কিন্তু যে গুণী আমাকে এ গানটি শুনিয়েছিলেন এবং শেখাবারও চেষ্টা করেছিলেন তিনি গীতবিতানে যে মুদ্রিত পাঠ আছে তার থেকে মাত্র একটি শব্দ পরিবর্তন করে গানটি গেয়েছিলেন। ছাপাতে আছে, ঝড়ের দুর্দান্ত বাতাসে কে যেন আর্ত রব করছে, তবে মুখের আঁচলখানি উড়ে যাচ্ছে।
গুণী বলেছিলেন, ১৯২০-১৯৩০-এ মুখের আঁচল উড়ে যাওয়াতে কোন মেয়ে এরকম চিল-চাঁচানো চেল্লাচেল্লি পাড়া-জাগানো হৈ-হুঁল্লোড় আরম্ভ করবে? তার নাকি সাজসজ্জা লাজলজ্জা বেবাক কর্পূর হয়ে গেল। (এস্থলে বলি, ওই গুণীটি আপনার ভাষার অনুকরণ করেন।) আর শুধু কি তাই? তাকে প্রলয় মাঝে আনি/এমন মরণ হানি।- তুমি দেখলে আমারে!
গুণী বললেন, এটা হতেই পারে না। আসলে গানটি কী ছিল জানেন? সে যখন ভূমিষ্ঠ হয় সে ছিল তখন উলঙ্গ। সে গান ছিল,
ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো
আমার বুকের
বসনখানি
অর্থাৎ ঝড়ে মুখের আঁচলখানি যায়নি, গেছে বুকের বসনখানি।
কিন্তু গানটি প্রথমবার গাওয়া মাত্রই যাঁরা সে নিতান্ত ঘরোয়া জলসাতে উপস্থিত ছিলেন, তারা কেমন যেন অস্বস্তি অস্বস্তি ভাব প্রকাশ করে কেউ-বা জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করতে লাগলেন, কেউ-বা পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ খুঁটতে লাগলেন। রবীন্দ্রনাথ নতুন গান প্রথমবার সর্বজনসমক্ষে গাওয়া হয়ে যাওয়ার পরই আপন প্যাঁসনে চশমাটি পরে নিয়ে সকলের মুখের দিকে একনজর চোখ বুলিয়ে নিতেন এবং বুঝে যেতেন, নতুন গানটি শ্রোতাদের হৃদয়-মনে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এবারে তিনি বুঝে গেলেন, কোনওকিছুতে একটা খটকা বেধেছে– যেটা অবশ্য ছিল বড় বিরল। তাই কাকে যেন শুধালেন–আমার ঠিক ঠিক মনে নেই– ব্যাপারটা কী? কারণ আজ আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, গানটি অপূর্ব।
তখন কে যেন একজন সভয়ে বললেন, ওই বুকের বসন কেউ কেউ মিসআন্ডারস্টেন্ড করতে পারে হয়তো।
রবীন্দ্রনাথ এসব রসের আসরে তর্কাতর্কি করতেন না। চুপ করে একটুখানি ভেবে বললেন, আচ্ছা দেখছি।
আশ্রমে রাত্রের খাবার ঘণ্টা পড়ে গেল। সভা ভঙ্গ হল।
তার পরদিনই টেলিগ্রাম পেয়ে কলকাতায় ফিরে আসতে হল। তার কিছুদিন পরে ছাপাতে দেখি, গানটি কোথায় যেন বেরিয়েছিল– বুকের বসনের বদলে মুখের আঁচল এই বিরূপ নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে।
গুণী কিছুটা সহানুভূতিমাখা সুরে আপন বক্তব্য শেষ করলেন এই বলে, অর্থাৎ সেই নগ্ন নবজাত শিশু গানটির উপর রবীন্দ্রনাথ পরিয়ে দিলেন চোগাচাপকান পাঁচজনের পাল্লায় পড়ে।… এ সম্বন্ধে আমার মতামত তো বললুম কিন্তু কবি, সুরকার, নব নব রাগরাগিণীর সৃষ্টিকর্তা রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করার নিন্দাবাদ দূরে থাক– আমার কী অধিকার! আমার অতি নগণ্য রসবোধ যা বলে, সেইটেই প্রকাশ করলুম মাত্র।
***
কিন্তু প্রিয় সৈয়দ সাহেব, এই যে মুখের আঁচল, বুকের বসন নিয়ে কাহিনীটি ওই গুণী কীর্তন করেছিলেন সেটা নসিকে লিজেন্ডারি বা আপনাদের রকের ভাষায় গুলও হতে পারে, কিংবা এর ভিতর সিকি পরিমাণ সত্যও থাকতে পারে। কারণ ওই গুণী প্রধানত গাইতেন শাস্ত্রীয় সংগীত। সেখানে তাকে ক্রমাগত ইম্প্রভাইজ করতে হয়, নব নব রস সৃষ্টি করার জন্য নব নব কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। সেটা পরে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। তাই তো সঙ্গীতের ক্ষেত্রে ওস্তাদদের নিয়ে এত গণ্ডায় গণ্ডায় লিজেন্ড। হয়তো তিনি সেটা নিছক কল্পনা দিয়ে রঙে-রসে জাল বুনেছেন, এবং বার বার একে-ওকে সেটা বলে বলে, সেই রেওয়াজের ফলস্বরূপ নিজেই এখন সে-কাহিনী সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করেন।
আপনিই না একদিন বলেছিলেন, পরিপূর্ণ পাক্কা মিথ্যেবাদী হওয়ার পথে যেতে যেতে যারা উত্তম সুযোগ না পেয়ে দড়কচ্চা মেরে গেল, অর্থাৎ যাদের গ্রোথু স্টানটে হয়ে গেল, তারাই আর্টিস্ট, সাহিত্যিক, কবি, আরও কত কী!
তবে ওই যে-লিজেন্ডটির কাহিনী এইমাত্র বললুম, সেটা সত্য না হলেও হওয়া উচিত ছিল এবং যাই হোক, যাই থা– কাহিনীটি ক্যারেক্টারিস্টিক এবং টিপিকাল।
কিন্তু আপনি এতক্ষণে নিশ্চয়ই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন– আবার ভাবছেন, আপনাকে আমার এ চিঠি লেখার উদ্দেশ্যটা কী? এখুনি বলছি।
আমার বক্তব্য, কি রবীন্দ্রনাথ, কি কালিদাস, কি বুদ্ধদেব– কেউই রমণীরহস্য এ যাবৎ আদৌ বুঝে উঠতে পারেননি। সহস্র বৎসরের এই সাধনার ধন পুরুষমানুষ অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে শুধু খুঁজেছে কিন্তু সন্ধান পায়নি।
প্রশ্নটা তো অতি সরল। যা দিয়ে আমি এ চিঠি আরম্ভ করেছি। উপস্থিত কঠিনতর সমস্যা, রহস্যগুলো বাদ দিন। সেই যে অতিশয় সাদামাটা প্রশ্ন : পুরুষের কী দেখে রমণী কামাতুর হয়? এবং সেটা শুধু নারী-পুরুষেই সীমাবদ্ধ নয়। পশুপক্ষী, কীটপতঙ্গেও সেটা সমানভাবে বিদ্যমান। অর্থাৎ অবজেকটিভ, স্টাডি করারও পূর্ণ সুযোগ রয়েছে।
অথচ কিমাশ্চর্যমতঃপরম! হাজার হাজার বৎসর চেষ্টা করেও পুরুষজাত যখন এর সমাধান বের করতে পারেনি, তখন এই ভেড়ার পাল, এই পুরুষজাত অপরাধ নেবেন না– বের করবে স্ত্রীচরিত্রের রহস্য, তাদের প্রেমের প্রহেলিকা– যেটা শারীরিক সম্পর্কের বহু বহু ঊর্ধ্বে– তাদের হৃদয়ের আধা-আলো অন্ধকারের কুহেলিকা!
তাই নিবেদন, এই পুরুষজাতকে আমার কোনও প্রয়োজন নেই। ডাক্তার না, পীর না, আপনিও না।
