হঠাৎ এক সকালে লেওনে ব্রেকফাস্ট খেতে এসে দেখেন, তাঁর প্লেটের উপর ছোট্ট একটি চিরকুট।
এবং ইতোমধ্যে তাঁর মতো আপন-ভোলা লোকও লক্ষ করলেন, যে-বউ সদাসর্বদা তার ব্রেকফাস্ট তৈরি করে দিত, সে-ও সেখানে নেই।
চিরকুটটি খুলে পড়লেন, আমি তোমার ভবন পরিত্যাগ করলুম। অপরাধ নিয়ো না।
ডাক্তার হতভম্ব।
তার পর রাম-গবেটের মতো ভোলাতে ভোলাতে যা শুধাল তার বিগলিতাৰ্থ, এরকম একটি সর্বগুণসম্পন্না মহিলা যিনি তার আপন দয়িতের পরিপূর্ণ আত্মনিবেদন পেয়েছেন, তাঁকে ত্যাগ করে চলে গেলেন।
আবার নতুন করে বুঝতে পারলুম, আমাদের এই মাইডিয়ার লার্নেড় ডাক্তারটি হয়তো তার চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞানপ্রসাদাৎ মড়াকে জ্যান্ত করতে পারেন, কিন্তু জ্যান্ত লোক যে দৈহিক মৃত্যু ভিন্ন অন্য নানাভাবে মরতে পারে– কএস যেরকম লায়লিকে ভালোবেসে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়ে লোকমুখে প্রচারিত মজনুন (যার স্কন্ধে জিন্ = ভূত চেপেছে) উপাধি পান– এ সবের কোনও এনট্রি তাঁর জীবনের খাতাতে নেই। তার কাছে সবকিছুই সরল সিলজিমে প্রকাশ করা যায় :
ডাক্তার শহর-ইয়ারকে সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করেছেন।
শহর-ইয়ার ডাক্তারকে সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করেছে।
অতএব এদের মধ্যে কোনও বিচ্ছেদ আসতে পারে না।
কিউ ই ডি!!!
প্রভু যিশু নাকি বলেছেন, শুধু রুটি খেয়েই মানুষ বাঁচে না, ঠিক তেমনি বলা যেতে পারে দাম্পত্যজীবনে শুধু প্রেম দিয়েই পেট ভরে না।
কিন্তু এসব তত্ত্বকথা ডাক্তারকে এখন বলে আর কী লাভ? মেঘে মেঘে যে বেলা হয়ে গিয়েছে।
বললুম, ডাক্তার, আমাকে অনেকেই শুধায় বিশেষ করে আমার মস্তান চেলারা শুধায়, কোন দেশের রমণী আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। কী প্রশ্ন! আমি কি দেশে দেশে কান্তা, দেশে দেশে প্রিয়া করে বেড়িয়েছি না কি যে, এর পাকি উত্তর দেব! তবে নিতান্ত হাইকোর্ট মাত্রই দেখিনি বলে চোখ-কান খোলা ছিল। এবং লক্ষ করেছি, স্পেন আর ইতালির মেয়েরা হয় তেজি আর স্বামী হোক প্রেমিক হোক, তার ওপর যে হক বর্তায় সে সম্বন্ধে তাদের জ্ঞানটি হয় খুবই টনটনে ভয়ঙ্কর জেলাস। অভিমান শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ নেই, ইতালি ভাষায়ও খুব সম্ভব নেই। তবু ইতালির নিম্নশ্রেণিতে হিংসুটে রমণী প্রতি গলিতে গণ্ডায় গণ্ডায়, আর ভদ্রসমাজে অভিমানিনীরা অভিমানের চূড়ান্তে পৌঁছে আত্মহত্যাতে বোধ করি জাপানিদের হার মানায়। কাএতানির বউ এক অর্থে আত্মহত্যাই করলেন, এবং করলেন একটি জলজ্যান্ত খুন। কিন্তু এহ বাহ্য।
লেওনের মনে এর কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সে-সম্বন্ধে সবিস্তর সংবাদ কেউই দিতে পারেনি। তবে তার পরবর্তী আচরণ থেকে এ সম্বন্ধে কিছুটা অনুমান করা যায়।
আন্নালির দশাংশের একাংশ তখনও শেষ হয়নি।
তার পর একদিন লেওনে ইতালি থেকে উধাও। কেউ জানে না কোথায় গেছেন।
তার কিছুদিন পরে খবর এল লেওনে তার বিরাট জমিদারি বিষয়-সম্পত্তি বিক্রি করে চলে গেছেন দূরের চেয়ে দূর সুদূর ক্যানাডায়। সেখানে সামান্য জমি-জমাসহ একটি কুটির খরিদ করেছেন। বনের ভিতর।
সেখানে দিন কাটান কী করে?
সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি জলের ধারে, বঁড়শি ফেলে।
কে জানে মাছ ধরা পড়ত কি না।
আর তার হাজার হাজার বই– অন্তত ত্রিশটি ভাষায়– যার ওপর নির্ভর করে, যেসব ইট-সুরকি দিয়ে তিনি তাঁর আন্নালি কুত্ত্বমিনার গড়ে তুলেছিলেন?
জানিনে। কিন্তু এ কথা জানি, তিনি ক্যানাডা যাবার সময় একখানা বইও সঙ্গে নিয়ে যাননি।
ডাক্তার বললেন, সে কী কথা? তাঁর সমস্ত সাধনা বিসর্জন দিলেন?
তাই তো বললুম, লেওনের বউ তাকে ছেড়ে যাবার সময় খুন করে গেলেন, পণ্ডিত লেওনেকে। আর যেহেতুক পণ্ডিত লেওনেই ছিলেন লেওনের চোদ্দ আনা সত্তা তাই বলা যেতে পারে, তিনি লেওনেকেই খুন করলেন।
তিনি যেন যাবার সময় বলে গেলেন, আন্নালিই যদি তোমার আরাধ্য দেবী হন, তবে আমার স্থান কোথায়?
লেওনে যেন উত্তরে বললেন, তুমিই ছিলে আমার জীবনের আরাধ্যা। আন্নালি নয়। প্রমাণ? সেই অসমাপ্ত আন্নালি-প্রতিমাকে ভেঙে চুরমার করে চললুম, নিরুদ্দেশে।
এবং আমার মনে হয়, লেওনে যেন পত্নীর উদ্দেশে বলতে চেয়েছিলেন, তুমি রোমান সমাজের উচ্চশিক্ষিতা রমণী হয়েও বুঝতে পারলে না, আমি কাকে কোন জিনিসকে কতখানি মূল্য দিই!
এ কাহিনীর সমাপ্তি এখানেই নয়।
লেওনে কিন্তু তার তাবৎ পাণ্ডুলিপি বিনষ্ট করতে পারেননি বা তার সেদিকে হুঁশ ছিল না। কাজেই দশ-দশ বিরাট ভলুমে বেরুল তাঁর আন্নালির অতিশয় অসমাপ্ত অংশ। আরবি প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণবরা সেটিকে রাজমুকুটের কুহ্-ই-নূরের মতো সম্মান দেন।
সঙ্গে সঙ্গে প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণবরা আন্দেশা করতে লাগলেন, লেওনেকে কী করে সেই পাণ্ডববর্জিত ক্যানাডা থেকে ফিরিয়ে এনে পুনরায় তাকে সুস্থ স্বাভাবিক করা যায়– তাতে করে অন্তত তিনি তাঁর আন্নালি সমাপ্ত করে যান।
এক প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণবদের সাধারণ সম্মেলনের পর পণ্ডিতরা গোপন বৈঠকে বসে স্থির করলেন কয়েকজন সমঝদার গেরেম্ভারি বৃদ্ধ পণ্ডিতকে পাঠাতে হবে, ডেপুটেশন, লেওনের কাছে। এঁদের সবাইকে বিনয়ী লেওনে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। এঁরা আপন আপন খরচে পৌঁছলেন, পৃথিবীর সেই সুদূর অন্য প্রান্তে ক্যানাডার ভ্যানকুভারে– বিন নোটিশে। লেওনে সবাইকে তার সরল অনাড়ম্বর কায়দায় অভ্যর্থনা জানালেন।
