অর্থাৎ কর্ম জিনিসটাই জড়।… ওই একই কথা– তুমি যে ভাবছ, তোমার যে অহংকার, তুমি কর্ম করছ এবং সেই কর্ম থেকে ফল প্রসবিত হচ্ছে সেটা সর্বৈব মিথ্যা, সেটা ভ্যানিটি (অহংকার)।
বলতে পারব না, কটা ভাষাতে, গদ্যে-পদ্যে, পদ্যে-গদ্যে মেশানো ভাষায়, কত সুরে এই ফিলারমনিক অর্কেস্ট্রা চলেছিল।
কিন্তু তখনও স্বপ্ন শেষ হয়নি।
শেষ হল সেই অরুণাচলমের আরেকটি শ্লোক দিয়ে :
ঈশ্বরার্পিতং
নেচ্ছয়া কৃতম।
চিত্তশোধকং
মুক্তিসাধকম্ ॥
পাজরে যেন গুত্তা খেয়ে ধড়মড়িয়ে জেগে উঠলুম।
স্বপ্নলব্ধ প্রত্যাদেশে আমি বিশ্বাস করিনে। কিন্তু এবারে আমার ঘাড়ে হুড়মুড়িয়ে আস্ত একটা ট্রাকের চল্লিশ মণ হঁট যেভাবে পড়ল তাতে অত্যন্ত বিমূঢ় অবস্থায়ও আমি হৃদয়ঙ্গম করলুম, আমার কর্ম দ্বারা কোনওকিছুরই সমাধান হবে না, শহর-ইয়ার, ডাক্তার, পীরসাহেব– এদের জট ছাড়ানো আমার কর্ম নয়, আমার কর্ম ঈশ্বর-অর্পিত নয়।
অতএব এ পুরী থেকে পলায়নই প্রশস্ততম পন্থা।
***
তখনও ফজরের নামাজের আজান পড়েনি। চন্দ্র অস্তে নেমেছে, কিন্তু তখনও রাত রয়েছে। পূর্ব দিকের অলস নয়নে তখনও রক্তভাতি ফুটে ওঠেনি।
প্রথম একটা চিরকুট লিখলুম। তার পর হাতের কাছে যা পড়ে, নুনময়লা ধুতি-কুর্তা পরে, গরিবের যা রেস্ত তাই পকেটে পুরে চৌর এবং অভিসারিকার সম্মিলিত নিঃশব্দ চরণক্ষেপে নিচের তলার সদর দরজার কাছে এসে দেখি, দরজা খোলা। আল্লা মেহেরবান্। তখন দেখি, বৃদ্ধ দারওয়ান শূন্য বদনা দোলাতে দোলাতে দরজা দিয়ে ঢুকছে। পরিষ্কার বোঝা গেল, বৃদ্ধ ফজরের নামাজের পূর্বেকার তাহাজ্জুদের নামাজও পড়ে।
মনে পড়ল, বহু বহু বৎসর পূর্বে, ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথের বাসভবনের অতি কাছে, নূতন বাড়িতে কয়েক মাসের জন্য আমার আশ্রয় জুটেছিল। তখন অনিদ্রাকাতরতাবশত অনিচ্ছায় শয্যাত্যাগ করে আমলকি গাছের তলায় পায়চারি করতে করতে দেখেছি, শুভ্রতম বস্ত্রে আচ্ছাদিত গুরুদেব পূৰ্বাস্য হয়ে উপাসনা করছেন। পরে তাঁর তঙ্কালীন ভত্য সাধুর কাছে শুনেছি, তিনি আগের সন্ধ্যায় তোলা বাসি জলে কি শীত কি গ্রীষ্মে স্নানাদি সমাপন করে উপাসনায় বসতেন। তাঁর সর্বাগ্রজ, তার চেয়ে একুশ বছরের বড় দ্বিজেন্দ্রনাথকেও আমি শান্তিনিকেতনের অন্য প্রান্তে ওই একই আচার-নিষ্ঠা করতে দেখেছি। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ষাট; বড়বাবুর একাশি।
কোথা থেকে কোথা এসে পড়লুম। কিন্তু এসব প্রাচীন দিনের কাহিনী বলার লোভ সম্বরণ করা বড় কঠিন। অনেকে আবার শুনতেও চায় যে।
***
ঘটিদের একটা মহৎ গুণ, তারা অহেতুক কৌতূহল দেখায় না। যদিও আড়ালে-আবডালে বসে তক্কে তক্কে থেকে আপনার হাঁড়ির খবর, পেটের খবর, যে সাদামাটা পোর্টফোলিও নিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন, বেরুলেন তার ভিতরকার খবর সব জেনে নেয়। আর বাঙালরা এ বাবদে বুন্ধু। বেমক্কা প্রশ্ন করে অন্য পক্ষকে সন্দিহান করে। তোলে। ঘটি তখখনি জিভে-কানে ক্লফর্ম ঢেলে, ঠোঁটদুটো স্টিকিং প্ল্যাটার দিয়ে সেঁটে নিয়ে চড়চড় করে কেটে পড়ে।
তদুপরি এ বৃদ্ধ দারওয়ান এ বাড়ির অনেক কিছুই দেখেছে। বেশিরভাগই দুঃখের। যে বাড়ি একদা গমগম করত, সে এখন কোথায় এসে ঠেকেছে! ভুতুড়ে বাড়ি বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না। সে জানে, প্রশ্ন জিগ্যেস করলে যেসব উত্তর শুনতে হয়, তার অধিকাংশই অপ্রিয়।
আমি তার দিকে চিরকুটটি এগিয়ে দিয়ে বললুম, সাহেব, বেগম-সাহেবকো দেনা। খুদা-হাফিজ অভি আয়া (সেটা হবে মিথ্যে) এ সব তো বললুমই না বখশিশ দিলে তো এক মুহূর্তেই সব ক্যামুফ্লাজ ভণ্ডুল হয়ে যাবে।
চিরকুটে লেখা ছিল, আমি বোলপুর চললুম; সময়মতো আবার আসব।
যঃ পলায়তি স জীবতি। আমি ম্লেচ্ছ, দেব-ভাষা জানিনে। স জীবতি না, হয়ে যুবতীও হতে পারে। সতীত্ব রক্ষা করতে হলে যুবতাঁকে পলায়ন করতে হয় বইকি!
***
প্রথম হাওড়াগামী ট্রামের জন্যে মনে মনে অপেক্ষা করতে করতে কদম কদম বাড়িয়ে হাওড়াবাগে এগিয়ে চললুম।
ট্রাম এল। উঠলুম। পাঁচ কদম যেতে না যেতেই বুঝলুম, তে হি নো দিবস গতাঃ। আমাদের ছেলেবেলায় ট্রামগাড়ির কী-সব যেন থাকত স্ত্রিঙিং, শ-এব জরবার আরও কত কী। গাড়ি এমনই মোলায়েম যেত যে, মনে হতো ওয়াই এম সি এর বিলিয়ার্ড টেবিল পেতে এখানে ওয়ার্লড় চ্যাম্পিয়নশিপ দিব্যি খেলা যেতে পারে। বস্তুত তখনকার দিনে এরকম আরামদায়ক নিরাপদ বাহন কলকাতায় আর দ্বিতীয়টি ছিল না। আর আজ! প্রতি আচমকা ধাক্কাতে মনে ভয় হল, কাল রাত্রি যা খেয়েছি তারা বুঝি সব রিটার্ন টিকিট নিয়ে গিয়েছিল, এই বুঝি সবাই একসঙ্গে হুড়মুড়িয়ে মোকামে ফেরত এসে কন্ডাকটরের কাছে গুহ কমিশনের রিপোর্ট পেশ করবেন, আমি ভোরবেলাকার বেহেড মাতাল।
০৬.৫০-এ বারাউনি প্যাসেঞ্জার ধরে নির্বিঘ্নে বোলপুর ফিরলুম।
কিন্তু বর্ধমানে চা জুটল না। বর্ধমানে চা যোগাড় করার ভানুমতী খেল গুণী একমাত্র শহর-ইয়ারই নব নব ইন্দ্রজালে নির্মাণ করে দেখাতে পারেন। সে তো ছিল না।
ট্রেনে মাত্র একটি চিন্তা আমার মনের ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিল।
এই যে আমি কাউকে কিছু না বলে-কয়ে সরে পড়লুম, এটাকে ইয়োরোপের প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব পণ্ডিতেরা নাম দিয়েছেন পলায়ন-মনোবৃত্তি না কী যেন বোধ হয় এসকেপিজম–রাজভাষায়। এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা তাঁদের সংস্কৃত পাণ্ডিত্যের দ্বিরদরদস্তম্ভের উচ্চাসনে বসে যে তত্ত্ব প্রচার করেন–ইংরেজ পণ্ডিতরা তো বটেনই এবং তাদেরই নুন-নেমক-খেকো হনুকরণকারী জর্মন-ফরাসি পণ্ডিতেরও একাধিক জন– সে তত্ত্বের নির্যাস : ভারতীয় সাধুসন্ত, গুণীজ্ঞানী, দার্শনিক-পণ্ডিত সবাই, সক্কলেই অত্যন্ত স্বার্থপর, সেলফিশ। তারা শুধু আপন আপন মোক্ষ, আপন আপন নির্বাণ-কৈবল্যানন্দ লাভের জন্য অষ্টপ্রহর ব্যতিব্যস্ত। বিশ্বসংসারের আতুর কাতরজনের জন্য তাদের কণামাত্র শিরঃপীড়া নেই, নো হিউমেন সিপেথি, নো পরোপকার প্রবৃত্তি। এই ভারতীয়দের দর্শন– কি সাংখ্য, কি বেদান্ত, কি যোগ– সর্বত্রই পাবে এক অনুশাসন, আত্মচিন্তা কর, আপন মোক্ষচিন্তা কর। মোসট সেলফিশ এগোইষ্টিক ফিলসফি।
