কিন্তু আল্লাহর ওয়াদা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরিবর্তনটা যদি আল্লাহর জন্যই হয়, তাহলে জেনে রাখুন–আপনার পাশে যখন আল্লাহ থাকেন, তখন দুনিয়ার আর কোনো সাহায্যকারীকেই আপনার দরকার নেই। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উপদেশ দিতে গিয়ে একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘জেনে রাখো, যদি সমগ্র উম্মাহ তোমার উপকার করতে একতাবদ্ধ হয়, তাহলে কেবল ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু তোমার তাকদিরে আল্লাহ লিখে রেখেছেন। আর যদি সমগ্র উম্মাহ তোমার ক্ষতি করতে জোটবদ্ধ হয়, তাহলে কেবল ততখানি ক্ষতিই করতে পারবে, যতখানি তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন আল্লাহ।[২]
আপনি যদি মনে করেন, নিজেকে বদলে নিলে, মুখে দাড়ি রেখে নিলে, বোরকা-হিজাবে নিজেকে আবৃত করে নিলে, সুন্নাহর রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নিলে চারপাশের মানুষেরা আপনাকে সাহায্য করা বন্ধ করে দেবে, আপনার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেবে, আপনার পাশে থাকা বন্ধ করে দেবে এবং এতে আপনার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে, আপনার জীবন স্থবির হয়ে যাবে; তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। চারপাশের মানুষেরা মিলে নয়, গোটা দুনিয়া সংঘবদ্ধ হয়েও যদি আপনার উপকারের চেষ্টা করে, কিন্তু তা যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনার তাকদিরে না রাখেন, তাহলে কারো সাধ্য নেই আপনার উপকার করে। আবার গোটা দুনিয়া একত্র হয়েও যদি আপনার বিরুদ্ধে লাগে, আপনার ক্ষতি করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ যদি কোনো ক্ষতি আপনার তাকদিরে না রাখেন, কারো সাধ্য নেই যে, আপনার একবিন্দু ক্ষতি করে। এই যদি হয় অবস্থা–তাহলে বলুন, নিজেকে বদলানোর ব্যাপারে পাছে লোকে কী বলছে, তা ভেবে সময় নষ্ট করবার মতো সময় আপনার হাতে থাকা উচিত?
———-
[1] সহিহুল বুখারি : ৪৯৭১; সহিহ মুসলিম : ২০৮; তাফসিরুত তাবারি, খণ্ড : ১৯; পৃষ্ঠা : ৪০৮;
তাফসিরু ইবনি আবি হাতিম, খণ্ড :১০; পৃষ্ঠা : ৩৪৭৩; বাইহাকি : ১৭৭২৫
[2] জামি তিরমিযি : ২৫১৬; মুসনাদু আহমাদ: ২৭৬৩; মুসতাদরাকুল হাকিম: ৬৩০৩; রিয়াযুস সালিহিন : ৬২
১০. খুলে যাক জীবনের বদ্ধ দুয়ার
এক.
একবার এক ভাই আমার অফিসে এসে বললেন, ‘আরিফ ভাই, একটা কথা ভাবছি।’
আমি বেশ আগ্রহের সাথেই বললাম, ‘কী কথা?’
‘ভাই, ভাবছি বিয়ে করবো।
বিয়ের কথাটা শুনে আমি খানিকটা চমকালাম। আমার সামনে বসা মানুষটা তিন সন্তানের জনক। এমনও নয় যে, তার বিয়ের ব্যাপারটা আমার কাছে অজানা কিছু। সুতরাং, তার মুখে নতুন করে বিয়ের কথা শোনাটা হালকা চমকে ওঠার মতোই ব্যাপার। আর আজকাল হয়েছে কী, মানুষজন দ্বিতীয়-তৃতীয় বিয়ে নিয়ে এত মজা-মশকরা করেন যে, বিয়ের মতো গুরুতর ব্যাপারও আজকাল হাসি-তামাশার ব্যাপারে পরিণত হয়েছে! আমাদের এই অধঃপতনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার দায়টাও অবশ্য কোনো অংশে কম নয়।
যা-হোক, উৎসাহের সাথেই ভাইটাকে বললাম, ‘মাশা আল্লাহ, বিয়ের চিন্তা তো বেশ ভালো, কিন্তু হঠাৎ করে দ্বিতীয় বিয়ের চিন্তা এলো কেন মাথায়?
আমি খেয়াল করলাম তার মুখ বেশ ফ্যাকাশে ও মলিন। চোখে-মুখে বিষণ্ণতার ছাপ গাঢ় হয়ে ধরা পড়ছে। চেহারার এমন দুর্দশা নিয়ে আর যাই হোক, মজা করার জন্য যে তিনি আমার কাছে বিয়ের ব্যাপারটা উত্থাপন করেননি–সে ব্যাপারে আমি ঘোরতর নিশ্চিত।
‘আসলে ভাই, জীবনে কেমন যেন ছন্দহারা হয়ে পড়েছি। যেদিকেই যাচ্ছি কোনো গতি পাচ্ছি না। কত দিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছি একটা ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য, কোনোভাবেই কুল-কিনারা হচ্ছে না। যেখানেই হাত দিচ্ছি মনে হচ্ছে, ক্ষতি ছাড়া আর কোনোকিছুই উঠে আসছে না। জীবন থেকে বারাকাহ একেবারে উঠে গেলো মনে হয়। তাই ভাবছি আরেকটা বিয়ে করবো। বিয়ে করলে আয়-রোজগারে বারাকাহ আসে, তা তো জানেন?’–একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন ওই ভাই।
বুঝতে পারলাম, জীবন থেকে হারানো বারাকাহ ফিরে পেতে তিনি পুনরায় বিয়ের কথা ভাবছেন। ছন্দহীন যে জীবনের জাঁতাকলে পিষ্ট তিনি, তা থেকে মুক্তি লাভ করতে এবং জীবন থেকে হারানো বারাকাহ পুনরুদ্ধারে নতুন করে বিয়ে করাকেই তার কাছে এই মুহূর্তে সঠিক কাজ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
এটা ঠিক যে–বিয়ে করলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জীবনে বারাকাহ দেন, আয়-রোজগারে বারাকাহ দেন, তবে বিয়েই যে বারাকাহ লাভের একমাত্র পথ্য– তা কিন্তু নয়। বারাকাহ লাভের অনেকগুলো পথ ও পন্থা আছে।
তাকে অনেকটা মজা করেই বললাম, ‘বিয়ে তো একটা করেই আছেন ভাই, তারপরও যখন বারাকাহ পাচ্ছেন না, তখন বারাকাহ লাভের নতুন দরোজার সন্ধান করার চাইতে বারাকাহ আসার যে দরোজাগুলো বন্ধ হয়ে আছে, তা উন্মুক্ত করবার চেষ্টা করাই ঢের উত্তম নয় কি?
বলাই বাহুল্য, তিনি আমার গভীর দার্শনিকসুলভ কথাটা বুঝতে বেমালুম ব্যর্থ হলেন! কপালের কুঞ্চিত রেখাকে আরো দীর্ঘ করে তিনি বললেন, ‘কী-সব জটিল-কঠিন কথা বলেন ভাইজান। সহজ করে না বললে বুঝি কীভাবে বলেন?
আমি স্মিত হাসলাম। লিখতে দিলে খানিকটা সহজ করে হয়তো লিখতে পারি, কিন্তু বলতে দিলে যে আমি একেবারে তালগোল পাকিয়ে বসি–হাতেনাতে তার প্রমাণ পেয়ে একটু শরমিন্দা হলাম বটে।
‘না, আসলে বলতে চাইলাম যে, বিয়ে করলে বারাকাহ পাওয়া যায় এটা ঠিক, তবে বারাকাহ লাভের জন্য নতুন করে বিয়ে করার আগে, জীবন থেকে বারাকাহ চলে গেলো কেন, সেই কারণ উদঘাটন করাটাই বেশি জরুরি। হতে পারে এমন কোনো কাজ আপনি করে যাচ্ছেন, যা হয়তো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পছন্দ করছেন না। এমন কোনো কাজ যা আল্লাহকে আপনার ব্যাপারে ক্রোধান্বিত করে তুলছে। ফলস্বরূপ, আপনার জীবন থেকে তিনি বারাকাহ উঠিয়ে নিলেন। হতে পারে না এমন?
