আমি বললুম, আমার কাছে, কেমন যেন হেঁয়ালির মতো ঠেকছে। বুঝিয়ে বল।
এবারে একটুখানি মধুরে উচ্চহাস্য করল– আপনাকেও বোঝাতে হবে?
উঠে দাঁড়িয়ে দক্ষিণের জানালা খুলে দিল।
আহ্। বাইরে কী নিরঙ্কু নৈস্তব্ধ্য। গ্রামে নয়, কলকাতাতেই এটা সম্ভবে।
বন্ধ জানালা খুলে দিলে বাইরের বাতাস যেরকম কামরাটাকে ঠাণ্ডা করে দেয়, হুবহু সেইরকম বাইরের নিস্তব্ধতা যেন আমাদের তর্কালোচনাটাকে শীতল করে দিল।
শহর-ইয়ার বললে, জানালার কাছে আসুন। আরাম পাবেন।
আমি শয্যাত্যাগ করে সেই প্রশস্ত জানালার অন্য প্রান্তে দাঁড়ালুম।
শহর-ইয়ার ধীরে ধীরে আমার কাছে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। আমার দু হাত তখন জানালার আড়ের উপর। সে তার ডান হাত আমার বাঁ হাতে বুলোতে বুলোতে বললে, এই নিচের আঙিনার দিকে তাকান। এখানে ভোর-সঁজ ভিখিরি-আতুর আসে। তাদের জন্য ব্যবস্থা আছে এ বাড়ি পত্তনের সঙ্গে সঙ্গেই। কিন্তু এ আঙিনায় সবচেয়ে বেশি আদরযত্ন কারা পায় জানেন? খঞ্জনি-হাতে বোষ্টমি, একতারা-হাতে বাউল, সারেঙ্গি-হাতে ফকির। আপনি হয়তো ভাবছেন, এরা সদাই শুধু আধ্যাত্মিক পারলৌকিক, এ সংসার নশ্বর, এইসব নিয়েই গীত গায়।
আমি বাধা দিয়ে বললুম, মোটেই না, এরা বহু ধরনের গীত জানে।
ভারি খুশি হয়ে বললে, ঠিক ধরেছেন। অবশ্য আমি ভালো করে জানতুম, আপনার কাছে এ তত্ত্ব অজানা নয়। তাই আপনাকে একটুখানি খুঁচিয়ে আমি সুখ পাই। কিন্তু সে-কথা থাক।
আমার বিয়ের রাত্রে, গভীর রাত্রে, এই আঙিনাতেই তারা অনেক মধুর মধুর গান আমাকে-ডাক্তারকে শুনিয়ে গিয়েছিল। তারই একটি ছত্র আমার কানে এখনও বাজে :
শ্যামলীয়াকে দরশন লাগি পর কুসুম্বী সাড়ি
বুঝুন, কী অদ্ভুত কালার-কন্ট্রাস্ট-সেনস। শ্রীকৃষ্ণ শ্যামল। তাই শ্রীরাধা তার শ্যামবর্ণের কন্ট্রাস্ট করার জন্য হলদে রঙের– কুসুম্বী রঙের শাড়ি পরে অভিসারে বেরিয়েছেন।
কিন্তু মোদ্দা কথাটা এইবারে আপনাকে বলি।
আমি সেই বিয়ের রাত্রির পর থেকেই এখানে দাঁড়িয়ে শতসহস্র বার এদের গীত বিশেষ করে ধর্মসঙ্গীত শুনেছি। বরঞ্চ এদের এই সরল, অনাড়ম্বর, সর্ব অলঙ্কার বিবর্জিত ভক্তিগীতি মাঝে মাঝে আমার বুকে সাড়া জাগিয়েছে, এমনকি তুফান তুলেছে– মনে হঠাৎ-চমক লাগায়নি শুধু। তার কারণ, অন্তত আমার মনে হয়, এদের অভাবের অন্ত নেই, এরা গরিব-দুঃখী অনাথ-আতুর। খুদাতালা ছাড়া এদের অন্য কোনও গতি নেই। তাই এদের গীতে থাকে আন্তরিকতা, ডিপেস্ট সিনসিয়ারিটি।
কিন্তু বিশ্বকবি, আবার বলছি, সর্ববিশ্বের কবি রবীন্দ্রনাথ তো এই হতভাগাদের একজন নন। তিনি তো অনাথ-আতুর নন। তাঁর ভক্তিগীতিতে ওদের মর্মান্তিকতা, ঐকান্তিকতা, সর্বাঙ্গীণ আত্মসমর্পণের সুর বাজবে কী করে? তিনি
আর আমি থাকতে পারলুম না। বাধা দিয়ে বললুম, এ তুমি কী আবোল-তাবোল বকতে আরম্ভ করলে শহর-ইয়ার! অন্নাভাব, বস্ত্রাভাব, আশ্রয়াভাব– এইগুলোই বুঝি ইহজীবনের পরম দুর্দৈব, চরম বিনষ্টি? রবীন্দ্রনাথের বয়স চল্লিশ হতে-না-হতেই তার যুবতী স্ত্রীর মৃত্যু হল, তার পাঁচ বছরের ভিতর গেল তার এক ছেলে, এক মেয়ে। তাদের বয়স তখন কত? এগারো, তেরো। অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয় অকাল মৃত্যু। তাঁর বাল্য-কৈশোরের কথা তুলতে চাইনে। সেই-বা কিছু কম? ছেলেবেলায়ই ওপারে গেলেন তার মা। সেই মায়ের আসন নিলেন তার বউদি। শুধু তাই নয়, সেই মহীয়সী নারীই কিশোর রবিকে হাতে ধরে নিয়ে এসে প্রবেশ করালেন জহান্-মুশায়েরায়, বিশ্বকবি-সম্মেলনাঙ্গনে।… আজ যদি আমাকে কেউ শুধায়, রবীন্দ্রনাথ কার কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী, তবে নিশ্চয়ই বলব, তার অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কাছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বলব, তার চেয়েও বেশি ঋণী তিনি তার বউদির কাছে।… সেই বউদি আত্মহত্যা করলেন একদিন। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন কত? বাইশ, তেইশ! এই নারীই ছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাব্যদর্শিকা। তাঁর রুচি, তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ কাব্য রচনা করেছেন তার জীবনের প্রথম বারো বৎসর ধরে।
অন্নাভাব, বস্ত্রাভাব সব মানি। কিন্তু আবার শুধাই, এগুলোই কি শেষ কথা? আত্মহত্যা, পরপর আত্মজনবিয়োগ এগুলো কিছুই নয়?
এই যে তুমি বার বার অনাথ আতুর, অনাথ আতুর বলছ, এই সমস্যাটি তুমি কোত্থেকে নিয়েছ, জানো? তোমার জানা-অজান্তে?
সে-ও রবীন্দ্রনাথের।
শুনেছে তোমার নাম অনাথ আতুর জন–
এসেছে তোমার দ্বারে, শূন্য ফেরে না যেন ॥
এ গীতে কি রবীন্দ্রনাথ বিধাতার প্রধানমন্ত্রী?– তিনি যেন হুজুরকে বলছেন, মহারাজ, এই অনাথ আতুর জনকে অবহেলা করবেন না। তিনি তখন স্বয়ং, নিজে, ওই অনাথ-আতুরদের একজন। অবশ্য তাঁর অন্নবস্ত্র যথেষ্ট ছিল, কিন্তু প্রভু খ্রিস্ট কি সর্বাপেক্ষা সার সত্য বলেননি মানুষ শুধু রুটি খেয়েই বেঁচে থাকে না। ঈশ্বরের করুণাই (ওয়ার্ড) তার প্রধানতম আশ্রয়।
আর এ-ও তুমি ভালো করে জানো, রবীন্দ্রনাথকে তার অর্ধেক জীবন– ১৯০১ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়ে বিশ্বময় ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল। বিশ্বভিখারিদের তিনি ছিলেন ওয়ার্নড় চ্যামপিয়ন নম্বর ওয়ান। পৃথিবীর হেন প্রান্ত নেই যেখানে তিনি ভিক্ষা করতে যাননি। তাঁর পূর্বে স্বামীজি। এবং দু জনাই ফিরেছিলেন, ওই গানের শূন্য ফেরে না যেন প্রার্থনায় নিষ্ফল হয়ে।
