গুহায় বন্দি হয়ে পড়া সেই প্রথম ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বললেন, ‘ইয়া আল্লাহ, আমি যদি এই কাজ কেবল আপনাকে সন্তুষ্ট করবার উদ্দেশ্যে করে থাকি, তাহলে আপনি আমাকে আজকের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।
মুহূর্তেই তার দুআ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কবুল করলেন। তারা দেখতে পেলেন–গুহার মুখ থেকে পাথর খানিকটা সরে গেছে। তবে বের হওয়ার মতো অবস্থা তখনো তৈরি হয়নি।
দলের দ্বিতীয়জন একবার অনৈতিক সম্পর্কে জড়াবার সুযোগ পেয়েছিলেন। চাচাতো বোনের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়াবার তার ছিলো অদম্য নেশা এবং তাকে নানাভাবে প্রলোভনও দেখাতেন তিনি, কিন্তু বরাবরই মেয়েটা তাকে এড়িয়ে যেতো। একদিন বেশ বিপাকে পড়ে মেয়েটা তার কাছে উপস্থিত হয় এবং নিরুপায় হয়ে তার কাছে কিছু অর্থকড়ি চায়। এমন সুযোগ হাতে পেয়ে তার ভেতরে এতদিনের পুষে রাখা সুপ্ত অনৈতিক ইচ্ছেটা জেগে ওঠে এবং শারীরিক সম্পর্কের বিনিময়ে মেয়েটাকে অর্থ দিতে রাজি হন তিনি। নিরুপায় মেয়েটা তাতে রাজি হয় শেষ পর্যন্ত।
কামনা চরিতার্থ করবার লক্ষ্যে যখন তিনি মেয়েটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাবেন, এমন সময় মেয়েটা বললো, আল্লাহকে ভয় করো। আমার পবিত্রতা তুমি নষ্ট করো না।
মেয়েটার প্রতি তার ছিলো দুর্নিবার আকর্ষণ, তথাপি তার এমন আকুতি শুনে তিনি ছিটকে দূরে সরে গেলেন আর তাকেও চলে যেতে বললেন। মেয়েটাকে যে
গুহার সেই দ্বিতীয় ব্যক্তি আল্লাহর কাছে করজোড়ে ফরিয়াদ করে বললেন, ‘মাবুদ, সেদিন যদি কেবল আপনাকে ভয় করে আমি ওই অসৎ কাজ থেকে বিরত থেকে থাকি, তার অসিলায় আজকের বিপদ থেকে আপনি আমাকে রক্ষা করুন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার দুআও কবুল করলেন এবং গুহার মুখে থাকা পাথর আরো খানিকটা সরে গেলো তাতে, কিন্তু বেরোনোর জন্য তখনো তা যথেষ্ট নয়।
তাদের তৃতীয়জনের অধীনে কিছু লোক কাজ করতো। কাজ সম্পন্ন হলে সবাইকে সবার মজুরি পরিশোধ করে দেন তিনি; তবে মজুরদের মধ্যে একজন তার মজুরি নিয়েই অন্যত্র চলে যায়।
সেই মজুরের টাকাটা তিনি একটা ব্যবসাতে বিনিয়োগ করে দেন। আস্তে আস্তে দেখা গেলো–সেই ব্যবসাতে প্রচুর লাভ ও অর্থকড়ি হতে লাগলো।
অনেক আগের সেই মজুর একদিন তার কাছে ফেরত আসে এবং তার না নিয়ে যাওয়া মজুরি দাবি করে। তখন লোকটা বললেন, এই যে দেখছো উট, গাভী, বকরি আর ছাগলের খামার, এ সমস্তকিছুই তোমার। তুমি সব নিয়ে যেতে পারো।
লোকটার কথায় বেশ বিভ্রান্ত হয় সেই মজুর। সে বললো, একদিন আপনার এখানে কাজ করে মজুরি না নিয়ে চলে গিয়েছিলাম আমি। সেই মজুরি চাইতে এসেছি আজ। আপনার সহায়-সম্পত্তি দাবি করতে আসিনি। দয়া করে আমার সাথে উপহাস করবেন না।
লোকটা বললেন, আল্লাহর বান্দা, আমি তোমার সাথে উপহাস করছি না। তুমি মজুরির যে টাকা নিয়ে যাওনি, তা আমি ব্যবসাতে বিনিয়োগ করেছিলাম। এই যে উট, গাভী, বকরির খামার দেখতে পাচ্ছো, এ সবকিছুই সেই ব্যবসার লাভ থেকে করা। সুতরাং, এসবকিছুর প্রকৃত মালিক তুমি। এগুলো তুমি নিয়ে যেতে পারো। মজুর লোকটা সবকিছু বুঝে নিয়ে প্রস্থান করলো।
গুহার সেই তৃতীয় ব্যক্তিটা বললেন, ‘মালিক, সেদিনের সেই কাজটা যদি আমি কেবল আপনার সন্তুষ্টির জন্যই করে থাকি, তাহলে আজকের এই বিপদের ঘনঘটা। থেকে আপনি আমাদের মুক্ত করুন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর এই বান্দার আকুতিটাও কবুল করলেন এবং তারপর গুহার মুখ থেকে বিশালকায় সেই পাথর পুরোপুরিভাবে সরে যায় আর তারা বাইরে বেরিয়ে আসেন।[১]
বন্দিত্বের এমন চরম পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, শিয়রে মৃত্যুর এত সুনিশ্চিত হাতছানি থাকা সত্ত্বেও তাদের হাতে মুক্তি লাভের একটা উপায়, একটা অবলম্বন ছিলো। তারা তাদের সৎ আমলগুলোকে তুলে ধরতে পেরেছিলেন, যা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করা।
তিন.
কুরআনও কয়েকটা গা ছমছমে বন্দি অবস্থার কথা আমাদের শোনায়। আমরা স্মরণ করতে পারি মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনা। ফিরআউনের বিশাল বাহিনী যখন তাড়া করেছিলো মুসা আলাইহিস সালামকে, তখন অনুসারীদের নিয়ে তিনি লোহিত সাগরের দিকে চলে যান। একপর্যায়ে অবস্থা এমন দাঁড়ালো–
সামনে কূল-কিনারাবিহীন সমুদ্র আর পশ্চাতে শত্রুর নিশ্চিত উপস্থিতি। সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লে মৃত্যু সুনিশ্চিত। আর ফিরআউন বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও আছে প্রাণনাশের শঙ্কা। বনু ইসরাইল সম্প্রদায়ের সামনে এ যেন জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘের মতো অবস্থা! এমন ঘনঘোর বিপদের মুখে মুসা আলাইহিস সালামের অনুসারীরা ভয়ে বিহ্বল হয়ে বলতে লাগলো, আমরা তো নিশ্চিত ধরা পড়ে গেলাম।[২]
অনুসারীরা যতই ব্যাকুল আর বিহ্বল হোক, উপনীত বিপদে তারা যতই ঘাবড়ে যাক, নবি মুসা আলাইহিস সালাম তা নিয়ে বিন্দুমাত্রও বিচলিত নন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাকে তিনি যেভাবে চেনেন, আর কেউ তো সেভাবে চেনে না। মহাপরাক্রমশালী রবের ক্ষমতার ব্যাপারে তার হৃদয়ে আছে অপরিসীম ভরসা। তার অন্তর তাওয়াক্কুলে টইটম্বুর। তাই, অন্য সবাই যেখানে ভয়ে কাবু, সেখানে মুসা আলাইহিস সালাম শোনালেন ভরসার সেই অমিয় বাণী। তিনি বললেন, ‘কখনোই নয়। আমার পালনকর্তা আমার সাথে আছেন। অতিসত্বর তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।[৩]
