হে সুন্দর, তোমার সৌন্দর্য আমাদেরকে দাও।
(কারণ) আমরা তোমার পূজারি, আমরা সকলেই।
আমার মনে ধোঁকা লাগল, শহর-ইয়ার কি এ দোহাটির গভীরে পৌঁছে পুরোপুরি মর্মার্থটি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছে?
যে আল্লাকে এ স্থলে আহ্বান করা হচ্ছে তিনি লতিফ। শব্দটি সুন্দর এবং করুণাময় দুই অর্থই ধরে। অর্থাৎ একই শব্দে তাঁকে শিবম্ ও সুন্দর বলা হচ্ছে। এখানে তার কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে উতুফ!
এর একটি অর্থ সরল- তুমি করুণাময় হও (বি না– আমাদের প্রতি) কিন্তু অন্য অর্থ– তোমার সৌন্দর্য আমাদের প্রতি বিকিরণ করো কিংবা/এবং আমাদেরকেও সুন্দর করে তোলো।
আল্লার বহু গুণ বোঝাবার জন্য মানুষ তাকে বহু নাম দিয়েছে। কিন্তু সুফিদের কাছে তিনি হক, অর্থাৎ সত্যম্। প্রখ্যাত সুফি মনসুর অল্-হল্লাজ আনা হক, অর্থাৎ আমিই সত্য আমিই ব্রহ্ম প্রচার করার দরুন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। কথিত আছে, যখন তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে কর্তিত হয় তখন প্রতি খণ্ড থেকে রব ওঠে আনাল হ, আনা হক!
শহর-ইয়ার সত্যের সন্ধানে বেরিয়েছে, না সুন্দরের সন্ধানে?
তার ললিত কণ্ঠের করুণ জপের (জির) :
— সুর
লাগিছে আমার কানে অসাথে মিলিত মধুর
….. আছে তাহে সমাপ্তির ব্যথা,
আছে তাহে নবতম আরম্ভের মঙ্গল-বারতা।
কিন্তু আপন অনিচ্ছা সত্ত্বেও লক্ষ করলুম শহু-ইয়ারের কণ্ঠস্বর তাদের শোবার ঘর থেকে আসছে না। তবে কি সে স্বামীসঙ্গ ত্যাগ করেছে। ইসলামের আইন-অনুযায়ী সে তো তা পারে না, তার স্বামীও পারে না।
কিন্তু আমিই-বা ঘামের ফোঁটায় কুমির দেখছি কেন?
হয়তো ত্রিমাযামিনীব্যাপী তার জি স্বামীর ন্দ্রিাকে ব্যাঘাত করবে বলে সে অন্য কামরায় আশ্রয় নিয়েছে।
অবসন্ন মনে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালুম। রাত্রির কলকাতার আকাশ যেন নির্ধণ ব্রহ্ম। কোনওরকম পরিবর্তন তার হয় না। সদাই একই, কেমন যেন হিমানীর গ্লানি-মাখা পাণ্ডুর ধূসর। শুনেছি, যুদ্ধের সময় নাকি ব্ল্যাক-আউটের কল্যাণে কলকাতার মডার্ন কবিরা জীবনে প্রথম চন্দ্ৰমা দেখতে পান, এবং ভয়ে আঁতকে উঠেছিলেন।
এটা কাল সকালেই শহর-ইয়ারকে বলতে হবে। সে আকছারই গবিতা নিয়ে টকঝাল ফোড়ন কাটে– ওদিকে এসব আবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েও। একদিন বিষাদমাখা সুরে আমাকে বলেছিল, আমি যে এসব কবিতাতে রস পাইনে তার জন্য কি আমার দুঃখ হয় না? আমি এরই মধ্যে এত বুড়িয়ে গেলুম কী করে যে নবীনদের সুর আমার প্রাণে সাড়া জাগাতে পারে না?
তখন হঠাৎ মনে ব্যথা জাগল, সেসব ঊষা-রসের নিশা তো তার আর নেই।
এসব ব্যথার উপশমের জন্য বিধাতা সৃষ্টি করেছেন নিদ্রা।
বেলাতে ঘুম ভাঙল। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললুম, বাঁচালে, বাবা। এতক্ষণে নিশ্চয়ই ডাক্তার চলে গেছেন কর্মস্থলে এবং শহর-ইয়ার গেছেন তার পীরের আস্তানায়। কে যেতে চায় ওই নিরানন্দ ডাইনিংরুমে? আর এই তো প্রথম আমরা তিনজন একসঙ্গে মুখোমুখি হব। কী হবে গিয়ে ওই আড়ষ্ট মূক সমাজে। আমি তো আর বান্দেবী নই যে, মূককে বাঁচাল করে তুলব।
কিন্তু শান্তি কোথায়? কৌটিল্য যে বলেছেন, উৎসবে-ব্যসনে, দুর্ভিক্ষে-রাষ্ট্রবিপ্লবে যে সঙ্গ দেয় সেই ব্যক্তিই বান্ধব– তার কী?
ব্যসন মানে অত্যধিক আসক্তিজনিত বিপত্তি। শহর-ইয়ারের এই অত্যধিক ধর্মাসক্তিও একপ্রকারের ব্যসন। কিন্তু এটাই-বা দীর্ঘস্থায়ী হবে কে বলতে পারে? অবশেষে সে হয়তো তার ভারসাম্য ফিরে পাবে এবং সর্বশেষে সে শব্দার্থে ডাক্তারের সহধর্মিণী হবে। ভুল বললুম, এতদিন ধরে ডাক্তার তো ভেবেছে, সে যে ক্রিয়াকর্ম করে যাচ্ছে সেখানেই তার ধর্মজীবনের পরিসমাপ্তি- সেই শুষ্ক আচারানুষ্ঠানের বিশীর্ণ তরুমূলে বরঞ্চ শহর-ইয়ার তখন সিঞ্চন করবে সুফি-সন্তদের প্রেম-উৎস থেকে আহরিত নব মন্দাকিনীধারা। ধর্মবাবদে কৌতূহলী অথচ সেটাকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে যে ধ্যানধারণা সাধনা-উপাসনার প্রয়োজন সে-খাতায় সম্পূর্ণ রিক্ত এই যে অধম–সে-ও উপকৃত হবে।
গুড মর্নিং, গুড মর্নিং, গুড মর্নিং হেঁকে খানা-কামরায় ঢুকলুম।
ডাক্তারকে অপেক্ষাকৃত প্রফুল্লতর দেখাচ্ছে। তবে কি এই খোদার-সিধে লোকটা ওই দুরাশা নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছে যে, আমি আসার দরুন তার সব মুশকিল আসান হয়ে যাবে। মূর্খ, মূর্খ, মূর্খ! আমি কি টেলিফোনের 199 যে, হোয়েন ইন্ ট্রবল-এ নম্বর রিং করলেই সর্ব ঝামেলা ফৈসালা হয়ে যাবে, না আমি পীরপ্যাকম্বর-গুরুগোসাঁইয়ের খ্যাট?–যদ্যপি শহর-ইয়ারের নবলব্ধ গরিমা রোওয়াবটাকে কঞ্চিৎ ঘায়েল করার জন্য কাল রাত্রে আমি মুখে মুখে হাইজাম্প লঙজাম্প মেরেছি বিস্তর শহর-ইয়ারের জিকরের সেই লতিফ তাঁর লু (দাক্ষিণ্য) বর্ষণ করে বর্বরতম আমার এ মদদর্প যেন ক্ষমা করে দেন।
ডাক্তারকে শুধালুম, কই, আজ যে এত্তা ল্যাটে? তবে কি যে-সব কঙ্কাল নিয়ে রিসার্চ করছেন তারা সরকারি ধর্মঘট করেছে, না রবিঠাকুরের কঙ্কালের মতো মোলায়েম মোলায়েম গল্প বলার জন্য মহিলা-মহলের প্যাটার্নে কঙ্কাল-মহল প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাবৎ কঙ্কাল বেতার থেকে দাওয়াত পেয়েছ?
অনুমান করলুম, ডাক্তার সজ্ঞানে কর্মস্থলে যেতে বিলম্ব করছে। বউকে যতখানি পারে ঠেকিয়ে রাখছে।
