তা সে যাক গে।
ইতোমধ্যে ভূতনাথ আমাকে তার হাফ প্রাচীনপন্থি বৈঠকখানায় বসিয়ে ব্যাপারটি সংক্ষেপে সারলো :
আপনি ঠিক বলেছেন, আমার ঠাকুরমা নিষ্ঠাবতী হিন্দু রমণী। এখনও স্বপাকে খান। আমাকে তাঁর হেঁসেলে ঢুকতে দেন না। ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে– এমরাল। মরাল নয়, ইমরালও নয়। আমার ঠাকুরমা এলিবারেল। তিনি ধর্মবাদে লিবারেল নন, ইলিবিরেলও নন তিনি এলিবারেল। কথাটা একটু বুঝিয়ে বলতে হয়, কারণ ওই শহর-ইয়ার বিবির সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক আছে। অবশ্য সেটা অনেক পরের কথা।
উত্তরবঙ্গের কোন হিন্দু সর্ব মুসলমানের সংস্পর্শ বর্জন করে বাস করেছে কবে? তাই তিনিও মুসলমানদের কিছুটা চেনেন। যেমন আপনার মরহুম শ্বশুরসাহেবকে খুব ভালোভাবেই চিনতেন।
কিন্তু আপন ধর্মচার তিনি করতেন– এখনও করেন তার মা-শাশুড়ি যেভাবে করেছেন হুবহু সেইরূপ। অন্য ধর্ম সম্বন্ধে তাঁর কোনও কৌতূহল কখনও ছিল না– এখনও নেই এবং সেখানে পুনরায় আসেন ওই শহর-ইয়ার বিবি। এমনকি এই হিন্দুধর্মেই যে– পূজাআচ্চার নানাবিধ পদ্ধতি রয়েছে সে সম্বন্ধে ঠাকুমা ছিলেন সম্পূর্ণ উদাসীন। তাই বলছিলুম তিনি ধর্মবাবদে ছিলেন এলিবারেল। তিনি তো, আর পাঁচটা ধর্ম সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল হয়ে সেগুলো রিজেক্ট করেননি। সে হলে না হয় বলতুম, তিনি ইলিবিরেল, কট্টর, কনজারভেটিভ। হাওয়ার ধাক্কায় যখন তেতলার আলসে থেকে ফুলের টব নিরীহ পদাতিকের কাঁধে পড়ে তাকে জখম করে তখন কি সে-টব চিন্তা করে এই কর্মটি করেছে? সে কি চিন্তা করে জানতে পেরেছে, উক্ত পদাতিক অতিশয় পাপিষ্ঠ ব্যক্তি? অতএব ফুলের টবের এ কর্মটি এমরাল। ঠিক ওইভাবেই আমার ঠাকুরমার যাবতীয় চিন্তাধারা কর্মপদ্ধতি পূজা-আচ্চা সব, সবকিছু ছিল এলিবারেল। ফুলের টবের মতোই তিনি ছিলেন অন্য পাঁচটা ধর্ম সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, আনকনশাস,–
আমি বাধা দিয়ে বললুম, থাক, তোমার এসব কচকচানি। আমি জানতে চেয়েছিলুম, তোমার নিষ্ঠাবতী হিন্দু ঠাকুমা ওই মসলা পীরের মোকামে পৌঁছলেন কী করে?
খান বড় সহিষ্ণু ব্যক্তি। বললে, স্যার, ওই সময় নাট্যমঞ্চে শহর-ইয়ার বানুর অবতরণ। তাই আমি তার পটভূমি নির্মাণ করছিলুম মাত্র। এইবারে আসল মোদ্দা কথায় পৌঁছে গিয়েছি। শুনুন।
দেশ-বিভাগের পর ঠাকুমাকে প্রায় দৈহিক বল প্রয়োগ করে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। তিনি তার শ্বশুরের ভিটে স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে ছাড়তে চাননি। এরকম বিস্তর কে আপনি রেফুজি কলোনিগুলোতে পাবেন।
ঠাকুমার সঙ্গে দেশত্যাগ করে এসেছিল তাঁরই পিতৃকুলের সুদূর সম্পর্কের একটি অরক্ষণীয়া। রান্নাবান্না ধোয়ামোছার পরও আর কিছু করবার নেই বলে সে কলেজ যেত। ঠাকুমা ব্রাহ্মণী, ন্যাচলি আত্মীয় পালিতা কন্যাও ব্রাহ্মণী। কিন্তু, মোশয়, সে যে-ক্লাসফ্রেন্ডের সঙ্গে প্রেমে পড়লো সে এক বদ্যি-সন্তান। তাকে বিয়ে করতে চায়।
ঠাকুমা তো শুনে রেগে কাই! কী! বদ্যির সঙ্গে বামুন মেয়ের বিয়ে! বরঞ্চ গোহত্যা করা যায়, গোমাংস ভক্ষণ করা যায়, কিন্তুক বামুনের সঙ্গে বদ্যি! বরঞ্চ ছুঁড়িটা ডোমাড়াল, মুচিমোচরমান বিয়ে করুক। কারণ ঠাকুরমার মনঃসিন্দুকে একটি আপ্তবাক্য প্রায় গোপন তত্ত্বরূপে লুক্কায়িত আছে :
একশো গোখরোর বিষ নিয়ে সৃষ্টিকর্তা একটি বদ্যি তৈরি করেন।
কিন্তু ঠাকুমা জানতেন না যে, একশো বদ্যির বিষ নিয়ে সষ্টিকর্তা একটি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ তৈরি করেন। আমরা বারেন্দ্র। ভূতনাথ তার হোমেড় সিগরেটে আগুন ধাবার জন্য ক্ষণতরে চুপ করে গেল।
আমি গুনগুন করে বললুম, এবং একশোটি বারেন্দ্রের বিষ দিয়ে আল্লাতালা তৈরি করেন একটি সৈয়দ।
খান আস্ত একটা চাণক্য। কিন্তু এ নীতিটি জানত না। খানিকক্ষণ এই নবীন তত্ত্বটির গভীর জলে খাবি খেয়ে খেয়ে বললে :
তাই বুঝি সৈয়দরা এত বিরল?
আমি বললুম, চোপ, তুমি যা বলছিলে, তাই বল।
খান তাবৎ বাক্য হজম করে নিয়ে বলল, এ হেন সময়ে, যে নাট্যে ছিলেন সুদুমাত্র দুটি প্রাণী, ঠাকুমা এবং অরক্ষণীয়া, সেখানে প্রবেশ করলেন বীরপদভরে পৃথিবী প্রকম্পিত করে একটি তৃতীয়া প্রাণী।
ভুল বললুম, স্যার, আমার মনে হল যেন আমাদের সরু গলি দিয়ে ঢুকল একটি জ্বলন্ত মশাল। অথচ অলিম্পিকের টর্চ-বেয়ারার নেই। সুন্দুমাত্র মশালটাই যেন স্বাবলম্ব হয়ে, গলি পেরিয়ে, আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে, ঠাকুরমার ঘরে ঢুকল।
সেই মশাল শহর-ইয়ার। আপনাকে বলিনি, অগ্নিশিখা?
আমি শুধালুম, কেন এসেছিল?
আজ্ঞে –।
এমন সময় ঠাকুমা আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। হাতে পাথরের থালা। খান ঠোঁটে আঙুল রেখে ইঙ্গিত দিল, এই আর ও-কাহিনী বলা চলবে না।* [* এই উপন্যাসের পূর্ববর্তী এক অধ্যায়ে আমি লিখি যে, প্রসিদ্ধ ইওরোপীয় প্রণয়গাথা ত্রিস্তান ইজলদে বাঙলাতে অনুবাদিত হয়নি। বড়ই আনন্দের সঙ্গে জানাই, পক্ষাধিককাল পূর্বে জনৈক সাতিশয় মেহেরবান পাঠক আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি স্বয়ং ওই গাথা নিয়ে একটি কিছুটা অনুবাদ, কিছুটা স্বয়ংসৃষ্ট লিস্তান কাহিনী বাঙলায় রচনা করেছেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে বে-এক্তেয়ার মহব্বত বশত ওই পুস্তিকার একখণ্ড আমাকে সওগাত করেছেন।]
.
১৯.
এতদিনে বুঝতে পারলুম, শহর-ইয়ারকে আমি চিনিনি, চেনবার চেষ্টাও করিনি। কোনও মানুষকে দিনের পর দিন দেখলে, তার সঙ্গে কথা কইলেও তার একটামাত্র দিক চেনা হয়। কারণ যার যে রকম প্রবৃত্তি সে সেইরকমভাবেই অন্যজনকে গ্রহণ করে। শহর-ইয়ার মদ্য আমার মনের পাত্র যখন পূর্ণ করল তখন সে শে নিল আমার মনের গেলাসেরই শে। কিন্তু সেইটেই যে তার একমাত্র শেপ নয় সেটা আমি আনমনে ভুলে গিয়েছিলুম। এমনকি তার স্বামী, ডাক্তার তাকে কী শেপ-এ নিয়েছে সেটাও আমি ভেবে দেখিনি। এবং সে-ই বা তার গড়া– অবশ্য তার মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়া শহর-ইয়ারকে যে শেপ দিয়েছে সে নিয়ে আমার সঙ্গে ডিপ্লোমেটিক ডিসপ্যাঁচ একচেঞ্জ করতে যাবে কেন?
