সেদিন এক অবাঙালি পিথৌরাকে ধাতিয়ে গেলেন। পিথৌরা নাকি বড্ড বেশি বাঙালি বাঙালি বলে চ্যাঁচাচ্ছে।
আরে বাপু, রায় পিথৌরা কে এমন কেষ্ট-বিধু যে তার চিৎকারে কারও কোনও ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে?
একটা গল্প মনে পড়ল।
পূর্ব বাঙলার গয়না নৌকো ঘাটে ভিড়তেই ভাড়াটেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে সব জায়গা দখল করে নিল। একটা চাষা ধরনের লোক কিছুতেই ঢুকতে না পেরে ছইয়ের বাইরে সেই হিমে বসে রইল।
জায়গা দখলপর্ব শেষ হতে ভিতরে আলাপচারি আরম্ভ হয়েছে।
আপনার নাম?
আজ্ঞে, তারাপদ হালদার। আপনার?
আজ্ঞে কেষ্টবিহারী পাল।
তৃতীয় ব্যক্তিকে, আর আপনার?
আজ্ঞে শশধরচন্দ্র গুণ।
করে করে নৌকোর ভিতরকার সকলের চেনাশোনা শেষ হল। তখন এক মুরুব্বি বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার নামটা তো জানা হল না, বাবাজীবন।
লোকটি অতিশয় সবিনয় বলল, আজ্ঞে আমার নাম পাঁচকড়ি বৈঠা।
বৈঠা! এ আবার কী বিদঘুঁটে পদবি রে বাবা! বাপের জন্মে শুনিনি।
লোকটি আবার বৈষ্ণবতর বিনয়ে বলল, আজ্ঞে, আপনারা, হালদার, পাল, গুণ সব নৌকোর ভিতরে বসে আছেন। নৌকো চালাবে কে? তাই আমি বৈঠা একা নৌকা চালাচ্ছি।
বাঙালি কেষ্ট্রবিষ্টরা নৌকোর ভিতরে বসে আপন ধান্দায় মশগুল। তাই রায় পিথৌরা বৈঠা হরবকৎ চেল্লাচেল্লি করে।
.
২২.
পিথৌরাকে ধমক দেওয়া হয়েছে, তিনি কেন মাঝে মাঝে হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড-এ এবং আনন্দবাজার পত্রিকায় একই মাল পরিবেশন করেন।
উত্তরে নিবেদন, আগাগোড়া একই বস্তু পিথৌরা দুই কাগজে কখনও লেখেন না। তবে মাঝে মাঝে দু একটি বিষয় এমনই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় যে, তখন সেগুলো উভয় কাগজে উল্লেখ না করে থাকা যায় না।
এই ধরুন, কাল যদি ওখলায় বেড়াতে গিয়ে দেখি, যমুনার জল উজান বইছেন– পদাবলিতে এরকম অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে, কিন্তু স্বচক্ষে কখনও দেখিনি আর আনন্দবাজার হিন্দুস্থান দুটোই পড়েন যে, এরকম একটা ঘটনা একদলকে বিলকুল জানাব না?
যারা বাঙলায় রায় পিথৌরা পড়তে পারেন, তারা যে কোন দুঃখে ইংরেজিতে পড়েন, তা ও তো বুঝতে পারিনে। রস আর আড্ডা জমাবার জন্য ইংরেজি কি একটা ভাষা!
***
এই ধরুন, গেল সপ্তায় এখানে যা হল সে অভূতপূর্ব।
রাষ্ট্রপতি ভবনে স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চারজন একনিষ্ঠ সাধককে স্বহস্তে চারখানা শাল গলায় পরিয়ে দিলেন। দিল্লি শহরের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ইয়োরোপীয় সঙ্গীতের ওস্তাদ ইহুদি মেনুহিনও আনন্দের আতিশয্যে ঘন ঘন করতালি দিচ্ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি ভবন বলাতে ঘটনার পরিবেশ ঠিক ঠিক ওত্রালো না। যদি বলতুম, ভাইসরিগেল লজে কাণ্ডটা ঘটল তা হলে পাঠক খানিকটা আমেজ করতে পারতেন। কারণ বড়লাট আদরকদর করতেন, তাঁরই জাতভাই সায়েব-সুবোদের কিংবা রাজা-রাজড়াদের।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খার পরনে ছিল কুর্তা আর পাজামা– মাথায়ও কাপড়ের টুপি। এ বেশ পরে ভাইসদের আমলে ওস্তাদজি নিশ্চয়ই সেখানে আমল পেতেন না, সম্মান পাওয়ার কথা দূরে থাকে– সে খেয়ালি পোলাও খেতে যাবেন না।
সাদাসিধে কাপড়-জামা-পরা ওস্তাদ আলাউদ্দিন সাহেব যখন শান্ত মুখচ্ছবি নিয়ে রাষ্ট্রপতির সামনে দাঁড়ালেন, আর তিনি সহাস্যবদনে ওস্তাদের কাঁধে শাল রাখলেন, তখন আমার ইচ্ছে হচ্ছিল, চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে বলি, সাধু, সাধু, সাধু!
সাধু, সাধু বলার রেওয়াজ এখনও এদেশে ফের চালু হয়নি, কিন্তু সে নিয়ে আমার মনে কোনও আক্ষেপ নেই। সভাস্থলে যা করতালি-ধ্বনি উঠল, তার থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল, দেশের লোক ভারি খুশি আমাদের অনাদৃত অবহেলিত গুণীরা যে রাজ-সম্মান পেলেন। রাষ্ট্রপতিকে আমি বহু জায়গায় বহু সার্টিফিকেট-সনদ দিতে দেখেছি, কিন্তু এই চারজন ওস্তাদকে সম্মান দেখাবার সময় তার মুখে যে আনন্দ ফুটে উঠেছিল, তার থেকে বোঝা গেল, তিনিও ওস্তাদদের সম্মান দেখাতে পেরে খুশি হয়েছেন। এবং সত্যই তো, শুধু যে ওস্তাদরা সম্মানিত হলেন তাই নয়, এদের সম্মান দেখিয়ে রাষ্ট্রও তো সম্মানিত হল।
***
আলাউদ্দিন সাহেব অতিশয় নিরভিমান ও ধর্মভীরু লোক। তিনি শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন বটে, কিন্তু তার মনে কি কোনও তোলপাড় চলছিল না? প্রথম যৌবনে যেদিন তিনি মা সরস্বতাঁকে বরণ করে নিয়েছিলেন, সেদিন কি তিনি আশা করতে পেরেছিলেন যে, এমন দিনও আসবে, যখন তিনি রাষ্ট্রপতির স্বহস্তে সম্মানিত হবেন? আজীবন তো তিনি দেখলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের লাঞ্ছনা অবমাননা। বরঞ্চ তাঁর বাল্যকালে সে সঙ্গীতের অনেকখানি কদর ছিল, তার পর ষাট-সত্তর বৎসর ধরে তিনি তার চোখের সামনে দেখলেন, কত ওস্তাদ না খেয়ে মারা গেলেন, কত মেধাবী তরুণ উৎসাহের অভাবে আপন প্রতিভার বিকাশ করতে পারল না। ধীরে ধীরে ক্রমে ক্রমে সর্বস্বান্ত হওয়ার নিদারুণ বেদনা অনেক সাংসারিক লোকই জানেন, কিন্তু এখানে তার চোখের সামনে যা গেল, সে তো তার আপন বিত্ত নয়– যুগ-যুগ সঞ্চিত তাবৎ দেশের সঞ্চিত সঙ্গীত-সম্পদ যে তার চোখের সামনে ভেসে গেল।
না, তা তো নয়। আলাউদ্দীন সাহেবের আজ বড় আনন্দ, ভারতীয় সঙ্গীত আর লোপ পাবে না। রাষ্ট্রের, দেশের, দশের সকলেরই সস্নেহ দৃষ্টি পড়েছে ওস্তাদের ওপর, অর্থাৎ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ওপর।
