ইসলাম গ্রহণের পর বাধ্য হয়ে অন্য সাহাবিদের সাথে তাকেও নিজের সকল সহায়-সম্পদ, সকল ব্যবসাপাতি ছেড়ে মদিনায় হিজরত করতে হয়। মক্কায় যিনি ছিলেন একজন সেরা ব্যবসায়ী, তাকে মদিনার মাটিতে পা রাখতে হলো একান্ত নিঃস্ব অবস্থায়! অবশ্য, অবস্থাটাকে তারা খুশি মনে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন।
মদিনার আনসার সাহাবিরা যখন মুহাজির সাহাবিদের সাথে নিজেদের সহায় সম্পদ ভাগাভাগি করে নিচ্ছিলেন, তখন একজন আনসার সাহাবি এসে আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার সম্পদের একাংশ দিতে চাইলেন যাতে মদিনায় জীবিকা নির্বাহে খুব বেশি অসুবিধে না হয়। তখন আনসার সাহাবিকে আব্দুর রহমান ইবনু আউফ বলেছিলেন, আল্লাহ তোমার পরিবারে আর সম্পদে অঢেল বারাকাহ দিন, কিন্তু তোমার সম্পদের আমার কোনো দরকার নেই। তারচে বরং তুমি আমাকে বাজারটা দেখিয়ে দাও।
হিজরতের সময়ে যে যৎসামান্য টাকা সাথে এনেছিলেন, তাকে সম্বল করেই আব্দুর রহমান ইবনু আউফ নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে চাইলেন। তিনি একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী। সম্পদের সঠিক ব্যবহার করে কীভাবে নিজের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করা যায়–সে ব্যাপারে তার চাইতে ভালো আর কে জানে! তাই তিনি আনসারি সাহাবির দয়ার আশ্রয়ে না থেকে, নিজের একটা কিছু দাঁড় করানোর জন্য বাজারের সন্ধান চাইলেন।
তার কিছুদিন পরেই একদিন খুশিমনে আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলেন। তার শরীরে তখন দামী সুগন্ধির গন্ধ। নবিজি বললেন, ‘কি হে আব্দুর রহমান, কী ব্যাপার?
তিনি বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি বিবাহ করেছি?
বিস্মিত হয়ে নবিজি বললেন, ‘মাশাআল্লাহ! মোহরানা কী দিয়েছো?
‘স্বর্ণ। একটা খেজুর আঁটির সমান।
‘বাহ, তাহলে এখন তো খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করা লাগে। যাও, একটা বকরি দিয়ে হলেও ওয়ালিমার ব্যবস্থা করো।’[১]
চিন্তা করুন, সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে আসায় আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামনে ছিলো মদিনায় বিনা পরিশ্রমে সম্পত্তি লাভের সুযোগ। সে সুযোগ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তৈরি করে দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি এমন সুযোগ গ্রহণ করলেন না। যোগ্যতা দিয়ে তিনি অর্জন করতে চেয়েছেন নিজের অবস্থান। দক্ষতার জায়গাটা তো তার চেনাই আছে। পথ খুঁজে পেলে লেগে পড়তে পারেন।
বিনা পরিশ্রমে সম্পদ লাভের চাইতে আব্দুর রহমান ইবনু আউফ চেনা পথটার সন্ধানে নেমে গেলেন বরং। অর্পিত সম্পদের প্রস্তাবকে নাকচ করে তিনি জেনে নিলেন বাজারের রাস্তা। সেখানে গিয়ে সাধ্যমতো মালপত্র কিনে তা বিক্রি-বাট্টাতে লেগে গেলেন। আর আমরা তো জানি–যে লেগে থাকে এবং প্রাণান্তকর চেষ্টা করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাও তাকে সাহায্য করেন। অলস আর অকর্মণ্য। লোকের জন্য কখনোই আল্লাহর সাহায্য আসে না।
রিক্তহতে আসা একজন সাহাবি ওই সময়ে সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবেশে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য করে স্বর্ণ দিয়ে মোহরানা পরিশোধ করে বিয়ে করছেন–মদিনার আনসারদের কাছেও তা ভারি আশ্চর্যের ছিলো বটে!
হালাল উপার্জনের মাধ্যমে আমরা যারা বড় হতে চাই, নিজের একটা অবস্থান তৈরি করতে চাই, আব্দুর রহমান ইবনু আউফ আমাদের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণার নাম। নিজের দক্ষতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন বলেই তিনি সম্পদের প্রস্তাব নাকচ করে পথের সন্ধান চেয়েছিলেন। আমরাও যদি আমাদের দক্ষতার জায়গাগুলোকে পোক্ত করতে পারি, যদি নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারি জ্ঞানে-দক্ষতায়, আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো আমরাও নিজেদের পথটাকে খুঁজে নিতে পারবো অন্যের গলগ্রহ হয়ে না থেকে।
আব্দুর রহমান ইবনু আউফ দুনিয়া অর্জন করেছেন, কিন্তু হারিয়ে ফেলেননি অনন্ত সুখের আখিরাত। কেমন তাকওয়াবান, ঈমান আর আমলদার হলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দুনিয়াতেই জান্নাত লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করেন, ভাবা যায়?
দুনিয়াকে খুঁজতে কোনো অসুবিধে নেই তা যদি আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো হয়।
চার.
পরিবারে দাওয়াহ দেওয়ার ক্ষেত্রে অসহিষ্ণু হলে চলবে না। দ্বীনের পথে হাঁটতে গেলে অনেক অপমান-অপবাদ-তিরস্কার ধেয়ে আসবে–এটাই অমোঘ নিয়তি। এটা মাথায় রেখেই আমাদেরকে চারপাশের পরিস্থিতি এবং পারিবারিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। আমরা রাতারাতি পরিবার এবং আশপাশের সবাইকে পাক্কা ধার্মিক বানিয়ে ফেলতে তৎপর হয়ে পড়ি। তার ফলে, যখন দেখা যায় যে, কেউ। আমাদের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছে না বা আমাদের কথাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না, তখন আমরা ব্যাপকভাবে হতাশ হয়ে পড়ি। নিকটজনেরা সদুপদেশে
সদিচ্ছা প্রদর্শন না করলে খারাপ লাগে বটে, তবে সেই খারাপ লাগা যেন। আমাদেরকে এমন কোনো অবস্থায় না নিয়ে যায়, যেখানে আমার দ্বীন পালনটাও কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, মানসিকভাবে আমাদেরকে শক্ত থাকতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে–ইচ্ছে হলেই আমি কাউকে দ্বীনের পথে টেনে আনতে পারবো না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও পারেননি। এটা হিদায়াতের ব্যাপার। আল্লাহ যাকে দেবেন, সে লাভ করবে; যাকে দেবেন না, সে বঞ্চিত হবে।
