‘যামু।’
‘কত টাকা ভাড়া?’
‘এত দেওন লাগব। রাস্তায় জ্যাম বেশি।’
প্রথমত অসহ্য গরম, তার ওপর মস্তিষ্কের কোষগুলোতে তখন ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে; খুব বেশি বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে ভাড়াটাকে যে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনবেন, মনের সেই অবস্থা নেই। একপ্রকার সওয়াল জওয়াব ছাড়াই রিকশায় চড়ে রাস্তার বাড়ি-ঘর, মানুষ আর যানবাহন গুনতে গুনতে বাসার উদ্দেশে পথ পাড়ি দিতে লাগলেন তিনি।
রিকশাওয়ালাকে যে জায়গার কথা বলে রিকশায় চড়েছেন, তার মূল সড়কে এনে রিকশাওয়ালা বললেন, ‘নামেন। আইয়্যা পড়ছি।’
যদিও মাথার তেজ কমার বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই, তথাপি নিজেকে শান্ত রাখার সবটুকু চেষ্টা চেহারায় ফুটিয়ে তুলে এবং গলাটাকে যতখানি নরম করা যায়, তার সবটুকু ঢেলে দিয়ে বললেন, এই দিকে একটু ভেতরে যান। সামনের মোড় পার হলেই আমার বাসা।
কিন্তু তার ভদ্র-কথা আর ভদ্রোচিত চেহারা–কোনোটাই রিকশাওয়ালার মন গলাতে পারলো না। তার আবদারকে সম্পূর্ণভাবে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে রিকশাওয়ালা বললেন, যেখানের কথা কইছেন ওইখানে আইয়্যা পড়ছি। এর বেশি আমি আর যাইতে পারুম না।’
অন্যকোনো দিন হলে একটা ব্যাপার ছিলো, কিন্তু সেদিন নিজের মন-মেজাজের বেহাল দশা, তার ওপর এখন আবার সামান্য একটা বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি! দেড় মিনিটের রাস্তা, একটুখানি সামনে গেলে কী এমন ক্ষতি হবে রিকশাওয়ালার?
তখনো নিজেকে স্বাভাবিক রাখার সবটুকু কসরত করে তিনি বললেন, দেখুন ভাই, আমি এই জায়গায় নামবো বলেছি ঠিক আছে, কিন্তু তার মানে তো এই না যে, আপনি আমাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে চলে যাবেন। আর এই এলাকা মানে তো কেবল এই রাস্তাটাই নয়। এলাকাটা বিশাল। রাস্তায় নেমে যাওয়ার জন্য তো আমি আপনার রিকশায় উঠিনি।
তিনি ভেবেছিলেন তার যুক্তিতে রিকশাওয়ালা একেবারে কুপোকাত হয়ে যাবেন, কিন্তু তাকে নিরাশ করে দিয়ে রিকশাওয়ালা বললেন,
‘এত কথা কইয়েন না মামা। যে জাইগার নাম কইছেন ওই জাইগাই আইছি। অহন নামেন আর ভাড়া দেন।
‘তার মানে আপনি আর সামনে যাবেন না?
‘না।
‘আমাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে যাবেন?
‘যেখানে কইছেন ওইখানে নামাই দিছি।
নিজেকে আর ধরে রাখা গেলো না কোনোভাবে। সারাদিনের ক্লান্তি, মস্তিষ্কের ওপর মেজাজের যে ভারিক্কি চাপ পড়েছে সেটা এবং রিকশাওয়ালার অনড় কিন্তু অবিবেচক অবস্থান তাকে একেবারে অন্য-মানুষ হয়ে উঠতে বাধ্য করলো যেন। কোনোদিন যা করেননি, কোনো সময়ে যা তাকে দিয়ে হয়নি এবং যা করার কথা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না, তা-ই করে বসলেন। মাথায় অসম্ভব রাগ চেপে রেখে তাকে বললেন, ‘আপনি জানেন আপনি কার এলাকায় এসে কথা বলছেন?
‘আপনের এলাকা? তো হইছে কী? আপনে আমারে মাইরবেন?’
‘মারবো তো অবশ্যই না, কিন্তু মানুষ যে আপনাদের গায়ে হাত তোলে, তা মনে হয় মাঝে মাঝে ঠিক-ই আছে। আপনাদের গোয়ার্তুমির কারণে আপনারা মার খান।
‘এত কথা কইয়েন না মামা। টেহা দেন, যাইগা।
তার সাথে বেশিদূর কথা আগানোর অবস্থায় তিনি ছিলেন না আর। রাগে গজগজ করতে করতে, টাকা ক’টা গুনে একপ্রকার তাচ্ছিল্যের সাথে তার হাতে দিয়ে সোজা রাস্তা ধরলেন; কিন্তু তার রাগ, তার অহংকার আর দম্ভোক্তি বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না। হোক রাগের মাথায়, হোক রিকশাওয়ালা-ই ভুল কিংবা অন্যায় করেছে, কিন্তু যে অন্যায় তিনি রিকশাওয়ালার সাথে করে ফেলেছেন, যে কদর্য ব্যবহার, যে অশালীন আচরণ তিনি প্রদর্শন করেছেন খানিক আগে, তা যখন পুনরায় তার মানসপটে ভেসে উঠলো, তিনি যেন ভেতর থেকে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে যেতে লাগলেন! যেন তিনি ভেঙে যেতে লাগলেন হুড়মুড় করে। একটু আগে যে রূপ তিনি দেখিয়েছেন, যে ভাষা মুখ দিয়ে বের করেছেন, তা কোনোভাবেই তার পরিচিত নয়। এই ‘তিনি’কে তিনি চেনেন না।
রিকশাওয়ালা তাকে যে জায়গায় নামিয়ে দিয়ে ভাড়া গুনে নিয়ে ফিরে গেছে, সেখান থেকে হেঁটে বাসায় যেতে তার বড়োজোর চার থেকে পাঁচ মিনিট লাগে। ওই চার/ পাঁচ মিনিট সময় ব্যয় করে বাসায় ফেরার আগেই তিনি বিবেকের দংশনে পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে লাগলেন। বারবার তার মনে হচ্ছিলো, ‘হায় আল্লাহ! এ আমি কী করে ফেললাম? আল্লাহর দরবারে বারংবার ক্ষমাপ্রার্থনা করেই চললেন তিনি। গরিব একজন মানুষের সাথে তার এমন কদর্য ব্যবহারের কারণে, এমন অশালীন আচরণের কারণে মালিক যেন তার প্রতি অসন্তুষ্ট না হন, সেজন্য তার চিন্তার জগতে, তার মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে কেবল একটাই ব্যাপার ঘটে চলেছে তখন-ইস্তিগফার। আল্লাহর কাছে বারে বারে মাফ চাওয়া।
দুই.
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, কিয়ামতের দিন বান্দা পর্বত পরিমাণ ভালো আমল নিয়ে হাজির হবে, কিন্তু সে দেখবে–কেবল কদর্য ভাষার কারণে তার সমস্ত ভালো আমল ভেস্তে গেছে।[১]
সারাজীবনের চেষ্টায় যেটুকু আমল নিয়ে মহামহিম রবের দরবারে হাজির হতে হবে, যা কিছু সঞ্চয় ওপারের জন্য জমা আছে, কেবল রিকশাওয়ালার সাথে এমন অমানবিক আচরণের কারণেই যদি সব হারাতে হয়, তাহলে এর চাইতে বড় দেউলিয়াত্ব আর কী আছে?
কারো কারো মনে হতে পারে, কী এমন আহামরি রিকশাওয়ালাকে বলে ফেলেছেন, যার দরুন তিনি এভাবে ছটফট শুরু করেছেন? হতে পারে আহামরি কিছুই তিনি বলেননি। হতে পারে সাধারণ বাঙালি মুসলিম, তার রোজকার জীবনে শ্রমিক শ্রেণি আর নিম্নশ্রেণির মানুষের সাথে যে ভাষায় কথা বলে, তার চাইতেও অধিক সভ্য-ভব্য তার শব্দচয়ন, বাক্যের মাত্রা। রিকশাওয়ালাকে তিনি না চড় লাগিয়েছেন,
