কিন্তু তাদের আসলে কে বোঝাবে যে, বাপ আর দাদারা কখনোই দ্বীনের জন্য। দলিল হতে পারে না। বাপ-দাদারা যে সর্বদাই সঠিক হবে, তাদের আনীত, পালিত রেওয়াজ যে সবসময় প্রশ্নাতীত থাকবে–এমন নিশ্চয়তা কোথাও দেওয়া নেই। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য তার দাদা আব্দুল মুত্তালিব দলিল হননি, তার জন্য দলিল হয়েছে কুরআন এবং আল্লাহর বাতলে দেওয়া পদ্ধতি।
আমার বন্ধুটাকে ঘর থেকে প্রায়-ই বলা হতো, ‘নামাজ-কালাম শুধু আমাদের ছেলেটাই পড়ছে, দুনিয়ার আর কেউ তো পড়ছে না!’ ‘ধর্ম শুধু আমাদেরটাই বুঝতেছে, দুনিয়ার আর কেউ তো ধর্ম বোঝে না!’
কটাক্ষ আর কটু মন্তব্যের এমন ঘাত-অভিঘাতে জর্জরিত হয়ে আমার বন্ধুটা আমাকে মাঝেমধ্যেই বলত, আর পারছি না রে!
একটা মানুষের বিপরীতে দুনিয়া দাঁড়িয়ে যাওয়াটাও মেনে নেওয়া সহজ, কিন্তু ঘরের আপন মানুষগুলো যখন ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দেয়, যখন বাবা-মা আর ভাই-বোনেরা ঘৃণার ঝুড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল সঠিকভাবে দ্বীনটাকে পালন করছে বলে, তখন সেই কষ্টটা আসলে সহ্যের বাইরে চলে যায়।
আমার বন্ধুই কেবল নয়, চারপাশের এমন আরো অনেক মানুষকেই আমি চিনি, যারা নিজ ঘরে নিগ্রহের স্বীকার হয় বা হচ্ছে কেবল ভুলের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সঠিক দ্বীনটাকে আঁকড়ে ধরার জন্য। অনেকে আমার কাছে পরামর্শ চায়, কীভাবে তাদের বাবা-মাকে সঠিক দ্বীনটা বোঝানো যায়, কীভাবে পরিবারের মানুষগুলোকে হিদায়াতের রাস্তায় আনা যায়। পরিবারের সদস্যদের কথা আর আচরণের দ্বারা যে নিঃসীম কষ্টের ভেতর দিয়ে তারা দিন যাপন করে, তা আমি অনুধাবন করতে। পারি। সেই কষ্টের গভীরে বসবাস করেও আপন আপন লোকগুলোর হিদায়াতের জন্য তাদের আহাজারি সত্যই একটা সুন্দর হৃদয়ের স্বাক্ষর বহন করে।
দুই.
সত্যের সাথে অবহেলার, শুদ্ধতার সাথে অবজ্ঞার সম্পর্কটা চিরন্তন। আপনি মানুষকে ভুলের গহ্বর থেকে উদ্ধারের কাজে নামবেন, কিন্তু পাড়ি দেবেন না একটা কণ্টকাকীর্ণ পথ–তা হবে না।
যেদিন, যে উষালগ্নে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম হলো, সেই সু-সংবাদ আবু লাহাবের কাছে বয়ে নিয়ে এসেছিলো তারই এক ক্রীতদাসী। বলাই বাহুল্য–আবু লাহাব ছিলো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আপন চাচা। মৃতভাই আবদুল্লাহর ঘরে এক পুত্র সন্তানের জন্মের সংবাদে আবু লাহাব এতটাই প্রফুল্ল আর আনন্দিত হয় যে, যে দাসী নবিজির জন্মের সংবাদ বয়ে এনেছিলো তার কাছে, তাকে সাথে সাথেই মুক্ত করে দেয় সে। যে ভ্রাতুস্পুত্রকে এতটা ভালোবাসা দিয়ে বরণ করেছিলো আবু লাহাব, একদিন নিজেই পরিণত হলো সেই ভ্রাতুষ্পুত্রের সবচেয়ে বড় শত্রুতে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যের যে পয়গাম ধরায় এনেছিলেন, তাকে স্বাগত জানাতে অপারগ ছিলো আবু লাহাব, কারণ বাপ-দাদাদের পালিত দ্বীনকে তারা জ্ঞান করতো পবিত্র বিধান হিশেবে। সেই ভুলে ভরা দ্বীনকে তারা এতটাই পূত আর পবিত্র মনে করতো যে–তার বিপরীত যেকোনো কিছুকেই তারা তাদের ধর্মের জন্য হুমকি মনে করতো।
আপনি যখন সত্যের পথে হাঁটতে শুরু করবেন, তখন মিথ্যেরা দলবেঁধে আপনাকে আক্রমণ করতে আসবে। আপনি যে আসলে কতখানি কূপমণ্ডুক, আপনার জ্ঞান যে কতটা বিকৃত আর আপনি কী পরিমাণ বিভ্রান্ত–সেসব তখন আপনার চারপাশে নিয়ম করে বাজতে থাকবে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কবি, গণক, জাদুকর, পাগল, বদ্ধ উন্মাদ-সহ কত যে অপবাদ, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই!
আপনার থাকতে হবে ত্যাগ স্বীকার করার অপরিসীম ধৈর্য। বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা চিন্তা করুন। ইসলামের সুমহান বার্তা পাওয়ার পর যখন ঈমান আনয়ন করলেন তিনি, তখন তার মনিব মাথার ওপর গনগনে সূর্যের তাপে মরুভূমির তপ্ত বালুতে তাকে শুইয়ে রাখতে এবং বুকের ওপর তুলে দিতো বিশালকায় পাথর। সূর্যের তাপ আর বুকের ওপর চেপে বসা জগদ্দল পাথরের চাপের কাছেও নতি স্বীকার করতে রাজি হননি ইসলামের প্রথম মুআজ্জিন বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু। সে কী সীমাহীন যন্ত্রণা! কী ভারি দুঃখের ছিলো সেই দিনগুলো! কিন্তু বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর ঈমানের কাছে বারেবারে পরাস্ত হয় নিষ্ঠুর-নির্দয় মনিব। আঘাত যত তীব্র হয়, বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর কণ্ঠ থেকে ততটাই ভালোবাসা-মিশ্রিত সুরে ভেসে আসে ‘আহাদ আহাদ’ শব্দ! ঈমানের সে এক অনুপম, অনন্য দৃষ্টান্ত!
শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও আপনাকে সম্পদ আর প্রতিপত্তিও ত্যাগ করতে হতে পারে। ইসলামের প্রাথমিক দিনগুলোতে সাহাবি আবদুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছিলো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা-বাণিজ্য। মক্কায় তিনি পরিচিত ছিলেন একজন অসাধারণ সফল ব্যবসায়ী হিশেবে, কিন্তু ঈমান আনয়নের পর যখন মক্কাবাসী তাদের ওপর খড়গহস্ত হলো, আবদুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু অন্য অনেক সাহাবির মতো, নিজের ব্যবসা, বসত-ভিটা, সম্পত্তি সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে আবিসিনিয়ায় চলে গেলেন।
কেবল ঈমানের জন্য, ইসলামের জন্য, আল্লাহর দ্বীনের জন্য আপনি ফেলে চলে যাচ্ছেন আপনার সফল ব্যবসা, ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি–দৃশ্যটা একবার ভাবুন তো!
