আমি হতভম্ব হয়ে শুধালুম, সে কী?
হ্যাঁ। এটা আপাতদৃষ্টিতে রহস্যময় মনে হতে পারে। সেটার সমাধান হল, একদিন যখন শুনতে পেলুম, শহর-ইয়ার কার যেন প্রশ্নের উত্তরে জনান্তিকে বলছে, সে এমন কিছু জিনিয়াস নয় যে উদ্ভট নতুন কোনও প্রশ্ন শুধোবে। সে নাকি অতিশয় সাধারণ মেয়ে। তার মনে অতিশয় সাধারণ প্রশ্নই জাগে। সেগুলো কেউ না কেউ আমাকে শুধাবেই। আমি উত্তর দেব। ব্যস, হয়ে গেল। কী দরকার ওঁকে– অর্থাৎ আমাকে– বিরক্ত করে।
আমি জিগ্যেস করলুম, তা হলে সে আপনার শিষ্যা হল কেন?
পীরসাহেব একটু চমকে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে বললেন, আমার কোনও শিষ্য-শিষ্যা নেই। আমি কখনও মুরশিদরূপে মন্ত্র দিয়ে কাউকে শিষ্য বা শিষ্যারূপে গ্রহণ করিনি!।
আমি হতভম্ব।
ইতোমধ্যে বিস্তর লোক পাশের ঘরে জমায়েত হয়েছে।
এবং সান্ধ্য নামাজের আজান শোনা গেল।
পীর এবার এদের সঙ্গে নামাজ পড়বেন। তার পর শাম্রালোচনা তত্ত্বালোচনা হবে হয়তো।
আমি হতভম্ব অবস্থাতেই বিদায় নিলুম।
.
১৮.
যা জানতে চেয়েছিলুম তার কিছুই জানা হল না; কল্পনায় যে ছবি এঁকেছিলুম তার সঙ্গে বাস্তবের ফিঙার প্রিন্ট একদম মিলল না। উল্টো রহস্যটা আরও ঘনীভূত হল। কোনও কিছুর সঙ্গে কোনও কিছুই খাপ খাচ্ছে না।
আমি কলকাতা থেকে আকছারই ট্রেনে করে বোলপুর যাই। একবার বোলপুর স্টেশনে ঢোকার পূর্বে সবকিছু কেমন যেন গোবলেট পাকিয়ে গেল। কই, এতক্ষণে তো অজয় ব্রিজের উপর দিয়ে গাড়িটা গম গম করে পেরোবে, তার পরে বাঁ দিকে পুকুর, ডান দিকে জরাজীর্ণ একটা দোতলা–কই সে-সব গেল কোথায়? উল্টো মাথার উপর দিয়ে হুশ করে একটা ওভারব্রিজ চলে গেল! এটা আবার রাতারাতি কবে তৈরি হল।
এখন হঠাৎ আমার হুশ হল, এবারে আমি কলকাতা থেকে বোলপুর আসছি না, আসছি। ভাগলপুর থেকে। অর্থাৎ আমি স্টেশনে ঢুকছি দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে নয়, উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ভেল্কিবাজি। উত্তর হয়ে গেল দক্ষিণ, পুব হয়ে গেল পশ্চিম। বাইরের দু দিকের দৃশ্য ফটাফট ফিট করে গেল।
তবে কি আমি শহর-ইয়ার রহস্যের দিকে এগুচ্ছিলাম উল্টো দিক দিয়ে? তবে কি আমার অবচেতন মন প্রতীক্ষা করছিল, পীর আমার দিক্-ভ্রান্তি দেখিয়ে দেবেন আর সঙ্গে সঙ্গে শহর-ইয়ার রহস্য অর্থাৎ তার আকস্মিক গুরুধর্মের কাছে ঐকান্তিক আত্মসমর্পণ, সাংসারিক নিত্যনৈমিত্তিক কর্মের প্রতি প্রচ্ছন্ন ঔদাস্য, ত্রিমা যামিনী-ব্যাপী জপ-জ্বিক– এসব তার পূর্ববর্তী জীবনের সঙ্গে সহজ সরলভাবে ফিট করে যাবে, সর্ব রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে?
বরঞ্চ পীর যেসব দুটি-একটি তথ্য পরিবেশন করলেন সেগুলো যেন চকিতে চকিতে বিজলি আলো হয়ে চোখেতে আরও বেশি ধাঁধা লাগাল।
সিঁড়ি দিয়ে আপন মনে ভাবতে ভাবতে নামছি এমন সময় জানা-অজানায় লক্ষ করলুম, কালো নরুনপেড়ে শাড়ি-পরা একটি বৃদ্ধা মহিলা নেমে যাচ্ছেন। মনে হল হিন্দু বিধবা। আকণ্ঠ রহস্যনিমজ্জিত অবস্থায়ও আমার মনে রত্তিভর কৌতুক সঞ্চারিত হয়ে মানসিক মৃদুহাস্য বিকশিত হল।… কে বলে, এদেশে হিন্দু-মুসলমান সুদু ঝগড়া-ফসাদই করে! যা না, যে কোনও পীর-মুর্শিদ গুরু-গোসাঁইয়ের আস্তানায়। হিন্দু-মুসলমান তো পাবেনই, তদুপরি পাবেন গণ্ডাখানেক দিশি সাহেব, দু চারটি খাস বিলিতি গোরা। তবে হ্যাঁ, কবি-রাজ ওমর খৈয়াম বলেছেন, সর্ব ধর্মের সর্বোত্তম সম্মেলন পাবে অঁড়িখানায়। সেখানে সব জাত, সব জাতি, সব ধর্ম সম্মিলিত হয়ে নির্বিচারে একাসনে বসে পরমানন্দে মদিরাপাত্রে চুম্বন দেয়।*[*ইরানের এক গণ্যমান্য সভাকবি নাকি নিকৃষ্টতম গুঁড়িখানায় চাড়ালদের সঙ্গে বসে ভাঁড়ে করে মদ্যপান করছিলেন। নগরপাল মারফত খবরটা জানতে পেরে বাদশা নাকি অনুযোগ করাতে কবি একটি দোহা রচনা করেন :
হাজার যোজন নিচেতে নামিয়া আকাশের ঐ তারা
গোস্পদে হল প্রতিবিম্বিত; তাই হল মানহারা?]
কিন্তু ভুললে চলবে না, সুফি-ফকির সাধুসন্তরা সাবধান করে দিয়েছেন, এ স্থলে মদিরা প্রতীক মাত্র, সিম্বল। মদিরা বলতে এস্থলে ভগবদ্প্রেম বোঝায়। তাই তো পীর গুরুর আস্তানায় এত শত ছাপ্পান্ন দেশের ইউনাইটেড নেশন, এবং তারো বাড়া, ইউনাইটেড রিলিজিয়ন ইউনাইটেড জাতবেজাতের সম্মেলন। এরা এখানে এসে জন্মগত পার্থিব সর্বপার্থক্য অগ্রাহ্য করে গুরুমুরশিদ যিনি সাকি– তার হাত থেকে ভগবদপ্রেমের পেয়ালা-ভরা শরাব তুলে নেয়।… থাগে এসব আত্মচিন্তা।
ততক্ষণে পেভমেন্টে নেমে গিয়েছি।
সামনে দেখি একটা বেশ গাট্টাগোট্টা জোয়ান মর্দ কেমন যেন ঈষৎ চেনা-চেনা –একটা কালো মোটরগাড়ির স্প্রিং-ভাঙা দরজাটা নারকেলের সরু দড়ি দিয়ে বাঁধছে।
আমার পাশে ততক্ষণে সেই বৃদ্ধা হিন্দু বিধবাটি এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে দেখে সেই জোয়ান (মিলিটারি অর্থে নয়, রূঢ়ার্থে) তাঁর দিকে এগিয়ে এল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল আমার চোখের উপর। সঙ্গে সঙ্গেই একে অন্যকে চিনে ফেললুম।… বেশ কয়েক বছর পর পুনর্মিলন।
এ তো আমার শ্বশুরবাড়ির দ্যাশের লোক! নাম, ভূতনাথ খান। খান পদবি মুসলমানের হলেও ওটা ওদের সম্পূর্ণ একচেটে নয়। খান হিন্দুসন্তান।
তুমি এখানে? অবাক হয়েই শুধোলুম। খানকে আমি চিনি। মহা পাষণ্ড। দেবদ্বিজে ভক্তি নেই, পীর-মুর্শিদের তো কথাই ওঠে না।
