মানুষ-ই ভুল করে এবং মানুষকেই ভুল শুধরানোর, ভুল থেকে ফিরে আসার, তাওবা করার সুযোগ দেওয়া হয়। মানুষকে মূলত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা যদি কোনো পাপ না করতে, তাহলে আল্লাহ অন্য কাউকে তোমাদের জায়গায়। স্থলাভিষিক্ত করতেন। তারা পাপ করতো আর মাফ চাইতো, এবং তাদেরকে মাফও করা হতো।[৪]
মানুষকে এই কাঠামোতেই তৈরি করা হয়েছে। বান্দা পাপ করবে, ভুল করবে এবং অবাধ্য হবে; তবে দিনশেষে সে প্রত্যাবর্তন করবে তার রবের কাছে। নিজের যাবতীয় কৃতকর্মের জন্য সে হবে অনুতপ্ত। অনুশোচনায় কাতর হয়ে উঠবে তার হৃদয়-মন। আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে ক্ষমা ভিক্ষা চাইবে। যে পাপ থেকে সে ফিরে আসবে, তার নিকটবর্তী না হওয়ার এক কঠিন সংকল্প নিজের ভেতর রাখতে হবে।
শাইখ আলি তানতাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, একবার আমার জানতে ইচ্ছে হলো, আল্লাহ কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন? আগ্রহ ও কৌতূহলের জায়গা থেকে আমি এর উত্তর পেতে চাইলাম কুরআন থেকে। কুরআন খুলে দেখতে লাগলাম যে, আল্লাহ কাদের ভালোবাসেন? কী তাদের বৈশিষ্ট্য?
আমি কুরআন খুলে দেখলাম, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নেককারদের ভালোবাসেন। ভাবলাম, আমি কি নেককার বান্দা?’ মনে হলো, না। তাহলে তো আমি এই তালিকা থেকে বাদ পড়লাম।
তারপর দেখলাম, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন; কিন্তু নিজেকে খুব বেশি ধৈর্যশীল বলে মনে হলো না আমার। ফলে এই তালিকা থেকেও বাদ পড়ে গেলাম।
এরপর দেখলাম, আল্লাহ মুজাহিদদের ভালোবাসেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে; কিন্তু আমার মতন অলস আর অক্ষম ব্যক্তি তো এই তালিকায় ওঠার কথা ভাবতেও পারি না। ফলে এখান থেকেও ছিটকে গেলাম।
তারপর দেখলাম, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা সৎ কাজে এগিয়ে; কিন্তু নিজের আমল আর আখলাকের দৈন্যদশা দেখে এই তালিকাতেও নিজেকে ভাবা গেলো না।
একপ্রকার হতাশা আর গ্লানিবোধ নিয়েই আমি কুরআন বন্ধ করে ফেলি। নিজের আমল, তাকওয়া আর ইখলাসের দিকে তাকিয়ে আমি তাতে রাজ্যের ভুল-ভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পেলাম না। কিন্তু একটু পরেই আমার মনে হলো, ‘হ্যাঁ, আল্লাহ তো তাদেরও ভালোবাসেন যারা তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
মনে হলো, এই একটা বৈশিষ্ট্যই বুঝি আমার জন্য মজুদ আছে এবং আমি তা যখন-তখন নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারি। এরপর আমি খুব বেশি পরিমাণে ইস্তিগফার পড়তে থাকি, যাতে করে আমি আল্লাহর সেসব বান্দাদের তালিকাভুক্ত হতে পারি, যারা অধিক পরিমাণে তাওবা করে এবং যাদের আল্লাহ ভালোও বাসেন।[৫]
আমরা হয়তো-বা নেককার হতে পারলাম না, আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ হওয়ার সৌভাগ্যও হয়তো আমাদের কপালে নেই। অনুপম ধৈয্যের অধিকারী কিংবা যারা বেশি ভালো কাজে অগ্রগামী–তাদের দলভুক্তও হয়তো হতে পারলাম না; কিন্তু তাই বলে কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ভালোবাসার তালিকা থেকে
একেবারে বাদ পড়ে যাবো? কখনোই নয়। আল্লাহর প্রিয়ভাজন হওয়ার একটা রাস্তা সদা-সর্বদা খোলা রয়েছে আমাদের জন্য। আর সেই রাস্তা হলো–তাওবার রাস্তা। অধিক পরিমাণে তাওবা করা। আল্লাহর কাছে নিজের পাপ, নিজের ভুল, নিজের অবাধ্যতার জন্য কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চাওয়া।
ভুল করেও ভুলের ওপর স্থির থাকা এবং সেই ভুলকে যুক্তি-তর্ক দিয়ে জায়েয বানানোর চেষ্টা করাটা শয়তানের বৈশিষ্ট্য। আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করতে অস্বীকার করাটা ছিলো ইবলিসের ভুল আর সেই ভুলকে–’আমি আগুনের তৈরি আর আদম মাটির তৈরি, তাই আমি সেরা হয়ে কেন আদমকে সিজদা করবো’–যখন সে স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণে লেগে গেলো, তখন সে ভুলের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলো একেবারেই। এই মাত্রা ছাড়ানোটাই তাকে অভিশপ্ত বানিয়ে ছাড়লো।
অপরদিকে ভুল করার পর তা বুঝতে পারা, তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া, তা থেকে বিরত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া একটা সতেজ, সুন্দর এবং সবুজ অন্তরের প্রমাণ বহন করে। জান্নাতে শয়তানের প্ররোচনায় নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার কারণে যখন আদম আলাইহিস সালাম এবং হাওয়া আলাইহাস সালামকে দুনিয়ায় নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন তারা নিজেদের কৃত ভুল বুঝতে পেরে, তার জন্য অনুতপ্ত হয়ে, গভীর অনুশোচনাসহ তারা আল্লাহর কাছে করজোড়ে ক্ষমা ভিক্ষা করেন। ভুল হয়ে গেলে তা নিয়ে অন্তরে পেরেশানি দেখা দেওয়াটা তাকওয়ার লক্ষণ।
তাই, কখনো ভুল হলে, কখনো পাপ কাজ হয়ে গেলে–হোক তা যত ক্ষুদ্র আর নামমাত্র, তা থেকে ফিরে আসার তাগাদা হৃদয়ে মজুত রাখতে হবে। ভুলের ওপর অটল না থেকে, তা থেকে বিরত হয়ে, নফল সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাইতে পারলে অন্তর প্রশান্ত হয়। বারে বারে সেই ভুলের কথা স্মরণ করে অনুতপ্ত হওয়া, তার জন্য বারে বারে আল্লাহর ক্ষমা আশা করে ইস্তিগফার পাঠ করা এবং নিজের পাপ মোচনের নিমিত্তে কিছু দান-সাদাকা করতে পারলে একদিকে যেমন আল্লাহর নৈকট্য লাভে এগিয়ে যাওয়া যায়, অন্যদিকে ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে ধারণ করা যায় ভালো কিছু আমলের চর্চা।
———–
[1] আদ-দাউ ওয়াদ-দাওয়া : ১৮৮
