থাপড়ানোর হুমকি দিয়েছেন। এসবের ধারে-কাছেও ঘেঁষেননি তিনি। তথাপি কেন তার ভেতর এত অনুতাপ, অনুশোচনা?
মানুষ হয়তো-বা তার কথাগুলোতে তেমন কোনো শ্লেষ, তেমন কোনো তিরস্কার খুঁজে পাবে না; কিন্তু উচ্চারণের সময় তাতে কী পরিমাণ অহংকার, দাম্ভিকতা আর বড়োত্ব জাহিরের প্রয়াস ছিলো, তা কেবল তিনিই জানেন। আর একজন সাধারণ অশিক্ষিত মানুষ, যিনি নিতান্তই সংগ্রাম করে জীবনযাপন করেন, তার সামনে নিজের এহেন দাম্ভিকতা প্রদর্শন, অহংকারের এমন পসরা সাজানোর ফলে আল্লাহর দরবারে কোন কৈফিয়ত নিয়ে তিনি হাজির হবেন? হাজারো পাপের ভিড়ে আপাতদৃষ্টিতে ‘পাপ নয় এমন বিষয়টাও যদি তাকে পাকড়াও করার জন্য কিয়ামতের ময়দানে হাজির হয়ে পড়ে, কোন সে পথ, যা দিয়ে তিনি পলায়ন। করবেন সেদিন? এই বোধটাই তাকে অনুতপ্ত করে তুলেছিলো সেদিন। ওই রিকশাওয়ালার কাছে মাফ চাওয়ার সুযোগটা তার হাতে ছিলো না, কিন্তু গাফুরুর রাহিম, যিনি জানেন বান্দার অন্তরের অবস্থা, তার কাছে অনুনয় করে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বুঝলেন যে, তার ভুল হয়েছে। ভুল হয়ে গেলে ভুলের ওপর স্থির না থেকে, যুক্তি-তর্ক সাজিয়ে সেই ভুলকে সমর্থন করে অন্তরে প্রবোধ লাভের চাইতে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে নিজেকে শুধরে নেওয়ার মধ্যেই প্রভূত কল্যাণ।
ভুল হয়ে গেলে তোক সে ভুল একেবারে সামান্য কিংবা অণু পরিমাণ, তবু তার জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হতে পারা, ক্ষমা লাভের আশায় অশ্রু বিসর্জন করতে পারা, মুনাজাতে দুহাত উত্তোলন করতে পারা একটা সবুজ সতেজ হৃদয়ের স্বাক্ষর বহন করে। যারা ছোটোখাটো ভুলে একেবারে নত হয়ে যায়, অন্তর্দহনে অস্থির হয়ে পড়ে, তাদের দ্বারা বড় কোনো ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব সামান্য। তারা পথ হারায় কম। পদস্খলনের ব্যাপারে তারা সম্যক সতর্ক।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, একজন তাকওয়াবান পাপ কাজকে এমন ভয় পায়, সে মনে করে সে কোনো পাহাড়ের গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, আর পাহাড়টা তার ওপর বুঝি ধ্বসে পড়তে যাচ্ছে। অপরদিকে পাপে নিমজ্জিত ব্যক্তি পাপ কাজকে এতই হালকাভাবে দেখতে শুরু করে, পাপ কাজ করাকে সে নাকের ডগায় থাকা একটা মাছির মতো মনে করে, যেন একটু হাত নাড়লেই তা উড়ে পালাবে।[২]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যে উপমা এখানে দিয়েছেন, তা খুবই যথাযথ। একজন তাকওয়াবান ব্যক্তি, যার হৃদয়ে সবসময় আল্লাহর ভয় কাজ করে, তার কাছে পাপ কাজকে পর্বত পরিমাণ বোঝা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ তার নফস এটার সাথে কোনোভাবেই অভ্যস্ত না। মিথ্যে কথা বলার আগে তার মন দুরুদুরু করতে থাকে। হায়! আমি কীভাবে মিথ্যে বলবো’–এমন মমর্যাতনায় সে বিধ্বস্ত হতে থাকে বারবার। কাউকে ঠকিয়ে কোনোকিছু অর্জনের মতন পাপ কাজ সামনে এলে সে শিউরে ওঠে। জীবনের এমন জটিল সমীকরণ থেকে সে পালিয়ে বাঁচতে চায়। কারণ সে জানে–জগতের আর কেউ জানুক বা না-জানুক, আর কেউ দেখুক কিংবা না-দেখুক, আসমানে যিনি আছেন, যিনি মানুষের অন্তঃকরণ থেকে শুরু করে গভীর পাতালে থাকা অণুজীবের ব্যাপারেও ওয়াকিবহাল, তার চোখকে ফাঁকি দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। হাশরের ময়দানে যখন আমলনামা হাজির করা হবে, সেদিন আজকের এই খুচরো মিথ্যে যা একান্ত হাসতে হাসতেই, কৌতৃকাচ্ছলেই বলে ফেলা হলো, আজকের এই লোক ঠকানি, যা কেউ দেখেনি ভেবে সেরে ফেলা হলো নির্বিঘ্নে, সবকিছুই যে একে একে সামনে তুলে ধরা হবে–সে ব্যাপারে তাকওয়াবান ব্যক্তি মাত্রই সবিশেষ জ্ঞাত। তাই জীবনের যেকোনো অনুষঙ্গে, যেকোনো পাপ কাজের সুযোগে সে শিউরে ওঠে, পালায় আর ভাবে, ‘এই বুঝি আযাবের পর্বত ধ্বসে পড়লো আমার মাথায়।[৩]
অন্যদিকে যার অন্তঃকরণে নেই আল্লাহর ভয়, যার কাছে আখিরাত কেবল কেতাবি আলোচনার বিষয়বস্তু, পাপ কাজকে সে খুব সস্তাভাবেই দেখে; এমন সস্তা ভাবে যে, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জুতসই উপমার মাধ্যমেই বলেছেন সেটা–যেন নাকের ডগায় বসা কোনো মাছি, হাত নাড়ালেই উড়ে চলে যাবে।
এ হলো আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল আর আল্লাহকে স্মরণকারী দুটো হৃদয়ের উদাহরণ। কোন শিবিরে আমরা নিজেদের দেখতে পছন্দ করি, তা বেছে নেওয়ার দায়িত্ব নিজেদের। সেই শিবিরে, যে শিবিরে সদা-স্মরণে গুঞ্জরিত হয় মহামহিমের নাম? নাকি সে শিবিরে, যাদের অন্তঃকরণে পড়ে গেছে অবাধ্যতার মরিচা?
তিন.
ভুল করার পরে যদি আপনি ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হন, অনুতপ্ত হন, যদি অনুশোচনায় কাতর হয়ে ওঠে আপনার তনুমন, তাহলে জানুন–আপনার অন্তরের কোথাও এখনো জিইয়ে আছে এক টুকরো সবুজ। সেই সবুজটাকে বাড়তে দিলে তা নিশ্চিতভাবে একদিন ঘন-অরণ্যে পরিণত হবে। তাতে যদি পানি দেওয়া হয়, পরিমিত পরিচর্যা করা হয়, একদিন সেই অরণ্যের বনে বসবে মহীরুহের মেলা।
ভুল করার পরে আল্লাহর সামনে কীভাবে দাঁড়াবো’–এই ভয়ে যদি প্রকম্পিত হয় আপনার অন্তর, তাহলে নিশ্চিত হন–আপনার হৃদয়ের কোথাও এখনো মিটিমিটি করে জ্বলছে একটুকরো আলো। আলোটাকে নিভতে না দিয়ে যদি আরো ভালোভাবে জ্বলে ওঠার বন্দোবস্ত করা যায়, তাহলে অন্ধকার হৃদয় একদিন আলো ঝলমলে উঠোনে পরিণত হবে।
