেন: আপনি কি চান? আমি থতমত খাইলাম। তাড়াতাড়ি মুখ হইতে বাহির হইয়া গেল : একটা পোস্টকার্ড দেন।

সে সময় আমার পোস্টকার্ডের দরকার ছিল না। কিন্তু ওটা এমন জিনিস যার দরকার একদিন হইবেই। কাজেই ওটাকে অপব্যয় মনে না করিয়াই বাসায় ফিরিলাম। হাত-মুখ ধুইয়া নাশতা করিয়া ঢাকা কলেজের মুসলিম হোস্টেলে গেলাম। এটা আমার রোজকার অভ্যাস। বর্তমানে যেখানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এটাই তখন ঢাকা কলেজের মুসলিম হোস্টেল। এর নাম ছিল তখন সেক্রেটারিয়েট মুসলিম হোস্টেল, সংক্ষেপে এসএম হোস্টেল। পূর্বপরিচিতদের মধ্যে শুধু শামসুদ্দিনই এই হোস্টেলে থাকিত। প্রথম-প্রথম তারই খাতিরে যাইতাম। কিছু দিনে অনেক বন্ধু জুটিয়া গেল। তাতে সেখানে যাওয়া আমার একটা বৈকালিক নেশা হইয়া গিয়াছিল।

.

. পথে-পাওয়া টাকার সদ্ব্যবহার

আমি হোস্টেলে পৌঁছিয়া দেখিলাম আমার বন্ধুরা সাজিয়া-গুঁজিয়া বাজারে যাইবার জন্য প্রস্তুত। অন্যদিন তাদেরে টেনিস বা ব্যাডমিন্টন খেলায় পাই। আমিও ওদের র‍্যাকেটে, ওদের বলে ও শাটলককে দুই-এক হাত খেলিতাম। কিন্তু সেই দিন ওরা বাজারে যাইবে বলিয়া অনেক আগেই খেলা ছাড়িয়া দিয়াছিল। সকলকে একত্রে পাইয়া খুশিই হইলাম। আমার টাকা পাওয়া, থানা-পোস্টাফিসে যাওয়া সব কথা বিস্তারিত বলিয়া তাদের উপদেশ চাইলাম। আমার কথা শুনিয়া সকলে একসঙ্গে হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। একজন বলিল : তুমি বিলাইর কাছে গোশতের পাহারাদারি দিতে চাইছিলা। যাক আল্লার মাল আল্লাই বাঁচাইছেন। আমিও মনে-মনে আল্লাকে ধন্যবাদ দিলাম। পরের টাকা লইয়া কী আহাম্মকিই না করিতে যাইতেছিলাম। নিজের এই গাধামির জন্য লজ্জা-ভারী চোখ তুলিয়া বলিলাম: এখন তবে করি কী?

এক বন্ধু হাত বাড়াইয়া বলিলেন : এমন আহাম্মক কি আর গাছে ধরে? ঐ টাকা যথাস্থানে পৌঁছানো ত সোজা ব্যাপার। দাও আমার কাছে টাকাটা।

আমি বন্ধুর কাছে টাকা দিলাম। একটা বড় বোঝা ঘাড় হইতে নামিয়া গেল। আরাম পাইলাম। বন্ধুদের সাথে হাসি-খুশিতে বাজারে গেলাম। গেলাম একদম পাটুয়াটুলীতে। প্রথমেই কালাচাঁদ গন্ধবণিকের দোকানে ঢুকিয়া বন্ধু এক টাকার মিঠাইর অর্ডার দিলেন। তৎকালে এক টাকার মিঠাইয়ে দশজনের পেট ভরিত। আমরা পাঁচ বন্ধুতে সে মিঠাই খাইয়া গলা পর্যন্ত ভরিলাম। ঢেকুর তুলিয়া কালাচাঁদের দোকান হইতে বাহির হইলাম এবং পান-সিগারেট খাইলাম। তারপর আমরা গেলাম মজিদ চশমাওয়ালার দোকানে। সেখানে আমাদের নেতা বন্ধু এগার টাকায় একটি সোনার ফ্রেমের জিরো পাওয়ারের চশমা কিনিলেন। সেখানে হইতে বাহির হইয়া লতিফ খলিফার দোকানে প্রবেশ করিয়া সেখানে এক বন্ধুর গায়ের ছয় টাকা দামের একটা কোটের মাপ দিয়া পুরা টাকা আগাম দিয়া দিলেন।

লতিফ খলিফার দোকান হইতে বাহির হইয়া বন্ধুরা আমার দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিলেন : দেখলা এইবার পাওয়া-টাকার সদ্ব্যবহার কেমনে করতে হয়?

সকলে প্রাণ খুলিয়া গলা ফাটাইয়া হাসিলেন। হাসি থামিলে আরেক বন্ধু বলিলেন : কিন্তু যে বেচারা টাকাটা পাইল, তারে ত কিছু দিলা না।

যে বন্ধুর পকেটে টাকা, তিনি বলিলেন : তার কথা আমার মনে আছে। তার কথা ভুইলা যাবার মত অবিবেচক আমি নই। চারটা টাকা এখনও রাইখা দিছি।

আমি এতক্ষণে ব্যাপার বুঝিলাম। বন্ধুরা ঐ পথে-পাওয়া টাকা দিয়াই আমাদেরে মিঠাই খাওয়াইয়াছেন এবং চশমা-কোট কিনিয়াছেন! বন্ধুরা কেন এটা করিলেন? হাওলাত স্বরূপই টাকা খরচ করিতেছেন, পরে ভরিয়া দিবেন। নিশ্চয়ই। কিন্তু ও-টাকা খরচ করিয়া কাজটা কি তারা ভাল করিলেন, বুঝিলাম না। তবে এটা বুঝিলাম যে টাকাটা খরচ হইয়া যাইতেছে। ভাবনা-চিন্তা শেষ হইবার আগেই দেখিলাম, আমরা এক রেডিমেড কাপড়ের দোকানে ঢুকিয়াছি। বন্ধুরা সকলে পছন্দ করিয়া চার টাকা দিয়া আমার জন্য খয়েরি হলুদ রঙের তসরেটের একটা কোট কিনিলেন। সব টাকা খরচ হইয়া যাওয়ার চেয়ে চার টাকা বাঁচা ভাল, বোধ হয় এই নীতিতে আমি ঐ কোট নিলাম। বন্ধুরা চকবাজার পর্যন্ত আমাকে পৌঁছাইয়া দিয়া সেন্ট্রাল জেলের সামনে দিয়া নিজেদের হোস্টেল মুখে রওয়ানা হইলেন। যাইবার সময় বলিয়া গেলেন : তোমার মত বোকারামের এ চার টাকাও পাওয়া উচিৎ ছিল না।

.

. কেতাবি সাধুতা বনাম বিষয়ী সাধুতা

এতক্ষণে পাঠকেরা নিশ্চয়ই বুঝিয়াছেন, কেন আমি বন্ধুদের নাম উল্লেখ করিলাম না। ঐ বন্ধুদের দুইজন ছাড়া আর সবাই বাঁচিয়া আছেন। তারা সকলেই আজ সম্মানিত ব্যক্তি। কিছুদিন আগে পর্যন্ত উচ্চপদস্থ ছিলেন। স্বভাব-চরিত্রে তারা সে সম্মানের যোগ্যও ছিলেন। নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি ও পদমর্যাদার সুযোগ লইয়া এঁরা কেউ কখনও অন্যায়-অসৎ উপায়ে অন্যের সম্পত্তি বা টাকা-পয়সা হস্তগত করিয়াছেন, এমন বদনাম এঁদের একজনেরও নাই। এঁরাই যৌবনে ঐ মনোভাবের পরিচয় দিয়াছিলেন। নিজের সাধুতার ফুটানি করিবার উদ্দেশ্যে অথবা বন্ধুদের নীতি-বোধকে হেয় করিবার মতলবেও এ ঘটনার উল্লেখ করিতেছি না। ঘটনা যেরূপ ঘটিয়াছে, অবিকল তাই বলিতেছি। বরঞ্চ সাধুতার ফুটানি করিবার মুখ আর আমার নিজেরই নাই। যখন এটা লিখিতেছি তখন আমার ঐ বন্ধুদের সকলেরই সুনাম অক্ষুণ্ণ ও চরিত্র নিষ্কলঙ্ক রহিয়াছে। আমি কয়েক মাস মন্ত্রিত্ব করিয়াই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও নিম্ন আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হইয়াছিলাম। মাত্র উচ্চ আদালত হইতেই খালাস পাইয়াছিলাম। এ অবস্থায় নীতিবোধে আমি বন্ধুদের থনে শ্রেষ্ঠ, এ কথা বলিবার আমার অধিকারও নাই। বলিলে কেউ বিশ্বাসও করিবেন না। তবু এই ঘটনার উল্লেখের যদি কোনও মতলব ধরা যায় তবে সেটা সাধুতার ফুটানি করিবার জন্য নয়, বরং তেমন ফুটানির নিন্দা করিবার জন্যই।

পথে টাকা-পয়সা বা কোনও মূল্যবান চিজ পড়িয়া পাইলে এ ব্যাপারে আমাদের নাগরিক দায়িত্ব কী? পড়িয়া-পাওয়া টাকার পরিমাণ বা জিনিসের মূল্যভেদ, প্রাপকের অবস্থা বিশেষ, হারানো বস্তুর মালিকের আনুমানিক অবস্থা ইত্যাদিতে আমাদের নাগরিক কর্তব্যের ইতর-বিশেষ হইবে কিনা, এসব প্রশ্নের বিচার নিশ্চয়ই খুব সোজা নয়। অবস্থাভেদে ব্যক্তির ত বটেই, সমাজেরও নীতিবোধের প্রখরতার বেশ-কম হইতে পারে। ইউরোপ আমেরিকান দেশসমূহের লোকদের এদিককার নাগরিকতা-বোধ নাকি খুবই তীব্র। আমি শুনিয়াছি, সেখানে রাস্তার মোড়ে খবরের কাগজের স্তূপ ও একটা পাত্র পড়িয়া থাকে। বিক্রেতা থাকে না। খরিদ্দাররাই যার-তার ইচ্ছামত কাগজ নিয়া তার দাম ঐ পাত্রে ফেলিয়া যায়। কেউ এক পয়সা হেরফের করে না। দোকানেও নাকি জিনিসপত্রের গায় দাম লেখা থাকে। দরজায় বাক্স থাকে। খরিদ্দাররা ঐ বাক্সে দাম ফেলিয়া পছন্দমত জিনিস লইয়া যায়। কলেজজীবনে এক অধ্যাপকের মুখে শুনিয়াছিলাম, দ্রুতগামী চলন্ত বাসে জানালায় মুখ বাহির করায় তাঁর মাথার হ্যাট রাস্তায় পড়িয়া গিয়াছিল। মোটরসাইকেলওয়ালা পুলিশ দশ মাইল মোটর চালাইয়া পরবর্তী স্টেশনে সেই বাস ধরিয়াছিল এবং তার হ্যাট দিয়া গিয়াছিল। মন্ত্রিত্ব করিবার কালে এক রাষ্ট্রদূত বন্ধুর মুখে শুনিয়াছিলাম, এক বিমানবন্দরে তিনি রুমাল ফেলিয়া আসিয়াছিলেন। তিনটা দেশ ও দশটা বিমানবন্দর বাহিয়া হাওয়াই জাহাজে জাহাজে তাঁর রুমাল তার হাতে ফিরিয়া আসিয়াছিল। কিন্তু এটা ছবির একদিক মাত্র। ঐ দেশের অমন নাগরিক কর্তব্য-চেতন লোকেরাই আবার আফ্রো-এশিয়ান দেশসমূহের লোকদের ইনসানি হক ও মুখের বুলি কাড়িয়া লইতেছে। বাধা দিলে গুলির মুখে তাদের খুলি উড়াইয়া দিতেছে। মানুষের নীতিবোধ এত বিচিত্র।

আমাদের দেশের ও সমাজের অবস্থা তা নয়, এটাই বড় কথা নয়। আমার নিজেরই মধ্যে নৈতিক কাপুরুষতা ও দ্বিধা-সন্দেহ আছে। আমি আজ তা বেশ বুঝিতেছি। কলেজজীবনে এক হোস্টেল-মেট একবার আমার কাছ থনে পাঁচটা টাকা ধার নেন। কথা থাকে বাড়ি থনে মনি অর্ডার আসিলেই শোধ করিবেন। কতবার তার মনি অর্ডার আসিল। আমার টাকা শোধ করিলেন। যথেষ্ট তাগাদা করিলাম। বন্ধু-বান্ধব সালিস-সুপারিশ করিলেন। তবুও। বছর-দুই বছর কাটিয়া গেল। টাকা পাওয়ার আশা ছাড়িয়া দিলাম। এমন সময় একদিন দল বাঁধিয়া মার্কেটে যাইতেছি। আমার ঐ দেনাদার বন্ধুর পকেট থনে দশ টাকার একখানা নোট তার ও সকলের অজ্ঞাতে মেঝেয় পড়িয়া গেল। আমি সকলের অজ্ঞাতে আলগোছে তা তুলিয়া নিলাম। ভাবিলাম আল্লাহ সুদসহ আমার টাকা পাওয়াইয়া দিলেন। বাজারে গিয়া জিনিস পছন্দ করিয়া দাম দিতে গিয়া পকেটে হাত দিয়া বন্ধু বুঝিলেন তাঁর টাকা হারাইয়াছে। কত হায়-আফসোস করিলেন। আমি অন্যদের সাথে প্রচুর সহানুভূতি জানাইলাম। কিন্তু আসল কথা বলিলাম না।

ফাইনাল পরীক্ষার পর যেদিন সমপাঠীরা সকলে হোস্টেল হইতে বিদায় লইতেছিলাম, সেদিন ঐ বন্ধু পাঁচটা টাকা আমার হাতে জিয়া দিলেন এবং এতদিন দেনা শোধ না করার জন্য মাফ চাহিলেন। আমার হাত কাঁপিতেছিল। বুক ধড়ফড় করিতেছিল। কিন্তু মুখ ফুটিয়া সত্য কথা বলিতে এবং সে টাকা ফেরত দিতে সাহস পাইলাম না। বরং পরে মনকে প্রবোধ দিবার জন্য দুই বছরের অধিককাল আমাকে জ্বালাইবার প্রতিশোধের কথা এমনকি ইনসাফের মালিক আল্লাহর সুবিচারের কথাও ভাবিয়াছিলাম।

কেতাবি সাধুতা ও রাস্তার সাধুতায় সে পার্থক্য আছে এঁরা তার প্রমাণ। অথচ সাধারণ লোক এটা বুঝিতে পারে না। সাধুতার ভন্ডামি বা ফুটানিরিয়াকারীই যে আসল সাধুতা নয়, বিষয়ী সাধু লোকদের ধারণা তাই। এঁরা আসলে খারাপ লোক নন। সমাজের অবাঞ্ছিত অঙ্গ ও রাষ্ট্রের অবাঞ্ছিত নাগরিকও এঁরা নন। বরঞ্চ শুধু এই শ্রেণীর বিষয়ী ও বাস্তববাদী সাধু লোক যারা সাধুতাকে শুধু পলিসি মনে করেন, তাদের লইয়াই একটা দেশ একটা সমাজ সুখী-সমৃদ্ধিশালী হইতে পারে। পক্ষান্তরে পান হইতে চুন খসিয়া পড়িলেই যাঁরা হায়-হায় করিয়া উঠেন, কেতাবি সাধুতার সেই ভণ্ড ও রিয়াকারদেরে লইয়া একটা সমাজ বা দেশ সুখী হইতে পারে না। আজ পঁয়তাল্লিশ বছর পরেও আমি মনে করি, আমি ঐদিন আহাম্মকি করি নাই। কিন্তু যেসব বন্ধু ঐদিন আমাকে আহাম্মক বলিয়াছিলেন তাঁরা অসাধু, এ কথাও আমি বলিতে পারি না। বিশেষত এ কথাও আমি ভুলিতে পারি না যে বাইশ টাকা হজম করিতে আমার বিবেকে বাধিয়াছিল বটে কিন্তু ঐ টাকার ভগ্নাবশেষ চার টাকা হজম করিতে আমার আপত্তি হয় নাই। কিন্তু জনমত ব্যক্তির মতের বা যুক্তির তোয়াক্কা করে না। জনগণ ব্যক্তিগত সাধুতার খুব কমই মূল্য দিয়া থাকে। জনগণের বিশ্বাস, সুযোগ পাইলেই মানুষ চোর হয় ‘এভরিওয়ান হ্যাঁজ হিজ ভ্যালু, টাকা দিয়া সবাইকে কেনা যায়। জনগণের এই বিশ্বাস আছে বলিয়াই তাদের কথা : তৃণ হরণ করে না ব্রহ্মচারী; টাকা চুরি করে লক্ষ চারি। সারা জীবন যে লোকটা সাধুতার জন্য চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করিল, সেও যদি মওকামত ভাল সুযোগ পায় তবে টাকা মারিতে দ্বিধা করিবে না। যে সময়ে এ টাকাটা আমি রাস্তায় কুড়াইয়া পাইয়াছিলাম ঠিক সেই সময়ে কলেজের বকেয়া পাওনার জন্য আমার নাম কাটা যাওয়া আসন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। তবু এ টাকা দিয়া কলেজের বকেয়া বেতন শোধ করার কল্পনার একটা উঁকিতেই আমার বিবেক তার দিকে বাঘা কুত্তার মত ঘেউ-ঘেউ করিয়া উঠিয়াছিল। অথচ দুই ঘণ্টা পরে আমার বন্ধুরা যখন ঐ টাকার সব শেষ করিয়া বাকি চার টাকা দিয়া আমাকে একটা রেডিমেড কোট কিনিয়া দিলেন, তখন আমার সেই বিবেকই ক্লান্তি-অবসাদে অন্ধকার কোণে ঘুমাইতেছিল।

.

. হোস্টেল-জীবন বনাম যায়গীর-জীবন

হোস্টেল-জীবনের কথা শুরু করিবার আগে যায়গীর-জীবন সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার। এই দেড় বছরের যায়গীর-জীবন একাধিক কারণে একাধিক দিক হইতে আমার নয়া অভিজ্ঞতার উৎস হইয়াছিল। ভবিষ্যৎ জীবনে সে অভিজ্ঞতা খুবই কাজে লাগিয়াছিল। প্রথম ও সর্বাপেক্ষা মূল্যবান যে শিক্ষালাভ করি, তা ছিল ছাত্র হিসাবে আভিজাত্য-বোধের অবসান। স্কুলজীবনের চার বছর হোস্টেলে কাটাইবার সময় নিজের অজ্ঞাতেই যায়গীরবাসী ও হোস্টেলবাসী ছাত্রদের মধ্যে একটা আভিজাত্যের সীমারেখা টানিতে শিখিয়াছিলাম। হোস্টেলবাসী ছাত্ররা সুপিরিয়র ও যায়গীরবাসী ছাত্ররা ইনফেরিয়র। হোস্টেলবাসীরা নিজের টাকায় খায় আর যায়গীরবাসীরা পরের খায়। এই কারণে হোস্টেলবাসীরা ধনী বাপের ছেলে আর যায়গীরবাসীরা গরীব বাপের ছেলে; পার্থক্যটা শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কারণ শহরতলী ও অদূরবর্তী পাড়াগাঁয়ে যেসব ছাত্র নিজের বাড়ি হইতে স্কুলে পড়িতে আসিত, আমরা হোস্টেলবাসীরা তাদেরেও কিছুটা অবজ্ঞা চোখে দেখিতাম। আমরা হোস্টেলবাসী ছাত্ররা অন্য সব ছাত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর, কিছুটা অভিজাত শ্রেণীর মনে করিতাম। আজকালকার ক্যাডেট কলেজের ছাত্ররা যেমন সাধারণ স্কুল-কলেজের ছাত্রদের থনে নিজেদেরে কিছুটা শ্রেষ্ঠ মনে করিয়া থাকে, এমনি একটা মনোভাব আর কি?

আমার যায়গীর-জীবনে এই অহমিকা ভাঙ্গে। ভাঙ্গা কথাটা ব্যবহার করিলাম এই জন্য যে হোস্টেল-জীবন হইতে যায়গীর-জীবনে আমার এই পরিবর্তনটা প্রথম-প্রথম আমার মনঃপীড়ার কারণ হইয়াছিল। এটাকে একটা পতন মনে হইয়াছিল। বাপের দারিদ্র্যের ফলেই আমার এই পতন ঘটিয়াছিল। সুতরাং আমি আর অভিজাত শ্রেণীর ছাত্র নই। এটাই ছিল আমার মনঃপীড়ার কারণ।

এই মনঃপীড়ার যখন অবসান হইল, তখন নিজের দুর্ভাগ্যের সহিত আপস করার মত নিগেটিভ মনোভাব এটা ছিল না। যায়গীর-জীবনের একাধিক উপকারী দিকের সন্ধান লাভের মত পজিটিভ দিকও আমার চোখে উদ্ভাসিত হইল। প্রথমত, যায়গীর-জীবনে ছাত্ররা জনগণের মধ্যে বাস করিয়াই শিক্ষা লাভ করে; হোস্টেলবাসীর মত গণ-সমাজ-জীবন হইতে বিচ্ছিন্ন তারা হয় না। এই দিক হইতে যায়গীরবাসী ছাত্র হোস্টেলবাসীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয়ত যায়গীরবাসী ছাত্র পরের ভাত খায় এটাও ঠিক না। যায়গীর বাড়ির দু-চারজন ছেলেমেয়েকে তাদের পড়াইতে হয় বলিয়া তারা নিজের রোযগারী খানাই খায়। এই দিক হইতে শিক্ষাজীবনের আধুনিক বৈজ্ঞানিক নীতি আর্ন হোয়াইল ইউ লার্ন’, প্রয়োগ করিয়া থাকে এরাই। তৃতীয়ত, গণ সমাজ-জীবনে বাস করিয়া এরা শিক্ষা লাভ করে বলিয়া এরা সমাজের আচার-আচরণ সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং মানবজীবনের সহিত ব্যাপকতর ক্ষেত্রে পরিচিত হয়। হোস্টেলবাসীর চেয়ে এদের শিক্ষা অধিকতর বাস্তববাদী, অতএব পরিপূর্ণ হইয়া থাকে। হোস্টেলবাসীর মত অসামাজিক অবাস্তব ও অপূর্ণ থাকে না। চতুর্থত, যায়গীরবাসী ছাত্র হোস্টেলবাসীর চেয়ে আত্মবিশ্বাসী, স্বনির্ভর মিতব্যয়ী ও বিষয়জ্ঞানী হইতে শিখে। পরিস্থিতি ও পরিবেশই এমন হইতে তাদেরে শিক্ষা দেয়। পরবর্তী জীবনের জন্য এ সবই অত্যাবশ্যক গুণ।

.

. ঢাকার মহল্লা-জীবন

এটা ত গেল শিক্ষা-সুযোগের সাধারণ উপকারিতার দিক। দেড় বছরের যায়গীর-জীবনে চুড়িহাট্টা মহল্লা সাধারণভাবে এবং হাকিম সাহেব ও তার পরিবার-পরিজন হইতেও আমি ব্যক্তিগতভাবে যে জ্ঞান ও উপকার পাইয়াছি, তারও কিছু উল্লেখ করা প্রয়োজন।

চুড়িহাট্টা মহল্লাটি সে সময়ে ছিল একটি নিম্নমধ্যবিত্তের মহল্লা। ঢাকা শহরের অধিকাংশ গলিকুচার মহল্লাগুলি তখন এমনি ছিল। বাসেন্দাদের বেশির ভাগ ছিল নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর। তাদের অধিকাংশের বিশেষত তাদের মধ্যেকার আদি ঢাকাবাসীদের ভাষা ছিল ঢাকাইয়া উর্দু। এরা প্রায় সবাই ছিল স্বভাব-রসিক। সে রসিকতায় উপমা, শব্দবিন্যাস, বাক-রীতি, প্রকাশ ভঙ্গি ছিল অপূর্ব, মৌলিক ও প্রাসঙ্গিক। ঘটনা ও পরিস্থিতি যতই আকস্মিক ও অভাবনীয় হউক, তার উপযোগী মওকা-মাফিক অদ্ভুত কল্পনাপ্রসূত রসিকতা যেন তাদের ঠোঁটের আগায় সদা প্রস্তুত থাকিত। ঘটনার আকস্মিকতার মতই তাদের রসিকতার আকস্মিকতাও দর্শক ও শ্রোতাকে তাক লাগাইয়া দিত।

চুড়িহাট্টা মহল্লার জনসাধারণও ছিল এমন ঢাকাবাসীর এক অংশ। অন্যান্য মহল্লার মতই চুড়িহাট্টাতেও বাদ-মগরেব বিভিন্ন বাড়ির সেহানে আচ্ছা বসিত। এইসব আড্ডার রসে-ভরপুর বিতর্ক-আলোচনা ছিল বিচিত্র। আগে-আগে হাকিম সাহেবের সেহানেও ছিল আড্ডাখানা। কিন্তু হাকিম সাহেবের ছেলেমেয়েদের পড়ার ব্যাঘাত হয় বলিয়া ঐ আড্ডা ক্রমশ কমিয়া যায়। এবং আমি ছেলেমেয়েদের মাস্টার হওয়ার পর আজ্ঞা একদম উঠিয়া যায়। অবশ্য কিছু দূরের বাড়ি-সমূহের সেহানে আড্ডা চলিতে থাকে। আমার দরুন আড্ডা ভাঙ্গায় আড্ডাবাযরা অসন্তুষ্ট হইয়াছেন ভাবিয়া তাদেরে খুশি করিবার আশায় আমি মাঝে মাঝে তাঁদের আড্ডায় যাইতাম। কিন্তু লক্ষ্য করিতাম আমার উপস্থিতিতে আড্ডার স্বাভাবিক স্ফূর্তি বিঘ্নিত হইত। মন খুলিয়া তাঁরা হাসি-তামাশা করিতে পারিতেন না। ‘মাস্টার সাব’ বলিয়া তাঁরা আমাকে সম্বোধন করিতেন এবং উপযুক্ত সম্মান করিতেন বলিয়াই বোধ হয় এরূপ হইত। তাই আমিও আস্তে আস্তে তাঁদের আড্ডায় যাওয়া ছাড়িয়া দিলাম।

হাকিম সাহেব নিজে ছিলেন একজন স্বল্পভাষী গম্ভীর প্রকৃতির লোক। তিনি আরবি-ফারসিতে বেশ লিয়াকত রাখিতেন। নিজের বিদ্যার বড়াই তিনি কখনও করিতেন না। কিন্তু আমি অল্প দিনেই তাঁর পরিচয় পাইলাম। ফারসি আমার দ্বিতীয় ভাষা ছিল। আমি হাকিম সাহেবের ছেলেমেয়েদের পড়াইবার সময় সঙ্গে সঙ্গে নিজের পাঠ্যবইও পড়িতাম। আমি ফারসি টেক্সট বই পড়ার সময় হাকিম সাহেব দাওয়াখানা হইতে ফিরিয়া আসিলে প্রায়ই সাদী, হাফেয, রুমী, ফেরদৌসী ও জামী লইয়া আমার সহিত আলোচনায় বসিতেন। কবিদের সম্বন্ধে আমার অজানা অনেক তথ্য বর্ণনা করিতেন এবং আমার পাঠ্যবইয়ের বাইরের অনেক কবিতা আবৃত্তি করিতেন।

হাকিম সাহেব মোটামুটি খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক ছিলেন। মৌলবী বাজারে তার দাওয়াখানা ছিল। বন্ধুবান্ধবসহ বাজারে সওদা করিতে বা বেড়াইতে গেলে হাকিম সাহেবের দোকানের সামনে দিয়া যাইতে হইত। সুযোগ পাইলেই দাওয়াখানায় ঢুকিতাম। দেখিতাম তার রোগী সংখ্যা অনেক। আমাদেরে দেখিলে তিনি বসিতে বলিতেন। সুবিধা হইলে বসিতামও। অবসর পাইলে তিনিও আমাদেরে আগের দিনের এবং হিন্দুস্থানে (মানে দিল্লি-লাখনৌসহ উত্তর-ভারতে) বর্তমানেও হাকিমি বিদ্যার আদর ও মর্যাদা বর্ণনা করিতেন। আমি তাতে এ বিষয়ে বেশ কিছু জ্ঞান লাভও করিয়াছিলাম।

হাকিম সাহেবের নিকট আমি উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতাও শিখিয়াছিলাম। তিনি অনেকবার আমাদের গ্রামে গিয়াছেন। কাজেই জানিতেন আমরা গোড়া মোহাম্মদী। গোর-পীর পূজার আমরা ভয়ানক বিরোধী। মহল্লার লোকেরা এবং সহপাঠী ছাত্ররা প্রায় সবাই ছিলেন হানাফী। এই লইয়া সহপাঠীদের সাথে আমার যে তর্ক ও বাদ-বিতণ্ডা হইত, তাতে অনেক সময় অপ্রিয়তারও সৃষ্টি হইত। এই ধরনের ঘটনায় হাকিম সাহেব প্রকাশ্যে আমার পক্ষ লইতেন, গোপনে আমাকে উদার হইতে উপদেশ দিতেন। এমন একটি ঘটনার কথাই বইয়ের অন্যত্র উল্লেখ করিয়াছি।

প্রায় দেড় বছর হাকিম সাহেবের বাড়িতে যায়গীর থাকিয়া আইএ ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বাদামতলী ঘাটের এক মেসে যাই। এটা ছিল ছাত্র ও অফিসারদের একটি মিশ্রিত মেস।

এই মেসে আমি মাত্র মাস কয়েক ছিলাম। এখান হইতেই আইএ ফাইনাল দেই। ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করি। কিন্তু কোনও স্কলারশিপ পাই না। এই মেসে আমিন সাহেব নামে একজন কেরানি থাকিতেন। তিনি খুব ভাল ফুট বাজাইতেন। আমার পরীক্ষার পড়ায় ব্যাঘাত হইবে বলিয়া তিনি বেশি রাত্রে মেসের খোলা সেহানে বসিয়া বাঁশি বাজাইতেন। বাঁশির সে মিঠা আওয়াজে আমার ও মেসের আরো অনেকের ঘুম ভাঙ্গিয়া যাইত। আমরা আর বিছানায় শুইয়া থাকিতে পারিতাম না। সেহানে আসিয়া আমি তার পা ঘেঁষিয়া বসিতাম। এই আমিন সাহেবের নিকট আমি ফুট বাজানো শিখিয়াছিলাম এবং পরবর্তী ছাত্রজীবনে বাঁশিবাদক হিসাবে নাম করিয়াছিলাম।

দুই বছরের জগন্নাথ কলেজ-জীবন আমার মোটামুটি সুখেই কাটিয়াছিল। ভাল-ভাল প্রফেসারের কাছে পড়িবার আনন্দ পাওয়া ছাড়াও জগন্নাথ কলেজে আমার একটা নূতন অভিজ্ঞতা লাভ হয়। স্কুল-কলেজের এত বড় লাইব্রেরি থাকিতে পারে, জগন্নাথ কলেজেই প্রথম এই জ্ঞান লাভ করি। লাইব্রেরির বিশালতায়, বইয়ের সংখ্যায় ও নাম না-শোনা ও চোখে না-দেখা বহু বড় বড় আকারের বই দেখিয়া আমি লাইব্রেরিটার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়ি। ক্লাসে পড়া না থাকিলে অথবা অন্যভাবে অবসর পাইলেই আমি লাইব্রেরিতে ঢুকিতাম। অল্পক্ষণেই লাইব্রেরিতে ডুবিয়া পড়িতাম। সবচেয়ে বেশি ডুবিতাম ইতিহাসের বইয়ে। ইতিহাস মানে আরব জাতি ও মুসলিম দুনিয়ার ইতিহাস। খলিফা ওমরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিটি পোড়াইবার গল্পটি যে সম্পূর্ণ বানোয়াট, ঐতিহাসিক বাটলারের বই হইতে এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধসহ কয়েকটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লিখি এই সময়ে। এগুলি আল-ইসলাম-এ ছাপা হয়। এইভাবে ইতিহাসের আউট বুকে এতটা মাতিয়া উঠি যে ইতিহাসের টেক্সট বুকগুলির প্রতি অবহেলা করি। ফলে অন্যান্য বিষয়ে ৮০-এর উপর নম্বর পাইয়াও ইতিহাসে মাত্র ৩৬ নম্বর পাইয়া কোনও মতে ফার্স্ট ডিভিশনে আইএ পাশ করি।

খেলাধুলায় শখ ছিল ছেলেবেলা হইতেই। কিন্তু জগন্নাথ কলেজের দুই বছর ফুটবল-ক্রিকেট হইতে বঞ্চিত থাকি। জগন্নাথ কলেজের নিজস্ব কোনও খেলার মাঠ ছিল না। কলেজের পিছন দিকে যে খানিকটা খোলা জায়গা ছিল, তাতে ফুটবল-ক্রিকেট খেলা চলিত না। তবু তার মধ্যে আমরা কোনো রকমে খেলা চালাইতাম। বল ক্যাচিং-এ অর্থাৎ গায়ের জোরে খুব উঁচায় ক্রিকেট বল ছুড়িয়া তা ধরায়, এই সময়ে আমার নাম ছিল। এমনি খেলায় একবার বল ধরিতে গিয়া আমি আহত হই। অসমান মাঠে উপর দিকে চাহিয়া দৌড়াইতে গিয়া হোঁচট খাইয়াছিলাম। ফলে বল পড়ার সম্ভাব্য স্থান হইতে বেশি আগাইয়া গিয়াছিলাম। তাই পিছন দিকে কাত হইয়া হাত বাড়াইয়া বল ধরিতে চেষ্টা করিয়াছিলাম। বল হাত হইতে পিছল-ফসকিয়া চোখের নিচ দিকে গালে পড়ে। মুহূর্তে গাল-চোখ ফুলিয়া বাম চোখ একদম বন্ধ হইয়া যায়। এটা ছিল একটা অ্যানুয়েল স্পোর্টসের দিন। অধ্যাপকেরাও অনেকে দর্শকরূপে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের ও বন্ধুদের সমবেত উদ্যমে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা হইয়াছিল।

কলেজের অধ্যাপকদের মধ্যে প্রিন্সিপাল ললিত চ্যাটার্জি মহাশয় ছাড়াও আরো নামকরা অনেক অধ্যাপক ছিলেন। দর্শনের অধ্যাপক উমেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, ইতিহাসের অধ্যাপক মি. পি গুপ্ত, ইংরাজির অধ্যাপক সতীশ চন্দ্র সরকার, অধ্যাপক ফণীন্দ্র নাথ রায় প্রভৃতি অনেকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইতিহাসের অধ্যাপক মি. পি গুপ্ত অধ্যাপনায় ত ভাল ছিলেনই, চেহারা-ছবি ও পোশাকেও তিনি ছিলেন একেবারে ইংরাজ। বিশেষত, তিনি ছিলেন বিখ্যাত অধ্যাপিকা তটিনী গুপ্তার স্বামী। তৎকালে সারা ভারতে এবং ভারতের বাইরেও মিসেস তটিনী গুপ্তা ছিলেন জ্ঞানে প্রতিভায় বিস্ময় ও শ্রদ্ধার পাত্রী। অধ্যাপকদের মধ্যে শ্রীযুক্ত সতীশ চন্দ্র সরকার ছিলেন শুধু জগন্নাথ কলেজের নয়, সকল কলেজ-স্কুলের ছাত্রদের এবং ঢাকাবাসী সকলের ভক্তি শ্রদ্ধার পাত্র। অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করিয়া ইনি ন্যাশনাল কলেজ ও ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুল স্থাপন করেন। কলেজটি চলে নাই। কিন্তু মেডিকেল স্কুলটি আজও আছে।

.

. ঢাকা কলেজ–এস এম হোস্টেল

১৯১৯ সালে আইএ পাশ করিয়া আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। বিশ্বযুদ্ধের দরুন পাটের দাম কিছুটা বাড়িয়া যাওয়ায় সব পাটচাষির মতই আমার বাপের আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভাল হয়। এই সুযোগে আমি এস এম হোস্টেলেই উঠি। পরবর্তী জীবনে বড় হইয়াছিলেন এমন অনেক ভাল-ভাল ছাত্রের সাথে পরিচিত হই এই হোস্টেলে। এই হোস্টেলে তখন আসাম সরকারের অন্যতম মন্ত্রী কাছাড় হাইলাকান্দিবাসী মি. আবদুল মোত্তালেব মজুমদার, ডা. কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক যহুরুল ইসলাম, হাইকোর্টের বিচারপতি মি. মোহাম্মদ ইব্রাহিম, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মি. মিজানুর রহমান, আইন পরিষদের ডি. স্পিকার মরহুম মোহাম্মদ শাহেদ আলী, আইজিআর মি. সাদেক খা, এককালীন গভর্নর রাষ্ট্রদূত মি. সুলতান উদ্দিন আহমদ, পুলিশের আইজি মি. শামসুদদোহা, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মি. আফতাঁবুদ্দিন আহমদ ও মোহাম্মদ হাসান আলী, ইনকাম ট্যাক্স অফিসার আবদুল আজীজ ডি. ম্যা. মি. আবদুল মজিদ মোল্লার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজাদ সম্পাদক মি. আবুল কালাম শামসুদ্দিনও এই হোস্টেলের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি কলিকাতা রিপন কলেজে ভর্তি হইয়া কারমাইকেল হোস্টেলের বাসিন্দা হন।

আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হইবার অল্পদিন পরেই জগন্নাথ কলেজের দর্শনের অধ্যাপক বিখ্যাত দার্শনিক, সাহিত্যিক শ্রীযুক্ত উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য মহাশয় ঢাকা কলেজের দর্শনের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। তিনি জগন্নাথ কলেজে আমাদিগকে তর্কশাস্ত্র পড়াইতেন। তর্কশাস্ত্রে আমার কৃতিত্বে সন্তুষ্ট হইয়া বিএতে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স লইবার জন্য তিনি আমাকে তখনই উপদেশ দিয়াছিলেন। তাঁর উপদেশমতই আমি দর্শনশাস্ত্রে অনার্স লইয়াছিলাম। তিনি ঢাকা কলেজে যোগ দিয়া আমাকে দর্শনের অনার্স ক্লাসে দেখিয়া খুব সন্তুষ্ট হন। ঢাকা কলেজের দর্শনের প্রধান অধ্যাপক ছিলেন তখন অধ্যাপক ল্যাংলি। তিনি পরবর্তীকলে দর্শনে পিএইচডি পাইয়াছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার হইয়াছিলেন। অধ্যাপক ল্যাংলি ও অধ্যাপক উমেশ ভট্টাচার্য আমাদের দর্শনের অনার্স ক্লাস লইতেন। আমি জগন্নাথ কলেজ হইতেই উমেশবাবুর প্রিয় পাত্র ছিলাম। ক্লাসে ও পরীক্ষায় ভাল করিয়া আমি ল্যাংলি সাহেবের প্রিয় পাত্র হইয়া উঠিলাম।

.

. খেলাধুলা

জগন্নাথ কলেজে দুই বছর ধরিয়া খেলাধুলায় যে উপাস করিয়াছিলাম, ঢাকা কলেজে সে ক্ষুধা পুরাপুরি মিটাইলাম। খেলাধুলায় আমার বরাবরই খুব বেশি ঝোঁক ছিল। ঢাকা কলেজে ও হোস্টেলে খেলার সরঞ্জাম ও মাঠের সুবিধা প্রচুর পাওয়ায় খেলার ঝোঁকও আমার বাড়িল। ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন সব রকমের খেলাতেই অংশগ্রহণ করিতাম স্কুলজীবনেই। ঢাকা কলেজে আসিয়া টেনিস ও হকি খেলার সুযোগ পাইলাম। ফুটবল, ক্রিকেটে মোটামুটি ভাল খেলোয়াড় ছিলাম বটে, কিন্তু কলেজের এগার জনের একজন কখনো ছিলাম না। কিন্তু হোস্টেলে-হোস্টেলে কম্পিটিশনের অন্যতম খেলোয়াড় ছিলাম।

এই সব খেলায় মধ্যম শ্রেণীর খেলোয়াড় হইলেও লাফালাফি দৌড়াদৌড়িতে কিন্তু প্রধানদের মধ্যে একজন ছিলাম। বস্তুত, কলেজের বার্ষিক স্পোর্টসে লং জাম্প এবং হাই জাম্পে একবার প্রথম ও আরেকবার দ্বিতীয় হইয়াছিলাম। কাজী মোতাহার হোসেন, মি. আবদুল মোত্তালেব ও আমি এই তিনজনই ছিলাম এই লাফালাফিতে শ্রেষ্ঠ। লং জাম্পে আমার ও মোত্তালেব সাহেবের মধ্যে প্রতিযোগিতা হইত, আর হাই জাম্পে কাজী। সাহেব ও আমার মধ্যে প্রতিযোগিতা হইত। আমি যে বছর লং জাম্পে প্রথম হইয়াছিলাম সেইবার আমার লাফের দৈর্ঘ্য ছিল উনিশ ফুট দুই ইঞ্চি। পরে শুনিয়াছি আমার লাফের ঐ দৈর্ঘ্য বেশ কিছুকাল রেকর্ড ছিল। লম্বা লাফে আমার এই সাফল্যের কারণ সম্বন্ধে বন্ধুরা বলিতেন যে আমি লাফ দিয়া শূন্যে উঠিয়া দুই হাতে কাক-চিলের মত ডানা মারিয়া উড়িয়া যাইতাম। কথাটা ঠিক কিনা আমি জানিতাম না। কিন্তু আমি নিজে যেটা বুঝিতাম সেটা এই যে আমি জাম্পিং গ্রাউন্ড হইতে হাওয়ায় উড়িয়া ফলিং গ্রাউন্ডে পড়িয়া যাইতাম না। শূন্যে উঠিয়া হাত-পা ও কোমরের জোরে অন্তত দুইটা ঢেক্কর মারিতাম। আমি বুঝিতাম ঐ ঢেক্করে কমসে কম দুই ফুট জায়গা আমি আগাইয়া যাইতাম।

দ্বিতীয় বছর আমার লাফের দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় ফুট কমিয়া যায়। মোত্তালেব সাহেব সেইবার ফার্স্ট হন। আমার অধঃপতনের কারণ এই যে আমি সেইবার ফুটবল খেলিতে গিয়া হাঁটু মচকাইয়া ছিলাম। সে মচকানটা এত সাংঘাতিক হইয়াছিল যে আমাকে দুই-দুইবার হাসপাতালে ভর্তি হইতে হইয়াছিল। জীবনে আর তা সারে নাই। এই বৃদ্ধ বয়সেও সেই মচকানো হাঁটু নিয়া কষ্ট পাইতেছি।

.

. গলা সাধনা

বর্তমানে তরুণ বন্ধুরা শুনিয়া তাজ্জব হইবেন যে হোস্টেলের আনন্দমেলায় আমি শুধু ফুট বাজাইতাম না, গানও গাইতাম। ছেলেবেলা হইতেই আমার গলা ভাল ছিল। খোশ কুফী ও মিসরি ইলহানে আমি ছেলেবেলা যখন কোরআন তেলাওয়াত করিতাম, তখন অনেক কারী-মৌলবীও কান পাতিয়া শুনিতেন। আমি চাচাজীর নিকট এই ইলহান শিখিয়াছিলাম। আমার খোশ ইলহান শুনিয়া দরিরামপুর মাদ্রাসার কয়েক বন্ধু আমাকে গজল শিখান। জগন্নাথ কলেজে পড়িবার সময় আমি আমিন সাহেবের নিকট বাঁশি শিখি এবং হারমোনিয়ামে সারেগামা সাধি। আমিন সাহেব অবশ্য আমাকে হুঁশিয়ার করিয়া দিয়াছিলেন যে, গানের গলা রাখিতে গেলে আমাকে বাঁশি ছাড়িতে হইবে। আমি তা ছাড়ি নাই। ফুট, বাঁশি ও আড়বাঁশি বাজানো আমার একটা নেশা হইয়া গিয়াছিল। তাতে খুব দ্রুতগতিতে আমার গলা পড়িয়া যায়। বর্তমানে আমার গলা শুধু বেসুরা বা হোর্স হইয়াই যায় নাই; উদারার সপ্তগ্রামের প্রথম দুইটা ঘাট সা এবং রে একদম বন্ধ হইয়া গিয়াছে। ফলে বক্তৃতায়, এমনকি সাধারণ বৈঠকি আলাপেও নিম্ন গ্রামে আমার কথা মিলাইয়া বা ফেড আউট করিয়া যায়। ফলে জোর দিয়া কথা বাহির করিতে হয়। এক বন্ধুর এবং অনেকের ধারণা আমি চিল্লাইয়া কথা বলি। যারা জানেন না, তাঁরা ভাবেন আমি রাগ করিয়াছি।

.

১০. মধ্যম রকমের ভাল ছাত্র

ছাত্র হিসাবে আমি মধ্যম শ্রেণীর ভাল ছাত্র ছিলাম। প্রথম শ্রেণীর প্রতিভাধর ছিলাম না। ইউনিভার্সিটিতে নাম করিবার মত কিছু ছিল না। তবু যতটুকু পারিতাম সাহিত্য ও রাজনীতি আমাকে তা-ও করিতে দেয় নাই। আমি দিবারাত্র আউট বই লইয়া থাকিতাম। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা ছাত্রদের অনেকেই আউট বই পড়িয়াও পরীক্ষায় নাম করিয়াছেন। কাজেই শুধু আউট বই পড়াকেই আমার পরীক্ষার ভাল না করার জন্য দোষী করা যায় না। কিন্তু আমি ছিলাম একদম ‘হোল-হগার ওয়ান ট্র্যাক মাইন্ড’ যাকে বলে একরুখা। যখন যেটা ধরিতাম, সেটার শেষ না দেখিয়া ছাড়িতাম না। অনার্স নিয়াছি দর্শনে, কলেজ লাইব্রেরিতে রিসার্চ শুরু করিলাম ইতিহাসে। এক বই-এ আরেক বইয়ের রেফারেন্স পাইয়া সেই বই ধরিতাম। সেটা হইতে আরেকটা। এইভাবে দিনের পর দিন ও সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটাইয়া দিতাম। দর্শনে অনার্সের ছাত্রকে যদি রিসার্চ করিতে হয় তবে দর্শনেই করা দরকার। এ উপদেশ কেউ যদি দিতেন এবং সেটা যদি আমি পালন করিতে যাইতাম তবে সে পথেও শেষ দেখিতে চাইতাম। আমাদের পাঠ্যবইয়ে কান্ট, হেগেল, কোতে, ডেকার্টে, স্পিনোজা, মিলের কোটেশনে সন্তুষ্ট থাকিতাম না। তাদের মূল বই দেখিতে চাইতাম। এবং একটা খুলিয়া দশটায় জড়াইয়া পড়িতাম। ফলে আমি বোধ হয় পরীক্ষার পাশের দিক হইতে চিনিখোরের জায়গায় চিনির বলদ হইয়া গেলাম। সহপাঠীর নজরে পণ্ডিত হইয়া উঠিলাম; কিন্তু শিক্ষক ও পরীক্ষকদের কাছে মূর্খই রহিলাম।

.

১১. ল্যাংলি সাহেবের শেষ উপদেশ

এর উপর বিএ পরীক্ষার কয়েস মাস আগে হইতেই খিলাফত ও নন্‌কো আন্দোলনে মাতিয়া উঠিলাম। ইব্রাহিম সাহেব এই আন্দোলনে আমাদের নেতা। তার এবং বরিশালে আবুল কাসেম নামে এক সহপাঠীর প্রেরণায় খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিলাম। এবং বিএ পরীক্ষা দিব না বলিয়া হোস্টেল ছাড়িয়া বাড়ি চলিয়া গেলাম। ল্যাংলি সাহেব আমাকে সত্যই স্নেহ করিতেন। তিনি আমাকে তার সাথে দেখা করিবার জন্য বাড়ির ঠিকানায় পত্র দিলেন। আমি তাঁর আদেশ পালন করিলাম। তার সাথে দেখা করিলাম। তিনি আমাকে পরীক্ষাটা দিতে অনুরোধ করিলেন। আমি প্রস্তুতির অভাবের অজুহাত দিলাম। তিনি আমার সব কথা শুনিয়া বলিলেন : ‘পরীক্ষাটা তুমি দাও। অনার্স যদি নাও পাও পরীক্ষায় তুমি ফেল করিবে না। গ্র্যাজুয়েটটা ত হইয়া থাক, স্বরাজ হইলেও ওটা কাজে লাগিবে।’

আমি পরীক্ষা দিলাম। অনার্স পাইলাম না। পাশ করিলাম। পরীক্ষার ফল বাহির হইবার পর আবার ল্যাংলি সাহেব আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। দেখা করিলাম। অনার্স না পাওয়ায় তিনি আমার জন্য দুঃখ প্রকাশ করিলেন। তিনি বলিলেন, অনার্স না পাওয়ার সম্ভাবনার কথা তিনি বলিয়াছিলেন বটে কিন্তু সত্য-সত্যই তাই ঘটিবে এটা তিনি বিশ্বাস করিতেন না। আমি অনার্স না পাওয়ায় তিনি বিস্মিত হইয়াছেন। এই বদনাম লইয়া আমার কলেজ ছাড়া উচিৎ হইবে না। আমার এমএ ক্লাসে ভর্তি হওয়া উচিৎ।

তখন নয়া ঢাকা ইউনিভার্সিটির কাজ শুরু হইয়াছে। নয়া ইউনিভার্সিটিতে অনেক সুবিধা পাওয়া যাইবে বলিয়াও ল্যাংলি সাহেব আমাকে অনেক আশা ভরসা দিলেন। আলীগড় হইতে কয়েকজন ভাল ছাত্র আসিয়া এখানে ভর্তি হইয়াছেন বলিয়া তিনি তাদের সাথে আমাকে দেখা করিতেও বলিলেন।

আমি এতদিনে কংগ্রেস-খিলাফত আন্দোলনে গলা পর্যন্ত ডুবিয়া গিয়াছি। মহাত্মাজীর এক বছরে স্বরাজ পাওয়া সম্বন্ধে পূর্ণ বিশ্বাসী। সুতরাং এই কয় মাসের জন্য ইংরাজের গোলামখানায় ঢুকিতে আমি রাজি হইলাম না।

কিন্তু হোস্টেলে গেলাম। দেখিলাম আমার যেসব বন্ধু কলেজ ছাড়িয়া খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়াছিলেন, তাঁদের অনেকেই হোস্টেলে ফিরিয়া আসিয়াছেন। নূতন নামকরা এমএ ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে মি. আলতাফ হোসেনকে (পরে ডন-এর এডিটর), মি. যাকির হোসেন (পরে আইজি ও গভর্নর), মো. সিরাজুল ইসলাম (পরে জুডিশিয়াল সার্ভিস ও খান বাহাদুর) প্রভৃতি অনেকের সাথে পরিচিত হইলাম। এঁরাও আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইতে অনুরোধ করিলেন। কিন্তু আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল রহিলাম।

‘গ্র্যাজুয়েট হইয়া থাক, স্বরাজ হইলেও ওটা কাজে লাগিবে’, ল্যাংলি সাহেবের এই কথাটা কাজে লাগিবার জন্য স্বরাজপ্রাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করিতে হয় নাই। মাত্র পাঁচ বছর পরেই কাজে লাগিয়াছিল। গান্ধীজির প্রতিশ্রুতিমত এক বছরে স্বরাজ না হওয়ায় এবং ইতিমধ্যে আন্দোলনে ভাটা পড়ায়, অধিকন্তু হিন্দু-মুসলিম বিরোধ জটিল হইয়া উঠায় স্বরাজের সম্ভাবনা আরো দূরে চলিয়া যায়। আমি ১৯২৬ সালে রিপন ল কলেজে ভর্তি হইলাম। ১৯২৯ সালে ফার্স্ট ক্লাস পাইয়া ফাইনাল পাশ করিলাম।

.

১২. সমকালীন শিক্ষা কারিকুলাম

আমাদের ছাত্রজীবনে উচ্চশিক্ষা মাত্র দুই প্রকারের ছিল : আর্ট ও সায়েন্স। ডিগ্রিও ছিল দুই প্রকারের : ব্যাচেলর অব আর্টস (বিএ), ব্যাচেলার অব সায়েন্স (বিএসসি) ও মাস্টার অব আর্টস (এমএ), মাস্টার অব সায়েন্স (এমএসসি)। আজকাল আর্টস’-এর বদলে বলা হয় হিম্যানিটিস’। আর উচ্চশিক্ষার শ্ৰেণীও দুইটার স্থলে তিনটা করা হইয়াছে, বাণিজ্য যোগ করা হইয়াছে। তার উপর মেয়েদের জন্য ‘হোম ইকনমিকস’ যোগ করিয়া চারটা করা হইয়াছে। মেয়েদের হোম ইকনমিকসের মত পুরুষদের জন্য ডিগ্রি ইন এগ্রিকালচারও যোগ করা হইয়াছে। এগ্রিকালচারের কলেজ অবশ্য আগেও ছিল। কিন্তু গোটা উপমহাদেশে ছিল মাত্র একটা। এখন বাংলাদেশেই একটা এগ্রিকালচারের ইউনিভার্সিটি করা হইয়াছে।

এসব সংস্কার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ঠিকই হইয়াছে। যেসব দেশ শিক্ষা সভ্যতায় আমাদের দেশের চেয়ে অগ্রগামী, তাদের অভিজ্ঞতার আলোকেই এসব হইয়াছে এবং আমরা তাদের অনুসরণ করিয়াছি মাত্র। ধরুন, আর্টসের জায়গায় হিউম্যানিটিসের প্রবর্তন। আগেরটাও যেমন ঠিক ছিল না, পরেরটাও তেমনি ঠিক নয়। আর্ট’-কেও যেমন আমরা শিল্প, কারিগরি বা দক্ষতা ইত্যাদি রূপে বাংলায় তর্জমা করিতে পারিতাম না, এখনকারটাকেও আমার মানবিকতায় তর্জমা করিতে পারি না। তবু আমরা নিঃশঙ্কচিত্তে যেমন আগেরটা ব্যবহার করিয়াছি, এখনকারটাও তেমনি নিঃশঙ্কচিত্তেই ব্যবহার করিতেছি। ব্যাচেলার কথাটাকে ‘অবিবাহিত পুরুষ’ তর্জমা করিতে পারি নাই। আজও পারি না। তবু ডিগ্রিটার নাম ‘ব্যাচেলার আগেও বলিয়াছি এখনও বলিতেছি। বলিতেছি এইজন্য যে আসলে এসব শব্দের দ্বারা আমরা কী বুঝাইতে চাই, তা যতই আর্বিট্রারি বা অযৌক্তিক হউক, সকলে একই রকম বুঝিয়া থাকি। ব্যস, তাতেই কাজ হইল। উন্নততর, মানে অধিকতর স্পষ্ট অর্থজ্ঞাপক, শব্দের অনুসন্ধান করিতে গেলে অধিকতর জটিলতার সম্মুখীন হইব বলিয়াই আমরা অনুকরণযোগ্য ভদ্রলোকদের অনুকরণ করি। কিন্তু বিষয়-বস্তুর পরিবর্ধন বিস্তৃতিকরণ এবং তদনুসারে ডিগ্রির সংখ্যা বৃদ্ধিটা তেমন অযৌক্তিক বা অনাবশ্যক নয়। আমাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের এলাকা, আয়তনক্ষেত্র, অঞ্চল ও পরিমণ্ডল সম্বন্ধে আমাদের ধারণা ও জ্ঞান যতই অধিক ও ব্যাপক হইতেছে, উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি সংখ্যাও ততই বাড়িবে এটা খুবই স্বাভাবিক। একই শিক্ষার্থীর পক্ষে এই পরিমণ্ডলের সব জ্ঞানের বোঝা একই সঙ্গে একই মস্তকে বহন করা কঠিন বলিয়া জ্ঞানের ক্ষেত্রকে খণ্ড খণ্ড করিয়া এক এক বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিশেষজ্ঞ তৈয়ার করার ব্যবস্থার উদ্দেশ্যটাও সাধু ও বাস্তবধর্মী। সুখের বিষয় বর্তমানের শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ক্রমে শিক্ষানীতি ও কারিকুলামে এই বাঞ্ছিত পরিবর্তন প্রবর্তন করিতেছেন।

.

১৩. শিক্ষাজীবনের শেষ নাই

এইভাবে প্রথমে ১৯২১ সালে এবং দ্বিতীয় বারে ১৯২৯ সালে আমার ছাত্রজীবন শেষ হয়। কিন্তু আমার শিক্ষাজীবনও কি ঐ সঙ্গে শেষ হইয়াছিল? এই অধ্যায়ের শিরোনাম, আমার শিক্ষাজীবন। কাজেই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় : কলেজ-ভার্সিটি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কি মানুষের শিক্ষাজীবন শেষ হয়? এটা বড় প্রশ্ন। শাশ্বত সনাতন প্রশ্ন। যুগে যুগে এ প্রশ্ন উঠিয়াছে। শিক্ষাবিদেরাও বলিয়াছেন, মানুষের শিক্ষাজীবন কখনও শেষ হয় না। কথাটা কি সত্য? সত্য হইলেও কত জনের জন্য, কার কার জন্য সত্য? কীভাবে সত্য? আমরা প্রায়শ দেখি, দর্শনশাস্ত্রে এমএ পাশ করিয়া আমাদের কত তরুণ ব্যাংকের কেরানি বা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরি চাকরি গ্রহণ করিয়াছেন। তাঁদের কি শিক্ষাজীবনের নিরবচ্ছিন্নতা বা ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রহিয়াছে। ব্যাংকের কেরানি প্রৌঢ় বয়সে যখন ম্যানেজার হইয়া সাব-ইন্সপেক্টর যখন ডিএসপি হইয়া রিটায়ার করেন, তখন তাদের দর্শনশাস্ত্রে না হউক, আর কোন শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি বাড়িয়াছে? বয়সের অভিজ্ঞতা লাভ তাঁরা করিয়াছেন নিশ্চয়ই এবং সেটা হইয়াও থাকিতে পারে বিপুল উভয়ের বেলাতেই। কিন্তু অধ্যয়নের শিক্ষাও হইয়াছে কি? ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে, তা হয় নাই। সত্য কথা এই যে কলেজজীবন শেষ করিয়া কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিবার পর শিক্ষাজীবনের নিরবচ্ছিন্নতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ঘটিয়া থাকে আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের খুব কম লোকের ভাগ্যেই। বরঞ্চ উল্টাটাই সত্য সংসার-জীবনে ঢুকিয়া কলেজে-ভার্সিটিতে অর্জিত বিদ্যা ভুলিয়া যাওয়াই আমাদের দেশের সাধারণ নিয়ম। জ্ঞান অর্জনের জন্য বই-পুস্তক পড়া ত দূরের কথা, আনন্দের জন্য বই পড়ার অভ্যাসও এদেশে খুবই কম।

সুখের বিষয় এর ব্যতিক্রম আছে। আমি গৌরবের সাথে ঘোষণা করিতেছি যে এই ব্যতিক্রমের মধ্যে আমিও একজন। পড়িবার আগ্রহ আমার ছেলেবেলার মতই তীব্র রহিয়াছে। শুধু তা-ই নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে খিদা যেন আরো বাড়িয়াছে। ছাত্রজীবনের পনের-ষোল বছরে যত বই-পুস্তক পড়িয়াছি, পরবর্তী ষাট বছরে তার চার গুণেরও অনেক বেশি পড়িয়াছি। কাজেই আমি দাবি করিতে পারি যে আমার শিক্ষাজীবন। নিরবচ্ছিন্নভাবে আজও চলিতেছে। আমি আজও ছাত্র। গুরুতর অসুখ ছাড়া অন্য কোনও কারণেই আমার এই ছাত্রজীবনে ছেদ পড়ে নাই। এমনকি কঠিন অসুখেও রোগ মুক্তির পর স্বাস্থ্য লাভের মুদ্দতে বিছানায় শুইয়া বসিয়া কাটাইবার সময়টাও আমি বই-পুস্তক পড়িয়াই কাটাইয়াছি। জেল খাঁটিতে গিয়াও আমার অধ্যয়ন বন্ধ হয় নাই। বরঞ্চ এ সময় আরো বেশি পড়িয়াছি। আমার অধ্যয়নের এলাকা খুবই বিস্তৃত, এমনকি দেওয়ালহীন ছিল বটে এবং আমি সকল শ্রেণীর বই পড়িতাম সত্য, আমার পাঠ্য তালিকায় নাটক, নভেল, কাব্য-কবিতা, মিস্ত্রি-ডিটেকটিভ, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, ভাল-মন্দ, শ্লীল-অশ্লীল এমনকি স্কুল-কলেজের আধুনিক পাঠ্যপুস্তকও ছিল বটে, সব রকমের বই ছিল ঠিক, কিন্তু ফিলসফি, মেটাফিজিকস, পলিটিক্যাল সায়েন্স, ধর্মালোচনা (বিশেষত কোরআন, গীতা, বাইবেল সম্বন্ধে) প্রবন্ধই আমি বেশি পড়িয়াছি। ইতিহাসের প্রতিও আমার আকর্ষণ স্কুল-কলেজজীবন হইতেই ছিল। আজও আছে। টয়েনবি, রাসেল ও শ’র বহু বই পড়িয়াছি। কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটাল আমি একাধিকবার পড়িবার ও বুঝিবার চেষ্টা করিয়াছি। লেনিন ও মাও-এরও অনেকগুলি বই পড়িয়াছি। এসবের বেশির ভাগ পড়িয়াছি স্কুল কলেজজীবনের অবসানের পরে; পারিবারিক জীবনের ঝামেলার মধ্যে; রাজনৈতিক জীবনের হট্টগোলের মধ্যেও।

এসবই পড়িয়াছি জ্ঞান লাভের, মানে শিক্ষিত হইবার আশায়। জ্ঞান লাভও যথেষ্ট করিয়াছি। যথেষ্ট করিয়াছি বলিতেছি এইজন্য যে আমি নিজেই বুঝিতেছি প্রতিদিনই আমি কিছু না-কিছু নূতন জ্ঞান লাভ করিতেছি, নূতন সত্যের সন্ধান পাইতেছি। কাল যা জানিতাম না, আজ তা জানিয়াছি। এর যেন শেষ নাই। জ্ঞান লাভের যেন বিরতি বা বাউন্ডারি নাই। এমনকি নিছক আনন্দের জন্য শুধু সময় কাটাইবার জন্য যেসব মিস্ত্রি ও ডিটেকটিভ গল্প পড়িয়াছি, তাতেও প্রচুর জ্ঞান লাভ করিয়াছি। এসব বিষয়ে ইংলন্ড, আমেরিকার জনপ্রিয় যেসব গল্পকারের বই ও রুশ, ফরাসি যেসব বইয়ের ইংরাজি অনুবাদ পড়িয়াছি, তারও কোনও হিসাব নাই। সত্য-সত্যই অসংখ্য হইবে। অশ্লীল বলিয়া নিন্দিত যৌন-বিজ্ঞানের বই এবং সত্য-সত্যই নিন্দার যোগ্য এ সম্পর্কিত অবৈজ্ঞানিক বইও কম পড়ি নাই। কিন্তু শিক্ষা লাভ করিয়াছি আমি সবগুলি থনেই।

বই-পুস্তক কিনিয়াছি আমি অনেক। এ বিষয়ে সাধ্যানুসারে পয়সা খরচ। করিয়াছি ত নিশ্চয়ই। সাধ্যের অতীতও অনেক খরচ করিয়াছি। কিন্তু আমার মত রাক্ষস পাঠকের বই নিজে কিনিয়া পড়িবার সাধ্য খুব কম লোকেরই থাকে। আমার ত কোনও দিনই ছিল না। সেজন্য পরিচিত বন্ধুবান্ধবের নিকট ধার করিয়া অথবা কোনো লাইব্রেরিতে গিয়া পড়িতে হইয়াছে। বই পড়িয়া জ্ঞান লাভের একটা তৃপ্তি ত আছেই। তা ছাড়া বইয়ের মালিক হওয়ার আনন্দও কম নয়। কলিকাতা থাকিতে আমি ইমপেরিয়াল (বর্তমান ন্যাশনাল) লাইব্রেরিতে বসিয়া অনেক বই পড়িয়াছি। বর্তমানে ইউএসআইএসও বৃটিশ কাউন্সিল হইতে আনাইয়া অনেক বই পড়িয়াছি। বইয়ের মালিক হওয়ার জন্য কলিকাতায় প্রায় ত্রিশ বছরের জীবনে কলেজ স্কোয়ারের সেকেন্ড হ্যান্ড। পুস্তকের দোকানদার ও ফুটপাতের পুরান পুস্তক বিক্রেতাদেরও কম ঘাটাই নাই। বস্তুত আমার খরিদা পুস্তকগুলির মধ্যে অর্ধেকের বেশিই সেকেন্ড। হ্যান্ড। আমার ছেলেরা ও বউয়েরা সবাই পুস্তক কিনিয়া টাকা খরচ করিয়া থাকে। তারা অবশ্য নূতন পুস্তকই কিনিয়া থাকে। এদের কিনা বইয়ের রেঞ্জও খুব বিস্তৃত। বর্তমানে এদের কিনা বই-ই আমি বেশি পড়িয়া থাকি। আমার নিজের বই কিনার সামর্থও নাই, দরকারও পড়ে না।

কলিকাতায় কিনা বইগুলির অধিকাংশই ফেলিয়া আসিতে হইয়াছিল। তবু ছেলে ও বউদের বই-পুস্তক লইয়া আমার বাড়ির লাইব্রেরি মোটামুটি বেশ বড়। অবশ্য আমার সংগ্রহের মধ্যে আইন পুস্তকই বেশি।

আমার ছেলে-বউদের কিনা বই প্রায়ই অবশ্য তাদের নিজ নিজ সাবজেক্টের বই : কেউ ইকনমিকস, কেউ সাইকলযি, কেউ ফিলসফি, কেউ থিওলজি, আর কেউ বাংলা। সব বিষয়েই তারা ডিগ্রি লাভ করিয়াছে। কিন্তু ঐ সাবজেক্টের টেক্সট বুক ছাড়াও অনেকগুলি ইংরাজি নাটক, নভেল ও মিস্ত্রি বই তারা কিনিয়াছে ও কিনিয়া থাকে। ও সবই এখন আমার এই অবসরজীবনের প্রধান খোরাকি।

কেউ কেউ আছেন যারা বই পড়েন, কিন্তু কিনেন না। আবার কেউ কেউ আছেন বই কিনেন, পড়েন না। প্রথম শ্রেণীর লোকেরা পরের বই একবার হাতাইতে পারিলে আর ফেরত দেন না। দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা বৈঠকখানা সাজাইবার জন্য বুক কেস করেন। এই উভয় শ্রেণীর লোকই মন্দের ভাল। পরের বই নিয়া যদি পড়েন এবং পড়ার পরে যদি ফেরত নাও দেন তবু ভাল। পড়িলেন ত। দেশের জন্য এটাই লাভ আর যারা বই কিনিয়া লাইব্রেরি সাজান, পড়েন না, তাঁরাও ভাল যদি তারা অপরকে সে বই পড়িতে দেন। আগের দিন জমিদাররা বই কিনিয়া বড় বড় লাইব্রেরি সাজাইতেন, নিজেরা খুব কমই পড়িতেন। কিন্তু অপরকে তাঁরা পড়িতে দিতেন। ময়মনসিংহ জিলার জমিদারদের অনেকেরই ভাল ভাল লাইব্রেরি ছিল। সেখান হইতে আমি অনেক বই পড়িতে পাইয়াছি।

এতএব বই পড়ার সাধ, মানে জ্ঞান লাভের খিদা, আমার আজও মিটে নাই। কাজেই এই পঁচাত্তর বছর বয়সেও আমার শিক্ষাজীবন শেষ হয় নাই। ফলে আমার আত্মকথার এই অধ্যায় অসমাপ্তই রহিয়া গেল।

 

তৃতীয় খণ্ড – ধর্ম-জীবন

অধ্যায় সাত – গোঁড়ামির পরিবেশ

১. নফলিয়াতের পাবন্দি

ফরাযী পরিবারের আনুষ্ঠানিক ধার্মিকতার পরিবেশে আমার জন্ম। বুদ্ধি হওয়ার সাথে সাথেই দেখিয়াছি নামাজ-রোযার ধুম। সুরুজ উঠার দুই ঘণ্টা আগেই দাদাজী খোশ ইলহানে বুলন্দ আওয়াজে আযান দিতেন। তাঁর আযান আশেপাশের দু-চার গ্রামের লোক শুনিতে পাইত। লোকেরা বলাবলি করিত : ফরাযী সাবের আযানই আমাগর ঘড়ি। দাদাজীর আযানে আমাদের বাড়ির সকলেই জাগিয়া উঠিতেন। পুরুষরা সকলে বাহির বাড়ির মসজিদে (তকালে কাঁচা ভিটি টিনের ঘর) জমাতে নামাজ পড়িতেন। প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা সকালে উঠিতেন, তাঁরাও এই জমাতে শামিল হইতেন। আমাদের চাকরদের মধ্যে যারা রাত্রে আমাদের বাড়িতে থাকিত তারাও নামাজ পড়িতে বাধ্য ছিল এবং ফযরের নামাজে জমাতে শামিল হইত। মোট কথা আল্লার ভয়ে না হউক, দাদাজীর ভয়ে আমাদের বাড়ির সবাই নামাজি ছিলেন।

বাড়ির ভিতরের মেয়েরা সকলে পাক্কা নামাজি ছিলেন। মেয়েলোক অর্থে দাদি, ফুফু, মা ও চাচি। এ ছাড়া গুলের মা নাম্নী এক চাকরানি ও তার মেয়ে গুলজান। এরাও সকলেই আওয়াল-ওয়াকতে ফযরের নামাজ পড়িত।

এ অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে আমার পূর্বপুরুষেরাই সকলের আগে শিরা কবুল’ করিয়াছিলেন, এ কথা আমি এই পুস্তকের পয়লা অধ্যায়েই বলিয়াছি। ‘পয়লা শরা কবুল করার মধ্যে যেমন একটা গৌরব বোধ আছে, তেমনি একটা দায়িত্ববোধও আছে। আমি ছেলেবেলায় দেখিয়াছি, আমার মুরুব্বিদের মধ্যে এই গৌরববোধটা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল; কিন্তু দায়িত্ব বোধটা প্রতিবেশীরা এবং বাইরের লোকেরা স্মরণ করাইয়া দিতেন। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যারা রোযা-নামাজে নিজেরা গাফেল ছিলেন, তাঁরাও ফরাযী পরিবারের লোকদের নামাজ-রোযার গাফলতি সহ্য করিতেন না। যেসব আমোদ-প্রমোদ, গান-বাজনা, যাত্রাপার্টি ও পূজা-মেলায় আমার সহপাঠী ও সমবয়সীরা অবাধে যাইত, সে সবে আমি ও আমার ভাইয়েরা গেলে তারাই আপত্তি করিত। এমনকি ঐ সব গান-বাজনার আয়োজনকারী হিন্দুরা ও আমাদের শিক্ষকেরাও আর সকলকে বাদ দিয়া শুধু আমাদেরে বলিতেন : “তোমরা ফরাযী বাড়ির লোক। তোমাদের এসবে আসা উচিৎ নয়।

এই পরিবেশে আমাদের মুরুব্বিদের বাড়ির বাহিরের পুরুষদের, অন্দরের মেয়েলোকদের এবং আমরা মকতব-পাঠশালার পড়ুয়াদের কারো পক্ষে নামাজ-রোযায় ও শরিয়তের অপরাপর আইকাম-আরকানে গাফলতি করার উপায় ছিল না। এ অবস্থায় আমাদের অজ্ঞাতসারেই আমরা বাধ্য হইয়াই মুসল্লি-মুত্তাকি অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক ধার্মিকরূপে গড়িয়া উঠিয়াছিলাম।

কাজেই জ্ঞান হইয়াছে অবধি আমি আমাদের বাড়িতে নামাজের ধুম দেখিতেছি। আর রোযা? পুরুষরা সবাই বছরে একবার রমযানের এক মাস মাত্র রোযা রাখিতেন। এ ছাড়া দাদাজীকে মাঝে মাঝে কোনও বিশেষ উপলক্ষে রোযা রাখিতে দেখিয়াছি। কিন্তু বাড়ির মেয়েদের যেন রোযার আর শেষ নাই। রমযানের পরে শওয়ালের ছয়টি সাক্ষী রোযা’ মাসে মাসে আইয়াম-বাজের রোযা, আশুরার রোযা, শবে বরাত ও শবে মেরাযের রোযা ইত্যাদি কত কী? মেয়েদের মধ্যে আবার মা সকলকে ছাড়াইয়া যাইতেন। বরকত ও ফজিলতের যতগুলি নফল রোযা আছে সেগুলি ত তিনি রাখিতেনই, তার উপর তিনি প্রায় সারা বছরই সদুকার রোযা ও কাফুরার রোযা রাখিতেন। শ্বশুর-শাশুড়ি, বাপ-মা, স্বামী-পুত্র, ভাই-ভগিনী অথবা নিকট আত্মীয় কারো অসুখ-বিসুখ হইলে, অমনি মা তার রোগমুক্তির জন্য তিনটা রোযা, সদকা মানিয়া বসিতেন। খোদার ফজলে মার উপরোক্ত শ্রেণীর লোকের অভাব ছিল না তাদের কারো না কারো অসুখ-বিসুখ একটু-না-একটু হইতই। সুতরাং মার সদকার রোযা যোগাড় করিতে হইত না। যদি সৌভাগ্যবশত কোনো বছর এতগুলি আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কারোই কোনও অসুখ-বিসুখ না হইত এবং তার ফলে মার সদকার রোযার অভাব হইত, তবু তাঁকে রোযা রাখা হইতে মহরুম করিবার উপায় ছিল না। সে অবস্থায় তিনি কাফফারার রোযা রাখিতেন। আমি খুব ত্যক্ত-বিরক্ত হইতাম। কারণ দিনের বেলা মাকে খাইতে দেখা এবং তাঁর হাতের ‘লুকমা’ বা ‘নওলা’ খাওয়া আমার ভারি শখের জিনিস ছিল। তাই মাকে প্রশ্ন করিতাম : এটা আবার কিসের রোযা? তিনি বলিতেন, আমরা দিন-রাত অজানাভাবে কত আয়েব কসুর গোনা-খাতা করিতেছি, তার হিসাব নাই। আমাদের বরাতে যে বালা মুসিবত হইয়া থাকে, তা এইসব গোনা-খাতার জন্যই হইয়া থাকে। তিনি রোযা করিয়া সেইসব গোনা-খাতা আল্লার দরগায় মাফ নিতেছেন এবং ঐ সব বালা-মুসিবতের রাস্তা বন্ধ করিতেছেন। মোট কথা রোযা রাখা মার একটা নেশা ছিল এবং শেষ পর্যন্ত ওটা তার স্বভাবে পরিণত হইয়াছিল। দিনের বেলা কিছু খাওয়া তার সহ্য হইত না। জীবনের শেষ পনের-বিশ বছর তিনি বছরের নিষিদ্ধ ছয় দিন বাদে সারা বছরই রোযা রাখিতেন।

যা হোক রোযা-নামাজের এই ধুম ছাড়া বাহির বাড়ির আটচালা টিনের ঘরে চাচাজীর মাদ্রাসা বসিত। তাতে সকাল-সন্ধ্যায় আরবি-ফারসি পড়া হইত। তাছাড়া বার মাসই মুনশী-মৌলবী, আত্মীয়-স্বজন এবং বিদেশি আলেম-মুসাফিরের সমাগম থাকিত। এঁরা প্রায় সব সময় মসলা-মসায়েলের আলোচনা ও বাহাস-মুবাহেসা করিতেন। প্রায় মাসে মাসেই বাহির বাড়ির উঠানে ওয়াযের মজলিস বসিত।

.

. শৈশবের বাড়াবাড়ি

এই পরিবেশে অন্য সহোদরদের সাথে আমিও খুব মুসল্লি-মোত্তাকি হইয়া উঠিলাম। বরঞ্চ আমি সকলের চেয়ে বেশিই হইলাম। পাঁচ বছর বয়সে মতন কোরআন শরিফ খতম করিলাম। ঐ বয়সেই পাঁচ ওয়াকত নামাজ নিয়মিত পড়িতে লাগিলাম। এ ছাড়া মার জায়নামাজে তার পাশে বসিয়া তার দেখাদেখি এবাদত করিতাম। কী এবাদত করিতাম, তা নিজেই জানিতাম না। কখনও মার তসবিহ ছড়া নাড়িয়া, কখনও ডান হাতের আঙুল টিপিয়া এবং কখনো সিন্দা করিয়া মার অনুকরণ করিতাম। এতে মা অসন্তুষ্ট হইতেন না। বরঞ্চ দোওয়া তসবিহ শিখাইবার চেষ্টা করিতেন।

সাত বছর বয়সে সর্বপ্রথম পুরা ত্রিশটা রমযানের রোযা রাখিলাম। নয় বছর বয়সে বাড়ির মাদ্রাসায় জমাতে নহম ও পাঠশালায় দ্বিতীয় শ্রেণী পাশ করিয়া ফেলিলাম। তাতে উর্দু ফেকায়ে-মোহাম্মদী, রাহে-নাজাত, মেফতাহুল জান্নাত ও বাংলা নিয়ামতে-দুনিয়া ও আখেরাত এবং নক্‌শে-সুলেমানী পড়িয়া একরূপ মুখস্থ করিয়া ফেলিলাম। এইসব কেতাবের উপদেশসমূহের শিশুসুলভ আজগুবি অর্থ করিয়া সেসব উপদেশ গোপনে আমল করিতে লাগিলাম। এই সব আমলের দুই-একটা এইরূপ : প্রতি রেকাতে একবার সুরা ফাতেহার পর তিনবার সুরা কওসর অথবা সুরা এখলাস পড়িয়া একশ রেকাত নামাজ পড়িতাম। প্রতি দুই রেকাত অন্তর সালাম ফিরাইতাম এবং একশ বার সোবহানাল্লা পড়িতাম। প্রায় প্রতি রাত্রেই এই নামাজ শুরু করিতাম বটে কিন্তু খুব কম রাত্রেই পুরা করিতে পারিতাম। দশা বিশ রেকাত পড়িতেই মা বা বাপজী জাগিয়া উঠিতেন। আমিও নামাজ বন্ধ করিতাম। কিন্তু তারা কোনো দিন আমাকে তষিহ করিতেন না। বরঞ্চ মা এটা পছন্দই করিতেন। পড়ার জন্য বাড়ি ছাড়ার পূর্ব পর্যন্ত আমি বাবা-মার সঙ্গেই থাকিতাম। তাঁদেরে গোপন করিতে গিয়া আমাকে বেশি রাত্রে এ নামাজ পড়িতে হইত। আমি তাদের আগেই শুইয়া পড়িতাম এবং ঘুমের ভঙ্গিতে পড়িয়া থাকিতাম। তারা দুজনে শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িলেই আমি চট করিয়া উঠিয়া পড়িতাম। অযুর দরকার হইত না; কারণ অযু করিয়াই বিছানায় আসিতাম। মার জায়নামাজটা বিছাইয়া এবাদতে লাগিয়া যাইতাম। অন্ধকারেই এটা করিতাম। কারণ বাতি জ্বালাইলে বাবা-মা টের পাইবেন, ভয় ছিল। নফল নামাজে কেরাত জোরে পড়িতে হয় না। কাজেই সেদিকে কোনও চিন্তার কারণ ছিল না।

কিন্তু আসল কথা এই যে বাবা-মা উভয়েই আমার এই গোপন এবাদতের নেশার কথা জানিতেন। যদিও আমি মনে করিতাম, তারা ঘুমাইয়া আছেন। আসলে কিন্তু তারা সজাগই থাকিতেন এবং অন্ধকারে আমার এবাদত লক্ষ করিতেন। প্রথম প্রথম উভয়েই কৌতুক বোধ করিতেন। মা পছন্দ করিতেন। কিন্তু আমার কতকগুলি জটিল রোগ দেখা দেওয়ায় তারা চিন্তিত হইলেন। শরীর আমার কোনও দিনই পুষ্ট ছিল না। এইসব রোগে আমি শুকাইয়া একেবারে কঙ্কাল হইয়া গেলাম। আমার এই এবাদতের সঙ্গে আমার রোগের সম্পর্ক আছে বলিয়া বাবা-মারও সন্দেহ হইয়াছিল। কাজেই দাদাজীর কাছে এবং আমার চিকিৎসকদের কাছে তারা আমার এই গোপন কথা প্রকাশ করিয়া দেন।

এর পর শুধু বাবা-মা নন, সমস্ত মুরুব্বিরা মিলিয়া আমাকে বুঝাইতে লাগেন, এই অল্প বয়সে নফল এবাদতের দরকার নাই। চাচাজী এক ধাপ আগাইয়া গিয়া বলিলেন : এ অবস্থায় এই বয়সে নফল এবাদতে কোনও সওয়াব ত হইবেই না, বরঞ্চ গোনা হইবে।

কিন্তু এসব কথায় আমি টলিলাম না। মুরুব্বিরা ত শুধু উপদেশ দিয়াই ক্ষান্ত হইলেন। কোনও প্রকার যবরদস্তি করিলেন না। আমার গোপন এবাদত এখন হইতে প্রকাশ্যভাবে চলিতে থাকিল।

আমার এই নফল এবাদতের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হযরত পয়গম্বর। সাহেবকে খাবে দেখা। অন্তত খাজে-খেযেরের সাক্ষাৎ পাওয়া আমার নফল এবাদতের অপর প্রধান মকসুদ ছিল। পয়গম্বর সাহেবকে খাবে দেখার জন্য নশে-সুলেমানী’ ও ‘নিয়ামতে-দুনিয়া ও আখেরাতে যতগুলি তরকিব বাতলান হইয়াছিল একটা-একটা করিয়া তার সবগুলি আমি এস্তেমাল করিতাম। কাগজের ছোট টুকরায় আরবি হরফে একশ একবার আল্লাহ লিখিয়া সেই টুকরা বালিশের নিচে লইয়া শুইতাম। যাফরানের কালিতে শাহাদত আঙুলে আরবি হরফে মোহাম্মদ লিখিয়া শুইতাম। ঘুম আসিবার আগ পর্যন্ত মনে মনে ইয়া রাহিম’ জপিতাম। এত করিয়াও কিন্তু পয়গম্বর সাহেবকে কখনো খাবে দেখিতে পাই নাই। ঐ আমলের ফলে খাজে-খেযেরের মোলাকাত পাইবার আশায় নদীর পাড় বা অন্যান্য সম্ভাব্য স্থানে একা একা ঘুরিয়া বেড়াইতাম। কিন্তু খাজে খেযেরের সাক্ষাৎ পাইলাম না। তবে খাবে খাজে-খেযেরের আনুমানিক চেহারার অর্থাৎ সাদা দাড়ি, সফেদ পোশাকের গৌরবর্ণ একজন সুফি-দরবেশকে পুনঃপুন স্বপ্নে দেখিতাম। তিনি স্বপ্নে আমাকে আরবি মুখরেজ ও তালায় শিখাইয়াছিলেন। এসব কথা আমি অন্য অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা করিয়াছি।

.

. টুপি নিষ্ঠা

এবাদত-বন্দেগিতে আমার এই ধার্মিকতা আমার পোশাক-পাতিতে প্রকট হয়। টুপি ছাড়া আমি কোথাও যাইতাম না, স্কুলে-মকতবে ত নয়ই। ক্লাসে কখনও মাথা হইতে টুপি নামাইতাম না। আমার টুপিটা ছিল লাল তুর্কি টুপি। ঐ ধরনের টুপিতে মাথায় বাতাস যাতায়াতের কোনো রাস্তা ছিল না। গরমের দিনে ঘামে মাথা ভিজিয়া যাইত। কপাল, গাল, চিপ ও ঘাড় বাইয়া ঘাম পড়িত। তবু টুপি খুলিতাম না। গ্রামের পাঠশালায় পড়িবার সময় আমাদের শিক্ষক জগদীশ বাবু কোনও দিন টুপি খুলিতে বলেন নাই। আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব ত এ জন্য দস্তুরমত আমাদের দুই ভাইয়ের তারিফই করিতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে দরিরামপুর স্কুলে ও আরো পরে শহরে মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে পড়িবার সময় হিন্দু শিক্ষক ও সহপাঠীরা অন্তত গরমের সময় টুপিটা খুলিয়া রাখিতে। পরামর্শ দিতেন। কিন্তু আমি তাদের কথা রাখিতাম না। শুধু হাসিয়া বলিতাম: ‘আমার কোনও অসুবিধা হইতেছে না। দরিরামপুর স্কুলে পড়িবার সময় স্কুলসংলগ্ন মাদ্রাসার ছাত্রদের অনেকে সর্বদা টুপি পরিত না। তা দেখাইয়া অনেক শিক্ষক ও সহপাঠী টুপি খুলিয়া মাথা ঠাণ্ডা করিতে উপদেশ দিতেন। তাদেরও আমি বলিতাম : আমার মাথা বেশ ঠাণ্ডাই আছে। আমিও আসলে ঠাণ্ডা। টুপির জন্য আমি কখনও মাথায় গরম বোধ করিতাম না।

.

. মযহাবী-বিরোধ

আমার এই ধর্মপ্রীতি অনেকবার আমাকে খুব বিপদেও ফেলিয়াছে। আমাদের পরিবার খুব গোঁড়া মোহাম্মদী। আমাদের ধনীখোলা গ্রামের বেশির ভাগ লোকই তাই। ছাত্ররাও। কিন্তু আমি ছাড়া আমাদের অঞ্চলের ছাত্রদের কোনও অসুবিধা বা বিপদ ছিল না। কারণ এরা কেউ নিজেদের মোহাম্মদীগিরি প্রদর্শন করিত না। নামাজের আহকাম-আরকানে হানাফী ও মোহাম্মদীদের মধ্যে যেসব প্রভেদ আছে, তার মধ্যে মোহাম্মদীদের বুকের উপর তহরিমা বান্ধা ও রুকুতে-রুকুতে রফাদায়েন করাই প্রধান কারণ এই দুইটাই সহনামাজিদের এবং বাহিরের দর্শকদের চোখে পড়ে। অন্যসব প্রভেদ সাধারণ। দর্শকের চোখে পড়ে না। আরেকটি বড় তফাত যা চোখে পড়ে না কানে লাগে, সেটি হইল জোরে ‘আমিন’ বলা। কেরাত জোরে না পড়িলে জোরে আমি বলিত হয় না। সুতরাং জুম্মা ও রাতের নামাজ ছাড়া এ পার্থক্য ধরা পড়ে না। আমাদের জিলায় এবং পরে জানিতে পারি, সারা দেশেই, হানাফীর অনুপাতে মোহাম্মদীর সংখ্যা অনেক কম। আমাদের ছাত্রজীবনেই আমি হানাফী মোহাম্মদীতে অনেক বাহাস-মুবাহেসা ও ঝগড়া-বিবাদ দেখিয়াছি। সুতরাং উভয় সম্প্রদায়ে বিরোধ ছিল প্রচুর। এমন বিরোধ থাকিলে ছোট দলের লোক সাধারণত একটু আত্মগোপন করিয়া চলে। বড় জমাতে বা যেখানে-সেখানে তারা ধরা দেয় না। ধরা না দেওয়ার উপায়ও খুব কঠিন ছিল না। তহরিমা বাধার সময় হাত দুইটা ঠেলিয়া একেবারে বুকের উপর না তুলিয়া সামান্য নামাইয়া বাঁধিলেই গোলমাল চুকিয়া যায়। হানাফীদের নিয়ম দুই হাত নাভির নিচে বাঁধা। কিন্তু নাভির নিচে কি উপরে, সেটা কেউ আঙুলে মাপিয়া দেখে না। কাজেই পেটের উপর বা ভুড়িতে হাত দুইটা ফেলিয়া রাখিলেই হানাফী মতে তহরিমা বাধা হইল। আর রফাদায়েনটা হাতের কবজি ভাঙ্গিয়া ইশারায় করিলে অথবা একদম না করিলেই বা কী হইল? শান্তিপ্রিয় মোহাম্মদীদের তাই করা উচিৎ। সেকালে অনেকেই তা করিত। আমি নিজে অনেক মোহাম্মদীকে হানাফীদের জমাতে ঐভাবে আত্মগোপন করিতে দেখিয়াছি। ওরা যে শুধু আমার বয়সী শিশু ছিল, তা নয়। আমাদের জমাতের দুই-একজন মুনশী মৌলবীকেও ঐভাবে আত্মগোপন করিতে দেখিয়াছি। তারা যে উদার ছিলেন, তারা যে উভয় প্রকারের আহকাম-আরকানকে জায়েজ মনে করিতেন, তা নয়। নিজেদের মধ্যে জুম্মায় বা ঈদের জমাতে এবং সভা-সমিতিতে তাদের কেউ কেউ হানাফীদিগকে হিন্দু-সে বদতর’ বলিয়া গালিও দিতেন। এরাই যখন হানাফীদের মধ্যে পড়িয়া হানাফী মতে নামাজ পড়িয়া আত্মগোপন করিতেন, তখন আমার শিশুমনও বিদ্রোহী হইয়া উঠিত। আমি বুঝিতাম, ইনারা ভয়ে আত্মগোপন করিতেছেন। এটাকে আমি কাপুরুষ বলিয়া ঘৃণা করিতাম। এই ধরনের কোনও আলেমকে যখন আমাদের বাড়িতে হানাফীদেরে নিন্দা করিতে শুনিতাম, তখন প্রকাশ্যভাবে মৌলবী সাহেবের কুকীর্তির কথা বলিয়া দিতাম।

.

. আমার একগুঁয়েমি

কাজেই কোনও অবস্থাতেই কোনো জায়গাতেই আমি নিজের মোহাম্মদীগিরি গোপন করিতাম না। বরঞ্চ ওটা যাহির করাকে আমি গৌরবের বিষয় মনে করিতাম। নামাজে বুকের উপর তহরিমা বাঁধা, তহরিমা বাঁধার আগে কান পর্যন্ত হাত না তুলিয়া কাঁধ পর্যন্ত তোলা, জোরে ‘আমিন’ কওয়া, রুকুতে যাইতে-উঠিতে রফাদায়েন করা, প্রথম রেকাত হইতে দ্বিতীয় রেকাতে উঠিবার সময় সিজদা হইতে সোজা না উঠিয়া বসিয়া উঠা, চতুর্থ বা শেষ রেকাতে আত্তাহিয়াত পড়িবার সময় বাম পা ডান পায়ের নিচে দিয়া বাহির করিয়া দেওয়া, আত্তাহিয়াত পড়িবার সময় সারাক্ষণ শাহাদত আঙুল উঁচা করিয়া রাখা ইত্যাদি কোনও খুঁটিনাটিও বাদ দিতাম না। বরঞ্চ হানাফী সহনামাজিদেরে দেখাইবার জন্য তহরিমাটা অনাবশ্যকরূপে বুকের উপরের দিকে ঠেলিয়া দিতাম। ভাবটা যেন এই : দেখ ও হানাফীগণ, আমি মোহাম্মদী, তোমাদেরে আমি ডরাই না। যা করিতে পার কর। নিজের বাড়ির জমাতে আমি যতটা জোরে ‘আমিন’ বলিতাম, হানাফীদের জমাতে তার থনে জোরে বলিতাম। উদ্দেশ্য যেন হানাফীদের কানতালি লাগাইয়া দেওয়া।

এমন যখন আমার মোহাম্মদী তেজ, ঠিক সেই সময় আমি দরিরামপুর মাইনর স্কুলে ভর্তি হইলাম এবং দুই-একদিন বাদেই জুম্মার নামাজ পড়িতে মসজিদে গেলাম। ময়মনসিংহ ত্রিশালের পাকা রাস্তায় ত্রিশাল থানা বা দরিরামপুর হাই স্কুলে পৌঁছিবার একটু আগেই রাস্তার ডান দিকে যে পাকা এক গুম্বুজের মসজিদ দেখা যায় এইটিতেই তকালেও আমরা স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্র জুম্মার নামাজ এমনকি অনেকে ওয়াকতিয়া নামাজও পড়িতাম। আসল মসজিদটি আকারে তেমন বড় না হইলেও সামনের সেহানটি খুবই কুশাদা। মসজিদের ভিতরে যত মুসল্লি ধরে, বারান্দায় ধরে তার তিন ডবল। স্কুলের হেডমৌলবী জনাব জহুরুল হক ও অন্যান্য শিক্ষক-মুদাররেসদের পিছনে পিছনে আমরা অনেক ছাত্র দল বাঁধিয়া মসজিদে আসিলাম। সামনের পুকুরে অযু করিয়া ছাত্ররা সকলে বারান্দায় দাঁড়াইলাম। শুধু মৌলবী সাহেবরা মসজিদের ভিতরে গেলেন। আর আর সাথীরা কে কোথায় দাঁড়াইল মনে নাই। কিন্তু আমরা দুই ভাই একসঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়াইলাম।

.

. প্রথম সংঘর্ষ

আমরা দুই ভাই পাক্কা মোহাম্মদী। সুতরাং বুকের উপর রাখিয়া তহরিমা বাঁধিয়াছি। এক-আধ রেকাত দাখিলুল-মসজিদ বা কাবলুল-জুম্মা বোধ হয় পড়িয়াও ফেলিয়াছি। এমন সময় একজন মোটা গলায় চিৎকার করিয়া বলিলেন : “এই বাচ্চারা, তোমরা কেমনে নামাজ পড়তেছ? তোমরা লা-মাযহাবী নাকি?’ কাকে কে এ কথা বলিতেছে, তা ভাবিবার সময় পাইলাম না। একটা লোক আসিয়া আমাদের দুই ভাইয়ের বুকে বাঁধা হাত টানিয়া নাভির নিচে নামাইয়া দিলেন। নামাজে দাঁড়াইয়া কথা বলিতে নাই। কাজেই আমরা কিছু বলিলাম না। কিন্তু লোকটি আমাদের হাত ছাড়িয়া দেওয়া মাত্র আমাদের দুই জোড়া হাত স্প্রিংয়ের মত পূর্বস্থানে বুকের উপরে উঠিয়া আসিল। লোকটি আবার আমাদের হাত নামাইয়া দিলেন। আবার আমাদের হাত উঠিয়া পড়িল।

শুনিলাম অপর দুই-একজন বলিল : ‘আহা, আপনে এটা কি করতেছেন? আমাদের আক্রমণকারী ভদ্রলোক বলিলেন : এরা লা-মযহাবী যে।

প্রতিবাদকারী বলিলেন : হোক না। ওদেরে দাখিলী সুন্নতটা শেষ করতে দেন। তারপর যা হয় বলেন।

আমরা বিনা বাধায় সুন্নত শেষ করিতে পারিলাম। কিন্তু সালাম ফেরান মাত্র লোকটি আমাদের সামনে আবার কুঁদিয়া আসিলেন। মনে হইল তিনি আমাদের দুই রেকাত দাখিলী নামাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ওত পাতিয়া পাশেই দাঁড়াইয়া ছিলেন। চিল্লাইয়া আমাদের মুখের সামনে মুষ্টিবদ্ধ হাত নাড়িয়া বলিতে লাগিলেন : তোমরা লা-মাযহাবী। তোমরা খারেজি। আমাদের মসজিদে ঢুকিয়া মসজিদ নাপাক করিয়াছ।

আমরা ভড়কাইয়া গিয়াছিলাম। কিন্তু আশেপাশের কিছু লোক আমাদের পক্ষে থাকিলেন। পক্ষে থাকিলেন মানে আমাদেরে সমর্থন করিলেন, তা নয়। ঐ লোকটি যাতে তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত আমাদের গায়ে বসাইয়া দিতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তারা আমাদের ঘিরিয়া রাখিলেন। হৈ-চৈয়ে নামাজের কাতার ভাঙ্গিয়া নামাজের জমাত জনতায় পরিণত হইল। মসজিদের ভিতর হইতে স্কুলের হেডমৌলবী ও মাদ্রাসার মুদাররেসরাও বাহির হইয়া আসিলেন। জনতার মধ্যেও আলেমে-আলেমে অনেক কথা কাটাকাটি হইল। আমাদের পরিচয় জানাজানি হইয়া গেল। দাদাজীর নাম অনেকেই জানিতেন। হেডমৌলবী সাহেবের মধ্যস্থতায় আমাদের বিনা বাধায় নামাজ পড়িতে দেওয়া হইল। আক্রমণকারী ভদ্রলোক ও তার সমর্থকেরা গোঁ গোঁৎ করিতে লাগিলেন। নামাজ শেষে হেডমৌলবী সাহেব ও অন্য মৌলবী সাহেবেরা আমাদেরে সাহস দিলেন এবং বরাবর নির্ভয়ে এই মসজিদে নামাজ পড়িতে আসিতে বলিলেন। আমরাও নির্ভয়েই সেখানে জুম্মার নামাজ পড়িতে লাগিলাম। এর পরেও আরো দুই-একবার আমাদেরে আক্রমণ করা হইয়াছে কিন্তু প্রতিবারই আক্রমণকারী ছিলেন নবাগত।

.

. মযহাবী-বিরোধের তকালীন রূপ

যে যুগের কথা আমি বলিতেছি, সে যুগে এমন ব্যবহার অন্যায়ও ছিল না। ব্যতিক্রম ছিল না। বরঞ্চ ঐটাই ছিল নিয়ম। তৎকালে হানাফী মোহাম্মদীর বিরোধ, বাহাসের সভা, সভা শেষে মারামারি এবং পরিণামে মামলা মোকদ্দমা ও জেল-জরিমানা ছিল সাধারণ ব্যাপার। আমার আয়না পুস্তকের ‘মোজাহিদিন’ গল্পটা নেহাত কাল্পনিক গল্প নয়। ঐ ধরনের বহু সভায় আমি নিজে গিয়াছি। চাচাজী এরই ধরনের বাহাসের নামে নাচিয়া উঠিতেন। উদ্যোগ-আয়োজন করিতেন। বাহাসের সভায় গিয়া আগের কাতারে বসিতেন। হানাফীদিগকে তর্কে হারাইবার উদ্দেশ্যে তিনি এ সম্পর্কে বেশ কিছু পুস্তকাদি কিনিয়াছিলেন। তার মধ্যে মওলানা আব্বাছ আলীর ফেফায়ে মোহাম্মদী ও মৌলবী এলাহী বখশের রদ্দে মোকাল্লেদিন ও দুরারায়ে মোহাম্মদী ইত্যাদির নাম আজও আমার মনে আছে। পক্ষান্তরে হানাফীদের বক্তব্য সম্বন্ধে ওয়াকেফহাল হইবার জন্য মওলানা রুহুল আমিন ও মৌলবী নঈমউদ্দিন সাহেবের রদ্দে গায়ের মোকাল্লেদিন ও রদ্দে লা-মযহাবী নামক পুস্তকও তিনি কিনিয়াছিলেন। তিনি হানাফীদের উপর এত বিরূপ ছিলেন যে তাঁদেরে বুঝাইতে গিয়া রাগের চোটে উর্দু বলিয়া ফেলিতেন। তিনি বলিতেন ‘হানাফীরা হিন্দো-সে বদতর হ্যায়। আমার মোজাহেদিন’ গল্পে উভয় পক্ষের যে সব তথাকথিত যুক্তির অবতারণা করিয়াছি, ও-সবই ঐ সময়কার বাহাসে দুই পক্ষের দেওয়া যুক্তি। যুক্তিগুলি খুবই লজিক্যাল এবং আমার এখনও মনে হয় উভয় পক্ষের কথার মধ্যেই আন্তরিকতা ছিল।

কাজেই দরিরামপুর মসজিদের কতিপয় মাতব্বর-মুসল্লি যে আমাকে হামলা করিয়াছিলেন এতে বিস্ময়েরও কিছু নাই, অন্যায়ও তারা করেন নাই। আমার মত লা-মযহাবীরা ঐ মসজিদে ঢুকিয়া উহা নাপাক করিয়াছি, এ কথা তারা ঈমানদার সাচ্চা হানাফী মুসলমান হিসাবেই বলিয়া ছিলেন। তাদের বিচারে হানাফীরাই একমাত্র খাঁটি মুসলমান। অ-হানাফীরা মুসলমানই নয়। হানাফী আলেমরা অবশ্য বলিতেন, চার মযহাবই বরহক, চারটার একটা মানিলেই সে মুসলমান হইল। কিন্তু হানাফী জনসাধারণ অতশত সূক্ষ্ম বিচারে যাইত না। অন্যতম মযহাবী দল শাফীরাও নামাজের খুঁটিনাটি আরকানে অবিকল মোহাম্মদীদের মত চলিলেও জনসাধারণ সে কথা বিচার করে না। মোট কথা, লা-মযহাবীদের নামাজ পড়া না-পড়া সমান। শুধু তা-ই নয় চাচাজীর বিচারে হানাফীরা হিন্দুদের আগেই দুযখে যাইবে। অনেক হানাফীর চোখে মোহাম্মদীদের কপালেও তাই আছে। অতএব নামাজ না পড়ো তাও ভাল, তবু অপর দলের মত পড়িও না। এ কথাটাও আমার কাল্পনিক কথা নয়। এমন ঘটনা অনেক ঘটিয়াছে। আমার শ্রদ্ধেয় বন্ধু প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ সাহেবের মুখে শোনা গল্পটাই এখন নজিরস্বরূপ উল্লেখ করিতেছি। গল্পটা এই :

.

. করটিয়ার কাহিনী

বাংলার হাতেমতায়ী করটিয়ার স্বনামধন্য জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চান মিয়া) সাহেবের পিতা হাফেয মোহাম্মদ আলী সাহেব খুব কট্টর হানাফী ছিলেন। একদা তিনি খবর পাইলেন, তাঁর প্রজাদের মধ্যে একজন লা মহাবী আছেন। তাঁর নাম ইসমাইল মুনশী। তাঁর জমিদারির পুণ্য ভূমিতে লা-মযহাবী! অমনি ইসমাইল মুনশীর তলব হইল। ইসমাইল মুনশী আসিলেন। নকিব ফুকারিল : আসামি ইসমাইল মুনশী হাজির। মুনশী সাহেব দরবারে হাজির হইয়া কুর্নিশ করিলেন। হাফেয সাহেব সিংহাসন হইতে গর্জিয়া উঠিলেন : তোমার নাম ইসমাইল?

মুনশী সাহেব আরেকটা কুর্নিশ করিয়া বলিলেন : হাঁ হুযুর।

হফেয সাহেব : তুমি আমার প্রজা?

মুনশী : জি, হুযুর।

হাফেয সাহেব : তুমি নাকি লা-মাযহাবী?

মুনশী সাহেব চোখ কপালে তুলিয়া বলিলেন : লা-মযহাবী, ওটা কি চিজ, হুযুর?

হাফেয সাহেব লোকটার অজ্ঞতায় বিস্মিত হইয়া বলিলেন : লা-মযহাবী কারে কয় তাও জান না? আরে এই যে যারগো কয় মোহাম্মদী, তুমি কি মোহাম্মদী?

মুনশী সাহেব আরো বেআক্কেল বনিয়া গেলেন। বলিলেন : মোহাম্মদী কারে কয়, তা ত জানি না হুযুর।

হাফেয সাহেব এত বড় মূর্খকে লইয়া বিপদে পড়িলেন। বলিলেন : মোহাম্মদীও জান না? আহা এই যে যারগগা রফাদানী কওয়া হয়। তুমি কি রফাদানী?

মুনশী সাহেব কুঞ্চিত করিয়া বলিলেন: রফাদানী? সে আবার কে? আমি জীবনে এর নামও ত শুনছি না, হুযুর।

হাফেয সাহেবের ধৈর্যচ্যুতি ঘটিল। তিনি বিরক্ত হইয়া শেষ চেষ্টা করিলেন। বলিলেন : রফাদানী চিন না? অই যে নামাজের মধ্যে দুই হাত এমন এমন কৈরা যারা মশা খেদায়।

হাফেয সাহেব নিজের দুহাত কাঁধ পর্যন্ত ঘন ঘন উঠাইয়া-নামাইয়া দেখাইলেন এবং বলিলেন : তুমি নামাজের মধ্যে এমন কৈরা হাত উঠাও নামাও?

মুনশী সাহেব যেন এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝিলেন। তিনি বলিলেন : নামাজের কথা কইতেছেন হুযুর। আমার চৌদ্দপুরুষে নামাজই পড়ি না হাত উঠামু কি?

হাফেয সাহেবের গম্ভীর রাগত মুখে এইবার হাসি ফুটিল। তিনি হাসি মুখে বলিলেন : ও তুমি নামাজই পড় না? ঠিক ত? কোনো দিন নামাজ পড় নাই?

মুনশী সাহেব মুখ পুছিয়া বলিলেন : না, হুযুর। হাফেয সাহেব : যাও, তুমি, খালাস।

কাহিনীটার কতখানি সত্য, আর কতখানি রং-ঢং লাগানো, তা জানিবার উপায় নাই। কিন্তু মোটামুটি সত্য এই যে হানাফী-মোহাম্মদী বিরোধ তৎকালে ঐ রকমই ছিল।

দরিরামপুরে ঐ ঘটনা ঘটার পর আমি সাবধান ত হইলামই না, বরঞ্চ আমার জিদ আরো বাড়িয়া গেল। মোহাম্মদী মতে নামাজ পড়া সহী হাদিস সেহা-সেত্তার হুকুম। সহী হাদিস মানেই পয়গম্বর সাহেবের কথা। সুতরাং ওটাই আল্লার কথা। মানুষের ডরে আল্লা-রসুলের হুকুম অমান্য করিব? আল্লাকে না ডরাইয়া মানুষকে ডরাইব? কিছুতেই না। এই মনোভাব লইয়া নিরাপদে দরিরামপুর ছাত্রজীবন কাটাইয়া দিলাম। কারণ গোড়াতে বাপ দাদার পরিচয় এবং শেষ পর্যন্ত নিজের জনপ্রিয়তা ছিল সেখানে আমার জোর। ঐ অঞ্চলের মাতব্বররা ও স্কুল কমিটির মেম্বররা সকলেই আমাকে পুত্রের স্নেহাদর দিয়াছিলেন। আমিও ওঁদের নিজের লোক হইয়া গিয়াছিলাম। কিন্তু ময়মনসিংহ শহরে সে সুবিধা ছিল না।

.

. ময়মনসিংহ শহরে সংঘর্ষ

১৯১৩ সালে ময়মনসিংহে আসিয়া আবার সেই বিপদে পড়িলাম। মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের আশেপাশে কোনো মসজিদ ছিল না। কাঁচারি মসজিদ এখনও হয় নাই। কাজেই ওয়াকতিয়া নামাজ পড়িতাম আমরা কাঁচারির শানবান্ধা ঘাটে। ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল রোড যেখানে আসিয়া ব্রহ্মপুত্র নদীর পাড়ে পড়িয়াছে ঠিক এইখানে নদীতে একটা বিশাল বাধান ঘাট ছিল। পাশে যেমন বড়; গভীরও তেমনি। একেবারে নদীর তলায় চলিয়া গিয়াছিল। ঘাটলাটি ছিল দুতলা। অর্থাৎ রাস্তা হইতে সাত-আট ধাপ নিচে নামিয়া সিঁড়ি অপেক্ষা পাশে ডবল বিশাল পাকা চত্বরে আসিতে হইত। এই চত্বরের দুই পাশে পুরাটা এবং অপর দুই পাশে সিঁড়ি বাদে বাকিটা পোড়াপিট ছিল। ঠিক যেন হেলানিয়া বেঞ্চি। এই চত্বর হইতে মূল ঘাট শুরু। অসংখ্য সিঁড়ির ধাপ পানির ভিতর ঢুকিয়া পড়িয়াছে। ঘাটের উপরেই একটা বিশাল বটগাছ। এই গাছটা ঘাটলা ঢাকা দিয়া বেশির ভাগই ছায়া-শীতল রাখিত। আজ সে ঘাটও নাই, বটগাছও নাই। যা হোক কাঁচারির লোকজন এ মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের নামাজি ছাত্ররা এখানেই যোহরের নামাজ পড়িতাম। কিন্তু জুম্মার নামাজ পড়িতে যাইতাম জিলা স্কুল মসজিদে। পরিচয়ের সুবিধার জন্য একে ঐ নামে ডাকা হইলেও জিলা স্কুলের সাথে এর কোনও সম্পর্ক নাই। জনগণের অর্থ সাহায্যে আজ এখানে তিন গুম্বুজের মসজিদ উঠিয়াছে বটে কিন্তু আমি যখনকার কথা বলিতেছি তখন এটি ছিল একটি ছোট্ট টিনের ঘর।

এই মসজিদে জুম্মা পড়িতে গিয়া প্রথম দিনই আমি বিপদে পড়িলাম। দাখিলুল মসজিদের দুই রেকাত নামাজও শেষ করিতে পারিলাম না। হৈ হৈ করিয়া দুই-তিন জন লোক আসিয়া আমাকে ঘেরিয়া একদম হেঁচকা টানে আমার তহরিমা বান্ধা হাত নামাইয়া দিল। চিল্লাইয়া বলিল : তুমি লা মাযহাবী? তোমার বাড়ি কই? কই থাক?

চার বছর আগের দরিরামপুরের ঘটনা মনে পড়িল। কিন্তু দুই-এর মধ্যে কত তফাত। সেটা ছিল বাড়ির কাছে। দুই ভাই ছিলাম। মৌলবী যহুরুল হক ছিলেন, আর বাপ-দাদাকে ওরা চিনিতেন। আর আজ? আমি একা বিদেশ বিভুই। চিনা-জানা কেউ নাই। ঘাবড়াইলাম। আল্লাকে ডাকিতে লাগিলাম।

আল্লাহ সাড়া দিলেন। একদল ছাত্রসহ একজন মাস্টার গোছের লোক ঢুকিলেন। ঢুকিয়াই ব্যাপার কী জিজ্ঞাসা করিলেন। আমার কিছু বলিতে হইল না। ওদের মুখের কথা শুনিয়াই লোকগুলিকে তিনি তম্বিহ করিতে লাগিলেন। ওদের মত সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক মনোভাবের লোকই মযহাবী বিবাদ বাধাইয়া মুসলমানদের ঐক্য নষ্ট করিতেছে; আসলে সব মযহাবই ঠিক ইত্যাদি বক্তৃতা করিলেন। কাতার ভাঙ্গিয়া মুসল্লিরা জনতায় পরিণত হইল। ভিতর হইতে মৌলবী গোছের অনেকে বাহির হইয়া আসিলেন। দেখিলাম, এই ভদ্রলোককে সবাই চিনেন। সবাই খাতির করেন। তাঁর কথায় প্রায় সবাই সায় দিলেন। আমার আততায়ী তিনজনকে এতক্ষণ যাঁরা সমর্থন করিতেছিলেন, তাঁরাও ঘুরিয়া দাঁড়াইলেন। সবাই মিলিয়া ওদেরে বকিতে লাগিলেন। ভদ্রলোকের কত প্রভাব! এক মুহূর্তে সব ওলট-পালট করিয়া দিলেন।

এতক্ষণে ভদ্রলোক আমার দিকে স্নেহ-ভরা দৃষ্টিতে চাহিলেন। হাত ধরিয়া টানিয়া আমাকে নিজের পাশে দাঁড় করাইলেন। নিজের নামাজ শুরু করিলেন। তার নিরাপদ পাশে দাঁড়াইয়া আমি নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে নামাজ পড়িলাম। ইচ্ছার বিরুদ্ধে মনে মনে সারাক্ষণ আমি আল্লার চেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা জানাইলাম এই ভদ্রলোককে।

নামাজ শেষে ভদ্রলোক আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি পরম বিনয়ের সাথে পরিচয় দিলাম। তারও পরিচয় পাইলাম। তিনি জিলা স্কুলের শিক্ষক মৌ. শেখ আবদুল মজিদ। তার নাম আমি আগে হইতেই জানিতাম। তিনি সাহিত্যিক। শিক্ষা প্রচার বা এই গোছের নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করিতেন তিনি। সারা শহরের মুসলিম ছাত্রদের তিনি ছিলেন প্রিয় ‘মজিদ সার’। মুসল্লিদের উপর প্রভাবের কারণও বুঝিলাম। সারা জিলার মুসলমানদের একচ্ছত্র নেতা উকিল পাবলিক প্রসিকিউটর (পরে খান বাহাদুর) মৌ. মোহাম্মদ ইসমাইল সাহেবের প্রিয় সহচর ছিলেন এই মজিদ স্যার। যে স্কুলেরই ছাত্র হউক, মুসলমান ছেলেরা তাঁকে এক ডাকে চিনিত। সবাই তাকে মান্য করিত এবং ভালবাসিত।

অল্পদিন মধ্যেই আমিও তার একজন ভক্ত অনুচর হইলাম। সাহিত্য সেবায় তাঁর প্রেরণা পাইয়াছিলাম অনেকখানি ত বটেই মযহাবী উদারতাও শিখিয়াছিলাম নিশ্চয়ই। কারণ কিছুদিন মধ্যেই আমি বুঝিতে পারিলাম মজিদ সারের উদারতা ও মহানুভবতার খাতিরেই বোধ হয় তহরিমা বাঁধিবার সময় হাত দুইটা বুকের উপর অতিরিক্ত মাত্রায় ঠেলিয়া উঁচায় তুলিতে গিয়া কেমন যেন বাধ-বাধ ঠেকিত। মজিদ সারের উদার হাসিমাখা মুখ আমার চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিত। হাত দুইটা যেন অবশ হইয়া বুক হইতে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামিয়া আসিত।

.

১০. দাদাজীর উদারতা

এর পরেও মজিদ সারের উদারতা ও তার কথাগুলি আমার বুকে খোঁচাইয়া চলিল। এই মযহাবী কলহ মুসলমানদের আত্মঘাতী অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং এটাতে মুসলমানরা দুর্বল হইতেছে; মজিদ সারের এই কথাটা কি সত্য নয়? চিন্তা করিতে লাগিলাম। এত দিনে মনে পড়িল দাদাজীর মুখেও যেন এই ধরনের কথা শুনিয়াছি। দাদাজী উম্মী মানুষ, লেখা-পড়া জানিতেন না। কিন্তু তিনি জ্ঞানী ছিলেন। অনেক আলেম-ওলামা ও শিক্ষিত লোকও দাদাজীর জ্ঞান বুদ্ধির তারিফ করিতেন এবং জটিল-জটিল প্রশ্নে দাদাজীর উপদেশ মানিয়া চলিতেন। মজিদ সারের মত শিক্ষিতের ভাষায় ঐ সব কথা তিনি নিশ্চিয়ই বলেন নাই। কিন্তু তিনি যা বলিতেন মজিদ সারের কথার সাথে অর্থের দিক দিয়া তার আশ্চর্য মিল আছে। কথা ছাড়াও কাজে-কর্মে দাদাজী আশ্চর্য রকম উদার ছিলেন। দাদাজীও পাক্কা মোহাম্মদী ছিলেন বটে, কিন্তু আমাদের বাড়িতে হানাফী মযহাবের বড় কোনও আলেম আসিলে তাকে জুম্মার বা ঈদের নামাজে এমামতি করিতে দিতেন। চাচাজী এতে ঘোরতর অসন্তুষ্ট হইতেন। কিন্তু দাদাজী তাঁর মত অগ্রাহ্য করিতেন। শুধু শর্ত করিতেন, হানাফী মওলানা সাহেবকে কয়েকটি ব্যাপারে মোহাম্মদী মতে নামাজ পড়াইতে হইবে শুধু মুকতাদীদের সুবিধার জন্য। যথা : সুরা ফাতেহার শেষে কেরাত শুরু করিবার আগে মুকতাদীদেরে ‘আমিন’ বলিবার সময় দিয়া অল্প দম নিতে হইবে। প্রথম রেকাত হইতে দ্বিতীয় রেকাতে উঠিবার সময় বসিয়া লইতে হইবে। ঈদের জমাতে মোহাম্মদীদের মত সাত ও পাঁচ তকবির পড়িতে হইবে। ব্যস আর কিছু না। দাদাজী স্পষ্টই বলিতেন, ঐরূপ না করিলে মুকতাদীরা অসুবিধায় পড়িবে। মুকতাদীদের অসুবিধা না হয় এমনভাবে উক্ত হানাফী মওলানা সাহেব সব আরকান হানাফী মতেই পালন করিতে পারেন। যথা : বুকের উপর হাত না বাধিয়া নাভির নিচে বাঁধা এবং রফাদায়েন না করা। এমাম এটা করিলেন কিনা, তাতে মুকতাদীদের কিছু আসে যায় না।

দাদাজীর এই উদারতার জন্য হানাফী আলেমরাও দেশে-বিদেশে দাদাজীর নাম করিতেন। অবশ্য গোঁড়া মোহাম্মদীদের কেউ কেউ বলিতেন যে দাদাজী তাঁর এক হানাফী ভাগিনা মৌলবী লোকমান আলী সাহেবের খাতিরে ও প্রভাবে এইরূপ উদারতা দেখাইতেন।

সেটা ঠিক কিনা বলা যায় না। কিন্তু মৌলবী লোকমান আলী সাহেবও, যখন আমাদের জুম্মার এমামতি করিতেন, তখন মোহাম্মদী আরকানই মানিয়া চলিতেন। এমনকি, কট্টর হানাফী হইয়াও মৌ. লোকমান আলী আমাদের ঈদের মাঠে এমামতি করিতে গিয়া বার তকবিরে নামাজ পড়াইতেন।

.

১১. গোঁড়ামি ও আদব-লেহায

আরেকটা ব্যাপারে দাদাজীর উদারতা দেখিয়া ছেলেবেলা রাগ করিতাম, একটু বড় হইয়া গৌরব করিতাম ও অনুসরণ করিতাম। ভিন গাঁয়ে একদিন হানাফী আত্মীয় বাড়িতে আমাদের বাড়ির সকলেই দাওয়াত খাইতে গিয়াছিলাম। যিয়াফতটা বোধ হয় লিল্লার যিয়াফত ছিল। বোধ হয় সেই জন্যই খাওয়ার আগে মিলাদের মহফিল হইল। যথারীতি মিলাদ পড়া হইল। যথাসময়ে সকলে কেয়ামে দাঁড়াইয়া উঠিলেন। কেয়াম করাকে মোহাম্মদীরা কবিরা গোনাহ, অনেক শেরক মনে করিয়া থাকেন। প্রধানত এই কেয়ামের জন্যই মোহাম্মদীরা মিলাদের বিরোধী। অথচ দাদাজী সকলের সাথে সাথে কেয়ামে দাঁড়াইলেন এবং পাশে বসা আমাকেও হাত ধরিয়া টানিয়া খাড়া করিলেন। অদূরে বসা চাচাজী নিরুদ্বেগে বসিয়া রহিলেন।

যিয়াফত হইতে ফিরিবার পথে এই লইয়া দাদাজী ও চাচাজীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হইয়াছিল। তার সব কথা আমার মনে নাই। কিন্তু দাদাজীর একটা কথা আজও আমার কানে বাজিতেছে। দাদাজী বলিয়াছিলেন : অন্য কারণে না হউক, আদবের খাতিরে দাঁড়ান উচিৎ। কোনও মজলিসে সবাই যখন দাঁড়াইল তখন এক-আধজনের বসিয়া থাকা বেয়াদবি।

দাদাজীর এই ধরনের উদারতার অর্থ মজিদ সারের সাথে মিশিবার পর আমার কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হইয়া উঠিল। আমি দ্বিধা-সন্দেহের মাঝে কাল কাটাইতে লাগিলাম। মজিদ সারের সংসর্গ ও আমাদের হোস্টেলের পরিবেশ আমাকে ক্রমে উদার করিয়া তুলিল। আমাদের হোস্টেলে সুপার ছিলেন তৎসময়ের জিলা স্কুলের হেডমৌলবী মৌ. আলী নেওয়াজ সাহেব। তিনি মযহাবী কলহের বিরোধী ছিলেন। তা ছাড়া আঞ্জুমনে ওলামায়ে বাঙ্গলার দুইজন খ্যাতনামা আলেম আমাদের হোস্টেলে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন। একজন মওলানা খোন্দকার আহমদ আলী আকালুবী, অপরজন মওলানা মযাফফর উদ্দিন আহমদ। মওলানা মাফর উদ্দিনের বাড়ি ছিল ঢাকায়। তিনি আঞ্জুমনের প্রচার উপলক্ষে ময়মনসিংহ আসিলে আমাদের হোস্টেলে মেহমান হইতেন। আর মওলানা আকালুবী সাহেব ময়মনসিংহ জিলার লোক। তার সাতটি শ্যালক এক সঙ্গে এই হোস্টেলে থাকিতেন। তার মধ্যে একজন পরবর্তীকালে হাইকোর্টের জজ হইয়াছিলেন। তিনি ছিলেন জাসটিস বদিউজ্জামান। যা হোক সাত শালার খাতিরেই হউক আর আঞ্জুমনের প্রচার উপলক্ষেই হউক তিনি প্রায়ই আমাদের হোস্টেলে আসিতেন। মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও মওলানা মো. আকরম খাঁ প্রভৃতি যারা আঞ্জুমনে ওলামার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন, মওলানা আকালুবী ছিলেন তাঁদের অন্যতম। হানাফী-মোহাম্মদী মযহাবী কলহ দূর করা ছিল এই আঞ্জুমনের অন্যতম উদ্দেশ্য। মওলানা আকালুবী সাহেবের নাম আমরা অনেকেই আগে হইতে জানিতাম। তাঁর শুভ জাগরণ নামক কাব্যগ্রন্থ রাজদ্রোহ অপরাধে বাযেয়াফত হওয়ায় ইতিমধ্যেই তার নাম দেশময় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। সুবক্তা হিসাবেও তাঁর খুবই খ্যাতি ছিল। তাকে চোখে দেখিয়া আরো খুশি হইলাম। দুধে আলতা গৌরবর্ণ সুডৌল চেহারা মুখ ভরা বিরাট চাপ দাড়ি, হাসি-মুখ, মিষ্ট ভাষা আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করিল। তিনি ইসলামের সৌন্দর্য বুঝাইতে গিয়া প্রসঙ্গক্রমে মযহাবী বিরোধের অযৌক্তিকতা আমাদেরে বুঝাইয়া দিলেন। তিনি নিজে মোহাম্মদী। কিন্তু তার শ্যালকরা হানাফী এই খাতিরে তিনি উদারতা প্রচার করিতেছেন বলিয়া আড়ালে সিনিয়র ছাত্ররা হাসি-তামাশা করিলেও তার যুক্তিগুলির অকাট্যতা সকলেই স্বীকার করিতেন। ফলে আমাদের হোস্টেলের ভিতরে হানাফী-মোহাম্মদী মত-বিরোধটা আস্তে আস্তে নিভিয়া গেল। তার ফলে আমার মনেও উদারতা দেখা দিল। না দিলে চলে না। কারণ সবাই উদার। আমি একা অনুদার থাকিলে কেমন দেখায়?

.

১২. মযহাবী সংকীর্ণতা মরিয়াও মরে না

আমাদের জিলায় এই মযহাবী সংকীর্ণতা কতটা কায়েমী মোকরররী হইয়াছিল, তার প্রমাণ পাইয়াছিলাম উপরোক্ত ঘটনার পঁচিশ বছর পরে ১৯৩৭ সালে। তখন কৃষক-প্রজা আন্দোলন খুব জনপ্রিয়। ময়মনসিংহ জিলা কৃষক-প্রজা সমিতি সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। আমি এই সমিতির সেক্রেটারি। জিলার প্রজা আন্দোলনের আমি নেতা। বাংলা আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ মার্টির বিরুদ্ধে নির্বাচন যুদ্ধ করিতেছি। খান বাহাদুর শরফুদ্দীন, খান বাহাদুর নূরুল আমিন প্রভৃতি বড় বড় নেতা আমাদের বিরুদ্ধ পক্ষ। গরীব কৃষক প্রজা-কর্মী লইয়া এই সব ধনী ও ক্ষমতাশালী লোকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতেছি। আমি জিলার কৃষক প্রজা পার্টির নেতা বলিয়া লীগ পার্টির সোজাসুজি আক্রমণটা আমারই বিরুদ্ধে। আমার আয়নার অনেক কপি লীগ পার্টি হইতে ক্রয় করিয়া মুসলমানদের মধ্যে বিশেষত আলেম ও পীরদের মধ্যে বিতরণ করিয়া আমাকে মুসলমান ভোটারদের কাছে অপ্রিয় করা এবং তাতে পরোক্ষভাবে কৃষক প্রজা পার্টিকে দুর্বল করাই উদ্দেশ্য। কৃষক প্রজা পার্টির কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে বহু আলেম-ওলামা ছিলেন। তাহারা স্বভাবত আমার জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ণ রাখিবার চেষ্টা করিতেন। এটা করিতে গিয়া আমাকে তারা পাক্কা মুসলমান বলিয়া চিত্রিত করিতেন এবং আয়নার লেখাগুলির ব্যাখ্যা করিয়া নির্দোষ প্রমাণ করিতেন। কিন্তু একটা ব্যাপারে তারা লা-জবাব হইতেন। আমি তখন ঘোরতর বেনামাজি ছিলাম। ঘোরতর বেনামাজি মানে আমি সভা সমিতিতেও নামাজ পড়িতাম না। বাড়িতে নামাজ পড় আর না পড় সভা সমিতিতে বিশেষত ইলেকশনী সভায় পলিটিক্যাল নামাজ পড়া পলিটিশিয়ানদের চিরদিনের নীতি। অন্তত এই কাজ করিতে আলেম বন্ধুরা অনেক দিন আমাকে পীড়াপীড়ি করিয়াছেন। আল্লার ডরেই যখন পড়ি না, তখন মানুষের ডরে পড়িব? এই বলিয়া অনেকবার মৌলবী সাহেবদেরে নিরস্ত করিলাম।

কিন্তু নান্দাইল থানার এক সভায় তা পারিলাম না। এখানে সংগ্রাম বড় কঠিন। মুসলিম লীগ প্রার্থী ডিবি চেয়ারম্যান খান বাহাদুর নূরুল আমিন। আর তার মোকাবিলায় আমাদের প্রার্থী গরীব প্রাইমারী মকতবের শিক্ষক আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী। সেদিনকার মিটিংটা হইবে নূরুল আমিন সাহেবের হোম থানা নান্দাইলের আলেম-প্রধান জায়গা শাহগঞ্জে। এই অঞ্চলের কৃষক প্রজা আন্দোলনের প্রধান নেতা মওলানা বোরহান উদ্দিন কামালপুরী আমাকে আগেই জানাইয়াছিলেন, এই একটি গ্রামেই ত্রিশজনের বেশি মাদ্রাসা-পাশ ও দেওবন্দ-পাশ মওলানা আছেন। এঁরা যেদিক সমর্থন করিবেন, নির্বাচনে তাদের জিত অবধারিত। এই মিটিংয়ের উদ্যোক্তারাও সকলেই মৌলবী-মওলানা। কাজেই এঁরা আগেই আমাকে বলিয়া রাখিয়াছিলেন, এখানকার সভায় আমাকে নামাজ পড়িতেই হইবে। নইলে নির্বাচনে আমাদের চান্স অন্ধকার।

উদ্যোক্তা মওলানা সাহেবরা আমার সম্মতির অপেক্ষা করা নিরাপদ মনে করেন নাই। আমার শাসনভার তাঁরা নিজেদের হাতেই নিয়াছিলেন। সভাস্থলে আসরের আওয়াল ওয়াকতে পৌঁছিলাম। গিয়াই দেখিলাম সভামঞ্চের অদূরে আমার অযুর জন্য এক বদনা পানি, একটা জলচৌকি ও একখানা তোয়ালিয়া রাখা হইয়াছে। প্রধান উদ্যোক্তা মওলানা সাহেবের দিকে চাহিলাম। তিনিও হাসিলেন, আমিও হাসিলাম। চোখ ইশারায় জানাজানি হইয়া গেল, আজ আর ছাড়াছাড়ি নাই। কোনও অজুহাতেরই সম্ভাবনা বা ঘেঁদা রাখা হয় নাই। তখন মোটামুটি জনতা বেশ বড় হইয়াছে। কজন আযান দিতে লাগিলেন। তিনজন মওলানা আমাকে অযু করিতে বলিয়া ঘাড়ের উপর দাঁড়াইয়া থাকিলেন যেন আমি ফাঁক পাইলেই পালাইব। আমি মোহাম্মদী কায়দায় ধীরে ধীরে অযু করিতে লাগিলাম। তাতে বেশ দেরি হইতে লাগিল। ওদিকে নামাজের কাতার খাড়া হইয়া গেল। ঐ অঞ্চলের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বজ্যেষ্ঠ আলেম এমামরূপে দাঁড়াইয়া গেলেন। আমার পাহারা-বন্ধুদের তিন-চারটা তাগাদায় আমি অবশেষে যখন অযু শেষ করিলাম, তখন নামাজ শুরু হইয়া গিয়াছে। আমরা সকলের পিছনের কাতারে দাঁড়াইলাম। মওলানা বন্ধুরা আমার দুই পাশে দাঁড়াইলেন আমি যাতে কাতার হইতে ভাগিয়া না যাই। আমি পাক্কা মোহাম্মদী কায়দায় দুই পা ফাঁক করিয়া দাঁড়াইলাম। দুই হাত চিৎ করিয়া কাঁধ পর্যন্ত তুলিলাম এবং সিনা টান। করিয়া বুকের উপর তহরিমা বাধিলাম। আর কথা নাই! দুই পাশের দুই আলেম বন্ধু নিজেরা নিয়ত ছাড়িয়া দিলেন। আমার তহরিমা বাঁধা হাত দুইটা সজোরে টানিয়া খুলিয়া ফেলিলেন এবং আমাকে টানিয়া পার্শ্ববর্তী ঝোঁপের একটা গাছতলায় নিয়া আসিলেন। হাঁপাইতে-হপাইতে বলিলেন : আপনে যে ও জিনিস, তা জানিতাম না। আপনার আর নামাজ পড়িবার দরকার নাই। এইখানে বসিয়া আপনি বিড়ি খাইতে থাকেন। আমরা একটা অজুহাত দিয়া দিব।

তাঁরা নিশ্চয়ই ভাল অজুহাত দিয়াছিলেন। কেউ আমার নামাজ না পড়ার খোঁজও করিলেন না। খুব ভাল ও সফল মিটিং হইল। আমার বক্তৃতা খুব জমিল। মগরেবের পরেও অনেকক্ষণ বক্তৃতা করিলাম। মগরেবের নামাজও আমার পড়িতে হইল না।

.

১৩. আমার জবাব

সভা তুখার জমিয়াছিল। আমার বক্তৃতাও খুব জোরদার হইয়াছিল। প্রমাণ, নির্বাচনে ঐ অঞ্চলে ভোট অনেক বেশি পাইয়াছিলাম। যা হোক, সভা শেষে মওলানা সাহেবরা আমাকে স্টেশন পর্যন্ত আগাইয়া দিতে আসিলেন এবং আমার টিকেটসহ নিজেদেরও টিকেট কাটিলেন। ময়মনসিংহ শহরে আমার বাসা পর্যন্ত আসিলেন। সারা রাস্তায় একটা কথাও বলিলেন না।

অত রাত্রে চারজন মেহমানের খানা বাসায় ছিল না। কাজেই বিবি সাহেব আমাদেরে চা দিয়া রান্নায় লাগিলেন। চা খাওয়া শেষ হইল। আমি হুঁক্কা টানিতে লাগিলাম। মওলানা সাহেবরা যেন কত বড় গোপন কথা বলিতেছেন, এমনিভাবে অত রাত্রেও একবার দরজার দিকে একবার জানালার দিকে চাহিলেন। তারপর একাধিকবার গলা কাশিয়া একজন বলিলেন : উকিল সাহেব, আমাদের বে-আদবি মাফ করিবেন, কিছু মনে করিবেন না। আপনার মত এক বড় জ্ঞানী-গুণী, এত বড় সাহিত্যিক, জনসাধারণের এত বড় নেতা লা-মযহাবী, এটা যে আমরা কিছুতেই বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না।

আমি এক-এক করিয়া সকলের মুখের দিকেই তাকাইলাম। সত্যই ভদ্রলোকদের মুখে বিষাদের ছায়া। কত বড় ব্যথাই না তাঁরা পাইয়াছেন। আমিও তাদের বিষাদের অনুকরণে মুখ বিষণ্ণ করিয়া বলিলাম : আপনাদের চোখকে অবিশ্বাস করিবার কোনও কারণ নাই। আমি সত্যই লা-মযহাবী। এতে কি আমার প্রতি আপনাদের আস্থা কমিয়া গেল? আমার কথা বাদ দেন, কৃষক-প্রজা আন্দোলনের প্রতি আপনাদের দরদ এর পরেও থাকিবে ত? আমার অপরাধে আপনারা কৃষক প্রজা পার্টি ছাড়িবেন না ত?

ভদ্রলোকেরা তৎক্ষণাৎ উত্তর দিতে পারিলেন না। প্রায় মিনিটখানেক পরে তাঁদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় জন খুব গোছাইয়া মিষ্টি ভাষায় বলিলেন : আমাদের জন্য চিন্তা করিবেন না। আমরা অতটা ফ্যানাটিক নই। কিন্তু এটা জানাজানি হইয়া গেলে ত আর রক্ষা থাকিবে না।

আমিও সমান উদ্বেগ দেখাইয়া বলিলাম : এখন উপায় কী?

ভদ্রলোকেরা কোনও জবাব দিলেন না। একদৃষ্টে করুণ চোখে আমার দিকে চাহিয়া রহিলেন। অগত্যা আমি বলিলাম : এর মাত্র দুইটা উপায় আছে। একটা, আমার মোহাম্মদী মযহাব ছাড়িয়া হানাফী মাযহাব এখতিয়ার করা। এটা আমি পারি না। কারণ আমি বিশ্বাস করি, পৈতৃক ধর্মই মানুষের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ধর্মের খুঁটি। এটাকে নৌকার নঙ্গর বলিতে পারেন। ইংরাজিতে এটাকে মুরিং বলা হয়। এই খুঁটি একবার ফসকাইলে কোনও ধর্মের ঘাটেই আপনি স্থায়ী হইতে পারিবেন না। যে পৈতৃক হানাফী মত ছাড়িয়া মোহাম্মদী বা মোহাম্মদী মত ছাড়িয়া হানাফী হইতে পারে সে ইসলাম ছাড়িয়া খৃষ্টধর্ম, খৃষ্টধর্ম ছাড়িয়া বৌদ্ধধর্ম এবং সব ধর্ম ছাড়িয়া মানবধর্মও গ্রহণ করিতে পারেন। তার চেয়ে বরঞ্চ আল্লা আপনারে যে ধর্মে সৃষ্টি করিয়াছেন, সেই ধর্মে থাকিয়াই ধর্ম সাধনা করুন না। আল্লা আপনাকে খারাপ জায়গায় পয়দা করিয়াছেন, আল্লার প্রতি এই অবিশ্বাস কেন হইবে আপনার? তিনি কি ভুল করিতে পারেন? তিনি যে আলেম-উল-গায়েব, তিনি যে অন্তর্যামী। তিনি যে দেশে যে ধর্মে আপনারে পয়দা করিয়াছেন, সেখানেই আপনার কর্তব্যও রাখিয়াছেন। এটা আমি বিশ্বাস করি। কাজেই ভাই সাহেবান, আপনারা বুঝতেছেন, আমার পক্ষে বাপের মযহাব ছাড়া সম্ভব নয়। কাজেই আমি দ্বিতীয় উপায় অবলম্বন করিয়াছি। এই জিলার পঞ্চাশ লক্ষ মুসলমান কৃষক-প্রজার মধ্যে চল্লিশ লক্ষই হানাফী। আপনারা বলিয়াছেন, কৃষক-প্রজা আন্দোলনের নেতা লা-মযহাবী, এটা জানাজানি হইয়া গেলে আর রক্ষা থাকিবে না। তাই আল্লার সাথে আমার একটা ফয়সলা হইয়া গিয়াছে। আমি নামাজ পড়িলে কৃষক-প্রজা আন্দোলনের, তার মানে এ জিলার পঞ্চাশ লক্ষ, তথা বাংলার চার কোটি কৃষক-প্রজার মুক্তির আন্দোলনে ব্যাঘাত হইবে। অতএব আল্লার অনুমতি লইয়া আমি ঠিক করছি আমি নামাজ না পড়িয়া দুখেই যাব। নিজের একার বেহেশতের জন্য কোটি কোটি লোকের অনিষ্ট হইতে দিব না।

মওলানা সাহেবদের সবারই চোখ পানিতে ছলছল করিয়া উঠিল, আমারও। একজন চেয়ার ছাড়িয়া আমার দিকে আগাইলেন। আমার পায়ের দিকে হাত বাড়াইলেন। আমি পা সরাইয়া নিলাম। তিনি কদমবুছির ভঙ্গিতে নিজের মুখে বুকে হাত লাগাইয়া বলিলেন : আপনে পীর-মুর্শেদ, আপনের বাতেনি নামাজ আল্লার দরবারে কবুল হইয়া গিয়াছে। যাহেরি নামাজের আপনের দরকার নাই।

আমি সবিনয়ে বলিলাম : আমার সম্বন্ধে মুবালেগা করিয়া আমারে আরো বেশি গোনাগার করিবেন না। শুধু দোওয়া করিবেন, আল্লাহ যেন আমার ঈমান শক্ত রাখেন।

মওলানা সাহেবরা সত্য-সত্যই হাত উঠাইয়া দোওয়া করিলেন।

 

অধ্যায় আট – গোঁড়ামির প্রতিক্রিয়া

১. উদারতার ক্রমপ্রসার

আগের অধ্যায়ের শেষ দিকে যেসব ঘটনার কথা বলা হইয়াছে, সেগুলি ছাত্রজীবনের পরে কর্মজীবনের কথা। এখন ছাত্রজীবনেই আবার ফিরিয়া যাই। মজিদ সারের সংশ্রব আমার গোঁড়ামির বরফে উদারতার উত্তাপ লাগাইয়া দিল। আমার গোঁড়ামি প্রথমে আস্তে আস্তে ও পরে দ্রুত গলিতে লাগিল। অবশেষে গোঁড়ামির জায়গা উদারতা দখল করিল।

উদারতার বুক প্রশস্ত ও বাহু লম্বা। সে বুকে একজনকে নিতে পারিলে আরেকজনকেও নিতে হয়। সে বাহু একজনকে জড়াইয়া সন্তুষ্ট থাকে না। দশজনকে ধরিতে চায়। মজিদ সারের উদারতার ছোঁয়াচে আমার মন যখন আমার এতদিনের দুশমন হানাফীকে ভালবাসিতে পারিল, তখন উদারতা ও ভালবাসার পরিধি আর একটু বাড়িয়া অন্যান্য ধর্ম-সম্প্রদায়কেও ভালবাসিতে পারিবেন না কেন?

আমার মনও তা পারিল। প্রথমে ব্রাহ্ম, তারপর খৃষ্টান ও তারও পরে হিন্দুকে সে উদারতার পরিধির মধ্যে জায়গা দিল। উক্ত ক্রমে পরিধি বাড়িল কেন, সে কথাই এখন বলিতেছি। ব্রাহ্মরা এক খোদা মানে, লোকমুখে এই কথা শুনিয়া ব্রাহ্মদের সভায় বক্তৃতা শুনিতে যাইতে লাগিলাম। ময়মনসিংহ স্টেশন রোডে গাঙ্গিনার পাড়ে এখন ব্রাহ্মমন্দির নামে যে দালানটি আছে এবং যাতে বর্তমানে ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুল চলিতেছে, এটি তখনও ছিল এবং সত্যই ব্রাহ্মমন্দির ছিল। সেখানে প্রতি সপ্তাহেই সভা হইত। বিশেষ করিয়া মহোৎসবের সময় কলিকাতা হইতে বড় বড় নামকরা বক্তা আসিতেন। এঁদের বক্তৃতা কখনও আমি বাদ দিতাম না। এঁদের মধ্যে সঞ্জীবনী সম্পাদক শ্রীযুক্ত কৃষ্ণকুমার মিত্র ও প্রবাসী সম্পাদক শ্রীযুক্ত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কথা আমার মনে আছে। কৃষ্ণকুমার বাবুর বক্তৃতা আমার খুব পছন্দ হইয়াছিল। বোধ হয় এই সময়েই কৃষ্ণকুমার বাবুর মোহাম্মদ চরিত পড়িয়াছিলাম।

.

. ডা. বিপিন বিহারী সেন

ডা. বিপিন বিহারী সেন ও শ্রীযুক্ত মনোরঞ্জন ব্যানার্জী তখন ব্রাহ্ম সমাজের দুই প্রধান ছিলেন। ক্লাস সেভেনে পড়িবার সময় যখন সেহড়া কাঁঠাল লজে’ থাকিতাম তখন এই দুই ভদ্রলোকের সাথে প্রায়ই দেখা হইত। তাঁদের বাড়ির সামনে দিয়াই আমাদের স্কুলে যাতায়াতের পথ ছিল। ডা. বিপিন সেন বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন। মনোরঞ্জন বাবু সিটি স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ছিলেন। ডাক্তার বাবুর বাগানওয়ালা বিরাট বাড়ি ছিল। সেই বাগানে ডা. সেন ও মিসেস সেনকে প্রায়ই দেখিতাম। রাস্তার পাশের ডুয়ার্ক ওয়ালের উপর দিয়া তাঁদেরে দেখা যাইত। বাগানে দাঁড়াইয়া ডাক্তার বাবু স্কুলে-গমনরত আমাদের কুশল-মঙ্গল জিজ্ঞাসা করিতেন। তাঁর মুখ সব সময় হাসি-হাসি থাকিত। কাজেই রোজ দেখা হইলেই আদাব দিতাম। তিনি ত আদাব লইতেনই। মিসেস সেনও আমাদের আদাব লইতেন। প্রথম প্রথম অবশ্য আমি ডাক্তার বাবুকে উদ্দেশ্যে করিয়াই আদাব দিতাম। বেগানা আওরতকে আদাব দেওয়া বা তার দিকে চোখ তুলিয়া চাওয়া আমাদের কল্পনার বাহিরে ছিল। বিশেষত ঐ সময়ে মিসেস সেন ছাড়া আর কোনও মেয়েলোককে বাহিরে দেখি নাই। কাজেই মিসেস সেনের দিকে চোখ তুলিয়া চাইতে শরম লাগিত। কিন্তু ডাক্তার সেনকে আদাব দেওয়ার সময় তিনিও যেভাবে আমাদের আদাব নিতেন, তাতে আস্তে আস্তে আমার লজ্জা কাটিয়া গেল। তখন মিসেস সেনকে একা দেখিলেও আদাব দিতাম। তিনি হাসি মুখে হাত তুলিয়া আদাব নিতেন। কিন্তু কথা বলিতেন না। সে সময় ব্রাহ্ম মেয়েরাও ব্রাহ্মমন্দিরের সভায় যাইতেন। মিসেস সেনও যাইতেন। মেয়েদের বসিবার জন্য পৃথক ব্যবস্থা ছিল। মিসেস সেনও সেখানে বসিতেন। তবু গেটে বা রাস্তায় মিসেস সেনের সঙ্গে দেখা হইয়া গেলে, সেখানেও তাঁকে আদাব দিতাম। এইটুকু পরিচয়েই মহিলাকে আমার এত ভাল লাগিয়া ছিল যে, এর পর মাত্র কয়েক মাস পরে যখন মিসেস সেনের মৃত্যুসংবাদ পাইলাম, তখন নিজের অজ্ঞাতে আমার চোখে পানি আসিয়া পড়িয়াছিল। ডা. ও মিসেস সেনের প্রতি শ্রদ্ধাহেতুই হউক, আর কৃষ্ণবাবুর বক্তৃতা শুনিয়াই হউক, অথবা কৃষ্ণবাবুর মোহাম্মদ চরিত পড়িয়াই হউক, আমি ব্রাহ্মদের প্রতি বেশ আকৃষ্ট হইয়া পড়িলাম। এই সময় গিরিশ সেনের বঙ্গানুবাদ কোরআন ও অপসমালা পড়িয়া সে আকর্ষণ আরো বাড়িল। হোস্টেলেও স্কুলে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তর্ক করিতে গিয়া আমি ব্রাহ্মগণকে মুসলমান বলিয়া দাবি করিতাম। নিজের মতে নিঃসন্দেহ হইবার জন্য চাচাজীকে জিজ্ঞাসা করিলাম। চাচাজী হানাফীদের প্রতি নিষ্ঠুর হইলেও অমুসলমানদের প্রতি খুবই উদার ছিলেন। আমার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলিলেন : শুধু ব্রাহ্ম বৈলা নয়, যেকোনো লোক আল্লার ওয়াহাদানিয়াত (একত্ব) স্বীকার করে, সেই মুসলমান। চাচাজীর মত পাইয়া আমি এ বিষয়ে আরো শক্তিশালী হইলাম।

.

. খৃষ্টান

হযরত ঈসা পয়গাম্বরের উম্মত বলিয়া এই সময় খৃষ্টানদের সম্বন্ধে আমার কৌতূহল বাড়ে। ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের গেটের পাশে এখনও যে ‘গসপেল হল’ আছে সেখানে প্রতি রবিবার প্রার্থনা ও বক্তৃতা হইত। প্রতি সন্ধ্যায় হলের সামনে টুলের উপর দাঁড়াইয়া মিশনারীরা বক্তৃতা করিতেন। রোজ এঁদের বক্তৃতা শুনিবার জন্য আসিতাম কিন্তু এঁদের বক্তৃতা ভাল লাগিত না বলিয়া বেশিক্ষণ থাকিতাম না। কিন্তু যেদিন ইংরাজ পাদরি বক্তৃতা করিতেন, সেদিন বেশ অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিতাম। বক্তৃতা ভাল লাগিত বলিয়া নয়। ইংরাজ সাহেব বাংলায় বক্তৃতা করিতেছেন, তাই শুনিবার জন্য। ওদের মুখে বাংলা কথা আমার বড় ভাল লাগিত।

কিন্তু একবার এক খৃষ্টান পাদরির বক্তৃতা সত্যই ভাল লাগিয়াছিল। ইনি ছিলেন রেভারেন্ড ফাদার এ ডি খা। ইনার বক্তৃতার ব্যবস্থা হইয়াছিল টাউন হলে। এই উপলক্ষে টাউন হল বিশেষভাবে সাজান হইয়াছিল। জিলা ম্যাজিস্ট্রেট, জিলা জজ ও পুলিশ সাহেব প্রভৃতি সমস্ত ইংরাজ কর্মচারী এই সভায় যোগ দিয়াছিলেন। তা ছাড়া শহরের সমস্ত গণ্যমান্য লোকও উপস্থিত ছিলেন। রেভারেন্ড ফাদার এ ডি খা টাঙ্গাইল মহকুমার এক মুসলমান ভদ্র পরিবারের লোক। তাঁর নাম আলাউদ্দিন খাঁ। তিনি ছেলেবেলায় খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং স্বীয় প্রতিভা বলে খৃষ্টান ধর্মযাজক সমাজে এত উন্নতি করেন। গসপেল হল হইতে বিজ্ঞাপন আকারে আগেই এ সব খবর প্রচার করা হইয়াছিল বলিয়া আমি প্রবল আগ্রহে এই সভায় যোগদান করি। হলে তিল ধারণের স্থান ছিল না। ছাত্রদের দাঁড়াইয়া বক্তৃতা শুনিতে হইল। আমিও দাঁড়াইয়াই শুনিলাম। তিনি অবশ্য বেশিক্ষণ বক্তৃতা করিলেন ইংরাজিতে। ইংরাজি বক্তৃতা আমি তেমন ভাল বুঝিলাম না। কিন্তু বাংলায় তিনি যতটুকু বলিলেন, তা আমার খুব ভাল লাগিল। তিনি অন্যান্য মিশনারীর মত অন্যান্য ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু না বলিয়াই শুধু খৃষ্টান ধর্মের গুণাবলি বয়ান করিলেন।

এই সব নাম করা লোকের বক্তৃতা শুনিয়া শুনিয়া আমার ক্রমেই মনে হইতে লাগিল সব ধর্মের মধ্যেই অল্প-বিস্তর সত্য ও সৌন্দর্য রহিয়াছে। এই ধারণা পল্লবিত হইয়া শেষ পর্যন্ত আমার মধ্যে পরস্পর-বিরোধী মত দেখা দিল। সব ধর্মের সত্য আছে, সব ধর্মই মানুষের কল্যাণ চায়। তবু কেন এক ধর্ম আরেক ধর্মের নিন্দা করে? তবু কেন এক ধর্ম আরেক ধর্মকে মিথ্যা বলে? ধর্মে ধর্মে কেন এই বিরোধ? মানুষের কল্যাণ করার মত পবিত্র কাজ করিতে গিয়াও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেন? এটা ত নিতান্ত ব্যবসাদারের মত কাজ।

.

. নামাজ-রোযার শিথিলতা

যখন আমার মনে ধর্ম সম্পর্কে এই আলোড়ন চলিল, তখন নামাজ-বন্দেগিতে আমার আর উৎসাহ থাকিল না। আস্তে আস্তে নামাজ-রোযা ছাড়িয়া দিলাম। টুপি ফেলিয়া দিলাম। যাত্রা-থিয়েটার দেখিতে লাগিলাম। গান-বাজনা শুনিতে থাকিলাম। এই পরিবর্তন আমার মধ্যে এত তাড়াতাড়ি হইয়া গেল যে, আমার সহপাঠী ও বন্ধু-বান্ধবরা অবাক হইয়া গেল। কিন্তু বাড়িতে মুরুব্বিরা। আমার এই পরিবর্তন টের পাইলেন না। দাদাজী তখন এন্তেকাল করিয়াছেন। সুতরাং তাঁর ভয় নাই। বাপজীও দাদাজীর মতই উদার, তাঁকেও ভয় নাই। শুধু চাচাজীকেই সবচেয়ে ভয় পাইতাম। কিন্তু ভয়ে নয়, মুরুব্বিদের প্রতি বিশেষত বাপ-মার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধায় আমি বাড়িতে আমার মুসল্লী মুত্তাকিগিরি পুরামাত্রায় বজায় রাখিলাম। বাপজী-মার, বিশেষ করিয়া মার মনে কষ্ট দেওয়া আমার কল্পনারও বাহিরে ছিল। আমি এটা কিছুতেই বরদাশত করিতে পারিতাম না। তারা মনে কষ্ট পাইবেন, শুধু এ ভয়েই আমি বাড়িতে এসব করিতাম। শহরে যে আমি নামাজ-রোযা করিতাম না, এ খবর যাতে বাপজী ও মার কানে না যায়, সেদিকে সতর্ক থাকিতাম। গ্রীষ্ম ও পূজার লম্বা ছুটিতে সহপাঠী ও অন্যান্য বন্ধুদের বাড়িতে দল বাঁধিয়া বেড়ান তৎকালে ছাত্রদের মধ্যে রেওয়াজ ছিল। এই উপলক্ষে আমাদের বাড়িতে যেসব ছাত্র বন্ধু বেড়াইতে আসিত তাদেরে আগে হইতে আমি সাবধান করিয়া দিতাম।

এইভাবে কিছুকাল চলিবার পর আমি যখন আইএ পড়িবার জন্য ঢাকায়। আসিলাম, তখন আমি পুরামাত্রায় বে-নামাজি হইয়া গিয়াছি। আইএ পড়াকালে আমি যখন হাকিম আরশাদ সাহেবের বাড়িতে যায়গীর থাকিতাম, তখন রাতে শুইতাম চুড়িহাট্টা মসজিদে। মসজিদের একটি কামরায় আমার বিছানাপত্র ও বাক্স-আদি থাকিত। বই-পুস্তক যদিও থাকিত হাকিম সাহেবের বাড়িতে, কিন্তু কার্যত আমি মসজিদেরই একজন বাসিন্দা। তবু আমি এক ফযর ছাড়া অন্য ওয়াকতের নামাজ পড়িতাম না। ফযরটা না পড়িয়া উপায় ছিল না।

জগন্নাথ কলেজের দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন বাবু উমেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য। তিনি আইএতে আমাদের লজিক পড়াইতেন। তাঁর বাড়ি ছিল ময়মনসিংহ জিলার নেত্রকোনা মহকুমায়। এই খাতিরে আমি তার কাছে ভিড়িয়া পড়িলাম। তাঁর ক্লাসে ভাল করিলাম। তিনি সাহিত্যিক ছিলেন। তাঁর লেখা দার্শনিক প্রবন্ধটি মাসিক কাগজে ছাপা হইতে আগেই দেখিয়াছি। আমার কয়েকটা লেখা ইতিপূর্বেই মাসিক কাগজে বাহির হইয়াছে। আমি কলেজে শুধু ‘আহমদ’ বলিয়া উমেশ বাবু অবশ্য সে খবর রাখিতেন না। আমি নিজেই একদিন তাঁকে জানাইয়াছিলাম। এই সব কারণে উমেশ বাবু আমাকে একটু বিশেষ খাতির করিতেন। আমি লজিকের পাঠ্যবই ডিঙ্গাইয়া দর্শনের বই পড়িতে শুরু করি। জন স্টুয়ার্ট মিল, রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, হীরেন দত্ত, ব্ৰজেন শীল, এ্যানি বেসান্ত প্রভৃতি দার্শনিক লেখকের লেখা এই সময় আমি খুব পড়িতাম এবং মাঝে মাঝে উমেশবাবুর কাছে বুঝিতে যাইতাম। এইভাবে উমেশ বাবু আমার মধ্যে স্বাধীন চিন্তার উন্মেষ করেন এবং আমার মনকে সংস্কারমুক্ত করিয়া তুলেন।

.

. কবর-পূজা

‘নামাজ পড় আর না পড়, পীর মানিতেই হইবে’ এই ধরনের মতবাদ তখন হানাফী সম্প্রদায়ের এক অংশে খুবই চালু ছিল। আমরা মোহাম্মদীরা এমনিতেই পীর মানি না, তার উপর আমি সম্প্রতি ধর্মের সত্যতায়ই সন্দিহান হইয়া পড়িয়াছি। কাজেই এই সময়কার আমার মতবাদ হানাফী জনসাধারণের, এমনকি শিক্ষিত সম্প্রদায়েরও সহ্য করিবার কথা নয়। আমার এই মতবাদ কাজেই একবার আমাকে বিপদে ফেলিয়াছিল। আমি হাকিম আরশাদ সাহেবের বাড়িতে যায়গীর থাকাকালে আলিমুদ্দীন সাহেব নামক জনৈক শিক্ষকের নেতৃত্বে একবার নৌকাভ্রমণে যাই। ছাত্র-বন্ধুদের মধ্যে মি. রেজাই করিম তার এক ভাই আবদুল করিম, মি. ইউসুফ সালাহউদ্দিন তার ভাই সালেহউদ্দিন প্রভৃতির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নৌকাভ্রমণ উপলক্ষে নদীর ধারে অবস্থিত মিরপুরে পীরের দরগা যিয়ারত করা হয়। আমি যিয়ারত করি। যিয়ারত শেষ করিয়া নৌকায় ফিরিয়া বন্ধুরা পীর সাহেবের কাছে কে কী মুকসেদ চাহিয়াছেন, তার খবর-পুরসি শুরু করেন। সকলেই যার-তার মুকসেদের কথা বলেন। কিন্তু আমি কিছু বলি না। কাজেই আমাকে সবাই ধরেন, আমি কি চাহিয়াছি বলিতে হইবে। সকলের পীড়াপীড়িতে আমি বলিলাম : ‘পীর সাহেবের গোনা-খাতা মাফ করবার লাগি আল্লাহর দরগায় মুনাজাত করছি। আমার এই কথা শুনিয়া সকলে ত আমাকে মারে আর কি? পীর সাহেবের শানে এত বড় কথা! তাঁর গোনা-খাতা? সকলেই ভদ্র বংশের ভদ্রলোকের ছেলেপিলে। কাজেই সত্য-সত্যই আমাকে মারপিট করিলেন না। কিন্তু ঐ বেতমি কথা প্রত্যাহার করিবার জন্য জিদ করিলেন। আমি প্রত্যাহার করিলাম না। বরঞ্চ নিজের উক্তির সমর্থনে বলিলাম : এই যে আপনারা আল্লার কাছে মকসুদ চাইয়া পীর সাহেবের নিকট চাইলেন, এই যে পীর সাহেবের মাজারে মাথা কুটিয়া দৈনিক হাজার লোক শেরক করিতেছে, এই যে পীর সাহেবের কবর যিয়ারতের ওসিলায় হররোজ আল্লার হুকুমের বরখেলাফ করিতেছে, তাতে লোকেরার ত গোনাহ হইতেছেই, পীর সাহেবেরও হইতেছে। যার কবরে এমন শেরেকি হয়, আল্লার দরগায়ে তিনিও নিশ্চয়ই গোনাগার। তাই আমি পীর সাহেবের মাগফেরাত চাহিয়া মোনাজাত করিয়াছি।

আমার জবাবে বন্ধুরা স্তম্ভিত হইলেন। মেহেরবানি করিয়া তাঁরা আমাকে নৌকা হইতে ফেলিয়া দিলেন না। কালবিলম্ব না করিয়া নৌকা ফিরাইতে মাল্লাকে আদেশ দিলেন। আমার সাহচর্যে তারা যেন আর এক মুহূর্ত থাকিতে রাজি ছিলেন না। বাকি পথ তারা আমার সাথে কোনও কথা বলিলেন না। হাকিম সাহেবের কাছে আমার এই ধর্মবিরোধী বতমিজির খবর পৌঁছিল। আমার যায়গীর উঠাইয়া দিবার চাপ তার উপর পড়িল।

কিন্তু হাকিম সাহেব জানিতেন আমরা মোহাম্মদী। তিনি বহুদিন আগে হইতেই আমাদের গ্রামে যাতায়াত করিতেন। আমাদের গ্রামের অনেকেরই তিনি চিকিৎসা করিয়াছেন। গ্রামের বিভিন্ন মাতব্বরের বাড়িতে তিনি। একনাগাড়ে সপ্তাহের বেশি সময় থাকিয়াছেন। কাজেই তার কাছে এটা জানাই ছিল যে আমি ও আমার আত্মীয়স্বজন প্রতিবেশী সকলেই গোড়া মোহাম্মদী এবং আমরা পীর-পূজা, গোর-পূজার ভয়ানক বিরোধী। কাজেই হাকিম সাহেব ঐ চাপে টলিলেন না। তিনি শুধু গোপনে আমাকে উপদেশ দিলেন একটু সাবধানে কথাবার্তা বলিতে।

.

. পীর-পূজা

একশ্রেণীর মুসলমানের পীরভক্তি এই সময় এমন চরম সীমায় উঠিয়া ছিল যে, উহা স্পষ্টতই ইসলামের মৌলিক শিক্ষার বিরোধী। এই শ্রেণীর মুসলমানের কথাবার্তায়, কাজে-কর্মে আল্লার পানা না চাহিয়া পীর সাহেবদের পানা চাহিতেন। যেমন তারা ‘ইনশাহ আল্লাহ এই কাজ করিব’, ‘খোদার ফযলে ভালই আছি’, ‘আল্লার মর্জিতে এটা হইয়াছে, ইত্যাদি না বলিয়া হুযুর পাকের ইচ্ছা হইলে এ কাজ করিব’, ‘হুযুর কেবলার মেহেরবানিতে ভালই আছি’, ‘খাজাবাবার দোওয়াতে এটা হইয়াছে’ ইত্যাদি বলিতেন। মোট কথা, এঁরা যার-তার পীর সাহেবদেরে দিয়া আল্লার জায়গা দখল করাইয়াছিলেন। এই পীর-পূজার চরম দৃষ্টান্ত দেখিয়াছিলাম, এস এম হোস্টেলে থাকিবার সময়। আমার পাশের রুমেই চাঁদপুরের একজন ছাত্র থাকিতেন। আইএ সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। বয়স আঠার-উনিশ। চেহারা-ছবিতে এবং চাল-চলনে ভদ্র পরিবারের ছেলে। রোজ সকালে তার খোশ-ইলহানের কোরআন তেলাওয়াত শুনিয়া আমাদের ঘুম ভাঙ্গিত। কোনও কারণেই তার এই কোরআন তেলাওয়াত কামাই হইত না। অথচ এই ভদ্রলোক নামাজ পড়িতেন না। নামাজ আমিও পড়িতাম না। আলসামি করিয়া পড়িতাম না, তা নয়। নামাজ পড়ার আমি বিরোধীই ছিলাম। ছাত্র-বন্ধুদের মধ্যে নামাজের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করিতাম। সে জন্য কলেজের আরবির প্রফেসার এবং হোস্টেল সুপার অধ্যাপক এ এম আসাদ সাহেবের কাছে কয়েকবার ধমক খাইয়াছি। কিন্তু নামাজবিরোধী প্রচার বন্ধ করি নাই। কাজেই কথিত ভদ্রলোকের নামাজ না পড়ায় আমার খুশি হইবার কথা। কিন্তু খুশি হওয়ার বদলে আমি দুঃখিত হইলাম। যিনি কোরআন তেলাওয়াত করিবেন, তিনি নামাজ পড়িবেন না কেন? রোজ নিয়মিতভাবে কোরআন তেলাওয়াত করার মত দৃঢ় ধর্ম-বিশ্বাস যার, আলসামি করিয়া তিনি নামাজ তরক করিবেন, এটা আমার বরদাশত হইল না। আলসামিকে আমি দুচক্ষে দেখিতে পারিতাম না।

কাজেই আমি তাঁকে তাঁর এই আলস্যের কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম। এবং তাঁর জবাবের অপেক্ষা না করিয়া আলসামির নৈতিক ও দৈহিক কুফল বর্ণনা করিয়া বক্তৃতা শুরু করিয়া দিলাম। বক্তা, সাহিত্যিক উপরের ক্লাসের ছাত্র বলিয়া ভদ্রলোক আমাকে সম্মান করিতেন। কাজেই আমার কথায় তিনি চোখে-মুখে বাধা দিলেন না। আমি আমার কথার মাঝে একটু দম নিতেই তিনি বলিলেন : কিন্তু আমি ত আলসামি কইরা নামাজ তরক করি না। নামাজ আমার লাগি ফরযই হৈছে না।

আমার কানকে আমি বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। এই আঠার-উনিশ বছরের যুবকের জন্য নামাজ ফরয হয় নাই? আমি কি ভুল শুনিলাম? সন্দেহ নিরসনের জন্য আবার বলিলাম : কী কইলেন?’ যুবক তার কথার পুনরাবৃত্তি করিলেন। আমি বলিলাম, সাত বছর বয়স হোতেই যে নামাজ ফরয হয়।

যুবক কিছুমাত্র অপ্রস্তুত না হইয়া বলিলেন : জি হাঁ সে কথা ঠিক। কিন্তু আমার নামাজ যে আল্লার দরগায় কবুল হৈব না।

আমি আরো বিস্মিত হইয়া বলিলাম : কেন? আপনার অপরাধ?

যুবক বিনা-সংকোচে বলিলেন : আমি যে আজও পীরের মুরিদ হৈতে পারি নাই।

আমি স্তম্ভিত হইলাম। মুরিদ না হইতে পারার কারণ সম্বন্ধেও যুবক আরো কিছু বলিয়াছিলেন। কিন্তু সে সব কথা আমার কানে ঢুকিল না। আমি নিজের কাজে চলিয়া গেলাম। অনেক দিন আমার মন হইতে এই চিন্তা দূর হইল না। হায়, পুতুল-ভাঙ্গা ইসলামের এই দুর্দশা মুসলমানেরই হাতে?

.

. ধর্ম-মত বনাম চরিত্র

কিছুদিন আগে হইতেই আল-ইসলাম নামক বাংলা মাসিক ও ইসলামিক রিভিউ ও রিভিউ-অব-রিলিজিয়ন নামক ইংরাজি মাসিক কাগজ নিয়মিত পড়িতে শুরু করিয়াছি। এই সব কাগজে বড় বড় পণ্ডিত ও আলেম লেখকের লেখার মধ্যে একটি কথা আমার খুব পছন্দ হইয়াছিল। সেটা এই যে সব ইসলাম ধর্মের অনুসারীরাই ইসলামের আসল শিক্ষা হইতে দূরে সরিয়া পড়িয়াছে। মুসলমানদের কাজকর্ম, চাল-চলন, স্বভাব-চরিত্র যে আমাদের ভাল লাগে না, তার জন্য ইসলাম দায়ী নয়, দায়ী আমাদের ভুল ব্যাখ্যা।

কিন্তু বেশিদিন এই কৈফিয়তে সন্তুষ্ট থাকিতে পারিলাম না। প্রথমত সব ধর্মের পক্ষ হইতেই এ ধরনের কথা বলা হইতেছে। দ্বিতীয়ত ভয়ানক ধার্মিক, ভয়ানক শরিয়তের পা-বন্ধ, সাংঘাতিক নামাজি লোককেও আদর্শ চরিত্রবান, সত্যবাদী ও পরোপকারী হইতে দেখি না কেন? তৃতীয়ত হিন্দু, ব্রাহ্ম ও খৃষ্টানদের মধ্যে এমন আদর্শ চরিত্রবান সত্যবাদী ও স্বার্থত্যাগী লোক দেখিয়াই শুধু মুসলমান নন বলিয়াই তারা বেহেশতের বদলে দোযখে যাইবেন, এই কথাটা কিছুতেই আমার মন মানিত না। ময়মনসিংহের ডা. বিপিন সেনের মত ত্যাগী ও পরোপকারী ব্রাহ্ম, আমার অধ্যাপক উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের মত হিন্দু ও আমার অধ্যাপক মি. ল্যাংলির মত খৃষ্টান দোযখে যাইবেন। আর আমার চিনা-জানা দু-একজন মওলানা-মৌলবী সাহেবের মত মিথ্যাবাদী, মামলাবাজ ও নাবালক ভাতিজাদের সম্পত্তি অপহারক মুসলমান বেহেশতে যাইবে, এটা আমার বিবেকে বাধিত। চতুর্থত, সব ধর্মই যার-তার মতে মানুষের কল্যাণের জন্য একযোগে চেষ্টা না করিয়া যার-তার শ্রেষ্ঠত্ব, যাহির করিবার জন্য এত চেষ্টা-তদবির, এত প্রচার-প্রচারণা, এত অর্থ ব্যয় করিতেছে কেন? ইসলামিক রিভিউ ও আল-ইসলাম-এর পাশে পাশে এই সময় আমি খৃষ্টান মিশনারীদের প্রকাশিত এপিফেনি নামক কাগজ পড়িতাম এবং সদরঘাটে অবস্থিত ব্যাপটিস্ট মিশন হলে বক্তৃতা শুনিতে ও বই সংগ্রহ করিতে যাইতাম। সময়ের মধ্যেই ম্যাট্রিক পাশ করিবার সময় একবার ও আইএ পাশ করিবার সময় আরেকবার চামড়ার বাধানো সুন্দর কাগজে ছাপা দুইখানা বাইবেল এই মিশন হইতে উপহার পাইয়াছিলাম। এই প্রচারণার সমস্ত ব্যাপারটাই আমার কাছে ব্যবসাদারি বলিয়া মনে হইল। এই সময় হাকিমী চিকিৎসা ভাল কি কবিরাজী চিকিৎসা ভাল, এই বিষয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ও হ্যান্ডবিলে খুব বাদ-বিতণ্ডা চলিতেছিল। ‘জিস্তান’, ‘সুশীল মালতী’ প্রভৃতি সুগন্ধি পানের মসল্লা চা’র ছোট ছোট প্যাকেটও এই সময় বিনা মূল্যে বিতরণ করা হইত। ধর্মপ্রচার ও এই সব ঔষধপত্রের প্রচারের মধ্যে আমি কোনও পার্থক্য দেখিতে পাইলাম না।

.

. সব ধর্ম সত্য, না সব ধর্ম মিথ্যা?

দুই-তিন বছর আগে ভাবিতাম, সব ধর্মই সত্য হইতে পারে। এখন ভাবিতে শুরু করিলাম সব ধর্মই মিথ্যাও হইতে পারে। সিদ্ধান্তে পৌঁছিতে বেশি দিন লাগিল না। দর্শনের অনার্স ক্লাসে বড় বড় দার্শনিকের নাম শুনিয়া কলেজ লাইব্রেরিতে তাঁদের বই-পুস্তক পড়িতে লাগিলাম। গভীর অধ্যয়নের সময়ও ছিল না, সম্ভবও ছিল না। ভাসা-ভাসা পড়িয়াই বড় দার্শনিক তত্ত্ব সম্বন্ধে নিজস্ব অর্থ করিয়া বসিলাম। লৌকিক ধর্ম ও আসল ধর্মের পার্থক্য আমার সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল। আমি বুঝিলাম আল্লার গুণাবলির অনুকরণে সদগুণের অধিকারী হওয়ার নামই ধর্ম। সেটা করিতে গিয়া কোনও লৌকিক ধর্মের নিয়মাবলি মানিয়া চলার দরকার নাই। মানুষ নীতিমান হইলেই ধার্মিক হইল। যেসব লৌকিক ধর্ম মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে, এগুলি ব্যবসাদারী ডগমা মাত্র। খোদাকে মূলধন করিয়া এরা এক-একটা ব্যবসা ফাঁদিয়াছে মাত্র। সৃষ্টিকর্তার নিজের মুখের বাক্য বলিয়াও যে সব কিতাব চালু আছে, সেগুলির মধ্যে যুগোপযোগী ভাল-মন্দ কথা আছে বটে কিন্তু ওগুলি আসলে খোদার মুখের কথাও নয় এবং সে কারণেই ওগুলি চিরকালের উপযোগীও নয়। সৃষ্টিকর্তার অবতার পুত্র বন্ধু বলিয়া যেসব ধর্ম প্রবর্তক দাবি করিতেছেন, তাদের দাবি ঠিক নয়। এই সব সিদ্ধান্ত করিয়া সমস্ত লৌকিক ধর্মের বিরুদ্ধে পাইকারি হারে কঠোর কঠোর উক্তি করিতে লাগিলাম। সহপাঠী ও বন্ধুরা আমার কথা শুনিয়া কেউ কানে আঙুল দিল, কেউ শিহরিয়া উঠিল, কেউ মারমুখী হইল। মারিল না কেউ। কিন্তু সবাই আমারে নাস্তিক আখ্যা দিল। হিতৈষীরা আমার আখেরাতের চিন্তায় আকুল হইল। বক ধার্মিকেরা আমাকে হোস্টেল হইতে বাহির করিয়া দিবার জন্য সুপার আসাদ সাহেবকে চাপ দিতে লাগিল। আসাদ সাহেব কি ভাবিয়া আমাকে তাড়াইলেন না, প্রিন্সিপালের কাছে আমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করিলেন না। কিন্তু মিলাদ প্রভৃতি বার্ষিক অনুষ্ঠান হইতে আমাকে বাদ দিলেন।

.

. খোদা-বিশ্বাস বনাম ধর্ম-বিশ্বাস

কিন্তু আসল কথা এই যে আমি তখনও নাস্তিক হই নাই। ধর্মবিরোধী অর্থাৎ লৌকিক ধর্মবিরোধী হইয়াছি মাত্র। তৎকালে ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলিলেই লোকেরা তাকে নাস্তিক বলিত। ধর্ম ও আল্লাকে তারা একই বস্তু মনে করিত। সুতরাং যে ধর্ম মানে না, সে আল্লাকেও মানে না। এই ছিল সাধারণ জনমত। কিন্তু কৌতুকের বিষয় এই যে, ধর্ম মানে এখানে তারা শুধু নিজেদের ধর্ম মনে করিত। আল্লা ও ধর্ম যে এক, সেটা অন্য কারো ধর্ম নয়, আমাদের ধর্ম। কাজেই মুসলমান যদি হিন্দু ও খৃষ্টানের, হিন্দু যদি মুসলমান খৃষ্টানের অথবা খৃষ্টান যদি হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মের নিন্দা করে, তবে সেটা নাস্তিকতা হইবে না। এ কথার সোজা অর্থ এই যে আমার ধর্ম ছাড়া আর গুলি আসলে ধর্মই নয়। কাজেই ওগুলিতে অবিশ্বাস করিলে বা ওদের নিন্দা করিলে তাতে সৃষ্টিকর্তা অসন্তুষ্ট হইবেন না। বরঞ্চ উল্টা ঐগুলিকে নিন্দা না করিলেই তিনি অসন্তুষ্ট হইবেন। তার মানে আমারটাই আল্লার একমাত্র ধর্ম। আর গুলি সব জাল। ধার্মিকেরা একবার ভুলক্রমেও বলেন না, নাস্তিকের চেয়ে খোদা-বিশ্বাসী ভাল, অতএব আমার ধর্মে বিশ্বাস না হয়, অন্য ধর্মে বিশ্বাস কর; তবু সৃষ্টিকর্তার প্রতি ঈমান আন। না, না, এ কথা বলা চলিবে না। বরঞ্চ নাস্তিক থাক তা-ও ভাল। তবু আমার ধর্ম ছাড়া অপরের ধর্মে বিশ্বাস করিও না। ছেলেবেলা চাচাজীর কাছে যা শুনিয়াছিলাম তা আজও সত্য। তিনি বলিতেন: হানাফীরা হিন্দুর চেয়ে বদতর। হানাফীরা যে আল্লা, রসুল, নামাজ, রোযা, হজ, যাকাত ইত্যাদি ইসলামের সবগুলি মূলনীতিতে বিশ্বাসী তাতেও চাচাজী সন্তুষ্ট নন। তাঁরা যে বুকের উপর তহরিমা বাধিয়া জোরে ‘আমিন’ কয় না, এতেই তারা প্রতীক পূজক বহু ঈশ্বরবাদী হিন্দুর চেয়ে বদতর হইয়া গেল। চাচাজীর কথা : ‘যদি মুসলমান হইতে চাও তবে আমাদের মত মোহাম্মদী হও; যদি মোহাম্মদী না হও তবে তোমার মুসলমান হওয়ার কোনো সার্থকতা নাই; তুমি বরঞ্চ হিন্দুই থাক।’ এটা করটিয়ার জমিদার হাফেয মোহাম্মদ আলী সাহেবেরও কথা। অবশ্য প্রচলিত গল্পটি যদি সত্য হইয়া থাকে।

ঠিক তেমনি ধার্মিকেরা বলে, আমার ধর্মে যারা বিশ্বাস করে না, তারা। ‘নাস্তিকোঁসে বদ্‌তর হ্যায়’। চাচাজীর কথা অনুসরণ করিয়াই তারা বলে : যদি ধর্মবিশ্বাসী অর্থাৎ খোদা-বিশ্বাসী হইতে চাও, তবে আমার ধর্মে ঈমান আন। যদি তা নাই পার, তবে নাস্তিকই থাক।

.

১০. নাস্তিকতা

ধার্মিকদের চিন্তায় ও কথায় এই স্ববিরোধিতা দেখিয়া আমি নিজের মনেই হাসিতাম। স্বল্প বুদ্ধিতার জন্য ওদের উপর কৃপা হইত। কিন্তু তাদের কথা সত্য হইতে বেশি দিন লাগিল না। ধর্মে অবিশ্বাসী হইয়া আমি বেশি দিন। খোদার উপর ঈমান রাখিতে পারিলাম না। তখন দর্শনের ক্লাসে পড়া দেকার্তে, স্পিনোযা, মিল, বেনথাম, কোতে, লক, হিউম, কেন্ট, হেগেল আমার মাথায় গজগজ করিতেছে। আমি প্রথমে পার্সিমনি-অব-লজিক বা ন্যায়শাস্ত্রের বখিলির সূত্র দিয়া আল্লার সর্বজ্ঞতা, সর্বশক্তিমানত্ব ও সর্বব্যাপিতা খণ্ডন করিতে লাগিলাম। তর্কশাস্ত্রের বখিলি ব্যাপারটা এই যে আপনি কোনও কিছুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত করিবার সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু অনুমান করিতে পারিবেন না। ধরুন লংক্লথের একটা পায়জামার দাম আপনি আজকালের বাজারেও দশ টাকার বেশি অনুমান করিতে পারেন না। সে জায়গায় আপনার পরনের পাজামাটি দেখিয়া যদি আমি বলি : আমি অনুমান করি, এটা বানাইতে দশ হাজার টাকা খরচ পড়িয়াছে; কিম্বা যদি বলি : আমার মনে হয় কলিকাতার মাস্টার টেইলার বরকতুল্লা এই পাজামাটা সিলাই করিয়াছে তবে এই দুইটা কথাই পার্সিমনি-অব-লজিক-এর খেলাফ হইবে। কারণ ঐ পাজামা বানাইতে প্রথম শ্রেণীর লংক্লথেও দশ টাকার বেশি খরচ পড়িতে পারে না; এবং ইসলামপুর-নবাবপুরের যে কোনও সাধারণ দর্জি এই পায়জামা সেলাই করিতে পারে। তেমনি, একটি কাঁচা-ভিটির বাঁশ ছনে দুচালা ঘর দেখিয়া যদি আমি বলি : তাজমহলের কারিকর বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি ইসমাইল খাই নিশ্চয় এই ঘরটি বানাইয়াছে, তবে এটাও পার্সিমনি অব-লজিক সূত্রের খেলাফ হইবে।

চিন্তার এই সূত্র ধরিয়া ধর্ম বিরোধ হইতে অতি সহজেই খোদা বিরোধে পৌঁছিলাম। মুসলমান হিসাবে এক আল্লা-বিশ্বাসী। সে আল্লা-বিশ্বাসী, সে আল্লা নিরাকার, নিরঞ্জন, সর্বব্যাপী, সর্বশক্তিমান। এমন সর্বব্যাপী এক আল্লা হইতে প্রথমে সুফিবাদের দিকে মন ধাবিত হইল। মনসুর হাল্লাজের ‘আনাল হক’ (আমি’ই হক), উপনিষদের ‘অহংব্রহ্ম’ খুবই আকর্ষণীয় মনে হইল। স্পিনোযা ও লাইবনিজের নিয়ম (অদ্বৈতবাদ) ও প্যাথিযম (সর্বেশ্বরবাদ, মায়াবাদ) আমার চোখে খুব উঁচুদরের তত্ত্বদর্শন ছিল। এর সঙ্গে সুফীবাদ, অদ্বৈতবাদের মিল দেখিয়া আমি খুবই চমৎকৃত হইলাম। এইভাবে নিরাকার সৃষ্টিকর্তা হইতে ‘আনাল এক’-এ ‘অহংব্রহ্মবাদের ভিতর দিয়া প্রথম মায়াবাদ বা প্যাথিযম ও পরে মনিযম এবং আরো পরে নিরীশ্বরবাদের দুর্নিবার যুক্তির খাদে পড়িতে আমার বেশি সময় লাগিল না।

সূত্রের এই দৃষ্টান্ত হইতে আমি বলিতে লাগিলাম : রোগ, শোক, ঝড়, ভুইকাপ, বন্যা, মহামারি ও দুঃখ-দারিদ্র্যপূর্ণ অসুন্দর এই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তারূপে সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ ও কল্যাণময় একজন আল্লা-ভগবান অনুমান করা যুক্তিসহ ও ন্যায়সম্মত নয়। আমি বন্ধুদেরে চোখে আঙ্গুল দিয়া কলেজ প্রাঙ্গণের আমগাছগুলি দেখাইয়া দিতাম। দেখ, দেখ, ফায়ুন মাসে এইসব গাছ বউলে ঝুঁকিয়া পড়ে, মনে হয় লক্ষ কোটি আম হইবে। কিন্তু চৈত্র-বৈশাখে সেইসব বউল ঝরিয়া পড়ে, থাকে মাত্র এক কুড়ি আম। পাড়াগাঁয়ের খালে-বিলে-পুকুরে গিয়া দেখ একটা মাছ কমসে কম লক্ষ পোনা ছাড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাচ্চা মাছ থাকে মাত্র কুড়ি-পঁচিশ, বড় বড় হয় মাত্র দশ-পনেরটা। এসব কাজ দক্ষ নিপুণ সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কাজ হইতে পারে? একটা পাকা মালি এক সাজি ফুল দিয়া কুড়ি মালা গাঁথিবে। কোনও আনাড়ির হাতে পড়িলে একটি মালা গাঁথিতেই সাজির ফুল খতম। প্রকৃতির এই অপব্যয় অনিয়ম ও অশৃঙ্খলা কদাচ সর্বজ্ঞ ও অন্তর্যামী আল্লার অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। জ্ঞানের দিক দিয়া যা, শক্তির দিকেও তাই। আল্লার সর্বশক্তিমানত্ব চ্যালেঞ্জ করিয়া বলিতে লাগিলাম : খোদা কি এক সঙ্গে এই দরজাটা খোলা ও বন্ধ রাখিতে পারেন।

.

১১. মি. ল্যাংলির সহনশীলতা

এ সব কথা অধ্যাপকদের সামনেই বলিতাম। তাদের সঙ্গেও তর্ক করিতাম। অনার্স ক্লাসে অধ্যাপক ল্যাংলি ও ভট্টাচার্যের সঙ্গেই হইত বেশি। ল্যাংলি সাহেব খুব বড় ধার্মিক মানুষ ছিলেন। কিন্তু সহনশীল দার্শনিক মনোভাবও তার ছিল যথেষ্ট। তিনি প্রথম প্রথম আমাকে বুঝাইবার খুব চেষ্টা করিতেন। আমার যুক্তির দুর্বলতা কোথায়, দেখাইয়া দিতেন। কখনও চটিতেন না। কখনও কড়া কথা বলিতেন না। ছাত্রদের নির্বুদ্ধিতার জন্য কস্মিনকালেও তাদেরে মনে কষ্ট দিয়া কথা বলিতেন না। তারা যে নির্বোধ, তাদের মাথায় যে ঘিলু নাই, এমন ধরনের কথা যেত তার মুখ দিয়া আসিতই না। তার প্রশ্নের হাজার ভুল উত্তর দিলেও তিনি বলিতেন না : ‘তোমার উত্তর ঠিক হয় নাই। বরঞ্চ তিনি বলিতেন : ‘তোমার উত্তর যথাস্থানে ঠিকই আছে : কিন্তু আমার প্রশ্ন ওটা ছিল না। ল্যাংলি সাহেবের এই ভদ্রতার নজিররূপে আমরার ছাত্রদের মধ্যে যে উপমাটি প্রচলিত ছিল সেইটিই নমুনাস্বরূপ উল্লেখ করিতেছি। ধরুন, তিনি কোনও ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করিলেন : ‘বলো ত একটা মুরগির কতটা পা আছে? জবাবে ছাত্রটি বলিল : একটা ঘোড়ার চারটা পা আছে, স্যার’। ছাত্রদের এই নিরেট মূর্খের মত জবাবে যে কোনও শিক্ষক চটিয়া যাইতেন। কিন্তু ল্যাংলি সাহেব চটিতেন না। তবে কী করিতেন? তিনি বলিতেন : ‘ঘোড়ার পা সম্পর্কে তুমি ঠিকই বলিয়াছ। কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল মুরগির কয়টা পা।

এমন শরিফ ভদ্রলোকের সাথে গরম তর্ক করার উপায় ছিল না। তমিযে লেহাযে তাঁর মত ভদ্র, যবানে তাঁর মত মিষ্টভাষী না হইলে তার সাথে স্বভাবতই তর্ক জমান যাইত না। কিন্তু ল্যাংলি সাহেব শুধু আমাদের দর্শনের শিক্ষক ছিলেন না, ভদ্রতা ও তমিয-লেহাযেরও শিক্ষক ছিলেন। আমার নাস্তিক্য যতই বেপরওয়া ও বেলাগাম হইতে লাগিল, ল্যাংলি সাহেবের স্নেহ আমার প্রতি তত যেন বাড়িতে লাগিল। ডা. মার্টিনোর স্টাডি-অব-রিলিজিয়ন নামে একটা বড় দামি পুস্তক আমাদের অনার্সের পাঠ্য ছিল। এই পুস্তকের পঠিতব্য অংশ ছাড়াও সবটা বই পড়িয়া ফেলিতে তিনি আমাকে উপদেশ দিতেন এবং সত্য-সত্যই পড়িয়াছি কিনা, নানা রকম প্রশ্ন করিয়া তা পরীক্ষা করিতেন। ডা. মার্টিনোকে মি. ল্যাংলি পীরের মত মান্য করিতেন। এটা জানিয়াও আমি ল্যাংলি সাহেবের এক প্রশ্নের জবাবে বলিয়াছিলাম : ডা. মার্টিনো দার্শনিক নন, তিনি আসলে খৃষ্টান পাদরি। এতে ল্যাংলি সাহেব নিশ্চয়ই মনে খুব ব্যথা পাইয়াছিলেন। যিনি জীবনে কাকেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবেও কড়া কথা বলেন নাই তিনিই আমাকে শুনাইয়া একদিন বলিলেন : ‘বেকন ঠিকই বলিয়াছেন লিটল লার্নিং ইজ ড্যানজারাস অ্যান্ড লিটল ফিলসফি লিডস টু এথিযম’ অর্থাৎ অল্পবিদ্যা বিপজ্জনক, অল্পদর্শন নাস্তিক্য-জনক।’ কথাটায় আমি মনে কষ্ট পাইব আশঙ্কা করিয়াই বোধ হয় উহার ধার মারিবার উদ্দেশ্যে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বলিলেন : ‘ডোন্ট ওয়ারি অল অ্যাকটিভ মাইন্ডস মাস্ট অব নেসেসিটি পাশ থু দ্যাট স্কেপটিসিযম ইন দেয়ার ইয়ুথ’ অর্থাৎ এর জন্য চিন্তা করিও না। সক্রিয় তরুণ মনে অমন সন্দেহবাদ একবার আসিয়াই থাকে।

যেন নাস্তিক্য একটা রোগ। এই রোগাক্রান্ত হইয়া আমি যেন বাঁচিবার আশা ত্যাগ করিয়াছি। তিনি যেন বড় ডাক্তাররূপে আমাকে সান্ত্বনা দিলেন : কোনও চিন্তা করিও না। তোমার রোগ সারিয়া যাইবে। বছরের এই ঋতুতে সবারই এই রোগ হইয়া থাকে।

কিন্তু ল্যাংলি সাহেবের চিকিৎসায় আমি ভাল হইলাম না। ডা. মার্টিনোর স্টাডি-অব-রিলিজিয়ন পড়িয়া ধর্মের প্রতি আমার বিরূপ ভাব কমিল না। আল্লার প্রতি আমার মতিগতি বদলাইল না। নাস্তিক্যের প্রতি আমার ঈমান এতটুকু ক্ষুণ্ণ হইল না। বরঞ্চ ডা. মার্টিনোর কোনও কোনও যুক্তি আমাকে সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে আরো শক্ত করিয়া তুলিল।

.

১২. অধ্যাপক ভট্টাচার্য

ল্যাংলি সাহেব যা পারিলেন না; অধ্যাপক উমেশ ভট্টাচার্য তা পারিলেন। তিনি সক্রেটিসের ডায়লেকটিক ম্যাথডে আমার সঙ্গে তর্ক করিয়া অর্থাৎ আমার প্রায় সব কথার সমর্থন করিতে করিতে এক বেকায়দা জায়গায় আনিয়া ফেলিলেন। উমেশ বাবু ডগমা রিলিজিয়ন, এমনকি খোদার সর্বজ্ঞতা ও সর্বশক্তিমানত্বের প্রশ্নেও আমার সহিত একমত হইবার পর অবশেষে অত্যন্ত অকস্মাৎ তিনি বলিয়া বসিলেন : খোদা আছেন এটারও যেমন কোনও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমাণ নাই, খোদা যে নাই তারও কোনও প্রমাণ নাই, কি বল?

আমি হঠাৎ চমকিয়া উঠিলাম। তাই ত। কিসের জোরে আমি খোদা নাই বলিয়া কুঁদিয়া বেড়াইতেছি? আমার পকেটে টাকা বা সিগারেট নাই; ঘরে খাবার নাই, টেবিলে পুস্তক নাই, এসব কথা যেমন নিজের জ্ঞানে বলিতে পারি। সৌরজগতে আল্লাহ নাই, এ কথা কি তেমনি নিজের জ্ঞানে বলিতে পারি? আমাকে চিন্তা করিতে দেখিয়া উমেশ বাবু হাসিলেন। তিনি কান্টের বই হইতে খানিকটা পড়িয়া শুনাইলেন। ওতে লেখা ছিল : আল্লাহ অজ্ঞাত ও অজ্ঞেয়। তিনি মানুষের সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বাহিরে ও উর্ধ্বে বলিয়া কেউ তাঁকে জানেও নাই, জানিতে পারিবেও না। কান্টের উক্তি শেষ করিয়া উমেশ বাবু বলিলেন : তবু কান্ট খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। সব খোদা-বিশ্বাসীরাই না জানিয়া খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে তোমার মত এই না জানিয়া ‘খোদা আছেন’ বলার দরুন এঁদের মতকে যদি যুক্তিহীন ডগমা বলিতে চাও, তবে তুমি যে না জানিয়া ‘খোদা নাই’ বলিতেছ, এটা ত সেই কারণেই যুক্তিহীন ডগমা।

.

১৩. এ্যাগনস্‌টিক

উমেশ বাবুর ঐদিনকার কথায় আমার চিন্তা-স্রোতের মোড় ঘুরিয়া গেল। আমি বুঝিলাম নাস্তিক্যবাদের পক্ষে আমি এতদিন যত কথা বলিয়াছি, যত যুক্তি দিয়াছি, সব ভুল। তার একটারও ভিত্তি নাই। তা যদি না থাকে তবে কী? আল্লাহ আছেন কি নাই, তা আমরা জানি না। জানিতে পারিও না। এই মতে, মানে সন্দেহে, যখন দৃঢ় হইলাম, তখন নূতন চিন্তার সম্মুখীন হইলাম। আচ্ছা না হয়, আল্লাহ আছেন কি নাই, তা লইয়া মাথা ঘামাইলাম না; কারণ মাথা ঘামাইয়া কোনও লাভ হইবে না, বুঝিলাম। কিন্তু চিন্তা যে এখানে আসিয়াই থামিয়া যায় না। আল্লাহ থাকিলেও যখন দূরে আছেন, নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজনে যখন তাঁকে পাইতেছি না, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় যখন তাঁর সাক্ষাৎ পাইতেছি না, কাজেই তার কথা না হয় নাই ভাবিলাম। যদিও চিন্তক মন এই নৈরাশ্যবাদকে মানিয়া লইতে চায় না; কোনও একটা বিষয় চিরকাল মানবমনের অগোচরে থাকিয়া যাইবে যদিও মন এটা মানিয়া নিতে চায় না; তবু না হয় ধরিয়া নিলাম, খোদার চিন্তা নাই করিলাম মনকে এ ব্যাপারে চোখ বুজিয়া থাকিতে রাজি করিলাম। কিন্তু আমার নিজের সম্বন্ধে চিন্তা না করিয়া ত পারি না। আল্লাহ নাই না হয় মানিলাম, কিন্তু আমার মন ও আত্মা নাই, এ কথাটা অত সহজে মানিয়া লওয়া যায় না। হিউমের বইয়ে পড়িয়াছি, মন বা আত্মা বলিয়া আমাদের কোনও স্বতন্ত্র সত্তা বা অস্তিত্ব নাই। ডেকার্তে বলিয়াছেন, আমাদের মন ও দেহ দুইটা স্বতন্ত্র বস্তু। দুইটার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই আমাদের জীবন। এই মত লইয়া কোনও রকমে বাঁচা যাইত। কিন্তু হিউম আসিয়া স্পষ্টই বলিয়া দিলেন যে, মন বা আত্মা বলিয়া আমাদের স্বতন্ত্র কোনও অঙ্গ নাই। আমাদের দেহে যে সব ইন্দ্রিয় বা প্রত্যঙ্গ আছে, তাদের অভিজ্ঞতার সমষ্টিকেই আমরা মন বলিয়া জানি। ডেকার্তে বলিয়াছেন : কব্জিটো আরগো সাম আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি। হিউম বলিলেন : আমি বলিয়া কোনও স্বতন্ত্র সত্তা নাই; আমি নামক দেহটির মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, হাত-পা, নাসিকা, জিভ ও চামড়ার বোধ বা অভিজ্ঞতার যোগফলকেই আমরা আমার সত্তা, আমার মন বা আমার আত্মা বলিয়া ভান করিতেছি। আমার দেহের ঐ সব অঙ্গ একটা একটা করিয়া হাঁটিয়া ফেলিলেই বুঝিতে পারিব যে ঐ সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা ইন্দ্রিয়ের বাইরে মন বা আত্মা বলিয়া কোনও বস্তু নাই।

এটা বড় সাংঘাতিক কথা। আমার প্রেম-হিংসা, স্নেহ-ক্রোধ, মহত্ত্ব নীচতা, দয়া-প্রতিশোধ, সুখ-দুঃখ, আশা-নৈরাশ্য সবই কি তবে ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতামাত্র। ধর্ম না থাকায় আমি বুদ্ধির মুক্তি লাভ করিয়াছিলাম, ভালই হইয়াছিল। আল্লাহ না থাকায় আমার বিশেষ কিছু আসে যায় নাই। কিন্তু এখন যে সব গেল! আমার মন, অন্তর, আত্মা, কিছু যদি না থাকিল, তবে আমার জীবনের সার্থকতা কি? আমার জ্ঞান-বিদ্যা-চৰ্চ্চার অর্থাৎ আমাদের শিল্প-সাহিত্য, দর্শন-বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য কি? এক কথায় মানুষের জীবনই ব্যর্থ ও নিরর্থক হইয়া যায়। মানুষও এক প্রকার জন্তু বটে। কিন্তু তাই বলিয়া তারা কি গরু-বকরির চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়? মন-অন্তর-আত্মাই যদি মানুষের না থাকিল তবে সে শ্রেষ্ঠত্ব কোথায়?

ইম্যানুয়েল কান্টের মত হইতে সান্ত্বনা পাইবার চেষ্টা করিলাম। তিনি লিখিয়াছেন, মানুষের মন ও আত্মা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু আল্লাহকে যেমন আমরা জানিতে পারি না, পারিবও না, তেমনি আমাদের মন ও আত্মাকে আমরা জানিতে পারি না।

ফলে চারি বছরের ঘোরতর নাস্তিক আমি চারি মাসের মধ্যে নাস্তিক্যকে যুক্তিহীন ও ভিত্তিহীন ডগমা বলিয়া বর্জন করিলাম। ফলে আস্তিকও থাকিলাম না। নাস্তিকও থাকিলাম না। যা হইলাম তাকে ইংরাজিতে বলা যায় এ্যাগনস্‌টিক। বাংলাতে তাকে অজ্ঞেয়বাদী বলা যাইতে পারে। ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার বুঝাইতে হইলে বলিতে হয় চিন্তারাজ্যের ত্রিশঙ্কু অবস্থা।

 

অধ্যায় নয় – প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া

১. খিলাফত ও স্বরাজ আন্দোলন

কিন্তু চিন্তারাজ্যের এই ত্রিশঙ্কু অবস্থা আমার বেশি দিন বরদাশত হইল না। জানি না’ এবং জানা সম্ভব নয় এই ধরনের কথাই আমার ধাতে সহিত না। শৈশবে যখন মুরুব্বিদের কাছে কোনও ব্যাপারে এই ধরনের কথা শুনিতাম, তখন আমি। মনে মনে উহা অগ্রাহ্য করিতাম। তমিয-লেহাযের খাতিরে মুখে মুখে কিছু না বলিলেও মনে মনে জিদ করিতাম, ওটা আমাকে জানিতেই হইবে।

কাজেই আমার শ্রদ্ধেয় গুরুদেব অধ্যাপক ভট্টাচার্যের এবং আমাদের উভয়ের গুরু ইম্যানুয়েল কান্টের অজ্ঞেয়বাদ শেষ পর্যন্ত আমার প্রাণে অশান্তি ও অস্বস্তির আগুন জ্বালাইয়া দিল। আমার চিন্তারাজ্যে অবর্ণনীয় ঝড়-তুফান ও ওলট-পালট চলিতে থাকিল।

এই সময় দেশ খিলাফত ও স্বরাজ আন্দোলনের বন্যায় ভাসিয়া গেল। আমিও ভাসিলাম। এই আন্দোলনের ইনটেলেকচুয়াল দিকটা সহজেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। আমি মহাত্মা গান্ধীর ইয়ং ইন্ডিয়ার গ্রাহক হইলাম। শুরু হইতে উহার লেখা পড়িবার জন্য ব্যাক নাম্বারের কপিগুলির একত্রে বাঁধন কপি কিনিয়া ফেলিলাম। মহাত্মাজীর লেখার মধ্যে আমি খিলাফত স্বরাজ আন্দোলনের আধ্যাত্মিক দিকের সন্ধান পাইলাম। মহাত্মাজীর লেখা ছাড়া এই সময় আমি স্বামী বিবেকানন্দের ও রবীন্দ্রনাথের কতকগুলি লেখা পড়িয়া একদম আকৃষ্ট হইয়া পড়িলাম।

শেষ পর্যন্ত আমি যখন খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করি, তখন আমি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত মানুষ। এই পরিবর্তন দেহ-মন উভয় দিক থনেই হইয়াছিল। মনের দিককার কথা পরে বলিতেছি। আগে দেহের। কথাটাই বলিয়া নেই।

আমি পোশাকের বাবুগিরি একদম বর্জন করিলাম। খদ্দরের তহবন্দ ও কল্লিদার লম্বা কোর্তা (পাঞ্জাবির চেয়ে বেশি লম্বা বটে, কিন্তু মৌলবী সাহেবদের কোর্তার চেয়ে কম লম্বা) পরিলাম। মাথায় গান্ধী টুপি বসাইলাম। শেভ করা ছাড়িয়া দিলাম। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই চাপদাড়িতে গাল ভরিয়া উঠিল। মোহাম্মদী আলেমদের মধ্যে সুন্নতি বাবরি চুল রাখার রেওয়াজ আছে। আমিও সুন্নতি বাবরি রাখিলাম। সুন্নতি বাবরি মানে ঘাড়ের সমান কাটা বাবরি। হিন্দু-সন্ন্যাসী, মুসলমান শাহ ফকির বা শিখেরা মেয়ে লোকের মত লম্বা চুল রাখিয়া যে ধরনের বাবরি রাখে সুন্নতি বাবরি তেমন নয়। পয়গম্বর সাহেবের সুন্নত বলিয়া কাঁধ সমান উঁচা একটা বাঁশের লাঠিও লইলাম। গান্ধীজির অনুকরণে জুতা ছাড়িয়া প্রথমে খালি পায়ে এবং কিছুদিন খড়ম পায়েই আন্দোলন শুরু করিয়াছিলাম। কিন্তু খড়ম পায়ে বেশি দূর চলাফেরা করা যায় না। অথচ পুরাতন ডার্বি অক্সফোর্ডেও ফিরিয়া যাওয়া যায় না। কাজেই আগাগোড়া সুন্নতি লেবাছের সাথে খাপ খাওয়াইয়া বিহারিদের মত দেলওয়ারী’ জুতা পরিলাম। দেলওয়ারী মানে নাগরা বা সেলিমশাহী নয়। দেলওয়ারী জুতার মাথা চোখাই হউক আর ভোতাই হউক, ওটা লাল চামড়ার হইবে এবং সবুজ চামড়ার মেইন বর্ডার থাকিতে হইবে। আজকাল এ ধরনের জুতা আমার নজরে পড়ে না বলিয়াই এই কথা কয়টা বলা দরকার বোধ করিলাম। এই ভাবে আমি পুরা সুরতি বা পোশাকি মুসলমান হইয়া গেলাম।

.

. পুনরায় ধর্মে মতি

এইবার দেখা যাক সিরাতে বা চরিত্রে কতটুকু মুসলমান হইলাম। নামাজ রোযা পুরা মাত্রায় শুরু করিলাম ঠিক; কিন্তু এবার নামাজ-রোযাকেই আমি একমাত্র বা শ্রেষ্ঠ এবাদত বলিয়া মনে মনে মানিয়া লইলাম না। নিয়মিত নামাজ-রোযা ধরিলাম নিজের কথা ও কাজে সংগতি রাখিবার জন্য। কংগ্রেস ও খেলাফতের বড় বড় জনসভায় কোরআন-হাদিস হইতে মূল আরবি আয়াত (অবশ্য ছোট ছোট) আবৃত্তি করিয়া বক্তৃতা করিতাম। ছেলেবেলা হইতেই খোশ-ইলহানে দরায় গলায় কোরআনের কেরাত আবৃত্তি করা আমার অভ্যাস ছিল। মাঝখানে চার বছর নামাজ পড়ি নাই, কেরাতও আবৃত্তি করি নাই। অবিশ্রান্ত ফুট ও বাঁশি বাজাইয়া গলা নষ্ট করিয়াছি। কিন্তু স্বরাজ খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়া বিলাসিতার বস্তু হিসাবে ফুট-বাঁশি বর্জন করিয়াছি এবং নিয়মিত নামাজও ধরিয়াছি। এতে আশ্চর্য রকম অল্পদিনে আমার কেরাতি গলা ফিরিয়া আসিল। দুই-এক সভায় মগরেবের নামাজের এমামতি করিয়া নিজের খোশ-ইলহানকে আবার মশহুর করিয়াছিলাম। কাজেই এমামতিতে আমার ডাক পড়িয়া গেল। কিন্তু বুঝিলাম ইলহানই শুধু আসিল, খোশ আর আসিল না। গলা আসিল কিন্তু দায় আসিল না। মুখরেজ-তালাফুযে আমার কাবেলিয়াত আমাদের অঞ্চলের আলেম-ওলামাদেরও জানা ছিল। কাজেই খুব উচা দরজার মওলানা-মৌলবী উপস্থিত না থাকিলে আলেমরাও আমাকেই এমামতি করিতে ঠেলিয়া আগাইয়া দিতেন। অনেক সময় মুকতাদিদের দাবিতেই আলেমরা এই ত্যাগ স্বীকার করিতেন।

স্বরাজ-খেলাফতের বক্তৃতা করিতে করিতে আমি সহবক্তা আলেমদের মত কিছু কিছু ওয়ায-নসিহত করিতাম। এই ওয়াযে আমি আলেমদের মামুলি বক্তৃতার অনুকরণে রোযা-নামাজের কথা বলিতাম না। ছেলেবেলা হইতে আলেম-ফাযেলদের ওয়াযের নিয়মিত শ্রোতা হিসাবে আমার অভিজ্ঞতা এই যে, আলেমরা যে তাদের ওয়াযে শুধুই নামাজ-রোযা, হজ যাকাতের কথা বলেন, সাধারণ শ্রোতাদের এটা পছন্দ হয় না। একই কথা। একই ধরনে শুনিতে শুনিতে শ্রোতারা ঐ সব ওয়াযে কোনও রস পায় না। ওয়ায শুনিলে সওয়াব হয়, আলেমরা তাদের প্রত্যেক বক্তৃতায়ই কোরআন হাদিস দ্বারা তা প্রমাণ করিয়া থাকেন। শ্রোতারা এসব কথা বিশ্বাস করে। তাই শুধু সওয়াবের আশাতেই শ্রোতারা ওয়াযের মজলিসে বসিয়া থাকে। একটু জ্ঞান হইয়াছে অবধি আমি এই ধরনের ওয়ায না-পছন্দ করিতাম। ব্রাহ্ম ও খৃষ্টান বক্তাদের বক্তৃতার মধ্যে শ্রোতাদের শিখিবার মত অনেক কথা থাকে, এ অভিজ্ঞতা আমার হইয়াছে। শুধু সওয়াবের আশায় নহে, কিছু শিখিবার জন্যও মুসলমান শ্রোতারা ওয়ায শুনুক, এ কথা আমার মনে। আগে হইতেই জাগরূক হইয়াছিল। অনেক আলেম বন্ধুকে আমার মনের কথা বলিয়াছি। শুধু নামাজ-রোযা, হজ-যাকাত ও হায়েয-নেফাসের মসলা মসায়েল না বলিয়া চরিত্র গঠন, সত্য কথন, স্বাস্থ্য পালন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, পরোপকার, নাগরিক কর্তব্য, প্রতিবেশীর প্রতি কর্তব্য, ব্যবসা বাণিজ্য, হক-হালাল রুজি-রোযগার ইত্যাদি ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যাপারে বক্তৃতা করিবার জন্য আমি অনেক মৌলবী বন্ধুকে উপদেশ দিয়াছি। যে কোনও কারণেই হউক, তাঁরা কেউ আমার কথায় কান দেন নাই।

.

. ওয়াযে নূতনত্ব

কাজেই খিলাফত স্বরাজের সভা-সমিতিতে আমি নিজেই যখন স্বরাজ স্বাধীনতার কথার সাথে ওয়ায-নসিহত শুরু করিলাম, তখন নিজের বহুদিনের পোষা অভিমতকে নিজেই কাজে লাগাইবার চেষ্টা করিলাম। আমার বক্তৃতায়। শরিয়ত ও মসলা-মসায়েলের কথা খুব কমই থাকিত। ঐ সব ব্যাপারে সামান্য একটু ভূমিকা করিয়াই আমি শ্রোতাদের বাস্তব ও ব্যবহারিক জীবনের কর্তব্যের কথা বলিতে শুরু করিতাম ও চাষবাসের কাজে ব্যাঘাত না ঘটাইয়াও কীভাবে সকল ছেলেমেয়েকেই প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া যায়, তার সহজ ফন্দি-ফিকির বাতলাইতাম। সকল অবস্থার চাষি ভাইরাই যে কাপড়ের খরচা এক পয়সা না বাড়াইয়াও যার-তার বাড়ির মেয়েদেরে কোর্তা পরাইতে পারেন, কাপড়ের গজ ইঞ্চি সিলাইর খরচা হিসাব করিয়া তা বুঝাইয়া দিতাম। বনে-জঙ্গলে ও বাড়ির পিছাড়িতে যেখানে সেখানে পেশাব-পায়খানা না করিয়া সামান্য খরচে কীভাবে পুরুষ ও মেয়েদের জন্য বাড়ির ভিতরে ও বাইরে দুইটি স্বতন্ত্র পায়খানা নিজ হাতে তৈয়ার করা যায়, কাঠ-বাঁশের হিসাব করিয়া তার সহজ সাধ্যতা এবং উপকারিতা বুঝাইতাম। বাড়ির আশেপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করা, পুষ্করিণী, কুয়া-ইন্দারা সাফ রাখা, গোহাল পরিচ্ছন্ন রাখা, বাড়ির ভিতর বাহির উঠান ঝাড়ু দেওয়া, বাড়ির সামনে দু-চারটা ফুলের গাছ ও বাড়ির পিছনে শাক-সবজির গাছ লাগাইবার সহজ উপায় ও উপকারিতা বর্ণনা করিতাম।

সদা সত্য বলায়, পরোপকার করায়, এমনকি রোযা-নামাজেও যে গরীব জনসাধারণের বাস্তব অসুবিধা আছে সে কথা সরলভাবে উল্লেখ। করিতাম। কেউ যে ইচ্ছা করিয়া মিথ্যা বলে না, পরের অনিষ্ট করে না, নামাজ-রোযা তরক করে না, নিতান্ত বাধ্য হইয়াই যে করিয়া থাকে, দরদের সাথে এই সব কথা বলিয়া শ্রোতাদের মন জয় করিয়া ফেলিতাম। তাঁরা মনে করিত, তাদের অভাব-অসুবিধা আমি বুঝি এবং দরদ দিয়াই তাদের অবস্থা বিবেচনা করিয়া থাকি। আমি বহুবার লক্ষ করিয়াছি, এসব কথা বলিবার সময় শ্রোতারা গলা বাড়াইয়া, কান খাড়া করিয়া, হা করিয়া আমার কথা শুনিয়াছে। এই সব কথার মধ্যে দুইটা কথার জন্য আমার খুব নাম পড়িয়া গিয়াছিল বলিয়া কথা দুইটা আজও আমার মনে আছে। আমি অনেক বক্তৃতায় এই ধরনের বক্তৃতা করিতাম : আমাদেরে সদা সত্য কথা বলিতে উপদেশ দেওয়া হয়। সেটা যে উচিৎ তাও আমরা বুঝি। কিন্তু তা। সম্ভব না। ঘর-সংসার করিতে গেলে, দেনা-পাওনার মধ্যে অভাবের সংসার চালাইতে গেলে, ঝগড়া-ঝাটি না করিয়া কায়-কারবার ও বেচা-কেনা করিতে গেলে, অনেক সময় দু-চারটা ছোটখাটো মিছা কথা বলিতেই হয়। পরোপকার করা বিশেষত প্রতিবেশীর উপকার করা সওয়াবের কাজ, এটাও আমরা বুঝি। কিন্তু নিজের দুঃখ-ধান্ধা লইয়াই আমরা এত ব্যস্ত যে, দম ফেলিবার ফুরসত পাই না। পরের উপকার করিব কখন? সে জন্য আমার উপদেশ এই যে সদা সত্য কথা বলার চেষ্টা বাদ দিয়া আপনারা যার-তার সুবিধামত সপ্তাহের একটি দিন ঠিক করেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, ঐ দিনটিতে আপনি মিছা কথা বলিবেন না; অন্ততপক্ষে একটি লোকের একটি উপকার করিবেন। সে উপকার যতই ছোট হউক। কাজে না হউক মুখের কথায় হউক, তাতে কিছু মনে করিবেন না, বড় উপকারও উপকার, ছোট উপকারও উপকার। কাজ দিয়া উপকারও উপকার, কথা দিয়া উপকারও উপকার। উপকার কথাটা শুনিয়াই আমরা ঘাবড়াইয়া যাই। মনে করি, টাকা-পয়সা খরচ দরকার। ওটা ভুল। একজনের গরুতে আরেকজনের ক্ষেত খাইতেছে, আপনি ইচ্ছা করিলেই ঐ গরুটা খেদাইয়া খেতওয়ালার উপকার করিতে পারেন। একজনের আইলের পল্লাটা ভাঙ্গিয়া ক্ষেতের পানি সরিয়া যাইতেছে। হউক না ক্ষেতওয়ালা আপনার অনাত্মীয় বা শত্রু। আপনি যদি এক টুকরা মাটি ফেলিয়া পল্লাটা বন্ধ করিয়া দেন, তবে ক্ষেতওয়ালার যে উপকার হইবে, সে তা জানিবে না সত্য, কিন্তু সকলের উপরের যিনি দেখনেওয়ালা তিনি দেখিবেন। উপকৃতের অজ্ঞাতে উপকারের যে কী সওয়াব আল্লা দিবেন না আপনারা কল্পনা করিতে পারিবেন না।

.

. পীরগিরির উপক্রম

এমনি দৃষ্টান্ত হাজার দিতাম। সবই পল্লিজীবনের ঘটনা। এই ধরনের ওয়ায পাড়া-গাঁয়ে একদম নূতন। শুধু এই নূতনত্বের জন্যই আমার বক্তৃতা জনপ্রিয় হইল। চারদিক হইতে আমার ডাক পড়িতে লাগিল। কারো কাজ বা চাল-চলন ভাল লাগিলেই আমাদের জনসাধারণ তাকে অতিরিক্ত বিশ্বাস করিয়া বসে এবং প্রাপ্যাধিক মর্যাদা দিয়া থাকে। এখানে আমার কথাগুলি নূতন; আমি বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা ইংরাজিওয়ালা লোক; কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমি নামাজ-রোযা করিতাম না বলিয়াও জনসাধারণ কানাঘুষা করিয়াছে! সেই লোকটার মুখে এমন সব নূতন কথা! এটা ত সাধারণ ব্যাপার নয়। নিশ্চয়ই লোকটা কোনও বুযুর্গের সহবত অথবা দোওয়া পাইয়াছে। খুবই সম্ভব। এদের বংশে ত এই ধরনের লোক আগেও হইয়াছে।

বস্, আর যায় কোথায়? দোওয়া-তাবিজ ও পানিপড়া, সজ-পড়ার জন্য লোকজন আমার কাছে আসিতে লাগিল। এসব ব্যাপারে ‘না’ করাও যায় না। আমি কিছু জানি না বলিলেও কেউ বিশ্বাস করিবে না। বরঞ্চ তাতে বুযুর্গি আরো বাড়িয়া যাইবে। সুতরাং তাবিজ-কবচ, পানি-পড়া, সজ-পড়া, মাটি পড়া দিতে লাগিলাম। নক্‌শে-সোলেমানী’ চার খণ্ড আমাদের বাড়িতেই ছিল। উহা দেখিয়া তাবিজ দিতে লাগিলাম। কখনও কোরআনের এক-আধটা আয়াত পড়িয়া কখনও ‘আল্লা এই রোগীকে ভাল করিয়া দাও, মনে মনে বাংলায় এইটুকু বলিয়াও পড়া দিয়াছি। মনে করিয়াছি, যে একবার যাইবে সে আর আসিবে না। কিন্তু তা হয় নাই। অনেকেই উপকার পাইয়াছে। আমার তাবিজে বা পানি-পড়ায় রোগী সঙ্গে সঙ্গে ভাল হইয়া গিয়াছে। কাজেই আর দুইটা নূতন রোগীর জন্য পানি-পড়া নিতে আসিয়াছে। এই সব রোগী বা তাদের আত্মীয়স্বজন প্রথমে ডালিম, আনারস, তার পর মুর্গী, খাসি এবং পরে টাকাপয়সা নজর লইয়াও আসিয়াছে।

আশ্চর্য হইয়া ভাবিয়াছি, এমনি ঝরে বক মরার সুযোগ লইয়া অনেক শাহ ফকির তাঁদের কেরামত বাড়াইয়াছেন এবং প্রচুর রোযগার করিতেছেন। এমনি ব্যবসা আরো অনেক শ্রেণীর লোকেরাই অবশ্য করিতেছে। জ্যোতিষী বা হস্ত-রেখা পরীক্ষা করিয়া যারা রোযগার করিতেছেন, তাদের কাজও প্রায় এই রূপ। যতই আন্দাযি ভবিষ্যদ্বাণী করুন, দু-চারটা মিলিয়া যাইবেই। ভাল চিকিৎসাবিজ্ঞানীর মুখে শুনিয়াছি, শতকরা পঞ্চাশের বেশি রোগ এমনি ভাল হইয়া যায়। প্রকৃতি নিজেই রোগের সঙ্গে লড়াই করিয়া জয়লাভ করে। কাজেই বিনা চিকিৎসায়ও ঐসব রোগী ভাল হইয়া যাইত। পক্ষান্তরে দেশের শ্রেষ্ঠ ডাক্তারের হাতেও রোগী মারা যায়। এই কারণে সাধারণ ডাক্তারের কাজ কতকটা ঐ গণকদের মতই। দোওয়া-তাবিজ, পানি-পড়াও তাই। কাজেই গণক বা ডাক্তারদের ব্যবসা দোষের না হইলে তাবিজ-পানি পড়াওয়ালাদের ব্যবসাটাই দোষের হইবে কেন?

কিন্তু তাবিজ-পানি-পড়াওয়ালাদের ব্যবসা নিছক চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকে না। আরোগ্যের জন্য তাবিজ দিতে দিতে এঁরা শেষ পর্যন্ত আখেরাতের জন্যও তাবিজ দিতে শুরু করেন। স্বাস্থ্য বিক্রয়ের ব্যবসা হইতে প্রমোশন পাইয়া এরা ক্রমে বেহেশত বিক্রয়ের ব্যবসা আরম্ভ করেন। এঁরা নিজেরা বদমায়েশি বুদ্ধি হইতেই যে এই ব্যবসা শুরু করেন, তা নয়। বিশ্বাসপ্রবণ জনসাধারণই এঁদের