গান শেষ হলে বললুম, জানো শহর-ইয়ার এ গানেরই একটি লোকায়ত রূপ আছে :
জ্ঞানের অগম্য তুমি, প্রেমের ভিখারি।
দ্বারে দ্বারে মাগো প্রেম নয়নেতে বারি ॥
কোথায় তোমার ছত্রদণ্ড কোথায় সিংহাসন।
পাতকীর চরণতলে লুটায় আসন ॥
শহর-ইয়ার কোনওকিছু বলার পূর্বেই আমি আদেশ দিলুম, অনেক রাত হয়েছে; ঘুমুতে যাও।
আসলে শহর-ইয়ার এখন ধর্মপথে স্বপনচারিণী। পরিপূর্ণ সুষুপ্ত অবস্থায় কোনও কোনও মুদ্রিতাখি নারী-পুরুষ দৃঢ় পদক্ষেপে ভয়-নির্ভয়াতীত অবস্থায় ভ্রমণ করে সংকীর্ণতম আলিসার উপর দিয়ে কোন বিধাতা বা অপদেবতার অদৃশ্য করাঙ্গুলি সঙ্কেতে কে জানে? এই স্বপনচারীর হাল তখন বড়ই নাজুক এবং সঙ্কটময়। অকস্মাৎ কেউ তখন তার নাম ধরে ডেকে উঠলে বা তার গাত্ৰস্পর্শ করলে সে তার সম্মোহিত ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং সেই মুহূর্তেই কোনও একটা মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে ওঠাটা মোটেই অসম্ভব নয়।
শহর-ইয়ার এখন সে ক্ষুরস্য ধারা সুফিরহস্যের কেশ-পরিমাণ সংকীর্ণ পথের উপর দিয়ে এই নব-অভিযানে বেরিয়েছে অর্ধসম্মোহিত অর্ধসচেতনাবস্থায় তাকে এখন আকস্মিক তর্ক-মুদার দ্বারা সচকিত জাগরণে ফিরিয়ে আনা কি আদৌ সমীচীন হবে? যদ্যপি সেটা আদপেই সম্ভবে।
কিন্তু প্রশ্ন, তাকে জাগাতে যাব কেন? নিতান্ত জড়বাদী চার্বাকপন্থি ভিন্ন এ দায়িত্ব নেবে কোন সবজান্তা প্যাকম্বর! হয়তো সে সত্য পথেই চলেছে। তদুপরি আমার জানা আছে, খ্রিস্টান-মুসলিম, জৈন, বৌদ্ধ, হিন্দু, ভক্তিতত্ত্বের, বহু তথাগত মহাত্মা বলে গেছেন, এ মার্গে পদার্পণ করার প্রথম অবস্থায় অবতরণিকায় প্রায় প্রত্যেক সত্যসাধকই অম্লাধিককাল মোহাচ্ছন্ন অবস্থায় কাটায়। সামান্য মানবীর প্রেমমুগ্ধ দান্তেও নাকি মোহাচ্ছন্ন অবস্থায় দিভ্রান্তের মতো যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতেন। আর এ নারী তো মুগ্ধা সবচেয়ে সর্বনেশে প্রেমে।
কিংবা এ নারী কি এখন দ্বিতীয় মনজিলে খ্রিস্টান মিষ্টিকরা যাকে বলে মেনশনঃ এখানে নাকি আসে অ্যারিডিটি– ঊষরতা, অনুর্বরতা। জগদ্বল্লভ নাকি ভক্তকে গোড়ার দিকেই এক ঝলক দর্শন দিয়ে মিলিয়ে যান। শ্রীরাধা তার বল্লভ রসরাজের সঙ্গসুখ কতকাল পেয়েছিলেন সেটা পরবর্তীকালে অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের মথুরা গমনের পর তিনি নিজেই বলতে পারতেন না। সিলেটের একাধিক গ্রাম্যগীতিতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমার মরম তাঁর স্মরণে বলে আমি তাকে পেয়েছি ওইটুকু সময়ের তরে, বিদ্যুতার পৃথ্বীতলে পৌঁছতে যতখানি সময় লাগে। তার পরই আরম্ভ হয় আকুলি-বিকুলি।
বৃন্দাবন ত্যাগ করে শ্রীকৃষ্ণের মথুরা-গমন এবং সাধককে একবার ক্ষণতরে দর্শন দিয়ে জগদ্বল্লভের অন্তর্ধান সম্পূর্ণ একই ঘটনা।
তখন সেই ঊষরকালে সর্ব প্রেমিক-প্রেমিকাই আর গৃহবাসিনী হয়ে থাকতে চায় না, তার তখন কোন প্রয়োজন রজত কাঞ্চন, সে তখন গেরুয়া বসন অঙ্গেতে ধরে তার স্নেহময়ী মাতাকে পর্যন্ত ত্যাগ করে।
শহর-ইয়ার যে আত্মজন প্রিয়জনকে অবহেলা করেছে সেটা তো সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় নয়।
বৌদ্ধ ভিক্ষুণীদের জন্য, ক্যাথলিক নাদের জন্য যেরকম সংঘ-মনাস্টরি আছে, মুসলমান রমণীর জন্য সে রকম কিছু একটা থাকলে এতদিনে হয়তো সে সেখানে আশ্রয় নিয়ে নিত। জীবন কাটাত ধ্যানধারণায়, উপবাস-কৃচ্ছ্বসাধনে, জনসেবায়—
সেবা?
আমি যে এতক্ষণ শহর-ইয়ারের সমর্থনে যুক্তিতর্ক দিয়ে মহলের পর মহল গড়ে তুলছিলুম সেই চিন্ময় এমারৎ এক লহমায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে ধূলিদলিত মাত্র একটি শব্দের অনধিকার প্রবেশে। সেবা!
সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, নবীন সাধকের প্রতি সুফি সম্প্রদায়ের প্রধান গুরু হুজবেরির প্রত্যাদেশ :
সাধনার প্রথম বত্সরে মানুষের সেবা করবে,
দ্বিতীয় বৎসরে আল্লার সেবা করবে,
তৃতীয় বৎসরে আত্মদর্শনে নিয়োজিত হবে।
ডাক্তার, আমি, বাড়ির এত যে খেদমতগার সুবো-শাম শহরু-ইয়ারের মুখের পানে তাকিয়ে থাকে, তাকে সত্যকার মা জেনে আম্মা বলে ডাকে আমরা কি মানুষ নই? সাধনার প্রথম বৎসরে তো মানুষের সেবা করারই প্রত্যাদেশ।
একদা শহর-ইয়ারকে বলেছিলুম, তোমার সর্বাঙ্গসুন্দর বেশভূষা হবে তোমার স্বামীর জন্য। আর আজ যদি তুমি সর্বসুন্দরের সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করো, তবে তার সর্বপ্রথম সর্বোত্তম সেবা পাবে তোমার স্বামী।
.
১৩.
খুব বেশিক্ষণ আত্মচিন্তা করিনি। দেহের ক্লান্তি তো ছিলই, তদুপরি ডাক্তারের বিপাক বিহ্বলতা, শহর-ইয়ারের দূরত্ব-দূরত্ব ভাব আমার মনকেও অসাড় করে তুলেছিল। ঘুমিয়ে পড়েছিলুম অল্পক্ষণের মধ্যেই। হজরত পয়গম্বর বলেছেন– যদিও তাঁর বাক্যটি কোনও শাস্ত্রগ্রন্থে আমি স্বচক্ষে দেখিনি– মূর্থের উপাসনা অপেক্ষা পণ্ডিতের ন্দ্রিা শ্রেয়ঃ। কিন্তু মূখের নিদ্রা কোন পর্যায়ে পড়ে সে সম্বন্ধে কোনও আপ্তবাক্য আমি এ তাবৎ শুনিনি, শাস্ত্রেও দেখিনি। আমি মূর্খ। জাগ্রতাবস্থায় আমার পাপাত্মা সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে না। তাই বোধ হয় তিনি নিদ্রিতাবস্থায় তাঁর নামগান শুনিয়ে দেন।
ধড়মড়িয়ে জেগে উঠে সম্পূর্ণ সচেতন হলুম।
শুনতে পেলুম, বেশ কিছুটা দূর থেকে অতি মধুর কণ্ঠে জপগীতি :
ইয়া লতিফুল/তুফবি না।
নাহন্য বিদক/কুল্লি না ॥
আরবি ভাষার দোঁহা।
