এইবারে একটি তৃতীয় পক্ষ পেলুম যে শহর-ইয়ারকে দেখেছে, একটুখানি দূরের থেকে এবং তাতে করেই পেয়েছিল বেসট পারসপেকটিভ– এবং তারই ভাষায়, সেই অগ্নিশিখাকে সাইজ অপ করতে গিয়ে একদম বিমূঢ় হয়ে গিয়েছে। আমিও মনে মনে বললুম, অগ্নিশিখা তো তরল দ্রব্য নয় যে তাকে তোমার মনের পেয়ালায় ঢেলে নিয়ে আপন শেপ দেবে!
ঠাকুমা চলে যেতেই ভূতনাথ দরজাতে ডবল খিল দিল।
ছেঁড়া কথার খেই তুলে নিয়ে বললে, দ্রৌপদী, মশাই, সাক্ষাৎ দ্রৌপদী। আমি শুধালুম, দ্রৌপদীর সঙ্গে তুলনা করছ কেন?
একগাল হেসে বলল, কেন স্যার, আপনিই তো হালে একখানা গবেষণাপূর্ণ রসরচনা ছেড়েছেন যাতে দেখিয়েছেন, এ সংসারে একটি প্রাণ, তা-ও রমণী, কী করে পাঁচ-পাঁচটা মদ্দাকে তর্কযুদ্ধে চাটনি বানাতে পারে। সেই নারীই তো দ্রৌপদী। দুঃশাসন যখন তাঁকে জোর করে কুরুসভাস্থলে টেনে এনে হাজির করল তখন তিনি যে স্বাধীনা, তাকে যে তার অনিচ্ছায় প্রকাশ্য সভাস্থলে টেনে আনা সম্পূর্ণ বে-আইনি, আজকের আদালতি ভাষায় যাকে বলে আলট্রা ভাইরিসা তাঁর সেই বক্তব্য যখন তিনি অকাট্য যুক্তির পর যুক্তি দিয়ে পেশ করতে লাগলেন, ভুল বললুম, পুশ করতে লাগলেন, সজোরে কড়া কড়া যুক্তিসহ– তখন কি কুরুবৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্মদেব, কি দ্বিজশ্রেষ্ঠ নিষ্ঠাচারী দ্রোণাচার্য কেউ কি কোনও উত্তর দিতে পেরেছিলেন?… তার এক হাজার বছর পরে সোক্রাতেস না? তার পর এ তাবৎ ব্ল্যাঙ্কো! না?
আমি অধৈর্য হয়ে বললুম, থাক! তোমার কচকচানি থামাও। শহর-ইয়ারের কথা কও!
পূর্বেই বলেছি শ্ৰীমান ভূতনাথ বৃথা তর্ক করে না। ঘাড় নেড়ে বললে, শহর-ইয়ারের কথাই তাবৎ শহরের ইয়ার– অথবা হওয়া উচিত।
ভেবে দেখুন, ঠাকুমা একা। শহর-ইয়ার একাই একশো দ্রৌপদী। ঠাকুমা পারবেন কেন? শহর-ইয়ার কী যুক্তিতর্ক উত্থাপন করেছিলেন সে আমার জানা নেই, কারণ আমার কলিজাতে পুকুর খোঁড়ার ভয় দেখালেও তখন আমি সে-সভাঙ্গনে যেতে রাজি হতুম না। ঠাকুমা একে মেয়েছেলে তদুপরি বৃদ্ধা। তাঁর কথা আলাদা। কিন্তু আমি মদ্দা। আমাকে ওই দ্রৌপদী চিবিয়ে গিলে ফেলত না– যদিস্যাৎ তার মনে ক্ষণতরেও সন্দেহ হত, আমি ঠাকুমার পক্ষ সমর্থন করতে এসেছি!
আমি সত্যিই তাজ্জব মানলুম। শহর-ইয়ারকে তো আমি চিনি, শান্তা, স্নিগ্ধা কল্যাণীয়া রূপে। সে যে তর্কাঙ্গনে রণরঙ্গিনী হয়ে তার রুদ্রাণী রূপ দেখাতে পারে সে কল্পনা তো আমি কখনও করতে পারিনি।… তাই তো বলছিলুম, তৃতীয় পক্ষের মতামত অবর্জনীয়।
ইতোমধ্যে ভূতনাথ ঘাড় চুলকে চুলকে বললে, পরে আমার কানে কী একটা ঐতিহাসিক যুক্তিও এসেছিল। বেগম শহর-ইয়ার যা বলেছিলেন তার মোদ্দা নির্যাস ছিল :
বুদ্ধদেব ব্রাহ্মণ-শ্রমণকে একাসনে বসিয়ে বার বার বলতেন, ব্রাহ্মণ-শ্রমণ, ব্রাহ্মণ-শ্ৰমণ।
তার বহুশত বৎসর পর, বৌদ্ধধর্ম যখন এদেশ থেকে লোপ পেল, তখন সর্বশেষে, এই শ্রমণরা হিন্দুধর্ম গ্রহণ করলেন। এবং হিন্দু ধর্মানুযায়ী বিবাহাদি করলেন। তাঁদেরই বর্তমান বংশধর বৈদ্যসম্প্রদায়। অতএব তাঁরা ব্রাহ্মণদেরই মতো কুলসম্মান ধারণ করেন। একদা তারা শ্ৰমণরূপে লোকসেবার জন্য আয়ুর্বেদ অধ্যয়ন করতেন, হিন্দুধর্মে প্রত্যাবর্তন করার পর তারা সেই বৈদ্য-বিদ্যাই জীবিকারূপে গ্রহণ করলেন। তার পর
আমার কান তার পর ভূতনাথের আর কোনও কথাই গ্রহণ করেনি। কারণ আমার মন তখন বিস্ময়বিমূঢ়। আমি ভালো করেই জানতুম, শহর-ইয়ার ইহজনে কখনও কোনওপ্রকারের গবেষণা করেনি।… এমনকি তার স্বামী যে মেডিকাল রিসার্চে আচৈতন্য নিমজ্জিত সেটাও সে বোধ হয় হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করতে পারেনি। অবশ্য সে এযাবৎ ইতালির লেওনে কাএতানির স্ত্রীর মতো বিদ্রোহ ঘোষণা করেনি।
তবে কি তাবৎ সমস্যা এভাবে দেখতে হবে যে, কাএতানির স্ত্রী স্বামীকে ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন, আর শহর-ইয়ার স্বামীকে ত্যাগ না করে ধর্মে আশ্রয় নিয়েছে।
ভূতনাথ বললে, সে বিয়ে তো নির্বিঘ্নে হল। কিন্তু আমার মনে হয়, বিবি শহর-ইয়ার ঠাকুমাকে কাবু করেছিলেন, যুক্তিতর্ক দিয়ে নয়, তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে। ব্যক্তিত্ব বা পার্সনলাটি বললে অল্পই বলা হয়। বরঞ্চ ওই যে আমি বললুম, অগ্নিশিখা–সেই অগ্নিশিখা যেন আগুনের পরশমণি হয়ে ঠাকুরমাকে।
হঠাৎ ভূতনাথের ভাব পরিবর্তন হল। আপন উৎসাহের আবেগ আতিশয্যের ভাটি গাঙে এতক্ষণ অবধি সে এমনই ভেসে চলেছিল যে শহর-ইয়ার সম্বন্ধে আমার কৌতূহলটা কেন সে-সম্বন্ধে সে আদৌ সচেতন হয়নি। এখন যেন হঠাৎ তার কানে জল গেল।
ভুরু কুঁচকে আমার দিকে ঈষৎ সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিতে– অবশ্য পরিপূর্ণ লাল-বাজারি ডবল-ব্যারেল বন্দুকের দু নাল উঁচিয়ে নয়– জিগ্যেস করলে, স্যর, আপনি কি ওনাকে চেনেন?
হ্যাঁ।
বেচারা ভূতনাথ! অত্যন্ত লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি বললে, মাফ করবেন, স্যর, প্লিজ। আপনার সামনে ওঁর সম্বন্ধে আমার এটা-ওটা বলাটা বড্ডই বেয়াদবি হয়ে গিয়েছে।
আমি বললুম, সে কী কথা! তুমি তো এখনও তার কোনও নিন্দে করোনি। এবং ভবিষ্যতে করবে বলেও তো মনে হয় না। এটাকে তো পরনিন্দা পরচর্চা বলা চলে না।… আর আমি জানতে চেয়েছিলুম বলেই তো তুমি আমাকে এসব বললে। আর, এগুলো আমার কাজে লাগবে।
