সে এক সু-কঠিন বন্দিদশা থেকে ইউনুস আলাইহিস সালাম মুক্তি পেলেন আর তার সেই মুক্তির পেছনে নিয়ামক হিশেবে যা কাজ করেছে, তা হলো–তাকওয়া।
চার.
হয়তো গুহা-মুখের পাথর এসে দাঁড়ায় না আমাদের যাপিত জীবনের পথে। হয়তো মুসা আলাইহিস সালামের জীবনের মতো সমুদ্র আর শত্রু বাহিনীর দ্বৈত দ্যোতনার বিপদ নেমে আসে না আমাদের সম্মুখে। মক্কার মুশরিকদের মতো ধাওয়া করবার মতো শত্র হয়তো উপস্থিত নেই আমাদের জীবনে। সমুদ্রের অতল অন্ধকার আর মাছের পেটের সংকীর্ণতাও হতে পারে আক্ষরিক অর্থে আমাদের জীবনে বিপদ হয়ে আসে না, কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের জীবনেও বন্দিত্ব আসে। কখনো কখনো আমাদের জীবন আটকে যায় তীব্র সংকীর্ণতায়। আমাদের দুআ কবুল হয় না, সুখ হারিয়ে যায় আমাদের জীবন থেকে, কাজকর্মে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, পড়াশোনা কিংবা সাংসারিক জীবনে–কোথাও আমরা পাই না এতটুকু বারাকাহ। দুনিয়াটাকে তখন খুবই সংকীর্ণ মনে হয়। মনে হয়, পৃথিবী তার সকল ভারত্ব নিয়ে ভেঙে পড়বে আমাদের মাথার ওপরে। হতাশা, অশান্তি আর অপূর্ণতা তখন আমাদের কুরে কুরে খায়। আমরা চিন্তার বন্দিত্বে ভুগি আর ভুগি স্বাধীনতার সংকীর্ণতায়। তখন ইচ্ছে করে–ইশ! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যদি আমার অমুক দুআটা কবুল করতেন! যদি তিনি আমাকে উদ্ধার করতেন অমুক বিপদ থেকে! যদি কেটে যেতো আমার বন্দিত্বটা! যদি খুলে যেতো আমার মুক্তির পথ!
জীবনের এমন বন্দি শিবিরে শিকলবন্দি হয়ে যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অপার অনুগ্রহ লাভের আশায় অস্থির হয়ে ওঠে আমাদের মন, যখন সকল প্রতিকূলতা, বিপদ আর বন্দিত্ব থেকে মুক্তির জন্য আশায় কাতর হয় আমাদের হৃদয়, তখন গুহায় আটকে যাওয়া আমাদের সেই পূর্বসূরিদের মতো করে, নিজেদের আমলনামাতে আমরা একটু চোখ বুলাতে পারি। যদি তাতে পাওয়া যায় কোনো গোপন আমল, যার সাক্ষী কেবল আমি এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা, যদি তা আমি লোকের প্রশংসা লাভের আশায় না করে থাকি, যদি তাতে না থাকে মানুষের বাহবা লাভের কোনো আকাঙ্ক্ষা, আল্লাহর সন্তুষ্টি সাধনই যদি তার একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে থাকে–তাহলে গভীর অন্ধকার রাতে, জায়নামাযে দাঁড়িয়ে আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে বলতে পারি–’মালিক, আমার সেদিনকার সেই কাজটা আমি একান্তই আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্যই করেছিলাম। মানুষের চোখে বড় আর মহান হতে, তাদের বাহবা কুড়াতে আমি সেই কাজটা করিনি। মাবুদ, অন্তরের খবর আপনার চাইতে ভালো আর কে জানে! আপনি আমার অন্তরের সেদিনকার অবস্থাও জানতেন, আর আজকের অবস্থাও জানেন। আজ যে বিপদ, যে দুর্যোগ আর দুর্ভোগে আমি নিপতিত, জীবনের যে সংকীর্ণতা আজ আমার শ্বাসরোধের দ্বারপ্রান্তে, সেদিনকার সেই কাজটার অসিলায় আপনি আমার জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতা, সমস্ত বিপদ আর দুর্যোগ দুর করে দিন। নিশ্চয়। বান্দার ডাকে আপনি সাড়া দেন আর বান্দার বিপদে আপনার আশ্রয়ের চাইতে উত্তম আশ্রয়স্থল আর কোথায় আছে?’
দুর্যোগ জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আগে আমরা মেরামত করতে পারি আমাদের তাওয়াক্কুল আর তাকওয়ার স্তরকে। যদি তাতে মরচে ধরে থাকে, যদি তা হয়ে থাকে ভীষণ দুর্বল আর নড়বড়ে, যত্ন নিয়ে। সেটাকে আমরা সেই স্তরে উন্নীত করতে পারি, যে স্তরে গেলে গভীর সংকটেও পথিক পথ হারায় না। তাওয়াক্কুল বুকে থাকলে সম্মুখের পথহীন অবস্থাতেও পথ তৈরি হয়ে যায়, যেভাবে দরিয়া ফুড়ে পথ তৈরি হয়েছিলো মুসা আলাইহিস সালামের জন্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি আকাশ-সমান ভরসার প্রাচুর্য বুকে ছিলো বলেই হিজরতের দিন নিশ্চিত মৃত্যুর সামনেও নির্ভার থাকতে পেরেছিলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আর অন্তরে তাকওয়ার অথৈ জোয়ার ছিলো। বলেই মাছের পেটের সংকীর্ণতার মাঝেও বাঁচবার কথা ভুলে আল্লাহর ক্রোধ থেকে বাঁচতে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে পেরেছিলেন নবি ইউনুস আলাইহিস সালাম। তাকওয়া তার জন্য সেই বিপদ থেকে, সেই সংকীর্ণতা থেকে, সেই অতল অন্ধকার থেকে মুক্তির মাধ্যমে পরিণত হয়ে গেলো।
জীবনের বন্দিশিবির থেকে মুক্তির স্বাদ আস্বাদন করতে চলুন আমরা আমাদের আমল, আমাদের তাওয়াক্কুল আর তাকওয়ার যত্ন নিই। আমলনামায় যোগ করি এমন গোপন আমল, যা বিপদের দিনে আমাদের জন্য বর্ম হয়ে দাঁড়াবে। অন্তরে চাষ করি তাওয়াক্কুল আর তাকওয়ার বীজ, যা মহীরুহ হয়ে একদিন রুখে দেবে জীবনের প্রতিকূলতা, বিপদের তপ্ত-কঠিন সময়ে, যা আমাদের ছায়া দেবে আর দেবে নিরাপত্তা।
————
[1] সহিহুল বুখারি : ২২৭২; সহিহ মুসলিম : ২৭৪৩; শুআবুল ঈমান : ৬৭০৪; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব :১; মুস্তাখরাজু আবি আওয়ানা : ৫৯৯৮
[2] সুরা শুআরা, আয়াত : ৬১
[3] সুরা শুআরা, আয়াত : ৬২
[4] সুরা তাওবা, আয়াত : ৪০
[5] সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭
০৮. যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
এক.
আমার এক বন্ধু দ্বীন পালন শুরু করবার পর থেকে প্রচুর নিগ্রহের শিকার হতো– স্বয়ং তার পরিবার থেকে। টিপিক্যাল বাঙালি মুসলিম পরিবারগুলো যেরকম হয় সাধারণত–হয়তো তারা আদৌ দ্বীন পালন করে না, নতুবা দ্বীন পালন বাদ দিয়ে দ্বীনে নব-উদ্ভাবিত বিদআতে বুঁদ হয়ে থাকাই তাদের নিত্যকার রুটিন হয়ে দাঁড়ায়। তারা শুক্রবার ছাড়া মসজিদের আশপাশে ঘেঁষবে না, শবে-বরাতে খাবার-দাবারের ধুম আয়োজনে মত্ত থাকবে ইত্যাদি; কিন্তু পরিবারের ভেতর থেকে দ্বীনটাকে সঠিকভাবে বুঝে এবং উপলব্ধি করে কেউ যদি তা পালন করতে যায়, তখন বাকি সদস্যরা রীতিমতো ক্যাওয়াজ লাগিয়ে দেন। তারা তখন মনে করেন, বাপ-দাদাদের পালিত ধর্মে এ আবার নতুন কী সংযোজন? এভাবে তো কোনোদিন কাউকে ধর্ম পালন করতে দেখিনি!
