আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হলেন সেই সাহাবি, যিনি সবচেয়ে বেশিসংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেছিলেন। সাহাবিদের মধ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস সবচেয়ে বেশি মুখস্থ করেছিলেন তিনিই। পরবর্তী সময়ে তা ছড়িয়ে দিয়েছেন উম্মাহর মাঝে। এমনকি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি এগিয়ে আছেন নবিজির স্ত্রী, উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহার চাইতেও। এ এক অনন্য, অসাধারণ কীর্তি!
কিন্তু জানলে অবাক হতে হয়, আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গ পেয়েছিলেন মাত্র তিনবছর। নবিজির গোটা তেষট্টি বছরের জীবন থেকে কেবল তিনটে বছর তার সংস্পর্শে থাকার সৌভাগ্য হয় আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর। তার ইসলাম গ্রহণের তিন বছর পরেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুবরণ করেন।
মাত্র তিনটি বছর কাছে পেয়েছিলেন নবিজিকে। নবিজির সাথি হওয়ার সময়কালটা তার জন্য বড়োই সংক্ষিপ্ত; অথচ এই তিন বছরেই তিনি কিনা হয়ে উঠলেন জ্ঞানের এক অনন্য উদাহরণ! এই তিন বছরেই তিনি নিজেকে নিয়ে গেলেন এমন এক উচ্চতায়, যেখান থেকে আজ গোটা মুসলিম উম্মাহ নিত্যদিন, নিত্য-নিয়ম করে তাকে পড়ে, তার নাম উচ্চারণ করে। হোক হাদিসের ছাত্র কিংবা সাধারণ তালিবুল ইলম, আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চেনে না, তার নাম শোনেনি কোনোদিন–এমন ঘটনা ঘটা একেবারে অসম্ভব।
‘অন্যেরা অনেকদূর এগিয়ে গেছে, আমি পিছিয়ে পড়েছি, কিংবা জীবনের সূর্যটা অস্তগামীপ্রায়, আর কি সময় হবে নতুন করে শেখার’-ভাবনার এমন দোলাচলে আমরা যারা দোদুল্যমান আছি, আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার এক অনন্য বাতিঘর হলেন সাহাবি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু। কত কম সময়ে কতকিছু যে শিখে ফেলা যায়, তা আমরা এখান থেকে শিখতে পারি।
তাই, শেখার শুরুটা আপনি কবে করছেন তা বিবেচ্য নয়। করছেন কি না, আর করলেও তাতে কতখানি আন্তরিকতা বিদ্যমান, তা-ই হচ্ছে ব্যাপার।
বয়সের ভার যদি জ্ঞানার্জনের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, একবার মনে করুন সাহাবি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা। মাত্র তিনটে বছর-ই তো! এর পরেরটুকু ইতিহাস!
চার.
সময় ফুরিয়ে যায়নি। দরকার একটা ইস্পাত-কঠিন সংকল্প আর অদম্য ইচ্ছের। আপনার বয়স কম, সেটা কোনো বড় ব্যাপার নয়। ব্যাপার হচ্ছে, আপনার ভেতরে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতন সবুজ-সতেজ চেতনা আছে কি না, যেই চেতনা গভীর শোকের মাঝেও খুঁজে নেবে শেখার উপকরণ। যে চেতনা আপনাকে আন্দোলিত করবে নতুন করে শিখতে। নতুন কিছু শিখতে।
বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে গেলেও ঘাবড়াবেন না, চিন্তিত হবেন না। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের জন্য বরাদ্দ আছে অবারিত সুযোগ। আরবি পড়তে পারেন
কিংবা এককালে পারলেও এখন ভুলে গেছেন, তা কোনো সমস্যা না। সমস্যা তখনই যখন শেখার জন্য আপনার মাঝে কোনো তাড়না না থাকে। বনশ্রীর সেই বৃদ্ধ, যাকে আমি দেখতাম কুঁজো হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে রোজ আরবি পড়তে আসতেন, তার দৃঢ়তা আর ধৈর্যকে আমার কাছে কখনোই নুইয়ে পড়া কিংবা ম্লান হয়ে আসা কোনোকিছু মনে হতো না; বরং মনে হতো–থুরথুরে শরীরের আড়ালে একটা অদম্য যৌবনশক্তি কোথায় যেন লুকিয়ে আছে, যা তাকে জীবনের শেষলগ্নে এসেও কাবু হতে দেয়নি। বয়সের ভার কিংবা সময়ের স্বল্পতা কখনোই শেখার পথে বাধা নয়। সাহাবি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতন যাদের অন্তরে আছে শেখার অদম্য তৃষা, তাদের জন্য জীবনের শেষ দিন, এমনকি শেষ মুহূর্তটাও সুবর্ণ সুযোগ। কবি বলেছিলেন, বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র ছাত্র হওয়ার একটা দারুণ মজা আছে! শিখতে পারার মজা!
———-
[1] মিহনাতুল ইমাম আহমাদ, আব্দুল গনি আল-মাকদিসি, পৃষ্ঠা : ৩৩-৩৪; আল-জামি লি উলুমিল ইমাম আহমাদ, খণ্ড : ৩; পৃষ্ঠা : ৪২৪
[2] বর্তমানে এটি তুরস্কের একটি শহর।
[3] সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড : ৮; পৃষ্ঠা : ৪০৮-৪০৯
[4] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত : ৩৭
[5] সুরা নাসর, আয়াত : ১-৩
[6] সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড : ১৫; পৃষ্ঠা : ৩৯৫
[7] মুআত্তা মালিক : ১২৮; আল-ইস্তিযকার, ইবনু আব্দিল বার, খণ্ড : ৪; পৃষ্ঠা : ২২৪; জামিউল উসুল, খণ্ড : ৩; পৃষ্ঠা : ২১৮
[8] জামি তিরমিযি : ২১৪০; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৮৩৪–হাদিসটির সনদ সহিহ
[9] শারহুল আকিদাতিল মুমিত, ইবনু উসাইমিন, খণ্ড : ৫; পৃষ্ঠা : ৩৮৮
[10] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড : ৮; পৃষ্ঠা : ৩২৮
[11] আল আকিদা ফি আহলিল বাইত বাইনাল ইফরাত ওয়াত তাফরিত, পৃষ্ঠা : ৩২৪-৩২৫; সহিহুল বুখারি : ৪২৯৪
০৬. কখনো ভুল হলে
এক.
ঘটনাটা পরিচিত একজনের। কোনো এক কারণে তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে তিনি সেদিন অফিস থেকে ফিরছেন। মাথা এমন ভার–যেন মস্তিষ্কের নিউরনগুলোতে জট বেঁধে গেছে। এমন অস্বাভাবিক রাগ তার হয় না সাধারণত। কেন যে সেদিন তিনি এত রেগে গেলেন এবং মেজাজখানা-ই বা কেন একেবারে সপ্তমে চড়ে বসেছিলো কে জানে! বাসায় ফেরার জন্য একজন রিকশাওয়ালাকে বললেন,
‘অমুক জায়গায় যাবেন?’
