পীরেরা ওড়েন না, কিন্তু ওঁদের চেলাদের, বিশেষ করে চেলীদের কেউ কেউ ওড়েন।
পীরহা নমিপরনদ, ওয়া লাকিল বাজি শাগিরাদান্ সখুসান জনানা মিপরন্দ।
এতে তাজ্জব বনবার মতো কীই-বা আছে? ঠাকুর রামকৃষ্ণ বিশ্বজয় করেননি কিন্তু তাঁর শিষ্য বাগ্মীরাজ বিবেকানন্দ করেছিলেন।
একজন নামাজ পড়ছেন, তার অনতিদূরে আরেকজন খাচ্ছে– এটা দৃষ্টিমধুর না হলেও ইসলামে বারণ নয়। হুঁঃ! বারণ হবে কেন? দূর-সম্পর্কের আমার ফুফুকে দেখেছি, বাচ্চার মুখে মাই তুলে দিয়ে তসবি-মালা জপ করতে।
আমি কোনওপ্রকারের শব্দ না করে মিনিমামতম পরোটা খাচ্ছি– যদ্যপি শহর-ইয়ারের আপন হাতে সযত্নে তৈরি (এটা ভুল বললুম, তাকে আমি অযত্বে কখনও কোনও কাজ করতে দেখিনি) খাস্তা, ক্রিসৃপ, মুরমুরে পরোটা মর্মর ধ্বনিবিবর্জিত কায়দায় খেতে পারাটা একটি মিনি-মিরা — এমন সময় আমার চিন্তাম্বরের একপ্রান্তে একটি বিদ্যুল্লেখা খেলে গেল।
ওহ্! তোমার আপন বাড়িতে আমি কী খাই না-খাই সে-বাবদে তুমি আমার যত না দেখ-ভাল করো তার চেয়ে এখানে তোমার হুশিয়ারি ঢের বেশি টনটনে। গুরুর বাড়ির ইজ্জত? না?
অভিমানভরে হাত-চলা বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আমার বিবেকাম্বরে আরেকটি সৎ বুদ্ধির বিদ্যুতা শাখা-প্রশাখা মেলে দিলঃ
আমি কী নেমকহারাম! মাত্র অর্ধদিবস, তার চেয়েও কম, হয়তো সম্পূর্ণ অজানায়, সে বাড়িতে ছিল না বলে আমি আমার পরিচিত পরিচর্যা পাইনি। আর সঙ্গে সঙ্গে বেবাক ভুলে গেলুম তার এতদিনের দিল-ঢালা খেদমত, প্রাণ-ভরা সেবা? ছিঃ! এ তো সেই প্রাচীন কাহিনীর নিত্যদিনের পুনরাবৃত্তি! যে-লোক একদা আমাকে হাতি দিয়েছে, ঘোড়া দিয়েছে, সে আজ বেড়ালটা দিল না বলে তনুহূর্তেই নিলাজ নেমকহারামের মতো তাবৎ অতীতের অকৃপণ দান ভুলে গিয়ে মার মার, কাট কাট হুহুঙ্কার ছেড়ে তার পশ্চাতে খাণ্ডার নিয়ে তাড়া করা!
তদুপরি আরেকটা রীতি-রেওয়াজ মনে পড়ল। যদিও আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই তবু বিশ্বস্তজনের কাছে শুনেছি, যে পীরের কিছুমাত্র সামর্থ্য আছে সেখানেই মহিলা-শিষ্যারা আপন হাতে রান্নাবান্না করে, নাশতা বানিয়ে সমাগত জনের সেবা করেন। এ রীতি তো অত্যন্ত স্বাভাবিক।
যে কাজ যারা উত্তমরূপে করতে পারে বিধাতা তাদেরই স্কন্ধে সে কাজ চাপান।
নইলে তিনি শেয়ালের কাঁধে দিতেন সিংহের কেশর, বেড়ালকে দিতেন হাতির শুঁড়।
শহর-ইয়ার যে বস্তু সবচেয়ে ভালো তৈরি করতে পারে সেইটেই করেছে।
মনে শান্তি পেলুম। পীর মিরাল করতে পারুন আর নাই-ই পারুন, বহু তৃষিত নরনারী শুষ্ক হৃদয় নিয়ে যেখানে ভক্তিভরে সমবেত হয়েছে সেখানে আল্লাতালা কিছু-না-কিছু শান্তির সুধাবারি বর্ষণ করবেনই করবেন!
এর সঙ্গে অবশ্য আরেকটি কথা যোগ দিতে হয়। শহর-ইয়ারকে আমি দিনে দিনে, এতদিনে যেভাবে হৃদয়ে গ্রহণ করেছি, তার পর তার যে কোনও আচরণ– সে আপাতদৃষ্টিতে যতই অপ্রিয় হোক– গ্রহণ করতে গোপনে গোপনে সে-হৃদয় সবসময়ই তৈরি। চোরাবাজারির চোরাই মাল নেবার জন্য কালোবাজারি যে রকম তৈরি থাকে।
প্রসন্ন মনে আবার হাত চালালুম। পরোটার অন্যপ্রান্ত চুরমুরুলুম।
.
অপরাহ্নের যে-আসরের নামাজ পীর পড়ছিলেন শাম্রাদেশে সেটি হ্রস্ব।
পীরসাহেব পনেরো মিনিটের ভিতর নামাজ শেষ করে উঠলেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। তিনি ঘরের এক কোণ থেকে একটা ভাজকরা ডেক চেয়ার টেনে এনে আমার সামনে সেটি পেতে বসলেন।
আমি চুপ করে আছি। যদিও একদা তিনি আমার সখা ছিলেন তবু তিনি আমার চেয়ে বয়সে বড়। বাক্যালাপ তিনিই আরম্ভ করবেন।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না; তিনিই বললেন, শহর-ইয়ারের কথা ভাবছি।
আমার মনে সেই প্রথম প্রশ্নের পুনরুদয় হল, তিনি জানলেন কী করে, আমি শহর-ইয়ারের সন্ধানে এখানে এসেছি? তবু চুপ করে রইলুম।
বললেন, আমার কাছে অনেক লোক আসে। মনে আছে আপনার, আমরা যখন একসঙ্গে বরোদাতে বাস করতুম তখন একদিন আপনি রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা আমাকে পড়ে শোনাচ্ছিলেন?–
ভক্ত কবীর সিদ্ধপুরুষ খ্যাতি রটিয়াছে দেশে।
কুটির তাহার ঘিরিয়া দাঁড়ালো লাখো নরনারী এসে।
কেহ কহে, মোর রোগ দূর করি মন্ত্র পড়িয়া দেহো,
সন্তান লাগি করে কাদাকাটি বন্ধ্যা রমণী কেহ।
কেহ বলে তব দৈব ক্ষমতা চক্ষে দেখাও মোরে,
কেহ কয় ভবে আছেন বিধাতা বুঝাও প্রমাণ করে।
রবীন্দ্রনাথ মহান কবি। তিনি মানুষের কামনা-বাসনার সংক্ষিপ্ত একটি ফিরিস্তির ব্যঞ্জনা দিয়ে বাকিটা বিদগ্ধ পাঠকের কল্পনাশক্তির ওপর বরাত দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু আমাকে তো কল্পনা করতে হয় না। মানুষের সম্ভব-অসম্ভব সব অভিলাষই আমাকে শুনতে হয়। বিশ্বাস করবেন কি, সৈয়দ সাহেব, জাল দলিলপত্র তৈরি করে, ভেজাল মোকদ্দমা রুজু করে আমার কাছে স্বেচ্ছায় অকপটে সেই কপটতা কবুল করে অনুরোধ জানায় আমি যদি তার জন্য সামান্য একটু দোওয়া করি তবে সে মোকদ্দমাটা জিতে যায়!
আমি বিস্ময় মেনে বললুম, সে কী?
ম্লান হাসির ইঙ্গিত দিয়ে পীর বললেন, উকিল, বৈদ্য আর পীরের কাছে কোনও কিছু লুকোতে নেই, এই হল এদের বিশ্বাস। বিশেষ করে পীরের কাছে তো নয়ই। কারণ তিনি নাকি দিব্যদৃষ্টি দিয়ে মনের গোপন কথা দেখতে পান। এক পীরসাহেব তো কোনও মেয়েছেলেকে সামনে আসতে দিতেন না, কারণ তাঁর আধ্যাত্মিক শ্যেনদৃষ্টি নাকি কাপড়জামা ভেদ করে সবকিছু দেখতে পায়।
