শহর-ইয়ারের হৃদয়-মন গড়ে দিয়েছেন বাঙালি রবীন্দ্রনাথ।
ধর্মক্ষেত্রে সে যখন অবতরণ করল তখন সে বরণ করেছে, বাঙালি পীর। বাঙালি পীরই তো বাঙালি রমণীর অভাব-অপরিপূর্ণতা বুঝতে পারবে সবচাইতে বেশি। শহর-ইয়ার পশ্চিমবাগে তাকায়নি।
এই পীরটির নাম অবশ্য তখনও তিনি পীর হননি– আমিনুর রশিদ মজুমদার। তিনি গুজরাতে এসেছিলেন মধ্যযুগের পীরদের আস্তানার সন্ধানে। কবীর, দাদু, জমাল কমাল, বুডট এদের অনেকেই তাদের হিন্দু-মুসলমান-সম্প্রীতিমূলক মতবাদ প্রচার করেন গুজরাতে। তদুপরি বরোদার অতি কাছেই নর্মদা নদী বয়ে যাচ্ছেন। হিমালয়ে প্রধানত থাকেন সাধু-সন্ন্যাসী। নর্মদার পারে পারে থাকেন পীর-ফকির সাধু-সন্ন্যাসী দুই সম্প্রদায়। স্বৰ্গত অরবিন্দ ঘোষ বরোদায় অধ্যাপনা করার সময় প্রতি শনি-সোম কাটাতেন নর্মদার পারে পারে উভয়ের সন্ধানে।
এই আমিন সাহেবের সঙ্গে আলাপ করে তখনই বুঝে গিয়েছিলুম যে, বিনয়তোষ সত্যই একটি সত্যান্বেষীকে বাড়িতে এনেছেন তাঁর চিন্তাধারা তাঁর অভিজ্ঞতা জানবার জন্য।
বিনয়তোষের ধর্মপত্নী ছিলেন ভূদেববাবুর আদর্শ ছাড়িয়েও প্রাচীনতরা হিন্দু-গৃহিণী। এদিকে পূজাআচ্চা ব্রত-উপবাসে পান থেকে চুন খসত না, ওদিকে দরিদ্রনারায়ণ অতিথিসেবার বেলা তিনি বিলকুল নিষ্পরোয়া মুচি-মোচরমান ডোমাড়ালের সেবা করে যেতেন। বিরাট কাঁসার থালায় তিনি আমিনুর রশিদ মিঞার সেবা করলেন।
বিনয়তোষের অনুরোধে তাঁর ওপেল গাড়িতে করে মিঞাকে তাঁর বাসস্থানে নিয়ে গেলুম। সেখানে গিয়ে দেখি, তিনি একটি নিমবস্তি অশান্ত অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছেন।
আমি একটু আবছাভাবে যেন ক্ষীণস্ফুট আত্মচিন্তা করলুম, এখানে আপনার অসুবিধা হচ্ছে না?
আমিন সাহেবের স্মিতহাস্যটি বড় মধুর এবং কিঞ্চিৎ রহস্যময়। বললেন, তেমন কী আর অসুবিধে। এদের অধিকাংশই মুসলমান। কাপড়ের মিলে কাজ করে। মদ খায়, জুয়ো খেলে আর বউকে ঠ্যাঙায়। কিন্তু আমার মতো বেকারের প্রতি তাদের স্নেহ আছে প্রচুর। তবে মাঝে মাঝে বড্ড বেশি চিৎকার হৈহুল্লোড়ের দরুন আমার কাজের একটু-আধটু অসুবিধে হয় বৈ কি!
আমি একটু আশ্চর্য হয়ে শুধিয়েছিলুম, আপনার কাজটা কী?
রশিদ সাহেব কোনও উত্তর দেননি। আমি অনুমান করলুম, তিনি যে শুধু নর্মদার পারে পারে তত্ত্বানুসন্ধান করছেন তাই নয়, খুব সম্ভব ধ্যানধারণা, জিতসৃবি, যোগাভ্যাস, সুফি-চিত্তবৃত্তি-নিরোধও করে থাকেন।
অতিশয় সবিনয় কিন্তু কিন্তু করে নিবেদন করলুম, আপনার যদি কোনও আপত্তি না থাকে তবে আমার বাড়িতে এসে থাকুন না।
কী দরকার! এই তো বেশ চলে যাচ্ছে। আপনাদের অসুবিধে হবে হয়তো।
আমি বললুম, আমি তো একা থাকি। মাত্র একটি পাঁচক আছে। তবে সে মাছ-মাংস ছোঁয় না। ফলে আমিও বাড়িতে নিরামিষাশী। আপনার একটু কষ্ট হবে। আর আমার দিন কাটে কলেজে। অপরাহূ আর রাত্রির এক যাম কাটাই আমার পার্শি সহকর্মী অধ্যাপক ওয়াডিয়ার বাড়িতে।
জানিনে, হয়তো এই নিরামিষের চ্যালেঞ্জ মৎস্যভুক বঙ্গসন্তানকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসে।
কিন্তু আমিন মিঞা যদিও মাঝে মাঝে আমাকে নর্মদার পীর-ফকির সাধুসন্ন্যাসীদের কাহিনী শোনাতেন তবু তিনি ছিলেন ঘোরতর সংসারী। প্রতি ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে পাঁচক ইন্দ্ররায়কে নিয়ে বেরুতেন বাজারে। কেনাকাটা সেরে বাড়ি ফিরে কুটনো কুটতেন, কয়লা ভাঙতেন, উনুন ধরাতেন আর ইন্দ্ররায়কে হাতেকলমে বাতলাতেন কী প্রকারে ছানার ডালনা, ধোকার ঝোল, বড়ির চচ্চড়ি তৈরি করতে হয়।
আমি অত বোকা নই। আমি বুঝে গিয়েছি, তিনি কারও স্কন্ধারোহণ করে মুফতে থাকতে চান না। বরং যদ্যপি আমি সংসার চালানো বাবদে একটা আস্ত অগা, তথাপি লক্ষ করলুম, চিরকুমারকে বিবাহ বাবদে উৎসাহিত করে লোকে যে বলে, টু ক্যান লিভ অ্যাজ চিপলি অ্যাজ ওয়ান–স্বামী-স্ত্রীর যা খরচা অবিবাহিত পুরুষেরও সেই খরচা সেটা কিছু মিথ্যে প্রলোভনকারী স্তোকবাক্য নয়। দু জনার খরচাতে তিনজনেরও চলে। তদুপরি তখন ছিল সস্তাকড়ির বাজার।
বড় আনন্দে বড় শান্তিতে কেটেছিল ওই ছ টি মাস। কখনও আমিন মিঞার ঘরে, কখন বিনয়তোষের বারান্দায়, কখনও ওয়াডিয়ার রকে আমাদের চার-জনাতে নানাপ্রকারের আলোচনা হত। সবচেয়ে মজার লাগত, বিনয়ভোষ তন্ত্রঘেঁষা, আমিন মিঞা ভক্তিমার্গের সুফি, আর বরোদা-আহমদাবাদ, সুরাট-বোম্বাইয়ের তাবজ্জন জানত, চার্বাকের পর সোহরাব ওয়াডিয়ার মতো পড় নাস্তিক কস্মিনকালেও ইহভুবনে অবতীর্ণ হননি।
.
তার পর একদিন আমাদের কাউকে, এমনকি তার জান-দিলের দোস্তো ইন্দ্ররায়কে ছায়ামাত্র আভাস-ইঙ্গিত না দিয়ে আমিন মিঞা এক গভীর দ্বিপ্রহর রাত্রে নিরুদ্দেশ। জানতুম, অনুসন্ধান বৃথা, তবু আমরা তিনজনাই মাঝে-মধ্যে সেটা করেছিলুম। কোনও ফল হয়নি।
তার পরিপূর্ণ ত্রিশ বৎসর পর আবার আমাদের চারি চক্ষে মিলন।
পীরও কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলেন; তবে পীর, পুলিশ, ব্যারিস্টার, ডাক্তার সংসারের এত শত বিচিত্র জিনিস দেখবার সুবিধে-কুবিধে পান যে তাঁদের অভিজ্ঞতার কেলাইডেসকোপ যত বিচিত্র প্যাটার্ন তৈরি করুক না কেন, এঁরা সংবিৎ হারান না। কোন বাকে কী ধন দেখাবে, কোনখানে কী দায় ঠেকাবে? এই অপ্রত্যাশিতের আশা। কবিদের পীর-পুলিশের নয়।
