রবীন্দ্রনাথ বেরিয়েছিলেন বিশ্বভারতীর জন্য। তিনি বিশ্বপ্রেম, বিশ্বভারতী– বিশ্ব শব্দ দিয়ে একাধিক সমাস নির্মাণ করেছেন; আমি, অধম, তাঁরই সমাস নির্মাণের অনুকরণে তাঁকে খেতাব দিয়েছি বিশ্বভিক্ষুক। এ হক্ক আমার কিছুটা আছে : রবীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, উপাধি ঠাকুর। কিন্তু তার বংশপরিচয় পীরিলি বা পীর + আলী দিয়ে। আম্মো আলী। আমারও পীর বংশ। কিন্তু থাক, এসব হালকা কথা।
তুমি হয়তো বলবে তুমি কেন, অনেকেই বলবে– এসব শখের ভিখিরিগিরি। আমি এ নিয়ে তর্কাতর্কি করতে চাইনে। কারণ স্বয়ং কবিই গেয়েছেন
এরে ভিখারী সাজায়ে
কী রঙ্গ তুমি করিলে,
হাসিতে আকাশ ভরিলে ॥
কিন্তু এহ বাহ্য।
আমি বারবার জোর দিতে চাই তার মাথার ওপর দিয়ে যে আত্মহত্যা, যেসব অকালমৃত্যুর ঝড় বয়ে গেল, তারই ওপর। সেখানে তিনি অনাথের চেয়েও অনাথ, আতুরের চেয়ে আতুর।
শহর-ইয়ার বড় শান্ত মেয়ে। কোনও আপত্তি জানাল না দেখে আমার উৎসাহ বেড়ে গেল। বললুম, আচ্ছা, রাশার সম্রাট জার নিকোলাসের নাম শুনেছ?
না তো।
কিছু এসে-যায় না। এইটুকুই যথেষ্ট যে তাঁর কোনও অভাব ছিল না। ইয়োরোপের রাজা-ম্রাটদের ভিতর তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বিত্তশালী। দোর্দণ্ড প্রতাপ। তাঁরই রচিত একটি কবিতার শেষ দুটি লাইন আমার মনে পড়ছে, আবছা আবছা। ভুল করলে অপরাধ নিয়ো না। সত্যেন দত্তের অনুবাদ :
কাতরে কাটাই
সারা দিনমান
কাঁদিয়া কাটাই নিশা।
সহি, দহি, ডাকি
ভগবানে আমি
শান্তির নাহি দিশা।
এর চেয়ে আন্তরিকতা-ভরা, হৃদয়ের গভীরতম গুহা থেকে উচ্ছ্বসিত কাতরতা-ভরা আৰ্তরব তুমি কী চাও?
না হয় রাশা-র জার-এর কথা থাক।
কুরান শরিফে এবং এদিক-ওদিক নানা কেতাবে রাজা দাউদের–King David-এর কাহিনী নিশ্চয়ই কিছু কিছু পড়েছ? ইনি শুধু প্রবল পরাক্রান্ত বাদশাহই ছিলেন না, তিনি বাইবেল-কুরান উভয় কর্তৃক স্বীকৃত পয়গম্বর।
ভগবৎ-বিরহে কাতর এই রাজার Psalms বাইবেলে পড়েছ?
কতদিন ধরে, এমন করিয়া
ভুলিয়া রহিবে প্রভু?
Why standest thou afar off, O Lord? Why hidest thou thyself in times of trouble?
আরও শুনবে?
শহর-ইয়ার মাথা না তুলেই বললে, আমার একটা কথা আছে—
আমি বললুম, অনেক রাত হয়েছে। কাল সেসব হবে।
তার পর ছাড়লুম আমার সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বশেষ অগ্নিবাণ :
তোমারও তো ধনদৌলতের কোনও অভাব নেই। তবে তুমি কেন সকাল-সন্ধ্যা ছুটছ পীরসাহেবের বাড়িতে? ভেবেচিন্তে কাল বুঝিয়ে বোলো।
.
২১.
কী একটা স্বপ্ন দেখে ধড়মড়িয়ে জেগে উঠলুম।
স্বপ্ন কী, তার অর্থ কী, সে ভবিষ্যদ্বাণী করে কি না, এসব বাবদে এখনও মানুষ কিছুই জানে না। অনেক গুণী-জ্ঞানী অবশ্য অনেক কিছু বলেছেন। আঁরি বের্গস থেকে ফ্রয়েড সাহেব পর্যন্ত। পড়ে বিশেষ কোনও লাভ হয়নি– অন্তত আমার।
তবে এ বাবদে একটি সাত বছরের ছেলে যা বলেছিল সেটা সব পণ্ডিতকে হার মানায়। অন্তত, স্বপ্ন জিনিসটা কী, সে-সম্বন্ধে তার আপন বর্ণনা। ডাক্তার তাকে শুধিয়েছিলেন, সে স্বপ্ন দেখে কি না? পুট করে উত্তর দিল, ও, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সিনেমা দেখা? না?
বেশ উত্তর। কিন্তু এখানেই শেষ কথা নয়। আমি এর থেকে একটা তত্ত্বও আবিষ্কার করেছি– কারণ একাধিক শাস্ত্রগ্রন্থ বলেছেন, স্বর্গরাজ্যে সর্বপ্রথম প্রবেশাধিকার শিশুদের। সেই তত্ত্বটি সূত্ররূপে প্রকাশ করলে দাঁড়ায় : আজকের দিনের বাঙলা ফিলম দেখে যেমন আসছে বছরে বাঙলার ভবিষ্যৎ কী হবে সে-সম্বন্ধে কিছু বলা যায় না, ঠিক তেমনি আজ রাত্রে আমি যা স্বপ্ন দেখলুম, তার থেকে তিন মাস পরে আমার কী হবে, সে-হদিস খোঁজা সম্পূর্ণ নিষ্ফল।… তার চেয়ে অনেক নিরাপদ, তাস ফেলে ভবিষ্যৎ নির্ণয় করে সেই অনুযায়ী কার্য করা, কিংবা তার চেয়েও ভালো, অচেনা বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠবার সময় ধাপের সংখ্যা জোড় না বেজোড়, গুনে গুনে সেটা বের করে আপন কর্তব্য নির্ধারণ করা। জোড় হলে মোলায়েম কায়দায় কাজ হাসিল করার চেষ্টা বেজোড় হলে লোকটার মাথায় সুপুরি রেখে খড়ম পেটানোর মতো শুশান-চিকিৎসায়।
কিন্তু আমি স্বপ্নটা দেখেছিলুম একটু ভিন্ন পদ্ধতিতে।
সেই বাচ্চাটার মতো সিনেমা দেখিনি। আমার ফিলটা যেন যান্ত্রিক গোলযোগে (অবশ্য তার অন্য প্রোগ্রাম শেষে মরমিয়া ভণ্ডস্বরে কেউ ক্ষমা চায়নি) কেটে যায়। কিন্তু সিনেমার বাক্যন্ত্রটি বিকল হয়নি। সে যেন সাথিহারা বিধবার মতো একই রোদন বার বার কেঁদে যাচ্ছিল : সবই বৃথা, সবই মিথ্যা, সবই বৃথা, সবই মিথ্যা।… বোধ হয় ফিলমটা বাইবেলের কোনও কাহিনী অবলম্বন করে তার রূপ-বাণী পেয়েছিল। কারণ, তারই সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজিতে ঠিক ওই একই সন্তাপ কানে আসছিল, ভ্যানিটি অব ভ্যানিটিজ; অল ইজ ভ্যানিটি। যেন বৌদ্ধদের সেই সর্বং শূন্যং, সর্বং ক্ষণিকম্।
এবং সঙ্গে সঙ্গে কী আশ্চর্য! বহু বহু বৎসর পূর্বে দক্ষিণ ভারতের অরুণাচলে শোনা একটি সংস্কৃত মন্ত্র কানে আসছিল :
কর্তৃরাজ্ঞয়া
প্রাপ্যতে ফলম্।
কর্ম কিং পরং
কর্ম তজ্জড়ম্ ॥
এর বাঙলা অনুবাদ আমার এমনই সুপরিচিত যে, স্বপ্নশেষে সেটিও আমার স্মৃতিপটে ধরা দিল :
ঈশ্বরাজ্ঞাধীন কর্ম ফলপ্রসূ হয়।
জড় কর্ম সেই হেতু ঈশ বাচ্য নয় ॥
