বুঝলে, চেকের এ পিঠে সই করার প্রতি আমার অনীহা কেন?
এস্থলে বলে রাখাটা প্রয়োজন মনে করি যে, আমার যে কটি ইয়েমেন চেলা আছে, তারা সবাই তখন বলে, না, স্যার! আপনার দশ লাখ টাকা পাওয়ার কোনও প্রয়োজন নাই। ভগবান করুন, আপনার যেন চাকরি না জোটে। তাহা হইলে আপনি লেখনী বন্ধ করিবেন না। ফলস্বরূপ বঙ্গসাহিত্য শ্রীবৃদ্ধিশালী হইবেক, শনৈঃ শনৈঃ উন্নতিমার্গে উচ্চাশ্রমে প্রবেশ করিবেক।
কিন্তু শহর-ইয়ার এস্থলে সে-বুলি আওড়াল না। সে বুদ্ধিমতী মেয়ে। বিলক্ষণ জানে, আমার সাহিত্যসৃষ্টি সাম্প্রতিক যত মূল্যই ধরুক তার দীর্ঘস্থায়ী মূল্য না-ও থাকতে পারে।
তা সে যাই হোক, প্রকাশকের কাছে দরিদ্র লেখকের দু পাঁচ টাকার জন্য ধন্নে। দেওয়াটা সে বিতৃষ্ণার সঙ্গে শুনে যেত। তার সহানুভূতি ছিল লেখকের সঙ্গে।
তাই জানতুম সে আমাকে শুধাবে না, আমি টাকা পেলুম কি না।
.
ড্রাইভার যখন বঙ্কিম চাটুয্যে স্ট্রিটে পৌঁছল তখন তাকে বললুম, তুমি বাড়ি যাও, আমি ট্যাসি ধরে ফিরব। মা-জি পীরের বাড়ি যাবেন। গাড়িটার দরকার হবে।
কাঁচুমাচু হয়ে বললে, কিন্তক সায়েব যে বললেন, আমি আপনার জন্য গাড়িটা রাখি।
স্পষ্ট বুঝতে পারলুম, ড্রাইভারও শহর-ইয়ারের এই গুরু নিয়ে মাতামাতি পছন্দ করে না।
তাই দৃঢ় এবং মোলায়েম কণ্ঠে বললুম, না, ভাই, তুমি বাড়ি যাও।
ড্রাইভারকে শুধিয়েছিলুম, পীরের নাম-ঠিকানা কী?
ঘণ্টাখানেক পরে সেই উদ্দেশে রওনা দিলুম।
আমার এক মুসলমান চেলা একদিন আমাকে বলেছিল, সে নাকি তার এক ল্যাটাই-ভক্ত দোস্তের পাল্লায় পড়ে সেই দোস্তের পীর দর্শনে যায়। গিয়ে তাজ্জব মেনে দেখে, গুরু বসে আছেন একটা বিরাট হলের মাঝখানে। আর তাঁকে ঘিরে গোটা আষ্টেক ডপকী হুঁড়ি দাঁড়িয়ে। তাদের উত্তমাঙ্গে ব্লাউজ-চোলি নেই। ক্ষণে ক্ষণে শাড়ি খসে পড়ে গিয়ে বক্ষঃস্থল অনাবৃত করে দিচ্ছে। কেউ তখন শাড়ি তোলে, কেউ তোলে না। আর গুরু বলছেন, এই দেখো, আমি চতুর্দিকে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছি, কিন্তু আমার ঘি গলছে না।
আমি ভেবেছিলুম, অতখানি না হলেও অনেকটা ওই রকমেরই হবে। শহর-ইয়ার নিশ্চয়ই কোনও বুজরুক শার্লাটেনের পাল্লায় পড়েছে।
বিরাট গৃহে বসে আছেন পীরসাহেব। আমি তার দিকে তাকিয়ে হতভম্ব।
পীরটি তো আমার প্রাচীন দিনের বন্ধু আমিনুর রশিদ মজুমদার!!
.
১৬.
আমি স্তম্ভিত।
আমি বেকুবের মতো বাক্যহারা। এমনকি পীরসাহেবকে সেলামটা পর্যন্ত করতে ভুলে গিয়েছি। পীর মানি আর না-ই মানি, স্বেচ্ছায় পীরের আস্তানায় গিয়ে তাকে সেলামটা পর্যন্ত করলুম না, এতখানি বেয়াদব, বেতমিজ মস্তান আমি নই।
বাড়িটা খুঁজে বের করতে আমার কিছুমাত্র অসুবিধা হয়নি। পার্ক সার্কাস আমার চেনা পাড়া। পীরমুর্শিদরা সচরাচর এ পাড়াতেই আস্তানা গাড়েন। আমার এক পুত্রবৎ সখা মুসলমান ছেলে, কচিবাবু যে আমাকে একদিন বলেছিল, ওই পীরসাহেবের কথা, গিয়ে দেখেছিল পীরসাহেবের চতুর্দিক গোটা আষ্টেক খাপসুরত ডপকী হুরী তার চতুর্দিকে তাঁকে ঘিরে বসে আছে। আর তিনি নাকি ক্ষণে ক্ষণে উদ্বাহু হয়ে বলছেন, এই দেখ, এই দেখ, আমার চতুর্দিকে আমি আগুন জ্বালিয়ে রেখেছি, কিন্তু আমার ঘি গলছে না, আমার ঘি গলছে না। কচিবাবু নাকি এক্কেবারে বেবাক নির্বাক হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল।
আমি কিন্তু সেভাবে হতভম্ব হইনি।
সিঁড়ি দিয়ে উঠবার সময় মনে হয়েছিল, একতলাতে বাড়ির মালিক সপরিবার বাস করেন, দোতলাতে পর্দা চিক ঝিলিমিলির প্রাচুর্য থেকে অনুমান করলুম, এখানে পীরসাহেবের শিষ্যরা আলাদাভাবে থাকেন, আসেন।
তেতলায় যে ঘরে পীরসাহেব বসে আছেন সেটি অনাড়ম্বর। খানচারেক তক্তপোশ মিলিয়ে একটি ফরাশ। পীরসাহেব ছোট্ট একটি তাকিয়াতে হেলান দিয়ে ওই তক্তপোশেই উপবিষ্ট কয়েকজন শিষ্যকে কী-একখানা চটিবই থেকে পড়ে শোনাচ্ছেন।
তক্তপোশের এ পারে কয়েকখানি চামড়ামোড়া আরাম-কেদারা।
এসবেতে হতভম্ব হবার মতো কিছু নেই।
পীরসাহেবের চতুর্দিকে ঘি-গলানেউল্লী অষ্টরমণী নেই, এমনকি চিত্রে খ্রিস্টান সেন্টদের মস্তকের চতুর্দিকে যে হেলো বা জ্যোতিঃচক্র থাকে সেটি পর্যন্ত তার মস্তক ঘিরে নেই।
লৌকিক, অলৌকিক, কুলৌকিক কোনও কিছুই নেই। অত্যন্ত সাদামাটা পরিস্থিতি।
আমি স্তম্ভিত হলুম পীরসাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমি আন্দেশা করেছিলুম, দেখতে পাব এক বুজরুক, ভণ্ড, শার্লাটেন। আমারই ভুল, আমারই বোঝা উচিত ছিল, শহর-ইয়ার এরকম কাঁচা মেয়ে নয় যে বুজরুকি দেখে বানচাল হবে।
আমি অবাক, এই পীরটি আমার সাতিশয় পরিচিত জন।
বছর পঁচিশেক পূর্বে এর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় স্বর্গত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর খ্যাতনামা পুত্র, পণ্ডিত বিনয়তোষ ভট্টাচার্যের বাড়িতে বরদায়; বিনয়তোষ ও আমি তখন বরোদাতে সরকারি কর্ম করি। পীর খাঁটি বাঙালি মুসলমান।
শহর-ইয়ারকে মনে মনে পুনরায় সানন্দ নমস্কার জানালুম। বাঙালি মাত্রই কি হিন্দু, কি মুসলমান হরকত তাকিয়ে থাকে পশ্চিমবাগে। কনৌজের ব্রাহ্মণগুরু, দিল্লির মুসলমান পীর এরা যেন এই পাপ বঙ্গদেশে আসেন পশ্চিমের কোনও-এক পুণ্যলোক থেকে। একমাত্র কাবুলে দেখেছি, সেখানকার হাজার ষাটেক হিন্দু পুববাগে তাকায়, কারণ পশ্চিমবাগে তো আর কোনও হিন্দু নেই। তাই প্রতি দু তিন বৎসর অন্তর তাদের এক গুরু আসেন বৃন্দাবন থেকে। তাদের মন্ত্র নেওয়া প্রাচ্চিত্তির-ফিত্তির করা বছর দুয়েকের জন্য বন্ধ থাকে।
