ইংরেজ যখন বলে এই ভারতীয় মোটেই ভারতীয়ের মতো নয়, একদম আমাদের মতো তখন কি আমরা উল্লাস বোধ করি?
***
মনু-নিষিদ্ধ পক্ষী ভক্ষণকরতঃ হিন্দু-সন্তান ইহলোক-পরলোক নষ্ট করুক এ অভিসন্ধি আমি কিছুতেই করিতে পারি না; তৎপূর্বে যেন আমার মস্তকে বজ্রাঘাত হয়।
কিন্তু আমার বহু পারসিক, মুসলমান, খ্রিস্টানি বন্ধু আছেন, তাঁহাদের কল্যাণার্থে নিবেদন করি তাহারা যদি কখনও দিল্লি আসেন তবে যেন একবার আফগানি নান (তন্দুরপকু রুটিবিশেষ) এবং তন্দুরি মুর্গি ভক্ষণ করিয়া দেহলি বাস সার্থক করেন।
এই দুই বস্তু বস্তুত গান্ধার দেশীয় অর্থাৎ পেশাওয়ার হইতে কাবুল পর্যন্ত এই দুই বস্তু সানন্দে ভক্ষণ করা হয়। কিন্তু বিচলিত হইবেন না, ইহাদিগকে ভক্ষণ করিবার জন্য পাঠান। দন্ত কিংবা উদরের প্রয়োজন নাই। ঈষৎ অবান্তর, তবুও নিবেদন করি পাঠানের দন্ত বাঙালি অপেক্ষা বহু নিকৃষ্ট। বড়ই কোমল জিনিস এবং তন্দুরের অভ্যন্তরে সুপক্ক করা হয় বলিয়া সর্বাঙ্গসুন্দর মাধুর্য ধারণ করে। গান্ধার দেশে লঙ্কার প্রচলন সংকীর্ণ বলিয়া তন্দুরিতে কোনওপ্রকারের তীব্র আস্বাদ নাই।
একদা এই দুই বস্তু দেহলি প্রান্তে প্রচলিত ছিল না। দেশবিভক্তির ফলে এক পেশাওয়ারি শিখ মহোদয় এই দুই মহাশয়কে দিল্লিতে প্রচলন করিয়াছেন। ভগবান তাহার মঙ্গল করুন।
কিন্তু সাধু ভক্ষক, সাবধান। মস্তক কর্তন করিবার ভীতি প্রদর্শন করিলেও তন্দুরি ছুরি কাঁটা দিয়া খাইবে না। উভয় হস্ত সঞ্চালন দ্বারা তন্দুরিকে খণ্ড বিখণ্ড করতঃ সোল্লাসে সশব্দে হোটেল রেস্তোরাঁ সচকিত করিয়া নির্লজ্জভাবে কড়কড়ায়েত মড়মড়ায়েত করিবে। যদি সাহস না থাকে আমাকে নিমন্ত্রণ করিও।
***
স্বর্গীয় পরিমল রায়ের শোকসন্তপ্ত বন্ধুবর্গ এই সংবাদ শুনিয়া কথঞ্চিৎ সান্ত্বনা পাইবেন।
ইউ.এন.ও. রায়ের বিধবাকে সারাজীবনের জন্য মাসিক চারি শত টাকার ভাতা এবং তদুপরি রায়ের পুত্র ও কন্যার শিক্ষাব্যয় আপন স্কন্ধে তুলিয়া লইয়াছেন!
ইউ.এন.ও.-র জয় হউক।
.
০৯.
এক ইংরেজ সংবাদপত্র পড়িতে পড়িতে বাষ্পকুলকণ্ঠ অশ্রুমোচন করিয়া বলিল, হায় হায়, কোটিপতি স্মিথ ইহলোক ত্যাগ করিয়াছেন।
সখা সান্ত্বনা দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি কি আপনার নিকট-আত্মীয় ছিলেন?
প্রথম ইংরেজ বলিল, না, আমার দুঃখ তো সেই জন্যই।
ডক্টর মুখোপাধ্যায় বাংলা দেশের ছোটলাট হওয়াতে আমার শোক বহুলাংশে সেই জাতীয়ই। বরঞ্চ বলিব, অনেক বেশি; কারণ মুখোপাধ্যায় মহাশয়কে আমি বিলক্ষণ চিনিতাম কিন্তু হায়, তখন কি জানিতাম যে তিনি একদিন লাট সাহেবের গদিতে আরোহণ করিবেন! এই সরল শান্ত অমায়িক লোককে কি কখনও রাজ্যপালরূপে কল্পনা করিতে পারিয়াছি? তাহা হইলে কি তাহার এইরকম অবহেলা করিতাম? তিনি যখন সাদর আমন্ত্রণ করিয়া বলিতেন, আসুন, আসুন : বঙ্গদেশ হইতে কতিপয় সুপক্ক আম্র আগমন করিয়াছে; ভক্ষণ করিয়া আপনি তপ্ত হউন, আমিও আনন্দ লাভ করি, হায়, তখন জানিলে কি আমি ক্ষিপ্রগতিতে তাঁহার পদাঙ্ক অনুসরণ করিতাম না, অতিশয় সবিনয় তাহার কুশল সন্দেশ জিজ্ঞাসা করিয়া তাঁহার চিত্তজয় করিবার জন্য সচেষ্ট হইতাম না? হায়, কী মূর্খ আমি, ধিক্ আমাকে!
কিন্তু প্রলাপ বকিতেছি। রে রসনে, তুমি সংযত হও।
আমি বড়ই আনন্দিত হইয়াছি। মুখোপাধ্যায় অসাধারণ সজ্জন ব্যক্তি। যদিস্যাৎ সাক্ষাৎ হয় তবে তিনি নিশ্চয়ই আমাকে রসাল ভক্ষণে পুনরপি সাদর আমন্ত্রণ জানাইবেন।
সত্যই বলিতেছি, আমি ও আমার প্রতিবেশীগণ সকলেই মুখোপাধ্যায়ের রাজ্যপালত্ব প্রাপ্তিতে অবিমিশ্র উল্লাস উপভোগ করিয়াছি। একে অন্যকে আনন্দ অভিনন্দন জানাইয়াছি এবং বলিয়াছি, কলিকাতায় আর বাসস্থানের দুর্ভাবনা রহিল না।
মুখোপাধ্যায় মহাশয় আজীবন আর্তসেবা, জ্ঞানসার এবং সত্যের অনুসন্ধান করিয়াছেন। ভগবানের সাহায্য ও গুরুজনের আশীর্বাদ তাহার উপরে নিশ্চয়ই ছিল; কিন্তু দৃষ্টত সর্বপ্রকার সঙ্কর্ম তিনি স্বীয় পুরুষকারের দ্বারাই সম্পন্ন করিয়াছেন। এক্ষণে তিনি যে পদমর্যাদা ও তৎসংযুক্ত রাজদণ্ড হস্তে পাইলেন তাহার সাহায্যে প্রচুরতর সঙ্কর্ম সাধন করিতে পারিবেন এমত আশা নিশ্চয়ই দুরাশা নয়। আর যদি না করিতে পারেন তবে বুঝিব ফিরিঙ্গি-প্রবর্তিত এ পদ এখনও স্বদেশী হয় নাই। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস মুখোপাধ্যায় মহাশয়ও যদি এ পদের রূপ পরিবর্তন না করিতে পারেন তবে আর কেহই পারিবে না।
মুখোপাধ্যায় মহাশয় নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান, অগণিত মুসলমান তাঁহাকে অন্নদাতা বস্ত্রদাতারূপে ভক্তি করে আর হিন্দু সমাজের তিনি স্বজন ছিলেন তো বটেই। তিন সম্প্রদায়ই মুখোপাধ্যায় মহাশয়কে সানন্দ অভিনন্দন জানাইবেন।
মুখোপাধ্যায় দীর্ঘজীবন লাভ করতঃ দেশের দশের মঙ্গল সাধন করুন।
শতং জীব, সহস্রং জীব।
***
শ্ৰীযুত কাটজুর বঙ্গত্যাগে বহু লোক তাহার অভাব অনুভব করিবেন। তিনি অমায়িক, নিরহঙ্কারী ও সুপণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি ধীরে ধীরে বঙ্গভূমির প্রতি বিলক্ষণ অনুরক্তও হইয়াছিলেন।
দিল্লিবাসী বাঙালিরা শ্ৰীযুত কাটজুর দিল্লি আগমনে উল্লসিত হইলেন। ধর্ম জানেন, আজ বাঙালির বেদনা বুঝিবার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও মুরুব্বি নাই। বঙ্গদেশাগত বাঙালি প্রয়োজনবশত দিল্লিতে আগমন করিলে এক্ষণে অন্তত শ্ৰীযুত কাটজুর দ্বারস্থ হইতে পারিবে; দিল্লিবাসী বাঙালিও মনে মনে সে আশা পোষণ করে।
