ঈমানের পথে হাঁটবেন, সত্য আর ন্যায়ের পথে চলবেন, সঠিক দ্বীন চর্চা করবেন, কিন্তু শত্রু পাবেন না–এমনটা অসম্ভব। আপনাকে হয়তো আপনার পরিবার তিরস্কার করে, আপনার বাবা-মা অবজ্ঞা করে আর পাড়া-প্রতিবেশি কটু কথা শোনায়, কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবিদের জন্য বিরূপ হয়ে উঠেছিলো গোটা দুনিয়াটাই। তাদের ত্যাগের সাথে আপনার-আমার ত্যাগ তো তুলনাতেই আসতে পারে না। সুতরাং, দ্বীনের পথে আপনাকে চর্চা করতে হবে ধৈর্য আর সীমাহীন সংযমের। আপনি যখন দাড়ি রেখে দেবেন, তখন আপন লোকেরাই আপনাকে বলবে, এই বয়সে দাড়ি কেন রাখতে হবে তোমায়?’ ‘তোমার বাপের মুখে তো দাড়ি নেই, তোমার মুখে দেখছি একহাত লম্বা দাড়ি। দাড়ি রাখার কি বয়স চলে গেছে? গোপনে গোপনে তারা আরো বলবে, ছেলেটা কি বখেই গেলো, নাকি? কাদের খপ্পরে পড়েছে কে জানে!
এতদিন বেপর্দায় চলতেন, ধামাকা জীবনযাপন করতেন, কিন্তু হঠাৎ করে যখন আপনি বোরকা-হিজাব পরা শুরু করবেন, যখন আপনি নন-মাহরাম কোনো পুরুষের সামনে আসতে চাইবেন না, কথা বলতে চাইবেন না, আপনার আপন মানুষেরা, হতে পারে আপনার বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়স্বজন, আপনাকে বলবে, ‘এই বয়সে এত ঢেকেঢুকে চলতে হবে কেন? বিয়ের আগে একটু খোলামেলা। চলা উচিত।
‘এভাবে চোখ-মুখ ঢেকে রাখলে বিয়ে হবে? পুরুষ মানুষের চোখে না পড়লে বিয়ের প্রস্তাব কোত্থেকে আসবে?
যখন আপনি তাদের সামনে দ্বীনের সঠিক বিষয়টা তুলে ধরে ভুলটা শুধরাতে যাবেন, তারা তেড়েফুড়ে আপনাকে বলবে, ‘মাতব্বরি বাদ দাও। আমরা কি তোমার চাইতে কম বুঝি? দুই-চারটা বই পড়ে ওস্তাদ হয়ে গেছো? আমাদের বাপ-দাদারা সবাই ভুল আর দুনিয়ায় তুমি একাই কেবল সঠিক?
আপনি বুঝতে পারবেন–আপনার জন্য দুনিয়াটা তখন সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। আপনজনেরা মুখ ফিরিয়ে নেবে, আত্মীয়স্বজনেরা দূরে চলে যাবে, বন্ধুরা এড়িয়ে চলবে। হেনস্থা, অবজ্ঞা আর অবহেলার জাতাকলে পিষ্ট হয়ে আপনার মন বিষিয়ে উঠবে ভীষণভাবে।
এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী?
একটাই উপায়–আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বাড়ানো। আপনি যখন দেখবেন দুনিয়াশুদ্ধ লোক আপনার বিপরীতে, কিন্তু হৃদয়গহীনে যদি আপনার সাথে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার একটা মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকে, চারপাশের কটুকথা, অবজ্ঞা অবহেলা, তিরস্কার-লাঞ্ছনা–কোনোকিছুই তখন আপনাকে আর আশাহত করতে পারবে না। আপনাকে দগ্ধ করতে পারবে না হতাশার অনলে। মানুষের চোখে নীচু হয়েও আপনি তখন গর্ব অনুভব করবেন এটা ভেবে যে–আল্লাহর পথে আছেন বলেই আপনার জন্য তারা বরাদ্দ করেছে এত ঘৃণা, চাষ করেছে এত বিদ্বেষ। মানুষের এতসব ঘৃণা-বিদ্বেষের বিপরীতে উপহারস্বরূপ যদি আখিরাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনাকে জান্নাত দান করেন, ভাবুন তো কী এক মহাসাফল্য লাভ করবেন আপনি!
তিন.
সাধারণত একটা পর্যায়ে গিয়ে পরিবারের লোকেরা আপনার কথাকে গ্রাহ্য করতে চাইবে না। আপনি যতই তাদেরকে সঠিক পথে, সঠিক দ্বীনে আহ্বান করুন না কেন, তারা আপনাকে গুরুত্ব দিতে চাইবে না, যদি না পরিবারে আপনি ভালো রকমের অবদান রাখতে পারেন।
পরিবারে অবদান রাখা বলতে আর্থিকভাবে পরিবারে আপনি কেমন ভূমিকা রাখছেন সেটাকেই বোঝানো হয়েছে মূলত।
ধরা যাক আপনি একজন ফুল-টাইম বেকার। আপনাকে চলতে হচ্ছে বাবা কিংবা ভাইয়ের কাঁধে ভর করে। এমতাবস্থায় পরিবারে আপনার মন্তব্য কম গুরুত্ব বহন করবে। যেহেতু আপনি টাকা-পয়সা রোজগার করেন না, অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে চলতে হয় আপনাকে, তাই আপনি যতই ভালো কথা, জ্ঞানগর্ভ উপদেশ, সঠিক বার্তাই তাদের কাছে তুলে ধরুন না কেন–তাদের কাছে আপনার যাবতীয় জ্ঞান, যাবতীয় শুভাকাঙ্ক্ষার চাইতেও বড় হয়ে থাকবে আপনার বেকারত্ব। তাদেরকে যদি আপনি গিবত থেকে বাঁচতে বলেন, সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে সাবধান করেন, মিথ্যা বলা ছাড়তে বলেন, নিয়মিত সালাত আদায়ের তাগিদ দেন, মহিলাদের পরিপূর্ণ পর্দা মেনে চলতে বলেন, আপনি দেখতে পাবেন–এই সবকিছুকে তারা কেমন হালকাভাবে নিচ্ছে। এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেওয়া যাকে বলে।
কিন্তু অবদান রাখার দিক থেকে আপনি যদি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কেউ হয়ে উঠতে পারেন, অর্থাৎ যদি আর্থিকভাবে পরিবারে আপনার অবদান দৃশ্যত মুখ্য আর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, আপনি অবাক বিস্ময়ে খেয়াল করবেন যে–ওপরের দৃশ্যটা কীরকম ভোজবাজির মতো পাল্টে গেছে! তখন আপনার যাবতীয় ভালো কথা, ভালো উপদেশ, ভালো পরামর্শের আলাদা একটা মর্যাদা থাকবে। বাড়ির বড়রাও আপনার কথাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে আর ছোটোরা তো আপনার বেঁধে দেওয়া রুটিনের বাইরে চলতেই পারবে না।
এটা আসলে মানুষের মনস্তত্ত্ব। মানুষ ক্ষমতাকে পছন্দ করে। যার হাতে ক্ষমতা থাকে, মানুষ তার কথা শুনতে আর মানতে চায়। সামথ্যৰ্বান মানুষের সান্নিধ্য মানুষ উপভোগ করে। যদিও এই ধারণার সাথে ইসলামের তেমন একটা সম্পর্ক নেই, কিন্তু আমি মনে করি, পারিবারিক আর সামাজিকভাবে দ্বীনের কাজ করার জন্য যেহেতু এটা ভালো একটা নিয়ামক হিশেবে কাজ করে, তাই আমাদের উচিত নিজ নিজ আর্থিক সামথ্য বাড়ানোর ব্যাপারেও মনোযোগী হওয়া।
