ডাক্তার বললেন, তা আর বিচিত্র কী? শহর-ইয়ারই কিছুদিন পূর্বে বলছিল বেতারের হাঁড়িতে যা চাল বাড়ন্ত, আমার কঙ্কালের না ডাক পড়ে?
শহর-ইয়ার তখন ডাক্তারের লাঞ্চের জন্য স্যালাডে যে মায়োনেজ দেবে তার জন্য ডিমের কুসুম, সরষের তেল আর নেবু নিয়ে বসেছে।
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললুম, তবেই দেখ, ইয়ার, শুধু যে গ্রেট মাইন্ডজ থিন্ক এলাইক তাই নয়, দৈবাৎ কখনও-সখনও কোনও নীলমণি-চন্দ্রমায় তোমার মতো গ্রেট মাই আর আমার মতো স্মল মাইড়ও একইরকম চিন্তা করে। আর তুমি যে বেতার তথা কঙ্কালতত্ত্ব ডাক্তারকে বলেছ সেটি আমি একটি ব্যঙ্গচিত্রেও দেখেছি। গত যুদ্ধে হিটলারের যখন তাবৎ সৈন্য খতম, তখন আমাদেরই ডাক্তারের মতো এক ডাক্তার বার্লিনের যাদুঘরে গিয়ে একটা কঙ্কালের পাঁজরার উপর স্টিতস্কোপ রেখে পাশের রংরুট আপিসারকে বলছেন, হ্যাঁ, ফিট ফ দি আর্মি!
তার পর কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বললুম, আমি তো শুনেছি, মায়োনেজ তৈরি হয় অলিভ অয়েল আর সিরকা দিয়ে।
শহর-ইয়ার আমার দিকে না তাকিয়েই বললে, ঠিকই শুনেছেন, কিন্তু অনেকেই তো মায়োনেজের ধক্ বাড়াবার জন্য ফিকে অলিভ অয়েলে ঝাঁজালো মাস্টার্ড পাউডার দেয়। ও দুটোতে মিশে তা হলে তো সর্ষের তেলেই দাঁড়াবে। আর ইয়োরোপে টক নেবু নেই বলেই তো শুনেছি, তারা ভিনিগার ব্যবহার করে। নেবু অনেক তাজা।
ইতোমধ্যে জমিল এসে শুধল, কী খাব?
উদাত্ত কণ্ঠে বললুম, ব্রাদার, আমি তো ব্রেকফাস্ট খাইনে। কিন্তু কাল রাত্রের খানাতে ঠিক রুচি ছিল না বলে মেকদারে একটু কমতি পড়ে গিয়েছিল।… দাও কিছু একটা। শেষ কথা দুটি বললুম ঈষৎ অবহেলা-ভরে।
আমার মতলব, শহর-ইয়ারকে ইঙ্গিতে অতি মোলায়েম একটি খোঁচা দেওয়া। ভাবখানা এই, তুমি সামনে বসে ভালো করে খাবার জন্য চোটপাট করবে, রসালাপের মধুসিঞ্চন করবে, তবে তো আমার জিভে জল, পেটে জারক রসের ছয়লাপ জাগবে। নইলে আমার কি আর অন্যত্র অন্ন জোটে না?
এবারে শহর-ইয়ার মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। আমি যেন দেখতে পেলুম, কেমন যেন একটা বেদনা-ভরা নৈরাশ্য।
তবে কি সে বলতে চায়, সে খেয়ালখুশিতে আমাকে অবহেলা করেনি; আমাকে, তার স্বামীকে সেবা করার মতো শক্তি তার আর নেই।
তার পর ধীরে ধীরে জমিলের কাছে গিয়ে বললে, আমি খাবার তৈরি করছি, তুমি কমলালেবুর রস ঠিক করো।
আমার আপসোস হল। কী দরকার ছিল আমার এ অভিমান দেখাবার। আমি না স্থির করেছিলুম, আমি অভিমান করব না। আমি, অগা, কী করে জানব এ মেয়ের বুকের ভিতর কী তুফান উঠেছে? আমি কী করে বুঝব ওর মনের কথা? আপন মা-ই কী সবসময় বুঝতে পারে, তার সন্তানের আশা-আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব? আমার তরুণ বয়সে দেখেছি, একাধিক সুশিক্ষিতা মাতা পুত্রকে স্বাধীনতা সংগ্রামে নামতে বাধা দিয়েছেন। হয়তো সন্তানের অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যৎ কারাবাসের দুঃখ-যন্ত্রণা মাতাকে হ্রাসাতুর করে তুলেছিল। যাই হোক যাই থাক, মা তো তখন বুঝতে পারেনি ছেলে বিভীষিকা দেখছে, সে যদি তার আদর্শ ত্যাগ করে কারাগারের বাইরে থেকে যায় তবে সেই মুক্ত পৃথিবী তখন তার পক্ষে হয়ে দাঁড়াবে বৃহত্তর, বৃহত্তম কারাগার!
শহর-ইয়ার আমার কে, যে, আমি তার হৃদয়মনের আশা-আকাক্ষার দ্বন্দ্ব আপন হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারব? মুসলমান সমাজের ভিতর আমাদের দু জনার মধ্যে যে সম্পর্ক দিন দিন ক্রমশ বিকশিত হচ্ছিল, সেরকম সম্পর্ক আমাদের সমাজে কিছুদিন পূর্বেও ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব, এখনও সাতিশয় বিরল। খুদ আরব দেশ, ইরান-তুরান, আফগানিস্তান এমনকি এদেশের হরিয়ানা-মধ্যপ্রদেশও তো এসব বাবদে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঢের ঢের পিছনে। ওসব দেশে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে হদিস খুঁজতে যাওয়া বিলকুল বেকার। বরঞ্চ শহর-ইয়ার ও আমার উভয়ের অনুভূতিক্ষেত্রে যিনি আবাল্য রসসিঞ্চন করেছেন, সেই রবীন্দ্রনাথকে শুধোই। তিনি এই সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা করে করে পৌঁছেছিলেন কবি বাণভট্টের কাদম্বরী আখ্যানে। সেখানে পত্রলেখা নাম্নী তরুণী কুমারী যুবরাজ চন্দ্ৰাপীড়ের পত্নী নয়, প্রণয়িনীও নয়, কিংকরীও নয়, পুরুষের সহচরী।
কিন্তু শহর-ইয়ার আমার সহচরী কেন, নমসহচরীও তো নয়।
তদুপরি সে বিবাহিতা, স্বামীর প্রতি অনুরক্তা; আমিও একদারনিষ্ঠ।
কবিগুরুর তীক্ষ্ণদৃষ্টির খরতর শর কিন্তু আমাদের এই নাজুক বা ডেলিকেট সম্পর্কের অন্তত একটি সূক্ষ্মতম কেন্দ্রবিন্দুকে লক্ষ্যভেদ করতে পেরেছে। পত্রলেখা যেখানে (চন্দ্ৰাপীড়ের সান্নিধ্যে) আসিয়া যে অতি অল্প স্থানে আশ্রয় লইয়াছে সেখানে তাহার আসিবার কোনওপ্রকার প্রয়োজন ছিল না। স্থানটি তাহার পক্ষে বড় সংকীর্ণ, একটু এদিকে ওদিকে পা দিলেই সংকট।
পরিস্থিতিতে অবশ্য পার্থক্য আছে। পত্ৰলেখা ছিলেন চন্দ্ৰাপীড়ের তাম্বুল করঙ্কবাহিনী পরিচারিকা; চন্দ্ৰাপীড় যুবরাজ। যুবরাজকে তো সাবধানে পা ফেলতে হয় না। কিন্তু শহর-ইয়ার ও আমার সম্পর্ক তো বরাবরেষু।
তাই শহর-ইয়ারের স্থানটি তাহার পক্ষে যেমন বড় সংকীর্ণ আমারও একটু এদিকে ওদিকে পা ফেলিলেই সংকট।
তার প্রতি আমার সহানুভূতি, তার প্রতি আমার ভালোবাসা, তার অন্তরের দ্বন্দ্বে তাকে সহায়তা করা– এ সবই যেন একটু এদিকে ওদিকে পা না ফেলে! তা হলেই সংকট।
