আমি বললুম, থাক!
আপনি তো জানেন, আমি পারতপক্ষে ভালোমন্দের যাচাই করতে যাইনে। তবু শুনুন, সেদিন এক মারওয়াড়ি জৈন এসে উপস্থিত। ওদিকে জৈন কিন্তু এদিকে করুণাময়ের করুণাতে তার অশেষ বিশ্বাস। লোকটির সঙ্গে কথাবার্তা বলে বড় আনন্দ হল। বড় সরল, অকপট, সজ্জন। ইতোমধ্যে শহর-ইয়ার তার জন্যে এক জাম-বাটি লসসি পাঠিয়েছে। আমাদের কথাবার্তা সে বারান্দায় আড়ালে বসে শুনছিল। তার থেকে অনুমান করেছে, ইনি ছোঁয়াছুঁয়ি মানেন না, নইলে হিন্দু অভ্যাগতদের অনুমতি ভিন্ন সে কোনও খাবারের জিনিস ওঁদের সামনে পেশ করে না। আর আপনি তো জানেন, মেয়েটির দেহমনহৃদয় কতখানি সরলতা দিয়ে গড়া। সে মোহমুক্ত বলে প্রায়ই ভুল করে ভাবে ইহসংসারের সবাই বুঝি তারই মতো সংস্কারমুক্ত।–শহর-ইয়ারের কথা কিন্তু পরে হবে। এবারে সেই মারওয়াড়ি সজ্জনের কথা শুনুন। ….লসি সামনে আসতেই তার মুখ শুকিয়ে গেল। আমি বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি বললুম, না, না, আপনাকে খেতে হবে না। আপনি হয়তো যত্রতত্র পানাহার করেন না। সেটা তো কিছু মন্দ আচরণ নয়। আমিও তো বাড়ির বাইরে কোথাও খাইনে। তখন তিনি কী বললেন জানেন? তিনি নিরামিষাশী। আমি একটু আশ্চর্য হয়ে শুধালুম, লসি আবার আমিষ হয় কী প্রকারে? তিনি যা বললেন তার অর্থ একটা পশুর রক্তমাংস নিংড়ে যে নির্যাস বেরোয় সেটা সবচেয়ে কড়া আমিষ। তিনি খান– না, পান করেন সুদুমাত্র ডাবের জল। অন্য কোনও-কিছু খান না। সুন্দুমাত্র ডাবের জল খেয়ে লোকটি গত পঁচিশ বৎসর ধরে বেঁচে আছে!
আমি বললুম, এ ধরনের ডায়েটিং হয়, সে তো জানতুম না।
পীর বললেন, আপনি ভাবছেন, আমি পীর বনে গ্যাট হয়ে বসে আছি বলে আমার আর-কিছু জানবার নেই, শেখবার নেই! হাজার দফা ভুল! নিত্য নিত্য শিখছি। তার পর শুনুন বাকিটা। হঠাৎ, বলা নেই, কওয়া নেই, ভদ্রলোক দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে যা বললেন তার অর্থ, তাঁর ছেলেটা জাহান্নামে গেছে। মদমাংস মেয়েমানুষ নিয়ে অষ্টপ্রহর মেতে আছে। বুঝুন ব্যাপারটা, সৈয়দ সাহেব। যে-লোক মাছমাংস এমনকি দুধ পর্যন্ত না খেয়ে অজাতশত্রু হয়ে জীবনধারণ করতে চায়, তারই একমাত্র পুত্র হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে বড় শত্রু! তার পরিবারের শত্রু, তার বংশপরম্পরায় ঐতিহ্যের শত্র, পিতৃপিতামহের আচরিত ধর্মের শত্রু।
সর্বশেষে কাঁদতে কাঁদতে বললে, আমি নিশ্চয়ই পূর্বজন্মে কোনও পাপ করেছিলুম, তার জন্য আজ আমি এই শাস্তি পাচ্ছি। আপনি আমার ছেলের জন্য দোওয়া করুন।
বলুন তো, তার সঙ্গে তখন পূর্বজন্ম-পরজন্ম আলোচনা করে কী লাভ! আর দোওয়া তো আমি সকলের জন্যই করি, আপনিও করেন, কিন্তু আমি কি মিরাল করতে পারি?
তার পর পীর বেদনপীড়িত কণ্ঠে বললেন, কেন লোকে বিশ্বাস করে, আমি অলৌকিক কর্ম করতে সক্ষম!
পীরসাহেব অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে রইলেন বলে আমাকে বাধ্য হয়ে সে-নীরবতা ভঙ্গ করতে হল। বললুম, আপনাকে এসব ব্যাপারে আমার কিছু বলতে যাওয়া গোস্তাকি হবে। অপরাধ নেবেন না। তবু বলি, এসব লোক আসে আপনার কাছে ভক্তি-বিশ্বাসসহ। আপনি তাদের জন্য দোওয়া-আশীর্বাদ করলেই তারা পরিতৃপ্ত হয়।
পীর বললেন, ঠিক। আমি তাই মারওয়াড়িকে বললুম, আপনি শান্ত হোন। তার পর তাকে এই নামাজের ঘরে এনে দু জনাতে একাসনে বসে আল্লার কাছে। দোওয়া মালুম।
এর পর পীর একদম চুপ মেরে গেলেন বলে আমাকে বাধ্য হয়ে শুধাতে হল, তার পর কী হল?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, তার পর দীর্ঘ তিন মাস ধরে সে ভদ্রলোকের আর দর্শন নেই।
তার পর আমি শহর ইয়ারের মুখে খবর পেলুম, ছেলেটি নাকি সৎপথে ফিরে এসেছে, এবং সে-দ্রলোক আমাদের পাড়ার জরাজীর্ণ মসজিদটি নিদেন ত্রিশ হাজার টাকা খর্চা করে মেরামত করে দিয়েছেন। ঠিক ঠিক বলতে পারিনে, হয়তো আমি মুসলমান বলেই।
আচ্ছা এবারে বলুন তো, এর মধ্যে আমার কেরামতি– মিরাকল কী?
আমি আর কী বলি! কাকতালীয় হতে পারে, আল্লার অযাচিত অনুগ্রহ হতে পারে। কে জানে কী? আমি চুপ করে নিরুত্তর রইলুম।
পীরসাহেব তখন স্মিতহাস্য করে বললেন, শহর-ইয়ার কিন্তু তখন কী মন্তব্য করেছিল জানেন?
কিন্তু আমি অতশত নানাবিধ জিনিস আপনাকে বলছি কেন বলুন তো? ওইসব শত শত হরেক রকমের লোকের মাঝখানে এখানে এল শহর-ইয়ার।
কিন্তু আপনি একটু চিন্তা করবেন তো, শহুর-ইয়ার তখন কী মন্তব্য করেছিল?
খানিকক্ষণ চুপ থেকে পীরসাহেব বললেন, ভক্ত কবীরের কাছে কে কী চেয়েছিল, সে তো জানেন। আমি কবীর সাহেবের পদধূলি হবার মতো যোগ্যতাও ধরিনে, তবু আমারই কাছে কারা কী চায়, তার দুই প্রান্তের দুটি এক্সট্রিম উদাহরণ আপনাকে দিলুম।
আজ পর্যন্ত আমি যেসব পীরদের আস্তানায় ঘুরেছি, এবং আমার এই ডেরাতে যারা আসে, এদের ভিতর এমন একজনও দেখিনি যে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ দিল নিয়ে এসেছে। অবশ্য বেশকিছু লোক আসেন তথাকথিত শাস্ত্রালোচনা করতে। সে-ও এক বিলাস, ফ্যাশান। তা হোক। আল্লাপা কার জন্য কোন পথ স্থির করে দিয়েছেন, তার কী জানি আমি!
এরই মাঝখানে এল শহর-ইয়ার। এক মুহূর্তেই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, সে কোনও কামনা নিয়ে আসেনি। বিশ্বাস করবেন না, সে আজ পর্যন্ত একবারের মতোও আমার সঙ্গে শাস্ত্রালোচনা পর্যন্ত করেনি। এযাবৎ একটি প্রশ্নমাত্রও শুধোয়নি।
