আমি খেয়াল করে দেখেছি, আমার বেকারাবস্থায় পরিবারে আমার কথার গুরুত্ব ছিলো একরকম, আমার আর্থিক স্বচ্ছলতায় পরিবারে আমার গুরুত্ব হয়ে ওঠে অন্যরকম। আগে যেখানে কেউ আমার কথাকে তেমন গ্রাহ্য করতে চাইতো না, স্বাবলম্বী হওয়ার পরে এই মানুষগুলোই আমার কথাকে মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং ভুল-শুদ্ধ বাতলে দিলে তা পালনে তৎপর থাকে। অন্তত আর যা-ই হোক– ভুলটাকে ভুল হিশেবে মেনে নিতে আগের মতো কার্পণ্য কেউ আর করে না।
ঠিক একই ব্যাপার এলাকাতেও। আগে যেখানে সবাই নিতান্তই বেকার বলে অবহেলা করতে চাইতো, এখন তারাই অনেকটা সমীহ করে। দেখা হলেই ভালো-মন্দ জিগ্যেশ করে, হাসি মুখে কথা বলে, দু-চার কথা বলতে চাইলে বিমুগ্ধ শ্রোতার মতো সেসব শুনতে চায়।
সবকিছুর মূলে নিয়ামক একটাই–আর্থিক সচ্ছলতা।
তাই, আমরা যারা আমাদের পরিবার ও সমাজে দ্বীন প্রতিষ্ঠা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি, চিন্তা-ভাবনা করি, আমাদের উচিত নিজ নিজ যোগ্যতা ও দক্ষতা বাড়ানো। হালাল উপার্জন দিয়ে যখন আমরা আর্থিকভাবে নিজেদের একটা অবস্থান তৈরি করতে পিরবো পরিবার আর সমাজে, তখন দ্বীনের কথা বলতে গিয়ে যে অবজ্ঞা-অবহেলা তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হয় আমাদের, তা বহুলাংশেই হ্রাস পাবে, ইনশা আল্লাহ। আর হালাল উপার্জনের জন্য নিজেকে যোগ্য করে তোলাটা অতি-অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামও সমানভাবে এটাকে গুরুত্ব দেয়। মনে রাখতে হবে–হালাল উপার্জন আমাদের ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। আমরা যত ইবাদত-বন্দেগিই করি না। কেন, আমাদের উপার্জনের উৎসটা যদি অসৎ পন্থায় হয়ে থাকে, আমরা যে খাবার খাই, তা যদি অসৎ উপায়ে কেনা হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের সকল ইবাদত, সকল দ্বীনি প্রচেষ্টাই বৃথা। আল্লাহর কাছে তার কানাকড়িরও মূল্য নেই। আর্থিকভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরির জন্য আমাদের তাহলে কী করা উচিত?
আমাদেরকে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে হবে। তার পাশাপাশি আমাদেরকে দক্ষতা অর্জনের পন্থাগুলোতেও রাখতে হবে সতর্ক দৃষ্টি। চাকরির বর্তমান প্রতিযোগিতার বাজারে আধুনিক বিশ্বে টেকনোলজি-নির্ভর জ্ঞানের অপরিসীম কদর। টেক দুনিয়ায় যারাই এগিয়ে, দিন দিন দুনিয়াকে তারাই পুরে নিচ্ছে হাতের মুঠোয়। আমরা যদি ফেইসবুক, গুগল, ইউটিউব আর টুইটারের দিকে তাকাই, এই কথার সত্যতা আমাদের সামনে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গেলো মার্কিন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উলটাপালটা বক্তব্যের কারণে ফেইসবুক আর টুইটার একযোগে ট্রাম্পের সোশ্যাল অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দেয়। দিনকয়েক আগেও যে ছিলো। পৃথিবীর সেরা পরাশক্তির সর্বাধিনায়ক, তার সাথে এরকম খবরদারি করার জন্য কতখানি সাহস আর নেপথ্যে কতখানি শক্তিমত্তার দরকার ভাবুন তো! টেকনোলোজির জ্ঞান আর দক্ষতা আপনাকে কেবল আর্থিক সক্ষমতার রাস্তাই দেখাবে না, একইসাথে মুসলিমদের উন্নয়নে আপনি রাখতে পারবেন প্রভূত অবদান। জ্ঞান-বিজ্ঞানে, যোগ্যতা-দক্ষতায় আমাদের যত উন্নতি হবে, পশ্চিমা বিশ্বসহ ইসলামের শত্রুদের চোখ রাঙানি আর খবরদারির মাত্রাও ততই কমে আসবে। আগেই বলেছি–মানুষ আসলে ক্ষমতার পূজারি। যার হাতে ক্ষমতা থাকে, মানুষ তাকেই সমীহ করে।
তার মানে, আমাদের সবাইকে যে দলবেঁধে টেক দুনিয়ার পেছনে ছুটতে হবে তা নয়। ব্যক্তিগত পছন্দ আর রুচিশীলতার ওপর নির্ভর করছে আমরা কে কোন দিকে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলবো। আমাদেরকে শিল্প-সাহিত্য, ব্যবসা, উদ্যোক্তাসহ নানান কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকতে হবে। যারা ভালো লিখতে পারে, তারা লেখালেখি সম্পর্কিত পড়াশোনা করবে; যাদের শখ নির্মাতা হওয়ার, তারা ভিডিও মেইকিং, ভিজুয়ালাইজেশানের ওপরে প্রশিক্ষণ নেবে। লক্ষ্য হবে হালাল কন্টেন্টগুলোকে চমৎকারভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা। ডিজিটালাইজেশানের দুনিয়ায় সবাইকে প্রযুক্তিমুখী হতেই হবে। আজ নয়তো কাল। দক্ষ মানুষদের জন্য কাজের ক্ষেত্র দুনিয়াতে অভাব নেই। এসবের বাইরে আমাদের প্রাণ-বৈচিত্র আর কৃষি নিয়েও ভাবতে হবে। যাদের প্রচুর পরিমাণ আবাদি জমি-জমা আছে, তারা সেগুলোতে মৌসুমি ফসল, ফলমূল চাষ করতে পারে। রপ্তানি করা যায় এমন নানান ফল এবং খাদ্য দেশে অনেকেই উৎপাদন করছে। কৃষি আমাদের জন্য এক বিরাট সম্ভাবনা! পড়াশোনা করে চাকরিই করতে হবে’–এমন মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। পেশাকে বরণ করে নিতে আমাদের মাঝে কোনো কার্পণ্য থাকা চলবে না, তা যদি পার্কে পার্কে ঝালমুড়ি বেচতে হয়, তবু।
তরে স্মরণে রাখতে হবে–দুনিয়ার পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা যেন আমাদের আখিরাত নষ্ট না করি। তাহলে আমরা দুনিয়া আর আখিরাত–দুটোকেই হারাবো।
দুনিয়ার পেছনে আমাদের ছুটবার মাত্রা কীরকম হওয়া উচিত তার একটা চমৎকার দিকনির্দেশনা আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবন থেকে পাই। আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মক্কার সফলতম একজন। ব্যবসায়ী। আমরা যেমন এখন ‘বিজনেস ম্যাগনেট’ বলতে জেফ বেজোস, ইলন মাকসহ নানান ব্যক্তিকে চিনি, নবিজির সময়ে তখন আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেভাবে চিনতো সবাই।
