যেন একটুখানি শঙ্কিত হয়ে খান শুধালে, এনি ট্রবল, স্যর?
আমি বললুম, ইয়েস। কিন্তু সে-কথা পরে হবে। তুমি যা বলছিলে, বলে যাও।
কথঞ্চিৎ শান্তি পেয়ে ভূতনাথ বললে, বলার মতো তেমন আর বিশেষ কিছু নেই। পূর্বেই বলেছি, বিয়ে হয়ে গেল। চতুর্দিকে শান্তি। শহর-ইয়ার ঠাকুমাকে দেখতে আসেন কি না তা-ও জানিনে।… ইতোমধ্যে ঠাকুমা যখন নিশ্চিন্দি মনে ওপারে যাবার জন্য যাব-যাচ্ছি যাব-যাচ্ছি করছেন তখন তাঁর জীবনসন্ধ্যায় এল একটা দুর্ঘটনা। তার এক পিঠাপিঠো ছোটভাই বহু বৎসর ধরে হিমালয়ে ঘোরাঘুরি করতেন, দু তিন মাস অন্তর অন্তর দিদিকে পোস্ট-কার্ডও লিখতেন।
হঠাৎ একদিন এক চিঠি এল সেই ভাইয়ের এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনিও তাঁর সঙ্গে হিমালয় পর্যটন করতেন। চিঠির মূল বক্তব্য ছিল, মাস তিনেক ধরে সেই ভাইয়ের সন্ধান নেই।
ঠাকুমার আদেশে আমাকেই যেতে হল হিমালয়ে তার খোঁজে। সে দীর্ঘ নিষ্ফল কাহিনী আপনাকে আর শোনাব না। তিন মাস পর ঠাকুমার আদেশে কলকাতায় ফিরে এলুম।
এসে দেখি, যা ভেবেছিলুম ঠিক তার উল্টো।
ঠাকুমা শান্ত প্রশান্ত।
আমি অনুসন্ধান করে জানতে পারলুম, ইতোমধ্যে ওই শহর-ইয়ার বিবি নাকি ঠাকুমাকে কোন এক পীরের আস্তানায় নিয়ে গিয়েছেন এবং সেখানে তিনি মনের শান্তি পেয়েছেন। সে তো খুব ভালো কথা। দেহমনের শান্তিই তো সর্বপ্রধান কাম্য। কিন্তু আপনি জানেন, আমি এসব গুরুপীর কর্তাভজাদের একদম পছন্দ করিনে।
আমি বললুম, আমিও করি না।
ভূতনাথ বললে, কিন্তু অনুসন্ধান করে জানলুম, শহর-ইয়ার নাকি ঠাকুমাকে পীরের আস্তানায় নিয়ে যাবার পূর্বে পাকাপাকিভাবে বলেছে, পীর সাহেব আপনার ভাইকে হিমালয় থেকে এখানে উড়িয়ে নিয়ে আসবেন না। কিন্তু আমি আশা রাখি, তিনি আপনাকে কিছুটা মনের শান্তি এনে দিতে পারবেন আল্লার কৃপায়।
ভূতনাথ খান খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, তাই তো এই মহিলার প্রতি আমার এত শ্রদ্ধা।
২০. মধ্যরাত্রে যে নৈস্তব্ধ্য
২০.
কলকাতা মহানগরীর কোনও কোনও অঞ্চলে মধ্যরাত্রে যে নৈস্তব্ধ্য উপভোগ করা যায় গ্রামাঞ্চলে অতখানি সহজলভ্য নয়। যদ্যপি কবিরা ভিন্নমত পোষণ করেন। জনপদবাসী দুপুররাত্রে কেমন যেন নিশ্চিন্ত মনে ঘুমুতে জানে না। এ বাড়ি থেকে নিদ্রাহীন বৃদ্ধের কাশির শব্দ, ও-বাড়ি থেকে চোর সম্বন্ধে মাত্রাধিক সচেতন মরাই-ভরা ধানের গেরেমভারি মালিকের গলাখারি, চিকিৎসাভাবে কাতর জ্বরাতুর শিশুর নির্জীব গোঙরানো এসব তো আছেই, তার ওপর পশুপক্ষীর নানা রকমের শব্দ। তারা যেন মধ্যরাত্রে একাধিক শত্রুর অতর্কিত আক্রমণের ভয়ে আতঙ্কিত। অথচ বেশ লক্ষ করা যায়, এদের ভিতর তখন একরকমের অপ্রত্যাশিত সহযোগিতা দেখা দেয়। হঠাৎ মোরগটা ভয় পেয়ে ডেকে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে উঠল, ছাগলটা মা মা করল, সর্বশেষে পাশের গোয়ালের গাইটা একটুখানি ঘড় ঘড় করল –খুব সম্ভব চেক্ অপ্ করে নিল, অধুনা প্রসবিত তার বাছুরটি পাশ ছেড়ে কোথাও চলে যায়নি তো!
একমাত্র ব্যত্যয় আমার আলসেশিয়ান মাস্টার। সে ওই ঐকতানে কস্মিনকালেও যোগ দেয় না, যদিও তার কণ্ঠই এ অঞ্চলে সর্বাপেক্ষা গ্ৰাম্ভারি। সোজা বাঙলায়, গম্ভীর অম্বরে যথা নাদে কাদম্বিনী। তার কারণ সে তার আচার-আচরণে অনুকরণ করে আমাকে। আমি নীরব থাকলে সে-ও নিশ্চুপ। আমিও তাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি– সর্বোপরি তার ধৈর্য আর সহিষ্ণুতা। কিন্তু এ-শীলে সে আমাকে রোজই হার মানায়।
হুঃ! ঠিক। শহর-ইয়ারকে আমি একটি আলসেশিয়ান-ছানা সওগাত দেব।
হঠাৎ একটা লোক আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললে, হুজুর, মাফ করবেন। এই তো আমাদের বাড়ি।
ওঃ হো! তাই তো। আমি এ বাড়ি ছাড়িয়ে বেখেয়ালে কহাঁ কহাঁ মুলুকে চলে যেতুম, কে জানে।
অর্থাৎ এই লোকটিকে মোতায়েন করা হয়েছে, আমি যদি রাত সাড়ে তেরটার সময় বাড়ির সামনে চক্কর খাই তখন সে যেন আমাকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু এই লোকটাকে মোতায়েন করল কে? ডাক্তার? তার তো অতখানি কম সেন্স নেই। শহর-ইয়ার? সে তো পীরের আস্তানা থেকে ফেরে অনেক রাতে।
দীর্ঘ চত্বর পেরিয়ে যখন বাড়িতে ঢুকলুম, তখন দেখি আরও দুটি লোক জেগে বসে আছে। স্পষ্টত আমার-ই জন্য। আমি লজ্জা পেলুম। তিন-তিনটে লোককে এ রকম গভীর রাত অবধি জাগিয়ে রাখা সত্যই অন্যায়।
এ পাপ আর বাড়ানো নয়। চুপিসাড়ে আপন ঘরে ঢুকে অতিশয় মোলায়েমসে খাটে শুয়ে পড়ব। আলোটি পর্যন্ত জ্বালাব না। সুইচের ক্লিক-এ যদি ডাক্তার, শহর-ইয়ারের ঘুম ভেঙে যায়, আর আমার ঘরে হামলা করে।
এককথায়, মাতাল যে রকম গভীর রাত্রে বাড়ি ফেরে।
অতিশয় সন্তর্পণে দরজার হান্ডিলটি ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকে আমি অবাক! ঘর আলোয় আলোময়। আমার খাটের পৈথানের কাছে যে কেদারা তার উপর বসে আছে শহর-ইয়ার।
কিছু বলার পূর্বেই সে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, আপনি আমাকে আর কত সাজা দেবেন?
আমার মুখে কোনও উত্তর জোগাল না। কিসের সাজা? ওকে দেব আমি সাজা! ওর মতো আমার আপনজন এদেশে আর কে আছে?
এস্থলে সাধারণজন যা বলে, তাই বললুম, বসো!
কিন্তু শহর-ইয়ার যেন লড়াইয়ে নেমেছে।
তার চেহারা দেখে কেচ্ছা-সাহিত্যের দুটি লাইন আমার মনে পড়ল :
রানির আকৃতি দেখি বিদরে পরান।
নাকের শোওয়াস যেন বৈশাখী তুফান ॥
