আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুসা আলাইহিস সালামকে ঠিক ঠিক পথ দেখালেন। সমুদ্রের বিশাল জলরাশিকে তিনি নবি মুসার জন্য পরিণত করলেন প্রশস্ত রাস্তায়, যে রাস্তা ধরে মহাসমুদ্র পার হবে তার অনুসারীরা। সেদিন মুসা আলাইহিস সালামকে পথ দেখিয়েই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা থেমে যাননি, ওই একই পথকে ফেরাউনের জন্য তিনি পরিণত করেছিলেন মৃত্যুফাঁদে।
এই যে অনুসারীদের নিয়ে এমন কঠিন বন্দিদশায় পড়েছিলেন মুসা আলাইহিস সালাম, সেই বিপদ কাটাতে কোন জিনিসটা তাকে সহায়তা করেছে জানেন? সেটা হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ওপর তার টইটম্বুর তাওয়াক্কুল। অনুসারীরা যেখানে নিশ্চিত মৃত্যু ব্যতীত আর কিছুই দেখছিলো না, নবি মুসা আলাইহিস সালাম সেখানে দেখছিলেন বেঁচে ওঠার আলোকরশ্মি! কেউ যেখানে মর্মান্তিক পরাজয় ব্যতীত কোনো পথ দেখছে না, সেখানে মুসা আলাইহিস সালাম দেখছিলেন বিজয়ের রক্তিম সূর্যোদয়! তিনি জানেন, পথ তৈরির মালিককে ডাকতে জানলে, তাঁর ওপরে ভরসা করতে জানলে পথ তৈরি হতে সময় লাগবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ওপরে যারা ভরসা করে, তাদেরকে তিনি অবিশ্বাস্যভাবে পথ প্রদর্শন করেন।
হিজরতের দিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়ে যাত্রা করলে মক্কার মুশরিকরা সেদিন তাদের পিছু নিয়েছিলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো যেকোনো প্রকারে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বন্দি করে হত্যা করা। নবিজিকে হত্যা করবার উদ্দেশ্যে তারা শুরুতে হামলা করেছিলো তার ঘরে। সেখানে নবিজিকে না পেয়ে, হত্যার নেশায় উন্মত্ত আর পাগলপারা হয়ে তারা পিছু নেয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর।
পেছনে শত্রুবাহিনী আর সম্মুখে যেন এক অনন্ত মরুভূমি! বিপদের এমন ঘনঘোর সময়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহ নিয়ে তারা আশ্রয় নিলেন একটা গুহার মধ্যে।
কিন্তু, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ গুহার মুখে টের পাওয়া গেলো শত্রুর উপস্থিতি! শত্রু যদি ভুল করে একবার নিজের পায়ের দিকে তাকায়, তাহলে গুহার ভেতরে থাকা আবু বকর এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধরা পড়ার সম্ভাবনা শতভাগ। বন্দিত্বের এমন করুণ মুহূর্তে ঘাবড়ে গেলেন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু৷ কী হবে যদি ধরা পড়তে হয়? নিজের চাইতেও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিরাপত্তা নিয়েই তিনি সবিশেষ আতঙ্কিত! তাকে যে নিজের প্রাণের চাইতেও বেশি ভালোবাসেন তিনি!
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এমন বিচলিত অবস্থা, বিমর্ষ চেহারা দেখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিন অভয়বাণী হিশেবে যে কথাটা বলেছিলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সেটাকে কুরআনে স্থান দিয়েছেন। তিনি বলেছেন
‘চিন্তিত হয়ো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।[৪]
নাকের ডগায় শত্রুর উপস্থিতি টের পেয়ে দুজনের একজন ঘাবড়ে যাচ্ছেন আর অন্যজন নির্ভার-চিত্তে বলছেন, ‘চিন্তিত হয়ো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন!
এই যে অন্তরের গভীরে প্রোথিত থাকা এই নির্ভরতা, এই নির্ভরতার নাম তাওয়াক্কুল। এই তাওয়াক্কুলের কারণেই সেদিনকার সেই বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলেন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আমরা আরো স্মরণ করতে পারি নবি ইউনুস আলাইহিস সালামকে। গভীর সমুদ্রতলে মাছের পেটে আটকে পড়তে হয় তাকে। জগতে এরচেয়ে করুণ, ভয়ংকর, বিভীষিকাময় বন্দিদশা আর কার হয়েছে! একে তো সমুদ্রের অতল অন্ধকার, তারওপর মাছের পেটের ভেতরের সংকীর্ণতা এবং সেখানেও অন্ধকারের আরেক স্তর–সে কী এক মহাবিপদই না ছিলো আল্লাহর নবি ইউনুস আলাইহিস সালামের জন্য!
কিন্তু এমন ঘোরতর বিপদের মুখে পড়লে যেখানে দুনিয়ার কঠিনপ্রাণ মানুষও বিহ্বল হয়ে যাবে, সেখানে আল্লাহর নবি ইউনুস আলাইহিস সালাম হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহর স্মরণে মত্ত হয়ে গেলেন। যেন মাছের পেট থেকে উদ্ধার হওয়া নয়, নিজের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে লজ্জিত, অনুতপ্ত হওয়াটাই তার ধ্যান-জ্ঞান। সেই শোচনীয় অবস্থার মধ্য থেকে তিনি আল্লাহর কাছে হাত তুলে ফরিয়াদ করলেন–
‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। আপনি মহা-পবিত্র, আর নিশ্চয় আমি ছিলাম জালিম।[৫]
গভীর সমুদ্রতলে এক মহাবিপদের মাঝে নিপতিত হয়েও নবি ইউনুস আলাইহিস সালাম যা ভুলে যাননি, সেটা হলো–তাকওয়া। ওই মহাবিপদ থেকে বাঁচবার কী পথ, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত নন। প্রাণবায়ু আর কতক্ষণ তার শরীরে অবশিষ্ট থাকবে–তা নিয়েও তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। তার সমস্ত চিন্তা কেবল আল্লাহকে ঘিরে–যে পদস্খলন তার থেকে হয়েছে, তা কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ক্ষমা করবেন? নিজের কৃতকর্মের জন্য একটা অনুতপ্ত হৃদয় নিয়ে তিনি তাই আল্লাহর কাছে ফরিয়াদে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তার সেই ব্যস্ততার কাছে মাছের পেটের সংকীর্ণতা, সমুদ্রতলের গভীর অন্ধকার আর বাঁচবার তীব্র আকুলতা কোনোকিছুই মুখ্য হয়ে উঠতে পারেনি।
কিন্তু ইউনুস আলাইহিস সালামের শেষ পরিণতি সম্পর্কে আমরা জানি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে যে দুআ তিনি করেছিলেন, তা তো কবুল হলো-ই, সাথে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইউনুস আলাইহিস সালামকে বাঁচিয়ে নিলেন সেই মহা সংকট থেকে। মাছের পেটের দুর্ভেদ্য সংকীর্ণতা, সমুদ্রতলের অন্ধকার–সবকিছুকে ডিঙিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে মুক্ত করে নিয়ে আসলেন। ইউনুস আলাইহিস সালামের অন্তরে তাকওয়ার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিলো, অনুতপ্ত অন্তরের যে স্বাক্ষর তিনি বিপদের মাঝে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছিলেন, তা ছিলো অনন্য-অসাধারণ!
