এ তত্ত্বটা আমি স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু আমার দৃঢ়তর বিশ্বাস, পুরুষ কবি, পুরুষ সাহিত্যিক কখনও, কস্মিনকালেও নারীর হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারেনি, পারবেও; তার কারণ কী, কেন পারে না, সে নিয়ে আমি অনেক চিন্তা করেছি, কিন্তু কোনও সদুত্তর পাইনি।
যদিও কিঞ্চিৎ অবান্তর তবু এই প্রসঙ্গে একটি কথা তুলি। নারী-হৃদয়ের স্পন্দন এবং পুরুষ-হৃদয়ের প্রতিস্পন্দনের আলোচনা নয়; নারী-পুরুষের একে অন্যকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করার যে চিন্ময় প্রেম সেটাও নয়। আমি নিতান্ত মৃন্ময়, শারীরিক যৌন সম্পর্কের কথা তুলছি। আজকাল সাহিত্যিক, তাদের পাঠক সম্প্রদায়, খবরের কাগজে পত্র-লেখকের দল সবাই নির্ভয়ে এসব আলোচনা সর্বজনসমক্ষে করে থাকেন। আমার কিন্তু এখনও বাধোবাধো ঠেকে। কত হাজার বৎসরের না, না-র taboo আজ অকস্মাৎ পেরিয়ে যাই কী প্রকারে?
তবে আমার এইটুকু সান্ত্বনা, যার আপ্তবাক্যের শরণ আমি নিচ্ছি, তিনি আপনার গুরুর গুরু দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
যে দেশ পত্রিকার সঙ্গে আপনি বহু বৎসর ধরে বিজড়িত সেই পত্রিকাতেই বেরিয়েছিল তাঁর একখানা চিঠি। আমার শব্দে শব্দে মনে নেই। তবে মূল তত্ত্বটি আমার মনে জ্বলজ্বল করছে।
কে যেন তাকে শুধিয়েছিল, পুরুষ যখন কখনও কোনও রমণীকে দেখে কামাতুর হয় (এখানে দেহাতীত স্বর্গীয় প্লাতনিক প্রেমের কথা হচ্ছে না), তার কামকে উত্তেজিত করে রমণীর কোন কোন জিনিস?
তার মুখমণ্ডল, তার ওষ্ঠাধর, তার নয়নাগ্নি, তার কৃচদ্বয়, তার নিতম্ব, তার উরু।
এইবারে প্রশ্ন, কোনও পুরুষকে দেখে যখন কোনও রমণী কামাতুরা হয় তখন কী দেখে তার কামবহ্নি প্রজ্বলিত হয়?
যে-ভদ্রলোক দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথকে এ প্রশ্ন শুধিয়েছিলেন তাঁর পত্র দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু দেশে প্রকাশিত দ্বিজেন্দ্রনাথের পত্রোত্তর থেকে সে প্রশ্নের মোটামুটি স্বরূপ অনুমান করা যায়।
আবার বলছি, দ্বিজেন্দ্রনাথ কী উত্তর দিয়েছিলেন সেটি আক্ষরিক, হুবহু আমার মনে নেই। তিনি যা লিখেছিলেন তার মোদ্দা তাৎপর্য ছিল; তিনি যে এ সম্বন্ধে কোনও চিন্তা করেননি তা নয়। কিন্তু কোনও সদুত্তর খুঁজে পাননি।
তার পর ছিল ইংরেজি একটি সেন্টেন্স। যতদূর মনে পড়ছে, তিনি লিখলেন, But why ask me? Ask Rabi. He deals in them. অর্থাৎ বলতে চেয়েছিলেন, তিনি দার্শনিক, এসব ব্যাপারে তিনি বিশেষজ্ঞ নন; তবে লাকিলি তাঁর ছোট ভাইটি এ বাদে স্পেশালিস্ট; তিনি প্রেম, কাম, নিষ্কাম প্রেম সম্বন্ধে সুচিন্তিত অভিমত দিতে পারেন।
কিন্তু সৈয়দ সাহেব, পীর সাহেব, আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস কনিষ্ঠ ভ্রাতাটিও এ বিষয়ে খুব বেশি ওয়াকিফহাল ছিলেন না। প্রথম যৌবনে তিনি এসব নিয়ে কবিতা লিখেছেন, কিন্তু বোলপুরে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করার পর তিনি যাকে বলে হট-স্টাফ– সেটাকে তাঁর গানের বিষয়বস্তু করেননি। বোধ হয় ভেবেছিলেন, তাঁর রচিত হট-স্টা গান আশ্রমের ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারিণীরা দিনের পর দিন শুনবে, এটা কেমন যেন বাঞ্ছনীয় নয়। এবং এগুলো তো আর ওয়াটার-টাইট কমপার্টমেন্টে বন্ধ করে খাস কলকাতার বয়স্কদের কনজাম্পশনের জন্য চালান দেওয়া যায় না। ওগুলোর বেশকিছু ভাগ বুমেরাঙের মতো ফিরে আসবে সেই বোলপুরেই প্রথম যুগে গ্রামোফোন রেকর্ডের কল্যাণে, পরবর্তী যুগে বেতার তো ঘরে ঘরে।
অ্যথা বিনয় আমার সয় না। আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত বেশ ভালো করেই চিনি, অবশ্য বিশ্বভারতীয় প্রকাশন বিভাগের মতো তার গানের ফুলস্টপ-কমা স্পেশালিসট নই। তাই অহ্যানড় বলছি তার শেষের দিকের গানের একটিতে হট-স্টাফের কিঞ্চিৎ পরশ আছে :
বাসনার রঙে লহরে লহরে
রঙিন হল।
করুণ তোমার অরুণ অধরে
তোলো হে তোলো।
আর বার বার বলছেন, পিয়ো হে পিয়ো। সর্বশেষে বলছেন, আমার এই তুলে-ধরা পান-পাত্র চুম্বনের সময় তোমার নিশ্বাস যেন (আমার) নিশ্বাসের সঙ্গে মিশে যায়।
এই যে প্রিয়ার নবীন উষার পুষ্পসুবাসের মতো নিশ্বাস, একে নিঃশেষে শোষণ করার মতো সালাইম্ কাম আর কী হতে পারে?
কিন্তু আপনার মুখেই শুনেছি, রবীন্দ্রভক্তদের ভিতর এ গানটি খুব একটা চালু নয়। অথচ দেখুন, সিনেমা এটা নিয়েছে, গ্রামোফোন এটা রেকর্ড করেছে। মাফ করবেন, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, এইসব তথাকথিত রবীন্দ্রভক্তদের চেয়ে ব্যবসায়ী সিনেমা, গ্রামোফোন কোম্পানি রবীন্দ্রনাথকে বহু বহু বার অধিকতর সম্মান দেখিয়েছে, নিজেদের সুরুচির পরিচয় দিয়েছে।
হ্যাঁ, আগে ভাবিনি, এখন হঠাৎ মনে পড়ল আরেকটি গানের কথা। এটি অবশ্য হট স্টাফ নয়, কিন্তু আমার মূল বক্তব্যের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে।
ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো।
আমার মুখের আঁচলখানি।
ঢাকা থাকে না হায় গো,
তারে রাখতে নারি টানি ॥
আমার রইল না লাজলজ্জা,
আমার ঘুচল গো সাজসজ্জা–
তুমি দেখলে আমারে
এমন প্রলয়-মাঝে আনি
আমায় এমন মরণ হানি ॥
আচ্ছা, চিন্তা করুন তো এ গানটি কোন সময়ের রচনা? ভাষার পারিপাট্য, স্বতঃস্ফূর্ত মিলের বাহার, আরও কত না কারুকার্য যেগুলো চোখে পড়ে না, কারণ প্রকৃত সার্থক কলার ভিতরে তারা নিজেদের এফার্টলেসলি বিলীন করে দিয়েছে– এগুলো তো ওই গানের পরবর্তী শ্লোকের ভাষায় আকাশ উজলি লাগিয়ে বিজুলি আমাকে পরিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে, গানটি কবির পরিপক্ক বয়সের অত্যুকৃষ্ট সৃজন। নিশ্চয়ই এ শতাব্দীর দ্বিতীয় বা তৃতীয় দশকে।
