***
এসব তাবৎ কাহিনী সকলেরই জানা। আমি শুধু আমার আপন ভাষাতে কাহিনীটির পুনরাবৃত্তি করার লোভ সম্বরণ করতে পারলুম না। কেউ যেন অপরাধ না নেন। যুগ যুগ ধরে আসমুদ্রহিমাচল সবাই আপন আপন ভাষাতে মহাভারত নয়া নয়া করে লিখেছে। আমি যবন। আপ্তবাক্য বেদে আমার শাস্রাধিকার নেই। কিন্তু মহাভারতে অতি অবশ্যই আছে। সাবধান! বাধা দেবেন না। ক্যুনাল রায়োট লাগিয়ে আপন হক কেড়ে নেব।
কিন্তু এহ বাহ্য।
ইয়োরোপীয়রা বলে আমরা স্বার্থপর। তবে আমাদের এই যে সর্বপরিচিত সর্বজনসম্মানিত গ্রন্থে যুধিষ্ঠির বলছেন, তাঁর স্বর্গসুখের তরে কোনও লোভ নেই, তিনি মোক্ষলুব্ধ নন, এমনকি স্বর্গে না যেতে পারলে তিনি যে তাঁর ভ্রাতৃবর্গ, কুন্তী, পাঞ্চালীর সঙ্গসুখও পাবেন না, তাতেও তার ক্ষোভ নেই– কিন্তু, কিন্তু, তিনি—
এই ভক্ত শরণাগত কুকুরটিকে কিছুতেই পরিত্যাগ করতে পারবেন না।
***
ট্রেনে কলকাতা থেকে আসতে আসতে এইসব কথা ভাবছিলুম। স্বপ্নে যে শুনেছিলুম, যার মোদ্দা ছিল,
ওরে ভীরু, তোমার উপর নাই ভুবনের ভার।
হালের কাছে মাঝি আছে, করবে তরী পার ॥
তুই কলকাতা ছেড়ে পালা। না, যুধিষ্ঠিরকে সামনে রেখে সেই পন্থা অবলম্বন করব? অবশ্য আমি যুধিষ্ঠির নই বলে, আমার যেটুকু সঙ্গতি আছে সেইটুকু সম্বল করে নিয়ে।
হজরত নবী প্রায়ই বলতেন, আল্লার ওপর নির্ভর (তওয়াক্কুল) রেখো। একদা এক বেদুইন শুধাল, তবে কি, হুজুর, দিনান্তে উটগুলোকে দড়ি দিয়ে না বেঁধে মরুভূমিতে ছেড়ে দেব– আল্লার ওপর নির্ভর করে? পয়গম্বর মৃদুহাস্য করে বলেছিলেন, না। দড়ি দিয়ে খুঁটিতে বেঁধে আল্লার ওপর নির্ভর রাখবে। অর্থাৎ বাঁধার পরও ঝড়ঝঞ্ঝা আসতে পারে, দড়ি ছিঁড়ে যেতে পারে, চোর এসে দড়ি কেটে উট চুরি করে নিয়ে যেতে পারে– ওই সব অবোধ্য দৈব-দুর্বিপাকের জন্য আল্লার ওপর নির্ভর করতে হয়।
তে রয়ে গিয়ে যেটুকু করার সেইটুকু করাই উচিত ছিল আল্লার ওপর নির্ভর করে অর্থাৎ মা ফলেষু কদাচন করে?
***
শুতে যাবার সময় হঠাৎ একটি কথা মনে পড়ে যাওয়াতে আপন মনে একটু হাসলুম।
সেই পাকিস্তানি মহিলাকে শুধিয়েছিলুম, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ এই নাপাক কুকুরটা মহাভারতে ঢুকল কেন?
তিনি বলেছিলেন, আমি ভেবে দেখেছি কথাটা।… আসলে কী জানেন, মহাভারত সব বয়সের লোকের জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে বাচ্চাদের জন্যও।
তারা কুকুর-বেড়াল ভালোবাসে। তাই তারা কুকুরের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ দেখে মুগ্ধ হয়। ওইটেই তাদের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মত্যাগ।
.
২২.
কলকাতা
হাজার হাজার আদাব তসলিমাৎ পর পাক জনাবে আরজ এই,
সৈয়দ সাহেব,
আমি ভেবেছিলাম, দু একদিনের ভিতর আপনাকে সবকথা খুলে বলার সুযোগ পাব, কিন্তু আপনি হঠাৎ চলে গেলেন। আপনার ডাক্তার বিস্মিত ও ঈষৎ নিরাশ হয়েছেন। কিন্তু আমি চিন্তা করে দেখলুম, এই ভালো। আপনার সামনে আমার বক্তব্য রাখার সঙ্গে সঙ্গে আপনি এমন সব আপত্তি, প্রতিসমস্যা তুলতেন যে, শেষ পর্যন্ত আমার কোনওকিছুই বলা হয়ে উঠত না। তাই চিঠিই ভালো। কে যেন আপন ডায়েরি লেখার প্রারম্ভেই বলেছেন, মানুষের চেয়ে কাগজ ঢের বেশি সহিষ্ণু।
অবশ্য একথা আবার অতিশয় সত্য যে পত্র লেখার অভ্যাস আমার নেই। ভাষার ওপর আমার যেটুকু দখল সে-ও নগণ্য। তাই যা লিখব তা হবে অগোছালো। তবে তার সঙ্গে সঙ্গে এ কথাটিও বলি, আমার ভাবনা-চিন্তা সবই এমনই অগোছালো যে অগোছালো ভাষাই আমার অগোছালো মনোভাবকে তার উপযুক্ত প্রকাশ দেবে। তদুপরি আমি জানি, আপনি গোছালো-অগোছালো সব রাবিশ সব সারবস্তু মেশানো যে ঘাট, তার থেকে সত্য নির্যাসটি বের করতে পারেন।
আপনি হয়তো অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। আমি মোদ্দা কথায় আসছি না কেন? সেটাতে আসবার উপায় জানা থাকলে তো অনেক গণ্ডগোলই কেটে যেত।
আপনার গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের ধর্মসঙ্গীত আমার বুকে তুফান তোলে না, সেকথা আপনাকে আমি বলেছি। এখনও ফের বলছি– আপনার সে-রাত্রের দীর্ঘ ডিফেনসের পরও। অথচ এস্থলে আমাকে তারই শরণ নিতে হল।
গানটি আপনি নিশ্চয়ই জানেন :
যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা
তোমায় জানাতাম।
এস্থলে আমি এটা স্বীকার করে নিচ্ছি, যে, কবিগুরুর তুলনায় আমি শোকদুঃখ পেয়েছি অনেক অনেক কম। আপনি সে-রাত্রে তার একটার পর একটা দুর্দৈবের কাহিনী বলার পূর্বে আমি সেদিকে ওভাবে কখনও খেয়াল করিনি। আপনার এই সুন্দুমাত্র তথ্যোল্লেখ আমার মনে গভীর দাগ কেটেছে। আমি ভাবছিলুম, রবীন্দ্রনাথ পরপর এতগুলো শোক পাওয়ার পরও কি জানতে পারলেন না, তার কিসের ব্যথা, তাঁর শোকটা কোন দিক থেকে আসছে?
তাই অসঙ্কোচে স্বীকার করছি, আমি এখনও ঠিক ঠিক জানিনে, আমার কিসের ব্যথা, আমার অভাব কোনখানে, যার ফলে বিলাসবৈভবের মাঝখানেও যেন কোনও এক অসম্পূর্ণতার নিপীড়ন আমাকে অশান্ত করে তুলেছিল।
কিন্তু এখানে এসেই আমার বিপত্তি– এতদিন ধরে আমার সঙ্গে সঙ্গে আছে। আপনার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের দিন থেকে। এবং সত্য বলতে কি, তার অনেক আগের থেকেই কিশোরী অবস্থায় যখন প্রথম পরপুরুষের সঙ্গে আলাপ হয় তখন থেকেই। পুরুষ কথাটার ওপর আমি এখানে জোর দিচ্ছি।
আমার বিপত্তি, আমার সমস্যা– পুরুষমানুষ কি কখনও নারীর মন বুঝতে পারে, চিনতে পারে, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারে? সাহিত্য সমালোচক পণ্ডিতরা বলেন, সার্থক সাহিত্যিকের ওই তো কর্ম, ওই তো তার সত্যকার সাধনার্জিত সিদ্ধি। জমিদার রবীন্দ্রনাথ গরিব পোস্টমাস্টার, ভিনদেশি কাবুলিওলার বুকের ভিতর প্রবেশ করে তাদের হৃদয়ানুভূতি স্পন্দনে স্পন্দনে আপন স্পন্দন দিয়ে অনুভব করে তাঁর সৃজনীকলায় সেই অনুভূতিটি প্রকাশ করেন। যে কবি, যে সাহিত্যিক আপন নিজস্ব সত্তা সম্পূর্ণ বিস্মরণ করে, অপরের সত্তায় বিলীন হয়ে যত বেশি গ্রহণ করে আপন সৃজনে প্রকাশ করতে পারেন তিনিই তত বেশি সার্থক কবি, সাহিত্যিক।
