দাওয়াহ দিতে গেলে যদি তা ফলপ্রসূ না হয়, কেউ যদি সেই দাওয়াহ গ্রহণ না করে, হোক তা পরিবার কিংবা সমাজে–আমাদের ভেতরে তখন যে খারাপ লাগা তৈরি হয়, তা স্বাভাবিক। মক্কার মুশরিকদের এতভাবে তাওহিদের দাওয়াহ দেওয়ার পরও যখন তারা ফিরতে চাইলো না, ঔদ্ধত্য দেখালো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বেশ বিমর্ষ হয়ে যান। মানসিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি।
‘আরেকজন দ্বীনের দাওয়াহ কবুল করছে না বলে নিজে হতাশ হয়ে পড়া’ –এটা কোনো কার্যকরী পন্থা নয়। তাই মুশরিকদের বিমুখতায় যখন নবিজি ভেঙে পড়লেন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেন, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবিজিকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেন–
‘তারা ঈমান আনয়ন করছে না দেখে মনে হচ্ছে, আপনি তাদের জন্য পরিতাপ করতে করতে নিজেকে নিঃশেষ করে দেবেন।’[২] ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবিজিকে বলছেন, কেন আপনার এত হতাশ, বিমর্ষ আর বিধ্বস্ত হওয়া লাগবে? আপনার যা দায়িত্ব, তা তো আপনি পালন করেছেন। দ্বীনের যে দাওয়াহ পৌঁছানোর কথা, তা তো আপনি পৌঁছিয়েছেন। এখন কে। হেদায়াত পাবে আর কে পাবে না, তা নির্ধারণ করবেন আল্লাহ। যারা হিদায়াত পাচ্ছে, তাদের কথা ভেবে নিজের দেহ আর মনকে অশান্ত রাখবার কোনো দরকার নেই।
পরিবার আর সমাজ আমাদের কথা শুনছে না, আমাদের ডাকে সাড়া দেয় না, আমাদের দাওয়াহকে তারা প্রত্যাখ্যান করে, দ্বীন পালন করতে দেখলে আমাদের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়–এসবকিছুকে একটা পরীক্ষা হিশেবে নেওয়া যাক। আমাদের দেখতে হবে যে–সঠিকভাবে, সঠিক পন্থায় তাদের কাছে আমরা। দ্বীনকে তুলে ধরতে পেরেছি কি না। যদি কোনো ঘাটতি থাকে এই কাজে, সেই ঘাটতি পূরণে মনোনিবেশ করতে হবে। আমাদের আহ্বানে কতজন সাড়া দিচ্ছে। তা কখনোই বিবেচ্য নয়। দুনিয়া থেকে আল্লাহর এমন অনেক নবি-রাসুল গত হয়েছেন, সারাজীবনে যাদের ডাকে একজন মানুষও সাড়া দেয়নি। সুতরাং সংখ্যা নয়, কাজ এবং কাজের ধারাবাহিকতাই আমাদের সামনে বিবেচ্য বিষয়।
———–
[1] সহিহুল বুখারি : ২০৪৮, ৩৭৮০; জামিউল মাসানিদ, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ২০৬; রাহমাতুল্লিল আলামিন : ২৬২; আর রাহিকুল মাখতুম : ১৬৮
[2] সুরা কাহফ, আয়াত : ৬
০৯. যে যাই বলুক পিছে
এক.
আমার পরিবারকে কোনোভাবেই প্র্যাক্টিসিং পরিবার বলা যাবে না। গতানুগতিক গ্রাম্য পরিবারগুলো যেমন হয় অনেকটাই সেরকম। আম্মা আমার সাথে ঢাকায় থাকার ফলে ইসলামি অনুশাসনের রীতি-নীতিকে নতুনভাবে জানা শুরু করেছেন। এবং আলহামদুলিল্লাহ সে-মতে চলবার আপ্রাণ চেষ্টাও আম্মার মাঝে লক্ষণীয়।
যেহেতু আমার পরিবার সেভাবে প্র্যাক্টিসিং না, তাই একজন প্র্যাক্টিসিং মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করাটা আমার জন্য একটা চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিলো রীতিমতো। চ্যালেঞ্জটা বহু দিক থেকে–একটা নন-অ্যাক্টিসিং পরিবেশে একজন প্র্যাক্টিসিং মেয়েকে সর্বোতভাবে সহায়তা করা, যাতে তার দ্বীন পালনে কোনো অসুবিধে না হয়। আবার সেটা করতে গেলে আত্মীয়স্বজনদের যে টিটকারি, কথা কানাকানি, এমনকি নিজের পরিবারের মানুষগুলোর বিরূপ মনোভাবগুলোকেও সমানভাবে সামলানোটা কতটা দুরূহ, তা বিবাহিত জীবনের শুরুর দিকে বেশ ভালোমতন টের পেয়েছিলাম।
আমার বিয়ের দিনের ঘটনা। মসজিদ থেকে বিয়ের সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে আমরা বাসায় এলাম। আমাদের গ্রাম্য রীতিনীতি অনুসারে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর কনেকে মিষ্টি হাতে ছেলের দুলাভাইদের (যদি থাকে) সামনে যেতে হয়। তাদেরকে মিষ্টি খাইয়ে দিতে হয় এবং দুলাভাইরা শালার বউ দেখে বকশিশ প্রদান করে।
বলাই বাহুল্য, আমার বিয়ের দিনও সেরকম একটা গুঞ্জন উঠেছিলো। যদিও আমি আগেই বলে রেখেছিলাম–আমার স্ত্রী পর্দা করবেন। কোনো পুরুষ মানুষের সামনে যাবেন না, কিন্তু পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলো–অন্তত হিজাব পরে হলেও তো দুলাভাইদের সামনে মিষ্টির প্লেট হাতে আসতে পারে। খাইয়ে না দিক, অন্তত একটা সালাম দিয়ে চলে যাবে।
কিন্তু বেঁকে বসলাম আমি এবং আমার নব বিবাহিতা স্ত্রী। সাফ জানানো হলো– কোনো নন-মাহরাম পুরুষের সামনে আমার স্ত্রী যাবেন না। সেটা দুলাভাই হোক আর আমার নিজের ভাই। এগুলো তথাকথিত সামাজিকতা। এসব সামাজিকতা মানতে আমরা বাধ্য নই।
বুঝতে পেরেছি, সেই রাতে আমার বোনেরা কষ্ট পেয়েছিলো। তারা ভেবেছিলো, তাদের আদরের ছোটো ভাই তাদের জামাইকে অপমান করেছে। কী এমন হতো তার বউকে মিষ্টির থালা হাতে এক মিনিটের জন্য পাঠালে?
কিন্তু সামাজিকতা নয়, আমাদের যে সুন্নাহটাই মানতে হবে!
আমার স্ত্রীর পর্দার ব্যাপারে কেবল ওই একবার-ই পরিবেশ ঘোলাটে হয়েছিলো। এরপর পর্দা করা নিয়ে আর কোনো সমস্যার সম্মুখীন আমার স্ত্রীকে আজ পর্যন্ত হতে হয়নি, আলহামদুলিল্লাহ; বরং আমার পরিবার আর আত্মীয়স্বজনদের সবাই এখন সমানভাবে সচেতন তার পর্দা করার বিষয়ে। কোনো আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে গেলে সেখানকার পুরুষেরাও আমার স্ত্রীর পর্দা করার ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেন এবং সেভাবে সবকিছুর আয়োজন করেন।
কয়েকদিন আগে দারুণ একটা ব্যাপার চোখে পড়লো। আমার স্ত্রী রান্না করছিলেন। রান্নাঘরের দরোজায় খেলছিলো আমার তিন বছরের ছোটো ভাগিনা। বাইরে থেকে হঠাৎ আমার বড় ভাই ঘরের ভেতরে এলে ভাগিনা জোরে বলতে শুরু করলো, ‘মামা, এখানে এসো না। মামি আছে এখানে।
