***
ওস্তাদ মুশতাক হুসেন খানও অতিশয় বিনয়ী লোক কিন্তু তিনি অত্যন্ত প্রাণবন্তও বটেন। রাজ-সম্মান পেয়ে তার মুখে দম্ভ ফুটে ওঠেনি, তিনি হলেন উল্লসিত এবং অভিভূত।
তাই তিনি যখন গান গাইতে আরম্ভ করলেন, তখন তাঁর গলা দিয়ে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। আর সে কী গলা– ওঠানো-নামানোর কায়দা! উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম, আকাশ-পাতাল সবদিক থেকে তিনি যেন টেনে এনে নয়া নয়া ধ্বনি নয়া নয়া সুর আপন গলার ভিতর দিয়ে বের করতে লাগলেন। কখনও গম্ভীর উচ্চকণ্ঠে– সে কণ্ঠ নিষ্কম্প প্রদীপশিখার মতো যেন স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পেলুম আর কখনও যেন নিঝরিণীর গতিবেগের মতো, কখনও আবার তার গলা থেকে মারবেলের গুলির মতো গোল গোল তানের সারি পিল পিল করে বেরুতে লাগল।
আর কী উৎসাহ, কী উদ্দীপনা! ঘন ঘন শাকরেদদের দিকে তাকান, ভাবখানা এই, পছন্দ হচ্ছে তো? সমের সময় তবলচির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি, ইশারা মারেন, আদর দেখিয়ে তাম্বুলাওলার কাঁধে কাঁধ রেখে স্বর যাচাই করে নেন, আর মাঝে মাঝে দু হাত দিয়ে কানের ডগা ছুঁয়ে আপন অশরীরী ওস্তাদের সামনে যেন নিজের অপূর্ণতার জন্য ভিক্ষা করছেন।
বহু বাঘা ওস্তাদের মজলিসে শাকরেদদের বিবর্ণমুখে বসে থাকতে দেখেছি। মেহেরবান মুশতাকের সামনে তারা আনন্দে ফেটে পড়ার উপক্রম। শুরুর দিকে তারা তাকাচ্ছিল যেন শ্রীরাধা গোপীজনবল্লভের দিকে তাকাচ্ছেন।
ওস্তাদ মুশতাকের চেয়েও ভালো ওস্তাদের গান আমি শুনেছি, কিন্তু ওরকম প্রাণবন্ত, সচল রঙ্গে রঙ্গে রঙ্গিমা সঙ্গীত আমি পূর্বে কখনও শুনিনি।
***
দাক্ষিণাত্যের আইয়ার ও আয়াঙ্গারকে দেখেই মনে হল, এরা দু জনই অতিশয় ধর্মভীরু সজ্জন। দক্ষিণের ব্রাহ্মণবাড়িতে থাকার সুযোগ আমার জীবনে বহুবার হয়েছে। সঙ্গীতের প্রতি তাদের অনুরাগ গৃহদেবতার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।
বিশ্বাস করবেন না, দক্ষিণের এক আইয়ার ব্রাহ্মণের বাড়িতে সঙ্গীতোৎসবের শেষে পাঁচটি (একটি নয়, দুটি নয়, পাঁচটি) তামিল কন্যাকে আগাগোড়া জনগণমন অধিনায়ক গাইতে শুনলুম। হাতে তাদের গানের বই ছিল না; তবু রাত্রি প্রভাতিল শেষ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত তারা একবার মাত্র না থেমে গড় গড় করে গেয়ে গেল– অবশ্য দক্ষিণি কায়দায়।
শুধাই, এই বাংলা দেশেরই কটি ছেলেমেয়ে তাবৎ জনগণমন অধিনায়ক কণ্ঠস্থ বলতে পারে?
আসল কথায় ফিরে যাই।
দক্ষিণি গুরুরা দুই সম্মান পেলেন। রাজ-সম্মান এবং উত্তর ভারতের সম্মান। উত্তর ভারত দক্ষিণি গানের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়, সেকথা আপনি-আমি বিলক্ষণ জানি, কিন্তু শুরুদের পয়লা সা আর পয়লা পিড়িঙের সঙ্গে সঙ্গেই সভাস্থ তামাম উত্তর ভারত বে-এক্তেয়ার। দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি সঙ্গীত-রসজ্ঞাকে আমি এখানে চিনি। দেখি, তাঁরা চোখ বন্ধ করে চেয়ারে মাথা হেলিয়ে দিয়েছেন। একেবারে বাহ্যজ্ঞানশূন্য।
কণ্ঠে এবং যন্ত্রে যে এত গোপনবাণী লুকানো আছে, কে জানত? রায় পিথৌরা মূর্খ এবং অরসিক সঙ্গীতের সে কিছুই বোঝে না, তাই সব জিনিসই তার ভালো লাগে। তাই যদি নিবেদন করি, দক্ষিণি সঙ্গীতের তত্ত্ব না বুঝেও যদি তার মর্মে সাড়া জেগে উঠে, তবে কি স্বীকার করবেন না গুরুদেবের সঙ্গীত পশুর প্রাণেও মানবতা জাগাতে পারে। কিন্তু রায় পিথৌরা চুলোয় যাক; দেখি, উত্তর ভারতীয় উন্নাসিকেরাও মুগ্ধ হয়ে দক্ষিণ ভারতের কৃতিত্বকে যেন উদ্বাহু হয়ে অভ্যর্থনা করছেন।
উত্তর-দক্ষিণের এরকম মিলন আমি এর আগে কখনও দেখিনি।
***
আলাউদ্দীন সাহেব আমার দ্যাশের লোক। ভেবেছিলুম তাঁকে কত কথা বলব। গলা ভেঙে গেল, কিছুই বলতে পারলুম না। রবীন্দ্রনাথের নাতনি নন্দিতাও সঙ্গে ছিল। ওস্তাদকে সেলাম করল। ওস্তাদ বললেন, মা, কত দিন পরে দেখা!
ওস্তাদ মুশতাক হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে বেরুচ্ছিলেন তাঁর বন্ধু কাশ্মিরী পণ্ডিত হাকসার। আমি লখনওয়ি কায়দায় ঝুঁকে ঝুঁকে তাকে তিনবার কুর্নিশ করলুম। ওস্তাদ সদয় হাসি হেসে (এবং সবিনয়ে) আমার কুর্নিশ নিলেন দেখে আমার আর সেদিন মাটিতে পা পড়েনি।
***
ততক্ষণে দক্ষিণি গুরুরা চলে গিয়েছেন।
তাদের প্রণাম করতে পারলুম না বলে মনে আক্ষেপ নেই। ভক্তি থাকলে অদৃশ্য প্রণামও যথাস্থানে পৌঁছয়।
***
নিরপেক্ষ পাঠক, এইবার বল তো হিন্দুস্থানে এ-বয়ানে ইংরেজিতে লিখেছি বলে বাঙলায় যদি আনন্দবাজারে না লিখতুম তা হলে তোমার প্রতি অবিচার করা হত না?
.
২৩.
খবর এসেছে নাগপুরে জাপানি ভাষা শেখাবার ব্যবস্থা হয়েছে। অতি উত্তম প্রস্তাব।
ভারতবর্ষ আজব দেশ। কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজের মতো বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানি ভাষা পড়াবার ব্যবস্থা নেই– ওদিকে এদের তুলনায় ক্ষুদ্র নাগপুরে জাপানি পড়াবার ব্যবস্থা হয়ে গেল।
ঠিক তেমনি আজ যদি আপনি উত্তম চীনা ভাষা শিখতে চান তবে আপনাকে যেতে হয় শান্তিনিকেতন নয়, পুণায়। অন্য জায়গায় বিশেষ কোনও বন্দোবস্ত নেই।
(এই দিল্লি শহরে বহুভাষা শেখাবার কিঞ্চিৎ ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু সেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার নেই।)
নাগপুরে পুণায় জাপানি চীনা শেখাবার বন্দোবস্ত, অথচ বড় বড় শহরে নেই। এ যেন সেই মাকড় সম্বন্ধে পূর্ববঙ্গের ধাঁধা, কোথায় জাল আর কোথায় জেলে–
