ডেপুটেশন ডিনারের পর কফি-লিকোর খেতে খেতে অতিশয় যুক্তিসম্মত পদ্ধতিতে, তাদের সমস্ত ধার, সমস্ত ভার, লেওনের স্কন্ধে নামিয়ে কী সব উপদেশ দিয়েছিলেন, কী সব অনুনয়বিনয় করেছিলেন তার কোনও প্রতিবেদন বা রিপোর্ট নেই, তবে আমি কল্পনা-রাজ্যে উড্ডীন হয়ে কিছুটা অনুমান করতে পারি। কিন্তু আমার অনুমানে কী যায় আসে! এ যে এক বিরাট ট্র্যাজেডি। এ তো শুধু দুটি নরনারীর ব্যক্তিগত মান-অভিমান বিরহ-মিলন এবং সর্বশেষে অন্তহীন বিচ্ছেদের কাহিনী নয়– যেটা হর-আকছারই হচ্ছে এখানে যে তার বাড়া রয়েছে, অকস্মাৎ অকালে একটি প্রজ্ঞাপ্রদীপের অন্ধকারে নিলয়। শুধু পণ্ডিতজন না, ইউরোপের বহু সাধারণ জনও আশা করেছিল, লেওনের আন্নালির জ্যোতি ইসলাম-ইতিহাসের বহু অন্ধকার গুহাগহ্বর প্রদীপ্ত করে তুলবে– কারণ লেওনে লিখতেন অতিশয় সাদামাটা সরল ইতালীয় ভাষা।
ডেপুটেশনের সর্ব বক্তব্য লেওনে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও মনোযোগের সঙ্গে শুনে বললেন, কয়েকদিন চিন্তা করে তিনি ডেপুটেশনকে তাঁর শেষ মীমাংসা জানাবেন।
ডেপুটেশন দেশে ফিরে গেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও তারা লেওনের তরফ থেকে কোনও চিঠি পাননি।
লেওনে কাএতনি তাঁর খোলস দেহটি ত্যাগ করে ইহলোক ছাড়েন ক্যানাডাতেই, খ্রিস্ট জন্মদিবসে, বড়দিনে, ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর জন্ম রোম শহরে ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে। আমার গুরু আমাকে এ কাহিনীটি বলেন লেওনের মরজগৎ ত্যাগ করার প্রায় এক বৎসর পূর্বে।
যুদ্ধে মিসিং জওয়ানের মা যেরকম বছরের পর বছর নিস্তব্ধ, সহিষ্ণু প্রতীক্ষা করে, তার দুলাল একদিন নিশ্চয়ই ফিরে আসবে, আমার গুরু আরবি শাস্ত্রে অতুলনীয় পণ্ডিত, স্নেহময়ী মাতার ন্যায় বহু বৎসর ধরে প্রতীক্ষা করতেন, লেওনে একদিন আবার তাঁর ক্যানাডার অরণ্যানীর বনবাস ত্যাগ করে ফিরে আসবেন তাঁর মাতৃভূমি ইতালিতে। তার পর অধ্যাপক গুনগুন করে যেন আপন মনে বলতেন, লেওনের মতো এরকম স্পর্শকাতর লোক কি আমৃত্যু বিদেশ-বিভুঁইয়ে পড়ে থাকবে? নাঃ, হতেই পারে না। সে নিশ্চয়ই মৃত্যুর পূর্বে রোমে ফিরে আসবে। যাতে করে তার হাড়িগুলো তার মায়ের হাড়িগুলোর পাশে শেষ-শয্যায় শয়ন করা হয়। কিন্তু আমার গুরুর এ দূরাকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়নি।
ততক্ষণে ডাক্তার আবার খানিকটে সংবিদে ফিরে এসে কী যেন শুধাচ্ছে। আমি ঈষৎ উত্তপ্ত কণ্ঠে বললুম, ব্যস, আমরা মেডিকেল কলেজে পৌঁছে গিয়েছি। এবারে আমি পাবলিশার্সদের কাছে যাচ্ছি।
মনে মনে বললুম, বুদ্বুটা এখনও যদি না বোঝে আমি কোনদিকে নল চালাচ্ছি, তবে ঝকমারি, ঝকমারি, হাজার বার ঝকমারি।
১৫. প্রকাশকদের সঙ্গে দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা
১৫.
প্রকাশকদের সঙ্গে আমার দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা এস্থলে অবান্তর।
তবে এস্থলে এ বাবদে একটি কথা বলতে হয়। শহর-ইয়ারদের বিস্তর টাকাকড়ি। আমার অর্থাভাব সে ভালোভাবেই বুঝত, কিন্তু বুদ্ধিমতী রমণী বলে আরও জানত আমাকে কোনওপ্রকারের সাহায্য করতে চাইলে আমার আত্মাভিমানে লাগবে।
একদিন তাকে ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিলুম, আমি জীবনে সাতবার না আটবার কবার চাকরি রিজাইন দিয়েছি বলতে পারব না। কারও সঙ্গে আমার বনে না। যখন চাকরিতে থাকি, তখন সাহিত্য-সৃষ্টির কোনও কথাই ওঠে না। মাইনের টাকা তো আসছে, বই লেখার কী প্রয়োজন? চাকরি যখন থাকে না, তখন পঞ্চতন্ত্র, শন এসব আবোলতাবোল লিখতে হয়।
শহর-ইয়ার তাজ্জব হয়ে শুধিয়েছিল, আপনি শুধু টাকার জন্য লেখেন!
আমি বলেছিলাম, এগজ্যাকটলি! মোস্ট সানেলি!
তার পর বলেছিলুম, জানো শহর-ইয়ার, এ বাবদে অন্তহীন সাহিত্যাকাশে আমিই একমাত্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তারকা নই। মহা মহা গ্রহ-উপগ্রহও ওই একই নভোমণ্ডলে বিরাজ করার সময় বলেছেন, লজ্জাঘৃণাভয় অনায়াসে তাচ্ছিল্য করে বলেছেন, কথাগুলো আমার ঠিক ঠিক মনে নেই, তবে মোদ্দা কথা এই, না বাট এ ফুল রাইটস একসেপ্ট ফর মানি অর্থাৎ অর্থাগম ভিন্ন অন্য কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে লেখে শুধু গাড়োলরাই। স্বয়ং ডক্টর জনসন বলেছেন, আমি লিখি টাকার জন্য! বুঝলে ইয়ার, শহর-ইয়ার?
ঈষৎ ভ্রুকুঞ্চন করে শহর-ইয়ার শুধিয়েছিল, আচ্ছা, কাল যদি আপনি দশ লক্ষ টাকার লটারি জিতে যান তবে কী করবেন? (আমি জানতুম ডাক্তারের জমিদারি, কলকাতার গণ্ডা গণ্ডা বাড়ি থেকে প্রতি মাসে ওদের দশ-পনেরো হাজার টাকা আমদানি হয়, আর ব্যাংকে আছে দশ-পঁচিশ লাখ)।
আমি সোল্লাসে বললুম, দশ লাখ? পাঁচ লাখ পেলেই আমার কাজ হাসিল। সঙ্গে সঙ্গে কালি কলম কাগজ পুড়িয়ে দিয়ে বলব, বাঁচলুম। এখন থেকে লিখব শুধু প্রেমপত্র, আর, আর চেকের উল্টো দিকে নামসই।
শহর-ইয়ার টাকাকড়ি বাবদে বড়ই অনভিজ্ঞা। শুধাল, চেকের উল্টো-পিঠে সই, তার অর্থ কী? আমি লক্ষ করলুম, প্রেমপত্র নিয়ে সে কোনও প্রশ্ন শুধাল না। আর চেকফেক তো তার স্বামীর নায়েব সই করে। সে-সব জিনিস তার জানার কথা নয়।
বললুম, চেকের উল্টোপিঠে সই, মানে সে-টাকা আমি পাব। আর এ পিঠে সই, তার মানে টাকাটা আমাকে দিতে হচ্ছে। জানো না, দিশি ছড়া :
হরি হে রাজা করো, রাজা করো।
যার ধারি তারে মারো ॥
যার ধারি দু চার আনা,
তারে করো দিন-কানা।
যার ধারি দুশ চারশ
তারে করো নির্বংশ ॥
