ততক্ষণে আমি সংবিতে ফিরেছি। আদব-মাফিক মাথা ঝুঁকিয়ে ওঁকে একটা সালাম জানিয়েছি। তিনি প্রত্যভিবাদন জানালেন। যদিও আমার শোনা ছিল, বহু পীর বহু গুরু প্রতিনমস্কার করেন না।
কারণ এত রবাহূত, অনাহূত এমনকি অবাঞ্ছিত জনও পীরের ঘরে সুবোশা আনাগোনা করে যে এক পলিটিশিয়ান ভিন্ন অন্য কোনও প্রাণীর সাধ্য নেই যে, প্রত্যেককে ব্যক্তিগত সালামালিক জানায়, বা শতংজীব বলে।
আস্তানায় গিয়েছিলুম বেলা প্রায় চারটার সময়। ওই সময় আসরের নামাজ বা অপরাহুঁকালীন উপাসনা আরম্ভ হয়। পীরসাহেব আসন ত্যাগ করে অন্য ঘরে চলে গেলেন অনুমান করলুম, নামাজ পড়তে। মুরিদান (শিষ্য সম্প্রদায়) পাশের মসজিদে নামাজ পড়তে রওনা হলেন। আমি কী করব, কী করব ভাবছি এমন সময় একজন গেরেমভারি চেলা এসে আমাকে কানে কানে বললেন, হুজুর আপনাকে তসলিমাৎ জানিয়েছেন। হুজুরের নামাজ-ঘরে একটুখানি আসবেন কি? যে সসম্ভ্রম-কণ্ঠে চেলাটি আমাকে দাওয়াত-সন্দেশটি জানালেন, তার থেকে অনায়াসে বুঝে গেলুম যে পীরের নামাজ-ঘর হোলি অব্ হোলিজ, সানথটুম-সানকটরুম, হিন্দু-মন্দিরের গর্ভগৃহপ্রায়। সেখানে প্রবেশাধিকার অল্পজনেরই। আর আমি প্রথম ধাক্কাতেই!
নামাজ-ঘরে ঢুকতেই পীর আমাকে আলিঙ্গন করলেন, তার পর ঘরের এক কোণে পাতা একখানি সিলেটি শেতল-পাটিতে আমাকে বলেন, নিজেও বসলেন। দু একটি কুশল প্রশ্ন শুধিয়ে বললেন, আপনি একটু নাশতা করুন। ততক্ষণে আমি নামাজটি সেরে নিই।
আমি বাধা দিয়ে বললুম, সে কী করে হয়? আপনি নামাজ সারুন। তার পর একসঙ্গে খাব।
অভিমানভরা কণ্ঠে পীর আমিন বললেন, এই তো আপনার সখার প্রতি ভালোবাসা, আর এই তো আপনার স্মৃতিশক্তি। আমি যে দিনে একবার খাই সে-ও ভুলে গেছেন?
আমি বেহদ শরম পেলুম। এটা আমার মনে রাখা উচিত ছিল। তাই লজ্জাটা ঢাকবার জন্যে সঙ্গে সঙ্গে আমার মতো মূখের মাথায়ও একটি মিথ্যা সদুত্তর জুটে গেল– নিছক আল্লার মেহেরবানিতেই বলতে হবে। কারণ আসমান-জমিনে কে না জানে, মা সরস্বতী মূর্খকেই (যথা কালিদাস) হরহামেশা দয়া করেন; নইলে চালাকরা নিশ্চয়ই এতদিনে আমার মতো কুল্লে বেওয়ারিশ বেকুবের সর্বস্ব গ্রাস করে, আমাদের সত্য নাশ করে আমাদের পিতামহাশয়দের নির্বংশ করত।
সেই কিস্মৎ-প্রসাদাৎ প্রাপ্ত কদুত্তরটি দিতে গিয়ে জড়িত কণ্ঠে বললুম, তা-তা-তা, সে-সে, সে তখন আপনি আপনি ছিলেন আমার গরিবখানায়।
পীরের কপালে যেন হালকা মেঘের সামান্য আবছা পড়েছে। তাই দেখে আমি থেমে গেলুম। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, আর এখন আমি পীর– না? এখন আমি যত খুশী গাণ্ডেপিণ্ডে গোগ্রাসে যত চাই তত গোস্ত গিলতে পারি না?
থেমে গেলেন। আমি আশঙ্কা করেছিলুম, এর পর তিনি আমাকে খোটা দিয়ে বলবেন, তাই আমি পীর হয়েছি– না? চেলাদের ঘাড় ভেঙে তাদের মগজ দিয়ে মুড়িঘণ্ট খাব বলে না?
না। এ লোকটি যে অতিশয় ভদ্র।
আমি চুপ করে গিয়েছি দেখে বললেন, ভাই সৈয়দ সাহেব, আমি জানি, আপনি খাঁটি পীরের নাতি। আপনি কথার মুখে কথায় কথায় ওটা বলে ফেলেছেন।
আমি খুশি হয়ে বললুম, আমি যে পীরের নাতি সেটা মেহেরবানি করে আর তুলবেন না, সেটা দয়া করে ভুলে যান। আপনি তো নিশ্চয়ই ভুলে যাননি ধর্মাবদে আমি একটা আস্ত চিনির বলদ। ওটা দেখেছি, শুঁকেছি, ওর দরদাম নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছি, কিন্তু ওটা ককখনও চাখিনি– খেয়ে দেখা তো দূরে।
তিনি বললেন, এসব কথা পরে হবে; কেন আমি এখানে আছি, কেন আমি পীর রূপে এখানে দর্শন দিচ্ছি–
ইতোমধ্যে সেই গেরেমভারি চেলা একটা বিরাট ট্রে নিয়ে এসে আমার পাশে রেখেছেন। তার উপর অতিশয় সযত্নে সাজানো দু খানি মুড়মুড়ে চেহারা তেকোনা পরোটা, গ্রেট ইস্টারনের পাঁউরুটির মতো ফোলানো টেবো-টেবো বিরাট একটি মমূলেট, ডুমো-ডুমো আলু-ভাজা, এবং কাঁচালঙ্কার আচার।
আমি আবার পেলুম দারুণ শক। এসব যা এসেছে এ তো আমার জন্য তৈরি করা শহর-ইয়ারের ফেভারেট মেনু!
এ তো আমাদের উভয়ের প্রিয় মেনু!
কী করে শহর-ইয়ার জানল, আমি এখানে এসেছি?
কিন্তু এ শকটা সামলাতে না-সামলাতে পেলুম এর চেয়ে মোক্ষমতর দুসরা শক্।
পীরসাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ, শহর-ইয়ার বানু। আর কিছু না বলে খাটে উঠে নামাজ পড়তে আরম্ভ করলেন।
.
১৭.
আমি মিরাকল বা অলৌকিক কাণ্ডকারখানায় বিশ্বাস করিনে। যে ইরান কর্তাভজা গিরিতে ভারতের সঙ্গে অনায়াসে পাল্লা দিতে পারে তারই এক গুণীজন হাফ-মশকরা করে বলেছেন :
পীরেরা ওড়েন না, ওঁদের চেলারা ওঁদেরকে ওড়ায়।
পীরহা নমিপরনদ, শাগিরদান উনহারা মিপরানদ।
বিশেষত, এই পীর আমিন সাহেবকে আমি অন্তরঙ্গভাবে একদা চিনেছিলুম। তিনি যে এরকম একটা বাজে স্টার্ট মারবেন– খাস করে আমার ওপর– যে, তিনি অলৌকিক প্রক্রিয়ায় ধরে ফেলেছেন, আমি শহর-ইয়ারের সন্ধানে এসেছি সেটা আমি বিশ্বাস করতে নারাজ। কাজেই সেকথা পরে জিগ্যেস করে জেনে নেব।
কিন্তু শহর-ইয়ার জানল কী করে যে আমি এখানে এসেছি?
সে নিজে পর্দা মানে না, কিন্তু পীরসাহেব যে তাঁর শিষ্যাদের সম্পর্কে কিছুটা মানেন সেটা দোতলার চিহ্ন, পর্দা থেকে খানিকটে অনুমান করেছিলুম। কিন্তু সেই চিকের আড়াল থেকে শহর-ইয়ার যে উঁকিঝুঁকি মারবে সেরকম মেয়ে তো সে নয়। বরঞ্চ আজকের মতো মেনে নিলুম, শহর-ইয়ার অলৌকিক শক্তির অধিকারিণী হয়েছে। আজ বাড়ি ফিরে যদি কথা ওঠে, তবে সেই ইরানি গুণীর হাফ-মশকরাকে ডবল প্রমোশন দিয়ে তাকে বলব–
