আমি প্রাচীন দিনের চটুলতা আনবার ভান করে বললুম, তা, আমি তো কখনও বলিনি- তুমি শুধোনি– আমি প্রথম যৌবনে কবার প্রেমে পড়েছিলুম, তুমি তো কখনও শুধোওনি–
কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ করে মনে মনে কিছুটা তৃপ্তি পেলুম। শহর-ইয়ারের গুরু তাকে অজগরের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরতে পারেননি। নইলে অন্য গুরু অন্য সুফি সম্বন্ধে সে কণামাত্র কৌতূহল দেখাত না। বরঞ্চ এ স্থলে কুরুচিরা মাত্রই অন্য গুরুর কথা উঠলেই তাকে নস্যাৎ করবার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। প্রাচীন দিনের আপ্তবাক্য মনে এল– অন্যের পিতার নিন্দাবাদ না করেও আপন পিতার প্রশংসা করা যায়।
ওদিকে দেখি, শহর-ইয়ার আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আর এই সর্বপ্রথম দেখলুম, আমার রসিকতা প্রতিক্রিয়া স্বরূপ তার সদাশান্ত ভালের এক প্রান্তে, আঁখিকোণে যেন সামান্যতম অসহিষ্ণুতার কুঞ্চন পরশ লাগিয়ে চলে গেল।
আর দুঃখ হল এই দেখে যে, যে শহর-ইয়ার আমার ভোঁতা রসিকতাতেও একটুখানি সদয় স্মিতহাস্য করত– দু একবার বলেছে, এটা কিন্তু জুৎসই হল না– সে আজ রসিকতার পুকুরে (মানছি ঘোলা জলের এদোপুকুর) যেন সাক্ষাৎ পরমহংসিনী হয়ে গিয়েছে!
এ অভিজ্ঞতা আমার বহুকালের। যে কোনও-কিছুতেই মানুষ মজে গিয়ে সিরিয়স হলেই সবচেয়ে সর্বপ্রথম তার লোপ পায় রসবোধ। এর প্রকৃষ্টতম উদাহরণ প্রেমের বেলা। রসে টইটম্বুর পাড়ার সুকুমার যখন প্রথম প্রেমে পড়ে– ইংরেজিতে যাকে বলে কাফ ল– তখন তাকে যদি আপনি কোনও কিছু না জেনেশুনে নিতান্ত হামলেসলি শুধোন, কী হে, মুখখানা এত শুকনো কেন? সে তখন সেই কাঠিয়াওয়াড়ি চাষার মতো তেড়ে বলবে, শুখ-শুকে লকড়ি বন্ জাউংগা তেরা ক্যা শালা।
ধর্মরাজ্যে আমাদের অখণ্ডসৌভাগ্যবতী খাজিস্তে-বানু মুসম্মৎ বেগম শহর-ইয়ার আল্লা তাঁর শান্-শওকৎ লুৎফ-নজাফৎ হাজার চনদ বৃদ্ধি করুন!–কোন গৌরীশঙ্করের শীর্ষদেশে তথাগতা হয়েছেন সে জানেন তার অধুনালব্ধ পীর সাহেব; আমার কিন্তু এ তত্ত্ব বিলক্ষণ মালুম হচ্ছে, বিবিজান তার স্বামী এস্তেক বাড়ির খানসামা-বাবুরচি এবং আর পাঁচজনের লবেজান করে এনেছেন তো বটেই, আমার সঙ্গে তার যে রসে রসে ভরা রসের মিতালি দিনে দিনে গড়ে উঠেছিল, সেই শিশু নীপতরুটি অধুনা অবহেলার খর তপনে বিবর্ণ পাণ্ডুর; আসন্ন কালবৈশাখীতে ধূলিদলিতা এবং শ্রাবণে হবে কর্দমমদিতা।
শান্তকণ্ঠে বললুম, তুমি তো আমাকে একাধিকবার বলেছ– এখন মনে হচ্ছে, তাতে হয়তো সামান্য বিষাদের সুর মাখানো ছিল– যে, রবীন্দ্রনাথের ধর্মসঙ্গীতে তোমার বুকে তুফান তোলে না। অথচ তার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবারই শ্লাঘার সঙ্গে নিজেকে ধন্য মেনেছ যে রবীন্দ্রনাথের প্রেম-প্রকৃতির গান তোমার অস্থিমজ্জা, তোমার অনিন্দ্যমোহন চিন্ময় ভুবন নির্মাণ করেছে।
রবীন্দ্রনাথের সেই ধর্মসঙ্গীত এবারে একটু কান পেতে শোনো তো।
আমাদের পরিবারে একাধিক সাধক সুফিমার্গ অবলম্বন করেছিলেন। এ পন্থার শেষ পথচারিণী ছিল আমার ছোট বোন সৈয়েদা হবিবুন্নেসা, সে এখন ওপারে। আমার এক ভাগ্নি ঢাকাতে বাংলার অধ্যাপনা করে। সে তার সম্বন্ধে প্রামাণিক প্রবন্ধ লিখেছে। আমার এই বোনটি আবার ছিল সিলেটের পীরানী। প্রতি ভোরে তার বাড়ির সামনে জমে যেত মেয়েছেলেদের ভিড়। তারা এসেছে বোনের দোওয়া নিতে, কাচ্চাবাচ্চাদের অসুখ সারানোর জন্য, বন্ধ্যারা এসেছে মা হবার জন্য, আরও কত কী! আমার বোন তাবিজ-কবজ পানি-পড়া কিচ্ছুটি দিত না। এক একজন করে মেয়েরা ঘরে ঢুকত আর সে শুধু আশীর্বাদ করত। বহুকাল ধরে, কেন জানিনে, সে শয্যাগ্রহণ করেছিল। শুয়ে শুয়ে গুন গুন করে গান গাইত। সুফিতত্ত্বের মারিফতি গান। এবং নিজেই সুর দিয়ে অনেকগুলি গান রচেছিল। ঢাকা বেতার মাঝে মাঝে সেগুলো শোনায়। তার একটা গীতিসঙ্কলন আমার আব্বা প্রকাশ করেন। কিন্তু সে কথা থাক। আমি বলছিলুম।
শহর-ইয়ার প্রাচীন দিনের দৃঢ়কণ্ঠে বাধা দিয়ে বললে, না। আপনার বোনের কথা বলুন।
আমি দৃঢ়তর কণ্ঠে বললুম না। আমিও এখন তপ্ত গরম। তুমি যদি গুরু নিয়ে মেতে উঠে আপন-জন, বেগানা-জন সর্বজনকে স্বচ্ছন্দে অবহেলা করতে পার, তবে আমিও তোমার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে তারও বেশি অবহেলা করতে পারি।
বললুম তুমি প্রশ্ন শুধিয়েছিলে, আমাদের পরিবারের সুফিদের সম্বন্ধে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছু কিছু বললুম। নইলে কোথায় রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনমান্য ধর্মসঙ্গীত–আফটার অল গীতাঞ্জলির ধর্মসঙ্গীতই তো তাঁকে নোবেল প্রাইজ পাইয়ে দেয় আর কোথায় আমার ছোট বোনের মারিফতি সুফিগীতি!
আমি কিন্তু তখন মনে মনে বেশ খানিকটে আত্মপ্রসাদ উপভোগ করছি। বিবিকে যে তাঁর আকস্মিক ধর্মোন্মত্ততার কচ্ছপের খোল থেকে (তওবা! তওবা!! কাছিম আমাদের কাছে হারাম-পাপবিদ্ধ অপবিত্র না হলেও মকরূহ, অর্থাৎ বর্জনীয়) বের করতে পেরেছি সেটাও তো কিছু হেলাফেলার ফেলনা নয়।
যদিও আমি না শান্তা সুফি-কন্যার অগ্রজ তবু তুর্ক-সিপাহির মোগলাই কণ্ঠে আদেশ দিলুম, ওই রেকর্ডটা বাজাও তো–
তাই তোমার আনন্দ আমার পর
তুমি তাই এসেছ নীচে।
আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর,
তোমার প্রেম হত যে মিছে।
শহর-ইয়ার রেকর্ডটি লাগাল। এতদিন অন্য গানের বেলা মাঝে মাঝে সে যে-রকম গুনগুন করত, এ গানে সে সেটা করল না। ধর্মসঙ্গীত তার মনে কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে সেটা ঠিক ঠিক বুঝতে পারলুম না।
