কিন্তু আমি কোনও মতামত প্রকাশ করার পূর্বেই সে বললে, আমি খুব ভালো করেই জানি, কলকাতার রাস্তাঘাট আপনি একদম চেনেন না। ওদিকে গাড়ি-ড্রাইভার দিলেন ছেড়ে। এদিকে রাত একটা। তখন কার মনে দুশ্চিন্তা হয় না, বলুন তো!
এসব অভিযোগ সত্ত্বেও আমার হৃদয় বড় প্রসন্ন হয়ে উঠেছে। কারণ, এতক্ষণে আমার কাছে বেশ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, কাল রাত্রে, আজ সকালে তার চোখে অর্ধসুপ্ত, আচ্ছন্ন-আচ্ছন্ন যে ভাবটা ছিল সেটা প্রায় অন্তর্ধান করেছে। সেই প্রাচীন দিনের শহর-ইয়ারের অনেকখানি– সবখানি না– যেন ফিরে এসেছে। এর কারণটা কী? তখনও বুঝতে পারিনি। পরে পেরেছিলুম। সে-কথা আরও পরে হবে। কিন্তু উপস্থিত তার এই অবস্থা পরিবর্তনের পুরোপুরি ফায়দাটা ওঠাতে হবে।
আমি গোবেচারি সেজে বললুম, তা তো বটেই। আমি যে কলকাতার রাস্তাঘাট চিনিনে সে তো নসিকে সত্য কথা। এই তো, আজ সন্ধ্যায়ই, আমি ট্যাকসি ধরে গেলুম ধর্মতলা আর চৌরঙ্গির ক্রসিং-এ। আমি জানতুম, সেখানে ঠঠনের কিংবা কালীঘাটের মা-কালীর মন্দির। ও মা! কোথায় কী! সেখানে দেখি টিপ্পু সুলতানের মসজিদ। কী আর করি। ওজু করে দু রেকাৎ নফল নামাজ পড়ে নিলুম। তার পর বেরুলুম দক্ষিণেশ্বর বাগে। সেখানে তো জানতুম, মৌলা আলীর দরগা–
এতক্ষণে শহর-ইয়ারের ধৈর্যচ্যুতি হল।
তবু, প্রাচীন দিনের মতো শান্ত কণ্ঠে বললে, দেখুন, আপনারা সাহিত্য সৃষ্টি করেন। আপনাদের কল্পনাশক্তি সাধারণজনের চেয়ে অনেক বেশি, ভাষা আপনাদের আয়ত্তে, স্টাইল আপনাদের দখলে। সেই ক্ষমতা নিয়ে আপনারা অনেক কিছু করতে পারেন– লোকে ধন্য ধন্য করে। কিন্তু আমাদের নিতান্ত ব্যক্তিগত জীবনে আপনি সেসব শস্ত্র ব্যবহার করেন কেন? সেটা কি উচিত? আমরা কি তার উত্তর দিতে পারি? আমরা–
প্রাচীন দিনের শহর-ইয়ার যেন নবীন হয়ে দেখা দিচ্ছে। আমি তারই সুযোগ নিয়ে মন্তব্য করলুম, বড় খাঁটি কথা বলেছ, শহর-ইয়ার। এ কর্ম বড়ই অনুচিত!… আমি তোমারই পক্ষে একটি উদাহরণ দিই :
আমাদের শান্তিনিকেতনে কয়েক বৎসর পূর্বে একটি অপ্রিয় ঘটনা ঘটে। তার জন্যে কে দায়ী আমি সঠিক জানিনে। হয় জনৈক অধ্যাপক, নয় ছাত্ররা। তখন শান্তিনিকেতনবাসী জনৈক প্রখ্যাত লেখক ছাত্রদের বিরুদ্ধে একটা কঠোর কঠিন মন্তব্যপূর্ণ পত্র খবরের কাগজে প্রকাশ করেন … তুমি এখখুনি যা বললে, তারই সপক্ষে আমি এ ঘটনার উল্লেখ করছি।… তখন ছাত্ররা করে কী? সেই প্রখ্যাত সাহিত্যিকের শাণিত তরবারির বিরুদ্ধে লড়তে যাবে কে? তারা ফোর্থ-ইয়ার ফিফথ-ইয়ারের ছাত্র। তাদের ভিতর তো কেউ সাহিত্যিক নয়।… সিংহ লড়বে সিংহের সঙ্গে, বাঁদর।
আমি থেমে গেলুম। কিন্তু শহর-ইয়ার চুপ করে রইল।
ইতোমধ্যে আমি আস্তে আস্তে আপন মনে বুঝে গিয়েছি, শহর-ইয়ার কেন আপন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে।
অবশ্য নিঃসন্দেহ, নির্ঘ কোনও কিছু বলা কঠিন।
সে ভয় করেছিল, তার পীরেতে-আমাতে লাগবে লড়াই!
ফলে সে হারাবে পীরকে, নয় আমাকে।
এই দ্বন্দ্বের সামনে পড়ে কাল সন্ধ্যায় সে ডুব মেরেছিল ধ্যানের গভীরে। সেই ধ্যানের পথ সুগম করার জন্য অনেকেই বহুক্ষণ ধরে জপ-জিক করেন। শহর-ইয়ার তাই কাল রাত্রে লতিফ সুন্দরের নাম জপ করেছিল। শুনেছি বহু গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাধক জপ করতে করতে দশা (আরবিতে হাল) প্রাপ্ত হন।
এ নিয়ে তো দিনের পর দিন আলোচনা করা যায়, এবং আমি কিছুটা করেছিও, শহর-ইয়ারের পীরের সঙ্গে বরোদায়। কিন্তু এসব করে আমার কী লাভ? আমি চাই শহর-ইয়ারের মঙ্গল, ডাক্তারের মঙ্গল এবং আমরা তিনজন এতদিন যে-পথ ধরে চলেছি– সুখেদুঃখে হাসিকান্নার ভিতর দিয়ে সে-পথ দিয়েই যেন চলতে পারি। এরই মধ্যে একজন ছিটকে পড়ে যদি স্বয়ং পরব্রহ্মকেও পেয়ে যায় তাতে ডাক্তারের কী লাভ, আমারই-বা কী লাভ? বুদ্ধদেব বৈরাগ্য আর সন্ন্যাস দিয়ে বিশ্বজয় করেছিলেন; কিন্তু সে ধন কি পিতা তথা রাজা শুদ্ধোধনকে আনন্দ দান করতে পেরেছিল? তিনি তো কামনা করেছিলেন, পুত্র যেন যুবরাজরূপে দিগ্বিজয় করে। এবং গোপা-যশোধরা? তিনিও তো চেয়েছিলেন, একদিন রাজমহিষী হবেন, তাঁর পুত্র যুবরাজ রাহুলের রাজমাতা হবেন।
কিন্তু যে-কথা বলছিলুম :
পীরেতে-আমাতে কোনও ঝগড়া-কাজিয়া তো হলই না, বরঞ্চ প্রকাশ পেল, দু জনকার বহুদিনের হৃদ্যতা। শহূরুইয়ারের যেন একটা দুঃস্বপ্ন কেটে গেল, তার যেন দশ দিশি ভেল নিরদ্বন্দা।
***
হঠাৎ না ভেবে-চিন্তেই বলে ফেললুম, আচ্ছা, শহর-ইয়ার, এখন রবীন্দ্রনাথের ধর্মসঙ্গীত তোমাকে আনন্দ দেয়? এখন শব্দটাতে বেশ জোর দিলুম। আগে তো তুমি পছন্দ করতে না।
একটুখানি ম্লান হাসি হেসে বলল, না।
আমি বললুম, সে কী? এখন তুমি যে-পথে চলেছ সেখানে তো তাঁর ধর্মসঙ্গীত তোমাকে অনেককিছু দিতে পারে, তোমার একটা অবলম্বন হতে পারে।
মাথা নিচু করে বলল, হল না। কাল দুপুরেই আপনি তখন বাড়িতে ছিলেন না– আবার কিছু রেকর্ড বাজালুম। অস্বীকার করছিনে, খুব সুন্দর লাগল। ভাষা, ছন্দ, মিল সবই সুন্দর। এমনকি আল্লাহকে নতুন নতুন রূপে দেখা, নতুন নতুন পন্থায় তার কাছে এগিয়ে যাবার প্রচেষ্টা সবই বড় সুন্দর। আমার মন যে কতবার নেচে উঠেছিল, সে আর কী বলব!… কিন্তু, কিন্তু, আমার বুকের ভিতরে কোনও সাড়া জাগল না।
