***
এই হেমন্ত শিশিরে দেহলি-প্রান্তে যেসব কলা প্রদর্শনী দেখিলাম, তাহার মধ্যে দুইজন চিত্রকরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য– শ্ৰীযুত বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ও শ্ৰীযুত অবনী সেন।
শ্ৰীযুত অবনী সেন গত সপ্তাহে তাঁহার বিগত কয়েক বৎসরের চিত্রকলা দেহলি-প্রান্তে উপস্থিত করিয়াছেন এবং সেইগুলি দেখিয়া বহু গুণী মুগ্ধ হইয়াছেন।
অবনী সেন সরল এবং অনাড়ম্বর চিত্রকার। তিনি জীবজন্তু, প্রকৃতি, পুরুষ-নারী দেখিয়াছেন অতিশয় সযত্নে এবং সেইগুলির প্রকাশ দিয়াছেন নিজস্ব সরল পদ্ধতিতে। সুদ্ধমাত্র মনোরঞ্জন করিবার জন্য কিংবা আর্টিস্টিক হইবার জন্য তাঁহার চিত্রে কোনওপ্রকারের ছলনা নাই। দিল্পি নগরীতে এ বড় বিস্ময়কর বস্তু। সামান্য দুই-তিনটি প্রদর্শনী ব্যত্যয়রূপে বিচারাধীন না করিলে অধিকাংশ স্থলেই দেখিয়াছি কেহ করিতেছেন মাতিসের নকল, কেহবা সেজানের, কেহবা ভানগগের। তবুও ঈষৎ সান্ত্বনা পাইতাম যদি ইহারা সত্যই পূর্বোল্লিখিত কৃতী পূরুষগণের অনুকরণ করিতেন। আমার মনে হয় ইহারা তাঁহাদিগের সত্য বৈশিষ্ট্য সম্যকরূপে হৃদয়ঙ্গম করিতে সক্ষম হন নাই, ইহারা অনুকরণ করিয়াছেন এইসব গুণীদের অবান্তর অংশগুলিকে। শুনিয়াছি শিলার নাকি ডেস্কে গলিত আপেল না রাখিলে কবিতা রচনা করিতে পারিতেন না। দিল্লিতে প্রদর্শিত অধিকাংশ চিত্রকারের চিত্রে গলিত আপেলের দুর্গন্ধ পাইয়া সন্দেহ হইল উঁহারা শিলারের অনুকরণ করিয়াছে– শিলারের প্রতিভার সন্ধান ইঁহারা পান নাই, কিংবা বলিব, অশ্বত্থামার ন্যায় পিষ্টতণ্ডুল দর্শনে উদ্বাহু হইয়া নৃত্য করিয়াছেন।
সাহিত্যে এই কর্ম অহরহ হইতেছে– তাহার সন্ধান সকলেই রাখেন, কিন্তু চিত্রে এই দুষ্কর্ম মর্মান্তিকরূপে শশিকলার ন্যায় বৃদ্ধি পাইতেছে।
তাই নিবেদন করিতেছিলাম, অবনী সেন কোনও গলিত আপেলের সন্ধানে কালক্ষয় করেন নাই। বিচিত্র পৃথিবীকে তিনি স্বচক্ষে দেখিয়াছেন, সেই দর্শন তাঁহার হৃদয়ের যে অনুভূতি যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করিয়াছে, তিনি তাহারই প্রকাশ দিয়াছেন কোনও প্রকারের ছলনা না করিয়া।
এই প্রশস্তিই যথেষ্ট।
***
কলিকাতা মহানগরী প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়াছেন বৈদেশিকদের যেসব প্রতিমূর্তি আমাদিগের নগরে নগরে বিরাজ করিতেছে ইহাদিগকে লইয়া আমাদের কর্তব্য কী? এই প্রশ্ন দিল্লিতেও উপস্থিত হইয়াছে।
কেহ বলিতেছেন, এইগুলোকে কোনও যাদুঘরে রাখিয়া দেওয়াই প্রশস্ততম পন্থা।
কেহ বলিতেছেন, তাহা হইলে ভবিষ্যৎ ঐতিহাসিকগণের মূল্যবান তথ্য আহরণের সূত্র বিনষ্ট করা হইবে।
কেহ বলিতেছেন, এইগুলি স্থানান্তর করিতে যথেষ্ট অর্থব্যয় হইবে এবং যে বিরাট ভাণ্ডার ইহাদিগের জন্য নির্মাণ করিতে হইবে তাহার জন্য অর্থব্যয় এক গৌরী সেনেই সম্ভবে।
কেহ বলিতেছেন, এইগুলিকে ইংলন্ডে পাঠাইয়া দাও। ইহারা ইংলন্ডের কৃতী সন্তান; স্ব স্ব নগরে ইঁহারা প্রাতঃস্মরণীয় এবং প্রাতর্দর্শনীয় হইয়া বিরাজ করুন।
এই ইন্দোনেশিয়ান বান্ধব আমাকে একাধিকবার জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, আপনারা বৈদেশিকদের এই প্রতিমূর্তিগুলি সহ্য করিতেছেন কেন?
আমি প্রশ্ন করিলাম, আপনারা ওলন্দাজ প্রতিমূর্তিগুলির কী ব্যবস্থা করিয়াছেন?
মৃদু হাস্য করিয়া বলিলেন, দণ্ডাধিককাল মধ্যেই চূর্ণবিচূর্ণ করিয়াছি।
***
স্বীকার করি বৈদেশিকের প্রতি কিংবা তাহাদের প্রতিমূর্তির প্রতি আমার এইরূপ জাতক্রোধ সহজে উপজাত হয় না। ভিনাস কিম্বা মজেসের প্রতিমূর্তি দেখিয়া আনন্দ পাই, কোনওপ্রকারের ক্রোধ চিত্তকোণ স্পর্শ করে না।
কিন্তু এই প্রতিমূর্তিগুলি যে অত্যন্ত কুৎসিত। যত দিন পর্যন্ত এই প্রতিমূর্তিগুলি নগরে নগরে বিরাজমান থাকিবে ততদিন আমাদের ভবিষ্যৎ ভাস্করদের সুরুচি নির্মাণের পক্ষে ইহারা নিদারুণ অন্তরায়– ফিল্মি গানা যেরূপ ইয়োরোপীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত গ্রহণের পক্ষে অন্তরায় হইয়া রহিয়াছে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল যেরূপ ভারতীয় স্থপতির রুচি-বিকার ঘটাইতেছে। কিন্তু হায়, ফিল্মি গানা বন্ধ করিবার উপায় নাই, মেমোরিয়াল ধূলিসাৎ করিই-বা কী প্রকারে।
ঐতিহাসিকেরা যে এই প্রতিমূর্তিগুলি হইতে বহুতর গবেষণার উপাদান পাইবেন সেকথা অস্বীকার করি না, কিন্তু এ তথ্য অনস্বীকার্য যে, ইহাদের জন্য ভাণ্ডার নির্মাণ করা অর্থের অতিশয় অন্যায় অপব্যয়।
***
ইঁহারা স্বদেশে প্রত্যাগমন করিতে পারেন কি না সে সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা, ইংলন্ডমাতা ইঁহাদিগকে আপন বক্ষে স্থান দিবেন কি?
কারণ একদা একখানা বিরাট ইংলভীয় কামান– সেই কামান এই দেশে নাকি বহু শৌর্যবীর্য দেখাইয়াছিল– কোনও এক ইংরেজ মহাপ্রভুর উৎসাহে স্বনগরে প্রেরিত হয় এবং নগরের মধ্যবর্তী উদ্যানে প্রতিষ্ঠিত হয়। নগরবাসীগণ সেই বিকটদর্শন কামান দেখিয়া তদ্দণ্ডেই সে চক্ষুশূলকে অপসারণ করিবার জন্য তারস্বরে চিৎকার করে। বহু প্রকারে তাহাদিগকে বলা হইল, এই ভুবনবিখ্যাত কামান ভারতের অমুক দুর্গের প্রাচীর ভগ্ন করিতে সহায় হইয়াছে, অমুক নগরে শত শত ইংরেজের প্রাণরক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছে; এই কামানের জন্মস্থল এই নগর, অতএব এই নগর ইহাকে সম্মান না করিলে ইহার উপযুক্ত সম্মান করিবে কে?
