[2] সহিহুল বুখারি : ৬৩০৮; মিশকাতুল মাসাবিহ : ২৩৫৮; শুআবুল ঈমান : ৬৭০২–হাদিসটির
[3] ফাতহুল বারি, খণ্ড : ১; পৃষ্ঠা : ১০৩-১০৪
[4] সহিহ মুসলিম : ২৪৭৯
[5]সুরা বাকারা, আয়াত : ২২২
০৭. বন্দিশিবির থেকে
এক.
মানুষ বন্দি হয়ে বাঁচতে চায় না। সে স্বাধীন পাখির মতো ডানা মেলে আকাশপানে উড়তে চায়। সে উড়ে বেড়াবে সবুজ অরণ্যে, বৃক্ষের ডালে-ডালে। সে কথা বলবে ফুলের সাথে। মুক্তবিহঙ্গ হয়ে সে উপভোগ করবে জীবন আর জীবনের ছন্দ। সে তন্ময় হয়ে দেখবে আদিগন্ত নীল আকাশ! দখিনা বাতাসে সে এলিয়ে দেবে গা। ঝুম বৃষ্টির ঐকতানে সে কান পেতে শুনবে প্রকৃতির নির্মল সংগীত। নদীর কলতান, ঝরনার গান আর দৃষ্টি ছাড়িয়ে যাওয়া দূর পাহাড়ের ছায়া–প্রকৃতির শোভা দু-চোখে নিয়ে বাঁচতে চায় সে।
কিন্তু মানুষ তা পারে না। দিনশেষে তাকে বন্দি হতে হয়। সমাজের শৃঙ্খলে, অনিয়মের অন্ধকারে। কখনো-বা নিরন্তর সংগ্রামের বাঁধনে। সে দেখতে চায় নীল আকাশ, কিন্তু জীবন তাকে উপহার দেয় বেদনার নীল। পাহাড় তার পছন্দ, কিন্তু যাপিত জীবনে দুঃখ আর বেদনা হয়তো তার জীবনে হিমালয় হয়ে বর্তমান। মানুষ কোনো না কোনোভাবে জীবনে বন্দি হয়ে পড়ে। সে ছটফটায়। সে মুক্তি চায়। সে চায় শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে যেতে। বেদনার যে নীল সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে সে, সেখান থেকে বেঁচে উঠবার তার আকুল ইচ্ছে। দুঃখের যে হিমালয় চেপে আছে তার ওপর, তা সরিয়ে মুক্তির সুবাস পেতে তার অনন্ত অভিপ্রায়। তবে, এই বন্দিদশা থেকে মানুষের মুক্তি কীসে?
দুই.
বন্দিত্বের কথা মনে আসলে আমার মনে পড়ে যায় বনু ইসরাইলের সেই তিনজন মানুষের কথা, যারা একদিন আটকা পড়েছিলো একটা অন্ধকার গুহার মধ্যে। চমৎকার সেই ঘটনাটা আমাদের প্রায় সবারই জানা। ঘুরতে বের হয়ে পথিমধ্যে রাত হয়ে গেলে তারা রাত্রি যাপনের জন্য একটা গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েন। উদ্দেশ্য ছিলো রাতটা এই গুহার মধ্যে কাটিয়ে ভোর হলেই নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাবেন। রাত তাদের কাটলো বটে, কিন্তু ভোরে উঠে তাদের সকলের তো মাথায় হাত! গুহার যে প্রবেশদ্বার দিয়ে তারা প্রবেশ করেছিলেন এখানে, সেই উন্মুক্ত দ্বার যেন কোথায় হাওয়া হয়ে গেলো! দৃষ্টিসীমার মধ্যে তার কোনো অস্তিত্বই নেই।
ঘটনার আকস্মিকতায় শুরুতে ঘাবড়ে গেলেও, খানিক বাদে তারা আবিষ্কার করলেন। যে–পাহাড়ের ওপর থেকে কোনো কারণে বেশ বড়োসড়ো একটা পাথর ঠিক গুহাটার মুখে এসে পড়েছে। পাথরের আকৃতি এতই বিশাল ছিলো, পুরো গুহাটার মুখ তাতে বন্ধ হয়ে গেলো।
ভাবুন তো–কোনো এক দূরের জায়গা থেকে গন্তব্যে ফিরছেন আপনি। পথিমধ্যে রাত নেমে যায়। এমতাবস্থায় বনজঙ্গল পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ আপনার জন্য। যেকোনো সময় সামনে চলে আসতে পারে বাঘ-ভাল্লুক কিংবা হিংস্র। কোনো প্রাণী। বিপদ মাথায় নিয়ে ঘরে ফেরার চাইতে পাহাড়ের কোলে থাকা একটা নির্জন গুহার মধ্যে আশ্রয় নেওয়াটাই আপনার জন্য অধিক উত্তম এবং আপনি তা-ই করলেন। একটা গুহার মধ্যে ঢুকে পড়লেন যাতে নির্বিঘ্নে রাতটা কাটানো যায়।
কিন্তু সকালে ঘুম ভাঙার পরে যদি সেই গুহার প্রবেশমুখ খুঁজে না পান? যে দ্বার দিয়ে সেখানে পা রেখেছিলেন, তা যদি ভোর বেলাতে ভোজবাজির মতো হাওয়া হয়ে যায়–ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে? ঘন বনজঙ্গল পরিবেষ্টিত একটা পাহাড়। তার কোলে থাকা নির্জন একটা গুহা।
সেই গুহায় আপনি এখন বন্দি! গুহা থেকে বেরোনোর কোনো রাস্তাই আপনার সামনে খোলা নেই। সারাদিন চিৎকার-চেঁচামেচি করলেও আপনার আওয়াজ বাইরে বেরোবে না। কেউ জানতেও পারবে না যে, এই গুহায় কোনো এক মানুষ আটকা পড়ে আছে। হিংস্র জন্তুর থাবা থেকে বাঁচতে আপনি আশ্রয় নিয়েছিলেন গুহার মধ্যে, কিন্তু সেই গুহার মধ্যেই এখন আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে ক্ষুধা আর তৃষ্ণার যন্ত্রণা এবং সেই যন্ত্রণার শেষ পরিণতি–মৃত্যু! কেমন হবে এই দৃশ্যপট?
এমন পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আপনার যে অনুভূতি হবে, গুহার মধ্যে বন্দি হয়ে পড়া বনি ইসরাইলের সেই তিনজন মানুষের অনুভূতিও একই ছিলো–সম্মুখে নিশ্চিত মৃত্যুর হাতছানি! তবে বন্দি হয়ে পড়া সেই আল্লাহর বান্দাদের ঝুলিতে কিছুটা সম্বল ছিলো, যা দিয়ে তারা এই নিশ্চিত মৃত্যু-কূপ থেকে মুক্তির আশা করতে পারেন।
কী সেই সম্বল জানেন? সেই সম্বল ছিলো তাদের সৎকর্ম। কেবল আল্লাহকে খুশি করবার জন্য তারা যে কাজগুলো করেছিলো, যেগুলোর ব্যাপারে তারা ছাড়া দুনিয়ার কেউ জানে না, সেগুলোকে অসিলা করে তারা আল্লাহর কাছে সেই বন্দিদশা থেকে মুক্তি চাইলেন।
তাদের প্রথমজন গাভীর দুধ দোহন করে সবার আগে বাবা-মাকে পান করাতেন। বাবা-মা পান করার আগে পরিবারের কাউকেই দুধ পান করানো হতো না। এমনকি নিজেও খেতেন না। কোনো এক কাজে একবার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যায় এবং দুধের পেয়ালা হাতে বাবা-মায়ের ঘরে ঢুকে তিনি দেখতে পেলেন– তারা দুজনেই ঘুমে বিভোর। একদিকে বাবা-মা দুধ পান করলে পরিবারের অন্য কেউ দুধ পান করতে পারবে না, আবার অন্যদিকে ঘুমের ব্যাঘাত হবে ভেবে বাবা-মার ঘুম ভাঙিয়ে তাদের দুধ পান করানোও পছন্দ হচ্ছে না। ফলে দুধের পেয়ালা হাতে তিনি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন তাদের মাথার কিনারে। সকালবেলা বাবা-মার ঘুম ভাঙলে তারা দেখতে পান–তাদের সন্তান বিছানার কাছে দুধের পেয়ালা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলের এই কাজে বাবা-মা সন্তুষ্ট হলেন এবং তৃপ্তিভরে দুধ পান করলেন।
