আপনি এখানে? সে-ও সঙ্গে সঙ্গে জিগ্যেস করল। কারণ বিলক্ষণ জানত আমি পীরটিরের সন্ধানে কখনও বেরুই না। খান ঝাণ্ডু ছোকরা। তাই পুরো পাক্কা তরুণ, মডার্ন হয়েও প্রাচীন প্রবাদে বিশ্বাস করে, কাগে কাগের মাংস খায় না।
বৃদ্ধাকে কোমরে জড়িয়ে ধরে সে তাঁকে মোটরের পিছনের সিটে বসাল, কোনও প্রকারের প্রতিবাদ না শুনে আমাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে সামনে বসাল। স্টার্ট দিতে দিতে পিছনের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বললে, ঠাকুমা, একে তুমি কখনও দেখনি, কিন্তু চিনবে। তোমার ওই শাজাদপুরের প্রতিবেশী মৌলবি বশিরুদ্দিনের মেয়েকে বিয়ে করেছেন
বাকিটা কী বলেছিল আমার কানে আসেনি। বৃদ্ধা তাকে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চুপ কর– বলে তার কম্পিত শীর্ণ হস্ত আমার মস্তকে রেখে বার বার আশীর্বাদ করতে লাগলেন। খানের সেই ভিন্টেজকারের নানাবিধ কর্কশ কানফাটা কোলাহল ভেদ করে যে কটি শব্দ আমার কানে এসে পৌঁছল তার একটি বাক্য শুধু বুঝতে পারলুম, আহ্! তুমি আমার বশির ভাইসাহেবের মাইয়ারে বিয়া করছ। বুড়ি একই কথা বার বার আউড়ে যেতে লাগলেন।
আমার মনে দৃঢ় প্রত্যয় হল, বুড়ির কাপড়ের খুঁটে আকব্বরি মোহর বাঁধা ছিল না বলে তিনি সাড়ম্বর জামাইয়ের মুখদর্শন কর্ম সমাধান করতে পারলেন না। বুড়ি পিছনের সিটে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লেন। হায় দিদিমা, তুমি হয়তো এখন মনে মনে চিন্তা করছ, জামাইরে কী খাওয়াইমু!
আমি খানকে শুধালুম, তুমি ওই পীরের আস্তানায় জুটলে কী করে?
খান তার সেলফ-মেড় একটা সিগারেট আমার দিকে এগিয়ে ধরে বললে, না, আমার কোনও ইনট্রেট নেই। ঠাকুরমাকে আপিসে যাওয়ার সময় ড্রপ করে যাই, ফেরার সময় দুই-এক পেগ স্যাঁট স্যাঁট করে নামিয়ে, ঠিক মগরিবের নামাজের ওক্তে তাকে ফের পিক অপ্ করে নিই—
ঠাকুরমা যাতে শুনতে না পান তাই ফিসফিস করে শুধালুম, সে তো বুঝলুম, কিন্তু আমি তো জানতুম, তোমার ঠাকুরমা নিষ্ঠাবতী হিন্দু রমণী। তিনি আবার এই মুসলমান পীরের কাছে এলেন কী করে?
খান বললে, অতি সহজ এর উত্তর। তার নাতনির মারফত। সেই নাতনির এক ক্লাসফ্রেন্ডের সঙ্গে ঠাকুরমার পরিচয় হয়। মেয়েটা মুসলমান।
ওরে বাব্বা!
শিউরে উঠে ভূতনাথ খান বললে, অগ্নিশিখা, মশাই, অগ্নিশিখা। অগ্নিকুণ্ডও বলতে পারেন। জহরব্রতের অগ্নিকুণ্ড। যেখানে গণ্ডায় গণ্ডায় লেডি-কিলার ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ দিতে পারে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও নটবরই সে-অগ্নিকুণ্ডের কাছে যাবারও ইজাজত পাননি– ঝাঁপ দেওয়া দূরের কথা। লেডি-কিলার হিসেবে আহ্মে কম যাইনে, হেঁহেঁ হেঁহেঁ, কিন্তু ওই মুসলমানির দিকে একনজর বুলোতেই– সে তখন পীরসাহেবের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নামছিল– হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেলুম এ রমণী ফঁসুড়ে। তার একটিমাত্র চাউনি যেন অদৃশ্য একখানা রুমালে পরিবর্তিত হয়ে সাঁ করে উড়ে এসে লটবরবাবুর গলাটিতে ফাঁস লাগিয়ে, জস্ট, স্ট্রেঙলস্ হিম্ টু ডেথ, কিংবা বলতে পারেন, তার হি-ম্যান হবার প্ল্যানটি নস্যাৎ করে দেয়! বাপ!
রগরগে বর্ণনাটা শুনে আমার মনে কেমন যেন একটু কৌতূহল হল। শুধালুম নামটা জানো?
দাঁড়ান, বলছি, স্যার। আরব্য উপন্যাসের কোন এক নায়িকা না নায়কের নাম। শহর-জাদি? শহর-বানু? হা, হ্যাঁ, শহর-ইয়ার–
আজ আমার বার বার স্তম্ভিত হবার অর্থাৎ নিশ্চল নির্বাক স্তম্ভে পরিণত হওয়ার পালা।
শুনেছি, একদা নগরের একাংশ সহস্র স্তম্ভের (খাম্বার) উপর নির্মিত হয়েছিল বলে অদ্যকার ক্যাম্বে বন্দরকে গুজরাতিতে খাম্বাৎ বলা হয়, প্রাচীন যুগে স্তম্ভপুরী বলা হত। দিল্লিবাসীর কাছে এ শব্দতত্ত্ব ফজুল। সেথাকার চৌষট্টিটি স্তম্ভের উপর খাড়া বলে আকবর বাদশার দুধবাপ আজিজ কোকলতাসের কবরকে চৌসট খাম্বা বলা হয়।
আজ আমি এতবার হেথাহোথা স্তম্ভে পরিণত হয়েছি যে আমার উপর দিয়ে অনায়াসে কলকাতার ওভার-হেড রেলওয়ে নির্মাণ করা যায়!
ইতোমধ্যে ভূতনাথ ফের বকর বকর আরম্ভ করেছে। আমি ফের ফিসফিস করে বললুম, চুপ, চুপ। ঠাকুরমা শুনতে পাবেন। তুমি নিতান্ত অর্বাচীন; তাই জানো না প্রাচীনারা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে-একটি মহৎ সদ্গুণ রপ্ত করে নেন সেটি হচ্ছে, যে কথা তারা শুনতে চান না, সেটা তাদের কানের কাছে কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে শোনালেও শোনেন না, আর যেটি ভঁরা শুনতে চান সেটি তুমি বাঁশবনের কলমর্মরের ভিতর রাজার মাথায় শিং গোছ গোপনে গোপনে বললেও তারা দিব্যি শুনতে পান। তাই তো তারা দীর্ঘজীবী হন! আফটার অল কানের ভিতর দিয়ে যে-সব কথা মরমে পৌঁছে তার চৌদ্দ আনাই তো দুঃসংবাদ। অন্তত এ যুগে।
ভূতনাথ নিশ্চয়ই ভূতকালটা সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল। তদুপরি সে বৃথা-মাংস খায় না, বৃথা তর্ক করে না। গম্ভীর কণ্ঠে বললে, সর্ব যুগেই, সত্যযুগেও। পূর্বেই বলেছি, সে একটা আস্ত চার্বাক। আর আমার যদুর জানা, প্রথম চার্বাক এই পুণ্যভূমিতে অবতীর্ণ হন। সত্য ও ত্রেতাযুগের মধ্যিখানে।
ভূতনাথ জাতিস্মর।
.
ঠাকুমা গুটি গুটি রান্নাঘরের দিকে রওনা হলেন।
খাইছে!
ঠাকুমা নিশ্চয়ই তার ভাইয়া বশিরুদ্দিনের জন্য যেভাবে লুচি ভাজতেন সেইভাবে ভাজবার জন্য ভূতনাথের বউকে ফরমান ঝাড়বেন। তার বয়স ত্রিশ হয় কি না হয়। আমাদের পাড়ার চ্যাংড়া হীরু রায় বাজাবে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সামনে বাজনা। তওবা, তওবা!
