ডাক্তার নিম-সম্মতি জানিয়ে বললেন, এ গাড়ি আমি অতি অবশ্যই স্ক্রেপরূপে বিক্রি করব না। তাকে তার আপন গারাজচ্যুতও করব না। এবং নিশ্চয়ই রাখব নিত্য রানিং অর্ডারে, আপনার ভাষায় স্বতশ্চলাবস্থায়।
আমি প্রসন্ন বদনে বললুম, আর আপনার নাতি সেটি চড়ে ভিনটেজ কার রেসে নামবে।
বলতে পারব না, হয়তো আমার দৃষ্টিভ্রম– কিন্তু আমার যেন মনে হল ডাক্তার অন্যদিকে অতি সামান্য মুখ ফেরালেন।
আমি সে কুহেলি কাটাবার জন্য শুধালুম, ডাক্তার, আপনার মনে আছে, গত বর্ষারম্ভে আপনারা যখন শান্তিনিকেতনে বেড়াতে এসেছিলেন তখন একদিন অপরাহ্নে ওঠে প্রচণ্ড কালবৈশাখীর ঝড়, তার পর মুদগরধারে শিলাবৃষ্টিপাত এবং সর্বশেষে রুপালি ঝালরের মতো ঝিমঝিম বরষন? শহর-ইয়ার বৃষ্টিতে ভিজবে বলে একা চলে যায় আদিত্যপুরের দিকে।
আমরা দু জনাতে তখন বারান্দায় বসে অনেকক্ষণ ধরে ইসলামের প্রচার ও প্রসার নিয়ে আলোচনা করি। শেষের দিকে আপনি ইসলাম সম্বন্ধে ভালো ভালো রেফরেনস বইয়ের একটি ফিরিস্তি আমার কাছে চান। সে-নির্ঘন্ট শেষ করার পূর্বেই শহর-ইয়ার বাড়ি ফেরে। তাই তখন দশ খণ্ডে অসমাপ্ত একখানি অতুলনীয় গ্রন্থের কথা আমার আর বলা হয়ে ওঠেনি।
বইখানির– বরঞ্চ বলা উচিত এই ইসলামবিশ্বকোষ-এর নাম আন্নালি দেল ইসলাম অর্থাৎ অ্যানালস্ অব ইসলাম, ইতালীয় ভাষায় লেখা। কিন্তু তার পূর্বে এই অজাতশত্রু বিশ্বকোষের একক স্রষ্টার পরিচয় কিছুটা দিই। এর নাম প্রিন্স– ডিউকও বলা হয়– লেওনে (অর্থাৎ সিংহ) কাতানি। ইতালির তিনটি পরিবারের যদি নাম করতে হয়, যাদের সঙ্গে রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে তা হলে কাএতানি পরিবারের নাম বাদ যাবে না। কিন্তু এহ বাহ্য।
আসলে এ পরিবারের যশ-প্রতিপত্তি আরম্ভ হয় যখন ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এ পরিবারেরই একজন বনিফাতিযুস নাম নিয়ে তদানীন্তন খ্রিস্ট-জগতের পোপ নির্বাচিত হন। ইনি ছিলেন অসাধারণ পণ্ডিত ও কূটনীতিতে চাণক্য! ওদিকে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। ডেনমার্কের রাজাকে তিনি পদানত করেন এবং ফ্রান্সের সম্রাটকেও প্রায় শেষ করে এনেছিলেন। কিন্তু এসব তথ্য বলার কোনও প্রয়োজন নেই– এইটুকু বললেই যথেষ্ট যে তাঁর সমসাময়িক অমর কবি দান্তে তাকে তার বিশ্ববিখ্যাত কাব্যে যিশুখ্রিস্টের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু এহ বাহ্য। তত্ত্ব কথা এই যে বনিফাতিয়ুস সে-যুগের সর্বোত্তম দার্শনিক স্পেনের মুসলমান আবু রুশদের দর্শন প্রায় সর্বাংশে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। এটা প্রায় অবিশ্বাস্য। কারণ আবু রুশদ (ওই যুগেই তার দর্শন একাদশ খণ্ডে লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়- লাতিনে রুশদের নাম আভেরএস) যুক্তিতর্ক দ্বারা প্রমাণ করতেন যে মৃত্যুর পর মানবাত্মা অনন্ত স্বৰ্গভোগ বা অনন্ত নরকযন্ত্রণা সহ্য করতে পারে না। তার কারণ অনন্ততা, আনন্ত্যগুণের অধিকারী একমাত্র মহান আল্লা। মানবাত্মা নয়, এবং অনন্ত স্বর্গ অনন্ত নরকের আনন্ত্যগুণ স্বীকার করলে এরা সকলেই সেই মহান আল্লার (বেদান্তের ভাষায় একমেবাদ্বৈত ব্রহ্মের) প্রতিদ্বন্দী হয়ে যাবে- এ ধারণা কিম্ভুতকিমাকার অশ্বডিম্ব–আটারলি এবসার্ড। তাই আবু রুশদের মতে মৃতাত্মারা স্বর্গ-নরক যথোপযুক্ত কাল ভোগ করার পর আল্লাতালা অবশেষে সর্ব আত্মা, স্বর্গ, নরক সব, সবকিছু নিজের মধ্যে আপনাতে সংহরণ করে নেবেন। তখন তিনি আবার এক, অদ্বৈতম্।
ডাক্তার বাধা দিয়ে বললেন, এই মতবাদটা আমি ঠিক ঠিক বুঝতে পারিনি। একটু সবিস্তার বলুন।
আমি বললুম, নোঃ! আমি দর্শন প্রচার করিনে। আমি শোনাই কাহিনী। একটি করুণ কাহিনী শোনাবার জন্য আমি এস্থলে অতি সংক্ষেপে একটি পটভূমি নির্মাণ করলুম মাত্র। তৎপূর্বে আরও আধ মিলিগ্রাম দর্শনবিলাস করতে হবে। এদিকে আবার খ্রিস্টান মাত্রেরই অটল অচল বিশ্বাস পুণ্যাত্মা অনন্ত স্বর্গসুখ এবং পাপাত্মা অনন্ত নরকযন্ত্রণা পাবে। ওদিকে পোপ, খ্রিস্টজগতের পিতা, যার পুণ্যাস্যনির্গত প্রতিটি বাক্য শাম্রাতিশাস্ত্র আপ্তবাক্য, সেই সর্বশাস্ত্রবিশারদ পোপ বনিফাতিয়ুস ম্লেচ্ছ যবন দার্শনিক আবু রুশদের মতবাদ এমনই আকণ্ঠ গিলে বসে আছেন যে তিনি তাঁর সহকর্মী কার্ডিনালদের সমক্ষে গোপন রাখতেন না যে, তিনি মৃতাত্মার অনন্ত স্বৰ্গনরক-ভোগাদিতে বিশ্বাস করেন না। তাই পূর্বেই বলেছি, এটা প্রায় অবিশ্বাস্য। খুদ বাইবেলের বিরুদ্ধে এই ম্লেচ্ছ যাবনিক মতবাদ প্রচার করার জন্য পোপকে দণ্ডভোগ করতে হয়েছিল। তারই উল্লেখ করে কবি দান্তে বিলাপ করে তাঁর মহাকাব্যে লিখেছেন, যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে তার জল্লাদরা যেরকম তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে ব্যঙ্গপি করেছিল ঠিক সেইরকম প্রভু যিশুকে দ্বিতীয় বারের মতো ব্যঙ্গবিদ্রূপ করা হল।
কিন্তু এহ বাহ্য।
যে কাএতানি পরিবারে এই পোপর জন্ম সে-পরিবারে যুগ যুগ ধরে বহু পণ্ডিত, বহু গবেষক জন্ম নিয়েছেন। এ পরিবারের শেষ পণ্ডিত, আমার অতিশয় শ্রদ্ধেয় ঐতিহাসিক লেওনে কাএতানি। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, কিন্তু আমি প্রমাণ করতে পারব না যে, এই পোপের ওপর আরব দার্শনিক আবু রুশদের প্রভাব সম্বন্ধে তাঁর পারিবারিক ও পোপদের প্রচলিত ইতিহাস অধ্যয়ন করার ফলে তিনি আরবি ভাষা ও মুসলিম সভ্যতার প্রতি আকৃষ্ট হন।
