দ্বিতীয়ত ভারতের একখানা ইতিহাস সঙ্গে আনিবেন।
ভালো বায়োস্কোপ দেখিবার পর হৃদয়ে স্বতই বাসনা জাগে পুস্তকখানি পড়িবার। ঐতিহাসিক স্থাপত্য দর্শনের পর ওই একই অভিলাষ জন্মে। যখন শুনিবেন, এই ত্রিপোলিয়া তোরণের উপরেই বাদশা ফররুখসিয়ার তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী জাহানদার শাহকে বন্দি করিয়া প্রাণদণ্ডের আদেশ দেন এবং আট বৎসর যাইতে না যাইতেই সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় সেই ফররুখসিয়ারকে অন্ধ করিয়া ওই ত্রিপোলিয়া তোরণের উপরেই বন্দি করেন ও পরে তাহাদের আদেশেই তিন নরপিশাচ তাহাকে ঠগীদের পদ্ধতিতে ফাঁসি লাগাইয়া খুন করে, তখন আপনার মনে কৌতূহলের সঞ্চার হইবে তাবৎ ইতিহাস অদ্যোপান্ত পাঠ করিবার। আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন গাইড মাত্রই বিশুদ্ধ গঞ্জিকা না হউক কিঞ্চিৎ অতিরঞ্জনের পক্ষপাতী। গাইড হিসাবে আমারও ন্যূনাধিক সে দুর্বলতা আছে; কিন্তু ইতিহাসের অত্যাচারে সেই দুর্বলতা সম্যক প্রস্ফুটিত হইবার অবকাশ পায় না।
তৃতীয় স্থাপত্য দর্শনকর্ম আরম্ভ করার পূর্বেই স্মরণ রাখিবেন দিল্লিতে হিন্দু স্থাপত্যের বিশেষ কিছু নাই। প্রত্নতাত্ত্বিকরা বিস্তর পরিশ্রম করিয়াও দিল্লিতে প্রাক কুশান যুগের কোনও কিছু আবিষ্কার করিতে সক্ষম হন নাই। অতএব হস্তিনাপুর, ইন্দ্রপ্রস্থ জাতীয় কোনও বস্তু দেখিবার আশা পোষণ না করাই প্রশস্ততর।
একেবারে যে কিছুই নাই তাহাও নয়। কুতুবমিনারের কাছেই রাজা চন্দ্রের(এই চন্দ্রটি কে তাহা ঐতিহাসিকেরা এখনও বলিতে পারেন না।) একটি মনোহর লৌহস্তম্ভ আছে; ফিরোজ তুগলুক নির্মিত ফিরোজ শাহ কোটলাতে একটি অশোক স্তম্ভ এবং উত্তর দিল্লিতে আর একটি; গিয়াসউদ্দিন তুগলুক নির্মিত তুগলুকাবাদের প্রায় ক্রোশ পরিমাণ দূরে সূর্যকুণ্ড (এই কুণ্ডটি সত্যই হিন্দু না মুসলমান সে বিষয়ে মুনিদের ভিতর এখনও মতভেদ আছে), এবং কুতুবমিনারের কাছে যে কুওওৎ উল-ইসলাম মসজিদ আছে তাহার স্তম্ভগুলি– এই স্তম্ভগুলি হিন্দু এবং বৌদ্ধ মন্দির হইতে নেওয়া হইয়াছিল এই বিষয়ে সন্দেহ নাই।
***
সংবাদ শুনিলাম, যে স্থলে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সেই স্থলে রাষ্ট্রপতি বৌদ্ধ শাস্ত্র ও পালি ভাষার চর্চার নিমিত্ত এক প্রতিষ্ঠানের দ্বারোদঘাটন করিয়াছেন। ক্রমে ক্রমে সেখানে নাকি তিব্বত, চীন, বর্মা, শ্যাম এবং সিংহলের ভাষা শিখাইবার ব্যবস্থা করা হইবে।
সংস্কৃতের কোনও উল্লেখ নাই!
হায়, আমি মূর্খ, আমার ধারণা ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বৌদ্ধধর্ম ও শাস্ত্রচর্চা হইত তাহা মহাযান বৌদ্ধধর্মের এবং মহাযানের অধিকাংশ এবং হীনযানের বহুলাংশ শাস্ত্র পালিতে নয়, সংস্কৃতে লিখিত। আমি মূর্খ, আমি তো জানিতাম, হিউয়েং সাঙ এই মহাযান শাস্ত্রই সংস্কৃতের মাধ্যমে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। আমি নিতান্ত জড়ভরত, আমি তো জানিতাম নালন্দাতে শিক্ষাদান প্রদানের মাধ্যম ছিল সংস্কৃত। আমি অতিশয় নির্বোধ, আমার কুসংস্কার ছিল সংস্কৃতের সাহায্য ভিন্ন বৌদ্ধধর্মের উচ্চতম বিকাশ, অর্থাৎ বৌদ্ধদর্শন ও তর্ক কণামাত্র আয়ত্ত করা যায় না।
কিন্তু সার্থক জনম আমার জনেছি এই দেশে। নবনির্মিত সংস্কৃত বিবর্জিত নালন্দার নব-বিদ্যায়তনের মোহমুদার আমার মোহ চূর্ণ চূর্ণ করিল, সদগুরুর ন্যায় অজ্ঞান তিমির অন্ধকারে জ্ঞানাঞ্জন শলাকার ন্যায় চক্ষু উন্মীলন করিয়া দিল।
এখন শুনিব, গ্রিক ভাষা শিখা থাকিলেই ইয়োরোপীয়ন দর্শন করায়ত্ত হয়। ফরাসি জর্মন (কিংবা কেবল মাত্র ইংরেজির মাধ্যমে) শিখিয়া দেকার্ত, কান্ট, হেগেল পড়িবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। প্লাতো, এরিসততেল অধ্যয়ন করা থাকিলেই তাবৎ ইয়োরোপীয় দর্শন হস্ততলগত।
***
কোন রাজাকে নাকি এক বুদ্ধিমান বিশেষ একপ্রস্থ পোশাক নির্মাণ করিয়া দিয়াছিল। সে পোশাক নাকি অসাধু জনের চক্ষুগোচর হইত না। রাজা একদিন সেই পোশাক পরিধান করিয়া শোভাযাত্রায় বাহির হইলে পাত্র অমাত্য অসাধুরূপে সন্দিহান হইবার ভয়ে করতালি ধ্বনি করতঃ পোশাকের ভূয়সী প্রশংসা করিলেন।
হঠাৎ একটি ক্ষুদ্র বালক চিৎকার করিয়া বলিল, কিন্তু পোশাক কোথায়, মহারাজ তো কিছুই পরেন নাই।
চীন হইতে প্রত্যাগত ভারতীয় অমাত্য ও অন্যান্য গুণীজন বারম্বার চিৎকার করিয়া বলিতেছেন চীন দেশ কম্যুনিস্ট নয়। ইঁহাদের কোনও অসাধু অভিসন্ধি নাই সে সম্বন্ধে আমি স্থিরনিশ্চয়, কিন্তু আমি প্রত্যাশা করিতেছি সেই বালকের। কখন না চিৎকার করিয়া বলে চীন তো কম্যুনিস্ট এবং সঙ্গে সঙ্গে সকলের সুখস্বপ্ন ভঙ্গ হয়।
***
আমি এই তত্ত্বটি এখনও হৃদয়ঙ্গম করিতে সক্ষম হইলাম না। ইংরেজ যখন বলে জানো, লোকটি ভারতীয়, কিন্তু একদম আমাদের মতো; ভারতীয়দের সঙ্গে তাহার কোনও সামঞ্জস্য নাই কিংবা যখন কোনও বাঙালি বলে জানো, লোকটা আসলে ছাতুশোর কিন্তু আচার ব্যবহারে ঠিক বাঙালির মতো, তখন আমি আশ্চর্য হই। ছাতুষোর থাকিয়াও কি বাঙালির প্রশংসা অর্জন করতে পারে না?
অর্থাৎ চীনকে কম্যুনিস্টরূপে স্বীকার করিয়াও কি তাহার প্রশংসা করা যায় না কিংবা তাহার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায় না? তারস্বরে চিৎকার করিয়া বলিতে হইবে চীন কম্যুনিস্ট নয়, সে আমাদের মতো তবেই বন্ধুত্ব সম্ভবে? এবং চীন কি আমাদের এই চিৎকার শুনিয়া উল্লসিত হইবে?।
