পরপর দু খানি অত্যুত্তম গ্রন্থ প্রকাশ করে তিনি ইয়োরোপ তথা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ভূখণ্ডে নব শমসু–উলেমা (জ্ঞান-ভাস্কর) রূপে আন্তরিক অভ্যর্থনা ও অকুণ্ঠ প্রশস্তি লাভ করলেন। তখন তিনি স্থির করলেন, এসব উটকো বই না লিখে তিনি তাঁর সম্পূর্ণ জীবন নিয়োজিত করবেন ইসলামের একখানা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করাতে। বিদ্বজ্জন সোল্লাসে হর্ষধ্বনি তথা সাধুবাদ প্রকাশ করলেন।
ইতোমধ্যে লক্ষ করলুম, মেডিকেল কলেজ আর বেশি দূরে নয়। বললুম, এবার আমি আমার মোদ্দা কথাতে চলে এসেছি।
রাজপরিবারের অংশবিশেষ, অসাধারণ সুপুরুষ, সঙ্গীতচিত্রভাস্কর্য ইত্যাদির সক্রিয় সমঝদার কাএতানি প্রেমাবদ্ধ হলেন এক পরমা সুন্দরী, সর্বগুণান্বিতা রোমান রমণীর সঙ্গে। সৌভাগ্যক্রমে প্রেমটি হল উভয়ত ও গভীরতম।
বিবাহ হয়ে গেল। তাবৎ ইতালি এককণ্ঠে বললে, তাদের দেশের নীলাম্বুজের ন্যায় গভীর নীলাকাশের সঙ্গে চক্রবালবিস্তৃত ইন্দ্রধনুর এহেন পূর্ণাঙ্গ আলিঙ্গন ইতোপূর্বে তাদের এবং সর্ববিশ্বপূজ্য রোমেও জুলিয়েতের প্রেমভূমিতেও হয়নি।
তার পর আমাদের লেওনে– নরসিংহ ডুব দিলেন তার ইসলামের ইতিহাস –তার আন্নালি বা অ্যানালস্ গ্রন্থে।
বউ এসে বললেন, ওগো, শুনছো, কাল সন্ধ্যায় আমাদেরই তসকানিনি আসছেন সঙ্গীত পরিচালনা করতে। ওই দেখো টিকিট পাঠিয়েছেন। অন্য লোকে হন্যে হয়ে ধন্না দিচ্ছে সুন্ধুমাত্র ওঁর দর্শন পাবার জন্য।
লেওনের মুখ বিবর্ণ। অপরাধীর মতো বললেন, কিন্তু আমার আন্নালি– এ অধ্যায়টা শেষ না করে– আচ্ছা, কাল দেখব।
কিন্তু কাল ও সেই দেখবটা দেখা হয়ে উঠল না। লেওনে ডুব মেরেছেন আন্নালির গভীর অরণ্যে।
তার পর এলেন দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ টেনর গাওয়াইয়া কারুজো। ফল তদ্বৎ।
মাঝে মাঝে বলতেন, তা তুমি, ডার্লিং (দিলেত্তো), দিনোর সঙ্গে যাও না কেন? সে তো সর্বসঙ্গীতে আমার চেয়ে ঢের ঢের বেশি সমঝদার। আমার আন্নালি–
বউ ঠোঁট চেপে বললেন, দিনো তার প্যতিত আমির (প্রিয়া বান্ধবী-র) সঙ্গে যাচ্ছে।
আকাশপানে হানি যুগল ভুরু লেওনে অবাক হয়ে শুধোলেন, সে কী? দিনোর তো সুন্দরী বউ রয়েছে। এই হালেই বিয়ে করেছে। এরই মধ্যে প্যতিত আমি?
যা শুনেছি, তারই স্মরণে যতটুকু মনে আসছে তাই বলছি, বউ নাকি ঠোঁট দুটি আরও কঠিনভাবে চেপে চলে যাচ্ছিল–
লেওনে তোলাতে তোলাতে তিনি ছিলেন লক্ষ্মীট্যারার মতো অতিশয় যৎকিঞ্চিৎ লক্ষ্মী-তোলা– বললেন, কিন্তু, কিন্তু ডার্লিং, আমার আন্নালি, আ
আন্নালি, আন্নালি– আবার সেই আন্নালি।
প্রেমিক, রসিক, ললিতকলার বিদগ্ধ সমঝদার লেওনে এখন হয়ে গিয়েছেন সুদ্ধমাত্র পণ্ডিত। পণ্ডিতেরও বউ থাকে। কিন্তু এ স্থলে লেওনের একটি প্যতিত আমি তার হৃদয়াসন জুড়ে বসে গেছেন। আন্নালি।
লেওনে যে তার বউকে সর্ব হৃদয় দিয়ে ভালোবেসে তার পদপ্রান্তে তার সর্বাত্মা নিবেদন করেছেন এ তত্ত্ব তাইবেরিয়া রোমবাসী জেনে গিয়েছে। বস্তুত লেডিকিলার রোমান নটবররা তখন ফিসফিস্ গুজগুজ করতে আরম্ভ করেছে, লেওনেটা একটা স্ত্রৈণ, ভেড়য়া ভাড়য়া (পূর্ববঙ্গের ভাষায় বউয়ের দেওয়া ভাত না পেলে যে ক্লীবের দিন গোজরান হয় না), আস্ত একটা নপুংসক।
এদিকে লেওনে তাঁর সর্বসত্তা স্ত্রীর কাছে নিবেদন করে নিশ্চিন্ত। তার দেবী যে তার আন্নালিকে তার সপত্নী, তার প্যতিত আমি রূপে কস্মিনকালেও ধরে নিতে পারে সেটা তার সুদূরতম কল্পনারও বাইরে। কিন্তু ডাক্তার, এই দ্বন্দ্ব জগতে কত ঢপবেটপেরই না সতীন হয়। সেই যে হিংসুটে দ্বিতীয়পক্ষ দেখল তার স্বামী একটা মড়ার খুলি বেড়ার কঞ্চির উপরে রাখছে, সঙ্গে সঙ্গে মীমাংসা করে ফেলল, এটা নিশ্চয়ই তার মৃত সপত্নী সীমন্তিনীর সীমন্ত-বহনকারী মস্তকের খুলি! তাই না মিনষের পরানে এত সোহাগের বান জেগেছে! দাঁড়াও, দেখাচ্ছি। তনুহর্তেই না, বরঞ্চ বলব– তনুহূর্তেরও তিন মিনিট আগে, রাষ্ট্রভাষায় যাকে বলে ফৌরনকে পাঁচ মিনট পেহলে, সেই খুলিটা ফেলে দিল বাড়ির পিছনের বিষ্ঠাকুণ্ডে। সে কেচ্ছা থাক, ডাক্তার, এ বাবদে আমি বিস্তর গবেষণা করেছি– সুবিধে-কুবিধে মতো কোনও এক সময়ে সেটা হবে। শুধু একটি আপ্তবাক্য বলি, এ দেশের হরিপদ কেরানি যে তার কুল্লে জীবনের দশটা-পাঁচটা বেচে দিয়েছে তার জন্য তার বউ খেদ করে না। কিন্তু বাবদ-বাকি ষোল-সতেরো ঘন্টা সেই পদী-বউ হয়ে যায় রাজরাজ্যেশ্বরী পট্টমহিষী রানি পদ্মিনী পদ্মাবতী — শাহ-ই-শাহ বাদশা আলাউদ্দীনও সেখানে ইতর জন।
আমাদের পণ্ডিত লেওনে একটি আস্ত মূর্খ।
এই সামান্য তত্ত্বটুকু পর্যন্ত জানেন না, গভীর, উভয়পাক্ষিক প্রেমের পর, বিয়ে হওয়ার পরও অনেক কিছু করার থাকে। সেগুলো অতি ছোটখাটো জিনিস। কিন্তু ছোট হলেই কি ছোট জিনিস সর্বাবস্থাতেই ছোট, বড় জিনিস বড়? পিপীলিকা অতিশয় ক্ষুদ্র প্রাণী; হাতি বৃহত্তম। চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু বানানের বেলা? সেখানে পিপীলিকার বানান ঢের বেশি শক্ত হাতির তুলনায়।
লেওনে মূর্খ। তিনি বুঝতে পারেননি, এসব ছোটখাটো অনেক ব্যাপার আছে। বউকে কনসার্টে নিয়ে যাওয়া, তার জন্মদিন বা নামকরণ দিন স্মরণে রেখে ভালোমন্দ কিছু-একটা সওগাত নিয়ে আসা, বিবাহের বর্ষাবর্তনের দিন হৈ-হুঁল্লোড় করে বন্ধুবান্ধবকে নিমন্ত্রণ করে উত্তমরূপে সমাধান করা– এসব কিছুই লেওনের স্মৃতিতে আসে না। আন্নালির গভীর গর্ভে এসব জিনিস ডুবে গিয়ে সম্পূর্ণ নিরুদ্দেশ।
