আমার চিন্তাধারায় বাধা পড়ল। ডাক্তার আসন ছেড়ে উঠে বললে, তা হলে আসি; আজ বড্ড দেরি হয়ে গেছে। আমিও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালুম, অর্ধসমাপ্ত ব্রেকফাস্ট টেবিলে রেখে। বললুম, আমাকেও একটুখানি বাইরে যেতে হবে। আপনি আমাকে ড্রপ করতে পারবেন?
উভয়েই আশ্চর্য! কারণ আমি এ বাড়ি থেকে মাত্র একবার বেরিয়েছিলুম– তা-ও ওদেরই সঙ্গে।
ডাক্তার বললে, নিশ্চয়, নিশ্চয়! কিন্তু আপনি ব্রেকফাস্ট শেষ করুন।
আমি তাচ্ছিল্য-ভরা কণ্ঠে বললুম, ওহ! ব্রেকফাস্ট! সে বালাই যা আমি কালেকস্মিনে খাই, সে তো বুড়ি ছোঁওয়ার মতো।
এটা নিছক শহর-ইয়ারকে খুশি করার জন্য। সে যেন না ভাবে যে, সত্যসত্যই কাল রাত্রে আমি অভুক্ত ছিলাম।
ওষুধ কিছুটা ধরল, শহর-ইয়ার আমার দিকে যেন একটুখানি কৃষ্ণনয়নে তাকাল। মেয়েটি সর্বার্থে অতুলনীয়া।
ওরা কিছু শুধোয়নি। আমি নিজের থেকেই বললুম, চললুম, অভিসারে। আমার সিঁথির সিঁদুরের সন্ধানে।
ডাক্তার তো বিস্ময়বিহ্বল, সিঁথির সিঁদুর? সে আবার কী? শহর-ইয়ারও তদ্বৎ।
একগাল হেসে বললুম, আমার পাবলিশার গো, আমার পাবলিশার। উনি আছেন বলেই তো দু পয়সা পাই, মাছ-মাংস খাই। সিঁথির সিঁদুর না তো কী? ওদের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করেই বললুম, আমার ফিরতে দেরি হবে। আমার পাবলিশার রীতিমতো খানদানি মনিষ্যি। সায়েসুববাদের মতো পয়লা নম্বরি হোটেলে লাঞ্চ খান। বিজনেস টকম যা-কিছু সেসব হোটেলের বার-এ পিজি (পিং জিন) গেলাশের থারমোমিটার সাইজের ডাঁটাটি ঘোরাতে ঘোরাতে।… আমার গাড়ির দরকার নেই।
আমার ইচ্ছা, শহর-ইয়ারের এদানীংকার প্রোগ্রাম ডিস্টার্ব না করা। মুরশিদমঞ্জিলে যাবার জন্য তার যদি নিত্যিনিত্য পারিবারিক গাড়ির প্রয়োজন হয় তবে তাই হোক। আমি রাত না করে ফিরব না।
আমি আশা করেছিলুম, সে বুঝে যাবে এটা আমার কোনও অভিমানজাত প্রত্যাখ্যান নয়। কিছুটা প্রসন্ন নয়নে আমার দিকে মুহূর্তেক তাকাবে।
রহস্যময়ী এ নারী। শুধু বললে, আমারও তো গাড়ির দরকার নেই।
আমার খুশি হওয়ার কথা, কারণ এ যুগে মায় ড্রাইভার চোপ্পর দিনের জন্য মোটরপ্রাপ্তি যেন চৌরঙ্গিতে সোঁদরবনের কেঁদো বাঘ-সওয়ার গাজী পীরের ইয়ার দক্ষিণ-রায়ের দাক্ষিণ্যপ্রাপ্তি! কিন্তু আমার উল্টো হল গোশশা। ওহ! তুমি বুঝি ধরে নিয়েছ, যানাভাবে দ্বিপ্রহর রৌদ্রে, ঘর্মাক্ত কলেবরে যত বেশি ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে গুরুর পদপ্রান্তে পৌঁছবে সেই অনুপাতে তোমার মুরশিদসেবার পুণ্যধ্বজা মনুমেন্ট ছাড়িয়ে আল্লাতালার কুর্সিপানে ধাওয়া করবে! তলিফ বরদাস্ত করাতেই সওয়াব কৃচ্ছ্বাধনেই পুণ্য– অর্ধসিদ্ধ বৈরাগ্যবিলাসীদের মুখে এ জাতীয় জনপদসুলভ নীতিবাক্য শুনে শুনে এক কামিল্ সুফি বিরক্তিভরে বক্রোক্তি করেছিলেন, তবে চড়ো না গে প্রতি ভোরে হিমালয়ের চুড়ো, সেখানে পড়ে গে ফজরের নামাজ বেহেশতের বেবাক ফেরেস্তা সেই হুদো হুদো পুণ্যের খতেন রাখতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যাবেন। আর চূড়ো চুড়ার বেপথে যদি ফেঁসে যাও তবে তা তো হাজার দফে বেতর। তখন তুমি পাবে শহিদের উচ্চাসন। পূর্বকৃত সর্বপাপভার থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে সরাসরি চলে যাবে বেহেশতে!
না গো, শহর-ইয়ার, তোমার পুণ্যপন্থা আমি অত সহজে নিষ্কণ্টক করে দেব না। দুপুরে বাড়িতে খাবও না। তোমার প্রোগ্রাম-প্ল্যান আমি এতই নর্মাল সহজ করে দেব যে তুমি কৃসাধন করার রন্ধ্রটি পর্যন্ত খুঁজে পাবে না। আমি সতী বেহুলার চেয়ে ঢের বেশি চালাক।
উপস্থিত আমি স্রেফ একটি বারের তরে তোমার মুরশি-বিরিঞ্চ-বাবার মুখারিদ রুচিটির দর্শনলাভ করে যে পুণ্যসঞ্চয় হবে সেইটে মনিঅর্ডার করে পাঠিয়ে দেব স্বর্গের পোস্টাপিসে হোথায় সিট রিজার্ভেশনের জন্য ইনসিওরেনসের পয়লা কিস্তি!
আহা, শহর-ইয়ার, তুমি দর্শন পেয়ে গেলে, তুমি ভাগ্যবতী :
অদ্যাপিও সেই খেলা খেলে গোরা রায়।
মধ্যে মধ্যে ভাগ্যবানে দেখিবারে পায় ॥
এবং ততোধিক বিস্ময় মানতে হয় যে আবাল্য ধর্মশাস্ত্র, এমনকি ধর্মসঙ্গীতও উপেক্ষা করে কোন মন্ত্রবলে কোন পুণ্যফলে নিরঙ্কুশ অব্যবহিত পদ্ধতিতে আজ অকস্মাৎ হৃদয়ঙ্গম করে ফেললে,
যদ্যপি আমার গুরু বেশ্যাবাড়ি যায়।
তথাপি আমার গুরু নিত্যানন্দ রায় ॥
.
১৪.
সর্বপ্রকারের বাদ-প্রতিবাদ অখণ্ড উপেক্ষা করে গেলুম শোবার ঘরে। চীনাংশুক অঙ্গবাসটি স্কন্ধোপরি লম্বমান করে দৃঢ়পদক্ষেপে দৃকপাত না করে সোপান অবরোহণান্তে রাজসিক পদ্ধতিতে আরোহণ করলুম সেই মান্ধাতাতাতযুবনাশ্ব সমসাময়িক স্বতশ্চলশকটে।
ডাক্তার সভয় সবিনয় কণ্ঠে অনুরোধ করলেন, গাড়িটা রাখুন না সমস্তদিন আপনার সঙ্গে। আমি ভারি খুশি হব। আর জানেন তো কলকাতায় যানবাহনের হাল।
আমি স্থির কণ্ঠে বললুম, আপনাকে কোনও বাবদেই না বলতে আমার বড় বাধে। কিন্তু ক্ষণতরে বিবেচনা করুন, আমি বেরিয়েছি চতুর্বর্গের দ্বিতীয় বর্গের অর্থাৎ অর্থের সন্ধানে; পক্ষান্তরে শহর-ইয়ার বেরুবেন চতুর্থ বর্গ অর্থাৎ মোক্ষের সন্ধানে। কার সেবাতে এস্থলে নিয়োজিত হবে এই শকট? তার পর মৃদুহাস্য করে বললুম, অপরাধ নেবেন না, শকটটিও মুমূর্ষ তথা মুমুক্ষু তারও তো ভূত-ভবিষ্যৎ আছে। সেই-বা যাবে না কেন রাজেন্দ্রাণী সঙ্গমে দেবদর্শনে?
