এসব অর্ধভুক্ত বমননিঃসৃত আপ্তবাক্য যুক্তিতর্ক দ্বারা খণ্ডন করা যায় না। ভূতকে বন্দুকের গুলি ছুঁড়ে ঘায়েল করা যায় না। সেখানে দরকার– জৈসনকে তৈসন– তেজি সরষে, আঁজালো লঙ্কা পোড়ানো।
সে মুষ্টিযোগ রপ্ত ছিল একমাত্র বঙ্কিমচন্দ্রের। এ স্থলে তিনি প্রয়োগ করলেন ঝাঁজালো লঙ্কা-পোড়া। অর্থাৎ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। অতিশয় সিদ্ধহস্তে। অথচ সে পুণ্যশ্লোক রচনা এমনই সুনিপুণ প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত তথা সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা-ভরা যে, আজও, অর্ধশতাব্দাধিক কাল পরও, এখনও কোনও কোনও ভারতপ্রেমী হিন্দু সভ্যতা তথা মর্যাদা রক্শাকরুনেওয়ালা বামনাবতার মড়লী বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গ বুঝতে না পেরে বঙ্কিম মুর্দাবাদ, বঙ্কিম মুর্দাবাদ জিগির তুলে গগনচুম্বী লক্ষপ্রদানে উদ্যত হন।
বঙ্কিমের সেই রামায়ণ সমালোচনার কথা ভাবছি।
অবশ্য এসব ব্যঙ্গ ছাড়াও এদেশের পণ্ডিতগণ দার্শনিক পদ্ধতিতেও ইয়োরোপীয় পণ্ডিতদের মুখ-তোড় উত্তর দিয়েছেন। কিন্তু হায়, দর্শনশাস্ত্রে আমার আলিফের নামে ঠ্যাঙা। আমি অন্য দৃষ্টি অন্য দর্শনের আশ্রয় নিই।
অপবাদটা ছিল কী? আমরা নাকি বড্ডই স্বার্থপর, নিজের মোক্ষচিন্তা ভিন্ন অন্য কারও কোনও উপকার বা সেবার কথা আদৌ ভাবিনে।
এস্থলে আমার বক্তব্যটি তার মূল্য অসাধারণ কিছু একটা হবে না জানি– সামান্য একটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে আরম্ভ করি। এই বাঙলা দেশে সবচেয়ে বেশি কোন গ্রন্থখানা পড়া হয়? অতি অবশ্যই মহাভারত। মূল সংস্কৃত, মহাত্মা কালীপ্রসন্নের অনুবাদ, বা রাজশেখরীয়, কিংবা কাশীরামের বাঙলায় রূপান্তরিত মহাভারত কিছু-না-কিছু-একটা পড়েনি এমন বাঙালি পাওয়া অসম্ভব। এই হিসাবের ভিতর বাঙালি মুসলমানও আসে। প্রমাণস্বরূপ একটি তথ্য নিবেদন করি। দেশ-বিভাগের প্রায় পনেরো বৎসর পর আমি একটি পাকিস্তানবাসিনী মুসলিম ইন্সপেকট্রেস্ অব স্কুলকে শুধোই, আমাদের দেশে কাচ্চা-বাচ্চাদের ভিতর এখন কোন কোন বই সবচেয়ে বেশি পড়া হয়? ক্ষণমাত্র চিন্তা না করে বললেন, রামায়ণ-মহাভারত বরঞ্চ বলা উচিত মহাভারত-রামায়ণ– কারণ মহাভারতইকাচ্চাবাচ্চারা পছন্দ করে বেশি। তবে তারা প্রামাণিক বিরাট মহাভারত পড়ে না। গ্রামাঞ্চলে হিন্দু পরিবারে এখনও কাশীরাম, কিন্তু বাচ্চারা পড়ে মহাভারতের গল্প এই ধরনের সাদা-সোজা চটি বই। তার পর একটু চিন্তা করে বললেন, অবশ্য ব্যত্যয়ও আছে। আমার বারো বছরের ছেলেটা ইতোমধ্যেই তার মামার মতো পুস্তক-কীট হয়ে গিয়েছে। তাকে কালীপ্রসন্ন আর রাজশেখর দুই-ই দিয়েছিলুম। মাস দুই পরে আমার প্রশ্নের উত্তরে বললে, রাজশেখর বাবুর ভাষাটি বড় সহজ আর সুন্দর। কিন্তু সবকিছুর বড় ঠাসাঠাসি। কালীপ্রসন্নবাবুটা বেশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লেখা। আরাম করে ধীরে ধীরে পড়া যায়। এর পর মহিলাটি একটু হেসে বললেন, জানেন, বয়স্ক মুসলমানদের কথা বাদ দিন, তারা তো দেশ-বিভাগের পূর্বেই কারিকুলাম-মাফিক রামায়ণ-মহাভারত অন্নদামঙ্গল মনসামঙ্গল এসবেরই কিছু কিছু পড়েছিলেন কিন্তু পার্টিশনের এই পনেরো বৎসর পরও, আমাদের মুসলমান বাচ্চারা দাতাকর্ণ-কে চেনে বেশি, কর্ণের অপজিট নাম্বার আরব দেশের দাতাকর্ণ হাতিম তাঈ-কে চেনে কম।
এই মহাভারতটি যখন বালবৃদ্ধবনিতার এতই সুপ্রিয় সুখপাঠ্য, তখন দেখা যাক, এ মহাগ্রন্থের শেষ অধ্যায়ের শেষ উপদেশ কী– ভুল বললুম, উপদেশ নয়, আপন আত্মবিসর্জনকর্ম দ্বারা দৃষ্টান্ত-নির্মাণ, আদর্শ নির্দেশ– সেটি কী?
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের প্রাণাধিক প্রিয় চারি ভ্রাতা, মাতা কুন্তীর পরই যে নারী তার জীবনে সর্বাপেক্ষা সমাদৃতা, যার শপথ রক্ষার্থে এই শান্তিপ্রিয় যুধিষ্ঠির নৃশংস কুরুক্ষেত্রের সমরাঙ্গনে অবতীর্ণ হলেন, সেই নারী, এবং পরপর তাঁর চার ভ্রাতা মহাপ্রস্থানিকপর্বে বর্ণিত হিমালয় অতিক্রম করার সময় একে একে যখন মৃত্যুমুখে পতিত হলেন, তখন পরম স্নেহশীল যুধিষ্ঠির তাঁদের জন্য ক্ষণতরেও শোক করেননি, কারও প্রতি মুহূর্তেক দৃষ্টিপাত না করে সমাহিতচিত্তে অগ্রসর হতে লাগলেন। এ সময় সে-ই কুকুর, যে হস্তিনাপুর থেকে এদের অনুগামী হয়েছিল, সে-ই শুধু যুধিষ্ঠিরের পশ্চাতে।
এমন সময় ভূমণ্ডল নভোমণ্ডল রথশব্দে নিনাদিত করে দেবরাজ স্বর্গরাজ ইন্দ্র যুধিষ্ঠিরের সম্মুখে সমুপস্থিত হয়ে বললেন, মহারাজ, তুমি অবিলম্বে এই রথে সমারূঢ় হয়ে স্বর্গারোহণ কর।
এর পর উভয়ে অনেক কথাবার্তা হল। আমার ভাষায় বলি, বিস্তর দরকষাকষি হল। শেষটায় সমঝাওতা ভি হল। ওই যে রকম দেশ-বিভাগের পূর্বে কংগ্রেস-লীগে হয়েছিল। কিন্তু সে তুলনার এখানেই সমাপ্তি। ইতোমধ্যে চতুর্থ পাণ্ডব এবং দ্ৰৌপদী স্বর্গারোহণ করেছেন।
এর পর, পুনরায় আমার নগণ্য ভাষাতেই বলি, বখেড়া লাগল সেই নেড়ি কুত্তাটাকে নিয়ে। যুধিষ্ঠির ফরিয়াদ করে বলেছেন, এ কুত্তাটা আমার সঙ্গে সঙ্গে এত দীর্ঘদিন ধরে এসেছে। একে ওখানে ছেড়ে গেলে আমার পক্ষে বড়ই নিষ্ঠুর আচরণ হবে।
সরল ইন্দ্র মনে মনে ভাবলেন, এ তো মহা ফ্যাসাদ। এই যুধিষ্ঠিরটা তো আপন স্বার্থ কখনও বোঝেনি, এখনও কি আপন কল্যাণ বোঝে না? প্রকাশ্যে বললেন, ধর্মরাজ, আজ তুমি অতুল সম্পদ, পরমসিদ্ধি, অমরত্ব ও আমার স্বরূপত্ব লাভ করবে (এই স্বরূপত্ব লাভটা আমি আজও বুঝতে পারিনি; মরলোকের ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তো স্বর্গলোকে তার স্বরূপত্ব লাভ করবেন স্বর্গের যম-রাজার অস্তিত্বে বিলীন হয়ে ইন্দ্রের স্বরূপত্ব লাভ করবেন তো তাঁর পুত্র অর্জুন!)। এসব বিদকুটে বয়নাক্কা কর না। আমার এই অতি পূত, হেভেনলি বেহেশতের রথে ওই নেড়ি, ঘেয়ো অতিশয় অপবিত্র কুকুর আর হাইড্রফবিয়া থাকাও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়– কী করে ঢুকতে পারে?
